কুবেরের বিষয় আশয় – ৩১

॥ একত্রিশ ॥

এখান থেকে ডাকলে নগেন কিছুতেই শুনতে পাবে না। দূরে নিজের বাড়ির বারান্দায় বুলু দাঁড়িয়ে—না, একখানা শাড়ি ঝুলছে বোঝার উপায় নেই। পরিষ্কার জ্যোৎস্নার সঙ্গে সব সময় কিছুটা করে ধোঁয়া মেশানো থাকে। কুবের মাথা নীচু করে রুপোলী দড়িটা ফিরে দেখতে পেল। সাপটা বেশিদূর যায়নি। আহারে বেরিয়েছে। এই নিশুতি রাতে কিছু ব্যাঙ, বে-আক্কেলে পোকামাকড় বেরোবেই। ধরা দিতে হবেই বুঝে ওগুলো আর একদম নড়ে না।

কুবের অবাক হয়ে গেল। সাপটা তাকে চিনতে পেরেছে। একটু মাথা তুলে নমস্কারও করল। কুবেরও চিনেছে। জায়গা মাপার দিন দিব্যি আলে আলে ঘুরে কুবেরের ওপর নজর রেখে ছিল। সেদিন সারভেয়ার রায় মশায়ের কি আপসোস—লোহার গজ কাঠিখানা সঙ্গে আনেনি।

‘আমি ভালো আছি। আপনি?’

সাপটা কোন জবাবই দিল না। তড়তড় করে চলে গেল। এস কে, বোসের তেতলা বাড়ির ছায়া পেরোতেই রুপোলী একটা রেখাকে কুবের তীরবেগে যেতে দেখল। ওর বাসা কুবের চেনে। কোণের খেজুর তলার বাঁ হাতে। সেখানে মাটি কিছু ঢিবি হয়ে আছে। বর্ষাকালে ইঁদুররা ওই তল্লাটে গর্ত করে চোরাই ধান এনে জমা করে। তারপর একদিন সাপরা সেইসব বানানো বাসার দখল নেয়।

গেছে বেশ বেগে। কিন্তু লেজের ঘষায় সারা তল্লাটের জ্যোৎস্না সোনালী আলোর গুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়েছে। কুবের আর চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। যেদিকে দেখে—শুধু রাশি রাশি হলদে আলোর ধান। ইচ্ছে করলেই সেইসব আলোর গুঁড়ো দু’হাতের আঁজলায় ভরে তুলে নিয়ে খুশিমত ছড়িয়ে দেওয়া যায়—ছিটিয়ে পড়বার সময় তা নির্ঘাত ধান হয়ে ছিটকে পড়বে।

‘নগেন—’

ভোরে সৃষ্টিধর, কুসুমকে ওদের বাবা দেখাতে না পেরে বুলু কিছু অস্বস্তিতে পড়ল। দেবেন্দ্রলালকে ছেলে দেখাতে না পেরে লজ্জায়, অপমানে বুলুর চোখে জল আসছিল। সকাল সকাল পুকুরে নামল দেবেন্দ্রলাল। কাল সারারাত জ্যোৎস্নায়, ঘুমে, শান্তিতে কেটেছে। জাহাজের গল্প শুনে সৃষ্টিধর সব সময় ইঞ্জিনঘর, বয়লার নয়ত ডেক এইসব নিয়ে আছে। পুকুরে অল্প জলে দাঁড়িয়ে পা দাপালো, তারপর জানতে চাইল, ‘দাদু জাহাজ চলে যাওয়ার পর নদীতে খুব ঢেউ হয়—’

‘চারদিকের নৌকোগুলো দুলতে থাকে—’, দেবেন্দ্রলাল আর কিছু মনে করতে পারল না। একটা ছবি অনেকদিন তার মনে ছিল—সন্ধ্যের অন্ধকারে ‘ফ্লোরিকান’ স্টার্ট নিয়ে বেরিয়ে গেল—মাইলখানেক চলে গেছে—ঠিক তখন কোত্থেকে মানুষপ্রমাণ সব ঢেউ এসে জেলখানার ঘাটে ভাসানো জেটি এলোপাথাড়ি কাঁপাতে লাগল।

কুসুমের জলে খুব ভয়। একবার তার বাবার হাতে সাঁতার শিখতে গিয়ে ভরপেট জল খেয়েছিল। সেই থেকে বাথরুমে চান করে। পরিপাটি সিঁথি কেটে কপালে সিঁদুরের টিপ পরে ঠানদিদি হয়ে ঘাটে বসে আছে। দেবেন্দ্রলাল কথা দিয়েছে, আজ ওদের শিবতলায় নিয়ে যাবে। কত মজা হবে—অনেক লোক আসবে। সৃষ্টিধর, কুসুম এমন অন্যমনস্ক হয়ে এই পেল্লায় বাড়ি, খালপাড়ে একা একা ঘোরে—দেখেই ছাঁৎ করে উঠেছিল দেবেন্দ্রলালের মন। একেবারে অনাথ শিশু।

একেবারে দুপুর পার করে দিয়ে কুবের ফিরল। সারাদিনের জ্বালাধরা রোদ সোজাসুজি মুখে নিয়েছে, চোখে নিয়েছে—উসকো -খুসকো চুল, হাঁটু অব্দি কাদা, চোখ লাল।

ছেলেমেয়ে ঘুমোচ্ছে। বসার ঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে দেবেন্দ্রলাল খবরের কাগজ ওলটাচ্ছিল। কুবেরকে দেখেও উঠল না।

বুলু নিঃশব্দে তোয়ালে, সাবান রেখে এল বাথরুমে। কুবের তারপর সাওয়ারের নীচে জামাকাপড়সুদ্ধ গিয়ে দাঁড়াল। বাথরুমের দরজা খোলা। বুলু টেবিলে প্লেট দিচ্ছিল। হঠাৎ দেখল, খোলা বাথরুমে জলের ধারার নীচে চোখ বুজে কুবের দাঁড়িয়ে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।

একবার নীচে উঁকি দিয়ে দেখল বুলু। দেবেন্দ্রলাল এখন ওপরে উঠবে না। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর একটানে কুবেরের গা থেকে ভিজে শার্ট খুলে নিল। নাভি থেকে বুকের বাঁ দিকের অনেকটা জুড়ে কালচে শ্যাওলা পুরু হয়ে পড়েছে। ডলে দেখল,ওঠে না। কুবের ঝিমধরা গলায় খুব আস্তে বললে, উঃ! লাগে—’

কিছু না বলে বুলু সাবান ঘষতে লাগল, ‘কতদিন চান করোনি বলত—’

‘সাঁইত্রিশ বছর—’

‘পুরো সাঁইত্রিশ?’

‘একজাক্‌টলি ছত্রিশ বছর একুশ দিন। তেরোশো ঊনচল্লিশের চৈত্রে এই ওয়ারল্ডে পা দিয়েছিলাম-’

‘বেশ পুরনো মডেল তো! তোমার ব্রজদার ওখানে আজ গাড়িগুলো যাবে কিন্তু! নাও আর জ্বালিও না। ধুতিটা ছেড়ে ফেল। হাঁটুতে কতকাল সাবান দাওনি?’

‘লাভ নেই বুলু! ও দাগ ওঠার নয়।’ হঠাৎ খুব মুডের মাথায় কুবের বললো, ‘আচ্ছা—যদি খুব ভাল ডাক্তার দেখাই—তাহলে ফুল কিওর হয়ে যাব?’

‘কি হয়েছে তোমার? এত ঘাবড়াচ্ছ কেন?’

‘কি হয়নি বুলু। আর কি বাকি আছে! এখন এত জায়গা-জমি, ঘরবাড়ি, ব্যাঙ্কের তাড়া-তাড়া চেকই—সব দেখলে আমার বমি আসে, না এলে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করতে ইচ্ছে করে।’

‘চান করে খেয়ে নাও। ঘুমোবার আগে এক গ্লাস জলে দশ ফোঁটা যোয়ানের আরক দেব। খেয়ে নিও।’

‘ইনকরিজিবল্!’ কুবের এখন একদম ল্যাংটা। বুলু সাবান মাখাচ্ছিল। একেবারে পাম্প করে ফোলানো উরুর ওপর থেকে বউকে একরকম ঠেলে সরিয়ে দিল। বাথরুমের বাইরে বের করে দিতে দিতে ফেনায় পেছল কুবের যতখানি পারে মুখ ফাঁক করে হাসল, ‘আমার বাঁ পাখানা একেবারে কোমর থেকে এক কোপে খসিয়ে দিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়ে মাসভর খাওয়া যায়। তাই না! আমাদের ফ্যামিলি তো ছোট।’

চোখ বুজে এসেছে, কণ্ঠমণি হাসির দমকে কেঁপে উঠছে, সাবানের ফেনা কুবেরের চোয়ালে শুকিয়ে গিয়ে খড়ি মাখানো হয়ে আছে—সব নিয়ে মানুষটাকে চেনাই যায় না। কিছু একটা ঘটে গেছে বলে সন্দেহ হয়। জানতে গিয়ে ভীষণ খারাপ কিছু শুনতে হবে এই ভয়ে আর কিছু বলতে পারে না বুলু। এই মানুষ যে একদিন এইভাবে আসবে কে জানত।

কোন কোন সময় ঘেন্না চাবুকের চেহারা পায়। চোখ থাকলে দেখা যায়। কুবেরের সে সব চোখ অনেকদিন নেই।

বুলু বললো, ‘আমরা মানুষ। শুনেছি, বাঘ পুরুষছানা হলে খেয়ে ফেলে—

হাট করে খোলা বাথরুমের চৌকাঠের ফ্রেমের মাঝখানে ফেনায় তেলতেলে কুবের দাঁড়িয়ে পড়ল, গায়ে কিছু নেই, ‘আমরাও খাব। রোজ কত লোক হচ্ছে—একদিন দাঁড়াবার জায়গাও থাকবে না বুলু

‘তা কেন হবে?’ তারপর কুবেরের বুকে হাত রেখে অনুনয় মাখিয়ে বলল, ‘লক্ষ্মীটি দরজা আটকে ভেতরে যাও। চান করে এস—একসঙ্গে খেতে বসব।’

বুলু চোখ ফেরাতে পারছিল না। টান টান প্রায় দশাসই শরীরের খানিক জায়গা জুড়ে কালচে কিছু ছোপ বুক বেয়ে উঠেছে।

বুলুর গোড়ার কথা ধরে বসে ছিল কুবের, ‘তাই হবে। কে কোথায় বাড়ি করল—কোন্ জায়গার দলিল কার—এ সব ইনসিগনিফিকেন্ট হয়ে যাবে। তখন হয়ত আমরা থাকব না। সৃষ্টিধর ওদের কেড়ে খেতে হবে। অর্ডার অব দি ডে—তাই দাঁড়াবে একদিন?’

‘আমরা বাঘ সিংহ নই!

‘বাঘকে হেলাফেলা কোরো না। বাঘ খুব জিওমেট্রিক। সাঁতরে নদী পেরোনোর সময় ঢেউয়ে ভেসে যেতে যেতে রেগে ডাঙায় ফিরে আসে। ফিরে শুরু করে। স্ট্রেট লাইন ধরে সাঁতরে ওপারে ওঠার জেদ চেপে যায় ওদের—’

‘হয়েছে! আর পাগলামি করো না লক্ষ্মীটি। যাও চান করে নাও।’

‘বাঘকে আন্ডার এস্টিমেট করাও ঠিক নয়, বুলু। অনেকদিন আহার না পেলে ওরা শেষরাতে নদীর পারে চলে যায়। তারপর ব্রাহ্মমুহূর্তে পেছনের দু’পায়ের ওপর বসে সামনের দু’পায়ে কাদার বল বানিয়ে লুফতে থাকে। একসময় শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে হাঁ করে গিলে নেয়—

‘কেমন?’

‘পেটে খিদের গর্তটা বুজিয়ে দেয় আর কি—’

‘এসব বলছ কেন?’

‘আমরা—আমি না থাকলে সৃষ্টিধর, কুসুম—ওদের কি হবে? ওরা তো এসব কিছুই জানে না। কে শিখিয়ে দেবে ওদের। আমি পোড়া খেয়ে খেয়ে তৈরি-ওরা তো কিছুই শিখল না–শেখাবার সময়ই পেলাম না!’

‘এত ভেবে লাভ নেই।’

‘কিন্তু তুমি বল—কোথায় ওদের রেখে যাচ্ছি—কোন্ ওয়ার্ল্ডে! আমাদের দুনিয়া সেই তুলনায় কত ইজি ছিল। আমাকে দ্যাখো। আন্দাজে কোথায় উঠেছি।’

‘তুমি খেটেছো তাই পেরেছো।’

‘বাজে কথা। কত লোক তো খাটে। কজনের হয়—’

বুলু জোর করে কুবেরের মুখের ওপর বাথরুমের দরজা আটকে দিল। তাও কি পারা যায়। দরজা চেপে ধরতে গিয়ে জলে সাবানে মাখানো কুবের, গায়ে কোথাও কিছু নেই, হাতে লেগে পিছলে যাচ্ছিল। এখনও একটু সাবান দিতেই কেমন চাপা গন্ধ দেয় লোকটার গা দিয়ে।

বুলু কুবেরের পছন্দমত অনেক কিছু রেঁধেছে। সেগুলো সাজাতে সাজাতে অনেক দিন পরে একরকমের আনন্দ হচ্ছিল তার।

বাথরুমের ভেতরে কুবের তখন ধারাস্নানে অনেক টাটকা হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় ঠিক মেরুদণ্ডের ওখানে শুকনো একখানা হাড়ের চাকতি প্রথমে খচ করে উঠল তারপর সব ক’খানা একসঙ্গে মিলে ছুঁচলো ব্যথা সিধে ওপরে পাঠিয়ে দিল। কুবের ফেনা করে গোড়ালি ঘষতে গিয়ে এই বিপদ ডেকে আনল। সঙ্গে সঙ্গে যতটা মনে করা যায়—এই চেষ্টায় খট করে দাঁড়াতে গেল। সাওয়ারের মাঝামাঝি আর একটা কল গলা বাড়িয়ে ছিল। একেবারে কুবেরের কাঁধের নরম মাংসে তা বিঁধে গেল। খাপছাড়াভাবে যা কিছু মাথার মধ্যে পর পর পড়ে যাচ্ছিল, স্মৃতি বলতে যা কিছু বাকি ছিল—সেই ব্যথা তা একদম ঘোলা করে দিয়ে কুবেরকে সোজা দক্ষিণের শোয়ার ঘরে পাঠিয়ে দিল।

সারা গা বেয়ে জলের ফোঁটা গড়াচ্ছিল। তোয়ালে কাঁধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথার বালিশটা তুললো। নাঃ! আছে। টিপে দেখল। তারপর নিজের গানের গলার ওপর চরম বিশ্বাস এনে গাইতে লাগল—‘তুমি যে গিয়াছ—বকুলে ও বিছানো পথে-এ-এ’।

টেবিল সাজিয়ে বুলু দাঁড়িয়ে পড়েছিল। এমন সিন বেশি দেখা যায় না। গায়ে একটুও জল নেই কুবেরের। মাথায় ঝাঁকুনি দিয়ে জল মুছছে। সঙ্গে সেই ‘বকুলে-ও বিছা-আনো পথে-এ!

লবি থেকে পাটভাঙা ধুতি গায়ের ওপর ছুঁড়ে দিল বুলু।

মাথা তুলে তাকিয়েই হেসে ফেলল কুবের, ‘সরি!’ তারপর সতেজ, ডাঁটালো যে-কোন গাছের ধারায় একেবারে ঝুঁকে পড়ে মেঝে থেকে ধুতিটা তুললো। গায়ে কোন ছালবাকল নেই। বুলু দেখবে না দেখবে না করেও পষ্টাপষ্টি তাকিয়ে থাকল। তার বুক ঠেলে শুকনো বাতাস উঠে গলার ভালভ্ বন্ধ করে দিচ্ছিল। এমন জিনিস বেশি দেখা যায় না। গর্বও হচ্ছিল একটু। চাষবাসে এত বড় একটা মার খেয়েও লোকটা গান গায়।

বিকেল পড়তেই মুশকিল হল। দেবেন্দ্রলাল ঘুমন্ত কুবেরকে কিছুতেই তুলতে দিল না। বুলু ভেবেছিল,শিব প্রতিষ্ঠার উৎসবে সবাই একসঙ্গে যাবে। কিন্তু কুবের যে ঘুমে কাদা হয়ে আছে। একখানা রেখে সব গাড়ি শিবতলায় পাঠানো হয়েছে। অগত্যা শ্বশুরের সঙ্গে সৃষ্টিধর, কুসুমকে নিয়ে বুলুকে যেতে হল।

.

কুবেরের ঘুম ভাঙালো আলোর মধ্যে। পূর্ণিমা বলে চাঁদ বেশ কিছুটা নেমে এসে লাইট দিচ্ছিল। বারান্দায় দাঁড়াতেই বুঝলো বাড়িতে কেউ নেই। ঠিক তখন দক্ষিণ থেকে একটানা হাওয়া এসে আছড়ে পড়তে লাগল। একেবারে ঢেউ। মেদনমল্লর দুর্গের চত্বরে দাঁড়িয়ে ভোর দেখা যেত-জল আসছে-না, কতকগুলো ঢেউ ফেনাসুদ্ধ কে চরিয়ে নিয়ে ফিরছে। হাওয়ার পেছনেও তেমন রাখালি। কুবের রোডের গায়ে পড়েই সেই সব অদৃশ্য তরঙ্গ বাড়ির সামনের লনে এসে গড়িয়ে যাচ্ছে-দু’একটা ফণা মেলে কুবেরকে ছুঁয়ে ফেলল। তার সারা শরীর এখন হাল্কা। ওপর থেকে ফেলে দিলে সে এখন ভাসতে ভাসতে নামবে।

.

সাহেক খুব একটা রঙীন জামা চড়িয়েছে গায়ে। ভিড়ের মধ্যে কুবেরের বাবা বলে দেবেন্দ্রলাল ভাল জায়গাই পেয়েছে। বাইরে জ্যোৎস্না-মন্দিরের ভেতরে নিওন-আর মধ্যে বেলপারার ডাঁই মাথা ঠেলে উঠেছে। ব্ৰজ মোহান্ত যেদিকেই ঘোরে লোকের চোখ সেদিকই ফেলে। আলখাল্লার বোতাম আছে কি না বোঝা যায় না। দাড়ি বুক বেয়ে অনেকদূর নেমেছে। চন্দনে, তিলকে কপালের আর কিছুই নেই। এখানকার ফাঁকা ধুধু প্রান্তর জুড়ে বাবা রেলেশ্বরের কত যে ভক্ত আজ না এলে তা বোঝা যেত না। তারা সব মন্দির চত্বরের বাইরে সামিয়ানার নীচে সারি দিয়ে বসে। এসব ঠেলে তেলের কুয়ো খোঁড়ার পেল্লায় তুরপুন টেনে তোলার ক্রেনের ডগা আকাশের অনেক খানি ভেতরে উঠে আছে। দূরে হাইওয়ের ওপর বড় বড় লরি-মাঝে মাঝে তাদের ইলেকট্রিক হন বেজে উঠছে। লাল নীল কাগজের নিশান আর পতাকা বাতাস পেয়ে কাঁপছে।

সাহেবের সঙ্গে কোন কথা বলতে পারল না বুলু। দু’জন দু’জায়গায় দাঁড়ানো। বুলু একবার লোকটাকে দেখল। তারপর মনে পড়ে গেল, রেলেশ্বর তো উধাও—তবে ব্রজ মোহান্ত এত ঢাকঢোল বাজিয়ে কি করছে? ভেবেই বুলু ঘেমে উঠল।

নানান সভায় কিছু লোক চেয়ারে আলো করে বসে। মাইক আঁকড়ে ধরে ভগবানের ইতিহাস বলে। দেবতাদের ঠিকুজি কুষ্ঠি বিশদে বলতে বলতে সংস্কৃত শ্লোক গুঁজে দেয় তার ভেতর। তেমন একজনকেও যোগাড় করেছে ব্রজ দত্ত। সেই লোকটাই মাইকে গাক গাঁক করে আসর ভরাট করে দিল। কেউ কিছু বুঝলো কি না দেখার দরকার নেই। সবার গলা ছাপিয়ে মাইকের গলা সব কান কালা করে দিতে পারল কিনা সেটাই আসল।

ব্রজ মোহান্ত আসনে বসেছে। এবারে রেলেশ্বরের অভিষেক হবে। বেলপাতা সরিয়ে তাঁকে রুপোর আসনে চড়িয়ে মন্দিরে নিয়ে পাকাপাকি থিতু করতে হবে। আসনখানা এসেছে তাড়দার হাটের ইজারাদার বিশ্বাসদের বাড়ি থেকে। মোহান্তর বড় ভক্ত ওরা।

একজন লোক এসে ব্রজর কানের কাছে মুখ নিল। কি শুনলো কে জানে। ব্রজ উঠে দাঁড়াল। বাইরে তখন ডায়াসের ওপর মাইকের গলা ফুলস্পীডে চেঁচাচ্ছে।

ভিড়ের বাইরে এসে দেখল দূরে প্রায় মাঠের মধ্যে একখানা রিক্শা সাইকেল দাঁড়িয়ে। রিকশাওয়ালা বললো, ‘আরেকটু আসুন। বাবু বসে আছেন—’

যাবে কি যাবে না—ঠিক করতে পারল না ব্রজ। পেছনে একটা মস্ত ভিড়। সামনে স্তব্ধ জ্যোৎস্নায় একখানা রিক্শা সাইকেল—ঘোমটা তোলা।

‘তুই? চল বসবি।’

কুবের রিক্শা থেকে নামল না, ‘হেঁটেই আসছিলাম। অনেকদিন অভ্যেস নেই। পা ধরে গেছে। মোড় থেকে রিক্শাটা নিলাম।’

‘বুলু বলছিল—তুই ফিরেছিস। পরে আসবি। তা ভেতরে চল—

‘নাঃ! আর যাব না। তোমার জিনিস বুঝে নাও।’

‘কি ব্যাপার?’

ঝোলাটা পড়ে যাচ্ছিল। ব্রজ দত্ত ধরে ফেলল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বাইরে আলোয় তুলে ধরে অবাক। ব্রজর গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না। চোখ জলে মেখে যাচ্ছে, জ্যোৎস্না বলে সবই ধোঁয়াটে দেখায় তাই রক্ষা। সেই চন্দনে দাগানো। একেবারে তিনটি চোখ তুলে সেবায়েতকে দেখছে।

‘কুবের।’ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ব্রজ মোহান্ত বললো, ‘তোর বউদি কেমন আছে রে—’

ভিড়ের মধ্যে তারই নাম ধরে ডাকাডাকি হচ্ছে। কে যেন খুঁজতে এগিয়ে আসছে। ব্রজ দত্ত আর দাঁড়াতে পারছিল না। তবু যাওয়াও যায় না। এতদিন পরে—

‘ফাইন!’

‘যাক! তোর কাছে গিয়ে যখন একবার পড়েছে—তখন আমি নিশ্চিন্ত!’ তারপর

খুব লজ্জা করেই বললো, ‘সময়মত শয়ান দিতিস তো—’

‘রোজ। রেলেশ্বরের শয়ান, স্নান—কিছুই বন্ধ থাকেনি।’

‘আভা এমনিতে কনসিডারেট খুব। নিয়ে এলে পারতিস।’

‘এবারে ফিরে গিয়েই নিয়ে আসব।’

‘আমি জানতাম! তোর কাছে আছে—’, ব্রজর কথাই যেন ফুরোচ্ছে না। কুবের বুঝতে পারল না, কে তার কাছে আছে? ছিল? রেলেশ্বর -না, আভা। কার কথা জানতো ব্ৰজদা।

‘বুলু তো আজ এসব কিছু বলেনি আমায়? কি কালো হয়ে গেছিস—‘

এমন সময় বেশ জোর গোলমাল উঠল ভিড়ের ভেতর থেকে। কার কথা বলবে বুলু। রেলেশ্বর? আভার? কুবের বললো, ‘তুমি যাও। আজই রেরেশ্বরের প্রতিষ্ঠা শুনে ছুটে ছুটে এলাম এদ্দুর। কাজ সেরে নাও ব্রজদা। পরে কথা হবে।

ব্রজ ফিরে যেতে যেতেও দু’বার ফিরে দাঁড়াল। কুবের রিক্শা থেকে নেমে হাত দিয়ে চলে যেতে বললো। ব্রজ ভিড়ে ঢোকার আগে বললো, ‘থাকিস কিন্তু। প্রসাদ পাবি সবার সঙ্গে। তোর জন্যে আমি রেলেশ্বরকে ডাকবো। সব বিপদ কেটে যাবে।’

কুবের আর হাত নাড়তে পারল না। জ্যোৎস্নায়, শব্দে, হাওয়ায় চুপ করে গেল। সামনেই পেছন-ফেরা একটা কবন্ধ ভিড়। ব্রজদা বেশ গুছিয়ে বসেছে। আহা! কতদিনের ব্রজদা। তুমি নোবেল প্রাইজ পাবে বলে উপন্যাস লিখতে। আমি ডিকটেশন নিতাম।

বড়লোকের বউ বুলুর মাথায় লাল শাড়ির ঘোমটার ডগা এতদূর থেকেও পরিষ্কার দেখতে পেল কুবের। সোঁদালিয়ার চেহারাই পাল্টে গেছে। বড় বড় রাস্তা—লরির আড্ডা, পথের দু’ধারে হরেক কারখানা। কি ছিল। কি হয়ে গেল। আভা সেদিন শেষরাতে ‘ডাহুকে’ উঠে না বসলে এখানেই থাকতে পারত।

বাতাস কেটে রিক্শা ফিরছিল। সারা গায়ে পেয়ারার গন্ধ মেখে আভা তার পাশে পাশে হেঁটেই হাইওয়ে কাবার করে দিতে পারত। কোন রিক্শা লাগত না। আজই ভোররাতে ‘ডাহুক’ ফিরবে হয়ত। সারেঙ এসে কদমপুরের বাড়িতে বসে থাকতে পারে। আবার কয়েক ঘণ্টা পেছনে ফেলে মেদনমল্লর দ্বীপ। আভা বলত, ‘তোমার দ্বীপ।’ মেয়েলোক জিনিসটা যে কি! কুবের কোন তল পায় না।

কদমপুরে ফেরার পথ আর ফুরোয় না। যতদূর চোখ যায় জায়গার পর জায়গা। এরা জ্যোৎস্নার আলোয় এমন মরে পড়ে থাকে। জ্বালানি করবে বলে গরিব দুঃখীরা খড়-নাড়া মুছে নিয়ে গেছে।

এমন ঠাণ্ডা ঝিরঝির আলোতেও রিকশাওয়ালা ঘেমে নেয়ে উঠেছে। লোকটা গলার নুন ঘষতে ঘষতে তিন টাকা চাইল। কুবের পাঁচ টাকার একখানা নোট দিয়ে চেঞ্জ না নিয়েই কুবের রোডে নেমে পড়ল।

‘বাবু বাড়ি অব্দি দিয়ে আসি?’

‘থাক।’

খুব কৃতার্থ হয়ে লোকটা রিক্শা ঘুরিয়ে নিল।

এই সেই রাস্তা। লোকে আগে বলত খালপাড়। কুবের প্রথম এসে দেখেছিল, খাল কেটে ন্যাওয়ার সময় এলোপাথাড়ি মাটি ফেলে ফেলে ঠিকাদারের লোকরা রাস্তার এক এক জায়গায় ঢেউ করে রেখে গেছে। এখন তা কুবেরের হাতে পড়ে আগাগোড়া প্লেন। কদমপুরের মৌজা ম্যাপে এই খালপাড়েরও একটা হাল দাগ আছে। সাবেক দাগও আছে। মোট জমি একুশ বিঘে চার কাঠা। এই পোড়ো জমি জুড়ে লোকে একসময় কড়াই চাষ করত। সাপখোপের ভয়ে রাখালরাও এ পথে গরু চরাতে যেত না। কলকাতার এক বাবু মাছ ধরতে এসে পাম্পশু পায়ে মরে পড়ে ছিল। সাপে কাটা মড়া লোকে খালে ভাসিয়ে দেয়। জায়গাটার নাম সারভেয়ার রায় মশায়ের মুখে—এনব্যাংকমেন্ট। এখান থেকেই জগতের সব মেঘ আকাশে ওঠে। এখানেই চাঁদ পূর্ণিমা করে—জ্যোৎস্না দেয়।

বাড়ির কাছাকাছি এসে কুবের দেখল, বড় মুলতানি গাইটা জোড়া খেজুরতলায় বসে বসে জাবর কাটছে। এই গাছ দূটো বেঁটে-রস কাটাও সোজা। পাখিরা এদের জন্মদাতা। তাই আজও মালিকানা ঠিক হয়নি। মোড়ের চুনি মাতাল কুবেরকে তুচ্ছ করে ওই দু’টো গাছে তাড়ি কাটে। কতদিন ইচ্ছে হয়েছে, পিষে মারে লোকটাকে। মারা হয়নি। তেড়েল বলেই কুবের কি দরের লোক তা বুঝে উঠতে পারেনি।

গরুটার গলায় গিয়ে হাত বোলালো কুবের। কি করে চেন খুলে গোয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। এসব গরু সারাদিন বসে থাকলে বাত হতে পারে—তাই,একটু আধটু হাঁটাচলাও করা দরকার। গরুটা কুবেরকে পেয়ে উঠে দাঁড়াল। গা চাটল। গলার তারের কারে বিপদনাশিনী গিলের বিচি।

কুবেরের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে গোয়ালে এল। কুবের খুব সাবধানে গরুটা বাঁধলো। অন্য গরুদের গলায় হাত বোলালো। তারপর দোকায় দোকায় কাটাখড়, মুগচুনি দু’হাত ভরে তুলে দিল। অন্ধকারে কান নেড়ে গরুরা খুব তৃপ্তিতে খাচ্ছে। আরামেরও একটা শব্দ আছে। কুবের ওদের গা থেকে মশা তাড়াতে লাগল। ওরা কুবেরের গায়ে আদর করে লেজের চামর বুলিয়ে দিল। শান্তি কখনো কখনো অন্ধকারেও চেনা যায়। কান লটপট করে ওরা বড় বড় চোখে কুবেরকে দেখছিল। সে চোখে আশীৰ্বাদ!

বাইরে বেরিয়ে কালকের মতই আজও কুবের প্রায় ফিনকি দিয়ে জ্যোৎস্নায় গিয়ে পড়ল। সামনেই তার সাজানো বাড়ি। পেছনে বেঞ্চ লাগোনো পুকুরঘাট। পায়ের নীচে লনের মখমল ঘাস। ভেতরে অন্ধকার গোয়ালে গরুরা খাচ্ছে।

আমাকে আর নগেনকে মা এক থালার ভাত মেখে খেতে বসাতো। তখন গল্প বলত মা।

ছোটবেলা জুড়িয়ে গিয়েও যায় না। কবে কাকে কতখানি ব্যথা দিয়েছি মনে—আলাদা করে তার কিছুই মনে রাখতে পারিনি। জানাশোনা ছাড়াও যাদের অবস্থা দু’ একবার দেখেছে—তাদের জন্যে আজ কুবেরের চোখ ফেটে জল আসছিল। কেন-তা জানি না। হরগঞ্জ বাজারের বাইরে এক বুড়ো রাস্তায় বসে পুরনো শাড়ি রঙ করে বেচত। ইস্কুলে এক বন্ধুর বাবাকে সেখান থেকে দর করে শাড়ি কিনতে দেখেছিল। যতবার মনে পড়ে—ততবারই কুবেরের খুব কষ্ট হয় সেই লোকটির জন্য। একবার বহুকাল আগে ফুটপাতে উবু হয়ে বসে সৃষ্টিধরের জন্যে দর করে ইজের কিনেছিল কুবের।

অনেকটা এসে গেছে। কাল রাতে এদিকেই গিয়েছিল সাপটা। কুবের খুব পরিষ্কার গলায় ডাক দিল। কোন সাড়া শব্দ নেই। দক্ষিণে সমুদ্র থেকে হাওয়া উঠে এখানে রোজ আসে। জল নয় তাই ঢেউ দেখা যায় না। গায়ে লাগতেই বোঝা যাচ্ছিল।

জায়গাটা কুবেরের চেনা। খানিক তোলা মাটি এক জায়গায় বাতাসায় মঠ হয়ে ঠেলে উঠেছে। কাছাকাছিই থাকবে। খুব চাপা গলায় ডাকল। এবারও কোন শব্দ পেল না কুবের।

কিন্তু একটা জিনিসে খুব ভয় পেয়ে গেল। সে খুব মন দিয়ে শিস টেনে সাপটাকে ডাকছিল। বাসায় থাকলে যদি ভুলেও একবার বেরিয়ে আসে। এখনও ওদের আহারে যাওয়ার সময় হয়নি। যদি আসে। এখনও রাত নিশুতি হতে দেরি আছে।

কুবের নিজের গলা শুনেই ভয়টা পেল। পরিষ্কার শুনলো, সে নিজে—কুবের সাধুখাঁ গর্তের সামনে খুব অনুনয় করে ডাকছে—’আভা। আভা—’ মোটা পিচবোর্ড করাতে কাটলে এমন আওয়াজ বেরোয়—সেই শব্দে গলা ভর্তি।

সামনেই খালপাড়। ওখানে ওই পাকুড়তলায় একদিন জ্যোৎস্নায় মাছ কিনতে এসে একা একা গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল আভার। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল ঝিরঝির করে। তখন হলদের বদলে নীলচে মাখন মাখানো চাঁদ দেখে খুব মুশকিলে পড়েছিল আভা।

সারাদিন কাঠফাটা রোদে বেরোতে না পেরে সন্ধ্যেরাতে খালপাড় পেরিয়ে সাপটা জলের ধারে গিয়েছিল একটু। অমাবস্যা ঘুরে দাঁত উঠেছে ফিরে। ফণার দু’ধারে বিষ জমে জমে মাথাটা ভার ভার ঠেকছিল বিকেল থেকেই। মাথার দু’ধার তেলতেলে হয়ে গেছে। তাই জলের ধারে ভিজে মাটিতে গা মেলে দিয়ে মাথাটা খালের জলে ঝুলিয়ে ডুবিয়ে রেখেছিল খানিক। লোক চলাচলের কামাই নেই। ননী বোসের ফকরে ছেলে বিকাশ বোসের লোকজন টর্চ নিয়ে ঘোরে সব সময়। মাছ পাহারা দেয়। সাপটা তাই পড়িমরি করে ফিরে আসছিল।

কুবের আরেকবার ‘আভা’ বলে ডেকে উঠেই পিছিয়ে গেল। ফিরতে হবে। হিসেবে ভুল ছিল। বাঁ পায়ের গোড়ালির নরম জায়গায় ফনাসুদ্ধ একবার মুখ থুবড়ে পড়ল সাপটা। বাসায় ফেরার পথে এই কাণ্ড। এসময়টা মাথার ঠিক থাকে না। জাত গোখরো। কুবের ভুল জায়গায় পা ফেলেছে।

কুবের সব ভুলতে বসেছিল। পায়ের কাছে খুব চিনচিনে কি একটা হয়ে গেল। আর কিছু ভুলতে হল না। মন দিয়ে ডাকলে সব পাওয়া যায়। সাপটা এই ঠাসা জ্যোৎস্নার ভেতর দিয়ে খুব ঢিলে চালে একটু একটু করে গর্তে গিয়ে ঢুকে গেল। যাবার সময় লেজে সারাটা আলোর পরত নেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কুবের পরিষ্কার দেখল, হলদে শুঁড়িগুঁড়ি রাজ্যের ধান ছড়িয়ে এই মাঠ ভরে গেল। আঁজলা করে তোলা যায় প্রায়। দুধ এসে দানা ভরে শক্ত হয়ে গেছে—আলে আলে কামলারা কাস্তে হাতে দাঁড়ানো। এখন একদল কাটবে—আরেকদল আঁটি বেঁধে বেঁধে এগোবে।

কুবের গলা ফাটিয়ে ডাকল, ‘নগেন—’। নিজেই পরিষ্কার শুনতে পেল না। এইমাত্র কাশিতে গলা ঘড়ঘড়ে হয়ে গেছে।

তখন খালপাড়ে গোড়া থেকে একটা কুকুরের ঘেউঘেউ শোনা গেল। কুবের শার্টের একটা হাতা ছিঁড়ে ফেলল। কোন হেলপার নেই ধারে কাছে। তবু যতটা পারে শক্ত করে বাঁ পায়ের গোড়ালির একটু ওপরে বাঁধন দিল একটা।

.

ভদ্রেশ্বরের আজ কম ধকল যায়নি। চিটু দাশ বৈকুণ্ঠপুর থেকে সরু পিয়াসলে স্টেশন অব্দি আগাগোড়া সঙ্গে ছিল। অমৃত ঘোষের সেই ভাইপো বাঘাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে বলেছে, ‘আমার কথাটা মনে থাকে যেন স্যার। সাধুখাঁ মশাইকে একটু বলবেন কিন্তু।’

ভদ্রেশ্বরের গায়ে আর জোর ছিল না। ট্রেনে বসে মাথা নড়েছে শুধু। এতটা ঝক্কি যেত না—যদি ঘোষ মশাইর বাড়ি থেকে স্টেশন অব্দি বাঘা রিক্শায় আসতে রাজি হত। দু’বার তোলার চেষ্টা হয়েছিল। বেঁকে বসেছে।

তাই আড়াই মাইল রাস্তা ওর মর্জি মত হাঁটতে হয়েছে ভদ্রেশ্বরের। বাঘা এ—কুকুর সে-কুকুরের সঙ্গে ঘেউঘেউ করে, পথের ধারের আঁস্তাকুড় শুঁকতে শুঁকতে ভদ্রেশ্বরকে সারাটা রাস্তা হাঁটিয়ে স্টেশনে এসেছে। গাড়িতে উঠে একটা ভাল কাজ করল অবশ্য। ট্রেন ছাড়তেই সামনের দু’পা জানলায় তুলে দিয়ে জিভ ঝুলিয়ে বাঘা বাইরের হাওয়া খেতে লাগল।

বিকেল থাকতে বেরিয়ে সেই সোয়া নটার ট্রেনে এসে কদমপুরে নেমেই ভদ্রেশ্বর সোজা সাধুখাঁ মশাইর বাড়ির পথ ধরেছে।

কুবের শার্টের আরেকটা হাতাও ছিঁড়ে ফেলল। আগের বাঁধনের আরেকটু ওপরে গায়ের সবটুকু জোর দিয়ে বাঁধল। নিজের দিকে তাকিয়েই ছ্যাৎ করে উঠল বুকটা। জগন্নাথদেবের জামাও এত হাতকাটা হয় না। তাই খুব জোরে ডাকল, ‘নগেন।’

এবার গলার আওয়াজ পেল ঠিকই—তবে কিছু ভাঙা। নাকে হাত দিল। আগের চেয়ে কিছু বসে গেছে—আর ছোটোও লাগল। আরও জোরে ডাকল, ‘নগেন—।’ পরিস্কার বুঝলো গলা খোনা হতে শুরু করেছে। অথচ সামনে তারই বাড়ির দোতলার লবিতে আলো জ্বলছে। সেখানে কেউ নেই। এখন তার যেকোনভাবে জেগে থাকা দরকার।

বাতাস থেমে যাওয়ায় তাঁবুর গায়ে লটকানো শাড়িটা কুবের দেখতে পেল। বুড়ো কামলার কথাই খেটেছে। শেষ দিকে জল মেরে দেওয়াতে মোটা ধানটা প্রাণপণ ফলেছে। গাছ শুকিয়ে পাটখড়ি হয়ে আছে। হলদে শিষগুলোর ভারে মাটিতে মিশে যাচ্ছে।

সামনেই তালগাছের সারির মাঝখানে চাঁদ কালকের চেয়েও আরও নীচে নেমে এসেছে। আভা যা বলেছিল ঠিক তাই। একেবারে নীল। কুবের চাঁদের বাইরে আর কিছু দেখতে পেল না। কেননা চাঁদ কালকের চেয়ে অনেক বড়। আকাশের এমোড় ওমোড় জুড়ে একখানা নীলচে থালা। একথা কাউকে যে বলবে—একটা লোকও কাছে নেই। দু’চোখে যতদূর দেখা যায়—তার সবটা জুড়েই শুধু চাঁদ। অথচ কোন জ্বালা নেই সে-আলোয়। নীল। নরম। এত বড় একটা আবিষ্কার চেঁচিয়েও বলা যাচ্ছে না।

এস.কে. বোসের বাড়ি তৈরির গোডাউন এখনও ভাঙা হয়নি। কোণে একটা ম‍ই মাথা ঠেলে দাঁড়িয়ে ছিল। কুবের সেটাকে টেনে টেনে সামনের তালগাছে এনে লাগালো। ঘুমে চোখ জড়িয়ে যাচ্ছে। পায়ে বাবলা কাঁটা ফুটলো বোধ হয়। ব্যথা লাগে না। ঝিমুনিও কাটলো না। ছাদ ঢালাইয়ের রড বাইন্ডিং সেন্টারিং-এর খাড়া উঁচ মই। দম নিয়ে নিয়ে অর্ধেক উঠে কুবের দেখল ফলন্ত ধানে সারাটা দ্বীপ ঢাকা পড়ে আছে। শুধু অতিরিক্ত আলোয় দুর্গ কিছু আবছা ঠেকেছে।

মইয়ের প্রায় শেষ কাঠিতে পা রেখে কুবের চাঁদ পেয়ে গেল। মাথার ওপরে হাওয়ায় ঝুপসি তালপাতাসুদ্ধ কাঁটাতোলা ডালগুলো নড়ছে। নীচে তাকালেই মাঠ ভর্তি ধান, আধখানা দিঘি জুড়ে জ্যোৎস্নায় পদ্ম ফুটে আছে—সারি দিয়ে দাঁড়ানো পরীদের যে কেউ এক্ষুনি উড়ে যেতে পারে। দুর্গের চত্বরে ওপাশে বলে বাথান, ডালপালা ছড়ানো লাগোয়া পেয়ারা গাছটা কুবের দেখতে পেল না।

হাতের একটা আঙুল চাঁদের এক কোণে লাগাতেই ডেবে গেল। আভা ঠিক বলেছিল। আঙুলটা এনে চোখের সামনে তুলে ধরল! ঘিয়ের গন্ধ দিচ্ছে। এর চেয়ে ভাল করে দেখা গেল না। কিছুতেই চোখ খুলে রাখা যাচ্ছে না। একদম নীল। গন্ধ দিয়ে বাকিটুকু বুঝে নিতে হল।

খুব সাবধানে আরেক কাঠি উঠে কুবের ডান হাতখানা ছাঁদের ওপর চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে কনুই অব্দি গেঁথে গেল। অনেক কষ্টে টাল সামলে নিলে কুবের। এত বড় একটা জিনিস। তার সবটা জুড়েই নীল মাখনের কোটিং। তার ওপর দিয়ে নীলচে আলো গলে গলে পড়ছে। এখান থেকেই জ্যোৎস্না হয়। এই হল গিয়ে অরিজিন। মাখনের নীচে ডান হাত দিয়ে কুবের চাঁদের গায়ের শক্ত কিছু ধরতে চাইল। ভেতরে এবড়ো-থেবড়ো গা মাখনে পিছলে যাচ্ছে।

এদিকে মই সামলানোও কঠিন। নীচেই রাজ্যের ধান ফলে আছে। চোখ একদম জড়িয়ে গেছে। এমন সময় বাঘা তার চেনা বাড়ি দেখেই ঘেউঘেউ করে উঠল। গলাটা কুবেরের খুব চেনা। কিন্তু কিছুতেই নাম ধরে ডাকতে পারল না।

বিকেল থেকেই দোটানায় ভুগেছে বাঘা। বৈকণ্ঠপুরের সারা বাড়ির পাতকুড়োনো খেয়ে তার মন একরকম বসে গিয়েছিল সেখানে। তার মাঝখানে কদমপুরের লোক গিয়েই তার মন গুলিয়ে দিয়েছে। সারাটা পথ খুব ভাল বোধ হয়নি। এইমাত্র চেনা জায়গা দেখে আর স্থির থাকতে পারল না।

বাঘা হাত থেকে চেনসুদ্ধ ছিটকে বেরিয়ে গেল। হ্যাঁচকা টানে পড়তে পড়তে ভদ্রেশ্বর সামলে নিল, ‘কোথায় যায় দ্যাখো—‘

এত কষ্ট করে ফিরিয়ে আনা কুকুর এখন মাঠে নেমে ছুট দিলে কেমন লাগে। একরকম খোঁড়াতে খোঁড়াতেই ভদ্রেশ্বর নীচে নামল। বাঘা খানিক দূর গিয়ে একজায়গায় থেমে দারুণ চেঁচাচ্ছে।

এইমাত্র কুবের মইসুদ্ধ কাত হয়ে নীচে পড়েছে। টাল রাখতে পারেনি। চাঁদ বড় স্লিপারি। পরিষ্কার শুনেছে, বাঘা ডাকছে। ছুটতে ছুটতে কানের কাছে এসে এখন ঘেউঘেউ করছে। কুবেরের কিছুই করার নেই। চোখ আকন্দের আঠায় লেপ্টে গেল। খানিক আগে চাঁদের গা থেকে ডান হাতখানা হড়কে গিয়ে এই কাণ্ড। তখনও কনুই অব্দি নীল মাখনে হাতখানা ডেবে ছিল। একথা আভাই প্রথম বলেছিল। এত বড় একটা আবিস্কার কাউকে বলা হল না। নাক একদম বসে গেছে। অথচ এতকাল ধরে সবাই জানে চাঁদ হলদে।

মাঠের চুচকো ঘাস কানে ফুটে যাচ্ছে। বাঘা না থাকলে কখন ঘুমিয়ে পড়ত কুবের। সমানে ডাকছে—আগের চেয়েও জোরে। কানে কিন্তু কষ্ট হচ্ছে না কোন। কুসুম এই হাসে, এই কাঁদে। কেন যে এখানে এসেছে তাই জানে না মেয়েটা। ধান কাটা চলছে। এবার গাদা ঝাড়াই-মাড়াইয়ের জন্য তৈরি হতে হবে। কালই বাবা বলছিল, গোলা কোথায়? ঠিক শোয়া যাচ্ছে না।

টুকরো টুকরো আকন্দের শেকড়ে জায়গাটা ভর্তি।

কুবের আবছামত বুঝলো, একজন লোক এদিকেই জোরে হেঁটে আসছে। পায়ের শব্দটা তার মাথার কাছে এসে থামল। তারপর একটা থ্যাতলানো চীৎকার। তাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠেছে।

***

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *