১৯. যোগেনের রিস্টওয়াচ ও ফাউন্টেন পেন লাভ ও নানা বাবু সাক্ষাৎ
খৈ-মুড়ি খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। আশুবাবু বললেন, ‘তোর সইরষ্যার ত্যালের ঝাঁঝে তো আমার নাক শুল্যায়। দেহি, আমারে এক ফোঁটা ত্যাল দ্যান।’
‘আর-দুগা খৈ দেই?’ ছোটখুড়ি তেল দিতে এসে বলে।
‘না, না, লাইগলে তো চাইত্যামই।’ খৈ আর মুড়ি শেষ হয়ে গেলে একটু হাসহুস হয়। তারপর আশুবাবু বলে, ‘বাবা যোগা, আমার শিক্ষকজীবনে তুমি আমার শ্রেষ্ঠ ছাত্র—এইডা তোমার পক্ষে আর খুব বড় কথা না।’
‘কী যে কন স্যার?
‘ফ্যার, মুহে-মুহে কথা?’ আমার শিক্ষকজীবন আর কদডুগু? তুমি তারে বড় কইর্যা দিছ। আমি তোমারে দুইখান উপহার দিব–তোমার আরো জয় চাইয়্যা। তোমার অ্যাহন যা কাম—তাতে উপহার দুইডা তোমার কামেও লাইগব। দেহি তোর বাঁ-হাতখান।’ যোগেন তার বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দেয়। আশুবাবু নিজের বাঁ কব্জি থেকে ঘড়িটা খুলে যোগেনকে পরিয়ে দিতে থাকেন।
যোগেন বলে ওঠে, ‘স্যা–র’।
আশুবাবু বলে—’আমার বিয়্যার সময় আমার শ্বশুরমশাই নিজে খাশ শাহিবগ দুকান থিক্যা কিন্যা আমারে এটা দিছিলেন ইন দি ইয়ার নাইনদিন হানড্রেড অ্যান্ড থার্টিন। চব্বিশ বছরে মেরামতির দরকার হয় নাই। এক্কেরে রাইট টাইম। তোমারে তো অ্যাহন সময় মাইন্যা চইলবার লাগব। সাইমা সাইমা ঘড়ি।’
‘স্যার, আপনারে কি ঘড়ি মাইন্যা চইলবার হব না?’
আশুবাবু তার বুক পকেটের একটা পেন খুলে যোগেনের সেই জামার বুকপকেটে লাগিয়ে দিতে-দিতে বলে, ‘আর এই পেনডা রাখো। ফাউন্টেন পেন। রাজা। এইডা আমি শখ কইর্যা পূজার এক স্পেশ্যাল ট্রেইন থিক্যা কিনছিলাম। ইন দি ইয়ার নাইনটিন টুয়েন্টি ওয়ান। কুইঙ্ক কালি ভইরব্যা। কী শক্ত নিব। তোমার তো অ্যাহন সর্বক্ষণই কলম লাগে। কী দিয়্যা লিখ, কোর্টে, দুয়াত-কলমেই? এইবার তুমি এডডু ভদ্দরলোক সাইজ্যা আমার লগে চলো। বাবুগ এডডু দেখাইয়্যা আনি। তোমারে অগ কাছে আর নিয়্যা যাবে কেডা?’
‘সেইডা কামের হইব স্যার। কিন্তু, আপনি আমার ভার এমন বাড়ায়্যা দিলেন স্যার? আপনার ঘড়ি, ফাউন্টেন পেন, স্যার—’ যোগেন আশুবাবুকে আগের মত করেই প্রণাম করে, আশুবাবু তখন দাঁড়িয়ে। বাড়ির সকলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। আশুবাবু বলে, ‘নে, উঠ, চল্’। যোগামা চোখের জল মুছতে-মুছতে বলে, ‘অরে উইঠব্যার কবেন না। দিক। প্রাণভইর্যা ভক্তি দিক।’
যোগেন উঠে যোগামার হাতে পেন আর ঘড়ি দিয়ে বলে, ‘চলেন স্যার’। ‘জামাকাপড় বদল্যাইলা না?’
‘সে তো স্যার বাবুগ নাগাল ধুতিপাঞ্জাবি।’
‘সেইডাই পরো।’
‘সে তো ধলা স্যার।’
‘ধুতিপাঞ্জাবি কি ধলা না হইয়্যা কালা হব?’
‘স্যার, সে আমি পারব না। মইস্ত্যারকান্দির রাস্তা দিয়া আপনার লগে বাবু সাইজ্যা জুতা মচমচ্যায়া যাইবার পারব না।’
‘জুতাও পরবা না? তো এডা ক্যামন দ্যাখায়?’ আশুবাবু যোগেনের মাথা থেকে পা খুঁটিয়ে দেখেন। বাবরি, কোঁকড়ানো চুল, মোচও আছে একডা, গালে বাসি দাড়ি, মাপে ছোড একডা তপন, হাঁটুর উপুড় তুলা লাল পাইড়্যা কোঁড়া ধুতি, পায়ে আর হাতে অ্যাহনো কাঠের গুঁড়া।
আশুবাবু বলে ওঠেন, ‘এডা ক্যামন দেখায়? উনারা তো তোমাক মেম্বার অব দি লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লি অব বেঙ্গল, না ভাইব্যা, বরিশালের জলডাকাইত ভাবব।’ কথাটা বলতে-বলতেই আশুবাবু রাস্তার দিকে হাঁটা দিয়েছেন। যোগেন তার পিছু-পিছু নামে। আশুবাবু পশ্চিমে চলেন। মৈস্তারকান্দির বাবুরা ঐ ডাঙার দিকেই থাকেন।
তিনি বলে চললেন, ‘যোগা, আমি যে তোমারে বাবুগ কাছে নিয়্যা যাচ্ছি এর কারণডা কি তুমি আন্দাজ কইরব্যার পারো?’
‘আমার দিক থিক্যা পারি—আমারে একা যাইতে হইল না। আপনার দিক থিক্যা পারি না।’
‘এই বাবুগ কারো-কারো জীবনের কাম একডাই। অন্যে যে যাই করুক, সেইডা কী কইরলে আরো ভাল হইত তার বিধান দেয়া। এই-যে তুমি বাবুগর লগে দেখা কইরতে যাত্যাছ, এডা তো তুমি নাও যাইব্যার পারতা। তুমি তো জিতছ বরিশালের লাইগ্যা। মৈস্তারকান্দির থিক্যা না। যদি না-যাইত্যা, বাবুরা কিছু নাও কইব্যার পাইরত। কিন্তু তুমি যে যাইত্যাছ, ব্যস, শিয়ালরে ভাঙা বেড়া দেখানো হয়্যা যাবে নে। বাবুরা কেউ-কেউ ভাইব্যা বসত—এটা তাগ বিচারের বিষয়। কাউরে বাদ দেয়া যাবে না—তালেই তো হইল তোমার! যত্গুল্যা দেত্তা সবার পায়েই ফুল-ব্যালপাতা দাও। তাও অরা কইব্যার ধইরবেনে—ফুলপাতা এড্ডু বেশি দিলে ভাল হইত। ‘ ‘আপনি স্যার, সাইধ্যা এই গোলমালে ঢুকেন ক্যান? যাওনের কাম নাই। চলেন ফিরি।’
‘তার লগেই তো আমি তোমারে নিয়্যা যাত্যাছি। কথাডা য্যান অ্যামন কইর্যা রটে যে আশুমাস্টার তার নতুন মেম্বার ছাত্ররে নিয়্যা আসছিল। দোষগুল্যা তাহাইলে আমার ঘাড়ে আইসব। চলো, আগে হেডমাস্টারমশায়ের লগে যাই। কম কথার মানুষ। বাজে কথায় নাই। চিনো তো?’
‘হ্যাঁ। নদী ভাইঙ্গ্যা আইসছেন তো। উনার ছাওয়ালরে একবার দেখছিলাম, আইসছিল, য্যামন চেহারা, ত্যামন বাবু, কইলকাতায় থাহে।’
‘পুত্র না। পোষ্যপুত্র।’
‘আপনাগ যে স্যার কতরকম পুত্র হয়? কাণীন পুত্র, করণপুত্র, ঔরসপুত্র—’
‘আরে, খাইছে, তুই আবার এই সব কথা জাইন্যা ফেলছিস?’
‘স্যার- ঔরসঃ ক্ষেত্রজশ্চৈব দত্তঃ কৃত্রিম এব চ।
গুঢ়োৎপন্নোহপবিদ্ধশ্চ দায়াদা বান্ধবাশ্চষট্।।
কানীনশ্চ সহোঢ়শ্চ ক্রীতঃ পৌনর্ভবস্তথা।
স্বয়ংদত্তশ্চ শৌদ্রশ্চ ষড়দায়াদবান্ধবাঃ।।
কিছু তো আর বাকি থাইকল না স্যার। তার উপর দোষ দ্যান মুসলমানগ চার বিবি বইল্যা। আরে, অগ তো বিবি। আর আপনাগ তো পুত্রের বিছন। নিজেরডাও পুত্র, বন্ধুরা কইর্যা দিলেও পুত্র, বিয়্যার আগে গর্ভবতীরও পুত্র। স্যা—র।
আশুবাবু থেমে গেলেন। ওঁরা যে-রাস্তা দিয়ে এগচ্ছিলেন সেটাই হেডমাস্টারের বাড়িতে যাওয়ার সরকারি পথ ও ঘুরপথ। কিন্তু ওঁরা যেদিক থেকে আসছিল সেদিক থেকে এটাই সোজা রাস্তা। হেডমাস্টারের বারবাড়ির পেছনে তারা পৌঁছে গিয়েছিল। আশুবাবু থেমে গিয়ে বললেন, ‘যোগা, হিন্দু কাস্ট সিস্টেম ইজ এ ভেরি কমপ্লেক্স ট্র্যাডিশন দ্যাট হ্যাজ কাম ডাউন টু আস ফ্রম ওভার এলং আনডিটারমিন্ড পাস্ট। তুমি যা কইছ হ্যাই কথাডা ফ্যালনা না—সেটা আমি বুঝি। কিন্তু এই বাবুগ কারো কাছে তুমি সংস্কৃত কইয়ো না।’
‘হ্যাঁ স্যা–র।’ ওঁরা বারবাড়িটা ডান হাতে রেখে এগচ্ছিলেন। বাঁ হাতে বিরাট এক দিঘিতে জল টলটল করছে, এই মাঘেও–দিঘির কোণে-কোণে কিছু-কিছু জলজ ফুল ভেসে আছে। যোগেন বলে, ‘বা বা, দিঘি তো কাটাইছেন য্যান মানসসরোবর।’
‘আরে, হাইলি লার্নেড ফ্যামিলি। উনি বেঙ্গল এডুকেশন সার্ভিসে ছিল। এ কী তোমার বারথি ইশকুলের আশু স্যার? শোনো, সংস্কৃত কইয়ো না। দুই-একখান ইংরাজি বরং কইব্যার পারো।’
যাঁর কাছে আসা তিনি, হেডমাস্টার, তার বারবাড়ির বারান্দার এই পুবকোণেই বসেছিল একটা চেয়ারে। ধুতির ওপর একটা চিনে কোট। তার সামনে খুব বড় একটা মাঠ—বাড়ির বারদুয়ার, ঐ দিঘির পাড়েই। সেই মাঠে দুটি বাচ্চা ছেলে-বড়টির রং যেন মাঘের রঙে মিশে যাচ্ছে—হাঁটু পর্যন্ত খোলা ধুতি পরা আর একটা তপন পরা আধবুড়ো গোছের লোকের সঙ্গে খেলছে, মনে হয় ডাংগুলি। যোগেন নিশ্চিত জানে ঐ লোকটি হয় নমশূদ্র বা মুসলমান।
আশুবাবু বললেন, ‘স্যার, আমি আশু মুখার্জি, বারথি তারা স্কুলের।’
শুনেই হেডমাস্টার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন—’বসুন, বসুন, আরে একটা চেয়ার দাও কেউ।’ যোগেন একলাফে বারবাড়িতে ঢুকে একটা চেয়ার নিয়ে এসে দেয় আর একঝলক দেখে নেয় আরো দুটো চেয়ার আছে। উকিলের সেরেস্তার মত দুই চৌকি মেলানো। শতরঞ্চির ওপর শাদা চাদরে ঢাকা। চাদরটা এত ধবধবে নয়। চালের বেড়ার মাঝামাঝি সম্রাট পঞ্চম জর্জের বাঁধানো ছবি টাঙানো—ছবিটা পুরনো। পঞ্চম জর্জের পর তো দুইবার সম্রাটবদলি হইল—অ্যাহন তো ষষ্ঠ জর্জ।
হেডমাস্টার বললেন, ‘আপনার সঙ্গে তো আরো একজন আছেন, মনে হচ্ছে। ওঁর বসার জন্য—’
আশুবাবু বাধা দেন, ‘অরেই তো নিয়্যা আইসছি আপনারে দ্যাখ্যাইতে—’
‘কিন্তু আমার তো দৃষ্টিশক্তি নেই, আমি তো দেখতে পারি না।’
‘স্যার, এ দর্শনে তো চক্ষু লাগে না। আমাগ গ্রামের ছাওয়াল। আমাগ বারথি স্কুলের ছাত্র। এই ভোটে এমএলএ হইছে। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বিএ, বিএল।’
‘এমএলএ কি অ্যাক্রোনিম?’
‘স্যার? এই যোগা, পায়ের ধুলা নে।’
‘এমএলএ কি কোনো, অ্যাব্রিভিয়েশন? কথাটা তাহলে কী? আমি ঠিক জানি না,’ যোগা তার পা ছুঁলে সে বলে, ‘এঁর বয়স কত?
‘কত আর হইব? এহনো চ্যাংড়াই। তিরিশ পাড়াইছে।’
‘উনি কী হয়েছেন? কথাটি কী হল—এমএলএ?’
‘ও। মেম্বার অব দি লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লি। এমএলএ। আমি বুঝি নাই স্যার আপনি এইডা জিগাইছেন। কী যেন কইলেন—অ্যাক্রো না অ্যাব্রো? সেডা স্যার বুঝি নাই।’
‘হ্যাঁ। অ্যাক্রোনিম কথাটি নতুন, ওঁরাও সবে ব্যবহার করছে। এখনো বোধহয় বছর-দুই হয়নি, ওঁরা শব্দটা বানিয়েছে। কিন্তু অ্যাব্রিভিয়েশন তো পুরনো শব্দ—কোনো বড় শব্দ ছোট করে নেয়া, এই যেমন, মিস্টার, মিসেস, এটসেটেরা, মিসলেনিয়াস, বা বেঙ্গল পুলিশের বদলে বিপি এমন শব্দগুলি দিয়ে ওরা নতুন-নতুন শব্দ বানাতে শুরু করেছে, সবে শুরু করেছে—জিবি মানে গ্রেট ব্রিটেন, গক্ মানে জেনারেল অফিসার ইন কম্যান্ড। তাহলে তো ইনি খুবই সাফল্যলাভ করেছেন। মেম্বার অব দি লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লি। কিন্তু কী লেজিসলেট করবেন?
‘ক্যান্ স্যার, আপনারে ভোট দেয়ায় নাই—গত সোমবার দিন?’
‘আমাদের এখানে, এই গ্রামে ভোট হয়েছে?’
‘হইছে তো স্যার। আমরা সবাই ভোট দিছি? আপনারে কেউ তালাশই দ্যায় নাই? দ্যাখছ কাণ্ড!’
‘না। তাতে কিছু হয়নি। কিন্তু উনি, আমাদের গ্রামের মানুষ, আমাদের প্রতিনিধি, এটা তো গৌরবের কথা। একটু বসুন। আমি ভিতরে আমার বৌমাকে খবর দিচ্ছি। এ–ই জুড়ান।’
যে-লোকটি বাচ্চাদুটির সঙ্গে খেলছিল সে ছুটে আসে—‘কত্তা’।
‘বৌমাকে বলো, এঁরা এসেছেন শুভ সংবাদ নিয়ে—’
‘কী নিয়্যা আইসছেন কত্তা?’
‘সুসংবাদ। বলো, ভাল খবর।’
লোকটি ভিতরবাড়ির দিকে দৌড়য়—একঝলক বাচ্চা দুটির দিকে তাকিয়ে। যোগেন বারান্দার মেঝেতে একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে হেডমাস্টারের কথাগুলো বেশ মজা নিয়ে শুনছিল। লোকটি যে ভিতরবাড়ির দিকে ছুটতে গিয়ে বাচ্চাদুটির দিকে একঝলক তাকাল, তাতেই যোগেন বুঝে যায়—তার প্রধান কাজ বাচ্চাদুটিকে পাহারা দেয়া—যাতে দিঘির দিকে চলে না যায়। দিঘির পাড় উঁচু, বাচ্চারা উঠতে পারবে না। যোগেন দৌড়ে বাচ্চাদুটির কাছে গিয়ে তারা যেটাকে গুলি ভেবে নিয়ে ডাং দিয়ে মারছিল, সেই গুলিটা মাঠ থেকে তুলে খেলতে শুরু করে। যোগেন নিশ্চয়ই আগের লোকটির চাইতে বাচ্চাদের কোনো নতুন মজা দিতে পেরেছিল। তারা হেসে ওঠে আর সেই লোকটি ফিরে আসে ‘ভাল খবর’-এর খবর দিয়ে। কিন্তু যোগেন খেলা ছেড়ে যায় না।
‘এই যোগা, এইখানে আয়,’ আশুবাবুর ডাকে যোগেন বারান্দায় ফিরে গিয়ে দেখে—আশুবাবুর হাতে ছোট্ট গোল একটা কাঁসার বাটিতে পায়েস। আশুবাবুর হাতের বাটিটার চাইতেও সুন্দর—ধবধবে শাদা আর সেই শাদার ওপর ফুলকারি একটা এনামেল-করা বাটিভর্তি পায়েস—মেঝের ওপর রাখা, যোগার জন্য। যোগা জানে—এইসব বাটি-থালা বাবুদের ঘরে থাকে খানদানি মুসলমানদের জন্য। তারা কেউ-কেউ হয়ত কাজেকম্মে বছরে দু-বছরে দু-একবার আসেন। তাঁদের দাওয়াত দিতে হয় সম্মানের সঙ্গে। গ্রামের যারা রোজই আসে নানা কাজে কিন্তু যাদের ছোঁয়া জল খাওয়া বাবুগ মানা, তাদের জন্য, মুসলমান-নমশূদ্র-জোলা- কৈবর্তদের জন্য, কলাপাতা তো আছেই। ঐসব জাতের যারা বাড়িতে সব সময়ের কাজ করে তাদের বাসনকোশন তাদের কাছে থাকে—জল খাওয়ার ঘটও।
পায়েস শেষ হতে আর কতক্ষণ?
‘যাই। তাহাইলে, স্যার।’
‘হ্যাঁ, আমি খুবই সন্তুষ্ট হলাম।’
আশুবাবু আর আগের রাস্তায় ফেরেন না। এবার বারবাড়িটাকে ডানহাতে রেখে সোজা যেতে-যেতে বলে, ‘ঠাকুরবাড়ির দুয়ার মাইর্যা রাস্তায় পড়ব, চল্।’
হেডমাস্টারের বাড়ি আর ঠাকুরবাড়ির মাঝখানে খালের মতই একটা গর্ত, বর্ষায় নিশ্চয়ই জল আসে, তার ওপর একটা বাঁশপাতা। আশুবাবু সেটা টলটলিয়ে পার হতে-হতে বলে, ‘একডা ধরার কিছু দ্যায় নাই?’ যোগা তার ওপর একটা পায়ের ভর রেখে টপকে যায়। ওঁরা ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘরের পেছন দিয়ে দুয়ারে ঢোকেন। আশুবাবু চেঁচান, ‘ঠাকুরমশায় কই’। রান্নাঘর থেকে নওমা বেরিয়ে আসেন। ‘দ্যাহেন, ঠাউর্যানি, কারে আনছি। আমাগ যোগা, ভোটে জিতছে।’
‘আ হা হা রে! মামার খ্যাতে বিয়্যাল গাই, সেই সূত্রে মামাত ভাই। উনি আইছেন বারথি থিক্যা যোগারে চিন্যাইতে? অর বংশের কারে চিনি না? অর মাডা বড় ভাল ছিল রে। আমি তো যোগারে ভোট দিয়া আসছি, আমাগ ঘরের ছাওয়াল—তারে ছাইড়্যা কারে দিমু?’
‘আপনারা সব ভোট দিলেন আর হেডমাস্টারমশাই কিছু জানেনই না।’
‘জানান্ তো হয় নাই। উনি তো চোখে দেইখবার পায় না। এখানে তো দৃষ্টিহীনগ ভোট দেওনের ব্যবস্থা ছিল না।’ যোগেন প্রণাম করতে কোমর ভেঙেছিল। নওমা একটু সরে গিয়ে বললেন,
‘অ্যাহন আর ছুইস না গোপাল। ঠাকুর, পূজায় বসছে। নারায়ণের ভোগ রান্ধছি।’
‘তাহালি আমরা চলি অ্যাহন’, আশুবাবু পা বাড়াতেই নওমা বলে ওঠেন, ‘খাড়াও, খাড়াও।’ ছুটে যান বড়ঘরের বারান্দা দিয়ে ঠাকুরঘরে—সবাই চেনে ঐ ঠাকুরঘর। বড় পুরোহিত গ্রামে এই একজনই। নিঃসন্তান। দজ্জাল বলে নওমার নামডাক আছে।
বেলপাতা দুটি আর দুটি গ্যাদা ফুল এনে নওমা বলে, ‘নে বাবা, নারায়ণের আশীর্বাদী নে। আমাগ মুখ উজ্জ্বল কইরছ। যোগা, তোর সেই দানখণ্ডপালা শুইনব্যার গিছিলাম! কী গান যে গাইছিলি বাপ।’ নওমা স্পর্শ বাঁচিয়ে যোগার এক হাতের পাতার ওপর রাখা আর-এক হাতের পাতায় নারায়ণের আশীর্বাদী দেন। যোগা হাত মুঠো করে নিয়ে কপালে ঠেকায় আর আশুবাবুর পেছন-পেছন বেরতে-বেরতে এক কানে ফুল, আর-এক কানে বেলপাতাটা গুঁজে নেয়।
রাস্তায় পড়তেই সামনে শুকনো জোলা—বর্ষায় ভরে যায়। ওপারে রায়দের পাকা বাড়ি। বাইরে ঢাকা বড় বারান্দা। আশুবাবু সেদিকেই হাঁটেন—’রায়গ ক্যামন ছত্রখান ব্যবস্থা। বড় ছাওয়াল তো পাগলাছাগলা। নটীবাড়ি পইড়্যা থাহে। আর মাইঝ্যাল ছাওয়াল গান্ধী কইর্যা জ্যালে।’
রায়মশায় বেত-ছাওয়া একটা বড় চেয়ারে, একটা হাতলের ওপর দুই পায়ের আঙুলগুলো জড়িয়ে প্রায় শুয়েই ছিল। তার মাথার ওপর চেয়ারের মাথা আর সারা শরীর মোটা গরম চাদরে ঢাকা। পোর্টিকোতে উঠে আশুবাবু বলে, ‘রায়মশায়, ঘুমাননি?’
‘না। জাগ্রতই আছি।’
‘যোগেনরে নিয়্যা আইল্যাম আপনার লগে দেখা করাইতে?’
‘ক্যা? আমার কি ল্যাজ গজাইছে? আর মণ্ডলের বেটার ল্যাজ অ্যাহনো তো খসে নাই, গাছেই তো থাহে।’
‘অয় তো জিত্যা এমএলএ হইছে।’
‘হয়, জানি, ঐ নেড়াগোর সাথে শুদ্দুরগুল্যার মিল করাইয়্যা কংগ্রেসের অমন একখান নেতারে যে হারাইল—সেডাই তো গ্রামের লজ্জা।’
অস্বস্তিকর নীরবতা রায়মশায়ই ভাঙেন—’ভিতরবাড়ি যাও। ঠাউরানি গিছেন কুমিল্ল্যায়। সুবর্ণ আছে।’
আশুবাবু সিঁড়ি বেয়ে নামেন। অপমানিত বোধ করেন। সে একে টিচার, তার ওপর ব্রাহ্মণ। বামুনকে ভিক্ষা দেয়ারও একটা রীতিপ্রকরণ আছে। সে ছাত্রগর্বে যোগেনকে নিয়ে ঘুরছেন বলে সে তো আর চাঁড়াল হয়ে যাননি যে রায়মশায় তাকে ভিতরবাড়ি দেখায়। সুবর্ণ কার্যত ওঁর রক্ষিতা। নমশূদ্র মেয়ে—পঁচিশ বছর ধরে আছে, সে-ই এ-বাড়ির কর্ত্রী। রায়মশায় তাকে সুবর্ণের কাছে যেতে বলতে পারেন? কিন্তু ভিতরবাড়ি ঢোকার পথ ডানহাতি। আশুবাবু যদি না যান তাহলে সেটা রায়মশায় দেখতে পাবেন। রায়মশায়ের চোখের ওপর দিয়ে ডাইনে না-ঘোরার সাহস আশুবাবুর নেই। সে ভিতরবাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুই ঘুইর্যা আয়। আমি যাইয়্যা কী করব?’
যোগেন দৌড়ে ভিতরে যায়। কোঁকড়ানো চুলে, খাটো জামায়, খাটো কোঁড়া ধুতিতে এই দৌড়টা তাকে মানিয়েও যায়। সে ডাকতে শুরু করে, ‘মামি কই, বর্ণমামি, অ বর্ণমামি।’
তার ডাক শুনে ঘর থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে সিঁড়ি, সিঁড়ি বেয়ে দুয়ারে নেমে আসেন সুবর্ণ, কাঁচাপাকা চুল, যেন আরো দিঘল, গায়ের কাল রঙে যেন রোদ ঠিকরচ্ছে। সুবর্ণমামি তো বারবারই নীলরঙের কালীঠাকুরের মত সুন্দর। চুলডা কোমর ছাপিয়ে নেমেছে। আর, চোখ দুটো যেন চিলের ডানা মেলছে। বরাবরই যোগার মনে হয়—যে যাই কক্, সুবর্ণমামিরে দেইখতে যেমন তাতে রায়মশায়ের ঘরেই মানাইছে, ও আমাগ ঘরে আমরা রাইখতে পারত্যাম না। কথাডা কখনো যোগা কয় নাই। এইসব কথা কহাবলা যায় নাকী। যোগার মায়ের বাড়ি যে-গাঁওয়ে তার এক আধবুড়ার লগে বিয়া হইছিল সুবর্ণর। সেই সূত্রে যোগার মামি। রায়মশায়ের এই বাড়িডার আসল ঠ্যারান তো মামিই। সব ছাওয়াল-পাওয়াল-বৌরা মানে, ডরায়।
সুবর্ণ যোগেনের মাথা বুকে নিয়ে কেঁদে ওঠেন, ‘শ্যাষে তুই দুধের ছাওয়াল করলি তারকারে বধ। আমাগ জাইতের এতখান গর্বের কথা শুইনছে নাকী কেউ কুনোদিন? যোগা, তুই তাহালি মামিরে ভোলস নাই?’
যোগেনের খুব ভাল লাগছিল মামির বুকে। এমন নরম, কোমল, সুবাসিত বুকে সে কখনো মাথা রাখেনি। কিন্তু মামি চোখের জল মুছতে ও নাক ঝাড়তে মাথাটা ছেড়ে দিল। ‘মামি, আইজ যাই, আশুস্যার বাইরে খাড়ায়্যা আছে—’।
‘খাড়া, খাড়া এডডু’ সুবর্ণ আবার অতগুলো সিঁড়ি ভেঙে বড় বারান্দায় উঠে যান, কয়েক পা হেঁটে একটা ঘরে ঢুকে যান। সে-ই ঘরে ঢোকার সময়ই যোগেনের মনে হয়, সুবর্ণমামির যেন পায়ে আলতা থাকার কথা। কেন-যে মনে হল, সেটা যোগেন বোঝে, মামি নেমে এসে ‘দ্যাহ, ছেলে আইছে ক্যামন, ধুতির কোঁচা পাত্, যোগেনের ধুতির কোঁচা নারকেলের চিড়া, বরফি, নাড়ু, তক্তি, চন্নপুলি, খেজুরা গুড়ে মাখা মুড়কি একেবারে ভয়ে যায়—’আরে, এগিলা খাবে নে কেডা?’
‘ছাওয়াল-পাওয়ালরে দিস। আমার নাম কইরা দিস।’
যোগেন ঘুরতেই মামি যোগেনের জামার বুকপকেটে কয়েকটি নোট ঢুকিয়ে দেয়। যোগেন ভুরু কুঁচকে জিগগেস করে, ‘টাহা দ্যাও ক্যা?’
মামি যোগেনকে দরজার দিকে ঘুরিয়ে বলে, ‘তরে দিছি। অ্যাহন তো তোর কত খরচ। করবি কোখ্যা সে-কথা কেউ বুঝে?’
‘সে তো খরচা আছেই। তুমি তার কী করবা?’
‘যা পারি যহন আসবি, দিব।’
যোগেন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই মামি পেছন থেকে ডাকে, ‘যোগা–আ, হোন।’ যোগেন যে-দুপা গিয়েছিল সেখানে দাঁড়িয়ে ফেরে। সুবর্ণও এগয় না। যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকেই বলে, ‘রায়কর্তা কইছিল, তোরা নাকী মুসলমানগ সঙ্গে মিল্যা শাহেবগ পক্ষে কংগ্রেসের বিপক্ষে? এইডা তো কংগ্রেসের বাড়ি। বটুক তো জেলে। তোরা মাঝেমইধ্যে শাহেবগ বিপাকেও দুই-চাইরডা কথা কইয়্যা থুস। না-হয় তো আমারে রায়কর্তা ঠ্যাস দিয়া-দিয়্যা কথা কন।’
আশুবাবু ও যোগেনকে পোর্টিকোর সামনে দিয়েই ডানদিকে ঘুরতে হয়। ওদিকে যে ঘোরা হবে, সেটা যোগেনের জানা ছিল না। আশুবাবুই ঠিক করেছিল, কবরেজবাড়ি সেরে চুনাবাড়ির পেছন দিয়ে আবার রাস্তায় উঠবেন।
রায়দের বাড়ি পেছনে আড়াল হয়ে যেতেই যোগেন বলে, ‘স্যার, মামি তো আমার কোঁচর ভইর্যা যা দিছে তা খাইয়্যা শ্যাষ কইরতে দিন তিন লাইগব, একা-একা খাইলে। একডা মুখে দিবেন না কী স্যার’, বলে যোগেন কোঁচর খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেদিকে না তাকিয়ে আশুবাবু প্রায় যেন চিৎকার করে ওঠেন, ‘উনি ভাইবছেনডা কী? য্যান উনি একাই বামুন। তাও তো সিলেটি বামুন। আমি তো রাঢ়ী কুলীন। আমারে ভিতরবাড়ি দেখায়? থো তোর নারকোলের তক্তি। ওর এডডাও আমি ছুব ভাবছিস?’
যোগেন খুব জোরে হেসে ওঠে, ‘স্যার, বামুনগ নিজেদের মইধ্যে এই বর্ণভেদডা তো জলচল-অচলের থিক্যাও রগড়ের। স্যার, বামুনগ নিজেগ জাতপাত টাইট কইর্যা নিয়্যা তার বাদে শুদ্দুরগ শুদ্দুর কইরলে ভাল হইত।’
‘অ। আইলেন আমার নতুন রঘুনন্দন।’
আশুবাবু রেগে থাকায় ছোট-কবরেজমশাই বাড়িতে নেই শুনে আর ঢুকলেনই না। রাস্তায় নেমে ফিরে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘ছোড কবরাজমশায় রে কইয়া দিয়ো যোগেন মণ্ডল এমএলএ-রে লইয়্যা আসছিল্যাম বারথির আশুমাস্টার।’
চুন্যাবাড়ির পেছন দিয়ে একটু জঙ্গল ভেঙে রাস্তায় উঠে পশ্চিমে পা বাড়িয়েই আশুবাবু উলটোদিকের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থেমে যান, ‘আরে, রায়বাহাদুর আইছেন—পছন্দ হয়। আয় তো, দেইখ্যা যাই।’
‘এইডা নিয়্যা?’ যোগেন তার ফোলা কোঁচড় দেখায়। তলপেটের নীচে, জিনিশটা খারাপই দেখাচ্ছে।
‘আরে, রায়বাহাদুর তো আবার শাহেব রে! এইডা তো তোর কোঁড়লের লাগান দেহায়। কাঁধে ফেল।’
‘ধুতিডা তো খাটো। কোঁচড় কান্ধে ফেইললে তো বাবা মহাদেব ব্যার হয়্যা পড়বে নে!’
‘হাজারবার কইল্যাম—জুতা-ধুতি-পাঞ্জাবি পইর্যা আয়। তো মার কইলেন উনি মাটির সন্তান হইবেন। তো হ ঐ কোড়ল লইয়্যা।’
‘ছাড়ান দ্যান না। আমি পরে আইস্যা রায়বাহাদুররে ভক্তি দিয়্যা যাব।’
‘তাহালি আমার বংশপরিচয়ডা উনি জাইনবেন ক্যামনে যে আমি এমন প্রাতঃস্মরণীয়ের মাস্টার।’
‘কন কী স্যার? রায়বাহাদুরের এইসব জানা নাই?’
‘না, না। আইসছি যহন, দ্যাখা সাইর্যাই যাই। তুই ঢোকার সময় কোঁচড়ড়া পিছনে নে আর বসার সময় কোলে নিস। রায়বাহাদুর আছেন নি?’
একটি মেয়ে দরজা খুলে দিল। যোগেন বলে ওঠে, ‘অরে টুনি, তুই অ্যাহন নি এই বাড়িত?’
‘হ্যাঁ। সে অনেকদিন হইল তো। জয়াদিদির ছাওয়াল হইল না?’
‘জয়াদিদি কনে?’
‘স্যায় তো ঝালকাঠি। ফিইর্যা আইসব। আইসো যোগেনদাদা। তুমি তো ভোটে জিছ? বসো। কত্তারে ডাকি? যোগেনদাদা, আমি তোমাক ভোট দিছি। মাইয়্যাছাওয়াল তো খুব কম। তাই লজ্জা লাগে। বসো, কত্তারে ডাকি?’
যোগেন একটা সুযোগ পেল, তার কোঁচড় লুকিয়ে মেঝের ওপর বসতে।
‘ও কী যোগেনদাদা। মাটিত্ বইসল্যা ক্যান? তুমি আমাগ মইধ্যে একখান মানুষ। তুমি মাটিত্ বইসলে তো আমাগ বসাশোয়ার জইন্য গর্ত খুঁইজব্যার লাগব। সমানে-সমানে বসো।’
