৩৫. সেক্রেটারি : শিডিউল্ড কাস্ট অ্যাসেম্বলি পার্টি
ঘণ্টা পাঁচ ঘুমিয়ে ন-তারিখ সকাল থেকেই যোগেন তার ছাড়া সুতো ধরে ফেলে, সে যেন ঘুমের মধ্যেও সুতো ছাড়ছিল। ডাক্তার রোগী নিয়ে, বুন রান্নাঘরে আর ছেলেরা তাদের স্কুলকলেজে ব্যস্ত। মেঝে থেকে মাদুরের বিছানা তুলে নিয়েছে যোগেন—দিনে কাজকর্মে ঘরটা লাগে। হেম নস্করের কাগজের ভিতরে আবার ডুব দিতে গিয়েই যেন যোগেনের মনে পড়ে যায় দেশবন্ধুর স্বরাজ্য পার্টির প্রার্থী হয়ে সেই ২২-২৩ সাল থেকে কাউন্সিলের মেম্বার ছিলেন নস্করমশায়, দেশবন্ধু মারা যাওয়ার পরও। কিন্তু সংরক্ষণের সুযোগে এবার শিডিউল কাস্ট হিশেবে স্বতন্ত্র দাঁড়িয়ে এমএলএ হয়েছেন। তাহলে, লাভ বুঝলে নতুন করে শিডিউলও হওয়া যায়।
কিন্তু পৈতে পরে পদবী বদলে নতুন করে পুরাণ লিখে সেই তার বাপঠাকুরদার আমলের কর্তারা যে বামুন-কায়েত হতে চেয়েছিল, তা তো তারা হতে পারেনি, বরং ভদ্রলোকরা তাদের ঠাট্টা করত ‘সিকি পয়সার পৈতেধারী’ বলে। যোগেন নিজের জীবনের দেখাশোনা একটু ছাঁকতে চায়। বাপঠাকুরদার আমলের কর্তারা পৈতে পরেছিলেন আর যোগেনও তো ইংরেজি আর সংস্কৃত পড়েছে, উকিল হয়েছে। সেও তো একরকমের পৈতেই হল—সুঁতোর না-হয়ে কাগজের। প্যাচে পড়ে গেল নাকী যোগেন? যেন মনে হয়, হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের মত একটা নতুন ধর্মে—মতুয়া ধর্মে—লোকজনকে জড়ো করতে পারলে নিজেদের জাতের একটা দিশা হত।
যোগেন তার মনে-মনে জানা সত্যটার আঁচ পায়। চিকিৎসা আর গুরুগিরিও তো বামনাই। সে কলেজে পড়ার সময় বরিশাল কালীবাড়িতে হাঙ্গামা বাধিয়েছিল না—শুদ্দুর বলে একটা ছেলেকে বের করে দেয়া হয়েছিল বলে? সেটাও তো বাবু-হওয়াই। বাবুরা যেমন নিজেদের মত করে শাহেব হয়েছে। এখন শিডিউল হিশেবে আলাদা হওয়ায় যোগেন কী হবে? সেটা কোনোদিন জানা হয়নি বলেই, বা জানা যায়নি বলেই—কি জাতধর্ম অটুট রাখতে তারাই— নমশূদ্র-মাহিষ্য-রাজবংশীরা—ঘাড় দিয়েছে, পিঠ দিয়েছে!
কিন্তু দেয়ও তো নি।
ফরিদপুরে নমশূদ্ররা বামুন-কায়েতদের বয়কট করেছিল তিনমাস না ছয়মাস—শূদ্রের মাতৃশ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত হয়ে তারা আসেনি বলে। হিন্দু বামুন-কায়েত জমিদার বাড়িতে নিয়ম করে ডাকাতি করেনি নমশূদ্ররা? এবারের ভোটে নমশূদ্র-মুসলমান চাষিরা খেপে ওঠেনি—গজনভি আর ব্যোমকেশ চক্কোত্তির মন্ত্রীগিরির বিরুদ্ধে। স্যার ফারুকি, স্যার নাজিমুদ্দিন টাকা আর ইসলাম ছড়িয়েও হারল। সরল দত্ত মশায় না হলে হারতেন?
যোগেন তার নিজের সঙ্গে একটা মুখোমুখি কথা বারবার এড়ায়। তারা, এখন যাদের শিডিউল কাস্ট বলা হচ্ছে, আমরা কি হিন্দু? হিন্দু হিশেবে কি আমরা কিছু সুযোগসুবিধে আদায় করতে চাই? তাই যদি চাই, তাহলে এই লিস্টি বানিয়ে যে আমাদের দেগে দেয়া হল, সেটা আমাদের মেনে নেওয়া ঠিক হয়নি? আমরা তো দশটা আসন থেকে তিরিশ-চল্লিশটার জন্য দরবার করতে লাগলাম! যদি এই আসনগুলি রিজার্ভ রাখা না হত, তাহলে কি আমরা এতজন এই ক্ষমতার ভাগীদার হতে পারতাম? এটা কেন হিন্দু হয়ে ক্ষমতার ভাগ পাওয়া? আলাদা লিস্টি যখন করা হয়েছে তখন আমরা সেটাকে হিন্দুদের সঙ্গে পৃথক হওয়ার কাজে ব্যবহার করব না কেন? সেটায় কি আমরা নিজেরা নিজেদের রাজি করাতে পারব? আমরা হিন্দু থাকতে চাই কিন্তু বলতে চাই না? কংগ্রেস যদি হিন্দু না হত, তাহলে কি আমরা খুশি হতাম? আমাদের যদি আলাদা একটা পাওয়ার গ্রুপ হিশেবে কাজ করতে হয়, তবে, সে-পাওয়ার গ্রুপ চাইবেটা কী? নিশ্চয়ই আরো পাওয়ার? মানে, মন্ত্রিসভায় বেশি শিডিউল মন্ত্রী? নাকী একজনও মন্ত্রী চাই না কিন্তু আমাদের জন্য কাজ চাই? কাজটা কী? মন্দিরে পুজো দেয়ার অধিকার? নাকী সিলেটের নমশূদ্রদের মতো জুতো পরার অধিকার?
যোগেন নিজেকে এমন একটা গোলমেলে জায়গায় নিয়ে যেতে পেরে খুশিই হয়। সে যে নিজেই নিজেকে এড়াচ্ছে এতেও তার চনমনে লাগে—অনেকটা সময় খালে সাঁতার কাটলে যেমন ছিমছাম ও ঝিমঝিম লাগে, সেরকম। হ্যাঁ। এই ভোট নিয়ে এখন সে তার কথা বলতে পারবে। আর, বলতে-বলতেই সে-কথা আরো পরিষ্কার হবে। আরো সব পার্টির আরো সব কথা ‘চাইলতে-চাইলতে’ যোগেনের কথাটা ‘চাইল্যান’ হয়ে যাবে।
সন্ধের মুখে একটি লোক এসে একটা হাত চিঠি দিয়ে গেল। প্রজা পার্টির পক্ষে কেপিপির পার্লামেন্টারি বোর্ডের সেক্রেটারি শামসুদ্দিন আমেদ জানিয়েছেন, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহনের গৃহে কংগ্রেস পার্লামেন্টারি বোর্ড ও কৃষক-প্রজা পার্টির পার্লামেন্টারি বোর্ড-এর মিলিত সভা হবে। এই সভার একমাত্র আলোচ্য—দুই পার্টির মধ্যে মন্ত্রিসভা গঠন সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদন। আপনাকে এই সভায় উপস্থিত হয়ে প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভাকে আপনার/ইয়োর মেম্বারস সমর্থন জানাবার জন্য একান্ত অনুরোধ করছি।
মেনিফোল্ড পেপারে টাইপ করা ইংরেজি চিঠি একটু অস্পষ্ট বটে তবে পড়তে কোনো অসুবিধে হয় না। কম তো আর টাইপ করতে হয়নি—প্রত্যেক স্বতন্ত্র মেম্বারকেই যদি দেয়া হয়ে থাকে। খুব ভালো মেনিফোল্ডে তো এক-টাইপে, খুব বেশি হলে, ছ-কপি হয়—তাও নতুন কার্বন পেপারে ও নতুন ফিতেয়। তাও ছ-কপির শেষ কপিটা পড়ার জন্য দেয়া হয় না, শুধু দলিল হিশেবে রাখার জন্য দেয়া হয়। বরিশাল কোর্টে তো এরকমই। কলকাতায় একটু আলাদা হতে পারে।
চিঠিটা ভালো করে দেখতে গিয়ে যোগেন দেখে তার চিঠিতে ‘ইয়োর’-টা কেটে দেয়া। ‘ইয়োর মেম্বারস’টা রাখা। যোগেনকে সম্বোধন করা হয়েছে—সেক্রেটারি, শিডিউল কাস্ট অ্যাসেমব্লি পার্টি বলে।
পরদিন যোগেন যতীন্দ্রমোহনের বাড়িতে পৌঁছে যায় ঘণ্টাখানেক আগে। তখনো প্রায় কেউই আসেনি। কে কে আসবে, তা অবিশ্যি যোগেন জানে না। নিশ্চয়ই কেপিপি আর কংগ্রেসের সব এমএলএরা আসবে না। চুক্তি হবে একটা, দুই দলের নেতাদের মধ্যে—চুক্তি বললে চুক্তি, ঘোষণা বললে ঘোষণা, আজকাল আবার বিবৃতি কথাটাও চলছে। ‘আজাদ’ লেখে সমঝোতা যে-করেই হোক—আইনসিদ্ধ একটা দলিল হবে, প্রস্তাবের আকারেও হতে পারে যে কংগ্রেস আর কেপিপি মিলে এই সরকার তৈরি করছে—তাদের পক্ষে বেশিরভাগ মেম্বারের সমর্থন আছে। সেই প্রস্তাবের জোরে ফজলুল হকশাহেব লাটশাহেবের সঙ্গে দেখা করে সরকার তৈরি করতে চাইবেন, যদি এই ভোটের আগে ও পরে রাজনীতি নিয়ে যোগেন যদ্দুর শুনেছে, আর ভোটের মধ্য দিয়ে তো এই সিদ্ধান্তই বহাল হয়েছে, সেটাই এখনো টিকে থাকে। হ্যাঁ। বদলে যেতে পারে নিশ্চয়ই, তবে তেমন কিছু যোগেনের কানে আসেনি। সে অবিশ্যি বাড়ি থেকে বেরও হয়নি।
ঘরে অনেক ফটো টাঙানো। টেবিলের ওপর, আলমারির ওপর, দেয়ালে ও তাকে। এত বড় ঘরের একটা দিকে চৌকো করে সোফাটোফা সাজানো। এটাই যদি সভার জায়গা হয় তাহলে খুব বেশি কেউ আসছে না।
জুতো খুলে রেখে যোগেন দেয়ালের ছবিগুলো দেখে। যে-ছবিগুলি দেখলেই বোঝা যায় বাড়ির কেউ, সেগুলো যোগেন আর চিনবে কী করে? কিন্তু সে অনুমান করে নিতে পারে চট্টগ্রামে যতীন্দ্রমোহনের প্রাসাদ ও বাগান, নেলী সেনগুপ্তের কম বয়স, জাহাজ থেকে দেখা কোনো বন্দর, বন্দর থেকে দেখা কোনো জাহাজ, সুট-টাইয়ে যুবক যতীন্দ্রমোহন, ধুতি-পাঞ্জাবি-গান্ধীটুপিতে যতীন্দ্রমোহন, কলকাতা কর্পোরেশনে, দুটো গ্রুপ ছবি—একটা বেশ সাজিয়েগুছিয়ে বসা ও তিন লাইনে দাঁড়ানো অনেকে। দেখে মনে হয় বিলেতের। আর-একটাতে মাঝখানের চেয়ারে গান্ধীজি চশমা পরে—হাঁটুর ওপর হাঁটু দিয়ে, হাতলে হাত রাখেননি। তাঁর দু-পাশে ও পেছনে যাঁরা দাঁড়িয়ে ও বসে তাঁদের মধ্যে রাজেন্দ্রপ্রসাদ, মৌলানা আজাদ, জওহরলাল, গোবিন্দ বল্লভ পান্থ আর রাজাগোপালাচারিকে যোগেন চিনতে পারে।
‘ও, আপনি একা-একা বসে আছেন,’ নেলী সেনগুপ্ত দোতলা থেকে নামার সিঁড়ির মাঝখান থেকে বলেন। যোগেন ঘুরে নমস্কার করে, ‘আমি একটু আগে আসছি। ভালই হল। ছবিগুলো দেখা গেল। কম বয়সে দেশপ্রিয়কে দেখতে এত সুন্দর ছিল।’
‘উনি আর বুড়ো হওয়ার সময় পেলেন কোথায়? আটচল্লিশেই তো চলে গেলেন।’
‘কী একটা কথা আছে-না, ভগবান যাদের ভালবাসেন, তাদের—’
‘তাড়াতাড়ি কাছে টেনে নেন। কিন্তু ভগবান তো আমাদেরও ভালবাসতে পারেন।’
‘সে তো বটেই আর আপনারা দুজন মিলে তো একজন ছিলেন।’
‘বাঃ! কথাটা আর-একবার বলবেন? এমন করে তো কেউ বলেননি।’
‘মিসেস সেনগুপ্তা, গুড মর্নিং’, বলতে-বলতে শরৎ বোস ঢুকলেন, একেবারে নতুন নীল স্যুটে, সরু দাগ কাটা। শরৎ বোসের পেছন-পেছন তুলসী গোস্বামী ও কিরণশঙ্কর রায় ঢুকলেন। বসলেন কিরণশঙ্করের পরনে খুব পাতলা খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি আর গায়ে বগলের তলা দিয়ে শ্যাওলা রঙের একটা বালাপোশ। তুলসী গোঁসাইয়ের শাহেবিয়ানা নিয়ে কত গল্প যে রটানো হয়। এরা সকলেই এত নামকরা, প্রত্যেকেই এত সাকসেসফুল, এত বড়লোক, এত ফরসা, যেন এঁরা শেষ কথা বলতেই জন্মেছেন। ততক্ষণে একটু পেছনে পড়ে যাওয়া যোগেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এদের পেছনে রেখে সামনে যাওয়া যায় নাকী!
বাইরে হর্ন বাজিয়ে গাড়ি থামার আওয়াজে শরৎ বোস উদার হেসে বলেন, ‘কেউ বেট রাখবেন, কে এলেন?’
‘এটা একটা বেট হল? ডক্টর আমেদ-এর গাড়ির হর্ন শুনলে তো আমাদের গলির ষাঁড়রাও পথ দেয় না,’ কিরণশঙ্কর বলেন।
ডাক্তার আমেদ তখন ঢুকে গিয়েছেন, সঙ্গে হুমায়ুন কবির, ‘সে তো কিরণ, তোমার গলির ষাঁড় যদি কমিউন্যাল না-হয় তবে তো তোমার ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বারশিপ মালব্যজি কেটে নেবেন।’
হাসির হুল্লোড়ে কেউ খেয়াল করেনি, হকশাহেব ঢুকে পড়েছেন, ‘এত হাসি থেকে বঞ্চিত রেখো না মোরে, দিও কিঞ্চিৎ না করো বঞ্চিত।’ বলে বসলেন।
শরৎ বোস বললেন, ‘হকশাহেব, প্রত্যেকটা পরিস্থিতির, মানে সিচুয়েশনের, একটা ইউনিকনেস আর ইনএভিটেবিলিটি থাকে। সেটা রিপিট করা যায় না, এমনকী নাজিমুদ্দিন-জয়ী ফজলুল হকের খাতিরেও না। তবে, ফর ইয়োর নলেজ—ডক্টর আমেদ বলেছেন কিরণশঙ্কর নাকী ওর গলির ষাঁড়দের পর্যন্ত এত কমিউন্যাল বানিয়েছে যে তারা ডক্টর আমেদ-এর গাড়ির হর্ন শুনলেও পথ দেয় না।’
হকশাহেব সেকেন্ড কয়েক চোখ গোল করে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। তারপর উলটো দিক থেকে হাসতে শুরু করেন। কাল শেরওয়ানি-র গলার বোতামও সাঁটা, মাথায় কাল পারসিয়ান টুপি, খুব সরু একটা চেনে পকেটঘড়ি শেরওয়ানি-র বুকপকেটে। হকশাহেব কথাটা শুনে খুব ছোট একটু দুলুনির হাসি হাসলেন—আওয়াজ করে। তারপরই ওঁর হাঁ বন্ধ হয়ে গেল, চোখের পাতাও নেমে এল। নিজের হাসিটা চুকিয়ে দেয়ার পর হকশাহেবের মনে পড়ল আবার কথাটা! আমেদ বলেছে, কিরণশঙ্কর ষাঁড়গুলোকে কমিউন্যাল বানিয়েছে? হকশাহেব আবার একটা ফিরতি হাসি হেসে চুপ করে যান। তিনি যখন মনে-মনে ভেবে নিয়েছেন, বিষয়-অনুযায়ী হাসা তাঁর হাসা হয়েছে, তখনই তাঁর মনে পড়ে ষাঁড়দের এই কমিউন্যাল ব্যবহারের প্রমাণ কী? আমেদের গাড়ির হর্ন! এবার তিনি তৃতীয় বার হেসে ওঠেন একটু বেশি গমকে। এবারের হাসি তাঁর মুখের পেশিগুলিকে একটু ছুঁয়ে গেল। সেটা হয়তো প্রধানত আমেদের গাড়ির হর্নের স্মৃতিতেই। কিন্তু সেই তৃতীয় হাসি শেষ হওয়ার পর হকশাহেবের মনে এসে যায়—কিরণ বলদগুলোর শুদ্ধি করল কী করে, ওগুলোর তো সুন্নত হয়ে গেছে, কিরণ কি লস্ট ফোর স্কিন সেলাই করে দিয়েছে বলদগুলোর? কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি চতুর্থ হাসিটা বেরতে না-দিয়ে এইটুকু বলতে পারেন, ‘কিরণ বলদগুলিকে ডিসুন্নত করল কী করে।’ কথাটা খুব পরিষ্কার করে বলে হকশাহেব হিমবাহের মত কেঁপে-কেঁপে উঠে গড়িয়ে যেতে থাকলেন। কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের সময় থেকেই কংগ্রেসের এক অংশ, হিন্দুসভা, আর্যসমাজ—শুদ্ধিকরণ কর্মসূচি শুরু করেছিল। এঁরা মনে করতেন যে বাংলা-বিহারের মুসলমানরা হিন্দু ছোট জাত ছিল। মাত্র কয়েকশ বছর আগে তাদের মুসলমান করা হয়। জন্ম-মুসলিম আর বানানো-মুসলিম—এই দুইভাগ রাজনীতিতে এসে গেছে। আর-সব ধর্ম গ্রহণ করা যায়, হিন্দু হতে হলে হিন্দু হয়ে জন্মাতে হয়। ইসলাম বা খ্রিস্টধর্মে নতুন লোক নেয়া যায়, হিন্দুধর্মে নতুন লোক নেয়া যায় না। সেই কারণে হিন্দুদের যা কিছু আছে, তা থেকে কেটেই অন্য ধর্মীয়দের দেয়া হয়। ফলে হিন্দুর সংখ্যা কমে যাচ্ছে আর হিন্দুদেরই খ্রিস্টান বা মুসলমান বানিয়ে তাদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। হিন্দুদের অন্য কোনো ধর্মে নেয়া চলবে না আর যাদের নেয়া হয়েছে তাদের শুদ্ধি করিয়ে হিন্দুত্বে ফেরত নেয়া যাবে—এই এক রাজনীতি বেশ জমে উঠছিল। তাতে কংগ্রেসের নেতাদের কেউ-কেউ ছিলেন। কিরণশঙ্কর রায় তাঁর গলির বলদগুলিকে শুদ্ধি করিয়েছেন—সেই রাজনীতিরই লব্জ।
হকশাহেবের সারা শরীর কাঁপছিল—মাঝে-মাঝে শ্বাস টানছিলেন, আবার নিজের শরীরে ভূমিকম্প ঘটাচ্ছিলেন, মাঝে-মাঝে ‘কিরণ’, ‘কিরণ’, আওয়াজ উঠছিল। তুলসী গোঁসাই যে হকশাহেবের গলার বোতামটা খুলে দিতে বলছেন, অন্তত ‘স্ট্র্যাংগুলেশন’ থেকে বাঁচাতে, তাঁর উচ্চারণ কেউ বুঝতে পারে না। তবে ‘বাট্’ বা ‘বন্’ এমন আওয়াজ থেকে আন্দাজ করে একজন হকশাহেবের জুতোর ফিতে খুলতে গেলে, হকশাহেব তাকে কিক মেরে সরিয়ে দেন। নেলী সেনগুপ্ত এক গ্লাস জল নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে, ‘মিস্টার হক, প্লি-ই-জ, জলটা খেয়ে নিন।’
প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের আইন-অনুযায়ী বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকার তৈরির জন্য চরম এই আলোচনাসভা ডাক্তার আমেদ-এর গাড়ির হর্ন, কিরণশঙ্কর রায়ের ষাঁড়, তুলসী গোঁসাই-এর ইংরেজি আর ফজলুল হকের হাসিতে ভেঙে ভেসে যাচ্ছিল।
