২৯. একটু হয়ত দেরিতে, কিন্তু পৌঁছে গেল যোগেন
১৯৩৭-এর আইনসভা ভোটের এই অজস্র টানাপোড়েনের ফল। এইসব টুকরোটাকরা হিশেব মিলে একটা কোনো কথা তৈরি হয়নি, এখন যাকে বলে ‘বক্তব্য’ বা ‘ইশতেহার’ বা ‘সমীক্ষা’। কিন্তু মানুষজনের মুখের কথা তো চারাগাছের মতন, যত দিন যায় ততই সেটা খাড়া হয়, তত তার ডালপালা বেরয়, তত তার পাতা গজায়, সেইসব ডালপালা-পাতার ভিতর দিয়ে নতুন হাওয়া বয়। অনেককাল পরে খেয়াল হয়—গাছটা তাহলে এই হাওয়াটাই বইয়েছিল।
ফজলুল হকের প্রথম কথা ছিল—জমিদারি উচ্ছেদ। তাঁর দ্বিতীয় কথা ছিল—ঋণমকুব, চাষির। জমিদার হিন্দু আর চাষি-মুসলমান, সারা বাংলায় ছকটা এরকম মনে করলেও এসব বলা যেত? মুসলমান জমিদার ও তার নিচে মুসলমানদের নানা ধরণের—এই স্বার্থ-সংঘাত থেকেই হকশাহেবের রাজনীতি এমন সামর্থ্য পেয়েছিল।
আবার, হয়তো বলা যেতও। কারণ হকশাহেবের কৃষক-প্রজা পার্টির এই দুটো কথা—জমিদারি উচ্ছেদ আর ঋণখালাশ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। আর, মাত্র এই দুটো কথা একেবারে বাংলার হেলে মাটির চষা ক্ষেতের একেবারে ভিতরে সেঁদিয়ে গিয়েছিল। জমিদারি উচ্ছেদ—তা, সে-জমিদার হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক। ঋণখালাশ—এ কি কোনোদিন বাংলার চাষি-রায়ত স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছে যে ধান মাড়াইয়ের পর তাকে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হবে না। সে ছোট-রায়ত বা চাষি হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক। ফজলুল হকের কল্পিত বাংলায়, বাংলার জমিদার আর মহাজনদের বিরুদ্ধে রায়ত-কৃষকের অর্থনীতিই হয়ে উঠেছিল রাজনীতি।
যোগেনের ভোটাভুটির ভাগ বা শত্রুমিত্রের ভাগ এমন সোজা লাইনে ছিল না। তার পক্ষে জমিদারি উচ্ছেদের কথা সরাসরি বলা সম্ভব ছিল না—কারণ গৌরনদীর অনেক হিন্দু জমিদার তাকে সমর্থন করেছে। ঋণখালাশের কথা সে কিছুটা বলতে পারত। গৌরনদীর বড়-বড় সব উপস্বত্বভোগীরা চাষির হাতে ধরা ছাতার ছায়া ছাড়া বেরতেন না যদিও, তবে তাঁদেরও মহাজনের দরজায়-দরজায় ঘুরতে হত। যোগেনের পক্ষে মুসলিম লিগের বিরোধিতাও খুব কোমর কষে করা সম্ভব ছিল না। লিগ আর কৃষক-প্রজার মধ্যে কোথাকার মুসলমান কার দলে বোঝা যাবে কী করে, তখন, প্রথম ভোটেই? যোগেন যদি তার উদ্দেশ্য-বিধেয়কে প্রথম ভোটেই এত মোটা করে দাগিয়ে দিত, তাহলে বর্ণহিন্দুরা তাকে হিন্দু বলে মানত না, নমশূদ্ররা তাকে শূদ্র বলতে চাইত না। আবার, মুসলমান চাষিরাও তাকে হিন্দু ভেবে ফেলতে পারে।
যোগেন তাহলে ছিলই-বা কী, হবেই-বা কী? সে যদি নমশূদ্রই শুধু হত, তাহলে মুসলমানরা তাকে ভরসা করত, যেমন চিরকাল, চাঁড়াল-যবন ভাইভাই। কিন্তু সে যদি নমশূদ্রই শুধু থাকতে চাইত তাহলে তো সে রিজার্ভড সিটে দাঁড়ালেই পারত। সে যদি বরিশাল কোর্টের উকিল না হত তাহলে কি জমিদাররা তাকে ভরসা করত? যেন, উকিলিতে যোগেনের চণ্ডালি একটু ধোপদুরন্ত হয়েছে! যোগেন যদি পুরো কংগ্রেসি হতে চাইত, তাহলে নমশূদ্রদের পুরনো নেতারা তাকে সন্দেহ করতেন—রসিকলাল বিশ্বাস, যজ্ঞেশ্বর মণ্ডল, রাইচরণ বিশ্বাস, ডক্টর মোহিনীমোহন দাস, জগৎ মণ্ডল, বিরাট মণ্ডল, তা ছাড়া, মল্লিকদের তিনভাই—মুকুন্দবিহারী, নীরদবিহারী, পুলিনবিহারী—এঁরা যাতে তাকে তাঁদেরই অনুগামী মনে করেন, এটা যোগেনের পক্ষে ছিল খুবই দরকার। এঁরা সকলেই যে কংগ্রেসি ছিলেন, তা নয়। ১৯৩০-৩২-এর আগে পার্টিপুটিতে তো ভাগাভাগি শুরু হয়নি। তাই কখনো-কখনো ‘কংগ্রেসি’ হতে তাঁদের আপত্তি ছিল না আর তেমন হওয়াটার মধ্যে কোনো সুবিধেবাদও ছিল না। কৃষকনেতা নৌসের আলি ও রসিককৃষ্ণ বিশ্বাস মিলে ১৯২৯-৩৩-এ যশোর মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ও ভাইসচেয়ারম্যানের পদ দুটি দখলে রেখেছিলেন। আবার, শিক্ষাদীক্ষায় নমশূদ্রদের মধ্যে বিশিষ্ট হয়ে ওঠার সুবাদে সরকারি সম্মান, সুযোগ ও সুবিধে পাওয়ার দিকে এঁদের চোখ খাড়া থাকত। রায়শাহেব, রায়বাহাদুর, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের নমিনেশন, কাউন্সিলে নমিনেশন এসব দৌড়ে তাঁরা নিশ্চয়ই যোগেন্দ্রনাথের মত যোগ্য ও তরুণ প্রতিযোগী চাইতেন না।
এখন ভাবলে মনে হয়—যেমন চারাগাছটি মহাক্রম হলে বোঝা যায়—যোগেন ভোটের মুখে কোনো কিছুতেই সম্পূর্ণ ছিল না, সবকিছুই ছিল একটু-আধটু—বুড়িছোঁয়ার চাইতে বেশি, ডুবন্ত মানুষের জল-ঝাপটানোর চাইতে কম। একটু ‘জাতীয়তাবাদী’, একটু বর্ণহিন্দুবিরোধী, একটু হিন্দুও, একটু অচ্ছুৎ, একটু উকিল, একটু মুসলিমঘেঁষা, একটু হিন্দুঘেঁষা, একটু গান্ধীবাদী, একটু-আধটু গাইতে পারে, একটু ভাষণও দিতে পারে, লিখতেও পারে।
এটাই যোগেনের স্বভাব ছিল। পূর্বপ্রস্তুত কোনো নকশা অনুযায়ী যে-কোনো পরিস্থিতিকে সে সাজিয়ে নিত না। কিন্তু যে-কোনো পরিস্থিতির জন্য পূর্বপ্রস্তুত থাকত এমনকী প্রস্তুতি বলতে যেসব উপাদান-উপকরণ দরকার তা কোথাও না-থাকলেও। যোগেনের এই স্বভাব তার ব্যক্তিগত-স্বভাব ছিল না। বামুন-কায়েতদের সামাজিক-ধার্মিক দাপটের তলায় কোনো নমশূদ্রের পক্ষেই কোনো পরিকল্পনা ভেবে রাখা সম্ভব ছিল না। নমশূদ্র কি দিন কাটাতে পারে কোত্থেকে বামুন-কায়েতরা আক্রমণ করতে পারে তার ‘দিকে চোখ না রেখে?
যুদ্ধের ইতিহাসে এক বিশেষ ধরণের সেনাপতিদের কথা জানা যায়। তাঁরা যেন কিছুতেই কোনো লড়াই লাগাতে চান না। এই একটু-আধটু, দুই-একদিন, কোনো-কোনো সময় একটু পেছিয়ে আসা, একবারও আক্রমণ না-করা। তেমন সেনাপতিদের নিয়ে শত্রুপক্ষও বিরক্ত হয়ে উঠত। লোকটা যুদ্ধেও নামে না, যুদ্ধ ছাড়েও না। এমন একটা যুদ্ধের জন্য আর-কতদিন বসে থাকা যায়! এমন একটা বেযুদ্ধে এত সৈন্যকে বসে-বসে খাওয়ানো যায়? তারা গোপনে সৈন্যসংখ্যা কমায় আর প্রকাশ্যে এক-একদিন ঐ সেনাপতিকে খুচরো আক্রমণ করে। সেই সেনাপতি পেছন দিকে এগতে-এগতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছন, যেন সেই জায়গাটিতেই তিনি আসতে চাইছিলেন। তাঁর সৈন্যবাহিনীর কোনো পেছন নাই, যেন তিনি সেই পেছনেই পিঠ ঠেকিয়েছেন। তাঁর সৈন্যবাহিনীকে ডান বা বাঁ থেকে কোনো আক্রমণ শত্রুপক্ষ করতে পারবে না। তাঁর শুধু সম্মুখ আছে। তারও পর তিনি যখন নিশ্চিত যে শত্রুপক্ষ তাঁকে মৃত, পরাজিত বা পলাতক ধরে নিয়ে সৈন্যসংখ্যা আরো কমিয়ে দিয়েছে ও তাঁর পেছনে ভয়ংকর বর্ষা বা তুষারপাত বা হিমবাহ বিস্ফার শুরু হয়ে গেছে—তখন একদিন তিনি আক্রমণ শুরু করতেন। শ্বাস টানতেও একবারের জন্য থামতেন না। বর্ষা বা তুষারপাত বা হিমবাহ বিস্ফার বা দাবাগ্নি এই সব প্রাকৃতিক ঘটনা তাঁর সেনাবাহিনীর পেছনের লাইন রক্ষা করছে।
তবে এমন সেনাপতিত্বের কোনো শফরসূচি থাকে না। এঁদের পৌঁছনোর কোনো সময় বাঁধা থাকে না। তাঁরা যখন হাজির নেই, তখনো তাঁরা যুদ্ধেই থাকেন। যে-সব যুদ্ধে তাঁরা নেতৃত্ব দেন, সেগুলো ফৌত হতে যে কত সময়ই লাগে। একশ বছর তো কিছুই নয়—সবে শাদাদের তৈরি শ্বেতগৃহে একটা কাল মানুষকে বসানো হয়েছে, যাতে কালরা আর অশ্বেত না দেখায়! যোগেন তো লড়েই যাচ্ছে—মণ্ডল, সাচার এরা তো নতুন সীমান্তগুলি খুলে দিচ্ছেন। যোগেন এই একই যুদ্ধের নতুন সীমান্তের দিকে ছুটবে।
যোগেন এমন এক সেনাপতি। তার পৌঁছুতে একটু দেরি হয় কী হয়নি। এসে তো গেছে।
