কালোঘোড়া – ৭

সাত

হ্যারিসন রোডের একটা মেস।

শ্রীমন্ত বি.-এ. পাশ করেছে এবং সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে একটা চাকরি পেয়েছে। এর জন্যে তাকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। যুদ্ধের জন্যে বহু লোক নিচ্ছে। সুতরাং তার পক্ষে সেখানে একটা চাকরি যোগাড় করা বিশেষ কিছুই কঠিন হয়নি।

এর পরেও সে অবশ্য ‘দেবধামে’ যথাপূর্ব থেকে যেতে পারতো। বড়বাবু সত্যিই তাকে ভালোবাসেন। সুতরাং সেখানে থেকে যাওয়া তার পক্ষে কিছু অসুবিধাজনক হোত না। পয়সার দিক দিয়েও সুবিধা হোত।

কিন্তু অতখানি সে পারলে না।

হৈমন্তী সে রাত্রের পরে আর একদিনও দেখা দেয়নি। মহাসমারোহে তার বিবাহ হয়ে গেল। তাতে শ্রীমন্ত সাধ্যেরও অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে। বরবধূ ফিরে এল। ক’দিন ধরে বাড়িতে খুব হৈ চৈ চললো। পরিশ্রান্ত শ্রীমন্ত সে ক’টাদিন এক রকম ঘুমিয়েই কাটালে; বিশেষ অসুবিধা টের পেলে না।

কিন্তু বৈশাখের প্রথমেই যখন হৈমন্তী চলে গেল, এই বাড়ির সঙ্গে শ্রীমন্তর যোগসূত্র যেন হঠাৎ ছিন্ন হয়ে গেল। কিছু যেন তার ভালো লাগে না। অভ্যস্ত জীবনযাত্রায় হঠাৎ যেন একটা ছেদ পড়েছে।

সমস্ত দিন লাটাই-ছেঁড়া ঘুড়ির মতো অনির্দেশ্যভাবে কলকাতার রাজপথে ঘুরে বেড়ায়। রাত্রে শ্রান্তদেহে শোয়, তবু ঘুম আসে না।

এ তো ভালো নয়। শ্রীমন্ত নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করে। কিন্তু বোঝাবার আছে কি, তাও ভেবে পায় না।

এই অবস্থায় কিছুদিন কাটলো। তারপরে পরীক্ষার ফল বেরুলো এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডিপার্টমেন্টের চাকরিটা পেয়ে গেল।

আর নয়, এ-বাড়িতে আর নয়।

শ্রীমন্ত হ্যারিসন রোডের মেসটা ঠিক করলে। এবং একটা রবিবার হিমাংশুবাবুর অনুমতি নিয়ে তাঁকে প্রণাম করে চাকরবাকরদের বকশিশ দিয়ে মেসে চলে এল।

অপরিচিত আবহাওয়া।

এর পূর্বে জীবনে সে কখনও মেসে থাকেনি। এক ঘরে দুটো সীট। চাকর-ঠাকুর, লোকজন সকল সময়েই বারান্দা দিয়ে যাওয়া-আসা করছে। উন্মুক্ত দ্বারপথে তার দিকে একবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। গোপনীয়তার বালাই নেই। মেসের জীবনযাত্রায় ‘Privacy’-র কোনো স্থান নেই। খাওয়া কদর্য এবং একঘেয়ে। আলু-পটোল-ঝিঙে- কুমড়ো-কাঁচকলা, মাছের ঝাল, মাছের ঝোল একটা আশ্চর্য কৌশলে সমস্ত কিছুর স্বাদ একই রকম দাঁড়িয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে খেলে কোন্টা কি, কিছু বোঝবার উপায় নেই। যেন এক বহু হয়েছিল, আবার একে পরিণত হয়েছে।

বাড়ি যেমন নোংরা, তেমনি বিশৃঙ্খল।

কিন্তু শ্রীমন্ত দমলো না। সে জানে, জীবনের চলার পথে এসব এক একটি পান্থশালা মাত্র; জীবনের ইতিহাসে এর মূল্য হয়তো আছে। কিন্তু সে বেশি নয়।

কোথায় কোন্ অখ্যাত গ্রামে দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম, সে আজ আর তার ভালো করে মনেই পড়ে না। ঘোষেদের প্রাসাদ,—তার বাল্য, কৈশোর এবং যৌবনের প্রথমাংশ যেখানে কেটেছে,–সেও ভুলতে তার বেশি দেরি হবে না। এ তো তুচ্ছ মেস, হৃদয়ের বন্ধন যেখানে স্বভাবতই শিথিল।

শ্রীমন্তর মন মাঝে-মাঝে উদাস হয়ে যায়। কিন্তু তবু সে দমে না। নিজের প্রয়োজনে যে ক’টা দিন প্রয়োজন, এই মুসাফিরখানায় তাকে সেই ক’টা দিন চোখ-কান বুজে কাটিয়ে দিতেই হবে। এর মধ্যে দ্বিধার অবকাশ নেই, ক্ষোভ কিংবা দুঃখেরও কোনো কারণ নেই। অনেকটা ‘রোগী যথা নিম খায় মুদিয়া নয়ন।’

এরই মধ্যে একটা সুবিধা শ্রীমন্তর হয়েছে।

তার ঘরে সীট যদিচ দুটো, কিন্তু এই চারদিনের মধ্যে আছে সে একাই। পাশের সীটটা খালি নয়, তা বোঝা যায়। তক্তাপোশের ওপর বিছানাটা গুটোনো। তলায় একটা ট্রাঙ্কও আছে। কেবল লোক নেই। কে জানে তিনি কোথায় গেছেন।

এর মধ্যে হঠাৎ একদিন একটি যুবক এসে উপস্থিত হোল। মাথার চুল রুক্ষ, মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, পরনের কাপড় আধময়লা এবং গায়ে রুপোর বোতাম বসানো একটা সাদা জিনের কোট। বিড়ি টানতে টানতে শ্রীমন্তর দিকে অবাক হয়ে চাইলে।

—কাকে চান?—শ্রীমন্ত একটু বিরক্তভাবেই জিজ্ঞাসা করলে।

সে-প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যুবকটি গায়ের কোটটি খুলে আলনায় ঝুলিয়ে রাখলে। বিছানাটি বেশ করে ঝেড়েঝুড়ে পাতলে। হাতের বিড়িটা ফেলে দিয়ে বিছানায় আরাম করে বসে আর একটি বিড়ি ধরালে।

জিজ্ঞাসা করলে, আপনিই বুঝি ওই সীটে নতুন এলেন?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।—বিস্মিত শ্রীমন্ত অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলে।

—আমার নাম হরিশ ভদ্র। আপনার নামটি কি?

—শ্ৰীমন্ত মিত্র।

—আপনার কুঁজোয় জল আছে?

—আমার তো কুঁজো নেই।

—বলেন কি মশাই? তেষ্টা পেলে করেন কি?

—হুঁ। কিনতে হবে একটা।

হরিশ চীৎকার করে বললে, ওরে কেষ্টা, কুঁজোয় একটু জল দিয়ে যাস তো। আর আসবার সময় এক গ্লাস জল নিয়েও আসবি অমনি। তেষ্টায় ছাতি ফেটে গেল।

শ্রীমন্ত জিজ্ঞাসা করলে, কোথায় ছিলেন এ ক’দিন?

—রাণাঘাটে।

—সেইখানেই বুঝি আপনার বাড়ি?

বিরক্তভাবে হরিশ বললে, আজ্ঞে না মশাই। রাণাঘাটে আমার চোদ্দ পুরুষে কেউ কখন যায়নি।

—তবে? আপনি গেলেন কেন?

—চাকরি করতে। আর বলেন কেন মশাই, রেলের রিলিভিং চাকরি। যখন যেখানে লোক থাকে না, সেইখানে ছুটতে হয়। বাসা তো পাইনি, তাই থাকি-না-থাকি মেসের সীটটা রেখেছি। নইলে ক’দিনই বা থাকি এখানে?

—এখন দু’দিন ছুটি তো?

—ওই দুটো দিনই। পরশু আবার কোথায় ঠেলবে কে জানে! এনেছিস বাবা? আঃ! কলকাতার কলের জল খেয়ে বাঁচলাম। এইবার কুঁজোটা ধুয়ে একটু জল পুরে দাও। দিন দুই থাকতে হবে।

লোকটিকে শ্রীমন্তর খারাপ লাগলো না। ওরই সমবয়সী। দিনের প্রায় সমস্তক্ষণই তো অফিসে কাটাবে। যেটুকু সময় মেসে থাকবে, দু’জনে গল্প করে মন্দ কাটবে না, —এই বলে মনকে সে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করলে।

.

অফিসেও শ্রীমন্তর দু’চারটি নতুন বন্ধু-বান্ধব জুটেছে। সবাই তারই মতো সদ্য পাশকরা যুবক;–ট্রাউজারের উপর হাফশার্ট পরে আসে। বেশ চটপটে, স্ফূর্তিবাজ ছোকরা। যে-কোনো স্বাধীন দেশে এরা মস্ত বড় মূলধন বলে বিবেচিত হতে পারতো।

কিন্তু কোথায় যেন কি গলদ ঘটছে। এরা দেশের সেবা করে না, চাকরি করে শুধু। প্রথম-প্রথম এসে তারা পলিটিক্স আলোচনা করতো বেশি। এখন কাজের চাপে তেমন সময় পায় না। তবু, শিক্ষিত ছেলের দল, বাইরের দু’ চারটে বড় বড় কথা আলোচনা না করে পারে না।

—খবর শুনেছ হে? এদিকে ইটালী গ্রীস আক্রমণ করলে, ওদিকে জাপান ত্রিশক্তি চুক্তিতে সই করলে। Very significant.

—কি হবে বলো দেখি?

—জানিনে। কিন্তু দেখে নিও জার্মান সৈন্যদের বুলগেরিয়ায় ঢুকতে আর দেরি নেই। -তারপর?

—যুগোস্লাভিয়া। তারপরে তুরস্ক। ব্যাস, ইউরোপ খতম। রইলো শুধু বৃটেন।

—তা যেন হোল। কিন্তু আফ্রিকায় ইটালী ওরকম হারছে কেন বলো তো?

—পারছে না বলে। দেখছ না, সিদি বারানি, সোল্লুম ফোর্ট কাপুৎসো, বার্দিয়া, বেনগাজী, এমন কি শেষ ঘাঁটি মোলাদিসর পর্যন্ত গেল? ওদের আছে কি?

—কেন, মুসোলিনী?

—হ্যাঁ। আর তার goose-step, কিন্তু তাতে লড়াই জেতা যায় না।

যুদ্ধের খবর সোমেশের কণ্ঠস্থ। ওদের সেকশানে এ বিষয়ে ওকে অথরিটি বলা যেতে পারে।

ইউরোপীয় রাজনীতিতে বিজনের উৎসাহ কম।

বললে, ও সব রেখে বলো দিকি জাপান কি করবে?

—যুদ্ধ। ঝড়ের মতো। দেখে নিও।

বিজন চিন্তিতভাবে বললে, ওকেই আমার ভয়।

(যেন এ যুদ্ধে তাকেই লড়তে হবে!)

—ভয় তো আছেই। দেখে নিও, ওদিক থেকে জার্মানি আর এদিক থেকে জাপান সাঁড়াশীর মতো এদিকে ছুটে আসবে।

—সর্বনাশ!

—ইংরেজ কি পারবে?

সোমেশ গম্ভীরভাবে বললে, মনে তো হয় না।

সবাই খুশি হয়ে উঠলো। জার্মানি তখনও রাশিয়াকে আক্রমণ করেনি। তখনও রাশিয়া জার্মানির মিত্র এবং ভারতবর্ষে বিভিন্ন কমিউনিস্ট দলের মধ্যে রিক্তহস্ত আস্ফালন করে ‘জাপানকে রুখতে হবে’ জিগীর ওঠেনি। প্রভুশক্তির পরাজয় সম্ভাবনায় পরাধীন জনসাধারণের পক্ষে খুশি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেই অস্বাভাবিক খুশি সকলের চোখে-মুখে ফুটে উঠলো।

শ্রীমন্ত এতক্ষণ নিঃশব্দে চা খাচ্ছিল।

এইবার মুখ তুলে বললে, তার মানে এই সিভিল সাপ্লাই অফিস আর থাকবে না। আমরা বেকার হব। সেটা ভেবেছ?

—তাতে কি, তাতে কি?—সবই এক সঙ্গে হৈ হৈ করে উঠলো।

শ্রীমন্ত একটু মুচকে হাসলে।

বললে, কিছু নয়। “Make hay while the sun shines.” ব্যস্।

টেবিলের উপর চায়ের পেয়ালাটা ঠক করে নামিয়ে রেখে ঘাড় বেঁকিয়ে শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়ালো।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *