1 of 4

১৮. যোগেনের সংবর্ধনা

১৮. যোগেনের সংবর্ধনা

‘আরে যোগা, তোর কানে ঢুকে না?’

ছোটখুড়ো এসে দাঁড়ায়। যোগা চোখ না তুলে বলে, ‘খাড়াও’।

ছোটখুড়ো দেখে তক্তাটা ফালা হয়ে যেতে আর দুই-চার ঘষা মাত্র দরকার। ১৮ ছোটখুড়ো দাঁড়িয়ে থাকে যতক্ষণ-না তক্তাটার একটা ফালি নিচে পড়ে যায়।

‘যা, যা, তোর মাস্টার আইছে। সেই আশুবাবু।’

‘আশুবাবু স্যার? আরে কও কী?’

‘তুই যা না। আমি এহ্যানে যা করনের করি।’

‘আশুবাবু’, বলতে-বলতে যোগেন নৌকোর গলুই পেরিয়ে দুয়ারে ঢুকে দেখে—সত্যি, আশুবাবু স্যার তাদের দাওয়ায় বসে আছেন আর বাড়ির সবাই তার সামনে দাঁড়িয়ে। ধুতির খুঁটে মুখের ঘাম মুছতে-মুছতে প্রায় ছুটে এসে, ‘স্যা–র’, বলে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে, আশুবাবুর দুই পায়ের ওপর মাথা নামিয়ে আনে আর দুই হাতে তার পা জড়িয়ে থাকে, কিছুক্ষণ। আশুবাবুর চোখে জল। যোগামা শাড়ির খুঁটে সশব্দে নাক ঝাড়ে। যোগেনের কোঁকড়ানো কুচকুচে বাবরি চুলে দুই হাত রেখে, আশুবাবু বলে, ‘ওঠ, অ্যাহ, ওঠ’।

‘আপনারে স্যাবা দেয়া কি যোগার শ্যাষ হয়? গৌর রে—’

যোগামা বলে ওঠে।

যোগেন মুখ তুলে ওখানেই হাঁটু বেড় দিয়ে বসে, মুখটা বাঁয়ে-ডাইনে ঘাড়ে ঘষে চোখদুটো মুছে নেয়। যোগেনের দু-কনুই পর্যন্ত কাঠের গুঁড়ো, দুই পায়েও। সে তার সারা মুখটায় হাসির জ্যোৎস্না ছড়িয়ে বলে, ‘স্যার আপনি আইলেন ক্যান এই কোরস রাস্তা ভাইঙ্গ্যা? আমি তো যাইত্যামই। দাড়ি রাইখছেন ক্যান স্যার? পরামানিকরা নাই নাকী?’ যোগেনের হাসির বাহার যে কত! এই যেমন চোখে জল, হাতে মাটি আর মুখটায় স্থলপদ্ম ফুটে ওঠার হাসি। আবার যখন বুক খুলে, গলা খুলে, সারা শরীর দুলিয়ে হাসে তখন মনে হয় বটগাছে ঝড় ঢুকেছে। যখন যোগেন মুখ টিপে হাসে তখনো ধরা পড়ে যায় সে মনে-মনে কোনো বুদ্ধি আঁটছে বা তার ভিতরে-ভিতরে রাগ কাঠপোড়া আগুনের মত ধিকধিক করছে। এটাই বোধহয় যোগেনের সবচেয়ে বড় গুণ—দেখলেই মনে হয়, লোকটার ভিতর কোনো ছলনা নাই, সে নিজেকে একেবারে মেলে দেয়, রোদের মত।

আশুবাবু বলে, ‘অ্যাহন তোরে আমার দাড়ির কথা ভাইবব্যার লাগত না। দ্যাশের দাড়ির কথা ভাব্‌!’

‘স্যার, কন কী, দ্যাশের দাড়ি?’ যোগেন মাটির ওপর চড় মেরে ডিগবাজি খায়, হো-হো হাসি থামিয়ে বলে, ‘স্যার, সবাই কয় দ্যাশসেবা, দ্যাশভক্তি, দ্যাশোপ্রেম। আর আপনি কইলেন—দ্যাশের দাড়ি। দ্যাশের দাড়ি কাটা হবে—পরামানিক যোগেন মণ্ডল।’

