দ্য অ্যামিটিভিল হরর – ২

দ্বিতীয় অধ্যায় 

গির্জায় যাজকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, গির্জায় আসা পরিবারগুলোকে নানান ব্যাপারে পরামর্শও দিয়েও থাকেন ফাদার ফ্রাংক ম্যানকুসো। অতিপ্রাকৃত ব্যাপার- স্যাপারে তার অভিজ্ঞতা একটু কম। এছাড়া কোনো পরিবারের অল্প-বয়স্ক ছেলে- মেয়ে বখে গেলে তাদের আশ্রমে রেখে আসার ব্যবস্থাও তিনি করেন। 

সেদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই এক অদ্ভুত অস্বস্তি ঘিরে ধরল তাকে। মনের মধ্যে কেন যেন খচখচ করছে। কিন্তু হলোটা কী? নাহ, কোনো বিশেষ ব্যাপারে দুশ্চিন্তা তার নেই। তারপরেও এমন কেন লাগছে? পরবর্তীতে আমাদের কাছে সেই সময়কার মানসিক অবস্থা তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে, “ঠিক বোঝাতে পারব না… কেন যেন মনে হচ্ছিল খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে!” 

সারাটা সকাল তিনি নিজের লং আইল্যান্ডের অ্যাপার্টমেন্টে অস্থিরভাবে পায়চারি করে কাটিয়ে দিলেন। “আজ বৃহস্পতিবার,” মনে মনে ভাবলেন তিনি, “লিন্ডেনহার্স্টে দুপুরের খাবার খেয়ে লুজদের নতুন বাড়িটাতে যেতে হবে। ওরা চায় প্রথম দিন আমি বাইবেলের কয়েকটা শ্লোক আওড়ে ওটাকে শুদ্ধ করি। এরপর আমার মায়ের বাড়িতে যেতে হবে, ওখানেই রাতের খাবার খাব, ব্যস্ত একটা দিন।” 

দুই বছর আগে জর্জ লি লুজের সাথে পরিচয় ফাদার ম্যানকুসোর। ক্যাথিকে আরও আগে থেকেই চেনেন। মূলত জর্জ একটা মেথোডিস্ট[৪]। অন্য সব ক্যাথলিক গির্জা জর্জ আর ক্যাথির বিয়েতে অমত দিলেও ফাদার ম্যানকুসো নিজ উদ্যোগেই ওদের বিয়ে দিয়েছেন। একটা কথা আগে বলা হয়নি, ক্যাথির আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। তিন সন্তানের বাবাও জর্জ নয়, বরং আগের স্বামী। সেই ভদ্রলোক ছিল ক্যাথলিক, ক্যাথিও ক্যাথলিক। তিন ছেলে-মেয়েও ক্যাথলিক আদর্শেই বেড়ে উঠছে। আসলে ভেতরে ভেতরে ফাদারের মনে একটু সন্দেহ কাজ করে, যদি জর্জ কখনও বাচ্চাদের নিজ আদর্শে গ্রহণে উৎসাহিত করে? তবে? মূলত এই বাচ্চাগুলোর কথা ভেবেই তিনি লুৎজ পরিবারকে অনেক সময় দেন। 

[৪. মেথোডিজম হলো খ্রিষ্টান ধর্মের প্রোটেস্টান্ট মতবাদের একটি বিশেষ শাখা। এই মতবাদে বিশ্বাসীদের বলা হয় মেথোডিস্ট। ]

ডিয়ার পার্কের বাড়িতে থাকার সময়ে বেশ অনেকবারই ফাদারকে দুপুর আর রাতের খাবারের দাওয়াত দিয়েছিল জর্জ আর ক্যাথি। ফাদারেরও ইচ্ছা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গির্জার ব্যস্ততার কারণে আর যাওয়া হয়নি। কিন্তু এবার রীতিমতো জেদ চেপে বসেছে জর্জের, সে বেশ কয়েবার ফোন করে বলেছে, “ফাদার আমাদের নতুন বাড়িতে ওঠার দিন কিন্তু আপনাকে থাকতেই হবে। ক্যাথি চায় আপনি বাড়িটাকে শুদ্ধ করবেন।” 

“বেশ বেশ, যাও কথা দিলাম। ১৮ ডিসেম্বর ওখানে গিয়ে তোমাদের আশীর্বাদ করে আসব,” প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফাদার। 

তবে আগে লিন্ডেনহার্স্টে চার জন পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে হবে, দুপুরের খাবারটাও ওখানেই খাওয়া হবে। এরা চার জন একদম ওনার ছাত্রজীবনের বন্ধু, একসাথে অনেক কিছুই শিখেছেন তারা। 

পুরো লং আইল্যান্ডের যাজকমহলে ভালোই নাম হয়েছে ফাদার ম্যানকুসোর। অনেক অনুষ্ঠানেই ডাক পান তিনি। বন্ধুরা অবশ্য তেমন বিখ্যাত কেউ হতে পারেনি। ওনাদের মধ্যে কয়েকজন তো ভেবেই বসে আছে যে এত নাম-ডাকের কারণেই আকাশে উড়ছেন ম্যানকুসো, তাই দেখা করার সময়টাও হয় না। আসলে সারাদিন এতটাই ব্যস্ততা থাকে, যে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে আসা খুবই কঠিন ম্যানকুসোর জন্য। তবে আজ এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে। লিন্ডেনহার্স্ট থেকে অ্যামিটিভিল মাত্র কয়েক মাইল দূরে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে, খেয়ে-দেয়ে আরামসে জর্জ আর ক্যাথিদের বাড়িতে যাওয়া যাবে। 

আড্ডাটা বেশ জমল, দুপুরের খাবারটাও বেশ মজার ছিল। কিন্তু কেন যেন পুরোটা সময়ই মনমরা হয়ে রইলেন ফাদার ম্যানকুসো। অশুভ একটা অনুভূতি ভিতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে উনাকে। কিছুই ভালো লাগছে না। 

“এই শোনো, তোমরা থাকো, আজ আমি যাই,” উঠে দাঁড়ালেন ফাদার, “একটা বাড়িতে যেতে হবে। ওই, শুদ্ধীকরণ… বুঝলে? 

“তা কোথায় সেই বাড়ি?” বলে উঠলেন এক বন্ধু।

“অ্যামিটিভিল।” 

“অ্যামিটিভিলের কোথায়?” হেসে উঠলেন আরেক বন্ধু, “ওটা তো বেশ বড়ো এলাকা।” 

“১১২ নম্বর বাড়ি, ওশান অ্যাভিনিউ,” পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ঠিকানাটা দেখে নিলেন ম্যানকুসো, “আমার পরিচিত এক তরুণ দম্পতি আর তাদের তিন ছেলে-মেয়ে উঠেছে ওখানে। “ 

“ডিফেওদের বাড়ি,” চমকে উঠলেন ওনার সামনে বসে থাকা বন্ধু! 

“নাহ… ওটা লুজদের বাড়ি। জর্জ আর ক্যাথলিন লুজ।” 

“তোমার কি ডিফেওদের বাড়ির সেই ঘটনা মনে নেই ফ্রাংক?” টেবিলের ডানে বসা একজন বন্ধু বললেন, “ওই যে গত বছর? ওদের ছেলেটা রাতের বেলা ঘুমন্ত অবস্থায় নিজের মা-বাবা, দুই ভাই আর দুই বোনকে গুলি করে হত্যা করেছিল! কী ভয়ংকর ঘটনা… স্থানীয় সব খবরের কাগজেই তো ছাপা হয়েছিল খবরটা, জাতীয় দৈনিকগুলোকেও এসেছিল। ওই ভয়ংকর বাড়িটাতে যাচ্ছ?” 

ভাবতে লাগলেন ফাদার ম্যানকুসো। তিনি সাধারণত খবরের কাগজ পড়েন না। মাঝে মাঝে হুটহাট হাতে নিয়ে কিছু খবর দেখেন। ওই বাড়িতে যে এত ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটেছিল তা বলতে গেলে তিনি শোনেনইনি (হয়তো আশেপাশের কিছু মানুষ আলোচনা করেছিল, কিন্তু ফাদার পাত্তা দেননি)! 

“আসলে আমার মনে পড়ছে না,” উত্তর দিলেন তিনি, “শুনেছিলাম হয়তো… কিন্তু ততটা পাত্তা দিইনি, তাই মনে নেই।” 

“কী বলো ফ্রাংক! এমন একটা ঘটনা তোমার মনে পড়ছে না? পুরো লং আইল্যান্ডের মুখে মুখে ছিল এই কাহিনি!” 

‘শোনো, একটা কথা বলি। তুমি ওই বাড়িতে যেয়ো না। ওটা অশুভ,” গম্ভীর কণ্ঠে বললেন সামনে বসে থাকা বন্ধু। 

“উপায় নেই বন্ধু, আমি ওদের কথা দিয়েছি।” 

গাড়ি চালাতে চালাতে ফাদারের অস্বস্তিটা আরও বেড়ে গেল। বাড়িটাতে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার বিবরণ শুনে তেমন ভাবান্তর হয়নি তার। এমনটা তো কত বাড়িতে ঘটে। এটা সকালের সেই পুরোনো অস্বস্তিটাই… 

আগেই বলেছি, ফাদার বাড়িটাতে পৌঁছান দুপুর দেড়টার দিকে। লুজদের বাড়ির সামনের গাড়ি রাখার জায়গাটাতে বেশ ভিড়। তাই রাস্তাতেই নিজের পুরোনো ফোর্ড গাড়িটা পার্ক করলেন তিনি। বিরাট বাড়িটা দেখে একটু অবাকই হলেন ফাদার! এত বড়ো বাড়ি কিনে ফেলল ওরা! যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালোই। ক্যাথি আর বাচ্চাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছে জর্জ। 

গাড়ি থেকে পবিত্র পানি এবং আরও নানান সরঞ্জাম নিয়ে নামলেন ফাদার। ধীরে ধীরে উঠান দিয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। বাড়িটাকে শুদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ভেতরে ঢুকে কিছু মন্ত্র পড়ে পবিত্র পানি ছিটিয়ে দিলেন তিনি। ঠিক তখনই পিছন থেকে গম্ভীর এক পুরুষ কণ্ঠ বলে উঠল, “বেরিয়ে যাও, এখনই বেরিয়ে যাও…” 

সাথে সাথে ঘুরে তাকালেন ফাদার। পরক্ষণেই বিস্ময়ে তার চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা! কথাগুলো পিছন থেকেই কেউ বলেছে সেই ব্যাপারে সন্দেহ নেই। অথচ ধারে-কাছে কেউ নেই! পুরো ঘরে তিনি একা! কে বলল তবে ওই কথাগুলো? জর্জ? কিন্তু সে কেন ওনাকে বেরিয়ে যেতে বলবে? রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে পুরো বাড়ির সবগুলো ঘরে পবিত্র পানি ছিটিয়ে দিয়ে শুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়া শেষ করলেন ফাদার। পুরোটা সময়ই তার মনে হচ্ছিল যে কেউ তাকে দেখছে! যা-ই হোক, জর্জ আর ক্যাথিকে কিছুই জানালেন না। 

“আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ ফাদার,” হাসিমুখে বলল জর্জ, “মালামালগুলো ঠিকমতো বাড়িতে ঢোকানো নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত যে আপনার সাথে আর আড্ডা মারা হলো না। এক কাজ করুন না… রাতের খাবারটা আমাদের সাথেই খেয়ে যান। হাজার হলেও নতুন বাড়িতে আমাদের প্রথম রাত!” 

“না না,” মৃদু হাসলেন ফাদার, “আজ আর হচ্ছে না, বাবা। মাকে কথা দিয়েছি, ওনার বাড়িতেই রাতের খাবার খাব। উনি নাসওতে থাকেন, বুঝতেই পারছ অনেকটা পথ যেতে হবে। যাই তবে ঠিক আছে? মা অপেক্ষা করছেন।” 

“কিন্তু ফাদার, আপনি এত কষ্ট করে এলেন। কিছু খাবেন না?” কপট রাগ দেখাল ক্যাথি, “ধুর! ব্যাপারটা কেমন যেন হয়ে গেল!” 

‘এক কাজ করি তবে ফাদার। আপনি কাল গির্জায় একটা ভোজসভা করুন, আমরা খরচ দিয়ে দিচ্ছি, হাসল জর্জ। 

“আরে ধুর।” 

“তাহলে এক বোতল কানাডিয়ান ক্লাব হুইস্কি? আমাদের বেশ কয়েকটা আছে,” চোখ নাচাল জর্জ। 

“আরে না, তোমরা আমার বন্ধুর মতো। বন্ধুদের কাছ থেকে এসব নিতে নেই।” 

ফাদারকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো লুৎজ দম্পতি। গাড়িতে উঠে কাচ নামিয়ে ফাদার বললেন, “তোমাদের এত বড়ো বাড়ি দেখে খুবই ভালো লাগছে, বুঝলে? আশা করি তোমরা দু’জনে আজীবন এভাবেই একসাথে থাকবে।” 

“আমাদের আশীর্বাদ করবেন ফাদার,” হাসল ক্যাথি। 

“সে আর বলতে, যাইহোক জর্জ…” হুট করেই গম্ভীর হয়ে গেলেন ফাদার, “তোমাদের এখানে আসার আগে লিন্ডেনহার্স্টে আমার কিছু বন্ধু-বান্ধবের সাথে দুপুরের খাবার খেলাম। তোমাদের বাড়ির ঠিকানা শুনে ওরা জানাল যে এটা ডিফেওদের বাড়ি… এখানে না-কি খুনখারাবি হয়েছিল… কোম্পানি তোমাকে এসব জানায়নি?” 

“হ্যাঁ বলেছিল তো। সেই কারণেই হয়তো এত কম দামে বাড়িটা আমরা পেয়ে গেছি। নইলে এই বাড়ির দাম মাত্র আশি হাজার হয়? অনেক দিন পড়ে ছিল বাড়িটা। কেউই নেয়নি, মানুষের কুসংস্কার নিয়ে আর কী বলব! যা-ই হোক ওসব নিয়ে আমরা ভাবি না। অসাধারণ একটা বাড়ি কম দামে পেয়ে গেছি… একদিক দিয়ে মানুষজন এটা থেকে দূরে থাকায় ভালোই হয়েছে।” 

“কী একটা ভয়ংকর ব্যাপার, বলুনতো ফাদার,” থমথমে মুখে বলল ক্যাথি, “ছ-ছ’টা মানুষকে ঘুমন্ত অবস্থায় খুন! একবার ভেবে দেখুন, কত কষ্ট পেয়ে মারা গেছিল ওরা… বেচারা ডিফেও পরিবার।” 

“সেটাই, তোমরা ভালো থেকো,” মাথা নাড়লেন ফাদার, তারপর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তিন বাচ্চার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হেসে হাত নেড়ে গাড়ি ছেড়ে দিলেন। কুইনসের দিকে এগিয়ে চলল ফাদারের গাড়ি। 

বিকাল চারটার দিকে ট্রাকে করে আনা প্রায় সব জিনিসই বাড়ির মধ্যে ঢোকানো হয়ে গেল। কিছু জিনিসপত্র তখনও পুরোনো বাড়িটাতে থেকে গেছিল। ট্রাকটা চালিয়ে আবার ১১২ নম্বর, ওশান অ্যাভিনিউ থেকে ডিয়ার পার্কে এলো জর্জ। পুরোনো বাড়ির গ্যারেজের দরজা একটু উঁচু করতেই ওদের পোষা কুকুর হ্যারি মাথা বের করল। সারাদিন জর্জকে দেখতে না পেয়ে অস্থির হয়ে ছিল মনে হয়। সংকর জাতের কুকুর, আধা ম্যালামুট আধা ল্যাব্রেডর। বেজায় চটপটে আর সতর্ক। মালামালগুলো পাহাড়া দিতে ওকে রেখে গেছিল জর্জ। সব জিনিসপত্র তোলা শেষে হ্যারিকে নিয়ে ট্রাকে উঠে গেল সে। 

ওদিকে নাসওতে যাওয়ার পথে ফাদার ম্যানকুসো অ্যামিটিভিলের সেই ঘটনা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। কোনো যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করা যায় কি? না-কি কেউ সত্যি সত্যিই ওনাকে চলে যেতে বলেছিল! কিন্তু কে বলবে অমন কথা! গির্জাতে মাঝে মাঝেই ওনার কাছে কিছু লোক আসে, যারা অদৃশ্য মানুষদের কণ্ঠস্বর শোনার দাবি করে। ভূতুড়ে কণ্ঠ আরকি… যদিও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এটা বুঝেছেন যে এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসলে সাইকোসিসের উপসর্গ। এদের যাজকের কাছে না গিয়ে মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। তাহলে তিনি কি কোনো কারণে মানসিক স্থিরতা হারিয়েছেন? ধুর, একটু অস্বস্তিতে আছেন, তাই বলে মানসিকভাবে অসুস্থ? হতেই পারে না। 

[৫. সাইকোসিস হলো সেই সমস্যা, যেখানে একজন মানুষ তার চারদিকের পরিবেশের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে পারে না। ইংরেজিতে বলে ‘রিয়েলিটি ডিসটরশান’। মানুষের সঙ্গে থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা, নিজস্ব এক জগতের ভেতর ডুবে থাকে। চিন্তা, চেতনা, ভাবনা, আচার- আচরণ, কাজ, বিশ্বাস, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সবকিছুতেই অসংলগ্নতা স্পষ্ট।]

মায়ের বাসায় পৌঁছে দরজা নক করলেন ফাদার। 

দরজা খুলে ছেলেকে দেখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল মায়ের মুখে, “এতক্ষণে আসার সময় হলো তোমার?” পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে ফেললেন তিনি, “কী হয়েছে তোমার ফ্রাংক? শরীর ভালো নেই না কি?” 

“একটু খারাপ,” মাথা নাড়লেন যাজক, “খুব বেশি না।”

“বাথরুমে গিয়ে একবার আয়নায় নিজের মুখটা দেখো।” 

আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠলেন ফাদার ম্যানকুসো। দু’চোখের নিচে কালশিটের দাগ স্পষ্ট। একটু বেশিই কালো… প্রথমে ফাদার ভাবলেন যে গাড়ি চালাতে গিয়ে ধুলোময়লা লেগেছে। বেশ কয়েকবার মুখ ধুলেন তিনি। কিন্তু দাগগুলো গেল না। সাবান দিলেন, কিন্তু ফলাফল একই। 

.

ওদিকে হ্যারিকে নিয়ে অ্যামিটিভিলে ঢুকল জর্জ। কুকুর রাখার জায়গাটা সামনের গ্যারেজের পাশেই। বিশ ফুট লম্বা একটা ইস্পাতের শিকল দিয়ে কুকুরটাকে বেঁধে রাখল সে। ততক্ষণে সন্ধ্যা ছ’টা বেজে গেছে। খুবই ক্লান্ত লাগছিল জর্জের। বাদবাকি মালামালগুলো ট্রাকেই রেখে দিলো সে, পরেরদিন বাড়ির ভেতর আনা যাবে। অতিরিক্ত একদিন ট্রাকটা রাখার জন্য পঞ্চাশ ডলার বেশি দিতে হবে তাকে, কিন্তু কী আর করা? ভেতরে ঢুকে বসার ঘরের জিনিসপত্রগুলো গোছাতে শুরু করল সে। কোথায় কোন জিনিসটা থাকবে সেটা ক্যাথি আগে থেকেই ঠিক করে দিয়েছে। এসব ব্যাপারে বেজায় খুঁতখুঁতে মেয়েটা। 

.

রাত আটটার দিকে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন ফাদার। কুইন্সের ভ্যান উইক মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল ওনার গাড়ি। হুট করেই তিনি খেয়াল করলেন যে গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছে… রাস্তার ডানদিকে সরে যাচ্ছে। পাশ থেকে অন্য কোনো গাড়ি ধাক্কা দিচ্ছে না কি? তাড়াতাড়ি চারপাশটা খেয়াল করলেন তিনি। সামনে-পিছে, ডানে-বামে পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে কোনো গাড়ি নেই! তাহলে কেন অমন হচ্ছে? 

অনেক কষ্টে গাড়িটাকে সড়কের মাঝখানে নিয়ে এলেন তিনি। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর হুট করেই গাড়ির ছাদটা খুলে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল উইন্ডশিল্ডে। আঘাতের চোটে ঝালাই করা একটা কবজা ছুটে গেল… বিকট শব্দ করে খুলে গেল ডানের দরজাটা। মরিয়া হয়ে ব্রেক কষতে লাগলেন ফাদার, কিন্তু গাড়ি থামল না! দুই মিনিট এভাবেই চলল… তারপর নিজে থেকেই ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। 

অনেক কষ্টে গাড়ি থেকে নেমে কাছের একটা ফোনবুথে এসে তিনি ফোন করলেন আরেক যাজক বন্ধুকে। ভদ্রলোকের বাড়ি এই সড়কের কাছেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের গাড়ি নিয়ে চলে এলেন উনি। ম্যানকুসোকে সাথে নিয়ে কাছের একটা গ্যারেজে পৌঁছলেন তিনি, সেখান থেকে একটা টো-ট্রাক ভাড়া করে তারা আবার এলেন সড়কে পড়ে থাকা ম্যানকুসোর গাড়িটার কাছে। ট্রাকে করে গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হলো গাড়িটা। মেকানিক বেশ ভালো করে দেখলো ওটা, অনেকভাবে চেষ্টা করল… কিন্তু পুরোনো ফোর্ড গাড়িটা আর চালু হলো না। সে ফাদারকে বলল গাড়িটা রেখে যেতে। সেটাই করলেন ফাদার ম্যানকুসো, বেজায় ক্লান্ত লাগছিল তার। বন্ধুর গাড়িতে করে তিনি ‘সেক্রেড হার্ট রেক্টরি’-তে এসে নামলেন। ওখানেই ওনার অ্যাপার্টমেন্ট। 

.

আবার আমরা অ্যামিটিভিলে ফিরে যাই। সারাদিন এত কাজ করে জর্জের শরীর যেন আর চলছিল না। এখন একটু আরাম করে না বসলেই নয়। ডিফেওরা বসার ঘরে গান শোনার জন্য বেশ ভালো একটা সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করেছিল, জর্জ ঠিক করল সেটার সাথে নিজেদের স্টেরিও সেটটা জুড়ে দেবে। তারপর কিছু পপ গান বাজিয়ে সে আর ক্যাথি নাচতে পারবে। এমন পরিশ্রমের পর একটু আমোদ-ফূর্তি না করলেই নয়! 

নতুন বাড়িতে প্রথম রাতে আর কী লাগে! 

জর্জ যন্ত্রদুটো জুড়ে দেওয়ার কাজ শুরু করতে যাবে ঠিক তখনই বাইরে থেকে হ্যারি অদ্ভুতভাবে ডাকতে শুরু করল। কাজের শুরুতেই বাধা! দৌড়ে ঘরে এসে ঢুকল ড্যানি, “বাবা, একটু এসো, হ্যারি কেমন যেন করছে।” 

জর্জ দৌড়ে বাইরে এলো। বেড়া টপকাতে গিয়ে লাফ দিয়ে নিজের গলাতেই শিকল পেঁচিয়ে বেচারা হ্যারির যাচ্ছেতাই অবস্থা! বেড়ার খুঁটির সাথে আটকে গেছে শিকলটা। আরেকটু হলে দমবন্ধ হয়ে মরেই যেত বেচারা কুকুরটা। তাড়াতাড়ি করে ওকে ছাড়াল জর্জ, তারপর শিকলটা একটু পেঁচিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে দিলো সে। এতে করে ওটা খানিকটা ছোটো হয়ে গেল, এবার হ্যারি চাইলেও লাফ দিতে পারবে না। ঘরে ঢুকে আবার স্টেরিও সেটটায় হাত দিলো জর্জ। 

*** 

ওদিকে এক ঘণ্টা হয়ে গেছে ফাদার ম্যানকুসোর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার। হুট করেই ওনার টেলিফোনটা বেজে উঠল। 

“হ… হ্যালো,” কোনোমতে ফোনটা ধরলেন ফাদার। 

“আরে ফ্রাংক,” ওনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া বন্ধু করেছিল ফোনটা, “তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসার পথে অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটল বুঝলে? 

“ক….. কী ঘটেছে?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ম্যানকুসো। 

“রাস্তার মধ্যেই আমার গাড়ির উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারদুটো আপনি-আপনি চালু হয়ে গেল! কী জোরে জোরে নড়ছিল ও দুটো! অনেক চেষ্টা করেও থামাতে পারলাম না। আমার বাড়ি আসতেই হুট করে থেমে গেল। এসব কী হচ্ছে বলো দেখি? স্পষ্ট মনে আছে… ওয়াইপার আমি চালু করিনি। 

*** 

রাত এগারোটা বাজে। লুৎজ পরিবার ঘুমাতে যাওয়ার তোড়জোড়ে ব্যস্ত। নতুন বাড়িতে প্রথম রাত… বাচ্চারা অনেক খুশি। 

বাইরে বেজায় ঠান্ডা পড়েছে। তাপমাত্রা সম্ভবত মাইনাস ছয় ডিগ্রি। 

জিনিসপত্র বের করার পর বেশ কিছু খালি কার্ডবোর্ডের বাক্স জমেছে ওদের। ওগুলো ফায়ারপ্লেসে ফেলে দিলো জর্জ। গনগনিয়ে জ্বলে উঠল আগুন। 

“এগুলো বেশ ভালো জ্বলে, তাপও বেশি,” হেসে উঠল জর্জ। 

ঘুমাতে চলে গেল ওরা। তারিখটা ছিল ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৭৫। ওশান অ্যাভিনিউয়ের ১১২ নম্বর বাড়িটাতে ওদের কাটানো আটাশ দিনের মধ্যে প্রথম দিন!