১৪. নৌকাপথে মৈস্তারকান্দি
তার বাড়ি মৈস্তারকান্দি রওনা দিতে-দিতে আরো একদিন কেটে গেল যোগেনের। শেষে শুক্রবার শেষ বিকেলে প্রায় জোর করেই বেরিয়ে পড়ে ঘাটে এক নৌকোয় উঠে বলে, ‘আগে নাও খোলো, তার বাদে কই, কই যাব।’ নৌকোয় দুই মাঝি। একজন লাফিয়ে পড়ে নেমে কাছি খুলে দিয়ে ঝুলে গলুইয়ে উঠতেই লগির এক খোঁচায় নৌকো মাঝখালে গিয়ে পড়ে।
‘কোনোদিগে হাল ঘুরাই, বাঁয়ে না ডাইনে?’ বয়স্ক মাঝি জিজ্ঞাসা করে আর যোগেনের পেছন থেকে কেউ বলে ওঠে, ‘নে, নে, লগিঠেলা নাও, তার আবার হাল?’
যোগেন একটু অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, তার সঙ্গে-সঙ্গে আরো চার-পাঁচজন নৌকোয় উঠেছে। তারা পথে কোথাও নেমে যাবে নাকী তার সঙ্গে মৈস্তারকান্দি যাবে—সেটা বুঝতে যোগেনকে দ্বিতীয়বার ঘাড় ঘোরাতে হয়। ঘাড় আর সোজা করতে পারে না—পাটাতনে তাকে উলটে বসতে হয়। এরা কেউই যাত্রী নয়, তার সঙ্গে মৈস্তারকান্দি চলল। তা চলুক।
বয়স্ক মাঝি একেবারে নিচু গলায় বলে, ‘নাওয়ের না অয় হাল নাই, জলের তো পুব-পশ্চিম আছে। সেইডা তো এডডু কওয়ার লাগে—পুবে যাই না পশ্চিমে যাই।’
যোগেন তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘ভাই, মৈস্তারকান্দি, মৈস্তারকান্দি যাবার লাইগব।’
‘মৈস্তারকান্দি? তার থিক্যা ফরিদপুর চলেন না কত্তা, আড়িয়াল খাঁ দিয়া সোজা পাড়ি হইব নে। টাইমও কম লাইগবে, একখান বিদ্যাশেও ঘুরা হবে গিয়া।’
‘তুমার মত নাইয়া পালি তো দেখি, কহন না কইয়্যা বসো, আর-অ্যাদ্দিন কষ্ট কইর্যা থাইকবেন ক্যান, চলেন, গোরেই চলেন, খাটনিও কম আর জলে গোর হইলে তো কবরও খুঁড়া লাইগব না’, যোগেনের সঙ্গে যারা যোগেনের অজ্ঞাতেই নৌকোয় চড়ে বসেছে, কথাটা তাদেরই কেউ বলে।
মাঝি বলে, ‘না কত্তা, আগে কইলে যাইত্যাম না।’
যোগেন হেসে উঠেছিল, ‘আগে কইলে তো যাইত্যা না। অ্যাহন কইলে তো যাইবা, সোনাভাই? চলো।’
নৌকো তো চলছিলই। খালপাড় থেকে শহরের আলো জলটাকে আরো একটু ঘন করে তুলেছিল। কিছু আলো, কখনো-সখনো জল বেয়ে উঠে নৌকোয় মানুষজনকে চকিত আলোকিত করে নৌকো থেকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। নৌকোর গতিতে বোঝা যায়, বয়স্ক মাঝি অনিচ্ছেয় লগি ঠেলছে যেন সে ঠিক করতে পারছে না, কী করবে। ছোট মাঝির ঠেলাতেই নৌকো যা চলার চলছে। নৌকোর যাত্রীদের ভিতরও সেই অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে। মাঝির দোষ নেয়, এই সন্ধ্যায় এতটা পথ কোনো নৌকাই যাবে না, যদি আগে ঠিক করা না থাকে।
যোগেনের সঙ্গীরা চুপ করে থেকে মাঝিদের বোঝাতে চায়—যেতে তাদের হবেই। কিন্তু বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার পরও নৌকোর গতি বাড়ে না।
একজন বলে ওঠে, ‘আরে কারে নিয়া যাও মাঝি, জানো নি?’
উত্তরটা দিল ছোট মাঝি, বেশ জোরে, ‘সেই দুঃখেই তো যাবার চায় না।’
‘ক্যান? কী হইছে? যোগেন মণ্ডলরে নাওয়ে নিব্যার চায় না?
‘ক্যান?’
হয়ত এই কথাটা থেকে পেছন ফিরতেই বড় মাঝি লগিতে জোরে খোঁচা দিয়ে ফেলে, একটু দুলে উঠে নৌকোটা চলকে এগিয়ে যায়। ছোট মাঝি খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে। বড় মাঝি ধমকে দেয়, ‘শিয়ালের নাখান হাসস্ ক্যান?’
‘কথাডা তো শুইনতে হয় মাঝিভাই। ঐ-বা ক্যান হাসে আর তুমিই-বা ক্যান কান্দো?’
ছোট মাঝি আরো হেসে ওঠে, ‘বাজানের পাটি যে হাইরা গেল!’ এই মজাতে সে আরো একবার হাসে।
‘অ—। তাই কও। তুমি আমাগো শত্রুর পাটটি? তাই জলে ডুবাইয়্যা মাইরতে চাও। ক্যা? তোমার কী কাম পইড়ছিল কংগ্রেস হওয়ার।
‘কাম দিয়্যা কি কেউ ভোট করে? দত্তমশায় পুরানা মানুষ, জোতজমির কাজকম্ম জানে বোঝে, ভদ্দরলোক, ভরসা হয়, সংসারের কত্তা বইল্যা মাইনতে মন চায়—’
‘সে না-হয় বুঝা গেল। তা ভোট হইল ধরো গিয়্যা চাইর দিন। দত্তবাবুরে ভোট দিছ তো দিছ। তার লাইগ্যা এই চাইর দিন ধইর্যা তোমার মুখ কালা, যোগেন মণ্ডলরে নাওয়ে নিব্যার চাও না? এইডা কী কথা?’
তখন নৌকো ছোটখাল থেকে বড়খালে ঢুকছে। পাড়ের একটা মহীরুহ খালের ওপর ঝুলে থাকায় জায়গাটা গাঢ় অন্ধকার দেখায়। সেই অন্ধকারটা পেরতে-পেরতে বড় মাঝি বলে ওঠে——কী যে কন্! উনি না হইয়্যা আর-কেউ হইলে কি নৌকা খুইলতাম? ভোট যারেই দেই কত্তা, মানীর মান দিব্যার পারি।’
এই কথার মাঝখানে বড় মাঝির শ্বাস পড়ে যায়। যোগেন বলে ওঠে, ‘ভাই, আমাগো এড্ডা নৌকা ধইরা দ্যাও-না! তোমারে জিগ্যাইয়া আমার উঠা কাম ছিল। জিগ্যাইলে তো আর উঠা হইত না। তুমি বরং আমাগো এড্ডা নাও ধইরা দ্যাও।’
ছোট মাঝি পেছন থেকে কচি গলায় বলে ওঠে, ‘তাই কি হয়? আপনারে নাও থিক্যা নামার কথা কি কওয়া যায়? বসেন-না কত্তা—বাজানের মুখডা সগল সময়ই দ্যাখতে অমন ব্যাজার লাগে।’
যোগেন বলে, ‘জলের উপুর দিয়া যাচ্ছি-জলের উপুর দিয়া কি ব্যাজার মুখে ভাসা যায়। মা গঙ্গার ক্রোধ লাগে—আরে, আমি কলকল্যাইয়া হাইসবার ধরছি আর এই মানুষগুল্যা য্যান শ্মশান থিক্যা ফিরে। বড়মাঝি, যদি সত্যি আমাগো নিয়্যা মৈস্তারকান্দি যাবার চান, তাহাইলে হয় গীত ধরেন, নয় প্রস্তাব কন।’
‘যাচ্ছি তো—। রাইতে আর এতখান পথ ফিরা কাম নাই। আপনি কাইল যখন ফিরবেন, আপনারে নিয়্যা ফিরুম।’
‘এই কথার তো আর মাইর নাই। কিন্তু আমি তো কাইল ফিরব্যার পাইরব না।’
যোগেনের সঙ্গীদের ভিতর থেকে সে-ই প্রবীণ গলা শোনা যায়, ‘আরে, যাওনের টাইমে ফিরনের কথা আসে কোথ থিক্যা। ফিরনের কাম যদি থাকে তো আমরাই তো ফিরব—আইজ রাত্তিরেই—’
‘তাহাইলে নোড় পাইর্যা আইস্যা হেই নৌকা-বিলাসের কামডা কী ছিল?’ যোগেন বলে। ‘আ-আ-রে কন কী মণ্ডলমশায়—সরকারের একখান মেম্বার লাগছ, তোমার কি আর মানায় রাত্তিরবেলা অন্ধকারে একা নদী পাড়ি দেয়া?’
‘ক্যা? পছন্দ হয়—তোমাগো য্যান দিনরাইত মেম্বার দেহাই অব্যাস। দেইখল্যা কারে, মেম্বার হইয়া পাখা গজাইছে।’
‘পাখা গজায় না। মেম্বার হইলে মুরগির তাওয়ের গরম বাইড়্যা যায়। আর, উঁই-পিঁপড়ার নাগাল বাচ্চা মুরগিগুল্যা লাইন লাগাইয়্যা মার পিছনে-পিছনে ছুটে।
‘দেইখল্যা কারে? এমন মুরগিমেম্বার? কথা তো ধইরছ য্যান মেম্বার তোমার বদনায় জল ভইরা দ্যায় রোজ!
‘আরে, দেইখছি, দেইখছি। নুরে পাক ধইরছে আর একখান মেম্বার দেইখব্যার পারব না? কও কী?’
‘আমি কোথায় কইল্যাম। তুমিই তো কয়্যা যাও। আমি তো মেম্বারের নাম জিগাইছি। জাইনলে যাইব একবার তার লগে—মেম্বারের কায়দাকানুন শিখব্যার জইন্যে।’
‘এই নৌকাডারে মৈস্তারকান্দির দিকে না যাইয়া ডাইনে বেঁকব্যার কও। তাহালিই তো মেম্বারের ঘাটে নৌকা ভিড়ব,’ প্রবীণের কথায় জোর আসে, যেন জুতমত কথা পেয়ে গেছে আর পেয়ে গেছেই যখন তখন আর সুতো ছাড়তে চায় না। অন্যান্য সকলেই মনে-মনে হিশেবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে—ঐ জায়গা থেকে আড়িয়াল খাঁ যদি সোজা আড়াআড়ি পাড়ি দেয়া যায়, তাহলে তো ফরিদপুরের মাদারিপুর। সেখানে মেম্বার কে?
যোগেন বলে উঠল, ‘দ্যাহো মিয়াঁ, ধোঁকা লাগাইও না।’
‘আরে, তুমি যদি ধোঁকা খাও, তার আমি করব কী? নিজের বন্ধুর পৈঠ্যা ভুইল্যা গেইলা রে মণ্ডল, তোমার বন্ধু –’
‘হে—ই, তুমি নি রসিককাকার কথা কও?
‘কই। রসিকলাল বিশ্বাস।’
‘কী যে কও? নিজের অন্যায্য কথার সাক্ষী খাড়া কইরতে যশোরের মানুষডারে ফরিদপুরে নিয়্যা ফেল্লা?’
‘রসিক বিশ্বাস মেম্বার কী মেম্বার না?’
‘হ্যাঁ। হ্যাঁ। মেম্বার।’
‘দেখি নাই তারে?’
‘দেইখব্যা না ক্যান? সেইডা তো যশোরের।’
‘আরে থাকব্যার পারে যশোরের মিউনিসিপ্যালিটার চেয়ারম্যান হইয়্যা?’
‘চেয়ারম্যান না। ভাইস, ভাইস, ভাইস চেয়্যারম্যান, বামুনগ হারাইল না রসিককাকা আর নৌশের অলি মিইল্যা? নমশূদ্র আর মুসলমান ভোট যোগ হইলে কেউ পারে? এরে কয় ভোটের হিশাব।’
‘সে-ই হিশাবেই তো তুমিও জিতল্যা মণ্ডলমশায়! এই ভোটখান কিন্তু এক জবর কল বানাইছে। আমাগো নাগাল পাটের ছিবড়ার দর উঠাইছে।’
‘রসিককাকার মতন মানুষরে তুমি মুরগি কইল্যা?’
‘তোমার পছন্দ না আইলে তুমি শিবঠাকুরও কইব্যার পারো। যেহানেই যান সেইহানেই তার ষাঁড় হাজির—’
‘আর ফরিদপুর?’
‘তোমার তো মাথায়-মাথায় বয়স রসিক বিশ্বাসের। তাহাইলে তো তোমার স্মরণে থাকা উচিত ছিল।’
‘রসিককাকা সব দিক দিয়াই আমার বড়। স্যায় তো অ্যাহনো কাউন্সিলের মেম্বার। এডা ঠিকই কইছ—ফরিদপুরডা যদি ছাইড়্যা দাও।’
‘ছাড়ব্যার চাইলেই কি ছাড়া য্যায়, মণ্ডলমশায়? রসিক বিশ্বাসই তো তোমাগ সমাজে প্রথম বিধবা বিবাহ কইরল। ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের সাতপাড়ের গয়ালি বিশ্বাসের বড় মাইয়ারে? তাহাইলে আমার হিশাবে ভুলডা কোথায়? রসিক বিশ্বাসের উপর ফরিদপুরের দখল আছে কি নাই?’
‘কত্তা, অ্যাড্ডা কথা জিগাইব্যার চাই’, বড়মাঝি তার ঘাড় না ঘুরিয়েই বলে নিখুঁত হিশেবে, যেন হাওয়া ঠিকঠাক পৌঁছে দেবে তার কথা।
‘একখান ক্যান বড়মাঝিভাই, কী কও?’
‘না—আ। কই কী। শুইনল্যাম নাকী মহাজনের ধার মিটাইব্যার আইন চালু হইছে কুন-কুনখানে। আমাগো এইখানে হইব না?’
‘ভোটে তো এই কথাই উঠছিল। কিন্তু অ্যামন আইন যদি জারিই থাহে, তাহালি সে-কথা নিয়্যা আর চিক্কুর পাড়ার কী ছিল?’ যোগেন বলে।
‘আমার ভাইয়ের বেটির বিয়া হইছে চাঁদপুরে। তা, ধরেন কেন সাল পাঁচ-ছয়। এইবার ইদে জামাই আইস্যা জিগ্যাইল আপনাগ এহানে এই আইন চলে না ক্যান। তাই জিগ্যাই।’
‘চাঁদপুর? কোন চাঁদপুর? ঢাকার না ত্রিপুরার?’
‘না কত্তা, উত্তরের না, পুবের চাঁদপুর।’
‘কইলডা কী জামাই, এডডু ছড়াইয়্যা কও।’
‘ছড়াইয়্যা তো শুনি নাই। ক্যামনে কব?
‘অ্যাহনও মনে আছে তোমার। তাহাইলে তো কথাডা মনের ভিতর জমা আছে?’
‘তা আছে। আমাগ আর কতখান জমি? ফুফা কইল যে বড়ভাইরে জমিত্ লাগাইয়্যা তুই বরং নাওয়ে যা। নাও বানাইতে তো টাকা লাগে। টাকা দিব কেডা? ফুফা কইল ক্যা, জমির মহাজন দিবে! আমরা কইল্যাম, মহাজন তো জমির। স্যায় নদীতে টাকা ঢাইলব ক্যা? তো ফুফা কইল—মহাজনের আবার জমি-নদীর ফারাক কী রে। তার সুদ পাইলেই হইল। আমরা কইল্যাম—মহাজন তো ‘শুধু’ তুইলবে জমির থিক্যাই। এক জমির ‘শুধু’, তার সঙ্গে নাওয়ের ‘শুধু’, সব ‘শুধু’ কইর্যা ধানকাটার পরে ঘরে উঠবে তো ধুলা। প্যাটটা তো আগে সামলাইবার লাগব। ঐডায় হাত দিয়্যা কী অনাহারে পইড়ব? তাও ফুফা বলে—এগুলা তো তোর নিজের কথা, মহাজনের কথাডা মহাজনেরই কইব্যার দে না, যা, যা, মহাজনের লগে ক। ফুফার কথাডা মাইন্য করার জইন্যেই যাই মহাজনের নগত। আমরা তো কথা কইব্যারও পারি না পরিষ্কার কইরা। হালা, হাইলার কথা বলদ বুঝে। মহাজন তো আর বলদ হইব্যার পারে না। আমিই বলদ। হালা, বলদের কথা হাইলা বুঝে। তাই বুইঝ্যা নিল মহাজন। জিগ্যায়—’আরে তুমি তো অ্যাহন একখান নাও বানাইয়্যা সংসারের আয় বাড়াইবার মন করছ? সে তো খুবই ভালা কথা। নতুন আয় না কইরলে নতুন টাহা আইসব কোখন, মণি। তুমি নাওয়ের কামে টাকা চাও। তা না কইর্যা, ডাঙায় নাও বাও ক্যা? আমি কইল্যাম, না, মহাজন, আমার ভুল, আমি পছন্দ করছি আপনি য্যান ডাঙার মহাজন। তাই কইছি। মাপ দ্যান। মহাজন তহন কয়, একখান সিধ্যা কথা শুইন্যা বাড়ি গিয়্যা বিবিরে ডাইক্যা শোও আর বিচার ভাবো। বিচার শ্যাষ কইরবার পাইরলে আইসো। না-পাইরলে, আইসো না। সেই সিধা কথা বুইঝব্যার লাইগ্যা আমারে এক জুম্মাবার রোজা রাইখতে হইল। কিন্তু কথাখান এতডাই কটকইট্যা সোজা যে কিছুতেই ফেগরা বাইর হয় না। মহাজন আমারে একখান নৌকা বানাইয়্যা দিবে, সব খরচা কইর্যাই, নতুন একখান নৌকা। নৌকার যা আয় হইব পাই-পয়সা মহাজনরে দিয়া আইসবার লাগব। নৌকার উপার্জন। আর, মহাজন আমারে প্রত্যেক মাস পয়লায় পঞ্চাশ টাকা কইরা বেতন দিবে। নৌকা মহাজনরে বেতন দিবে রোজের রোজ। মহাজন আমারে বেতন দিবে, মাসে একবার। শ্যাষম্যাষ মহাজনরে গিয়্যা কই, আমি রাজি। তহন মহাজন আমারে বামুনরে খবর দিব্যার কয়—নৌকাটারির শুভদিন দেইখ্যা দিতে। ছয় মাস তো চইল। মাসে-মাসে টাহায় মাইন্যা পাওয়ার তো অব্যাস নাই। সে-অব্যাস পাকা হইল কী হইল না, মহাজন কইল, ‘তোর নৌকা তুই নেগা। আমার যে-টাকা খরচা গেইছে, সেইডা তুই ‘শুধু’ দিবি, ঐ আগের নাখাল। আর, নৌকাডাই তো আমার না। তাহালি তোক মাস-পয়লার মাইনা দিব ক্যান? জামাই যহন কইল, অগ দেশে নতুন আইনে পুরানা ঋণের উপুর শুধু নাই তহন ক্যামন লজ্জায় সইর্যা পইড়ল্যাম। য্যান জামাইগ ঐ চাঁদপুরের থিক্যা আমাগো এই বরিশাল বড় পড়তি জায়গা।’
বড়মাঝি অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছিল। লগি ঠেলার জন্য মাঝে-মাঝে তাকে থামতেও হচ্ছিল। শেষের দিকে একটু হাঁফিয়েও যাচ্ছিল—কথা-বলা আর লগি ঠেলার খাটনিতে। সে যে তার কথা শেষ করেছে—এমন কোনো ইঙ্গিত ছিল না।
যখন সেটা বোঝা গেল তখন তো যোগেনকে ও তার দলবলের কাউকে কিছু একটা কথা বলতে হয়। বলার মত কোনো কথা যোগেন খুঁজে পায় না। বড়মাঝি জানতে চায়—চাষির ঋণমকুবের ব্যবস্থা হয়েছে কী হয়নি। এর শাদা উত্তর, না, হয়নি। তাহলে মাঝির জামাই যে বলল, তাদের জায়গায় হয়েছে, ত্রিপুরার চাঁদপুরে? যোগেন তেমন কোনো ব্যবস্থার কথা শোনেনি। আর জামাই-ই-বা কী বলেছে আর বড়মাঝিই-বা কী বুঝেছে সেটাও তো জানা যাচ্ছে না। বড়মাঝির মহাজন মুসলমান, বড়মাঝিও মুসলমান, যোগেনের সঙ্গে যে-দলবল নৌকোয় যাচ্ছে তারাও সবাই মুসলমান। জাতের কথাডা মনেই আইত না যদি বড়মাঝির মহাজন মুসলমান না হইত। মহাজনি ব্যাবসা মুসলমানগ মইধ্যে কম। অগ ধর্মে সুদ খাওয়া নিষেধ। আর নিষেধ না-থাইকলেও হিন্দু জমিদার আর নতুন পচ্চিমা ব্যবসায়ীগ বাঁধা মহাজনি ব্যবসায় ঢুইকব কুন ফাঁকে। তয়, ছুটোখাটো জায়গায় কি আর মুসলমানি মহাজন দুই-এক টাকা ঢালে না? ঢালে। বড়মাঝির মহাজন তো ধুরন্ধর। পুরা ছয়মাসে নৌকার টাকা দুই গুণে উশুল নিয়্যা, অ্যাহন কিস্তিসুদে আদায় নিচ্ছে। এডার হিশাব তো চক্রবৃদ্ধি হারেও আইসব না। তার উপর সপ্তাহের দুই দিন কিস্তি। এ মহাজন হিন্দুও না, মুসলমানও না, অ্যাহেবারে সংরক্ষিত! নিজের এই রসিকতায় যোগেন খুশিই হয়। তার সঙ্গীদের মধ্যে মহাজনি ব্যাবসার কেউ থাকতেই পারে। তাঁদের দোষ দিয়ে যোগেন কিছু বলেনি।
নৌকোর নীরবতাটা একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছিল।
সেই প্রবীণ গলা থেকে বেরল, ‘তোমরা তো দেহি, ভাগ্যমান। সব জায়গা থিক্যা মহাজনি উইঠ্যা গিছে আর তোমার জায়গায় চাষের মহাজন নৌকায় টাকা খাটায়।’
বড়মাঝি বলে ওঠে, ‘বাজান, বৈঠা বাঁধ।’
ছোটমাঝি লগিটা নৌকোর পাশ ঘেঁষে রেখে তলা থেকে একটা বৈঠা বের করে ফাঁস গলিয়ে জলে নামায়। বেঁকল কোনদিক? ডাইনে না বাম? ডাইনে তো আড়িয়াল খাঁ।
ভোটে যোগেন জমিদারি উচ্ছেদ, মহাজনি উচ্ছেদ এসব নিয়ে কোনো কথা তোলেনি। তার প্রধান, বলা যায়, একমাত্র জোর ছিল—স্থানীয় সব সমস্যার ওপর। কোথাও খাল কাটতে হবে, কোথাও খাল ভরাতে হবে, কোথাও গুড-ওয়েদার ব্রিজ বানাতে হবে। যোগেনের আর-এক জোর ছিল—শিক্ষার ওপর। যোগেন একেবারে মেপেজুখে বলেছে—কত মাইলের মধ্যে স্কুল নাই, আর, থাকলেও খাল-বিল-নদীনালার জন্য সে স্কুলে ছাত্র-যাওয়ার পথ নাই। শিক্ষার অভাবেই মুসলমান ও শুদ্দুর হিন্দুরা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে পারে না। যোগেন বলত—থানার দারোগা কজন হিন্দু আর কজন অহিন্দু, মানে মুসলমান আর নিম্ন হিন্দু। কাউরে তো এই বইল্যা গালি পাড়ন যায় না যে তুই ক্যান ম্যাট্রিক পাস দিলি। এ-কথাডা তো কইতে পারে এক-বেটার পাঁচ-ছয়খান বৌয়ের একডাই শাশুড়ি-আমার যখন ম্যাট্রিক পাস হয় নাই—বৌয়ের তাহালি ম্যাট্রিক পাসের হাউস উঠে ক্যান? শিক্ষাডারে সব থিক্যা বেশি মূল্য দিয়া শিখতে হবই। যোগেন যে ঋণখালাসি, মহাজনি, জমিদারি এ-সব নিয়ে তার কী কর্তব্য তা জানানি, তেমনি তাঁদের শ্রোতাদেরও খুব খেয়াল হয়নি। ‘কংগ্রেসের বিরুদ্ধে’ মানেই তো জমিদারির বিপক্ষে। এর আবার কহনের কী? কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লিগ এখানে কোনো প্রার্থী দেয়নি। তার মানেই তো—জমিদারি-মহাজনি রাইখতে চায়—কংগ্রেস আর লিগ, নিজ-নিজ জমিদারগ। এদিকে কৃষক-প্রজা পার্টিও তো কোনো প্রার্থী দেয়নি। তার মানে তো মণ্ডলই বাখরগঞ্জ উত্তর সাধারণ আসনে কৃষক-প্রজার প্রার্থী।
‘আইন যদি হইয়া থাকে, তাহালি তোমার জামাইয়ের জায়গাতও হইবে, জামাইয়ের শ্বশুরের জায়গাতও হইব। কিন্তু একখানা সত্যি কথা কইবা বড়মাঝি?’ যোগেন তার দলবলের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে, যেন তাদেরও কেউ জবাব দিতে পারে।
‘আগে শুনি মেম্বার শাহেব। যা জিগাইবেন তা যদি সত্যি হয়, তাইলে আমার জবও সত্যি হবার পারে।’
প্রশ্নেরও সত্যিমিথ্যে থাকতে পারে—এমন একটা কথা বরিশালের জলরাশি পাড়ি দিতে-দিতে এই মাঘের রাত্রিতেও ঘেমে-নেয়ে-ওঠা এক মাঝবয়েসি মাঝির কাছে যোগেন শুনল। সে মাঝি পুরুষানুক্রমে চাষি। আয় বাড়াতে মহাজনের কাছে টাকা নিয়ে খেয়া চালাচ্ছে। তার মহাজন কত সুদ নিচ্ছে তা বড়মাঝি জানে না। প্রথম ছ-মাসেই মহাজন যে তার কাছ থেকে ঋণের টাকার দ্বিগুণ ও তার সঙ্গে সুদ উশুল করে নিয়েছে—এ-কথা হিশেবের অঙ্কে বোঝার ক্ষমতা বড়মাঝির যে দুই পুরুষেও হবে না, সে তো দেখাই যাচ্ছে—ছেলেও তো লগি ঠেলছে। এ লোকটি তবু রাজনীতি বুঝে নিতে চাইছে তার মত করে—নইলে কংগ্রেসকে ভোট দেয়া নিয়ে তার ছেলে তার পেছনে লাগত না, নইলে সে যোগেনের প্রশ্নের জবাবে এমন করে বলতে পারত না—প্রশ্নের সত্যমিথ্যার ওপর জবাবের সত্যমিথ্যা নির্ভর করে। বড়মাঝি মণ্ডলকে তার সমগোত্রীয় ভাবে বলেই কথাটা বলতে পারল। এই বড়মাঝি জানে—মণ্ডল মেম্বার হতে পারে, সে তো সরকারের আইনকানুনের ব্যাপার। কিন্তু মণ্ডল কখনো শাসক হতে পারে না। মণ্ডল নমশূদ্র। বড়মাঝি নিজেকে যেমন শাসিত ভাবে, মণ্ডলকেও তাই ভাবে। মণ্ডলকে যদি মালিক ভাবতে পারত, তাহলে, বড়মাঝি নিজেকেও অন্তত আংশিক মালিক ভাবত।