যোগামা একটি জামবাটিতে—সেই যে-জামবাটিটি যোগা তার বাবার মাথায় ফেলেছিল— মুড়ি আর গোটাদুয়েক কাঁচালঙ্কা দেন। আশুবাবু বলে ওঠেন, ‘মুড়ি খাওয়ার দাঁত নাই, খাব ক্যামনে?’ ছোটখুড়ি চাপা স্বরে বলে, ‘অ্যাহন তো মানুষ আইসবই, ঘরে কিছু তো থোয়া লাগে।’ আশুবাবু তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, ‘আমার নাগাল দাঁতনড়া লোক আর কয়ডা আইসব? যারা আইবো তাগ দাঁত আছে, মুড়ি চিব্যাবার পারব। আমার না-হয় দুগা খৈ দ্যাও।’

ছোটখুড়ি এসে মুড়ির বাটিটা তুলে নিতে গেলে যোগেন সেটার দিকে হাত বাড়ায়, ‘মুড়ির বাটিটা ফ্যারত্ নেওনের কী হইল। আমাগ তো দাঁত আছে।’

‘চুপ যা তো বোকাডা। মুড়ি নিবি তো নে, কোঁচড় ফ্যাল, বাটি ছাড়, মাস্টারবাবুরে কি খৈ দিব কলাপাতা কাইট্যা?’ যোগেনের মেলে ধরা ধুতির কোঁচায় ছোটখুড়ি মুড়ির বাটি উপুড় করে যায়। যোগেন, ‘আরে, সরষ্যার ত্যালও দিছে দেহি।’ যোগেন মুড়ি মাখতে থাকে। আরো দু-চারজন এসে মুড়ি খেতে শুরু করে। যোগেন একটা কাঁচালঙ্কা এককামড়ে অর্ধেক করে। ইতিমধ্যে ছোটখুড়ি সেই জামবাটিতেই খৈ আর বাতাসা এনে আশুবাবুর পাশে রাখে।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়—বারথি তারা ইনস্টিটিউশনের ইংরেজির মাস্টার ছিল। জলিল মাস্টারের পাঠশালার পড়া শেষ হলে তো যোগার কাজকামে নেমে পড়ার কথা। পাঠশালে তো আর ক্লাশ-টেলাস ছিল না। ঐ বর্ণপরিচয়, হস্তলিপি, ধারাপাত আর আর্যা শিখতে-শিখতেই ছাত্ররা পড়া ছেড়ে কাজে জুড়ে যেত, তারপর, একে-একে যুক্তাক্ষর, ব্যঞ্জনবর্ণ, স্বরবর্ণ ভুলতে-ভুলতে নিজের নাম লেখাটাও ভুলে যেত। একে-একে ছাড়ত আবার একে-একে এসে বসত। এটাই বরাবর চলে আসছে। যোগেন কোনো কাজে লাগার আগেই এই সবগুলো শিখে তো ফেললই, মনেও রাখল। জলিল মাস্টারের পাঠশালের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ঘটনা যে যোগেন কড়াকিয়া ও পঁচিশের নামতা পর্যন্ত বলতে পারত, যোগ ও বিয়োগ অঙ্ক করতে পারত ও যদিও সে গুণভাগ শেখেনি তবু শুভঙ্করের আর্যা অনুযায়ী এক কাঠা জমির এক-ক্রান্তির হিশেব পর্যন্ত মুখে-মুখে করে দিত, ছটাক-পাইয়ের তো কথাই নেই। এক পণ-এর হিশেবের গোলমালটা যোগা ধরতে পারত না। তাতে যোগার কোনো দোষ নেই। বরিশালে সুপুরির পণ ষোল গণ্ডায় আর আলুর পণ কুড়ি গণ্ডায়। যোগা যা শিখেছে, তা যে কাজে লাগছে—এটাই সকলের কাছে তার শিক্ষার প্রমাণ। অগত্যা তাকে ক্রোশখানেক উত্তরে বারথি তারা স্কুলে ভর্তি করা হল। মাস্টারমশায়রা ওকে ক্লাশ ফোরে নিয়ে নেন। কিন্তু বংশের প্রথম ক্লাশ ফোরে পড়া ছেলের পড়া চালিয়ে যাওয়া এতই কঠিন যে যোগাকে স্কুল ছাড়তে হল। কিন্তু যোগা বছর খানেক পরে ফিরে এল। স্কুল ছেড়ে দেয়ার পর স্কুলে ফিরে আসা যোগাদের সমাজে কল্পনারও বাইরে। সম্ভব যে হয়েছিল তার প্রধান কারণ নিশ্চয়ই যোগার নিজের জেদ, দ্বিতীয় কারণ যোগামা আর যোগার মা—এই দুজনের জেদ। সেই জেদেও কাজ হত না, যদি আশুবাবু যোগার বাবাকে এক হাটে পেয়ে বকে না দিতেন। আশুবাবুর বকার কোনো কারণ ছিল না—যদিও ক্লাশ ফোরেই এটা সবাই বুঝেছিল—যোগা পড়াশুনোয় খুবই ভাল। সে-বোঝার জোরে আশুবাবু রামদয়ালকে এমন ধমকে উঠতেন না, ‘তোমাগ কোনোদিন কোনো উন্নতি নাই। সেই আদিকাল থিক্যা তো তোমাগ সমাজে অক্ষরজ্ঞান গোমাংসতুল্য। বাড়িভর্তি অতগুল্যান মূর্খ লইয়্যাও তো প্যাটের ভাত জোটে না। একখান ছাওয়াল অ্যাডডু লিখাপড়ায় মন লাগাইছিল—সেডারেও স্কুল থিক্যা ছাড়াইয়া গোয়ালে পুরলা। স্কুলে পাঠাইয়্যা দিও যোগারে।’ যোগার বাবা রামদয়াল খুবই ঠান্ডা, কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথাই বলতে পারেন না আর কেউ যদি পরিষ্কার হুকুমের গলায় কোনো কথা বলে—রামদয়াল সঙ্গে-সঙ্গে সেটা মেনে না নিয়ে পারেন না। রামদয়াল আড়ালে-আবডালে থেকে কোনোরকমে টিকে যেতে চান। এই ভয়েই রামদয়াল সব সময় কাঁটা—কারো কাছে কী দোষ করে ফেললেন, বুঝি। আর বামুন-কায়েত বা নায়েব-গোমস্তাকে দূর থেকে দেখলেই রামদয়াল সরে পড়েন। হাটের ঐ ভিড়েও রামদয়াল যে আশুবাবুর চোখে পড়ে গেছেন, এটাই তার নিজের কাছে প্রায় পরশুরামের মায়ের ধরা পড়ে যাওয়ার অপরাধ। তার ওপর আশুবাবু যে যোগাকে স্কুল-ছাড়ানোর জন্য রাগ করলেন—তাতেই রামদয়ালের নিজেকে নরকের জীব মনে হয়েছে। তারও পরে আশুবাবু যখন হুকুমের সুরে যোগাকে স্কুলে পাঠাতেন বললেন, রামদয়াল হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। যাক, হুকুম একটা হয়েছে। সেই সন্ধ্যাতেই রামদয়াল যোগাকে স্কুলে পাঠিয়ে দিতে পারলে স্বস্তি পেতেন। পরের সকাল পর্যন্ত তাকে এমন করে থাকতে হয় বা ঘুমোতে হয় যেন সে সেখানে নেই।

আশুবাবুর যে খেয়াল ছিল যোগা আর স্কুলে আসছে না, তারও একটা কারণ ছিল। বারথি ব্রাহ্মণপ্রধান গ্রাম বললেও কম বলা হয়, বলা উচিত বারথি একেবারে ব্রাহ্মণ গ্রাম, ব্রাহ্মণ ছাড়া কিছু নেই। সে-ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেক জমিদার-জোতদার-তহশিলদার আছে, চালকলা-বাঁধা পুরুতও আছে আবার গাঁজা-ভাঙ খেয়ে খারাপ জায়গায় পড়ে থাকা মহাজনপুত্রও আছে। বারথির হাওয়াতে একটা বামুনগুমোরের গন্ধ ছিল। সেখানে ক্লাশে একমাত্র নমশূদ্র ছাত্র হয়ে থাকা যোগার পক্ষে কঠিন ছিল। পরে, অবিশ্যি যোগা পুরো স্কুলেরই একমাত্র ‘চাড়াল’-ছাত্র হয়েছিল। আশুবাবুর ক্লাশেই তিনি দেখেন দুই নম্বর সারির কোণের দিকে যোগার সঙ্গে তার পাশে বসা ছাত্রদের যেন একটু ঠেলাঠেলি হচ্ছে আর তাদের পেছনের বেঞ্চের ছেলেরাও বেঞ্চির তলা দিয়ে পা চালিয়ে যেন যোগাকেই খোঁচাচ্ছে। আশুবাবু তাদের কাছে গিয়ে, কী হয়েছে, জানতে চাইলে চক্রবর্তী বাড়ির ছেলেটি বলে উঠল, ‘স্যার, ও কিছুতেই কথা শুইনতেছে না।’

‘কী কথা?’

‘ওকে বারবার কইব্যার লাগছি—অন্য একডা বেঞ্চে গিয়া বোস।’

‘কী হয়েছে?’

আশুবাবু যোগাকে জিজ্ঞাসা করতেই যোগা বলে, ‘স্যার, এঁরা আমারে কইছে শুদ্দুর হইয়া তুই আমাগ সঙ্গে বসিস ক্যান? আমি কইছি—স্কুলডা শুধু তোমাগ লাইগ্যা বানান্ হয় নাই। আমাগ লাইগ্যাও হইছে।’ আশুবাবু ঐ বামুন ছেলেদের ওপর মনে-মনে খুবই ক্ষেপে গেলেন। কিন্তু খুব একটা কিছু বলতে সাহস পেলেন না—কী যেন, কোন্ কথা কীভাবে রটবে আর বামুনরা একজোট হয়ে তাকে বিপদে ফেলবে। মাত্র এইটুকুই বললেন ‘যে ও যেখানে বইসছে সেখানেই বসব, তোমরা যদি চাও অন্য বেঞ্চে যাও।’ এই ঘটনার কিছুদিন পর থেকেই যোগাকে আর স্কুলে না দেখে আশুবাবুর মনে হল—এই বামুন-ছেলেগুলোই বোধহয় ঐ শূদ্র ছেলেটিকে তাড়াল, তার যেন উচিত ছিল আর-একটু সাহস দেয়া যোগাকে। ফলে যোগা স্কুলে ফিরে এলে স্বস্তি পেলেন। তারপর অবিশ্যি যোগাকে কারো ওপরই নির্ভর করতে হয়নি। সে যে স্কুলের সবচেয়ে ভাল ছেলে—এ নিয়ে কারোই কোনো প্রশ্ন ছিল না। তার ক্লাশে আশুবাবু যোগাকে পড়া ধরতেন না। অন্য উচ্চবর্ণের ছাত্ররা যখন পারত না, একমাত্র তখনই যোগাকে উত্তরটা দিতে বলতেন। ক্লাশ এইটে একদিন এরকম একটি ঘটনায় আশুবাবু যোগাকে বললেন, ‘তাইলে মণ্ডলমশায়, তুমিই বলো।’ আশুবাবু ক্লাশের এমন পরিস্থিতিতে যোগাকে ‘মণ্ডল’ বলেই ডাকতেন, বামুনদের একটু ঠাট্টা করতে। সেদিন প্রশ্নটা যোগার পক্ষে সহজই ছিল কিন্তু যোগা পড়া করে আসেনি বলেই উত্তর দিতে পারল না। আশুবাবুর মনে হল—যোগা তাকে অপমানে ফেলে দিল। যত ভাল ছাত্রই হোক, সে একদিন একটা প্রশ্নের জবাব তো নাই দিতে পারে। কিন্তু আশুবাবু যে যোগাকে ‘মণ্ডলমশায়’ বলে ডাকলেন, ‘তাহলে তুমিই বলো’ বললেন, এতে একটু অহংকার ছিল। অপ্রস্তুত হয়ে বলে ফেললেন, ‘ও, ভুইল্যা গিছিলাম, এডা তো ক্লাশ এইট, তোমার তো তাইলে উচ্চশিক্ষা হইয়্যা গিছে। এর বেশি আর তোমার কী হইব?’

আশুবাবুর কথার মধ্যে যোগেনের নমশূদ্র-পরিচয় ইঙ্গিত ছিল। তেমন ইঙ্গিত হয়ত সে দিতে চাননি। তবে তিনিও তো ব্রাহ্মণ। হয়ত-বা, নিচু জাতের মধ্যে শিক্ষাসভ্যতার বিস্তার হোক—এটা মন থেকেই চাইতেন। হয়ত, নিজেকে এমন করেই দেখাতে চাইতেন যে ব্রাহ্মণ হলেও একজন উদার হতে পারে। বা, এর বিপরীতটা—ব্রাহ্মণত্ব যার স্বধর্ম, সে ব্রাহ্মণ, যেমন অন্যবর্ণ যার স্বধর্ম সেও ধার্মিক। বা, হয়ত নিজের ব্রাহ্মণত্বে তার গৌরববোধ ছিল ও সেই গৌরববোধকে নিজেরই কাছে প্রামাণিক করে রাখতে প্রচলিত হিন্দু বামুনদের থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র রাখতেন। তার হয়ত হিন্দু না-হলেও চলত কিন্তু ব্রাহ্মণ না-হলে চলত না। এইসব আনুমানিক আত্মপরিচয়ের যে-কোনোটিতে, বা এক-এক সময় এক-একটিতে, থিতু হতে, যোগেন হয়ত হয়ে উঠেছিল তার অবলম্বন ও যুক্তি, দুইই। যোগেন তুচ্ছ একবারও যদি তার মুখ রাখতে না পারে, তাহলে তাকে জাতের ইঙ্গিত করতে আশুবাবুর বাধেও না, মনস্তাপও হয় না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *