1 of 4

৩২. শুধু হিন্দুও নয়, শুধু মুসলমানও নয়

৩২. শুধু হিন্দুও নয়, শুধু মুসলমানও নয়

‘তা এইবার ডাকাডা কইরলা কে গ?’

‘লাটশাহেব। বড় লাটশাহেব। বিলাতের শাহেবমন্ত্রীরা। বিলাতের রাজা। আবার কেডা। এডা তো ভালো হইল আমাগ। না-হইলে ঐ কংগ্রেসি বামুন-কায়েতগ লগে প্যাচের খেলায় আমরা নি পারি?’ রসিকলাল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের ইংরেজ-নির্ভরতা নিয়ে কোনো ঢাকঢাক রাখেন না। সভায় একটু গুঞ্জন ওঠে। কেউ একজন খুব জোরে যেন কাউকে দাবড়ায়, ‘চুপ দে তো কানাই। এই কংগ্রেসের হইয়্যা কাকা খাড়িল ক্যান? কংগ্রেসডারে বেবাক শুদ্দুর বানাইবেন বইল্যা! চুপ দে কানাই—’।

‘যাউক গিয়্যা। এই কথাডা কেউ-না-কেউ জিগ্যাইবে, এই আশায় তো বইস্যা আছি। হেলান দেই নাই। আমরা তো ভোটে জিততে আইজ কংগ্রেস, কাইল কেপিপি হব্যার পারিই। এরা কুনডা আমার শুদ্দুর পরিচয় ঘুচাবার পারে? বর্ণ এ শুদ্দুর, ডাই এ শুদ্দুর।’

‘রসিকবাবু কিন্তু আসল কথাটা তুলেছেন। বিশেষ করে আপনাদের দুইটা পরিচয় আছে। একটা পরিচয় আমরা ভোটারকে দিয়েছি—কেউ কংগ্রেস, কেউ স্বতন্ত্র, কেউ লিগ আর কেউ কেপিপি। যদি কোনো একটা দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত তাহলে ঐ একটা পরিচয়েই চলত। কিন্তু যেহেতু তা পায়নি, তাই আপনাদের দ্বিতীয় পরিচয়টা এখন বের করতে হবে যে আপনারা সকলেই শিডিউল্ড কাস্ট। কংগ্রেসি শিডিউল্ড কাস্ট, লিগ শিডিউল্ড, কেপিপি শিডিউল্ড, এই সব। আপনারা যদি এখানে শিডিউল্ড কাস্ট অ্যাসেমব্লি পার্টি তৈরি করেন, তাহলে তো রসিকলালবাবু সেই পার্টির মেম্বার হবেন।’

‘কাহা শুদ্যা মেম্বার হয় না। প্রেসিডেন হবে।’

‘মেম্বার না হলে তো আর প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। বাইরে কংগ্রেস। আর অ্যাসেমব্লির ভিতরে শিডিউল পার্টি। এটা পার্লামেন্টারি পদ্ধতি, মেম্বারদের বিশেষ অধিকার।’

কেউ একজন বেশ চেঁচিয়েই বলে, ‘তা না হইলে রসিক কীসে, যদি না থাকে দুই মিনসে? নীহারেন্দুবাবু না-থামায় আওয়াজটা থেকে আর পালটা আওয়াজ বেরল না, ‘আমরা যারা কংগ্রেসের মধ্যে আছি তেমন চারজন মেম্বার, বঙ্কিম মুখার্জি আছেন, শিবনাথ ব্যানার্জি আছেন, সোস্যালিস্ট লেজিসলেটারদের ব্লক তৈরি করা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছি।’

‘একটা কথা একটু হওয়া দরকার। ডিপ্রেসড বলেন, শিডিউল্ডই বলেন, মুসলমানদের তার মধ্যে ধরা হচ্ছে না কেন? ধরেন, আজকার মিটিঙে একজনও মুসলমান নাই কেন?’ বর্ধমানের বন্ধুবিহারী মণ্ডল কথাটা তুলতেই শার্টপ্যান্ট পরা ছোটখাটো হুমায়ুন কবির চট করে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘সভাপতিমশায়, আমাকে কি একশ শতাংশ মুসলমান ধরা হচ্ছে না?’

কবির কখন এসে এক কোণে বসে পড়েছেন, সবার চোখে পড়েনি। সেই চমকে হাততালি ওঠে। নীহারেন্দুবাবু বলেন, ‘এখন কবির শাহেব বলুন। আমি তো অনেকক্ষণ বলেছি।’

যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, কবির সেখান থেকেই বলতে শুরু করেন, ‘আসলে ইলেকটেড গবর্মেন্টে, মানে পার্লামেন্টারি সিস্টেমে নাম্বার মানে সংখ্যাটা, সবচেয়ে দরকারি। ধরুন যে-ভোট হয়ে গেল তাতে সংখ্যার অনুপাত কী? আইনসভায় জেতা সদস্যদের আটভাগে ভাগ করা যায়। কংগ্রেসের ৫৪, স্বতন্ত্র হিন্দু উচ্চবর্ণ ১৪, স্বতন্ত্র শিডিউল্ড কাস্ট ২৩, হিন্দু ন্যাশন্যালিস্ট মানে মালব্যজির পার্টি ৩, হিন্দুসভা ২, মুসলিম লিগ ৪০, কৃষক-প্রজা পার্টি ৩৮, স্বতন্ত্র মুসলিম ৪৩ আর ইয়োরোপিয়ান-অ্যাংলো ইন্ডিয়ান-খ্রিস্টান ভারতীয় ৩১। মোট ২৪৮। দুজন দুটো কেন্দ্ৰ থেকে জিতেছেন। আমি যেরকম ভাগ করলাম, তার চাইতে আলাদা-আলাদা ভাগও করা যায়। ধরুন জমিদার ক-জন, উকিল-ডাক্তার-মাস্টার ক-জন সেটাও একটা ভাগ হতে পারে। আমি যে-আটভাগ করেছি তাকে আবার সোজাসুজি তিনভাগ করা যায়—হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান। তাতে দেখা যাবে কংগ্রেসকে ধরে হিন্দু মেম্বার ৯৪, মুসলিম ১২১, আর খ্রিস্টান ৩১। সরকার তৈরি করতে হলে কমপক্ষে ১২৬ জনকে সরকারের পক্ষে দরকার। সেই সংখ্যার সবচেয়ে কাছে আছে মুসলিম মেম্বাররা। সুতরাং এটা একটা সম্ভাবনা।’

সভায় চাপা গুঞ্জন ওঠায় কবির শাহেব বলেন, ‘না, না, আপনাদের চমকে দেয়ার জন্য আমি এই সম্ভাবনার কথা বলিনি। বলেছি সংখ্যার হিশেবে ১২৬-এর সবচেয়ে কাছে কারা। আবার ধরুন, হিন্দু-মুসলমান ভুলে গিয়ে যদি ধরি, কংগ্রেস আর কৃষক-প্রজা পার্টি মিলে হয় ৯২। যদি শাহেবদের ৩১ যোগ করা যায় তাহলে হয় ১২৩। ঐ ১২৬-এর আরো কাছে। এর সঙ্গে স্বতন্ত্র শিডিউল কাস্টের ২৩ যোগ হলে দাঁড়ায় ১৪৯। বেশ শক্তপোক্ত একটা সংখ্যা। এই সরকার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই ফজলুল হকশাহেবের সঙ্গে শরৎচন্দ্র বসুর কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে।

‘ধরুন, কংগ্রেস-প্রজাপার্টির সরকার হলে স্বতন্ত্র শিডিউল কাস্টরা তাকে সমর্থন নাও করতে পারে। কারণ তারা কংগ্রেসকে বর্ণহিন্দুর পার্টি মনে করে। এখন এমন একজন নেতাকে যদি পাওয়া যায় যিনি কংগ্রেসের কিছু সমর্থন পাবেন, স্বতন্ত্র বর্ণহিন্দুদের সমর্থন পাবেন, শিডিউল স্বতন্ত্রদেরও সমর্থন পাবেন আর শাহেবদের তো পাবেনই, তাহলে কিন্তু তিনি ১২৬ পেরিয়ে যেতে পারেন।

