1 of 4

৩০. যোগেন এমএলএ কলকাতায়

৩০. যোগেন এমএলএ কলকাতায়

বরিশাল এক্সপ্রেস সকাল ৭টা ১০-এ শেয়ালদায় ঢুকতে-না-ঢুকতেই যোগেন এক বগলে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা শতরঞ্চির পোঁটলা আর সেই হাতেই ছোট একটা টিনের সুটকেস নিয়ে আর-এক হাতে ফার্স্ট ক্লাশের দরজা খুলে নেমে পড়ে। হকশাহেব দরজার দিকে পেছন ফিরে তাঁর চাপকানের বোতাম আটকাচ্ছিলেন—টের পায়নি। টের পেয়ে যখন চেঁচাতে শুরু করেছেন, ‘হে-ই মণ্ডল, মণ্ডল, আরে খাড়াও এডডু, ট্রেন থাইমব তো’, যোগেন ততক্ষণে এগিয়ে গেছে। আর কালো পোশাকের এক শাহেব চেকার এসে তাকে টিকিট দেখাতে বলে, ‘ইউ গট ডাউন ফ্রম ফার্স্ট ক্লাশ?’

যোগেন একটু হেসে তার সুটকেস নামিয়ে ও শতরঞ্চি না-নামিয়ে ভিতরের পকেট থেকে টিকিটটা বের করে দিল। চেকার দেখে পাঞ্চ করে বলে, ‘গট ডাউন ফ্রম দ্যাট ফার্স্ট ক্লাশ?’ যোগেন টিকিটটা ফেরত নিতে হাতটা বাড়িয়ে বলে, ‘হোপ ইউ নো ফার্স্ট ক্লাশ টিকেটস্।’ শাহেব নির্লজ্জের মত দাঁত বের করে হাসে—নিচের সারির ডান দিকের দুটো দাঁত নেই। যোগেন তার আঙুল থেকে টিকিটটা প্রায় কেড়েই নিয়ে গেটের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায়। টিকিটটা আর পকেটে ঢোকায় না, আঙুলে ধরে রেখে সুটকেসটা ঝুলিয়ে নেয়। গেটে জমা দিতে গিয়ে চেকারের বুকে সুটকেসটা লেগে যাচ্ছিল—চেকার ঠিক সময়ে বুকটা সরিয়ে নেয়। ওদের অভ্যেস হয়ে গেছে। সকলেরই তো টিনের সুটকেস, শতরঞ্চির পোঁটলা, কারো কারো আবার ছাতা-লাঠি-বস্তাও।

যোগেন দেখে, ডানদিকের আর-একটা গেটে কৃষক-প্রজা পার্টির পতাকা নিয়ে কিছু লোক চিৎকার করছে, ‘বাংলার নেতা ফজলুল হক—জয় জয়,’

‘কৃষক-প্রজা পার্টি—জয় জয়,’

‘মুসলিম লিগ’—’হায় হায়’। ভিড়ের পেছনে কোনো কোনো ভদ্রলোকের সুট পরা। তাদের কারো হাতে ফুলের তোড়া। হকশাহেবকে নিতে এসেছে। যোগেন হঠাৎ নিজের কাছে লজ্জা পায়—তারও তো ঐ গেট দিয়েই বেরবার কথা, ফার্স্ট ক্লাশের গেট। অনভ্যাসে চন্দনের ফোঁটাও চড়চড়ায়। হকশাহেবের হাত থেকে যে ফসকানো গেল—এটাই বাঁচোয়া। না-হলে তার কাজকর্ম শিকেয় উঠত। আজ আটই ফেব্রুয়ারি, সোমবার। হেমচন্দ্র নস্কর মশায় লোক পাঠিয়ে বরিশালে খবর দিয়েছিলেন, আপনি যেদিনই আসুন, আগে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। সেই লোকটির হাতেই যোগেন জবাবি চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে যে সে ৮-তারিখ সোমবার বাসায় মালপত্র রেখে আর দুটো মুখে দিয়েই নস্কর মশায়ের সঙ্গে চিংড়িঘাটায় তার বাড়িতে দেখা করবে। খুব বেশি দেরি হলেও দুপুরবেলা বারটার অধিক হবে না ভরসা করি।

ট্রামডিপোর গা-ঘেঁষা উত্তরের গেট দিয়ে বেরিয়ে যোগেন দাঁড়িয়ে একটু ডাইনে-বাঁয়ে দেখে। কলকাতায় রাস্তা পার হওয়া মানে লংজাম্প প্র্যাকটিস করা। বগলে শতরঞ্চির পোঁটলা আর হাতে সুটকেস ঝুলিয়ে লংজাম্প প্র্যাকটিস হয় না। তার ওপর সার্কুলার রোড-হ্যারিসন রোড-বৈঠকখানা রোডের এই মোড়টায় চোখমাথা ঠিক রাখা যায় না। বাস-ট্রাক-ঠেলা- রিকশা-ট্যাক্সি-ঝাঁকা মাথায় কুলি-ঠেলাভর্তি কাঁচা তরকারি নিয়ে ঠেলা ঠেলতে ঠেলতে ও টানতে-টানতে কুলিদের ছুটে যাওয়া, কাগজের হকারদের গরম খবর গরম খবর বলে ছোটাছুটি, যেখানে যোগেন দাঁড়িয়ে রাস্তা পেরবার তাক করছে তার ডানহাতি ফুটের ভিতরের দোকান থেকে কচুরি ভাজার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, মটরশুঁটি দিয়েছে, মটরশুঁটি তো বরিশালে হয় কিন্তু সেখানে কি আর কেউ রুটি সেঁকতেই জানে, কচুরি তো দূরস্থান আর হালকা হিঙের গন্ধ মেশানো ছোলার ডাল। সুযোগ বুঝে যোগেন রাস্তা পার হয়—লংজাম্পে না, তবে সবার সঙ্গে মিশে প্রায় দৌড়েই। এপাড়ের সেই তেকোণ ফুটপাথে উঠে শ্বাস ফেলে যোগেন। এই মোড়টা পেরতে তার সবচেয়ে ভয় ট্রামগুলোকে। রাজাবাজারের দিক থেকে আসা ট্রামগুলো হঠাৎ এই জায়গাটিতে কোমর হেলায়। সে না-হয় হেলাক—সরে দাঁড়ালেই হল। বোঝা তো যায় না, ট্রামটা হেলে আবার সোজা হয়ে শেয়ালদা সাউথের দিকে গড়াবে, নাকী আরো হেলে বাঁয়ে একেবারে ডিপোর মধ্যে ঢুকে যাবে। তখনই যদি পার্ক সার্কাস—রাজাবাজারের ট্রাম দক্ষিণ থেকে গড়িয়ে আসে, তাহলে দুই বা তিন উটোমুখো আর কোণাকুণি ট্রামের মাঝখানে পড়ে যেতে হবে। যোগেনকে তেমন পড়তে হয়নি কখনো কিন্তু অত জ্বলজ্বলে ইস্পাত গায়ে গা লাগিয়ে পড়ে আছে—এটা দেখতে তার ভালো লাগে না।

হ্যারিসন রোড আর সার্কুলার রোডের কোণটায় উঠে পড়লেই যোগেন নিশ্চিন্ত। ল-কলেজে পড়ার সময়, স্মল কজেস কোর্টে নাম লেখানোর পরও, নিজের খরচা চালাতে তো এই পাড়ার অলিগলিতে প্রেশে প্রুফ দেখে বেড়াতে হত। এখানকার গালিঘুঁজি তার পায়ের আঙুলের ডগায়—চোখ বুজে ঠিক রাস্তায় পা ফেলবে। সে ‘প্যারাডাইস’ সিনেমা হলের পাশ দিয়ে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ের দিকে চলে। এই তো পৌঁছে গেল। এটুকু না-হাঁটলে ট্রামেবাসেই তো সব পয়সা খরচা হয়ে যাবে।

যোগেন সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে ঢুকে পড়ে। কলেজ স্ট্রিট-হ্যারিসন রোডের মোড় থেকে সে ডাইনে ঘুরে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট ধরবে। সেখানে হেদোটেদো পেরিয়ে একেবারে ফুটপাথের ওপর চাঁদসির বিখ্যাত ডাক্তার প্যারীমোহন দাশের বাড়ি। ওটাও হাঁটাপথই। যোগেন ওটুকু হেঁটেই যাতায়াত করে। কিন্তু এখন করবে কি না—ঠিক করতে পারে না। তাতে তো আবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেম নস্করের সঙ্গে দেখা করতে হবে। বুনের বাড়িতে উঠেই তো আর বলা যায় না—চললাম। তারাও তো দু-চার কথা জানতে চাইবে। তাকে তো স্নানাহার সারতে হবে। যদি হেঁটে যাওয়া সাব্যস্ত করত, তাহলে ডাইনে-ডাইনে আরো ঘুরে ঝামাপুকুর দিয়ে কর্নওয়ালিশ ধরত। আর, ট্রামই যদি ধরে, তাহলে বরং কলেজ রো ধরে যাওয়া ভালো।

প্যারীমোহন দাশ ডাক্তারের বাড়িতেই যোগেনের কলকাতার ঠাঁই। এখন তো সে এমএলএ, যদিও আইনসভা এখনো বসেনি আর সে-কলকাতা পৌঁছেছে কয়েক মিনিট আগে। এখন যোগেনের ওঠার জায়গার অভাব নেই। তাদের জাতভাইরা অনেকেই অনেকদিন হল কলকাতার বাসিন্দে। তাদের দেশের বাড়িঘরও আছে, সেখানে যাতায়াতও আছে, কিন্তু ঠাঁই পাকা হয়ে গেছে কলকাতায়। বনমালী দাশমশাই দু-হাতে কামাই করেছেন, চার হাতে খরচা করেছেন। প্রথম যুদ্ধের সময়ই তিনি ‘নমশূদ্র শিক্ষা সমিতি’ আর ‘বাণীভবন’ নামে শুধু তাঁর জাতিভাইদের জন্য একটা মেসবাড়ি তৈরি করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে সে আর থাকবে কী করে? খরচ জোগাবে কে? ডালমিয়া সিমেন্ট কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার অমিয় দাশদের বাড়ি আছে। ঢাকার মোহিনী দাশের ছেলেমেয়েরাও তো এই শহরেই নানা জায়গায় থাকে। মল্লিকদের তিন ভাইয়ের কথা যদি বাদও দেয়া যায়, তাহলেও, কলকাতা শহরে যোগেনের থাকা-খাওয়ার জায়গা একটা জুটে যেত। এখন। কিন্তু আইন পড়তে যখন এসেছিল, তখন যোগেনের মনেও পড়েনি—এদের কারো কথা। তাদের জাতের পক্ষে, বাড়ির পক্ষে তো বটেই, পাঠশালা পেরনোর পর মিডল স্কুলে পড়াই তো প্রায় যুদ্ধ জয়, তারপর হাইস্কুলে ঢোকা মহাযুদ্ধ জয়। ম্যাট্রিক পাস হলে তো রাজা ত্রিশঙ্কুর অবস্থা—এত শিক্ষিত ছেলে না-পারবে হাল ধরতে, না-পারবে করাত ধরতে। তাদের ছেলে বামুন-কায়েত হয়ে গেলে সংসারে কামাই করবে কে? যোগেন তো অভিশপ্ত নল রাজা—সে গিয়ে কলেজে ঢুকল। তাতেও কুলল না–সে পূর্বজন্মের অভিশাপের শর্ত পূরণ করতে কলকাতায় এসে আইনি কলেজেও ঢুকল। যোগেনের জাতভাইদের মধ্যে ভাবভালোবাসা আছে। কারো অবস্থা একটু ভালো হলে, সে জাতিগুষ্টিকে দূর-দূর করে না। তার একটা কারণ, যোগেন বুঝে নিয়েছে—যত ভালো অবস্থাই হোক, নমশূদ্রের হাতে বামুন-কায়েক-বদ্যি তো জল খাবে না। অবস্থা ভালো হলে তো অভিমানও বাড়ে। সেই অভিমানই তার জাতভাইদের মধ্যে মিলমিশটুকু রেখেছে। সেই মিলমিশটুকুর খাতিরে এমএলএ যোগেন মণ্ডলকে নিজের বাড়িতে যত্নে আদরে রাখার লোক জুটবে।

যোগেন যখন আইন পড়তে এসেছিল, তখন তো যোগেন ছিল অপরাধী—তার জ্ঞাতিগোত্রের কাছে, তার বাড়ির কাছে, তার নিজের কাছেও। বিএ পাশ করেও তার হল না, এখন সে বিএলও হবে? অথচ যোগেন তার এই উচ্চাশার পক্ষে কোনো যুক্তি দিতে পারত না। কী যুক্তি দেবে? উকিল হলেই শয়ে শয়ে টাকা কামাই করবে? কে আসবে নম-উকিলকে মামলা দিতে? যোগেন বলতে পারত—’বাবু হব।’ কিন্তু তাদের জাতের মধ্যে তখনো বাবু-হওয়াটা উচ্চাশার বিষয় নয়। উপহাসের বিষয়—’বাবু হবা?’ এমন একটা উপহাস্য কাজে কে যোগেনকে সাহায্য করবে—তার নিজের সমাজের কে? তার নিজের সমাজের যারা কলকাতায় একটু ভালো আছে—তাদের মধ্যেই-বা কে? কারণ, তাদের কারো জানা ছিল না—’কেন’, এই প্রশ্নটির জবাব। যোগেন কেন ল পাস করবে? যোগেনকে আইন কলেজেই ভর্তি হতে হবে কেন? যোগেন যদি আইনই ভালোবাসে, তাহলে মোক্তারি পরীক্ষা দিচ্ছে না কেন?

যোগেন যে তখন প্যারীমোহন ডাক্তারের বাড়িতে ঠাঁই গেড়েছিল, তার কারণগুলোর মধ্যে কোনো মিল নেই। প্যারীমোহন একেবারে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের ওপর একটা একতলা বাড়ি কিনেছিলেন—দু-চার বছর আগে। প্যারীমোহন যদি বাড়ি কিনতে পারেন, তাহলে যোগেন মণ্ডল সেখানে থেকে ওকালতি পড়তে পারে। এই কারণটির গাঁটগুলো খুব পাকা নয়, বাইরে থেকে। একজন বাড়ি করলে আর-একজনের সেখানে থাকার হক আসে কোত্থেকে? প্যারীমোহন দাশ, চাঁদসি-ডাক্তার, খাশ কলকাতায়, খাশ কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের ওপর, খাশ থিয়েটার-পাড়ায় যদি একটা বাড়িই কিনতে পারে আর তার ছেলেদের নাম দিতে পারে-পরিমল, সুবিমল, –সুকোমল তখনো হামা টানে—তাহলে কি দেশস্থ ও জাতস্থ একটি ছেলে গ্র্যাজুয়েট হয়ে এসে আইন পড়তে শুরু করলে ডাক্তার ‘না’ করতে পারে? ডাক্তারও তার কাজ গুছিয়ে নেয়—যোগেন তার দুই ছেলে, পরিমল ও সুবিমলকে গ্র্যাজুয়েট করে দেবে। একে বলে—থেকে যাওয়া আর লেগে যাওয়া।

কিন্তু থাকা ও লাগার জন্যও প্যারীমোহনের বাড়ির কথা মনে এল কেন?

চাঁদসি, বারথি, মৈস্তারকান্দি, গৌরনদী, মাহিলারা একই থানার মধ্যে। শুধু তাই নয়। একই ইউনিয়নে। শুধু তাই নয়। চাঁদসি আর মৈস্তারকান্দি একই সড়কের ডাইনে-বাঁয়ে। শুধু তাই নয়। মৈস্তারকান্দি বললে একটু দূরের কেউ চিনবে না, চাঁদসি বললে দুনিয়ার সবাই চিনবে। তাহলে, যোগেন তো চাঁদসি-রই ছেলে। চাঁদসির দাশ-ডাক্তারদের কথা পৃথিবীর কে না জানে? সেই চাঁদসির ডাক্তারবাড়ির ছেলে প্যারীমোহন দাশের স্ত্রীকে যদি যোগেন ‘বুন’ বলে ডেকে থাকে, বরাবরই, আর সেই ‘বুন’ যদি যোগেনকে ‘ভাই’ বলেই ডেকে থাকে, বরাবরই, তাহলে প্যারীমোহন তো যোগেনের সাক্ষাৎ ভগ্নীপতিই হয়। নমশূদ্রদের তো আর কুলপঞ্জিকা থাকে না যে কার মেলে, কার গাঁইয়ে, কে কার কী হয় তা লেখাপড়া থাকবে? প্যারীমোহনের ছেলেরা—পরিমল, সুবিমল—যোগেনকে ‘মামা’ ডাকে।

যোগেন হয়তো সম্পর্কের এই নিবিড়তাটুকু চায়। সেই নিবিড়তায় একটা গন্ধ পায়—যেন সে অনেক পুরনো ও ছড়ানো সময়ে বাঁধা। সেই গন্ধ পায় বলেই সে গঙ্গাজলের কলে ফুটপাথে স্নান করে।

যোগেন রাস্তা টপকে ডাবপট্টির স্টপে দাঁড়িয়ে ট্রামের জন্য অপেক্ষা করে। এখান থেকে হেদো তো কখনো সে ট্রামবাসে যায়নি। কতক্ষণই বা লাগবে। যোগেন ঘড়ি দেখে, সাড়ে সাতটা, সময় আছে তো, হেঁটে গেলেই হয়, এই ভাবতে-ভাবতেই দেখতে পায় প্রেসিডেন্সি কলেজের স্টপে একটা ট্রামের লগি দেখা যাচ্ছে।

বান্ডিল আর সুটকেস নিয়ে যোগেনকে ট্রামে উঠতে একটু অসুবিধেয় পড়তে হয়। উঠতে তো হ্যান্ডেলটা একটু ধরতে হয়। অসুবিধেটা যে হবে তা যোগেন জানত। সে বান্ডিলটা পাদানিতে ছুঁড়ে দিয়ে সুটকেসটা নিয়ে উঠে পড়ে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ট্রামটা চলা শুরু করতেই কলকাতার ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধের শীতের হাওয়ায় শরীর-মাথা জুড়িয়ে যায় যোগেনের। সে একটু ঘেমেও গিয়েছিল। কনডাকটার টিকিট চাইতে এসে বলে, ‘বসে যান’। যোগেন তাকে একটা ডবল পয়সা দিয়ে বলে, ‘এই বড়তলায় নামব’।

কতদিন পর যোগেন কলকাতা এল? সেটা সে হিশেব কষতে চায় না কারণ তার এমন মনেই হয়নি যে কলকাতার সঙ্গে কোনো ছাড়াছাড়ির কিছু আছে। কত লোকই তো আছে জীবনে কোনোদিনই কলকাতায় আসেনি। কত লোক কেন, বেশিরভাগ লোকই তো তাই। বরিশাল, ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা—এ-সব জায়গায় থাকতে-ঘুরতে ঘরসংসার-কাজকম্ম করতে-করতে খামোখা মানুষের মনে হতে যাবে কেন, যাই, এডুড কইলকাত্তা পাক দিয়্যা আসি!

না, তেমন মনে হয় না। আবার এখন শহরের এত চওড়া রাস্তা দিয়ে ট্রামটা এমন ছুটে যাচ্ছে বলেই যে ঠান্ডা হাওয়া লাগছে আর হাতছোঁয়া যে দূরত্বে পেছনে পড়ে যাচ্ছে, ঠনঠনে, মেট্রপলিটন, হেদোর জলের ওপর আবছা কুয়াশার জাল ছিঁড়ে জলে কারো সাঁতার কাটার উচ্ছ্ৰিত জলকণা, গির্জার মাথা, স্কটিশ, বেথুন, ডান্ডাস যে হিশেবনিকেশ ছাড়াই কলকাতা যোগেনের ভালো লাগতে থাকে।

ট্রামস্টপটা প্যারীমোহনের বাড়ি ছাড়িয়ে, দু-বাড়ি পরে। যোগেন সেকেন্ড ক্লাশের পা-দানিতে শতরঞ্চির বান্ডিল আর সুটকেস—দুটোই রেখেছিল। স্টপ আসতেই সে সিট থেকে উঠে পাদানিতে নেমে সুটকেসটা হাতে তুলে, বান্ডিলটা বগলদাবার উদ্যোগ নিতেই কনডাকটার এসে বান্ডিলটা তুলে নেয়। যোগেন নেমে গেলে সে বান্ডিলটা এগিয়ে দেয়। প্যারীমোহনের বাড়িতে ঢোকার সদর আর তার রোগী দেখার চেম্বার একই ঘরে। রোগীরা বেঞ্চিতে অপেক্ষা করে। পর্দা দিয়ে করা একটু আড়ালে ডাক্তার রোগী দেখে। ওষুধ বানানো হয় ভিতরে ঢোকার সিঁড়ির পাশে।

এই সাতসকালেই দুই রোগী বসে আছে।

তাদের পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে পা দিয়েই যোগেন হাঁক ছাড়ে—’আরে এ বাড়িতে কি অলক্ষ্মী বাসা বাইনধছে? সাতসকালে কুটুম আসে, পা ধোয়ার জল নাই। আরে গাড়ু না-হয় নাই দিল্যা, বদনা একটা দিবা তো!’

বাড়িটা কেনা হয়েছিল একতলা, পরে দোতলা করা হয়েছে। জায়গা বাঁচাতে সিঁড়িটা উঁচু ধাপের হয়ে গেছে। বাঁকে পৌঁছতে-পৌঁছতেই সিঁড়ির মাথায় প্যারীমোহন আর তার স্ত্রী এসে দাঁড়ায়।

প্যারীমোহনের স্ত্রী বলে ওঠে, ‘আরে, বগলে বিছন্যা লইয়া ঢুইকতেছেন বড় কুটুম। আরে, থোও না ভাই, ঐ হানে, তোমার ছাত্তররা নিয়্যা আইব।’

বলতে-বলতেই উদদুর-খুদদুর, দুই ভাই, লাফিয়ে সিঁড়ি গড়িয়ে নেমে আসে। তারা সেই শতরঞ্চির বান্ডিল আর সুটকেস নিয়ে ওপরে উঠে এল, তাদের পেছনে যোগেন।

উদর যুবক–আগের বছর বিএ পাশ করে, এ-বছর ল-তে ঢুকেছে। খুদদুর এখনো হাইস্কুলে।

যোগেন জুতোজোড়া বাইরে খুলে রেখে পাঞ্জাবিটাও খুলতে খুলতে ঘরে গিয়ে ঢোকে আর পেছনে প্যারীমোহন বলে ওঠে, ‘এই এড্‌ডা জিতাজিতির মইধ্যে মোহিনীকাহারে হারাইন্যার কামডা কী ছিল?’

যোগেন জামা খুলে ফেলেছিল। জামাটাকে দরজার কানছিতে ঝোলাতে-ঝোলাতে বলে, ‘ক্যা, আরো তো হারাইছি, অমূল্য রায়, শরৎ বল—পুরানা কাউন্সিলের সব নেতা। মোহিনী ডাকতারের কাম কী আইছিল কংগ্রেসি হইয়্যা খাড়াইব্যার? সরকার তোমারে শিডিউল বইল্যা কংগ্রেস থিক্যা পৃথক দিল আর তুমি গিয়্যা সেই কংগ্রেসের নামে খাড়াইল্যা?’

‘ভাই, দুদ খাবা তো এক গেলাস?’

‘বুন, দেরি করার কিন্তু উপায় নাই, বুন। আরে, হেম নস্কর মশাই খবর পাঠাইছেন, শিডিউল মেম্বারগ তার বাড়িত্ বেলা এগারডায় মিটিং কইরব্যার লাগব। কম তো না, আট গণ্ড এমএলএ। তার মইধ্যে নমশূদ্রই তো তেরডা। বুন, দুইগা ভাত ফুটাইয়া দ্যাও। আমি নায়্যা আসি নে। এডডু সইরষ্যার ত্যাল নি মিলে বু–ন—’

বাইরে থেকে বোনের জবাব আসে, ‘হ। দেই। সইরষ্যা ক্যান? এমন জেতা-মেম্বার, অ্যাহন তো জবা কুসুম তৈল ব্যাভার করা লাগে। নাইলে তোমহার গা থিক্যা জিতার বাস পাবে নে কে?’

যোগেন গলা তুলে জিজ্ঞাসা করে, ‘অ্যাহন কি আমার শরীর থিক্যা বাঘের বোঁটকা গন্ধ পাও’?

বাইরে থেকে বোনও গলা তুলে বলে, ‘কীসের গন্ধ?’

‘বড় বিলাইয়ের।’

বোন তেলের বাটি নিয়ে ঢোকে, ‘ক্যা? বড় বিলাইয়ের গন্ধ তোমার গায়ে আসে ক্যামনে ভাই?’

‘আরে, কাইল দুপর থিক্যা তো বড় বিলাইয়ের লগে ছিল্যাম, বুন। এহেবারে খাঁচার মইদ্যে। আর আমারে যে তার পরের একতিরিশ ঘণ্টায় মুখে ঢুকাইয়্যা চিব্যায়্যা গিলে নাই সে তো এক বনবিবির দয়া।’

‘ষাইট। ওড়া কী কথা?’

যোগেন বাটি থেকে আঙুলে তেল তুলে দুই কানে দেয়, দুই নাকে টানে আর প্যারীমোহন বলে ওঠে, ‘আ-রে সম্বুন্ধির তো দেহি ঘড়ি হইছে একখান! কেডা দিছে জিতার পুরস্কার?’ প্যারীমোহনের কথাতে যোগেনের নিজের মনে পড়ে যায়, ঘড়ির কথা। সে-ও তাকিয়ে দেখে।

‘আশু মাস্টার দিছেন। পেনও একখান।

‘তো ঘড়িড়া খুইল্যা রাখো। নাকী ঘড়ির গায়েও ত্যাল মাখাবা? শরীরের ত্যাল আর ঘড়ির ত্যাল তো আলাদা’, প্যারীমোহনের কথায় যোগেন হেসে ঘড়িটা খুলতে যায় কিন্তু তেল লেগে থাকায় আঙুল পিছলে যায়, ‘বুন, এই বকলেসখান্ খুলো দেহি।’

‘ঐ বান্দাখুলা আমার কাম না। চাঁদসির ডাক্তাররে কও। সারাদিন তো দুনিয়ার মানুষের হাগা বান্ধে আর খোলে’, বোনের কথায় একটু ঠেস ছিল অর্শরোগের চিকিৎসায় চাঁদসির বিশেষ পদ্ধতি নিয়ে। প্যারীমোহন এসে যোগেনের সামনে বসে তার ঘড়ির ব্যান্ডটা খুলে চৌকির ওপর রাখে। তার স্ত্রী দাঁড়িয়েই ছিল। সে যোগেনকে সূত্র ধরিয়ে দেয়, ‘তোমারে বড় বিল্যাই না খাইয়্যা ছাইড়া দিল?’

যোগেন আবার একচোট হাসে, ‘ছাড়ে নি? ভাইবছে এইডা তো গায়ের পোকার নাখান, খাঁচায় যহন ঢুইকছে, তহন গলা দিয়াও ঢুকব। ঢুকবই যহন, তহন আর আগে ঢুকাই ক্যা? অদ্য ভক্ষ্য ধনুর্গুণ। শিয়ালদায় বরিশাল এক্সপ্রেস ঢুইকছে কী ঢোকে নাই, জয় বন্ধু বইল্যা খাঁচা থিক্যা দিল্যাম এক ঝাঁপ পড়িমরি কইর‍্যা। বড়-বিড়াল ট্যার পাইতে-না-পাইতে পগাড়-পাড়।’

‘সে বাঘের নাম কী?’

‘জনাব মৌলবি আবুল কাশেম ফজলুল হক’!

প্যারী বলে, ‘স্যায় তো প্রাইম মিনিস্টার হইব কাগজে লিখে।’

‘তা হয় তো হব। নাজিমুদ্দিনরে যে-ঘোল খাওয়াইল পটুয়াখালিতে তারপর তার থিক্যা ফিট আবার কেউ কি আছে প্রাইম মিনিস্টার হব্যার নাগাল!

‘বাঃ, এই কইলা বাঘ আর এই বলো চিবাইব’, প্যারীমোহনের স্ত্রী বলে। আর প্যারীমোহন প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বলে ওঠে, ‘তুমি নি হকশাহেবের লগে আইল্যা?’

‘না, না, আমার কী খ্যামতা তার সঙ্গ পাওয়ার? স্যায়ই আমারে তার লগে বাইন্ধ্যা আনছে।’

‘বাইন্ধ্যা আইনছে? হকশাহেব নিজে? তোমারে কি মন্ত্রী বানাইব?’ যোগেন পিঠে তেল মাখছিল বলে তার ঘাড় ঘুরে গেছে। তার কথা একটু ভিন্ন স্বরের শোনাল, ‘আরে, মন্ত্ৰী কি হকশাহেবের ইচ্ছায় হয়?’

‘তয়?’

‘যেই সব পার্টির ইচ্ছা, হকশাহেবই হোক প্রাইম মিনিস্টার, তাদের ইচ্ছায় মন্ত্ৰী হয়।’

‘তাগ বাড়া ভাতে কি তুমি ছাই? তারা ক্যান আপেত্ত দ্যায়? হিশাবড়া বুঝাও তো?’ প্যারীমোহন বলে।

‘বুন, বাঘের মুখ থিক্যা বাইচ্যা আইলাম, অ্যাহন কি শিয়ালের গুতে আছাড় খাব? বুন, তুমি গল্প শুইনব্যার বইসল্যা, আমারে ভাত দিব কেডা? স্নান, ধরো, হইয়্যাই গেল’—জিভ কেটে বোন ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর টিনের সুটকেসটা খুলে একটা ধুতি আর গামছা বের করে কাঁধে রেখে উঠে দাঁড়ায় যোগেন

‘হিশাব দিল্যা না তো?’ প্যারীমোহনও দাঁড়ায়।

‘থাইকলে তো দিব হিশাব? আড়াইশখান সিটের আট আনি—লাল পয়সা মেম্বার পার্টিছাড়া। এক-বেশি সোয়া-শ মেম্বারের হাত তোলা ছাড়া তো আর মন্ত্রিসভা হয় না।’

‘কম পড়ল কীসে? মুন্ডুতে না হাতে?’

‘তফাত কীসের? মুন্ডু আর হাতের?

‘তুমিই তো কইল্যা হাততোলা ছাড়া মন্ত্ৰী হইব না।’

‘হ্যাঁ। এড্‌ডা মুন্ডুর তো এডডাই হাত।’

‘এই তোমার ভোটের অঙ্ক? একখান হাত নুলা?’

‘হাত তুইল্যা তো জানান দিব্যার লাগে, আছি আছি, ইশকুল-কলেজের নাগাল।’

‘আমি আবার ইশকুল গ্যালাম কবে? কিততন ছাড়া তো হাত তুলি নাই। কিততনে তো দুইহাতই তুইলব্যার লাগে। এক কুকুরই তো দেহি পেচ্ছাব করার লগে একখান পাও তোলে। আর তুম্রা অ্যাহন ভোট কইর‍্যা একখান হাত তুইলব্যা।’

‘ডাক্তার, অ্যাসেমব্লিতে তো কীর্তন হয় না। আইন পাশ হয়। কীর্তন গাইব্যা তো গাও দুই হাত তুইল্যা’, বলে যোগেন কাঁধে ধুতি-গামছাসহ দুই হাত মাথার ওপর তুলে গান ধরে আর ধরতে-না-ধরতেই প্যারীমোহন গলা মিলিয়ে দুইহাত তুলে নাচের ভঙ্গিতে ঘোরে। ঘরের মেঝেটুকুতে দুইজনের কীর্তন গাওয়া ও নাচ চলে।

তুমি হে ক্ষীরদশায়ী, নীরদবরণ,
মরণ বাঁচন স্মরণ চরণ অসাধারণ
রূপ করিলে ধারণ—

বাইরে থেকে প্যারীমোহনের স্ত্রী তীক্ষ্ণ গলা এসে মেশে, ‘গৌর হে গৌর’।

হঠাৎ গান-নাচ থামিয়ে যোগেন বলে ওঠে, ‘আরে, বাঘের হাত থিক্যা বাইচ্যা দেহি এহানে কুমিরে খায়। দিল আমার কাজকামের সব্বনাশ কইর‍্যা।’

‘ভাই, আমারে দুইষো না। ভাত নামাই। তোমার তো নাওয়া হয় নাই।’

‘হইছে বুন হইছে, হইছে,’ যোগেন সিঁড়িবেয়ে তরতরিয়ে নামে। দুই তলাতেই কলঘর আছে। কিন্তু যোগেন স্নান করে ফুটপাথের গঙ্গাজলে।

৩১. তপশিলিদের মিটিং

পয়সা না-থাকার সুবিধে কত! পয়সা ছিল না বলেই তো হেঁটে-হেঁটে এই শহরটাকে যোগেন এমন চিনে নিতে পেরেছে যে যার জন্মকম্ম সবই এই শহরে, তারপক্ষেও অতটা চেনা সম্ভব নয়। হেম নস্কর মশায়ের বাড়িতে এই আট তারিখে সকাল এগারটায় হাজির হতে হবে খবর পাওয়ার পর তাঁর বাড়ি কোথায় এটা কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হয়নি। তার একটা টিউশনি ছিল পামর বাজার রোডে। ক্লাশ এইটের ছেলে, মাইনে আর পাম বাজার বলেই জুটেছিল। ওখানে মাস্টার পাওয়া যাচ্ছিল না। যোগেন দশ টাকা শুনে যতটা খুশি হয়েছিল, পড়াতে গিয়ে চুপসে গেল। বেলেঘাটায় তো আর ট্রাম নেই, সুতরাং সেকেন্ড ক্লাশও নেই, একমাত্র ভরসা ধাপার বাস–সতের নম্বর। তার ভাড়া শেয়ালদা বি আর সিং থেকে দেড় আনা—মানে একটা এক-আনি, আর আরেকটা ডবল পয়সা। তার মানে প্রতিদিন যাতায়াতে তিন আনা, সপ্তাহে ছ-দিনে আঠার আনা, মাসে প্রায় পাঁচ টাকা। তাহলে তো তার মাইনে দাঁড়ায়, মাসে পাঁচ টাকা। যোগেন বাসে যেত না। শেয়ালদা সাউথ দিয়ে শর্টকাট করে বেরিয়ে হেঁটে মেরে দিত। হাঁটতে-হাঁটতেই তার জানা হয়ে গেল দুই নম্বর রেলব্রিজ পার হয়ে সে যদি বেলেঘাটা মেন ছেড়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে, তাহলে বাসের চাইতে আগেই পৌঁছে যেতে পারে।

সেই সুবাদে বেলেঘাটা মেন রোডের পুব সীমায় জোড়ামন্দিরে হেম নস্কর মশায়ের বাড়ি সে চেনেনি। এদিক থেকে জোড়ামন্দির ছাড়িয়ে চিংড়িঘাটা বলে একটি জায়গায় রাস্তা শেষ, তারপর বাঁধ। ঐ চিংড়িঘাটাতেই নমশুদ্র জমিদার দাসচৌধুরীদের বিখ্যাত প্রাসাদ ও বিখ্যাততর রাধাশ্যাম মন্দির। দাসচৌধুরীদের একটা আলাদা টানা ঘরই আছে-নমশূদ্র ছাত্রদের জন্য। ছাত্ররা তো থাকতই আর কাজেকর্মে কলকাতায় এলেও কেউ-কেউ ওখানে থেকে যায়, লোকের মুখে তাই ধর্মশালা কথাটাই চালু। প্রতিদিনই রাধেশ্যামের ভোগ খায় অনেকেই। যোগেনের পক্ষে এত দূর থেকে যাতায়াত কঠিন হয় বলেই সে দাসচৌধুরীদের ধর্মশালায় থাকেনি। কিন্তু রাসে কী ঝুলনে কী দোলে দাসচৌধুরীদের মন্দিরে গিয়ে গান গেয়েছে আর গব্যঘৃতে রান্না ভোগ খেয়েছে। তখনই জোড়ামন্দিরে নস্করদের বাড়ি তার দেখা, মন্দিরটাও দেখা—না দেখে উপায় নেই।

পাঁচ মাথার মোড় থেকে যোগেন কপালগুণে শেয়ালদারই ট্রাম পেয়ে গেল। নেমে সেই শর্টকাটে বি-আর সিঙে পৌঁছে টাইমঘরে খোঁজ করে শোনে, সোজা কোনো বাস চিংড়িঘাটা যাবে না, এখান থেকে রথতলা দিয়ে নারকেলডাঙা যাবে। রথতলায় নেমে আর-একটা বাস নিতে হবে। দুটো বাস? তার মানে তো অন্তত দু আনা। বাসে তো আর ডবল পয়সার টিকিট হয় না। তবে, রথতলা থেকে জোড়ামন্দির তো হাঁটা পথ! ওটুকু হেঁটে যাবে ভেবে যোগেন বাসে ওঠে।

সিটে বসে যোগেন নিজের মনে একটু মুচকি হাসে। কাল স্টিমারে কেবিনে, তারপর ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাসে শেয়ালদায় পৌঁছে সে এখন বাসের ভাড়া বাঁচিয়ে এমএলএ-দের মিটিঙে যাচ্ছে। কলকাতা বলেই সম্ভব। কে কাকে চেনে? তাছাড়া, যাতায়াতে পয়সা দিতে হলে যোগেনের খুব গায়ে লাগে। যেন, ঐ পয়সাটা তাকে ঠকিয়ে নেয়া হচ্ছে।

নস্করমশায় তাঁর বিখ্যাত পাকানো গোঁফ নিয়ে আদ্দির একটা ফতুয়া আর কোঁচা-উলটো ধুতি পরে বারান্দায় থামের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। যোগেনকে দেখেই নমস্কার করে, ‘আসুন, আসুন’ বলে অভ্যর্থনা করেন। যোগেনের গৌরব বোধ হয়—তাকে নস্করমশায় অভ্যর্থনা করছেন বলে নয়, নস্করমশায় কুলীন সব বামুন জমিদারদের মতই নিজের আভিজাত্য অনুযায়ী ব্যবহার জানেন। যেন, নস্করমশায় অনুন্নত শ্রেণির লোক হয়ে যোগেনের সম্মান বাড়িয়ে দিয়েছেন। যোগেন গিয়ে প্রণাম করে—তার সঙ্গে নস্করমশায়ের কোনো পরিচয় নেই। যোগেন সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তিনি যোগেনের দুই বাহু ধরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ভাই?’

‘যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।’

‘আরে ভাই, আপনি তো চ্যাম্পিয়ান, কী জেতা জিতে এসেছেন, আমাদের গৌরব।’

‘সে-পরীক্ষা তো এখন শুরু, জিতার পর। তবে পরীক্ষা একা দিতে হবে না—এই যা রক্ষা।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেজন্যই তো আপনাদের ডাকলাম। নিজেদের মধ্যে পরিচয়ও হওয়া দরকার আর আমরা, মানে, ডিপ্রেসড ক্লাশের যারা তারা একজোট হতে পারি কীনা, ভিতরে গিয়ে বসুন, কথাবার্তা শুরু করুন।

‘সবাই এসে গেছেন?’

‘অনেকেই এসে গেছেন, এসে পড়বেন সবাই।’ হেম নস্কর নতুন কাউকে আসতে দেখে নমস্কার করে ‘আসুন, আসুন’ বলে উঠলেন।

যোগেন ভিতরে ঢুকে দেখে—একটা হলঘরের মত বড় ঘর। বড়-বড় জানলা। উলটো দেয়ালে একটা চৌকির ওপর শতরঞ্চি পাতা। তার পাশে দেয়াল ঘেঁষে একটা লম্বা হেলানবেঞ্চ। তার উলটো দেয়ালে কাঠের চেয়ার আছে কয়েকটা। আর যে-দরজা দিয়ে যোগেন ঢুকল তার পাশে একটা গদিওয়ালা নিচু কৌচ, পাশে ছোট একটা টেবিলে গড়গড়া আর খানিকটা ফাঁক দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে একই রকম গদির একটা সোফা, সেটায় চারজন বসতে পারে, দু-একজন যদি রোগা হয় কিন্তু যোগেনের নিজের সাইজের তিনজনের বেশি ধরবে না।

‘যোগেন—এসো এখানে’, শুনে যোগেন দেখে পুলিন মল্লিক ডাকছে। মল্লিকভাইদের একজন—এদিকে কোথাও থেকে জিতেছে। চেয়ারে বসে আছে।

‘যোগেন—যশোর ছেড়ে হাওড়ায় যায়ো না’, রসিককাকা ডাকছেন—সেই হেলানবেঞ্চের হাতলে কনুই রেখে। পুলিন যদি চেয়ারে না বসে, তাহলে চেয়ার আছে কেন? আর, কোণাকানছিতে যদি এলিয়ে বসা না যায় তাহলে রসিককাকা বসবেন কোথায়, দুই পা তুলে, হাত-পা-ঘাড় কনুই যথাস্থানে রেখে। পুলিন তাকে ডেকেছে। ভদ্রতার খাতিরে তাকে হাত তুলে ‘খাড়ান, আসি’ বলে যোগেন যায় রসিককাকার দিকে। রসিককাকা তাঁর কোনো ভঙ্গিরই কোনো বদল না করে চোখ বুজেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী? তোমার ডিসিশন নেয়া হয়্যা গেছে?’

‘ডিসিশন কীসের? কথাই তো শুরু হয় নাই।’

‘আরে, সে-কথা কই না। তুমি কোথায় বইসব্যা সেই ডিসিশন—চেয়ারে না বেঞ্চিতে না শতরঞ্চিতে।’

‘ঐখানে তো পুলিন বইসছে। পুলিনের লগে বসা যায়?’

‘ক্যা? তোর যে পুলিনের সঙ্গে এমন ভাব তা তো জাইনত্যাম না রে?’

‘ও চেয়ারে বইসেছে ক্যান্? দেখছে তো আপনি এইহানে।’

‘ও নিজেকে চেয়ারের মানুষ ভাবে, তাই চেয়ারে বইসছে। তোরেও ডাক দিছে।’

‘ও আমারে ‘তুমি’ কইয়্যা ডাকে ক্যান্, এড্ডেরে তো সমান বয়স।’

‘তুই ওডারে কী ডাকিস?’

‘আপনে। আমার অত ‘তুমি’ আসে না।

‘বয়। এইহানে বয়। চেয়ারও না। শতরঞ্চিও না।’

যোগেন বসে বলে, ‘য্যান্ আপনি চেয়ার চিনেন না! অ্যাহনই তো ডাক পড়বরসিকবাবু আসেন, মিটিং শুরু করি।’

‘তহন যাব নে। দ্যাখ ছ্যামড়া, শতরঞ্চি থিক্যা কাউরে ডাইক্যা বেঞ্চিতে তোলা যায়, বেঞ্চি থিক্যা ডাইক্যা চেয়ারে তোলা যায়। কিন্তু চেয়ার থিক্যা শতরঞ্চিতে ডাকা যায় না।’

‘তত্ত্বখান কি এড্ডু খুইল্যা বলার নিষেধ আছে?’

‘এর আবার খুলা ঢাকা কী? আমাগ শুদ্দুরগ একসময় দাবি ছিল—বাবুরা আমাগ চেয়ারে বইসব্যার দ্যায় না।’

‘দাবিডার ভিতরে অন্যায্যডা কী?’

‘ন্যায্য কথাডা তো উলট্যায়াও কওয়া যায়? যায় না?’

‘কথাডাও ন্যায্য আর উলট্যাডাও ন্যায্য?’

‘হ্যাঁ। উকিলগ মত। আসামির উকিল হইলে বাদী অন্যায্য আর বাদী উকিল হইলে আসামি অন্যায্য।’

‘ভাগ্যিস ওকালতিডা করেন নাই। আশু মুখার্জির ভাত জুইটত না।’ যে-বছর যোগেন ল-কলেজ ঢোকে, সেই বছর রসিক বিশ্বাস ওকালতি পাশ করে বেরন। কিছুদিন ওকালতি করার পর ভালো লাগেনি বলে ছেড়ে দিয়ে কর্পোরেশন স্কুলে মাস্টারি নেন।

‘ক্যা? আমার ওকালতির ত্রুটি হইল কনে। কথাডা উলট্যায়া ভাবছস যোগেন? আমরা বাবুদের কাছে গেলে আমাগ বসার চেয়ার দিব্যার লাগব—এই তো দাবি। উলট্যাইয়া দ্যাখ আরো কত সত্যি শুনায়—আমরা বাবুগ কাছে গিয়্যা খাড়াইলে বাবুগ চেয়ার ছাইড়া খাড়াইবার লাগব।’

যোগেন হো হো হেসে ফেলে। রসিক বিশ্বাস চাপা গলায় বলেন, ‘থো। এমন কংসের মতন হাসস্ ক্যা। দশে ভাই—আমরা রসের কথা কানাকানি করি। কেউ নি বুইজবে আমরা অট্টহাস্যসহ পলিটিকস আলোচনা কইরতেছি।’

যোগেন আরো জোরে হেসে ওঠে।

‘তুই উঠ তো এইহান থিক্যা। শ্যাষে লোকজন আমারে দুশ্চরিত্তির ভাইব।’

‘বিরাটকাহা আইছে। সেবা দিয়া আসি।’

‘এই বয়সে স্ত্রী বিয়োগ হইল দাদার। তার মইধ্যে ভোটাভুটি। ক্যামন শুকাইয়্যা পড়ছে মানুষড়া।’

যোগেন উঠে বিরাট মণ্ডলের কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, ‘কাহা, শরীরের কুশল তো?’

‘বেয়াল্লিশ বছরে কী কুশল চাও?’

‘ক্যা? বয়সে কি কুশল কমে কাহা? তবে আপনার তো ব্যাবসাবাণিজ্যি আর শ্রমিক ইউনিয়ন—উদ্বেগের পক্ষে তো যথেষ্ট।’

রেল শ্রমিক ইউনিয়ন বোধয় কমিনিস্ট বা লেবার পার্টি কাইড়্যা নিবে। জুটের ইউনিয়নের মত নতুন দাবিদাওয়া নাই রেলে, কিন্তু মজুরও তো বিস্তর। তুমি কী কইরব্যা? শুদু এমএলএ-তে কি সংসার চলবে?

এর মধ্যে ঘরের সকলেই একটু চুপ করে যায়। মুকুন্দ মল্লিক আর পি-আর ঠাকুর এলেন। নমশূদ্র সমাজের তো বটেই, ডিপ্রেসড ক্লাশের, সবচেয়ে নাম করা নেতা। মুকুন্দ মল্লিক নমশূদ্রদের মধ্যে প্রথম এমএ-বিএল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি-র প্রফেসর আর পি-আর ঠাকুর নমশূদ্রদের মধ্যে প্রথম বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার, তার ওপর হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের বংশ, গুরুচাঁদ এখনো বেঁচে, মতুয়া ধর্মের গুরু, সমস্ত নমশূদ্রের গুরু বংশ। এইবার মিটিং শুরু হবে বুঝে যোগেন গিয়ে মুকুন্দ মল্লিকের সামনে দাঁড়ায়, ‘স্যা-র’।

‘যোগেন, তুমি তো ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট। তোমার মত যদি আমরা সবাই পারতাম—সেটাই হত ঠিক কাজ। রিজার্ভেশন লাগবে না। আমরা জেনারেল সিটেই কংগ্রেসকে হারাতে পারি। কিন্তু আমাদের তো আর তোমার মত মাসকনট্যাক্ট নেই।’ যোগেন প্রণাম করে।

পি-আর ঠাকুর বলেন, ‘যোগেনবাবু, আপনি সত্যি আমাদের জোর বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভালো খবরের তো সময়-অসময় নেই। কনগ্র্যাচুলেশনস।’ তাদের সমাজে বাবু বা আপনি সম্বোধন খুব চালু নয়। পি-আর ঠাকুর যোগেনকে বরাবরই বাবু বলেন ও আপনি বলেন। একটা কারণ যে ওঁদের পরিচয় হয়েছে পরে।

হেম নস্কর মশায় কথা বলতে শুরু করেছেন উঁচু গলায়। যোগেন তাড়াতাড়ি শতরঞ্চিতেই বসে পড়ে। হেম নস্কর তখন বলছেন, ‘ভ্রাতৃগণ! আমার গৃহে আপনারা পদার্পণ করায় আমি ধন্যবোধ করিতেছি। কিন্তু ইহা আমার ব্যক্তিগত কোনো অনুষ্ঠান নয়। পরিবারের কোনো অনুষ্ঠান হইলে সমাজের রীতি অনুযায়ী অভ্যর্থনা করিতে হয়। কিন্তু তেমন অভ্যর্থনা করা কতটা উচিত তাহা বুঝিতে না পারায় নিশ্চয়ই কিছু ত্রুটি ঘটিবেই। তাহার জন্য আপনারা আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমার কয়েকজন বিশিষ্ট বন্ধু জানাইয়াছেন যে আইনসভায় আমরা যদি একটি কোনো পার্টির প্রতিনিধি রূপে নিজেদের পরিচয় না দিতে পারি, তাহা হইলে আমরা প্রত্যেকেই পৃথক স্বতন্ত্র মেম্বার হইয়া যাইব। ইহা আর কে না বুঝে যে একটা লাঠি হইতে দশ-লাঠি জোট হইলে ভালো। তেমন শক্তিবৃদ্ধি সম্ভব কী না ও কতদূর সম্ভব তাহা আলোচনা করিবার জন্য আমরা মিলিত হইয়াছি। নীহারেন্দু দত্তমজুমদার মহাশয় এই সব ভোটাভুটি ও আইনসভার ভিতরবাহির সম্পর্কে বিদ্বান ব্যক্তি। আমি তাঁহাকে ও হুমায়ুন কবির শাহেবকে এই বিষয়টি বুঝাইয়া দেয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করিয়াছি। আজিকার সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য আমি শ্রীমুকুন্দবিহারী মল্লিক মহাশয়ের নাম প্রস্তাব করি।’

পি-আর উঠে বলেন, ‘আমি এই প্রস্তাব সমর্থন করি।’

মুকুন্দবিহারীকে সভাপতির নির্দিষ্ট চেয়ারে বসতে হয়। তিনি বসেছিলেন বড় সোফার এক কোণে। মুকুন্দবিহারীর হাতে একজন একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়। তিনি সে-কাগজটি সম্পূর্ণ পড়েন। তারপর ঘাড় একটু ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘নীহারেন্দুবাবু, আপনি আসুন।’ তারপর সভার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘নীহারেন্দুবাবু কিন্তু ডিপ্রেসড ক্লাশের মেম্বার নন। তিনি আজকের সভায় নিমন্ত্রণকর্তা কর্তৃক নিমন্ত্রিত হয়েছেন বিশেষজ্ঞ হিশেবে। এই ধরণের নির্বাচন ও মন্ত্রী নিয়োগ ও মন্ত্রিসভা গঠন আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন। ইতিপূর্বে লেজিসলেটিভ কাউন্সিল বা আইন পরিষদ ছিল। তাতে নির্বাচন হত খুব কম-সংখ্যক ভোটারের মধ্যে। আবার, তাতে অনেকে মনোনীত সদস্যও থাকিতেন। আইন পরিষদও একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করত। এই সভাতে দু-একজন আছেন, যাঁরা এখনো আইন পরিষদের মন্ত্রী। আইন পরিষদের সঙ্গে বর্তমান আইনসভা বা লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির প্রধান তফাত হচ্ছে—সভা তৈরি হয়েছে নতুন আইন-অনুযায়ী ভোটার লিস্ট তৈরি করে। তাতে ভোটার সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। দ্বিতীয় প্রধান তফাত হচ্ছে—পরিষদের মন্ত্রিসভা ছিল গভর্নর বা লাটশাহেবকে পরামর্শ দেয়ার জন্য। আর সভায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা সভার অনুগত থাকবে। অনেকে মনে করেন গভর্নরকে আলংকারিক পদাধিকারী করে আইনসভাকে ক্ষমতা দেয়া ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করা, বস্তুত আমাদের স্বাধীন সরকার গঠনের দিকে কার্যকর প্রধান পদক্ষেপ। আইনসভার বিষয়টি নীহারেন্দু দত্তমজুমদার মহাশয় বুঝিয়ে দেবেন। তিনি লেবার পার্টির নেতা ও সেই পার্টি থেকে জিতে এবার মেম্বার হয়েছেন। তিনি বিশেষ রকম শিক্ষিত ব্যক্তি। বিশেষ করে এই সব ব্যাপারে। তিনি আমাদের সাহায্য করতে এসেছেন। তিনি কোনো নির্দেশ দেবেন না ও ঔতিচ ব্যাখ্যা করবেন না। আমাদের এই সভা ডিপ্রেসড ক্লাশ থেকে নির্বাচিত মেম্বারদের সভা। এই সভায় আপনারা যে-সিদ্ধান্ত নেবেন তার কোনো দায় নীহারেন্দুবাবুর ওপর বর্তাবে না। তেমনি নীহারেন্দুবাবুর বক্তব্যের কোনো দায়ও এই সভার ওপর বর্তাবে না। নীহারেন্দুবাবুর বক্তৃতার পর তাঁকে প্রশ্ন করে আপনারা জিজ্ঞাসিত বিষয় জেনে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁর বক্তৃতার মাঝখানে কেউ কোনো বাধা দেবেন না। আসুন, নীহারেন্দুবাবু।’

সভাপতির পাশে দাঁড়িয়ে নীহারেন্দু দত্তমজুমদার বলতে শুরু করেন। ‘অধ্যাপক মুকুন্দবিহারী মল্লিক মহাশয় যেরকম করে ব্যাখ্যা করে দিলেন আইনপরিষদ ও আইনসভার পার্থক্য কোথায়, তারপর আমার আর কিছু বলা উচিত নয়। আসলে, তাঁর আগে যদি আমাকে বলতে হত তাহলে আমি পুরনো আইনের আইনপরিষদ ও নতুন-আইনের আইনসভার পার্থক্য ও নতুনত্বের কথা জটিল করে ফেলতাম। অধ্যাপক কেমন সোজা করে দিলেন—লাটশাহেবের আইন-পরিষদ ও প্রধানমন্ত্রীর আইনসভা। কিন্তু এই সোজা কথার মধ্যে একটু-আধটু খটকা ও বাঁক আছে। যেমন, আইনসভার ভোটে যে-দল বা পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ, লাটশাহেব তার নেতাকে, মানে, সেই দল বা পার্টির নেতা কে তা শুধু সেই দলের এমএলএরা মিটিং করে লাটশাহেবকে জানানোর পর লাটশাহেব তাঁকে ডেকে বলবেন, আপনি আপনার মন্ত্রিসভা গঠন করুন। লাটশাহেব প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সুপারিশ-করা মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করিয়ে সরকার তৈরি করবেন। লাটশাহেবের যদি মনে হয়, কোনো কারণে এই সরকার আর চলছে না, তাহলে তিনি সরকার ভেঙে দিয়ে নিজের হাতে ক্ষমতা নিতে পারেন।’

একজন উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ—,’ সভাপতি হাত তুলে তাঁকে বসার ইঙ্গিত করে বলেন, ওঁর বক্তৃতার পর বলবেন।’

না-বসে সেই সদস্য বলেন, ‘না, স্যার, আমার কুনো প্রশ্ন নাই। আমার অনুরোধ—এই বিষয়ডা আমি ভোটের আগেও বুঝি নাই, পরেও বুঝি নাই। এইডা যদি নীহারবাবু এডডু কন বিস্তারিতে যে আইনসভা প্রধানমন্ত্রী বানাবার পারে, লাটশাহেব পারেন না। আর, লাটশাহেব প্রধানমন্ত্রীকে খেদাইব্যার পারেন কিন্তু আইনসভা তার নিজের প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষা করতে পারেন না। এই দুইডা উল্ডা ব্যবস্থা চলে কোন আইনে?’ প্রশ্নকর্তা বসে পড়েন।

সভায় একটু গুঞ্জন ওঠে, ‘কে? মেম্বারটা কে?’ সভাপতি ও নীহারেন্দুবাবুও চেনেন না—তাঁরা একটু অপ্রস্তুত হাসেন। নীহারেন্দুবাবু অবস্থা সামলাতে সবে হাঁ করেছেন, একজন পেছন থেকে সভাপতির কানে-কানে কিছু বলে দেন। সভাপতি ডানহাত তুলে বলেন, ‘যিনি প্রশ্ন করলেন তিনি অনেকের চেনা নন। উনি মৈমনসিং পশ্চিম থেকে মেম্বার হয়েছেন। ওঁর নাম অনন্তলাল মণ্ডল।’

সভায় আবার একটা গোলমাল ওঠে। একজন দাঁড়িয়ে উঠে খুব উঁচুগলায় বলেন, ‘অনন্তলাল না। উঁয়ার নাম অমৃতলাল মণ্ডল। মৈমনসিং জিলা বোর্ডের অনেক দিনের মেম্বার।’

নীহারেন্দুবাবু গলা তুলে বলেন, ‘অমৃতলাল মণ্ডল মশায় খুব সাহায্য করলেন। আমরা সবাই যদি স্পষ্ট করে আমাদের অসুবিধেগুলি জানাই, তাহলে আমরা এই নতুন আইনটা ভালো করে বুঝতে পারব। সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে ডিপ্রেসড কাস্ট বা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী মানেই অশিক্ষিত। সেই কারণে, তাঁরা সব কথা তাঁদের জানাতে চান না যে অশিক্ষিতরা ওসব কথা বুঝবে না। কথা যদি পরিষ্কার না হয় তাহলে মহাশিক্ষিতরাও বোঝেন না। আর কথা যদি শাদা হয়, তাহলে যিনি নিজের নাম সই করতে পারেন না তিনিও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় সেটা বুঝে নেন। এই সভায় একটু চোখ বোলালেই এমন অনেক মানুষকে দেখা যাবে যাঁরা উঁচুজাতের মানুষের চাইতে বহুগুণ শিক্ষিত। এই-যে নিকুঞ্জবিহারী মাইতি মশায় মেদিনীপুরের, হাওড়ার রাধানাথ দাস, দিনাজপুরের শ্যামাপ্রসাদ বর্মন, জলপাইগুড়ির উপেন্দ্রনাথ বর্মন, রংপুরের পুষ্পজিৎ বর্মন, বরিশালের যোগেন মণ্ডল—এঁরা কেউ এমএ-বিএল, কেউ বিএ-বিএল। এঁরা এসব আইন গুলে খেয়েছেন। আমি শুধু তরুণ নেতাদের কথা বললাম—যাঁদের আমি চিনি। এই সভার সভাপতি মুকুন্দবিহারী মল্লিক ও তাঁর ভাইরা, রসিকলাল বিশ্বাস, বিরাট মণ্ডল মশায়, পি-আর ঠাকুরের কথা সারা বাংলায় কে না জানে? আমার তো মনে হচ্ছে—ধরুন, এই ৩২ জন পিছিয়েথাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মেম্বারদের মধ্যে যোগ্যতার বিচারে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেম্বার আছেন। কংগ্রেস, কেপিপি বা লিগের মধ্যে এর চাইতে যোগ্য মানুষ এত সংখ্যায় নেই।

সভার অনেকেই হাততালি দিয়ে ওঠে।

নীহারেন্দুবাবু বলেন—’আমি প্রথমেই বলছি, অমৃতলালবাবু যা বোঝেননি, তা বোঝা যায় না বলেই বোঝেননি। শাসন করার অধিকার, সর্বোচ্চ অধিকার তো আর ভাগাভাগি হয় না। একজনকে যদি ফাঁসির হুকুম দেয়া হয়, সেটা তো সমান ক্ষমতার দুটো কোর্ট দিতে পারে না। একটা কোর্টকেই দিতে হয়। আইনসভা তার মন্ত্রিসভার তৈরি করার একমাত্র অধিকারী। আবার, এই মন্ত্রিসভাকে খারিজ করার একমাত্র অধিকারী লাটশাহেব। এই ৯৩-ধারার বিরুদ্ধে আমরা, কংগ্রেসের বামপন্থীরা, ভোটে যোগ দেয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম। কিন্তু আইনে এই ব্যবস্থা বহাল আছে। আপনারা যদি এই আইন অনুযায়ী ভোটে জিতে মেম্বার হয়ে থাকেন, তাহলে এই আইন অনুযায়ী সরকার করতে হবে ও চালাতে হবে। কংগ্রেস থেকে এই ধারার বিরুদ্ধে আপত্তি করে কেউ-কেউ চেয়েছিলেন ভোটে না-যেতে। শেষ পর্যন্ত অবিশ্যি কংগ্রেস ভোটে এসেছে।’

‘আমরা তো এহানে যারা জড়ো তারা সবাই একই শ্রেণির লোক, অনগ্রসর শ্রেণি। এখন বলা হচ্ছে শিডিউল্ড কাস্ট, আরো আগে কওয়া হত শূদ্র বা অস্পৃশ্য, গান্ধীজি ডাহেন হরিজন। সবাইই নতুন-নতুন নাম দিছেন। কিন্তু সরকার চালানোর মত এত উঁচু কাজে আমাদের জাতের ৩২ জনকে কেউ আগে ডাকছে?’ রসিকলাল বিশ্বাস বেশ ধমকে জিজ্ঞাসা করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *