২৭. যোগেনেরা এল কোত্থেকে? যায় না-হয়—কলকাতায়
১৯৩৭-এর ফেব্রুয়ারির গোড়ায় ফজলুল হক আর যোগেন মণ্ডলের মত আরো সব এমএলএ -রা কলকাতা যাচ্ছিলেন, প্রায় স্বাধীন ভারতের, একটি প্রদেশের, প্রায় প্রথম, প্রায় সরকার, তৈরি করতে। আরো-আরো অনেক নেতা তো কলকাতাতেই ছিলেন—সব দলেরই, যেসব দল কেউ কারো মুখ দেখে না। হিন্দুরা ক-ভাগ, হিশেব রাখা মুশকিল–কংগ্রেস, হিন্দুসভা আর নতুন শিডিউল্ড কাস্ট নেতারা, তার ওপর কলকাতা আর মফস্বল। তারও ওপর কেন্দ্রীয় কংগ্রেস আর প্রদেশ কংগ্রেস। তারও ওপর প্রদেশ কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের নিজেদের ভাগাভাগি। বিধান রায়, শরৎ বোস, নলিনী সরকার, তুলসী গোস্বামী, নির্মল চন্দ্ৰ—এই পাঁচ কংগ্রেসি নেতার প্রদেশ কংগ্রেস, কাউন্সিল আর কর্পোরেশনের দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি-কাটাকাটি। তারই সঙ্গে শিডিউল্ড ক্যাস্টের জন্য সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রদেশ-কংগ্রেসের সঙ্গে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির প্রায় সিভিল-ওয়ার, গৃহযুদ্ধ— তবে প্রধানত চিঠিপত্রে ও গৌণত এক-এক উপদলের প্রদেশ-অফিস দখলে। জমিদারি ব্যবস্থা যাতে নিখুঁত থাকে তার জন্য কংগ্রেস আর লিগ মতৈক্যে কোনো ফাটল ছিল না। ১৯২৮-এর রায়তি স্বত্বের সংশোধনের পক্ষে তারা কেউ ভোট দেয়নি। জমিদারি আর শিডিউল্ড কাস্ট সংরক্ষণের পক্ষে ও বিপক্ষে বাংলার তাবৎ জমিদার কংগ্রেসের নেতা হয়ে নিজেদের জায়গায় কংগ্রেসকে তৈরি করে তুললেন আর প্রদেশ কংগ্রেসকে তাঁদের স্বার্থে চলতে বাধ্য করলেন। কংগ্রেসের জিলা অফিসগুলি ছিল সদরে—শহরের শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, মোক্তার, চাকুরে এঁরাই ছিলেন, মেম্বার ও নেতা। কিরণশঙ্কর রায়—ঢাকার তেওটার জমিদার, তুলসী গোস্বামী—রাজা কিশোরীলাল গোস্বামীর ছেলে, তারকনাথ মুখার্জি—উত্তরপাড়ার জমিদার, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ-এর জমিদারি মৈমনসিঙে, তুলসীঘাটার জমিদার বিজয় রায়চৌধুরী, ইন্দুভূষণ গুপ্ত, কালীপ্রসন্ন গুহ, ব্রজেন রায়চৌধুরী।
মুসলমানরাও তখন টুকরো-টুকরো—নবাবদের মুসলিম লিগ, কৃষক ও প্রজার ফজলুল হক, আরো কত ভাগ। একই ধর্মের, কত ভাগ
এই ভাগগুলি ধর্মীয় ও সামাজিক। অথচ এগুলির মার্কা দেয়া হচ্ছে—ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি প্রথা অনুযায়ী এক-একটি পার্টির নামে। ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে ব্রিটিশ ধারণা—শুধু সরকারি অফিসারদের নয়, ব্রিটিশ সমাজের ধারণা যে ভারতীয় সমাজ বলে কিছু নেই, শ্রেণি-জাতি-সম্প্রদায়ের এক জগাখিচুড়িকেই ভারতীয় সমাজ বলা হয়। তাদের স্বার্থ ও পরমার্থ এতই ভিন্ন যে-কোনো একটি স্থানীয় ঘটনা নিয়েও কোনো মতৈক্য তৈরি সম্ভব নয়। ব্রিটিশরা একটা অদ্ভুত ও উলটোপালটা ধারণা দিয়ে ভারতীয় সমাজকে বুঝে নিয়েছিলেন, কোনো সময়ই যে-ধারণা বদলায়নি। ভারতের যে-কোনো ঘটনাকেই ব্রিটিশরা বুঝে নিতেন জাতপাত, গাঁওগাঁই, বোলি, দেবদেওতা আর ঘর বা পরিবার দিয়ে। ব্রিটিশরা ভেবে নিয়েছিলেন—ভারতে সমাজ-পরিবার ছাড়া কিছু ঘটে না, ভারতে কোনো একটি মানুষও সমাজ-পরিবারের বাইরে একা কিছু করতে পারে না, করলে সেটা খুব খারাপ কাজ।
যে-ভোটে জিতে ফজলুল হক আর যোগেন মণ্ডল ১৯৩৭-এর ফেব্রুয়ারিতে আইনসভা তৈরি করতে যাচ্ছেন, সেই ভোটের ফল আইন-অনুযায়ী এইসব অংশ উল্লেখ করে-করে বেরিয়েছিল—সাধারণ : শহর, সাধারণ : গ্রাম, মুসলমান : শহর, মুসলমান : গ্রাম, সাধারণ : নারী : শহর, মুসলমান : শহর, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, ইয়োরোপিয়ান, ভারতীয় খ্রিস্টান, শিল্পবাণিজ্য, জমিদার, শ্রমিক বিশ্ববিদ্যালয়।
কোনো বানরকেও যদি বলা হত, তাহলে, সে এর চাইতে এলোমেলো অংশ-ভাগ করতে পারত না।
এইরকম অংশভাগের একমাত্র নীতি হল—অংশগুলির জোড় মিলিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এই অংশভাগের একমাত্র নীতি—কোনো ভাবেই যেন জোড় না মেলে। ততদিনে তো বাঙালির মিল আর স্পেন্সার পড়া হয়ে গেছে। এগুলি পড়তে আর লন্ডন যেতে হয় না। কলকাতাতেই, এমনকী বরিশালের বিএম কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, পাবনার এডোয়ার্ড কলেজ, কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজেও ক্লাশরুমে বসেই মিল পড়া যেত।
জন স্টুয়ার্ট মিলের স্বদেশবাসী ও মিলের কাছে শিক্ষা পেয়েছেন সেই বঙ্গবাসী-রা কিন্তু এমন অসম্ভব সব অংশভাগে কোনো খুঁত সেদিনও পাননি, এদিনেও পান না। কোনো যুক্তিবিজ্ঞানী বা ঐ ধরনের কেউ বলেননি—একটা ভাগের নাম যদি হয় ‘সাধারণ’ আসন, তাহলে একটা ভাগের নাম হতে পারে বা হতেই হবে—’অসাধারণ’। সেই ‘অসাধারণ’-এর আবার, ‘শহর’ ও ‘গ্রাম’ ভাগ থাকতেই পারে। তাহলে দাঁড়াত, সাধারণ : শহর, সাধারণ : গ্রামীণ, মুসলমান : সাধারণ-শহুরে, মুসলমান : সাধারণ গ্রাম্য। আবার মুসলমান অসাধারণ শহুরে, মুসলমান গ্রাম্য সাধারণ। ‘নারী সাধারণ’ শহুরে। নারী অসাধারণ শহুরে। আবার নারী ‘অসাধারণ’ গ্রাম্য। যদি ‘মুসলমান’ ধর্মপরিচয় হিশেবে থাকে, তাহলে, হিন্দুরাও ধর্ম হিশেবে থাকতে হবে। নেই। আর কোনো ধর্মের উল্লেখ নেই এক ‘ইন্ডিয়ান ক্রিশ্চিয়ান’ ছাড়া। ইয়োরোপিয়ান বলে একটা টুকরো আছে, তাহলে তো এশিয়ান-আফ্রিকানও থাকতে হয়। যদি কমার্স অ্যান্ড ইনডাশটি থাকে, তাহলে তো কমার্স অ্যান্ড এগ্রিকালচারও রাখতে হয়। ‘ল্যান্ডহোল্ডার’ থাকলে, ‘ল্যান্ডলেস’ও হতে হয়। ‘আরবান’-এ আলিপুর আছে, ঢাকা নেই—ঢাকা পূর্ববঙ্গ-আসামের রাজধানী।
মাত্র বছর দশেক আগে কিন্তু মিল-বেস্থামের ভারতীয় ছাত্ররা একেবারে লজিকের সূত্র অনুযায়ী ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান ছকে ফেলেছিল। না। ভারতের সংবিধান ভারতীয়রাই তৈরি করবে—এই প্রতিশ্রুতি সত্য করে তুলেছিল সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে পুরো দেশের মিলিত বিক্ষোভে, বিদ্রোহে, বয়কটে। ব্রিটিশ রাজনীতির টৌরি-লেবার সংঘর্ষে টৌরিরা সামনের ভোটে তাদের নিশ্চিত পরাজয় ঠেকাতে শুধুমাত্র শাহেবদের নিয়ে সাইমন কমিশন বানিয়েছিল।
সাইমন তাঁর কমিশন নিয়ে বম্বে পৌঁছুলেন ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৮। মুসলিম লিগের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ আলি জিন্না পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে বম্বে-বয়কট সম্ভব করে তুললেন। দেশব্যাপী সাইমন-বিরোধিতার সেটাই শুরু, নেতা—জিন্না। গান্ধীজি অভিনন্দন জানালেন এই অকল্পনীয় সাফল্যে।
ব্রিটিশ মন্ত্রী বার্কেনহেড ভারতের ভাইসরয়কে লিখিত আদেশ দিলেন, ভাঙো, ভাঙো, ভারতীয়দের এই ঐক্য। জিন্নাকে আলাদা করো। ডিপ্রেসড ক্লাসকে আলাদা করো। ভাঙো, ভাঙো।
জিন্না ভাঙতে দিলেন না। শারীরিক অসুস্থতায় ৫১-বছর বয়সে তিনি কাহিল—সে-ই হয়তো তাঁর লাঙ ক্যানসারের শুরু। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে—তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুও ঘটল প্যারিসে। এরই মধ্যে জিন্না মুসলিম নেতাদের বোঝালেন— মুসলমানদের শুধু মুসলমানরাই ভোট দেবে এসব বিশ বছরের পুরনো দাবি ফেলে দিয়ে নতুন দাবিপত্র তৈরি করতে। তাতে থাকবে—আসন-সংরক্ষণ, একটাই ভোটার লিস্ট, কেন্দ্রীয় আইনসভায় তিন ভাগের এক ভাগ আসন, পাঞ্জাব ও বাংলায় জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে আসন, আর সিন্ধুপ্রদেশ, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের লিস্টে ঢোকানো—এই দাবিগুলি নিয়ে কথা হবে। ১৯২৭-এর মে মাসে এ-আই-সি-সির বৈঠক ও ডিসেম্বরে মাদ্রাজ কংগ্রেসে জিন্নার প্রস্তাবে কংগ্রেস রাজি হয়ে গেল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রের প্রদেশ কংগ্রেস রে-রে করে উঠল। ১৯২৮-এর এপ্রিলে হিন্দু মহাসভার জব্বলপুর অধিবেশনে অহিন্দুদের হিন্দু করার কর্মসূচি ঘোষিত হল আর সমস্ত রকম সংরক্ষণ ও প্রদেশের নতুন তালিকা তৈরির বিরোধিতা করা হল। কংগ্রেসের নেহরু-রিপোর্টে কেন্দ্র ও মুসলমান-সংখ্যালঘু প্রদেশগুলিতেই কেবল সংরক্ষণ থাকবে বলা হল—মানে, পাঞ্জাব ও বাংলায় থাকবে না। আর, সিন্ধুপ্রদেশকে আলাদা প্রদেশ করা যায় কী না ভাবা হবে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস পাওয়ার পর। নেহরু রিপোর্টে কোনো স্বীকৃতিই থাকল না যে বছরখানেকও পেরয়নি—কংগ্রেস জিন্নার প্রস্তাব সমর্থন করেছে। মতিলাল নেহরুকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলে উঠেছিলেন, ‘জিন্না? সে আবার কে?’ এতসব সত্ত্বেও ১৯২৮-এর ডিসেম্বরে কলকাতায় অল পার্টি কনফারেন্সে হিন্দু-মুসলিম ও কংগ্রেস-লিগ ঐক্যের জন্য জিন্না একটা শেষ চেষ্টা করলেন। বললেন- বাংলা-পাঞ্জাবে সংরক্ষণ মাত্র ততদিন থাক যতদিন সর্বজনীন ভোটাধিকার চালু না হয়, প্রদেশগুলিকে ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ ক্ষমতার কিছু অংশ দেয়া হোক, সিন্ধুপ্রদেশকে এখনই আলাদা প্রদেশ করা হোক। জিন্না একটা শেষ আবেদন করলেন, কাউকে কোনো দোষ না দিয়ে, যদিও কংগ্রেসকে তিনি চেপে ধরতে পারতেন—কথাখেলাপের অপরাধে। সে-সব না-করে তিনি বলেন,–’আমরা সকলেই তো এই দেশেরই মানুষ। আমাদের একসঙ্গে থাকতেই হবে। … বিশ্বাস করুন, ভারতের কোনো আশাই নেই যদি হিন্দু ও মুসলমানরা এক না হন।
জিন্নার আপোশ-প্রস্তাবকে হিন্দু মহাসভার নেতা জয়কার কোনো পাত্তাই দিলেন না। জয়কার-এর নিজের কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা ছিল না। হিন্দু মহাসভাও তখন পার্টি হিশেবে দুর্বল। কংগ্রেসের হিন্দুপন্থীদের প্রায় প্রকাশ্য সমর্থনের জোরেই জিন্নার প্রস্তাব জয়কার তুচ্ছ করতে পেরেছিলেন। মুসলিম রাজনীতিতে যাঁদের বিরোধিতা করে জিন্না একটা জায়গা তৈরি করতে চাইছিলেন, হিন্দুপন্থী নেতারা সেই ফজল্-ই-হাসান ও মুহম্মদ শফি প্রমুখ কট্টর নেতাদের দলেই তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। বছর না পেরতেই জিন্না তাঁর চোদ্দ-পয়েন্ট দাবি নিয়ে নতুন রাজনীতি শুরু করলেন। আর কংগ্রেস আইন-অমান্য আন্দোলনে নামল।
কিন্তু ইতিমধ্যে অন্য ধরনের কিছু ঘটনা কংগ্রেস-লিগ-হিন্দু মহাসভা-দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম এইসব পার্টির সভা-সমিতি-সম্মিলন-প্রস্তাব বা দিল্লি-এলাহাবাদ-কানপুর-বোম্বাই-মাদ্রাজ এইসব শহর থেকে অনেক দূরে ও ভিতরে ও অনিশ্চিত সব লক্ষ্যে ঘটে যাচ্ছিল।
সূর্য সেনের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আমি ১৮ এপ্রিল সরকারের অস্ত্রাগার লুঠ করে জালালবাদ পাহাড়ে ২২ এপ্রিল সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। ভারতের সশস্ত্র আন্দোলনে চট্টগ্রাম-বিদ্রোহের সমতুল্য কোনো ঘটনা ঘটেনি। সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলা, তাদের বিশ্বস্ততা নিশ্ছিদ্র করে তোলা, অস্ত্রচালনা শেখা, শহরে সামাজিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধের পরিকল্পনা, লক্ষ্য স্থির করা আর সেনাবাহিনীসহ ইংরেজদের প্রাণভয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা—সমস্ত ঘটনাটিতে পরিকল্পনা, সংগঠন ও যুদ্ধশক্তির যে-প্রমাণ স্পষ্ট হয়ে উঠল তা থেকে বিপ্লবী সম্ভাবনার নতুন আবিষ্কার ঘটে গেল। এপ্রিলে হল চট্টগ্রামযুদ্ধ আর রাইটার্স বিল্ডিংসের অলিন্দযুদ্ধ করলেন বিনয়-বাদল-দীনেশ ডিসেম্বরে। পেশোয়ারে বাদশাহ খাঁনকে গ্রেফতার করা হল ২৩ এপ্রিল—আইন অমান্য আন্দোলনের কারণেই। সারা পেশোয়ার বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। কিসসাকাহিনি বাজারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমবেত মানুষের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ২০০ থেকে ২৫০ সাধারণ মানুষ মারা গেলেন। গাড়োয়াল রাইফেল্স-এর হিন্দুসৈন্যরা জনতার ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। ১৯৩০-এর শেষার্ধে উপজাতিদের প্রচলিত হঠাৎ-আক্রমণ শুরু হয় কিন্তু তারা আর গ্রামে ডাকাতি বা লুটপাট করল না। এমন লুটপাট ও হঠাৎ-আক্রমণ তো তাদের জীবিকা। এই বছর তারা শ্লোগান তুলেছিল-বাদশাহ খাঁন, মালং বাবা (নাঙ্গা ফকির), ইনকিলাব-কে জেল থেকে ছাড়তে হবে।
গান্ধীজির গ্রেফতারের (৫ এপ্রিল, ১৯৩০) খবর পৌঁছুনোমাত্র শোলাপুরের সুতাকল শ্রমিকরা মিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়ল ৭ মে। থানা, মদের দোকান, স্টেশন, কোট-কাছারিতে খেপে-ওঠা মানুষ আগুন লাগিয়ে দিল। তিনজন মুসলিম পুলিশকে পুড়িয়ে মারা হল। দুদিন পর ছিল বক্র-ইদ। কোনো দাঙ্গা হাঙ্গামা ঘটল না। ১৩ মে শোলাপুরের জিলা ম্যাজিস্ট্রেট দিল্লিতে জানালেন, ‘ট্র্যাফিক কনট্রোল থেকে সমস্ত প্রশাসনিক কাজ স্বেচ্ছাসেবকরাই চালাচ্ছেন। তারা নিজেদের ভিতর বেছে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট থেকে দারোগা পর্যন্ত সব পদে কর্মী নিয়োগ করেছে।’
করাচিতে ডকশ্রমিকরা, মাদ্রাজে চুলাই মিল শ্রমিকরা, কলকাতায় অবাঙালি যানবাহন মজুররা, কলকাতার কাছে বজবজে মিল শ্রমিকরা—রাস্তায় নেমে পুলিশের সঙ্গে কখনো সম্মুখ, কখনো গেরিলা, লড়াই শুরু করে দিয়েছিল।
গান্ধীজি আমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম থেকে হাঁটতে শুরু করেন ১৯৩০-এর ১২ মার্চ। তিনি ডান্ডিতে পৌঁছন ৫ এপ্রিল ও সমুদ্রের জল তুলে লবণ-আইন অমান্য করলেন ও জানিয়ে দিলেন পরদিন ৬ এপ্রিল থেকে সারা ভারতে আইন-অমান্য শুরু হবে। হাজার-হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূলীয় ভারত উত্তাল হয়ে উঠল। ৫ এপ্রিল গান্ধীজিকে গ্রেফতার করা হল।
আইন-অমান্য আন্দোলনের বাইরে, স্থানীয় কোনো বিবাদের ওপরে, চেনাজানা পার্টিগুলির বহুবার শোনা কথাগুলি ছাড়িয়ে, ভাইসরয়ের সঙ্গে চিঠি লেখালেখি বা দেখাসাক্ষাৎ এড়িয়ে—এই-যে কখনো ব্যক্তিগত সশস্ত্র আক্রমণ, কখনো তাৎক্ষণিক এক সমাবেশ, কখনো সংগঠিত সশস্ত্র যুদ্ধ, কখনো কোনো শাহেব অফিসারকে মেরে ফেলা, ভাইসরয়ের স্পেশ্যাল ট্রেনেও বোমা ফাটানো—করাচি থেকে বজবজ—সেই সব ঘটনারও একটিই শ্লোগান—শাহেবরাজ খতম, গান্ধীরাজ জারি—এমনকী, জালালাবাদ যুদ্ধেও। ‘ভারত’ বলে একটা ধারণাকে সত্য করে তোলা তাদের পক্ষে কঠিন। ‘গান্ধী’—কথাটিতে একটা চেনা মানুষের আদল আসে—হাঁটু-বেরনো খাটো ধুতি, খালি গা, টাক মাথা, মুখটি কখনো ভার, কখনো আলোমাখা।
১৯৩৭-এ সত্যি-সত্যি প্রায় সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রদেশে-প্রদেশে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন, তাঁরা প্রাদেশিক সরকার গড়বেন, তাঁরাই মন্ত্রিসভা গঠন করবেন, তাঁরাই আইনসভায় আইন তৈরি করবেন—তাহলে ক্ষমতা কি এসে গেল?
একেই তো স্বাধীনতা বলে? এমনই তো হয় স্বাধীন সব সভ্য দেশে। তাহলে কি স্বরাজ এসে গেল?
না, এটা যে স্বাধীনতা বা স্বরাজ নয়—সে-কথা বলার অনেক লোক ছিল, অনেক পার্টি ছিল। কেন্দ্রের কী হবে, কেন্দ্রীয় সরকার কি একটা সরকার হবে—না, প্রদেশগুলি মিলিয়ে মিশিয়ে কোনো সরকার হবে? কেন্দ্রীয় সরকার মানে তো ভারতবর্ষ। তাহলে ভারতবর্ষের কী হল? ভারতবর্ষ স্বাধীন না হলে কি প্রদেশ স্বাধীন হতে পারে? প্রদেশগুলি তো চেনাজানা জায়গা, তার মাটি চেনা, তার পৌরাণিক গল্পগুলি চেনা, তার নদীনালা চেনা, তার রাস্তাঘাট চেনা, তার ডিএম-ও সিবিল সার্জেন চেনা, তার পুলিশ সুপার চেনা। আর, ভারতবর্ষ বলে এক কেন্দ্রের বা পরিধির তো কিছুই জানা নেই। ধারণা করে নিতে হয়েছে কোথায় ভারতবর্ষের সত্তা, কোথায় ভারতবর্ষের অতীত, কোন্ ধারণায় বাঁধা পড়ে আছে হিমালয় থেকে পূর্ব-পশ্চিমঘাট, ভারতবর্ষের মন্ত্রিসভা কী করে তৈরি হবে—যদি একজন কোনো রাজা বা অন্তত সহরাজা মাথার ওপর না থাকেন। দেড়শ বছরের ওপর ভারতবাসী ইংরেজের ভারতবর্ষকে চিনেছে। এখন অনিংরেজ ভারতবর্ষকে ধারণা করতে পারছে না। দেশ স্বাধীন হবে—ভারতবাসী এই বিশ্বাস বা আস্তিক্য বা আস্থাটুকু তৈরি করে তুলতে পেরেছিল। সেই তৈরি-হওয়ার ক্রিয়া খুবই জটিল। নিজের-নিজের জমির আলের সমস্যা, নিজের-নিজের জীবিকার সমস্যা, নিজের-নিজের মিল-কারখানার সমস্যা—মালিকের ও মজুরের, নিজের-নিজের মিউনিসিপ্যালিটি ও ইউনিয়ন বোর্ডের সমস্যা গণ-আন্দোলন গোপন-আন্দোলন এইসব কিছুর মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ, ইংরেজের ভারতবর্ষকে চিনেছে।
ব্রিটিশরা জানতেন, ভারতবাসী অনিংরেজ ভারতবর্ষের ধারণা বিভ্রাটে পড়েছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতিরা তাদের জীবিকার দরকারে লুঠ করতে এসে শ্লোগান দেয়, নাঙ্গা ফকিরকে জেল থেকে ছাড়ো। উত্তর-পূর্ব সীমান্তের চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজকে যুদ্ধে আহ্বান করে বিপ্লবীরা শ্লোগান দেয়, গান্ধীরাজ জিন্দাবাদ। কিন্তু এই ভারতবাসীদের ভিতর যারা হিন্দু, তাদের ধারণাই নেই, অস্পৃশ্য হিন্দু ও যবন মুসলমানদের সঙ্গে তারা একসঙ্গে থাকবে কী করে। এই ভারতবাসীদের ভিতর যারা মুসলিম—তাদের ধারণাই নেই অনিংরেজ ভারত ও হিন্দু ভারতের মধ্যে তফাত কোথায়। যারা অ্যাংলো ইয়োরোপিয়ান তারা ধারণাই করতে পারে না—তাদের যারা পিতা, তারা তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না করে চলে যাবে। আটাশ বন্দুক আর খেতাবে যারা সূর্যবংশীয় ও চন্দ্রবংশীয় দেশীয় রাজা ও নবাব, তারা তখনো ধারণা করতেই পারে না,—ইংরেজ না থাকলে তাদের রাজত্ব দেখবে কে?
ব্রিটিশরা লন্ডনের এক প্রাসাদকক্ষ সাজিয়ে সব নেতাদের ডেকে বলল, ‘ভাবো। এখানে বসে-বসে ভাবো।’ দ্বিতীয় গোলটেবিল, ১৯৩১-এর সেপ্টেম্বর।