কবির শাহেব একটু থামলেন—সম্ভবত কিছু প্রশ্ন উঠতে পারে ভেবে। প্রশ্নটা উঠল আর তুললেন পি আর ঠাকুর। সভা একেবারে নিঃশব্দ হয়ে গেল। কবির আর ঠাকুর একেবারে শেয়ানে-শেয়ানে। সভাপতি মুকুন্দবিহারীর বিস্ময় সকলের চোখে পড়ে।

‘আপনি যে এই থার্ড অলটারনেটিভটা দিলেন, প্রফেসর কবির…’

‘না, না, আমি কোনো অলটারনেটিভ দিইনি মিস্টার ঠাকুর। আমি সংখ্যাগুলো কতভাবে সাজানো যায়, বলছিলাম, স্ট্যাটিসটিক্যাল প্রব্যাবিলিটিস।’

‘আই স্ট্যান্ড কারেকটেড। যে থার্ড প্রব্যাবিলিটিটা সাজালেন তার দুটো বেসিক ডিফেক্ট আছে। এক নম্বর ডিফেক্ট—আপনার কাল্পনিক নেতার সমর্থনে আপনি প্রায় সব পার্টি থেকেই একটা অংশ জড়ো করেছেন। কিন্তু সংখ্যাটি সব জায়গাতেই আন্দাজি। দুই নম্বর ডিফেক্ট—এমন একজন নেতা কল্পনা করা যায় না। তাঁকে রক্তমাংসে দেখা যায়। ধরুন, আমরা সবাই জানি—ফজলুল হক শাহেব সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। ধরুন আমরা মনে করে নিতে পারি—শরৎ বোস মশায়ও তেমন সমর্থন পেতে পারেন। আপনার ইঙ্গিত কিন্তু তৃতীয় কারো দিকে। এটা আপনি স্পষ্ট করুন।

‘প্রব্যাবিলিটি কি এর চাইতে স্পষ্ট হয়?’

‘এমন কি কোনো প্রব্যাবিলিটি হয়, যার কোনো পসিবিলিটি নেই?’

‘ধরুন, আপনিই, মিস্টার ঠাকুর।’

কবির এতই স্বাভাবিক স্বরে কথাটা বলেন যেন এটা খুবই সম্ভব। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতায় চালাকি মেশানো ছিল। ফলে সবার হেসে উঠতে একটু দেরি হয়। সবচেয়ে শেষে হাসেন পি আর ঠাকুর। একটু থতমত ভঙ্গিতে যেন বুঝতে চান—কবির চাইছেনটা কী।

‘আমার ব্যক্তিগত কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু একজন শিডিউল্ড কাস্টকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে তো কেউই রাজি হবে না—মুসলমানরাও না, হিন্দুরাও না।’

‘এতটা নিশ্চিত করে কি বলা যায় মিস্টার ঠাকুর। উলটোটাও তো হতে পারে। হিন্দুরা চায় না কোনো মুসলমান প্রধানমন্ত্রী। মুসলমানরা চায় না কোনো হিন্দু প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং একজন শিডিউল্ড কাস্ট প্রধানমন্ত্রীতে দু-পক্ষই রাজি হয়ে গেল।’

‘আপনি যে আইন-পরিষদের মেম্বার সেখানে কিন্তু সংরক্ষণের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য আপনারা তৈরি করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে সাতজন শিডিউল্ড কাস্ট সদস্যও একমত হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, এমন কোনো রেকর্ড নেই যে, শিডিউল্ড কাস্টের বাইরের কেউ শিডিউল্ড কাস্টদের সমর্থন করছেন। তাই, আপনার তৃতীয় সম্ভাবনার উদাহরণ হিশেবে আমার বা এই সভার আর-কারো নাম বলার অর্থ একটাই—আপনি নামটা বলতে চান না। তার নিশ্চয়ই কারণ আছে।’ পি আর ঠাকুর বসে পড়লেন। সারা ঘর জুড়ে হাততালি ওঠে। কবির শাহেব প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মোছেন।

হাততালি থামলেও গুঞ্জন চলে। কবির শাহেব বাঁ হাত তুলে ইশারা করেন. গুঞ্জন একটু কমতেই তিনি বলেন, ‘আমি ধরা পড়ে গিয়েছি। যদিও আমি নিরাপরাধ। আমি যখন পি আর ঠাকুরকে বলেছি, উনিই সম্ভাব্য তৃতীয় বিকল্প হতে পারেন, তখন আমি কোনো হিন্দু বা মুসলমান বা শিডিউল্ড কাস্ট মেম্বারকে সে-কথা বলিনি। বলছি, পি আর ঠাকুরকেই, যিনি ভারতীয় রাজনীতির নতুন নেতা। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা থেকেই কথাটা বেরিয়ে এসেছে। তবে, এখন যদি আমি সত্যি করেই কার কথা ভেবে তৃতীয় সম্ভাবনার কথা বলেছি তার নাম না বলি, তাহলে আপনারা আমাকে মিথ্যেবাদী ভাববেন। আমিও নিজেকে তাই ভাবব। আমি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কথা ভেবেই বলেছি—আপনারা কেন তাঁকে সমর্থন করবেন না?’

কবির শাহেব বসে পড়েন। কারো মুখ থেকেই কোনো কথা বেরয় না। মুকুন্দবিহারী মল্লিক একবার পেছন দিকে তাকান। যে-লোকটি সভাপতিকে কখনো-কখনো কানে-কানে কিছু বলে যাচ্ছিল, সে এবার তাঁর কানের অতটা কাছে না গিয়েও কথাগুলি বলেন ও সভাপতি কী করণীয় তা বুঝে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের আজকের সভার কর্তব্য এই সিদ্ধান্ত বিচার করা যে আমরা শিডিউল্ড কাস্টের ৩২ জন সদস্য আইনসভায় একত্রিত হতে পারি কী না।’

বিরাট মণ্ডলমশায় বসেবসেই বললেন উঁচু গলায়, ‘খুবই পারি। আমি প্রস্তাব করছি এই সভা থেকে ‘বেঙ্গল অ্যাসেম্বলিজ ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল্ড কাস্ট মেম্বার্স লিগ’ তৈরি হোক। তার সভাপতি হন, হেমচন্দ্র নস্কর আর সম্পাদক হন, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।’

‘আমি এই প্রস্তাব সমর্থন করে বলছি আপাতত ২৩ জন স্বতন্ত্র শিডিউলদের নিয়ে এই পার্টিটা হোক। বাকি নয়জনের মধ্যে তো অদ্বৈত মাঝি ও রসিকলাল বিশ্বাসের মত হিন্দুসভার দুই আর কংগ্রেসের সাত মেম্বার আছেন। আপাতত এই নয় মেম্বারকে বাইরে রাখেন যাতে তাঁরা দুই নৌকোয় পা-রাখার সুযোগে আমাদের ডোবাতে না পারেন,’ কথাটা বললেন রসিকলালই। এটা যে রসিকলালেরই কথাবলার ধরুণ, তা নয়, খুলনা-ফরিদপুর-বরিশালের লোকদেরই কথাবলার এই উলটো ধাঁচা। আর ঢাকার লোকের কথা বলার ধরণেই বোঝা যায় তাদের হাতে কোনো সময় নেই। ফলে, এদের সঙ্গে বীরভূম, আবাদ, দামোদর, নদীয়া, মুর্শিদাবাদের কোনো কথাবার্তা শুরু হতে সবসময়ই একটু দেরি হয়।

যোগেন তার নাম শুনে অবাক হলেও কিছু বলে না। সে বুঝে যায়, বিরাট মণ্ডলের মত নেতা পার্টির নাম, প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির নাম এমন সভায় প্রস্তাবের অর্থ—এটা ওঁরা স্থির করেছেন। ওঁরা, মানে নমশূদ্র সমাজের সর্বজনমান্য নেতারা ঠিক করে ফেলেছেন। যোগেন আগে কলকাতায় আসেনি তাই ওঁরা তার সঙ্গে কথা বলেননি। আগে এলেও যে বলা হত, তাও নয়। রসিকলাল, বিরাট মণ্ডল, মুকুন্দবিহারী কোনো কিছুতে একমত হয়ে গেলে, সেটা ঠেকানো মুশকিল। পি আর ঠাকুর এঁদের সঙ্গে থাকতে পারেন, নাও পারেন। যোগেন ধরতে পারে না উদ্দেশ্যই? পি আর থাকতে সে কেন?

রসিকলালের কথা ততক্ষণে যশোর-খুলনা-বরিশালের বাইরের মেম্বারদেরও বোঝা হয়ে গেছে। কে একজন গলায় সুর খেলিয়ে বলে, ‘উঁয়াদের একটা কইরে পা-ও কাইটে দেয়া যায় না? অবশিষ্ট ও তো দুই নৌকায় রাখা চলে না।’

‘কেডা রে তর্কপঞ্চানন, পাও-কাটার বিধান দেয়’, রসিকলাল তাঁর গলা গম্ভীর করে বলেন।

‘কেন, নীহারেন্দুবাবু যে পড়ালেন গ, ভোটে-জেতার আগের পার্টি জেতার-পর বদলান আইন-মোতাবেক’

পি আর ঠাকুর দাঁড়ালেন। যোগেন তাতে একটু স্বস্তি পায়—পি আর ঠাকুরের মত বা মন আন্দাজ করাটা তার পক্ষে খুব দরকার। তপশিলি সংরক্ষিত তিরিশটি আসনের মধ্যে নমশূদ্র আর রাজবংশীরাই প্রধান। এ নিয়ে ভোটের আগে ছোটখাটো জাতগুলির পক্ষ থেকে আপত্তিও উঠেছিল যে নমশূদ্র আর রাজবংশীরা তাদের গিলে ফেলবে। নমশূদ্রদের ভিতর শিক্ষাদীক্ষা এত বেড়েছে যে তাদের জন্য সংরক্ষণ দরকার নেই—এমন কথা নিয়ে বিলেতে আর্জি পাঠানো হয়েছিল। শাহেবরা কান দেয়নি। সেই নমশূদ্ররা ৩০টি আসনে ১৩ জন জিতে এসেছে। রসিকলাল, বিরাট মণ্ডল, মুকুন্দবিহারী আর পি আর ঠাকুর যদি একমত হয়ে কোনো কিছু স্থির করেন, তাহলে নমশূদ্রদের পক্ষে সে-কথার উলটো কাজ করা সম্ভব নয়। তার ভিতর পি আর ঠাকুরের আলাদা জায়গা। নমশূদ্রদের মধ্যে তিনিই প্রথম বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার, কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর প্র্যাকটিস। তার ওপর তিনি নমশূদ্রদের গুরুবংশের প্রতিনিধি। হরিচাঁদ ঠাকুরের ছেলে ও পি আর ঠাকুরের ঠাকুরদা গুরুচাঁদ ঠাকুর এখনো বেঁচে আছেন। গুরুগিরি ও মতুয়া মন্দির থেকে তাঁদের আয়ের জোরেই তাঁরা বড়লোক। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের গুরু হিশেবে প্রতিষ্ঠার সুফল পিআরএ বর্তেছে।

‘আমারও মনে হয় আইনসভায় আমাদের একটা আলাদা ব্লক বা গ্রুপ হলে সরকারকে বাধ্য করা সহজ হবে। সে যে-সরকারই হোক। আর, রসিকলালবাবুও এ-কথা ঠিক বলেছেন যে, যে-নয়জন তপশিলি সদস্য কোনো দলের হয়ে জিতেছেন তাঁরা বরং শুরুতে এই ব্লকের বাইরেই থাকুন, অন্তত নামে। সভাপতি হিশেবে হেমচন্দ্র নস্কর ও সম্পাদক হিশেবে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নাম আমি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করি।

হাততালি দিয়ে যেন সভার সমাপ্তি সভ্যরা নিজেদের কাছেই ঘোষণা করেন। হুমায়ুন কবির দাঁড়িয়ে উঠে দু-হাত তুলে কিছু বলতে শুরু করলে গোলমালটা থেমে যায় বটে কিন্তু কেউ আর নিজের জায়গায় ফিরে বসেন না, দাঁড়িয়েই শোনেন।

‘এবারের ভোটের ফলটা একটু বিশ্লেষণ করবেন আপনারা। কেপিপি শহরে কোনো আসন পায়নি আর গ্রামে লিগ কোনো আসন পায়নি—এই কারণে শহর আর গ্রামের মুসলমানদের দু-ভাগ করে ভাবা ভুল হবে। গ্রামের আসনের অনেকগুলিতেই জিলা ও মহকুমার শহরের ভাগ আছে। দ্বিতীয়ত, পটুয়াখালির ভোটে নাজিমুদ্দিন শাহেব সাম্প্রদায়িকতার চূড়ান্ত করা সত্ত্বেও জিততে পারেননি। মানে, তেমন সুযোগ পেলে মুসলমানরাও ধর্মের পতাকা ছেড়ে আসতে পারে। মোট মুসলিম ভোটের প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট পেয়েছে কৃষক-প্রজা আর লিগ পেয়েছে ২৮ শতাংশের মত। অথচ লিগ জিতল বেশি আসন। আমি তিনটি ঘটনার কথা বলছি। আপনাদের ভিতর যাঁরা এ বিষয়ে উৎসাহী, তাঁরা ভোটের ফলাফল থেকে এই ঘটনাগুলির অর্থ বের করার চেষ্টা করতে পারেন। এক, কংগ্রেস কোনো মুসলিম আসনে প্রার্থী দেয়নি। দুই, কৃষক প্রজা কোনো সাধারণ বা তপশিলি সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেয়নি। আর, ৩৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী সংরক্ষিত মুসলিম আসনে জিতেছেন—তাঁরা কোনো দলের নয়। এই তিনটি ঘটনার কারণ বের করতে না-পারলে এই ভোট কী বোঝাচ্ছে তা বোঝা যাবে না।’

মুকুন্দবিহারী দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে থেকেই বললেন, ‘আমি সভার সমাপ্তি ঘোষণা করছি।’ কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বসে এমন একটা ভেঙে-যাওয়া সভার দিকে তাকিয়ে তিনি বলে যেতে থাকেন, ‘খুব মূল্যবান সব কথা হল। সব ভেবে দেখতে হবে।’ যেন তিনি জানেন না তিনি কী বলতে চান, ‘একটা অ্যাসেমব্লি পার্টি তৈরি হল। আমাদের তাতে শক্তিবৃদ্ধি হবে, মানে, যদি আমরা বৃদ্ধি হবে, মানে, যদি আমরা বৃদ্ধি চাই।’ উনি একটু হেসে থেমে গেলেন, দু-একজন দু-এক পা বাড়ালেন। উনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘একটা গল্প বলি। মনে পড়ে গেল, কবির শাহেবের শেষ কথায়। এই ভোটটা কী বোঝাল। এক দেশে কেউ কোনোদিন শূকর দেখেনি। হঠাৎ এক শূকর এসে সব মাটিতে গর্ত করতে লাগল। লোকজন প্রথমে ভাবল, বাঃ, বিনে পয়সায় হাল দেয়া হয়ে গেল। তারপরে দেখল ঐ পশুর ব্যবহার সবটাই লাভজনক নয়। তাঁরা রাজামশায়কে গিয়ে ধরলেন, রাজামশায়, একটা ব্যবস্থা করুন। রাজামশায় বললেন, আরে, জন্তুটা কী তা বোঝা না গেলে ব্যবস্থা হবে কী করে। তখন পণ্ডিতরা এলেন বুঝতে ও বোঝাতে। পণ্ডিত মানেই বামুন। তারা রাজামশায়কে বলল, রাজামশায়, জন্তুটাকে বুঝতে পেরেছি বটে কিন্তু শেষ বুঝতে পারিনি। এ-জন্তুটা হয় গজহ্রাস, মানে হাতি ক্ষয় হতে-হতে এই হয়েছে। নয় তো জন্তুটা মূষিকবৃদ্ধি, মানে ইঁদুরের মেদ বেড়ে-বেড়ে এই হয়েছে। এখন আপনারা ভোট খুঁটিয়ে বিচার করুন। দেখবেন আপনি যা চাইছেন, ঠিক সেই জবাবটা পেয়ে যাবেন। তাই প্রোফেসর কবিরের শেষ কথায় আমি এই পরিশিষ্ট মন্তব্য যোগ করি, আগে দেখুন, ইচ্ছেটা কী?’

মুকুন্দবিহারী সভাপতির ভাষণেই কথাগুলো বললেন, নাকী, সভা ভেঙে দিয়ে কথাগুলি বললেন—সেটা বোঝা গেল না। তিনি নিজেও দাঁড়িয়েছিলেন, সভারও অনেকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, তবু, সভা একেবারে চুপ হয়ে গিয়েছিল, কী বলছেন মুকুন্দবিহারী সেটা শুনতে। মুকুন্দবিহারী এত ভালো বক্তা যে এমন ঘরোয়া সভায় তিনি মিটিঙের ভাষণ দিতে চান না বলেই দেননি। আবার, তিনি যদি চাইতেন, তাহলে, সবাইকে বসিয়ে নিজের কথাটা বলে দিতেন। এটা যেন হল, তিনি যে কোনো মত দিলেন না বা কোনো একটি হিশেবের পক্ষে গেলেন না—সেইটুকুমাত্র বুঝিয়ে দিলেন। বেরতে-বেরতে কবির শাহেব তাঁর পাশে গিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, ‘স্যার, এই অ্যানেকডটস ব্যবহারের সুবিধে হচ্ছে, আপনি যা চান তাকেই যুক্তির চেহারা দিতে পারেন।

মুকুন্দবিহারী খুব লম্বা আর তাঁর পাশে কবির শাাহেব যেন আরো বেঁটে। কবির শাহেবের মাথার দিকে তাকিয়ে মুকুন্দবিহারী বলেন, ‘হ্যাঁ, প্রফেসর কবির, যদি ঠিক সময়ে ঠিক গল্পটা মনে পড়ে। পাবলিক মাইন্ডের ওপর এগুলোর প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ যুক্তির চাইতে অনেক বেশি।’

‘হিন্দু এপিকস তো গল্প আর বিপরীত গল্পে ঠাসা। গল্প না হলে প্রমাণ হল না’, নীহারেন্দুবাবু বলেন, নীহারেন্দুও মুকুন্দবিহারীর পাশে খাটো বটে কিন্তু কান বরাবর। মুকুন্দবিহারী বাঁয়ে কাঁধ ঘুরিয়ে নীহারেন্দুকে চোখে-চোখেই বলতে পারেন, ‘মানে, আপনি রামায়ণ-মহাভারতকে হিন্দু-পুরাণ বলছেন? ভারতীয় পুরাণ বলছেন না?’

‘ভারতীয় পুরাণ বললে কি এগুলোর বা আরো সব পুরাণের হিন্দুত্ব কিছু কমে যায়? এগুলো তো হিন্দু জীবনেরই তত্ত্ব।’

‘ভারতীয় জীবন তো শুধু হিন্দুতে বা শুধু মুসলমানে বা শুধু শিডিউল্ড কাস্টে বাঁধা নয়’, পেছন থেকে বললেন উপেন্দ্রনাথ বর্মন—রাজবংশী এমএলএ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *