1 of 4

৩৩. শুদ্দুর থাইকলেও নাই

৩৩. শুদ্দুর থাইকলেও নাই

যোগেন যখন কোনো কিছু বুঝে নিতে চায় ও তেমন বোঝাবুঝির ওপর তার কী করণীয় তা নির্ভর করে, তার চলাফেরা হয় বাঘের মত—একেবারে একা হয়ে যায় ও তার পায়ের তলায় কোনো আওয়াজ থাকে না। আবার, সে যখন ঠিক করে ফেলেছে তার করণীয় কী, তখন তার গতিবিধি হয় ঘোড়েল কুমিরের মত। যেন, জলের কিনারার ডাঙাটুকুতে রোদ পোহাচ্ছে, ঠোটে একটু তৃপ্তি লেপে। কেউ তার কাছাকাছি চলে এলে যে-লেজটার শেষটুকু জলেরই ভিতর ছিল সেই লেজটা যেন ঘুরে গিয়ে হাতির শুঁড়ের মত ঝটকায় লোকটিকে ফেলে দেয় আর সে জলের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে যায় তার দাঁতের কপাটিতে লোকটাকে বিধিয়ে, যেন বকের ঠোঁটে স্রোতের ট্যাংরা মাছ।

যখন তার স্বভাবের এই শক্তিগুলির প্রয়োজন হয় না তখন আলসেমিতে, গল্পগুজবে, গানে-খাওয়ায় সে নিজেকে কপাটহীন খুলে দেয়। এটাও তার স্বভাব–সে কপাটহীন হতে পারে। নিজেরই কোনো বিগ্রহ তাকে নিজের কাঁধে বইতে হয় না।

যোগেন সকলেরই চেনাজানা, সকলেরই ভাবভালোবাসা সে পায় আর সেগুলো সে রক্ষা করতেও চায়। ফলে, তার স্বভাবের ভিতরের এই সব চোরাস্রোতের কাটাকুটি এখনো সকলের কাছে পরিষ্কার নয়। পরিষ্কার নয় বলেই—তার ওপর সকলেই নির্ভর করে।

মিটিং ভাঙতে-না-ভাঙতেই যোগেন তাড়াতাড়ি হেম নস্করের কাছে গিয়ে বলে, ‘আপনি কি ভোটের এইসব নথিপত্তর পাইয়্যা গিছেন? আমি তো আজ সকালেই আসছি। আপনার কাগজগুলা এডডু দ্যান না। নিজে-নিজে দেহি কী বোঝা যায়।’

‘নিশ্চয়, নিশ্চয়’, বলে নস্করমশায় সেই যুবকটিকে ডাকলেন যে সভাপতির সঙ্গে কানে-কানে বারবার কথা বলছিল।

‘এই ভোটের যা-সব কাগজপত্র জোগাড় করেছ এঁকে দিতে হবে, গোছানো আছে তো?’

‘তা আছে। মানে, আমাদের তো আবার কাজে লাগতে পারে—’ যুবকটির আপত্তি বোঝা যায়, সে যোগেনকে চেনে না।

‘উনি যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। জেনারেল সিট থেকে জিতে এসেছেন। বরিশাল থেকে কলকাতা এসেছেন মাত্র গতকাল। তাই কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি। ওঁর কাজটাও তো দেখতে হবে। কাজ হয়ে গেলে উনি ফেরত দেবেন। আর, যোগেনবাবু, যেদিন ফেরত দিতে আসবেন, হয় ওর হাতে দেবেন, নয় আমার হাতে দেবেন। না-হলে আপনার দেনা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকবে’–হেমচন্দ্ৰ হেসে যোগেনের কাঁধে হাত রাখেন।

সেই কাগজের ছোট বান্ডিল নিয়ে পথে নেমে ঘড়িটা একবার দেখে নেয় ও নিজের মনেই মুচকি হাসে-দেখো, ঘড়ির যখন কাম তখন ঘড়ি দেখার অভ্যাসও কেমন তৈরি হয়। শীতের বেলা আঁচ করা যায় না। যোগেন পয়সার হিশেব করে না, প্রথম বাসটিতেই উঠে পড়ে, বসার জায়গা ছিল—বসে না, তার তো তিন-চার স্টপের ব্যাপার। রথতলায় নেমে বাস বদলাবে।

যোগেন যখন বড়তলায় পৌঁছয় তখন আলো জ্বলে গেছে। সে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে দাশগুপ্তের বইয়ের দোকানে গিয়েছিল পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিসের বই কিনতে। এই ক-দিনে এটাই যে তার আসল কাজ এটা সে ঠিক করে ফেলেছিল। এরপর দিন যখন তারা মিটিঙে বসবে, তখন যেন যোগেন পার্লামেন্ট-অভিজ্ঞ হিশেবে কথা বলতে পারে। আজকের সভায় যোগেনের কিছু বলার ছিল না। এ মিটিংটা ডাকা হয়েছিল—মেম্বারদের একটু তৈরি করে দিতে আর ঐ অ্যাসেমব্লি পার্টিটা তৈরি করতে। মেম্বারদের মধ্যে যে-কজন আগে কাউন্সিল মেম্বার ছিলেন, তাঁরা তো নিয়মকানুন জানেন। যোগেনও কিছুটা জানে, কিছুটা আন্দাজ করতে পারে—ওকালতি ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সুবাদে। কিন্তু বত্রিশ জন শিডিউল মেম্বারের পঁচিশ জনই জানে না। নবাব-জমিদাররা জানতে চান না। আর, কিছু মেম্বার তো থাকেই যারা নিজের নেত্বত্বে বিশ্বাস করে, আইনে নির্ভর করে না। যোগেন মনে করে-করে কর গুনছিল—নমশূদ্র আর রাজবংশী মেম্বারই তো সব। চব্বিশ পরগনার হেম নস্কর, বর্ধমানের অদ্বৈত মাজি, আর মেদিনীপুরের হরেন দলুই, ঈশ্বর মাল—নমশূদ্র-রাজবংশীর বাইরে তো এই মোটে একগণ্ডা। আরো হয়ত এক-আধজন অন্য জাত থেকে জিততে পারে—যোগেন জানে না আর পদবী থেকে জানা যায় না। যাইহোক, ডিপ্রেসড কাস্টের নেতা অথচ যোগেন কোনোদিন নামই শোনেনি—এমন হওয়া আর কতটা সম্ভব। তাহলে জেনেশুনে বলাকওয়ার লোক শিডিউলদের মধ্যে তো থাকে—মল্লিকরা দুইভাই, রসিকলাল, উপেন বর্মন, পুষ্পজিৎ বর্মন, পি আর ঠাকুর, বিরাট মণ্ডল। এর মধ্যে মল্লিকরা বলবেন কী বলবেন না সেটা নির্ভর করে তাদের গোপন উদ্দেশ্যের ওপর। রসিকদাদাকে সভার নিয়মকানুনে বাঁধা যাবে না। নৌসের আলি-র সঙ্গে যশোর মিউনিসিপ্যালিটি চালিয়ে চালিয়ে জোতদারদের মত ভাবসাব হয়েছে, যেন ওঁর কথা শোনার জন্য সবাই হাঁ করে আছে। বিরাট কাহার সবে বৌ মারা গেছে, এখনো শোক সামলাতে পারেননি। পি আর ঠাকুর যদি পুরো সময় দিতে পারতেন, তাহলে কথা ছিল না। কিন্তু তাঁরও তো ব্যারিস্টারি আছে। উপেন বর্মন মশায় ধীরস্থির মানুষ, বলতে হলে বলবেন, কিন্তু গোলমাল বাধাবেন না। বাকি থাকল পুষ্পজিৎ। হ্যাঁ বলাকওয়া মানুষ। তাহলে একটা অ্যাসেমব্লি তৈরি হয়ে লাভ হবে কী? সেই বামুন-কায়েতদের মধ্যে যারা শাহেব, তাদের কথাবার্তা-বক্তৃতা শুনতে হবে? তাও আবার ইংরেজিতে। বিলেত-ফেরত ইংরেজিতে। শরৎ বোস, তুলসী গোস্বামী, কিরণশঙ্কর রায়, জে সি গুপ্ত, বরদা পাইন, শশাঙ্ক সান্যাল, সারওয়ারদি, আবু হেসেন সরকার, শাহাবুদ্দিন, সামসুল হুদা, স্যার ফারুকি, আবদুর রহিম, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি—এ তো হিন্দু-মুসলমান মিলে কুলীন বামুন-কায়েত সব। মুসলমানদের মধ্যে সব উর্দুওয়ালার ভিড় আর, হিন্দুদের মধ্যে সব ইংরেজিওয়ালার। বাকি সব শিডিউল আর বাঙালি মুসলমান মেম্বাররা তো বুঝতেই পারবে না কী নিয়ে কী কথা হচ্ছে।

যোগেন তাই দাশগুপ্তের দোকানে গিয়ে পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিসের বই খুঁজছিল। কেরফোর্ট-এর পার্লামেন্টারি ল পেয়েছিল, ব্লার্ক পড়ে দ্যাখে ১৮৯৯-এ প্রথম বেরিয়েছে। তার মানে ভারী বই। কিন্তু ব্রিটিশ ল আর এখানকার ল তো এক নয়। এক ল বলেই ব্রিটিশ ল জানা থাকলে ভালো—তারা তো আইনই তৈরি করবে। বইটি তাকে কিনতে হবেই। আজ সে মিশিগান হিস্টরিক্যাল রিপোর্টের ‘এ ম্যানুয়াল অব পার্লিয়ামেন্টারি প্র্যাকটিস’ নামের প্রকাণ্ড বইটা কিনে আনে। যোগেন একটা আন্দাজ পায়—সে যে পার্লিয়ামেন্টারি নিয়মকানুনে সড়গড় সেটা জাহির করাটাই প্রথম কাজ। সে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মেরই বামুন-কায়েতদের চেনে—যোগেন যেই জাহির করবে তার জোর, সঙ্গে-সঙ্গে ওরা পালটা প্যাচে তাকে জব্দ করার চেষ্টা করবে। আফটার অল, এ চাড়াল ইজ এ চাড়াল। সদর দরজা দিয়ে বই আর কাগজের ভার নিয়ে নীচের ঘরে ঢুকতেই প্যারীডাক্তার বলে ওঠে, ‘বাড়িতে কি বালিশ কম পইড়ছে?’

‘পড়ারই তো কথা। এক বালিশে তো অ্যাডডা মুন্ডুই গড়াগড়ি দিব, নাকী?’ বলে যোগেন ভিতরের দরজার দিকে পা বাড়ায়।

‘কাগজের যা বহর তাও তো সন্দ হবার পারে—মুন্ডু একখান না দশখান?’

‘হিন্দুগ আর কুন দেবতার একখান মুন্ডু,—তিন মুন্ডু, চার মুন্ডু, পাঁচ মুন্ডু, ছয় মুন্ডুর কম তো নাই।’

যোগেন দোতলার সিঁড়িতে পা দেয়।

তার পায়ের আওয়াজেই উদ্‌দুর-খুদ্‌দুর দুই ভাই ছুটে আসে, ‘মামা আসচে, মামা আসচে।’ সিঁড়ির মাথায় ওদের মা এসে দাঁড়ায়।

যোগেন জুতো খুলে ঘরে ঢুকে চৌকিতে বসে। বুন বলে, ‘সারাদিন প্যাটে কিছু পইড়ছে নাহি সকালের ঐ দুগা ভাতই সার।’

‘শুনো বুন! তুমি তো সকলগের বিচারে কলিকাতাবাসিনী—’

‘কোন্ দুঃখে? বরিশাল থাইকতে?’

‘বরিশাল তো বরিশালেই আছে। তুমি তো আছ কইলকাতায়। কইলকাতায় কেউ কারো বাড়ি গেলে খাওয়া দ্যায় না। জলপানি দ্যায়। অ্যাডডাই গেলাশ। এগবার জল, এগবার পানি। তুমি আমারে এক ধামা মুড়ি দিব্যার পার। আমরা মামা-ভাইগন্যারা খাই। সরষ্যার ত্যাল এডডু বেশি দিয়ো বুন, য্যান, ঝাঁঝ লাগে, আর ধরো, তিন-চাইরড্যা ধানি মরিচ।’

‘ধানি মরিচ কইলকাত্তায় পাব কনে?’

বোন বেরিয়ে গেলে যোগেন বলে, ‘উদ্‌দুর, দ্যাখ তো রে বাপ, আমার বাক্সডায় আলোয়ান আছে—’। পরিমল বেরিয়ে যায়, বাক্সটা পাশের ঘরে। আর, যোগেন দাঁড়িয়ে জামা খুলে দরজার কোণে ঝুলিয়ে দেয়। তার দাদা মামা-র বাক্স খুলে চাদর আনার মত কাজ পেল, সেই হিংসেয় খুদ্‌দুর বা সুবিমল, আলমারির ফাঁক থেকে মেদিনীপুরি মাদুরটা টেনে বের করে মেঝেতে ছড়িয়ে দেয়। মামা এখন ঐখানেই বসবে, বরাবর তাই বসে—সেটা ছোটভাইয়ের মনে আছে। দেখে যোগেন ডেকে ওঠে, ‘অ বুন, বুন, দেইখ্যা যাও, খুদদুরের বুদ্ধি।’ বোন ছুটে আসে। যোগেন তখন তাকে মাদুর দেখিয়ে বলে, ‘সাত বছর আগে তো দুই ভাইরে এইহানে বইয়্যাই পড়াইত্যাম খুদ্‌দুর তহন এই আঙুলডার নাগাল খাটো। যুক্ত অক্ষর লিখব্যার পারে না, পইড়ব্যার পারে। কিন্তু ওর কথাডা তো মনে আছে। তাই মাদুর পাইত্যা দিল। আয় বাবা, বুকে আয়, যোগেন মাদুরের ওপর চাদর গায়ে থপ করে বসে পড়ে।

‘খাড়াও, মুড়ি দেই, না তো মুইদ্যা যাবে’, বোন মুড়ি আনতে ছোটে।

‘কাগজপত্তর রাইখলি কনে’, যোগেন এদিকওদিক তাকায় আর খুদ্‌দুর গিয়ে কাগজের প্যাকেটটা মাথায় করে এনে, যোগেনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে নামিয়ে দেয়। খুদ্‌দুর বইটা আনেনি বা আনতে পারেনি দেখে উদ্‌দুর ছুটে গিয়ে বইটা নিয়ে আসে।

‘খাতা-পেন্সিল লাগে যে অ্যাড্ডা, যোগেনের এই কথা শুনে খুদ্‌দুর লাফিয়ে উঠে ছুটে গিয়ে তার ব্যাগের ভিতর থেকে একটা পেন্সিল আর একটি রাফ খাতা নিয়ে আসে।

‘উদ্‌দুর, খাতা একখান লাগব। কিন্যা আন। তক্তা সাইজের। হাফতক্তা না। পকেট থিক্যা পয়সা নিয়া যা।’

উদ্‌দুর বেরিয়ে গেলে খুদ্‌দুরকে যোগেন বোঝায়—’দ্যাহো, ছোট ভাইগন্যা। কথাডা তো তোমারে বুইঝব্যার লাগব। আমি যদি তোমার রাফখাতার পাতা ধ্বংস করি, কাইল তো তোমার ক্লাশটিচার তোমারে ধ্বংস কইরবে।’

‘আমি একটা নতুন খাতা বানিয়ে নেব—’  

‘তাতেও তোমার ক্লাশটিচার কইব্যার পারে, বছরের মধ্যিখানে নতুন খাতা ক্যান রে। পুরানডা কি কচুরি বানাইছস?’

শুনে উদদুর হেসে ফেলে ঠোঁটে হাত চাপা দেয়, তার হাসিটা লুকতে, সামনে দু-একটা দাঁত তার পড়ে গেছে। বোন একটা বড় বগি থালায় মুড়িখানা নামিয়ে দেয়। এক মুঠ মুড়ি তুলে হাতের তেলোয় একটু নাচাতে-নাচাতে যোগেন হেসে বলে, ‘কইব-না, ক্লাশটিচার?’

‘কচুরি বলবে, বানাইছস বলবে না।’

‘সে তো তোর টিচার বরিশালি জানে না বইল্যা কইব না। কইবড়া কী?’

‘বানিয়ে খেয়েছিস—বলবে।’

‘আরে রে, আমাগ খুদ্‌দুর তো ঘটি হইয়্যা গিছে গা।’

এইরকম আলাপের মধ্যে মুড়ি চিবনো চলে আর সেই বান্ডিলের কাগজগুলো একটা-একটা করে যোগেন দেখতে থাকে। তারপর একটু থেমে তাকে ভাবতে হয়—কাগজগুলো বোধহয় ভাগ করা দরকার। ভাগ করার আগে একবার দেখা দরকার—কোনো নিয়ম অনুযায়ী ভাগ করা আছে কী না। যদি থাকে তাহলে সেটা বুঝে নিতে হবে। কিছু আছে—কাগজের কাটিং, আঠা দিয়ে সাঁটা—স্টার অব ইনডিয়া, স্টেটসম্যান, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, অমৃতবাজার, যুগান্তর, বঙ্গবাসী, বসুমতী। কিছু-কিছু আছে—গবমেন্টের প্রেসনোট, কিছু আছে লাটশাহেবের সেক্রেটারির স্টেটমেন্ট। ২২ সাল থেকে ৩৬ সাল পর্যন্ত ১৪ বছর হেম নস্কর মশায় তো টানা মেম্বার, কাউন্সিলের। তাঁর কাছে কাউন্সিলের কাগজপত্র, মিনিটস, আলোচনা ও বিলের খাড়া, বাজেট পেপারস, আরো এমন অজস্র কাগজ আসে। সেগুলোও বান্ডিলে বাঁধা। বিতর্কের খশড়াগুলি আছে দেখে, একটু ভেবে, যোগেন খুব খুশি হয়। এগুলো খুব কাজে লাগবে—প্র্যাকটিক্যাল করার মত।

‘উদ্‌দুর, একটা কাজ করতে পারবি? এই বান্ডিলের যে-কাগজগুলির উপুর বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ছাপা আছে, সেইগুল্যা এক বান্ডিল করবি আর যেগুল্যার উপুর খবরের কাগজের কাটা টুকরা সাঁটা আছে সেইগুল্যা এক বান্ডিল করবি। স-ব তারিখ ধইর্যা। পারবি তো?’

‘তোমারই তো ছাত্তর। এই কামডাও যদি না পারে, তাহাইলে তো বুঝায় চৈত্যা গুরুর মৈত্যা শিষ্য।’ প্যারীমোহন উবু হয়ে বসে থালা থেকে একমুঠো মুড়ি তুলে মুখে ফেলেন,

‘অ্যাঁ? মুড়িতে য্যান ঘানির গন্ধ পাই। এতডা তেল। তা কও, মিটিঙে কী হইল, নাঁ হইল। ক্যারে, খুদ্‌দুর, তোর মুহে ব্যথা ক্যান?’

‘আমি কইছিল্যাম বুনকে, ত্যাল বেশি দিতে। কইলকাতার ঠান্ডা তো, আধখান ধানি মরিচেই ঠান্ডা। তোমার বাজারে নাহি ধানিলঙ্কা উঠে না। তহন কইল্যাম—তাহালি খোলা হাতে এডডু ত্যাল দিও।’

‘খুদ্‌দুর, কী হইছে বাবা, মুখখান এমন ভার মামারে পাইয়্যাও। মামায় আদর দেয় নাই? যোগেন খুদ্‌দুরকে কোলে টেনে গিয়ে, চাদর দিয়ে ঢেকে বলে, ‘গোসা ক্যান, তা আমি জানি। আমার তো মনে হইছিল অঙ্কডা আমাগো খুদুই বেশি বোঝে।’

‘বুঝে তো, কত বুঝে, ক্যা, অঙ্ক লইয়্যা আবার কী হইল? খুদু পারে নাই?’

প্যারীমোহন তার ছোট ছেলের প্রতি স্নেহাতুর হয়ে ওঠে।

‘আরে, দিল্যাম আর কই? উদুরে কইলাম-কাউন্সিল আর খবরের কাগজগুলিরে আলাদা কইরব্যার। ঐ তো করব্যার লাগছে। কিন্তু উর্দুর ভাগাভাগি শ্যাষ হওয়ার পর খুদুর ভাগে পইড়ব খুদুর ভাগ। সেই ভাগের ভাগাভাগি কি উদু পারে? অয় তো অ্যাহন ধারাপাত তাবৎ ভুইল্যা গিছে। খুদু, বাবা, উর্দুর ভাগ হয়্যা গেলে বাকি কাগজগুল্যা তুমি কাগজের মাথার ওয়ান, টু, থ্রি দেইখ্যা সাজাইবা। তুমি ওয়ান, টু, চেনো তো, নাকী বাংলা এক-দুই?’

যোগেনের কোলের মধ্যে খুদু ঘাড় হেলিয়ে জানায়, সে জানে আর প্যারীমোহন বলে ওঠে, ‘আরে, অয় তো স্কটিশ কলেজিয়েটে ভর্তি হইয়া গিছে, পুরা শাহেব।’

প্যারীমোহন যোগেনকে জিজ্ঞাসা করে—‘মিটিং থিক্যা যে মণখানিক কাগজ কান্ধে ফিরল্যা, মিনিস্টার হবা তো? হইল কী মিটিঙে?’

নিজেকে যে সে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে সেই খুশিতে যোগেনের চাদরের ভিতর থেকে বেরিয়ে খুদ্‌দুর হামাগুড়ি দিয়ে দাদার পাশে বসে—কখন দাদার কাজ শেষ হবে, তার অপেক্ষায়

‘এডা তো শিডিউল মেম্বারদের মিটিং ছিল। মন্ত্রিসভা তো আর শুধু শিডিউলগ দিয়্যা হবে না।’

‘তা হব ক্যা? সে তো শুদু বামুন-কায়েতগো দিয়্যাও হব না—তারাও তো তত জিতে নাই, কংগ্রেস। মুসলমানগো দিয়াও হব না—তাগো তো একডা কোনো দল নাই।’

‘আইজক্যার মিটিঙে একডা এই কাজ হইছে যে জিতা শিডিউল মেম্বাররা অ্যাসেমব্লির ভিতরে এডডা পার্টি হইছে। শিডিউল কাস্ট অ্যাসেমব্লি পার্টি। হেম নস্কর প্রেসিডেন্ট আর আমারে বানাইছে সেক্রেটারি। এডা কি তোমার আপাতত পছন্দ, মন্ত্রী হওয়ার আগে?

‘অপছন্দের কিছু নাই। অ্যাডডা কিছু তো হওয়া লাগে।’

‘শুদু মেম্বারে কুলায় না?’

‘আরে, আমরা তো অকুলানের জাত। না-কুল্যাইলে কুল্যাবে না। তাতে আর নতুন কী? কিন্তু যদি পছন্দ দ্যাও, তাহালি উথলানো দুধ চাই, কড়াইয়ে য্যান কুল্যায় না। হেম নস্কর তো সেই পুরানা হেম নস্কর? কংগ্রেস ছিল না? স্যায় তো সি আর দাশের দলে খাড়াইত আর জিতত কাউন্সিলে।’

‘এইবার স্বতন্ত্র শিডিউল হইয়া অ্যাসেমব্লিতে আইসছে। তবে, বিশ্বাস নাই।’

‘কীসের বিশ্বাস?’

‘যে মন্ত্রী বানাইব, তাগ দলে ভিড়ব।’

‘সেইডা আবার দোষ ধরো ক্যা? মন্ত্রী হওয়ার লগেই তো মেম্বার হওয়া।’

‘মন্ত্রী হওয়ার লগে না, মন্ত্রী-করার লগে মেম্বার হওয়া।’

‘এইডা কি তোমার ন্যায্য কথা যোগেন? আর-কারুরে মন্ত্রী বানাইব্যার লগে কেউ খাটাখুইট্যা ভোটে জিতে? কী যে কও?’

‘মানে, এই দুই শ পঞ্চাশজন মেম্বাররেই মন্ত্রী কইরব্যার লাইগব?’ খুদ্‌দুর-খুদ্দুরের মা এসে বলে, ‘ভাই, ভাত নামাই?’

উদ্‌দুর ঘাড় না তুলে, হাত তুলে বলে, ‘মা, পাঁচ মিনিট। না-হলে গোনা ভুল হয়ে যাবে।’

খুদ্‌দুর বলে ওঠে, ‘তুই শেষ না করলে তো আমি শুরু করতেই পারব না। খাব কী করে?’

‘তোমাগো কি আইজ নিশিপালন’, মা বলে। খুদ্‌দুর অনিশ্চিত চোখে তাকায়, ‘তাহলে আমি করব কখন?’

‘খাইয়্যা আইস্যা। প্যাটে গরম ভাত পইড়লে দেখবা মাথা ক্যামন ব্যালের লাগান ফাইট্যা যায়, যোগেন খুদ্‌দুরকে আশ্বস্ত করে।’

‘আমার তো খেয়ে উঠে ঘুম পায়।’

‘তো ঘুমাইব্যা, সোনা।’

‘তাহলে আমার ভাগের কাজ?’

‘তোমারই থাইকব। কাল সক্কালে উইঠ্যা ভাগ নিয়া বসবা।’

‘দাদা আমার ভাগ নিয়ে নেবে।’

‘নিলেই হইল? এই উর্দু, ছাড়ান দে। খাওয়ার ডাক কানে আইস্যা গেলে অপেক্ষা অলক্ষ্মী। যোগেন দাঁড়ায়, ডাক্তারও। খুদুর দিকে আঙুল বাড়িয়ে যোগেন বলে, ‘সোনা, চলো, ভাত খাইয়্যা আইস্যা তোমার ভাগ দড়ি দিয়া বাইন্ধ্যা শিয়রে নিয়্যা নিদ্রা যাইব্যা। চলো।’

উদ্‌দুর তিন থাক কাগজের ওপর একটা আড়কাঠ চাপা দিয়ে উঠে পড়ে। দাদার পেছন-পেছন যেতে-যেতে খুদু বলে, ‘দাদা, আমারটা চাপা দিলি না?’

‘বাঁধা আছে, চাপা দিতে হবে না।’

দুই ভাইয়ের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে যোগেন বলে, ‘এইডা তোমার খুব ভালো ডিসিশন হইছে ডাক্তার। কইলকাত্যায় থাইক্যা যাওয়া। দেহো, ঐ দুই পোলারে দেইখ্যা কারো কওয়ার সাইধ্য আছে—নমশূদ্র। যেমন ধলা রং, তেমন খাড়া নাক। বাবুর ঘরের ছাওয়ালদের সঙ্গে কোনো তফাত করা যায়? উদু-খুদু বড় হইতে-হইতে শুদ্দুর-চাঁড়াল উঠ্যা যাবে না?’

‘তুমি কি তুলব্যার চাও?

‘তুমি দেহি জিগ্যাও—হেই শালা শুদ্দুর, কয়খান জুতা খাবি? বাবু, একখানও না। আর যদি বাইন্ধ্যা মারি? তাহাইলে যত মাইরবেন।

‘আমার তো ত্যামন ঠ্যাহে না। বামুন-কায়েত থাইক্যা গেল আর নমশূদ্র উইঠ্যা গেল, এ হয়?’

‘তো কী হয়?’

‘আরে, শুদ্দুর যদি না থাকে বামুন-কায়েত তাইলে বামুন-কায়েত থাকবে ক্যামনে?’

‘আমি তো তাই কইল্যাম।’

‘কইল্যা তো কইল্যা। বামুন-কায়েতগো তুলব্যার পারে এক বামুন-কায়েতই। আমরা তুইলব ক্যামনে?’

‘মন খারাপ কইর‍্যা দিও না ডাক্তার!

‘ডাক্তার বইল্যাই তো কই—ব্যাধির চরম দশা না দেইখলে ব্যাধি সারান যায় না। তোমরা তো ব্যাধির উপশম চাও। আরোগ্য চাও না। শুদ্দুর থাইকলেও লস্ নাই। নাই যদি তাহালি শুদ্দুর থাকাই ভালো।’

‘সে না-হয় তোমার ভালো আমার ভালো। তোমার ছাওয়ালগো আমার ছাওয়ালগোরও সেই ভালো থাইকব? অরাও শুদ্দুরই থাইকব্যার চাইব?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *