৩৭. এক কংগ্রেসের কটা ঘর
১৯৩৬-এ জেল থেকে বেড়িয়েই শরৎ বোস বুঝে যান—হিন্দু ভোটও কংগ্রেস পাবে কী না সন্দেহ, অন্য সব সংরক্ষিত আসনে তো কথাই নেই। এআইসিসি-কে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস আগস্ট-সেপ্টেম্বরে শরৎ বোসের সভামুখ্যতায় দুটো প্রস্তাব পাঠাল। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাঁদের বিরুদ্ধে ও সর্বজনীন ভোটাধিকার আর যুক্ত-আসনের পক্ষে আন্দোলন করার স্বাধীনতা প্রদেশ কংগ্রেসকে দেয়া হোক।
কংগ্রেস রাষ্ট্রপতি জওহরলাল জানিয়ে দিলেন—নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য নীতির বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা চলবে না।
কাগজে খবর বেরতে শুরু করল—বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
শরৎ বোস ছুঁদে ব্যারিস্টার। বুঝে গেলেন, এআইসিসি কখনোই অনুমতি দেবে না। কারণ যুক্ত প্রদেশের আইনসভার মোট আসন সংখ্যা অনেক বেশি। লখনৌয়ে সংরক্ষিত মুসলমান আসনেও কংগ্রেস জিততে চায়। যুক্ত প্রদেশের মুসলমানদের ওপর কংগ্রেসের বেশ একটা প্রভাব আছে—বিশেষ করে মোমেন, উলেমা ও আহরদের ওপর। তার সঙ্গে আছে সিয়া-সুন্নি সংঘাত। কংগ্রেস জওহরলালের নেতৃত্বে মুসলমানদের সঙ্গে জনসংযোগকে আন্দোলনের আকার দিয়েছে। সম্প্রদায়ভিত্তিক সংরক্ষণের বিরোধিতা করলে যুক্ত প্রদেশে মুসলমানদের ভোট কংগ্রেস পাবে না। সুতরাং বাংলাতেও তা করা চলবে না। শরৎ বোস একটা বিবৃতিতে জানিয়ে দিলেন–কেন্দ্ৰীয় কংগ্রেস থেকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কোনো কারণেই বেরিয়ে আসছে না। তবে একই সঙ্গে ৩৫-এর আইনের বিরুদ্ধে সরব হওয়া আর সংরক্ষণ নিয়ে নীরব-থাকা যায় না।
এইসব যখন ঘটছিল তখন নলিনী সরকার, তুলসী গোস্বামী, কিরণশঙ্কর রায় এঁরা শরৎ বোসের ঘোঁটে ছিলেন। বিধান রায় ভাবলেন, তিনি নিজে যদি বলেন তাহলে গান্ধীজি না করতে পারবেন না। তিনি কাউকে না-জানিয়ে একা-একা ওয়ার্ধায় গিয়ে গান্ধীজিকে বাংলার অবস্থাই গুধু বোঝালেন না, একটা বুদ্ধিও বাতলে দিলেন, ‘শরৎ বোসের ব্যারিস্টারি কথাবার্তা বাদ দন। অত ম্যানিফেস্টো-ট্যানিফেস্টো লেখালেখির দরকার নেই। আমরা বাংলায় যা বললে ভোটে জেতা যায়, তাই বলব—দুটোই বর্জন করো, এই ভারত-শাসন আইন আর এই সংরক্ষণ। আপনারা চোখ ঘুরিয়ে থাকুন। আপনারা না-দেখলে আর জানবেন কী করে।
বছর দুই-আড়াই হল গান্ধীজি কংগ্রেসের চার-আনার মেম্বারও নন। তিনি এড়িয়ে যেতে পারতেন বা বিধান রায়কে জওহরলালের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। কোনোটাই না করে তিনি বিধান রায়কে মোড়া দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাংলাপ্রদেশে কংগ্রেসের যাঁরা হিন্দু স্বার্থ দেখতে চান, তাঁদের তো মালব্যজির ন্যাশন্যাল পার্টিতে যোগ দেয়াই ভাল। মালব্যজি তাই বলেছেন—না? ন্যাশন্যাল পার্টি হল কংগ্রেস আর হিন্দুসভার যোগফল।’
বিধান রায় রাজনীতিতে এতটাই আনাড়ি ছিলেন যে এরপরও জিজ্ঞাসা করে বসেন, ‘ও। তাহলে ন্যাশন্যালিস্ট পার্টি কংগ্রেসেই থাকছে।’
তখন গান্ধীজি চরকার চাকায় মন দিয়ে, না তাকিয়ে, আঙুল তুলে দরজা দেখিয়ে বলেন, ‘দেখবেন, আপনি যা লম্বা, দেখবেন, আমার ছোট চৌকাঠে ধাক্কা খাবেন না।’
বিধান রায় কাউকে কিছু না বলে ওয়ার্ধা থেকে কলকাতা ফিরলেন। কাকপক্ষীও যে তাঁর এই যাতায়াত টের পায়নি সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। লখনৌয়ে ব্রেকফাস্টের সঙ্গে কাগজ দিয়ে গেল ‘ন্যাশন্যাল হেরাল্ড।’ ডানদিকে বড় বড় করে ছাপা, ‘বাপু ডক্টরস হিজ ডক্টর।’ তাতে সমস্ত ঘটনা বলা আছে। এর ফলে নাকী যুক্তপ্রদেশে কংগ্রেসের পক্ষে মুসলমান ভোট আরো বেড়ে গিয়েছিল।
বাংলায় ভোটে কংগ্রেস সবচেয়ে বেশি আসন জিতবে—এটা ভাবাই যেত না। কে দেবে ভোট? মুসলমানরা দেবে না। শিডিউল্ড কাস্টরা দেবে না। গ্রামের হিন্দুরাও দেবে না। শহরের মুসলমানরাও দেবে না। এক দেবে জমিদাররা। আর মিউনিসিপ্যালিটি এইসব আসন। বাংলার পরিস্থিতি যা ছিল, তাতে ভোটে দাঁড়ানোই ছিল অবাস্তব। কংগ্রেসের একমাত্র ভরসা জমিদাররা শহরে চলে এসেছে। সদরে—সে জিলারই হোক, মহকুমারই হোক আর কলকাতাতেই হোক। যাদের একটু-আধটু আয় আছে, তারাও মফস্বলের সদরে আর কলকাতায় একটা করে বাড়ি বানাতেন আর সে বাড়ির নাম দিতেন জমিদারির নামে-তেহাট্টা হাউশ, বর্ধমান প্যালেস, শেতলাই হাউশ, ঢাকা হাউশ ইত্যাদি। তারা তো গ্রামের রাস্তা ভুলে গেছে—গ্রাম থেকে ভোট আনবে কী?
কিন্তু তাও যে কংগ্রেসই ভোটে সবচেয়ে বেশি জিতেছে, ৫৪টি সিট, তার একটি কারণ কংগ্রেস-ছাড়া আর কোনো পার্টিকেই ভোটাররা চিনত না। মুসলিম লিগকে তো একেবারেই না। কংগ্রেস যেমন কোনো মুসলমান সিটে প্রার্থী দেয়নি, প্রজা পার্টিও তেমনি অসংরক্ষিত, বা খোলা, বা হিন্দু, বা ভদ্দরলোকি আসনে প্রার্থী দেয়নি। প্রজা পার্টি যদি তাঁদের আসনের প্রার্থীর পক্ষে কংগ্রেসের ভোট না পেত, তাহলে কি তারা আসনে তিন নম্বর হয়েও সরকার গড়তে চাইতে পারত? একটা অঘোষিত ফ্রন্ট তো সত্যিই কাজ করেছে প্রজা পার্টি ও কংগ্রেসের মধ্যে। সেই কারণেই এই ভোটে হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি হল না। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি তো সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে যে তারা কোনো যুক্ত সরকারে যাবে না! তারা হককে শর্তসাপেক্ষ সমর্থন দেবে মাত্র। তাও দেবে কী না, সন্দেহ!
তাহলে কিরণশঙ্কর এমন একটা কথা বলল কেন, যার জবাবে প্রজা পার্টির একমাত্র বলার থাকতে পারে, হ্যাঁ, আমরা রাজি। আপনারা কংগ্রেসি সরকার বানান। আমরা কথা দিচ্ছি, আমাদের ফ্রন্ট না-ভেঙে আমরা সরকার ফেলব না। তাহলে কি দিল্লি থেকে কোনো খবর আনিয়েছে কিরণ যে যদি কংগ্রেস তার নিজের ৫৪-র সঙ্গে আরো কিছু মেম্বার জোটাতে পারে, তারা মুসলমান হলেও ওয়ার্কিং কমিটি খুব কিছু আপত্তি করবে না? কিরণ কি বিধান রায়ের ঘোঁটে ঢুকল? নইলে কথাটা ওঠালো কেন কিরণ?
বিধান রায় ভুরু কুঁচকেই জবাব দেন, সেটা তোমারই জানার কথা, শরৎ, তুমিই তো আমাদের অ্যাসেমব্লি পার্টির নেতা।’
শরৎ বোস একটা খোলা হাসিতে মুখ ভরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যা হোক। অন্তত জানা গেল যে চাকরিটা আছে। কোনো ড্রাফট করেছেন নাকী হকশাহেব।’
‘আপনি, কিরণ, গোঁসাই এরা সব থাইকতে ড্রাফট করব আমার হেলে-চাষা? আপনি কন-না, সামসুদ্দিন, ডিকটেশন ন্যাও।’
শরৎ বোস হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘ম্যানিফেস্টো দুটো পাওয়া যাবে?’
একজন কমবয়েসি বেঁটেখাটো লোক গিয়ে শরৎবাবুর হাতে দুটো ম্যানিফেস্টো দিয়ে আসে। পরে জানা গিয়েছিল, এঁর নাম নীরদ চৌধুরী, শরৎবাবুর রাজনীতি বিষয়ক সেক্রেটারি, বিরাট পণ্ডিত।
শরৎ বোস ‘এ ভাবেই তো বলা ভাল’–বলেই তিনি যেন বক্তৃতা দিতে থাকেন, ‘অ্যাজ দিস ফেনোমেনন হ্যাজ বিন রিভিল্ড ইন দি রিসেন্ট ইলেকশনস টু দি লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লি অব দি প্রোভিন্স অব বেঙ্গল, কমিউন্যালিস্টিক পলিটিকস অব অল ব্রান্ডস হ্যাভ বিন রিজেকটেড বাই দি ইলেকটোরেট অব অল রিজার্ভড অর আনরিজার্ভড কনস্টিটুয়েনসিস, উই, দি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়্যাল কংগ্রেস কমিটি অ্যান্ড দি কৃষক-প্রজা পার্টি ইউনাইটেডলি ডিক্লেয়ার হিয়ার টু ফর্ম এ ক্যাবিনেট আন্ডার দি লিডারশিপ অব মিস্টার এ কে ফজলুল হক ফর দি ওয়েলবিং অব দি পিপ্ল অব বেঙ্গল বাই ইমপ্লিমেন্টিং দি প্রোগ্রামস অ্যান্ড প্রোপোজ্যালস অ্যাজ প্রমিজড বাই আস টু দি পিপল অব বেঙ্গল…’
‘আরে শরৎ করো কী, একডা সেনটেন্সেই কি পুরা চুক্তি কইয়্যা দিব্যা নি? ফুলিস্টপ তো নাই-ই, কমা দ্যাও, কমা দ্যাও—’
‘কমা তো টাইপিস্ট দেয়, দাদা। যখন বাংলা করবে তখন যেন কমাটমা দিয়ে নেয়।’ শরৎ বোস বলে যাওয়ার ঝোঁকে বলে যান, ‘অ্যান্ড ইন দিস কানেকশনস উই আর রেসপনডিং টু দি ম্যানডেট অব দি পিপল অব বেঙ্গল হুইচ, ইজ এ ক্লিয়ার ভারডিক্ট এগেইনস্ট এনি অ্যালায়েন্স উইথ এনি কাইন্ড অব কমিউন্যালিজম অ্যান্ড দাস পেভস দ্য ওয়ে টুদি ফর্মেশন অব এ ম্যানিফ্যাস্টলি নন-কমিউন্যাল গবর্নমেন্ট অ্যান্ড…’
‘শরৎ, ক্ষ্যামা দ্যাও ভাই, ক্ষ্যামা দ্যাও। জজশাহেবের চোখ যে ঘুমে ভাইঙ্গ্যা আসে, শরৎ, ভাইডা আমার, এইবার আসল কথাডা কও’–হকশাহেব দু-হাত তোলেন, আর ঘাড় ঘোরান (যেন) তাঁর বসাটা উলটো হয়েছে, তাঁর পেছনে তাঁর দলবল—আর তারা তাঁকে দেখতেই পাচ্ছে না।
‘প্রপারলি কমপেনসেট দি পিপল হু হ্যাভ সাফার্ড ফর লং ফর দেয়ার রিলিজিয়াস আইডেনটিটি।
হকশাহেব হাত তালি দিয়ে ওঠেন, ‘ওঃ, শরৎ তোমার ওকালতি প্রতিভায় মুগ্ধ এই অধমের সেলাম গ্রহণ করো,’ হকশাহেব দাঁড়িয়ে উঠে শরৎ বোসের দিকে তাঁর কোমর বেঁকিয়ে ডান হাতটা আড়াআড়ি পেটের ওপর রাখেন, ‘ওঃ, পেভ দি ওয়ে ফর দি নন-কমিউন্যাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড কমপেনসেট দি রিলিজিয়াস সাফারার্স।’
‘আপনি তো টাইমই দিলেন না দাদা। ফাঁসির আসামি যদি উকিলবাবুর আরগুমেন্টের সময় শুধু গাউন ধরে টানে, তাহলে আরগুমেন্ট কি করা যায়। আপনি নিজে এত বড় অ্যাডভোকেট হয়ে গাউন ধরে টানেন! আপনার গাউন টানলে আপনি কী করতেন?’
‘না-ঘুইর্যাই বাঁ-হাতে একডা সাড়ে বিরাশি সিক্কার থাবড় কইসত্যাম।’
‘কনটেম্পট অব কোট’–জে. সি. গুপ্ত, ব্যারিস্টার এক কোণ থেকে খুব নিচু কিন্তু ভারী স্বরে বলে ওঠেন, তাঁর বাঁ-হাতের আঙুলগুলি চিবুকে।
সেদিকে ফিরে হকশাহেব বলে ওঠেন, ‘ইয়োর অনার, আই প্লিড গিল্টি মোস্ট হ্যাপিলি অ্যান্ড ওয়েট ফর দি পানিশমেন্ট। বাট স্যার, আই উইল এগেইন অ্যান্ড অলওয়েজ স্ল্যাপ এ ব্ল্যাবলার হোয়েন মাই অনার ইজ হিয়ারিং ল।’
সবাই হাত তালি দিয়ে উঠলেন—বেশ একটা মজার নাটক হল।
‘এই নাট্যরস কি আমরা এড্ডু আস্বাদ কইরব্যার পারি না?’ মৈমনসিঙের জব্বর পালোয়ান জিজ্ঞাসা করেন। হকশাহেব বসতে-বসতে বলেন, ‘এই ধরেন মিয়াবিবির সওয়াল। এতগুলা উকিল-ব্যারিস্টার এই অ্যাডডা ঘরে জিয়াল মাছের নাগাল ভাইসত্যাছে, এ গ এক-একজনের আয় দিনে পঞ্চাশ হাজার টাকা’, ফজলুল হক বসে পড়েন।
যোগেন বলে ওঠে, ‘জনাব, শাহেব গ হাত মিয়্যা উদ্ধার যদি-বা পান, উকিল-ব্যারিস্টারের হাত থিয়্যায় কুনো উদ্ধার নাই। কংগ্রেস আর প্রজা পার্টি মিল্যা তো অ্যাড্ডা সনসার হইল। সেই খবরডা তো পাবলিকরে দিব্যার লাগে।’
‘পাবলিক কেডা?’ পালোয়ান জিজ্ঞাসা করে।
‘ভোটার। ভোটার। তাইনরা ভোট দিলে-না মেম্বার!’
‘অ। ভোটার? যাগ জনসাধারণ কয়?’
‘ঐ যার যা পছন্দ, তাই বইল্যা ডাকে।’
‘তা ঐ আমাগ জনসাধারণ ইংরাজি জানে?’
‘বাংলায়ও হবে, বাংলায়ও হবে।’
‘আরে, বাংলাডা কেউ কইয়্যা দ্যাও-না’, হকশাহেব বলে ওঠেন।
‘আমি বলছি’—টানা লম্বা রোগা চেহারা। গায়ে পাঞ্জাবি, পরনে কোঁচা ছাড়া ধুতি। কংগ্রেসের হয়ে জিতে এসেছে আসানসোলের শ্রমিক আসন। কমিউনিস্ট, কংগ্রেসের ভিতরে। বঙ্কিমের গলা গমগমিয়ে ওঠে।
‘শরৎ বোস মশায় যে-প্রস্তাবটা লিখেছেন, তাতে ওঁর ধারণা, সাপটি গর্তে গিয়ে নিশ্চয় মরেছে কিন্তু তাঁর হাতের লাঠিটা কোথায় ভেঙেছে তা দেখতে পাচ্ছেন না।’
‘কথাখান তো সাপ মরব, লাঠি ভাঙব না। কথা ঘুরান ক্যান।’
‘আমি ঘুরাইনি। শরৎবাবু ঘুরিয়েছেন। বলেছেন, ভোটে প্রমাণ হয়ে গেছে আমাদের জনসাধারণ এমন একটা সরকার চান, যে সরকার কোনো ধর্মের সরকার নয়। কিন্তু কোনো ধর্মের জনসাধারণের প্রতি যদি অবিচার হয়ে থাকে তা সংশোধন করা হবে।’ বঙ্কিমবাবু থামলেন।
কিরণশঙ্কর একটু চাপা স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ তাতে ক্ষতি কী হল? হিন্দুর ওপর অন্যায় হয়ে থাকলে সরকার হিন্দুদের দেখবে। মুসলমানদের ওপর অন্যায় হয়ে থাকলে মুসলমানদের দেখবে।’ এতক্ষণ যাঁরা কথা বলছিলেন তাঁদের সবার গলাই ছিল উঁচুতে—শরৎ বোস, হকশাহেব, যোগেন, পালোয়ান, বঙ্কিম মুখার্জি। এক জে সি গুপ্ত চাপা গলায় রসিকতা করেছিলেন, আর এই কিরণশঙ্কর রায় চাপা স্বরে একটা ভাবনার কথা বললেন।
বঙ্কিমবাবু একটু হেসে বললেন, ‘একেই তো বলে ধরি মাছ না ছুঁই পানি। কংগ্রেস ভারতের অন্যান্য প্রদেশে সংরক্ষিত মুসলিম আসনে জেতার আশায় আর জিতেছেও তো, পুরো নির্বাচনই করল কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের বিরুদ্ধে। যাতে সব হিন্দু ভোট পায়। কিন্তু সংরক্ষণ নিয়ে কোনো কথা না-বলে। মাছও ধরল, হাতও শুকনো রইল।’
‘বেশ। তার সঙ্গে শরৎবাবুর ড্রাফটের মিল কোথায়? আমরা তো জানি, তাঁর সঙ্গে মানে প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের নীতি নিয়ে বিরোধই ছিল,’ কিরণশঙ্কর বঙ্কিমবাবুকে বললেন।
‘আমার সন্দেহ—শরৎবাবু নন—কমিউন্যাল বলতে কমিউন্যাল মুসলিম লিগকে বুঝিয়েছেন আর অপ্রেসড বলতে মুসলমানদের বুঝিয়েছেন।’
‘তাতে কি আপনার আপত্তি আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে। এই ভোটে নিশ্চয়ই প্রমাণ হয়েছে, বাংলার কৃষক ধর্মীয় স্লোগানে ভোলে না। তার সঙ্গে-সঙ্গে এও তো প্রমাণিত হয়েছে, মুসলিম লিগের শক্তিও কিছু কম নয়।’
‘তাহলে কী করতে হবে।’
‘জনসাধারণকে জনসাধারণই বলুন। হিন্দু-মুসলমান বলার দরকার নেই।’
‘কোথাও তো বলা হয়নি।’
‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। কমিউন্যাল, নন-কমিউন্যাল বলতে কাকে বলছেন সেটা কি কেউ বুঝবে না? তার চাইতে ‘শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত’ বলুন। তারাই তো সাপ মারার সেই ডান্ডা যা ভাঙবে না।’
