1 of 4

২১. হরির লুট

২১. হরির লুট

শারদা হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, ‘আগে, ভাই আইস্যা গিছে, ভাই আইসছে—’  

যোগামা কোন আড়াল থেকে গেয়ে ওঠে, ‘অসময় ছাড়া/আমার গোপালের নাই ফেরা। কইহানে কাটাইয়্যা আলি সারাডা দিন। তোর না আইজ জন্মদিনের হরির লুট। দ্যাখ্ বাবা, যারে কইছি স্যায় আইছে, কাগের বাবা, যারে কইছি স্যায় আইছে, কাগের মুহে শুইন্যাও আইছে। আমার যোগা রে বেবাক মানুষ কত ভাল যে বাসে! গৌর! গৌর!’

শারদা, যোগেনের দিদি, এগিয়ে যোগেনের হাত ধরে টানতে-টানতে তুলসীতলার সামনে নিয়ে আসে, ‘ভাই, তোর জইন্যে পুরান তেঁতুলের আচার বানাইয়্যা আনছি—’

‘কত্‌দিনের পুরান রে ছোটদিদি?’

একটু অপ্রস্তুত থেমে থেকে শারদা বলে, ‘সেডা ক্যামনে কই? শাশুড়ির হাতের বান্ধা তেঁতুল। মাটির হাঁড়ির গায়ে তো ব্যাঙের ছাতা গজাইছে।’

‘অ। তাই ক। আমি ভাইবল্যাম—তুই ভাইয়ের লাইগ্যা, তেঁতুলগাছ পুঁইত্যা, বড় কইর‍্যা, তেঁতুল ফল্যাইয়া, সেই তেঁতুল হাঁড়িত ভইর‍্যা, সেই হাঁড়ি পুরানা কইরা, হাঁড়ির গায়ে ব্যাঙের ছাতানাতা তুইল্যা, তার শ্যাষে ভাইয়ের লাইগ্যা আচার বানাইয়্যা আনছিস। জামাইবাবু কি অ্যাহনো তেঁতুল গাছেই আছে, না, নাইম্‌ছে।’

‘আরে, নামছে, নামছে’, শারদার স্বামী পেছন থেকে যোগেনের পিঠে কিল মেরে বলে, ‘নাইমছে’।

দুয়ারে ওঠার জায়গাটুকুতে হঠাৎ একটু আলো পড়ে। তারপর কারো কারো গলায় শোনা যায়, ‘মাস্টারশাহেব’, ‘মৌলবিশাহেব’। যোগেন এগিয়ে যায়। জলিল মাস্টার হাতে কলাপাতায় ঢাকা একটা বাটি নিয়ে এগিয়ে আসেন। পাটখড়ির একটা গোছায় আগুন লাগিয়ে কেউ তাকে পথ দেখাচ্ছে। দোকান, পাঠশালা আর মাটির একটা ছোট মসজিদের খোদার নোকর জলিল মাস্টার।

যোগেন জলিলমাস্টারের সামনে নিচু হয়ে যেন প্রণাম করতে এগিয়ে যায়। জলিলমাস্টারের দুই হাতে কলাপাতা ঢাকা বাটি—তিনি হাত দিয়ে বাধা দিতে পারেন না। ব্যস্ত হয়ে দু-পা পেছনে সরে যান, ‘ন্ না, না, না।’ যোগেন খাড়া হয়ে বলে, ‘সাপ দেইখলেন নি মৌলবি সাব’।

‘তোরে না আমি কতবার কইছি আমারে সেবা দিবি না। আমি খোদার বান্দা, আমি সেবা নিব্যার পারি?’

‘মৌলবি সাব, আমারে গাইল পাইড়া কী হব? এডা তো আমাগ শুদ্দুর জাইতের অভ্যাস। মানুষ দেইখলেই সেবা দিব্যার লাগব। শুদ্দুরের থিক্যা তো কেউ নিচু নাই। শুদ্দুরের তাহাইলে ভুল-সেবা দেয়ারও কুনো উপায় নাই।’

‘তোর মায়ে কই?’

‘যোগা—আ মা, মৌলবি-সাব ডাহে’।

যোগামা মাথার কাপড় টানতে টানতে সামনে এসে পড়ে, ‘জয় গৌরমাস্টার-সাব! আবার হাতে কী লইয়্যা আলেন।’

‘আরে মা, আগে আমারে ভারমুক্ত করো। জোলাপাড়ার কুটটির মায়ে নাকী মোনাজাত করছিল, কুটটির পালাজ্বরের সময়, যে কুটটি ভাল হইয়া গেইলে দরগায় সিন্নি চড়াইব। সেই চড়ান আজই চড়াইল রে মা। তাই নিয়্যা আইল্যাম যোগার জইন্যে।’

যোগামা ততক্ষণে সিন্নির বাটি হাতে নিয়েছেন। এ-হাত ও হাত করার সময় কলাপাতা উড়ে পড়ল দুয়ারে। কে একজন নিচু হয়ে তুলতে গেলে যোগামা বলে ওঠেন, ‘ছাড়ান দ্যান, ধুল্যায় পইড়ছে, মাস্টারসাব বহেন, অ বৌ–বৌ—’।

অন্ধকারের সুযোগে যোগেনের বৌ এসে পেছনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘কও কী?’

‘এইখান সিন্নি আমাগ ঐ বাটিটায় উপুড় কইর‍্যা মাস্টার-সাবের বাটিটা ধুইয়্যা আন্ মা।’ যোগেনের বৌ যোগামার পেছন থেকে শুধু তার হাতটুকু বাড়িয়ে বাটিটা ধরতেই জলিলমাস্টার বলে ওঠেন, ‘আরে দেইখ্ছ কাণ্ড, এইডা প্রহ্লাদের মাইয়্যা না? ঐডা অ্যাত্ত বড় হইল কবে?’

‘ক্যান, প্রহ্লাদের মাইয়্যা হব ক্যান শুধু? ঐ তো আপনার ছাত্তরের বৌ।

‘আরে মা, তোমার তো দেহি বুদ্ধিনাশ হইব্যার জো হইছে। তুমি-না সেইদিনকার ছুঁড়ি, তোমার-না ভাসুর ঠাউর অ্যাহনো বাঁইচ্যা? তুমি আমারে যোগার বৌ চিনাও?’

‘বৌরে কন কইন্যা, তা বুইঝব ক্যামনে, চিনছেন কী চিনেন নাই।’

‘দ্যাহো, বুদ্ধি দ্যাহো যোগামায়ের। ছাওয়াল হইল উকিল-ব্যারিস্টার আর মায়ের বুদ্ধি জলিল মাস্টারের পাঠশাল।’

‘মাস্টার-সাব, এমন দুর্নাম দিবেন না। বাবুরা যদি শুনে যোগামা পাঠশালে পড়া মাইয়্যা, তাহাইলে ঘরছাড়া কইরবে।’

‘এইডা এড্ডা ঠিক কথা কইছ মা। বাবুগ বুদ্ধিশুদ্ধি তোমারই নাগাল—পুব কইলে পচ্চিম বুঝে। আমি জিগ্যাই মা–প্রহ্লাদের মাইয়্যাডা কি শ্বশুরঘর কইরব্যার আইল? ডাগর হইছে তো?’

‘অর বাপও তো আইছে। দ্যাহেন নাই।’

তুলসীতলাতে হাততালির সঙ্গে লুটের গান উঠল, ‘লুট পইড়ছে লুটের বাহার, কারো তীক্ষ্ণ গলা কেঁপে ওঠে, ‘গৌর গৌর’, ‘লুইট্যা নে রে তোরা’। একমুঠো বাতাসা আকাশের দিকে ছোঁড়া হল। যারা মাটিতে দাঁড়িয়েছিল, তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাটিতে—লুটের বাতাসা কুড়োতে। এত কম আলোতে বোঝাও যায় না—বাতাসা কোথায়। কোনো বাচ্চার গলা ওঠে, ‘পাইছি, পাইছি অ্যাড্ডা’।

একইভাবে লুটের গান, হাততালি আর লুট দু-চার দফা চলে। লুটের বাতাসা যে ছোড়ে সে দু-একবার ছোড়ার ভঙ্গি করে কিন্তু ছোড়ে না। সেই ভঙ্গিটুকু দেখেই ছেলেমেয়েরা, ছুঁড়িবুড়িরা মাটির ওপর হামলে পড়ে। লুট-ছোঁড়ানির হাসির ধাক্কায় তারা বোঝে, তাদের ঠকানো হয়েছে। লুটের পর জলিলমাস্টারের সিন্নি হাতে-হাতে দেন যোগামা নিজের হাতের আঁজলায় তুলে-তুলে।

কোথা থেকে ঢোল বাজিয়ে কে গান গেয়ে ওঠে,

‘আয় রে কানী, তোর
আরেড্ডা চক্ষু কানা করি
এই তিরশূলে মোর।
শিবো শিবো শিবো হে।
যোগা যহন আইয়্যাই পড়ছে, ধর্ রয়্যানির গান।’

যোগেনের একেবারে জন্মকালের বন্ধু—ছিদাম। যোগেন বলে ওঠে, ‘ছিদাম, তুই অ্যালি কহন? তুই-না নাওয়ের বায়নায় গিছিলি?’

ঢোলে ঠোকা দিতে-দিতেই ছিদাম গানের মতই তালে-তালে বলে ওঠে, ‘বায়ানির খ্যাপও শেষ হয় যোগা, রয়্যানির গানের শ্যাষ নাই। তুই আইছস আর একখান বেউলা হইব না? ধর্ যোগা ধর্—কী কালনাগিনী রে–এ।

হঠাৎ যোগামা বলে ওঠেন, ‘রয়্যানি ক্যান। গাইস তো বিয়্যার গান গা। যোগামা বলতে-না-বলতেই শারদা কোথাও থেকে নাচের তালে সুর ধরে,

হাতি গোদা গোদা ঠ্যাং
রে মোতুয়ালা হাতি

শারদার গলায় নানা জায়গা থেকে মেয়েরা গলা মেলায়।

হাতির বিবি হইলেন
দুইশ মণি হাতনি।

ছিদাম বলে ওঠে, ‘লুট হইল, ছিন্নি হইল আর রয়্যানি হইব না? বিয়্যা নাই তো বিয়্যার গীত গাইয়্যা হব কি?

যোগেন বলে, ‘ছিদাম, ঢোল বাজা রে, বিয়্যাই হোক আর রয়্যাই হোক।’

শোনামাত্র ছিদাম ঢোলে দুটো বড়সড় চড় মেরে লাফিয়ে উঠে মেয়েদের গানের সঙ্গত শুরু করে। গানের আসর বলে তো কিছু নেই। একটা দুয়ার আছে—সেটা আরো অনেক বড় হতে পারত, নৌকোটা কাত করা না-থাকলে। বড় হয়ে গেলেও সেটা ঠাহর হত না আলোর অভাবে। এখন আলো প্রায় নেইই, যে-লণ্ঠনটা ছিল তাও নিবে গেছে। জায়গাটায় যে মানুষজন ছড়িয়েছিটিয়ে বসে-দাঁড়িয়ে আছে নানা ভঙ্গিতে, তা বেশ বোঝা যায়।

শারদা বিয়ের গান ধরতেই যোগামার ধক্ করে মনে আসে—এটা সে আচমকা কী করে বসল, রয়্যানির কথা উঠল, ছিদাম শুরুও করল আর যোগামা কী না বাধা দিয়ে বলল, বিয়্যার গান গা। রয়্যানি ছাড়া রক্ষা আছে—এই অন্ধকারে, জলেডাঙায়, বনবাদাড়ে, খালেবিলে, জলে সাপ, মাটিতে সাপ। মা মনসার যদি রাগ হয়? মনসার রাগ চৈত্রমাসে ছনে আগুন লাগার মত—লাগতে-না-লাগতেই সব পুড়ে ছাই। কিন্তু যোগামা তো বাধা দেননি। যোগামার হঠাৎ মনে হয়েছিল—কাঁদতে আর ভাল লাগছে না, সেই চাঁদের সাত ছেলের মৃত্যু, লখিন্দরের বিয়া আর ভাসান, বেউলা—রয়্যানি গানে কি কান্নার শেষ আছে? আর, বুকে জমে জমে অক্ষয় পাথর হয়ে গেছে এমন কান্না কাঁদতেই তো চায় লোকে রয়্যানিতে। এখন তো বিয়ের গান তুমুল হয়ে উঠেছে, দুই পক্ষ হয়ে মেয়েরা এ ওকে যা-তা বলে গালাগাল দিচ্ছে, ক্রমেই আরো খারাপ কথা আসবে, ছিদামের ঢোল গানগুলোতে নাচ এনে দিচ্ছে।

এসব গান তো কারো কথায় শুরু হয় না, শেষও হয় না। এক যোগা বা যোগার মত কেউ যদি রয়্যানির গান গেয়ে ওঠে, তাহলে এই বিয়্যার গান চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু যোগাকে বলবে কী করে যোগামা। যোগা তো বলবে, ‘তুমিই-না কইল্যা বিয়্যার গান গাইতে। গাউক-না। ক্যামন সুন্দর গায়, শুনো-না!’ বা, যোগা হয়ত বলবে, ‘ছিদাম কী না কী কইলো আর তুমিও নাইচল্যা, দ্যাহো না, ছিদাম ঢোল পিটায় ক্যামনে।’ মেয়েদের একদল তখন বলছে,

রাজার বাড়ির হাতি
কারে লাথথি দিল–
নাসিমাক্‌ লাথথি দিল।
জমিদারের ছাওয়াল আইস্যা
কারে কোল দিল—
ছিনাল নাসিমাক গোল দিল।

বিয়ার গীত তো মুসলমান বাড়ির বিয়েতেই গাওয়া হয়, নমবাড়ির মেয়েরাও সেই গানে গলা দেয়। কেচ্ছা গাওয়া চলতেই থাকে এর নামে ওর নামে।

‘এড্ডা রাইতে নাসিমা তোর
বিছনা ক্যান দোলে লো।’
‘নাং নাই লো, মাকুরের বাচ্চা
বিছনা বাইয়্যা গেল লো।’

ছি, ছি, ছি, ছি–রয়ানি গানের কান্নার বদলে কীনা যোগামা এইসব গানের হাসি বেছে নিল। যোগামা মনে আনার চেষ্টা করে কী সে বলেছিল। সে কি বলেছিল—বিয়্যার গান গা? যদি তাই বলে থাকে, তাহলে তো রয়্যানিতে বাধা দেয়া হয় না। যোগামা তো নাও শুনতে পারে যে ছিদাম রয়্যানির কথা বলেছে। মা মনসাও তো ঐটুকুই শুনে থাকতে পারেন যে যোগামা বিয়ের গান গাইতে বলেছে। তাহলে তো তার রাগ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যোগামা কি বলেছে—’রয়্যানি ক্যান? বিয়্যার গান দুই-একখান ধর্। রাইত হইছে’? যদি বলে থাকেন, তাহলেও তো রয়্যানিতে বাধা দেয়া হয় না। বরং বলা হয়—ঠিকঠাকমত না-গাইলে রয়্যানি গাওয়া উচিত নয়। মা মনসা তার মনের ভাবটা ঠিকই বুঝে নেবেন—যদি যোগামা সত্যি ঐ কথা বলে থাকেন, বা বলতে চেয়ে থাকেন। এইবার ঐ বিয়ের গানের উচ্ছ্বাস, হাসি আর দ্রুত তালের মধ্যে যোগামার দু-চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে। না, আমি অ্যাহন যাই বানাই-না ক্যান, তা আমি কই নাই। মা মনসা মনের কথাডাই শুইনছেন। মা কি শুইনছেন, মা কী শুইনছেন, আমি কী কইছি—আমি এই সব কথা বান্যাইয়া-বান্যাইয়া নিজের পাপ বাড়াই ক্যা? হ্যাঁ, মা, আমি কাইন্দব্যার চাই নাই বইল্যাই রয়্যানি গাওয়ায় বাধা দিছি, মা! এই যে অ্যাহন একা-একা কাইন্দ্যা সেই পাপের প্রাচিত্তির করি মা। মা, তুমি আমার পাপ জানো মা। তুমি আমার সত্যডাও জানো মা।’

রাতের মিলনপ্রহরে তখন বিয়ের গান মেয়েদের গলায় শানিয়ে উঠে একটু মদালস অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল, সমবেত উল্লাসে আবার ফিরে আসছিল।

এত যদি জাইনত্যাম আল্লা
মা হইব পর
দুয়ারেতে উঠ্যায়া থাইকত্যাম
জলটুঙ্গির ঘর।
বিপরীত পক্ষ গেয়ে ওঠে,
দেহিস মাগি, ঠেলা খাইয়্যা
তোর জলটুঙ্গি না ভাঙে
বিয়া থিক্যা কত সুখ-
দেইখবি ভরা গাঙে।

সেই উত্তাল গানের মধ্যে যোগামা হাতজোড় করে অন্য তালে অন্য এক গান গুনগুনিয়ে

গাইতে থাকে আর চোখের জলে ভাসে—

এমন বাসর বানাইছে বেউলা সোন্দরী
মান্দাসে গাঙুরে ভাসে সে মরা-ভাতারি—।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *