১৬. মিলনশয্যায় যোগেনের জাগরণ ও কিছু পুরনো কথা
পরের দিন সকালে, শুক্রবারে, যোগেনের ঘুম ভাঙে একটা কাঠচেরার আওয়াজে। একটু চমকেই চোখ খোলে। চমকে তাকে মনে করতে হয়—মৈস্তারকান্দির বাড়িতে ঘুম থেকে উঠেছে। কাইল রাত্তিরে না বৌ শুইছিল পাশে, কথাও য্যান দুই–একখান হইছিল, হ্যায় গেল কই। তার বৌ যেখানে শুয়েছিল বলে তার আন্দাজ হচ্ছে—সেখানে তাকিয়ে দেখে, কোনো চিহ্নও নেই। চিহ্ন না দিলে আর চিহ্ন আইব কোথন? রাত্তিরে লম্ফর আলো তো যোগেনই ফুঁ পাইড়া নিবাইল। না? যা ধোঁয়া বারাচ্ছিল! মাচায় উইঠ্যা আন্দাজ হইল মাচায় আরো য্যান কেডা। সে তো কেউ-না-কেউ শুব্যারই পারে। তবু, য্যান ক্যান যোগেন জিগ্যায়া ফেইল, কেডা? ক্যান জিগাইল? জায়গা একখান পাইছে, কাইত হইয়্যা চক্ষু মুইদবে আর বিহানে চক্ষু খুইলবে। আর মইধ্যে ‘কেডা’ জিগ্যাইবার আছেডা কী? একডা কিছু কি নিশানা ছিল? লম্ফর ধোঁয়ার গন্ধে য্যান এডডা বাস মিশ্যাইয়া ছিল না? হয়। পরে তো সেই বাসখান চিনাও গেল—নতুন কাপড়ের বাস। ঐ নিশানাতেই কি কয়্যা উঠছিলাম—কেডা। হা রে যোগেন মণ্ডল, নিজের বৌয়ের নিশানা চিনো না, অ্যাহন ঘুম থিক্যা উইঠ্যা নিশানা খুঁজো?
যোগেন উঠেও মাচার ওপর বসেই ছিল—যেন ঘুম শেষ হয়নি। কাল রাত্রিতে বৌয়ের সঙ্গে শোয়ার স্মৃতিতে যোগেনের ঠোঁটে সামান্য হাসি আসে। যোগেনের মনে-মনে কোনো প্রত্যাশা ছিল না? অভ্যাস নাই তো বৌয়ের সঙ্গে শোয়ার। আইজও শুবে তো? আরে, মুখডাই তো মনে থাকে না। তবু তো এগার বছরের পুরানা বৌ।
বাইরে ছোটখুড়ার গলা ওঠে, ‘যে মানুষগুলা ওডারে ভোট দিছে, তা গ আইন্যা দেহাও, তাগ মেম্বার এই চনচনা বেলাতও চৌকিদারের নাগাল ঘুমায়, য্যান সারা রাত্তির পাহারা দিছে। দেইখলে তো তারা ভোট ফিরাইয়া নিয়া যাব।’
ছোটখুড়ো যতক্ষণ কথা বলে, করাতের আওয়াজ পাওয়া যায় না। ছোটখুড়োই তাহলে করাত চালাচ্ছে?
‘হ্যার ঘুম হ্যায় ঘুমায়, তোমার তাতে কী। ঘুমাইয়্যা ঘুমাইয়্যাই বামুন-কায়েতগ চিৎ কইর্যা এই ভোটখান তো জিত্যা আইল? ছাওয়ালপাওয়ালের আরাম তোমার দুই চক্ষুর বিষ’–যোগামা-কে থামায় কে? না। তাহলে ছাওয়ালপাওয়ালের আর ঘুমানো ঠিক না। ঘরের ঝাঁপটা টানা ছিল—যোগেন বাঁয়ে ঠেললে ঝাঁপ নড়ল না। তাহলে কি সে ভুলে গেছে, কোনদিকে ঠেলে খোলে। যোগেন ডানদিকে ঠেললে ঝাঁপ নড়ল না। যোগেন নজর করে খোঁজে, ভিতর থেকে কোনো বাঁধন আছে কী না। নেই। কিন্তু ভিতরে বাঁধন দেবে কে? ভিতরে তো সে একা। তাহলে বৌ বেরল কোথা দিয়ে? বৌ তাহলে বেরিয়ে গিয়ে বাইরের বাঁধন লাগিয়ে দিয়েছে? যোগামা বা খুড়িমা কেউ লাগিয়ে দিতে বলেছে—যাতে যোগেন ভাল করে ঘুমুতে পারে? বৌ নিজেও তো পারে—লাগিয়ে যেতে। পারে না? যোগেন হঠাৎ ভাবতে বসে—তার বৌ কমলার বয়স এখন কত হতে পারে? সে আর কী করে জানা যাবে? বছর বার আগে বিএ পড়ার খরচা জোগাতে যে-মেয়েটিকে বিয়ে করেছিল, তাকে তো তখন ভাল করে দেখতেই পায়নি, সে তো তখন ঘুমে কাদা-সাত-দশ যে-কোনো বয়সই মেয়ের হতে পারে।
যোগামা-র কথায় ছোটখুড়া চাপা গলায় বলে উঠেছে—’এর মইধ্যে বামুন-কায়েতের কথা উঠে কোথিক্যা? কে কী শুইন্যা কী রটাইব, ছাওয়ালডার বিপদ হওয়া পারে। আরে, হাজারবার-না কইল্যাম—অ নমশূদ্র সিটে খাড়ায় নাই, বামুন-কায়েতের সিটে খাড়াইছে—’
‘যোগা কি বামুন হইছে?’
‘আরে, এড্ড়া কথা মাথায় ঢুকে না?’
‘ঢুকাইব্যার পার না, তাই কও। মাথা তো খুলাই আছে। সব কথা ঢুকে আর তোমার এই কথাখানই ঢুকে না? আমি যোগাইরে জিগ্যাব।’
‘তাই জিগ্যায়ো। তুমি তো হাকিম। উকিল-ব্যারিস্টারের কথা ছাড়া তোমার মাথায় ঢুকে না। যা জিগ্যাইব্যার যোগারে জিগাইও। মাথা খুল্যা রাখো, জিভখান্ খুইলো না।’
যোগেন আন্দাজ করে ফেলে, তাহলে তো কমলার বয়স এখন উনিশ-কুড়ি কিছুও হতে পারে। তাহলে কমলাই তো ঝাঁপটা বন্ধ করে থাকতে পারে। এতে যোগেনের বেশ ভাল লাগে। তাহলে কমলাই তো খুলে আসবে—এটা কি তেমন নিশানা।
যোগেন কি ‘টকি’ ভাবতে শুরু করেছে? শুধু শরীরের বয়সে কি ঐ নিশানা জানা যায়? যোগেন বেশ জোরে বলে ওঠে, ‘যোগামা, আমারে কি ঘরে আটকাইয়্যাই থুবা? ঝাঁপ খুলো।’
‘এই, যোগার ঝাঁপ লাগাইছে কেডা? খুইল্যা দ্যাও।’
যোগেন বেরতেই তার যোগামা জিজ্ঞাসা করে, ‘যোগা, তোর তো চা লাইগবে, বাবা? এই-যে তোর বড়খড়্যা আইন্যা থুইছে। বানাবে নে কেডা।’
‘খাড়াও, আগে খালপাড় থিক্যা আসি’– যোগেন খালপাড়ের দিকে চলে যায়।
যোগামা, মানে, যোগেনের বড় খুড়িমা। যোগেনের মা শুধু তাকে পেটে ধরেছিল, ঐ জন্মদান আর স্তন্যদানটুকু বাদ দিলে যোগেনের সবকিছুই করেছে যোগামা আর বড়খুড়া। তাঁদের নিজেদের সন্তান হয়নি। তখনকার দিনে সন্তানের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে ছিল খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে বামুন-কায়েতদের মধ্যে। আগের বৌয়ের পেটে যদি ছেলে না হয়ে থাকে, শুধুই ডজনখানেক মেয়ে হয়ে থাকে, তাহলেও আর দুটো-একটা বিয়ে করা বামুন-কায়েতদের মধ্যে চালু ছিল। নমশূদ্রদের মধ্যে এমন রীত্-কানুন ছিল না। সে অল্প বয়সে কারো বৌ মরে গেল, তাকে বাড়ির লোকজন আর-একটা বিয়ে দিল–এটা অন্য কথা। কিন্তু শখ হল আর ছেলে বা ছেলের ছুতোয় বিয়ে করে আনলাম—আর-একটা—এ চলে এক বামুন-কায়েতদের মধ্যে আর আমির-মুসলমানদের মধ্যে। ওদের তো বিয়ে করলেই লাভ—নতুন করে পণের টাকা, বৌয়ের সোনাদানা, জোত-যৌতুক। আরো একদিকে লাভ—পুরনো বৌ কাজকামের লোক হয়ে যায়। জমিদার-তালুকদার বামুন-কায়েতের আর আমির-মুসলমান বাড়ির কাজের শেষ নেই। বৌ যদি পেটভাতায় কাজ করে দেয়—তাহলে কত পয়সা আয় হয়? নমশূদ্রদের তেমন করলে চলে না। নতুন বিয়ে মানেই তো নতুন একটা পেট। নতুন বিয়ে মানেই তো মেয়েবাড়িকে পণ আর মেয়েকে একটু-আধটু কিছু দিতে হবে। কটা নমশূদ্র বাড়িতে সারা বছর সমান খাওয়াদাওয়া পাওয়া যায়? এক কাজ ছেড়ে দশ কাজ করলেও পেট ভরে না। তার ওপর দু-দুটো বৌ নিয়ে সংসার বড় করে ফেলা?
যোগার বছর দেড়েক আগে জন্মায় সদা। জন্ম থেকেই সদাটা রোগা তো ছিলই, অপুষ্টিতেও ভুগছিল। হয়ত সেসব কারণেই রামকৃষ্ণ আর তার স্ত্রী, সদাকে একটু ভাল করে রাখা, একটু খাওয়ানোদাওয়ানো আর সদাকে কাছে নিয়ে শোয়া—এই সবে জড়িয়ে পড়ে। বড়বৌয়ের তো পিঠেপিঠে তখন তিন ছেলে আর দুই মেয়ে। বড় নন্দ, তারপর ক্ষীরা, ক্ষীরার পরে প্রেমানন্দ, প্রেমার পর শারা—শারদা, তারপর সদানন্দ। বড়বৌ একা কী করে সামলায়। তারপর হল যোগা। শোয়ার জায়গাই হয় না—সদা আর যোগা যদি মেজবৌয়ের কাছে না শোয়। মেজভাই কেষ্টা—রামকৃষ্ণ, আর মেজবৌ সন্তানের জন্য একেবারে বুক থাবড়ানো তো শুরু করেনি। ভগবান দিলে পেট থেকে পড়ে। আবার, ভগবান তো অন্যের পেটের সন্তানকে বুকে জায়গা দেয়ার জন্যও তো অনেক মেয়ের পেট খালি রাখেন। মা বলতেই তো মা-যশোদা। কানু কি তার পেটের ছেলে?
সদাটাকে বাঁচানো গেল না। তখন মেজবৌয়ের বুকে যোগা, আর বুকের ভিতরে ভয়। তার নিজের মায়ের চাইতেও কি সে বেশি আগলাতে চেয়েছিল সদাকে? সেই দোষেই কি সদা চলে গেল? ভগবান যাকে সন্তান দেননি, সে নিজে-নিজে সন্তান জোগাড় করলে ভগবান তাতে রাগ করেছেন? সেই ভয়ে ধুকপুক করে মেজবৌয়ের বুক অথচ যোগাকেও বুক থেকে নামাতে পারে না। নামানো যায় নাকী। বুক থেকে না-নামিয়েও মেজবৌ মন থেকে নামানোর চেষ্টা করেছে। যেন, আছে বলেই আছে। যেন, মেজবৌয়ের কোনো টান নেই। যেন, বাড়ির সব ছেলেমেয়ে যেমন, যোগাও মেজবৌয়ের কাছে তেমনি। বাড়ির কোনো মানুষ যদি এই কথাটার একটু আভাসও দিত তাহলেও মেজবৌ যেন শান্তি পেত। বাড়ির কেউ তো দূরের কথা, নমশূদ্রপাড়ার গায়ে-গা লাগা ঘরবাড়িতে এত মেয়ে এত পুরুষের কোনো একজনও তো ইশারাতেও এমন কোনো কথা জানায়নি। শেষে মেজবৌ আর না-পেরে একদিন যোগার খুড়োর কাছেই কথাটা তোলে বটে কিন্তু আবার পুরোটা বলতেও পারে না। মেজবৌ এইটুকুই বলেছে—’যার ছাওয়াল, তার কাছেই ভাল থাকব—’, তাতেই রামকৃষ্ণ বেশ রেগেই বলে, ‘ক্যা? তোমার গতর বাইড়্যা গিছে, নাকী, বৌদিদির নতুন প্রাসাদ হইছে?’ মেজবৌ এরপরও বলতে পারে, কারণ, এই সম্ভাব্য কথাবার্তা অনেকবারই তার মনে-মনে বলা—’কী য্যান? সদাডারে তো তো রাইখতে পারল্যাম না? কী য্যান? আমার কোলের দোষ আছে কী নাই।’ রামকৃষ্ণ গলা একমাত্রা চড়িয়ে বলে, ‘বাড়ির কাজকর্ম কি কম পইড়ছে? খাটনিতে যার গতর ভেজে না, তার এই নাগাল দুষ্ট চিন্তায় মাথা ভিজে। অসুখ হইছিল সদার। তার সঙ্গে যোগার কী?’
রামকৃষ্ণের এই উঁচু গলায় মেজবৌয়ের মনটা ঠান্ডা হয়েছিল। তবু সে কোনো একটা রীতিকানুন মেনে যোগেনকে মানুষ করার মত দৈনিক কাজটাতে লেপটে যেতে চাইছিল। এমন কিছু নয়—বড়জোর একটা হরির লুট বা একটু নামগান। সে তো যে-কোনোদিনই হতে পারে। হরির লুট কেন—এ-কথা তুলতে নেই, এ-কথার জবাবও নেই। কে আর মেজবৌকে নিষেধ করেছে—এক পাতা-মোড়া বাতাসা কিনে এনে সন্ধেবেলায় পাড়ার বাচ্চাকাচ্চাদের ডেকে নাম গেয়ে লুট দিতে। দিলেই হয়—একদিন। কিন্তু তাতেও যে এ-কথাটা লুকনো থাকবে—যোগাকে নিজের করে নিতেই বা যোগার ওপর কারো নজর ঠেকাতেই মেজবৌ লুট দিচ্ছে, নাম গাইছে? সেই গোপনতাটুকু, এমনকী যোগার মা-বাবার কাছ থেকেও গোপনতা রক্ষাতে একটু পাপের ছোঁয়া লাগে না? যার ছেলে সে জানলও না, অথচ তারই নামে তুমি সন্ধেবেলা তুলসীগাছের তলায় প্রদীপ সাজিয়ে লুট দিলে? লুট তো কারো নামে হয় না, লুট হয় ভগবানের নামে আর তার মানসিকের কথা যদি পিঁপড়ে বা পাখিও জানতে পারে, তাহলে সে মানসিক কখনো পূরণ হবে?
শেষে অবিশ্যি ভগবানই পথ করে দিলেন।
এটা তো পুরোপুরি মৈস্তারকান্দি গ্রাম নয়। বরং সত্যি কথা হল—এটাকে কেউ মৈস্তারকান্দি বলে না। মৈস্তারকান্দিতে জোলার ওপারে-এপারে বাবু-হিন্দুদের আর বাবু শেখদেরবাড়ি-লাইন দিয়ে। ওদিক, মানে সিংহাসনের দিক থেকে এলে প্রথম, বাঁয়ে, জমিদার সন্তোষ রায়ের পাকা দোতলা। ছাড়িয়ে এলে ডানহাতে, বোধহয় ওঁরা ভটচাযই। সেই বাড়ি ছাড়িয়ে এলে ডানদিকে বাগানবাড়ি—সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে ফুলের বাগান। তার শেষে পুবের ভিটেয় বারবাড়ি। তার পরের বাড়িটাই তো ন্যাংটা বামুনের—দিনরাত ন্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়ায়, মুখ দিয়ে সব সময় লালা ঝরে। তারপরে পুরুতবাড়ি—তার পেছনে হেডমাস্টারের নতুন বড় বাড়ি উঠছে—নদীভাঙা মানুষ। ব্যস, মৈস্তারকান্দি শেষ। কিন্তু রাস্তা তো আর শেষ না। নিচু, থোবড়ানো, ছোট দাওয়া, কোথাও আবার দাওয়া নেই—সিধা ঘরের ঝাঁপ, বাইরে আখা, খোলা, দুয়ার, একটা ঘরই বেশি, তবে দুটো চালা যে একেবারেই নেই, তা নয়—এটাও মৈস্তারকান্দি, যখন নাম বলার দরকার হয়। দরকার না-হলে বাড়ির মালিকের নামেই কাজ চলে যায়, যেন সেটাই একটা গ্রাম, সেটাই গোটা একটা গ্রাম—দাড়িজোলা, গাধূলির মা, কলার ঝাড়, ছুতারের কাঠি, জলিল মাস্টার, লালচাঁদের কাঠি, নুদির ভিটা, লাটিক ঠাই—এই করতে-করতে হায়াতুন্নেছার তালুক। একই নাম যে সবাই বলে, তা তো নয়। একটা মাত্র বাড়ি চেনাতে এক-একটা গোটা গ্রামের সমান নাম। আবার একটাই নাম নয়—যেমন ইচ্ছে তেমন নাম। আর, এও নয় যে বামুনপাড়া, কায়েতপাড়া, নমশূদ্রপাড়া, ছুতোরপাড়া, ডোমপাড়া, মুসলমানপাড়া বলে আলাদা-আলাদা বসত আছে। যাদের পয়সাকড়ি আছে—তারা ডাঙায় বাড়ি করে। যাদের নেই, তারা তলায় বাড়ি করে। যাদের আরো নেই, তারা আরো তলায় বাড়ি করে। যাদের আরো নেই, তারা হয়ত খালের ঢালে বাড়ি করে। তবে এত খালি জায়গা থাকতে আর ঢালে গড়াবে কে? সব জায়গাতেই সবরকম মানুষ মিশে থাকে। কার্তিক সেন-রা কুলীন বৈদ্য। ছুতারের কাঠি থেকে নুদির ভিটা পর্যন্ত পুরোটাই তো সেনদের বাড়ি, তাদের কবরেজি ওষুধের গাছপালার বাগান, গাছপালা ধোয়া-বাটা-গুঁড়া করার চালা আর সেনদের বসতবাড়ি। সেনরা কুলীনই আছে, তবে বৈদ্য নেই। তাদের বংশের মানুষজন নানাদিকে চলে গেছে। শেষ পর্যন্ত বাড়িতে অবশিষ্ট থাকল—এক বুড়ি, যাকে এখনকার সেনদের বাবারা পিসি ডাকত আর ছিল অভিমন্যু—তার সংসার নিয়ে। অভিমন্যু ছিল ওষুধ তৈরির কারিগর। কালে-কালে এমন দাঁড়াল যে বুড়ির খাওয়াদাওয়া অভিমন্যুকে জোটাতে হয়। সেই-বা পারবে কোত্থেকে। সে ওষুধের বাগান তো জঙ্গল। শেষে, অভিমন্যুই বুদ্ধি বের করে। বুড়িও রাজি হয়। বুড়িকে কিছুটা টাকা বায়না দিয়ে, যারা ঘর তুলতে পারে, তারা ঘর তুলে নিত। সেখানে তো ছুতার কাঠির মিস্তিরিদের বেশ ভাল অবস্থা। যোগাদের বাড়ির কাছে বলে আর যোগার বাপ-কাকারা কাঠমিস্তিরির কাজও করে বলে অনেকে তো যোগাদের বাড়িকেও ছুতার কাঠি বলে। ছুতার কাঠির পরই জলিল মাস্টারের মুদির দোকান, পাঠশালা, ছোট একটা মাটির মশজিদ। সে-ও তো কার্তিক সেনের ভিটা। বরিশালের আর-সব গ্রামেও লোকজনের বসতিতে এমন মেলামেশাই বেশি।
যোগাকে নিয়ে মেজবৌয়ের দুশ্চিন্তা অথচ আকাঙ্ক্ষা নিরসনের উপায় বাতলেছিল কে, তা কেউ কোনোদিন জানে না, জানার কথাও না। মেজবৌয়ের মনে কী করে শান্তি এল—সেটা তো মেজবৌয়ের মনের ব্যাপার। তার স্বামীর কাছে সে যেটুকু মুখ খুলেছিল, ততটুকু তো সে নিজের কাছেও খোলেনি। এমনও হতে পারে—নানা ধর্মের, নানা সমাজের, নানা বিত্তের, নানা পেশার নারী-পুরুষের কত অজস্র কথা থেকে মেজবৌ নিজেই পরিত্রাণের উপায়টা বের করেছিল। তাকে তো সবাই, এমনকী তার বড়জা, যোগার মা নিজেই, তো ‘যোগার মা’ বলেই ডাকত। যোগা তো অষ্টপ্রহর মেজবৌয়ের কোলে-কাঁখেই থাকত—এমনকী ধানভানা বা পাটছাড়ানো বা কোনো ব্যাপার বাড়ির বাসনমাজার কাজে যখন তাকে বাইরে যেতে হত, তখনো যোগাকে সে সঙ্গে নিয়ে যেত। যোগা বেশ মোটা ছিল—তাকে কাঁধে-কোলে নিয়ে দূরে-দূরে যেতে জোয়ান মানুষও হাঁফিয়ে পড়ত। যোগার মা, মেজবৌয়ের বড়জা, বলত, ‘আরে, তোর ছাওয়ালরে আমরা সবাই মিল্যা কি পিট্যাইবার ধইরব? যাইস কাজে, ছাওয়াল নিয়া গেলে কি মহাজনগ ভাল লাগে?’ মেজবৌ জবাব দিত, ‘ছাওয়ালডারে মহাজনের ভাল লাগাইব্যার কামডা কী? তার দরকার কাম, হ্যায় কাম বুইঝ্যা নিক, ছাওয়াল দিয়্যা হ্যার কাম কী?’
যোগা যখন মাত্র দুটো-একটা কথা বলতে শুরু করেছে, সে তখন মেজবৌকেই ‘মা’ ডাকতে শুরু করে। মেজবৌ তাতে যোগার ওপর রেগে ওঠে, ‘এই ছ্যাড়া, নিজের মারে মা ডাক’। যে-বাড়িতে রোজকার খাওয়া রোজ কামাই করতে হয়—নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে, সে-বাড়িতে এসব কথা শোনার মত বাড়তি কান কারো থাকে না। কিন্তু মেজবৌ বছর দুয়ের যোগাকে বুঝিয়ে দিতে পারে যে মেজবৌকে ‘মা’ বললে তাকে ছোটখাটো ব্যথা পেতে হয়—যে তাকে সর্বক্ষণ আঁকড়ে থাকে, তারই হাতে। খুব ঝাঁকড়া চুল যোগার। সেটা ধরে টেনে দিত মেজবৌ বা কান একটু মুচড়ে দিত বা পাছায় চিমটি কাটত। ব্যথা দিয়েই মেজবৌ তার আপত্তিটা যোগাকে বুঝিয়ে দিতে পারে। যোগা, ‘মা’ আওয়াজটাই ছেড়ে দিল।
যোগা আওয়াজ ছাড়তে পারে, আওয়াজ তো আর যোগাকে ছাড়তে পারে না। আর, এটাই-বা কী করে সম্ভব যে বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে যোগা সব কথাই বলতে পারবে, এক ‘মা’ ছাড়া? মেজবৌয়ের সঙ্গেই তো সে সারাদিন। সারাদিনই তো সবাই মেজবৌকে ‘যোগার মা’ বলে ডেকেই যাচ্ছে—’যোগার মা, কবরাজবাড়ির বড় মা ঠ্যারান ডাইকছে একবার।’ ‘যোগার মা, অ্যাড্ডা চ্যার তো বার্নিশ করব্যার লাইগব।’ ‘যোগার মা শ্যাতলা ষষ্ঠী কাইল না ফরশু জাইন্যা আইসো।’ ‘যোগার মা, খালে যাইব্যা নি? ইঁচা মাছ উথাল দিছে।’ এইসব কাজে সবাই এমনি করেই সবাইকে ডাকে। আগে ডাকত, ‘মাইঝ্যান’ বা ‘কেষ্টার বৌ’ বলে। ডাকটা বদলাবার সময় পার হয়ে গিয়েছিল। তাই ‘যোগার মা’ ডাকটা সবাই জিভে তুলে নিল। আর, সব সময় ‘যোগার মা,’ ‘যোগার মা’, শুনতে-শুনতে যোগাও এক সময় ‘যোগামা’ আওয়াজটা করতে শুরু করল। যোগা তখন নিজেই জানে না তার নিজের নাম যোগা।
যোগার ‘যোগামা’-তে আর ‘র’ এল না। সবাই ডাকে ‘যোগার মা’, এক যোগা ডাকে, ‘যোগামা’। বড় বাড়িতে যেমন হয়—যোগা সকলের সঙ্গেই বড় হতে লাগল, সবার চেয়ে স্বাস্থ্যবানও। তার দাদাদের ও তার চাইতেও বড়দের ও তার চাইতে ছোটদের তো বটেই—যোগা এত পেটাতে শুরু করল যে যোগা আসছে টের পেলেই তারা পালাত। যোগার মা যোগার কোঁকড়ানো বাবরি চুল চুড়ো করে বেঁধে দিত, দু-এক সময় হলদে ফালি-কাপড় জাঙ্গিয়ার মত পরিয়েও দিত। আর, যোগা সেই বেশে দাপিয়ে বেড়াত। তাতে যোগার মা তার মতন করে সেই গোপবালক ও রাখালবালকের প্রাচীনতাকে একটা আধুনিকতা দিত।
যোগার বয়স যখন বছর আট, তখন একদিন সে হনুমান সেজেছিল। যোগা মা রঙ-বেরঙের কাপড়ের টুকরো ও একটু-আধটু জড়ির পাড় দিয়ে খড়ের মোটা লেজটাকে এমন করে মুড়িয়ে, শেষে আবার মুচড়ে দিয়েছিল আর লেজের সঙ্গে মানানসই মুকুট ও গন্ধমাদনে রাংতা লাগিয়েছিল যে ঘর থেকে বেরিয়ে একহাতে কাঠের মুগুর আর-এক-হাতে গন্ধমাদন নিয়ে টাল সামলাতে না পেরে তার সেই বপু নিয়ে যোগা আছড়ে পড়ল তার বুড়ো বাবার ওপর। রামদয়াল তখন বাড়ির একমাত্র কাঁসার বাটিতে পুরনো তেঁতুল দিয়ে ছাতু মেখে খাচ্ছিলেন। রামদয়াল হয়ত একটু তাড়াতাড়িই খাচ্ছিলেন—নইলে তেঁতুলের টকে আবার কাঁসার কল উঠবে। স্বাদ বাড়াতে রামদয়াল ছাতুটা একটু শুকনো করেই মেখেছিল। তাড়াতাড়ি গিলতে পারছেন না অথচ গিলতে চেষ্টা করছেন।
ছাতু নিয়ে এতটা ব্যস্ত না থাকলে রামদয়াল হয়ত হনুমানরূপী তার কনিষ্ঠপুত্র যে তারই ঘাড়ে পড়ছে, এটা বুঝে সরে যেতে পারতেন।
ফলে, ছাতুর অত বড় জামবাটি দুয়ারে পড়েও গড়াতে লাগল। রামদয়ালের ঠ্যাংদুটো বাতাসে ডানা কাটছে তো কাটছেই। যোগার মোটা শরীরের তলায় তার রোগা শরীর বা মাথা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যোগা নিজেই নিজেকে তুলতে পারছে না। এদিকে তার মুকুট, গদা ও পাহাড় রক্ষার জন্য সে কোনো একটি হাতও খালি পাচ্ছে না। আর যোগার মোটা রঙিন লেজ খাড়া দুলছে। রামদয়ালের গলায় ছাতু আটকে গোঁ-গোঁ আওয়াজ বেরচ্ছে। এ-বাড়িতে ছুতোরগিরির এত আওয়াজ ওঠে—রামদয়ালের গোঁ-গোঁ কারো কানে যাওয়ার কথা নয়। তখন প্রায় দুপুরবেলা। বাড়ির প্রায় সকলেই কাজে বেরিয়ে গেছে। যোগার মা আর ছোটবৌ ছিল বাড়িতে। যোগার মা টেরই পায়নি কী হয়েছে। ছোটবৌও টের পেত না—যদি সে আখা ছেড়ে দাঁড়িয়ে না উঠত। সে-ই ‘অ দিদি গ, বটঠাউরের কী হইল—’ রবে কান্না তুলল।
তারপর তো রামদয়ালকে উদ্ধার করা হল। তার হাঁ-মুখের ভিতর আঙুল ঢুকিয়ে ছাতুর গোলাটা বের করল যোগার মা। ছোটবৌ ঘটিতে জল আনল- রামদয়াল সেটা উঁচু থেকে গলায় ঢাললেন। সকলের এই ব্যস্ততার মধ্যে যোগা তার লেজ, মুকুট, গদা ও পাহাড় সবগুলোই রক্ষা করে হাওয়া হয়ে গেল। যোগার মা ছাতুর বাটিটা তুলে দেখে বালি-মাটি এক কোণে লেগেছে। সেটুকু ফেলে দিলে খাওয়া যাবে। রামদয়ালকে জিজ্ঞাসা করে, ‘দাদা, এডডু পাৎলা কইরা দেই। না-হয় তো আবার গলায় ঠেইকব!’ যেন শুকনো বলেই ছাতু রামদয়ালের গলায় ঠেকেছে, যেন এর সঙ্গে যোগা বা তার হনুমান-সাজার কোনো সম্পর্ক নেই।
হাঁফাতে-হাঁফাতে রামদয়াল বলে, ‘তাই দ্যাও আর দুইডা কাঁচা মরিচ ডইল্যা দ্যাও।’
এটা তার দুপুরের খাওয়া ছিল—ভাতের বদলে। দুপুরে আবার রান্না হয় কবে? বেটাছেলে-মেয়েছেলে যাদের কাজের বরাত থাকে—তারা গেরস্ত বাড়িতে কিছু খেতে পায়। বাড়িতে যারা থাকে—তারা বেশিরভাগ দিনই পান্তা খায়। গরম ভাত তো হয় সবাই ফিরলে, সন্ধ্যার মুখে। রামদয়াল পান্তা খেতে চাইছিল না বলেই, ছাতু মেখে নিয়েছিল। যোগার মা কখন ছাতুর বাটি নিয়ে আসে, তার জন্য অপেক্ষা করতে-করতেই, অত রোগা শরীরে যতটা রাগ করা সম্ভব, রামদয়াল ততটাই রাগ করেন, ‘এ হালা বাপ-খুইন্যা দিনে-দিনে বইস্যা-বইস্যা তো কালাপাহাড় হইয়্যা উইঠছে। হয় ওগ্ জলিল মাস্টারের নিকড়ে পাঠাও কাইল আর নয়তো পাঁচনবাড়ি দিয়্যা কুনো বামুনবদ্যির গোয়ালে ঢুকাও। কাইল সহালে য্যান ওর মুখ দেইখব্যার না-হয়।’
সারাদিনের পরে এইসব ঘটনার কোনো গুরুত্ব থাকে না। পাছে যোগাকে কোনো বাড়িতে কাজে ঢুকিয়ে দেন বটঠাকুর, তাই, যোগার মা তার স্বামীকে রাজি করায় জলিল মাস্টারের পাঠশালায় যোগাকে দিয়ে আসতে। রামকেষ্টও বলে, ‘অয়, অন্তত শুভঙ্করডা না শিইখলে তো শুদ্দুরের ব্যাটা শুদ্দুরই হইব।’
যোগাকে পাঠশালায় পাঠানোর সময়ই যোগার মা তার সেই সংগৃহীত উপায়টাকে কাজে লাগায়। সে তার স্বামীকে বলে, ‘যোগারে পাঠশালায় ঐ যোগানন্দ নামডা ছাড়ান যায় না?’ তার স্বামী একটু বিরক্তিই হয়, ‘তোমার যত ভেজাইল্যা কথা। আবার নাম নিয়্যা পইড়ল্যা? সব ছাওয়ালপাওয়ালের নাম তো নন্দ দিয়াই আছে—মহানন্দ, প্রেমানন্দ, সদানন্দ। তার সঙ্গে মিল রাইখ্যা যোগানন্দই তো আসে?’
‘তোমাগো ভাইগো নামে তো মিল নাই।’
‘ক্যা? দাদাই এক রামদয়াল—আমি আর রাজু তো কিষ্ণই।’
‘হ্যাঁ। যোগারে ঐ মতন আলাদা কইরো। যোগ-খান রাইখ্যা নন্দ বাদ দিয়্যা আর-কিছু দিও। দাদারে জিগাইবা না?’
‘হ। দাদার মনে আছে অর নাম যোগা না ভোগা। তার উপর আজ ছাতুর বাটি ফেল্যায়া দিছে।’
পরদিন সকাল হতে-না-হতেই যোগার মা গিয়ে তার বড়জাকে বলে, ‘দিদি, তোমারে যদি আমি দুই পোয়া খুদ দেই আর একখান সিকি দেই, তুমি কোনডা রাইখব্যা?’ বড়জা বলে, ‘দুইডাই।’
‘ক্যা? দুইডা ক্যা?’
‘এডা কী জিগাইলি? মানুষে দুইডা পাইলে একডা নেয়?’
‘না। তা কই না। তোমারে যদি এড্ডা নিব্যার কই?’
‘তুই কইলেই আমারে কি একডারে না কইরতে হব?’
‘না কইরব্যা ক্যান? আমি তো হ্যাঁ কইরবার কই। একডারে।’
‘একডারে হ্যাঁ কইরলেই তো আরেকডারে না-কহা হইয়া যাবেনে? সেইডা তো অমঙ্গুল্যা।’
‘ক্যা? অমঙ্গুল্যা হইব ক্যা?’
‘তোর মাথায় কি সত্যি-সত্যি কুনো জ্ঞানবুদ্ধি নাই?’
‘কেডা কয়, নাই?’
‘এইডা বুঝস না—সারাখান জীবন তো খুদই ভরসা। খুদ যদি না থাহে এই বেবাক মানুষগুলাক বাঁচাবি ক্যামনে? তোর ভারা তিনভাই, ছাওয়ালপাওয়াল মা ষষ্ঠীর দয়ায়। কেউ খুদ সাইধ্যা দিব্যার চ্যালে কি না করন যায়? এক মুঠা দিলে দুই মুঠা চাবি—’
‘ভিক্ষুকের নাগাল।’
‘তুই তো চাইস নাই। তোরে দিলে তুই না করবি নাকী?’
‘আচ্ছা খুদ থাউক। সিকি সিকি?’
‘সিকিই ক আর লাল পয়সাই ক—ওডা তো লক্ষ্মীর দয়া।’
‘আচ্ছা, তোমারে যদি দুইডাই দিয়া দেই, ‘তুমি কী করো?’
‘খুদ না-হয় বাড়িত্ থিক্যা দিলি। সিকি পাইছিস কনে?’
‘একডা-একডা পয়সা কইর্যা জমাইছি দিদি, আইজক্যার দিনডার লাইগ্যা।’
‘ক্যান? কী হইছে আইজ?’
‘যোগা পাঠশালে যাবে—’
‘বাপেরে ছাতুর বিষম খাওয়াইয়্যা শখ মিটে নাই? অ্যাহন মাস্টারের নুর ছিঁড়ব্যার যায়? তো তার সঙ্গে খুদেরই-বা কী, সিকিরই-বা কী। তোরে কেডা কইছে—খুদ দিয়্যা কড়ি দিয়া ছাওয়াল কিনতে?’
‘ডর লাগে দিদি। যে-জিনিশ আমার না, সে-দ্রব্য লই ক্যামনে? যোগার যদি বিপদ হয়?’
‘ছাওয়াল তো নিজেই তোরে মা বইল্যা বাইছ্যা নিছে। তোরে ক্যান দোষ ছুঁব?’
‘দিদি, আমি কিন্তু তোমারে লুকাইয়া ছাওয়াল কাড়ি নাই।’
‘লুক্যাইয়া পরপুরুষ করা যায়। ছাওয়ালপাওয়াল কি লুক্যাইবার মত জিনিশ? তোর অত ভাবনের কাম কী? পাঠশালে ওর বাপের নাম লিখ্যার লাগব না?’
‘লাগে বুঝি?
‘ঐহানে তোর নামখান লিখ্যা দিতে ক।’
‘কও কী দিদি? খুড়ি না-হয় মা সাইজব্যার পারে, বাপ সাজব ক্যামনে? আমাগো তো কাছা নাই। তাহাইলে তোমার দেওরের নাম দিব্যার লাগে তো—।’
‘কী কস তুই? আমার প্যাটের ছাওয়ালের বাপের নাম বইল্যা আমার দ্যাওরের নাম দিলে আমাগো ধর্মচরিত্তির থাহে কনে? তোর নামই দে—কুনো হাঙ্গাম হইব না।’
কথাডা যোগামার মনে ধরেছিল। কিন্তু যোগাকে একটা নতুন ধুতি-পিরান পরিয়ে, বগলে একটা বেতের আসন গোল করে দিয়ে, তার স্বামীর কাছে দেয়া পর্যন্ত কথাটা নিজের মনে গুছিয়েই তুলতে পারল না। অ্যামন কথা ক্যামনে কাওয়া যায়। উলটে তার স্বামী বলল,
‘ঐ আসনটাসন রাইখ্যা দ্যাও’।
‘বইসবনে কীসে?’
‘বাড়িতে কি আসনে বসে? জলিল মাস্টারের ঐখানে বামুন-কায়েতরাও পড়ে। শুদ্দুরের ছাওয়াল আসনে বইসলে তাগ বাপজ্যাঠা আবার পতিত্ কইরব।’
যোগার মা যোগার বগল থেকে আসনটা বের করে নিল। কথাটা তার মনে ওঠা উচিত ছিল, ‘চাঁড়াল হইব্যার এই একখানই সুবিধা। চাঁড়ালের আর পতিত কী?’
‘বামুনগ জানো না? প্রাচিত্তির বিধান দিয়া পয়সা চাইব নে।’
জলিলমাস্টারের পাঠশালা বাড়ির গা-লাগা। খালের ওপারে যোগামা-ই যেতে পারে। কিন্তু ইস্কুলটিস্কুলের ব্যাপার বলে গেল না। রামকৃষ্ণ যোগার কাঁধ ধরে মাস্টারকে বলে, ‘মাস্টারশাহেব, অর নামখান লেইখ্যা নেন।’
‘পইড়ব তো? না দুইদিন বাদে পাঁচন ধইরব্যার যাবে নে? নাম কী?’
‘যোগা যোগা কইয়্যাই তো ডাকাডাকি হয়। ও আপনি একখান থুয়্যা দিবেন।’
‘তোমাগো ছাওয়ালরা তো আনন্দ সব—ক্ষমানন্দ, প্রেমানন্দ। তাইলে তো অর যোগানন্দ হওয়া লাগে। যোগানন্দ মণ্ডল।’
‘ঐ আনন্দখান বাদ দিয়্যা দ্যান। আর-কিছু বসাইয়্যা দ্যান।’
‘ক্যা? তোমাগো বাড়ির কুনো ধারা নাই? ওর ভাইগুল্যা যহন আনন্দ, অরে ক্যান নিরানন্দ কইরব্যা?’
মাস্টারের কথার শেষটুকু না বুঝলেও রামকৃষ্ণ টের পায়—মাস্টারের ইচ্ছে ‘আনন্দ’ লেখার। এ-কথাতে আপত্তির ভাষা রামকৃষ্ণের জানা থাকবে কী করে? সে বলে বসে, ‘না মাস্টার শাহেব। ওর খুড়ির পছন্দ নাই—ঐ আনন্দ।’
‘যোগার মা-র? তাইলে তো কথাডা ফ্যালান যায় না। এক কাম করো-না। যোগার মা তো কলিকালের মা-যশোদা। তার ছাওয়াল প্যাটের না পালা, এই কথা কাউরে কহনো জিগাইব্যার শুনছ? তাইলে যোগার নামখান লিখি যশোদানন্দন। মানে যশোদার ছাওয়াল। এর থিক্যা ন্যায্য নাম যোগার আর-কিছু হবার পারে?’
রামকৃষ্ণকে একটু ভাবতে হয়। এত বড় নাম? তো নাম তো নামের নাখান থাইগব। যোগা তো যোগাই থাইকব। ‘যোগা’-ডা এক্কেরে বাদ দেওয়া কি ঠিক কাম হব? বেকামটা কী সেটা রামকৃষ্ণ বুঝে উঠতে পারে না। বড় হয়ে যোগার যদি নামের দরকার হয় তো যোগা মাস্টারশাহেবের লেখা নামটাই নেবে। রামকৃষ্ণ বলে বসে, ‘যোগাডা, রাইখ্যা কিছু করন যায় না মাস্টারশাহেব? ঐ নন্দখান বাদ দিয়া?’
‘নিশ্চয় যায়। ধরো, যোগেন্দ্রকুমার হব্যার পারে, যোগেন্দ্রনাথ হব্যার পারে। যোগেন্দ্রচন্দ্রও হব্যার পারে। কও, কোনডা মনে ধরে, কও।’
‘সবোই তো ভাল, বাবুগরে নাম।’
‘বাবুরা এইসব নাম রাখে, তবে এগুল্যা তো দেবদেবীর নাম। যোগেন্দ্রকুমার বইলতে বুঝায় শিবের দুই পুত্তুরকে—কার্তিক আর গণেশ। যোগেন্দ্রনাথ বইলতে বুঝায় এক্কেরে আসল শিবরে। যোগেন্দ্রচন্দ্ৰ—’
রামকৃষ্ণ বাধা দিয়ে বলে, ‘মাস্টারশাহেব, আমারে এই বুড়াকালে আর শিখাইব্যার খাটনি ক্যান। জিভে তো মইরচ্যা পইড়্যা গিছে। শিবের ছাওয়ালপাওয়াল দিয়া কাম নাই। আপনে ঐ আসোল শিবঠাকুরডাই থোন। যোগীন্দনাথ। এই যোগা, বয় গিয়্যা’।
একা বাড়ি ফেরার পথে রামকৃষ্ণ ভাবতে থাকে, মাস্টারশাহেব তাদের ছেলেদের নামের মধ্যে যে ক্ষমানন্দ বললেন, সেইডা কেডা?
