কালোঘোড়া – ১০

দশ

হ্যারিসন রোডের মেস। সেখান থেকে অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল হোটেল। তারপর সুন্দর একটি ফ্ল্যাট। এই একটা বছরে শ্রীমন্ত ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে।

ধর্মতলার উপরেই এই ফ্ল্যাট। চারতলায় দু’খানি প্রশস্ত ঘর। সামনের ঘরখানি বসবার ঘর। এই দুর্মূল্যের বাজারেও তা মূল্যবান আসবাবপত্রে সাজানো। পাশেরটি শোবার ঘর। সেটিও সুসজ্জিত। একটি চাকর রেখেছে। সে-ই রান্নাও করে।

অফিস থেকে বেরিয়ে মাঝে মাঝে ওরা হোটেল ডি-রিও-তে এখনও যায় কিন্তু বেশির ভাগ সন্ধ্যায় ওদের এই ঘরেই মজলিস বসে।

শীতের সন্ধ্যা।

নিভৃত গৃহকোণে একটি সোফায় একখানি ‘রাগ’ কোলের উপর রেখে দু’জনের সন্ধ্যা-যাপন কি মনোরম! সিগারেটের ধোঁয়া ওঠে স্বপ্নের মতো।

সেদিন সন্ধ্যায় একটু বিশেষভাবে সাজানোও হয়েছে। উপরে রান্নাঘরে রকমারি রান্নাও হচ্ছে।

সুমিত্রা ঘরে পা দিয়েই বিস্মিতভাবে জিজ্ঞাসা করলে, কি ব্যাপার?

ওকে সযত্নে একটি সোফায় বসিয়ে শ্রীমন্ত বললে, আছে ব্যাপার।

সুমিত্রাকে ওইখানে বসাবার জন্য আগে থেকেই যেন ব্যবস্থা করা আছে। ও বসতেই ঢাকা-আলোর ফাঁক দিয়ে সমস্ত আলো ওরই পরনের হালকা নীল-শাড়ীর জরিদার পাড়ের উপর ঝলমলিয়ে উঠলো।

ওর পায়ের তলার লাল কার্পেটখানা আধো-আলো, আধো-অন্ধকারে যেন অবগুণ্ঠনের মধ্যে হাসতে লাগলো! রেডিও সেটটা বাজছে। ওরা দু’জনে থাকলে রেডিও বড় একটা বাজে না।

সুমিত্ৰা সন্দিগ্ধভাবে আবার বললে, কি ব্যাপার বলো তো?

হেসে শ্রীমন্ত বললে, একটু পরেই বুঝতে পারবে।

—তবু?

শ্রীমন্তকে উত্তর দিতে হোল না, স্বয়ং বড়বাবু এসে দাঁড়ালেন ঘরের একেবারে মাঝখানে।

আধো-অন্ধকারে তসরেটের কোট নেই, পেন্টলুন নেই, সেই ভারি শু-জুতোও না। তার বদলে মূল্যবান শান্তিপুরী ধুতি, গিলেকরা আদ্দির পাঞ্জাবী, জরিপাড় সূক্ষ্ম চাদর এবং পায়ে সোয়েডের নিউ-কাট জুতো।

গা দিয়ে ভুর ভুর করে এসেন্সের উগ্র গন্ধ বার হচ্ছে।

প্রথম দৃষ্টিতে সুমিত্রা কেন, সকলেরই চেনা মুশকিল।

শ্ৰীমন্ত ‘আসুন’, আসুন’ বলে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। সেই সঙ্গে সুমিত্ৰাও।

কর্কশ কণ্ঠ যথাসাধ্য মোলায়েম করে বড়বাবু উত্তরে বললেন, এই যে! কি ব্যাপার বলো তো? হঠাৎ আমার মতো অরসিককে আহ্বান!

—কিচ্ছু না, এমনিতেই আমার ঘরে একটু পায়ের ধুলো চাইলাম।

শ্রীমন্ত এমন সমাদরে ওঁকে সুমিত্রার পাশের কুশনটায় বসালে যেন স্বয়ং গভর্নর এসেছেন ওর ঘরে।

অভ্যাসবসে সুমিত্রা পর্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠলো। অফিসে এই ব্যক্তিটি সামান্য তো নন, গভর্নরেরই সামিল। ‘মারিলে মারিতে পারে, রাখিতে কে করে মানা।’ তাঁর ঐ কর্কশ বাক্য অনেকেরই হৃৎকম্প সৃষ্টি করে।

সোনালী-তবক-মোড়া পান এলো, দামী সিগারেটের টিন এবং উৎকৃষ্ট জর্দা এলো। চাকরটা একটা অ্যাশ্-ট্রেও রেখে গেল।

দেখতে দেখতে বড়বাবু সম্বন্ধে সুমিত্রার ধারণা গেল বদলে। তাঁকে যতখানি ভয়াবহ এবং নীরস ব্যক্তি বলে তার ধারণা ছিল, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হোল। দেখা গেল, বৃদ্ধ হোলেও ভদ্রলোক অতি সুরসিক ব্যক্তি। নিজের হাতে ওকে তিনি সিগারেট এগিয়ে দিলেন।

হাত জোড় করে সুমিত্রা অসম্মতি জানালে। কিন্তু বড়বাবুর অমায়িক ব্যবহারে সে এত মুগ্ধ হয়ে গেল যে, নিজে দেশলাই জ্বেলে ওঁর সিগারেটটা ধরিয়ে দিলে। দু’জনের মুখ কাছাকাছি আসতেই ভক্ করে তার নাকে যেন মদের গন্ধ এলো।

কাঠিটা নিভিয়ে ট্রের মধ্যে ফেলে এদিকে চাইতেই দেখলে, শ্রীমন্ত দিব্যি একটা সিগারেট ধরিয়ে বড়বাবুর সামনে টানছে।

বড়বাবুর সামনে সিগারেট!

বিস্ময়ে তার চোখ-মুখের এমনই অবস্থা হোল যে, তা বড়বাবুর ক্ষীণ দৃষ্টিও এড়ালো না।

জবাফুলের মতো লাল চোখ ঢুলঢুল করে বললেন, Never mind, Miss Roy. We are friends here, we are all friends here. এটা অফিস নয়। এখানে সব বন্ধু আমরা।

বলে ভদ্রলোক এমন জোরে হেসে উঠলেন যে সুমিত্রা চমকে উঠলো।

.

পরের দিন সুমিত্রা অফিসে এলো না। লিখে পাঠিয়েছে তার মাথা ধরেছে, জ্বরের মত হয়েছে।

শ্রীমন্ত অফিসের শেষে বড়বাবুর কাছে গিয়ে হাসতে হাসতে বললে, You perhaps drove too rashly, Sir.

বাঁ হাতে খানিকটা হাওয়া যেন ঢেউ দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বড়বাবু বললেন, Don’t you worry. সব ঠিক হো যায়েগা। শোনো। একটা ভালো চাকরি খালি হচ্ছে। পরেশ চলে যাচ্ছে দিল্লীতে। তার জায়গায় আমি তোমার নাম সুপারিশ করেছি! সাহেব রাজি হয়েছেন।

আহ্লাদে গদগদ হয়ে শ্রীমন্ত বড়বাবুর পায়ের ধূলো মাথায় তুলে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লো। তখন তার দেহ যেন তুলোর মতো হালকা হয়ে গেছে।

এই চাকরিটা মানে মাসে তিনশো পঁচাত্তর টাকা!

আর এক ধাপ, তার পরেই সুপারিন্টেন্ডেন্ট!

বাসায় ফিরে সে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নিলে। শোবার ঘরে এসে গুন্ গুন্ করে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে যখন সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মাথা আঁচড়াচ্ছে, নিঃশব্দ পদ-সঞ্চারে সুমিত্রা এসে ওর খাটের এক প্রান্তে বসলো।

নিঃশব্দে।

শ্রীমন্ত টেরই পেত না, যদি না আয়নায় ওর ছবি পড়তো।

পিছন ফিরেই সে চমকে উঠলো :

সুমিত্ৰা!

সুমিত্রা সাড়া দিলে না। নীরবে চোখ মেলে চাইলে।

এই ঘরটিতে আলোটা এমন জায়গায় বসানো যে, জানালা খোলা থাকলেও বাইরে আলো পড়ে না। সে জন্যে এ-ঘরের আলোয় আর কাগজের ঘেরাটোপ দেবার আবশ্যক হয়নি।

সেই পরিপূর্ণ আলোয় শ্রীমন্ত দেখলে সর্বস্ব হারালে মানুষের চোখে যে দৃষ্টি ফুটে ওঠে, সেই বিভ্রান্ত ব্যাকুল দৃষ্টি সুমিত্রার চোখে!

শ্রীমন্ত ধীরে ধীরে ওর পাশে বসে ওর পিঠের উপর একখানি হাত রাখলে। মিনিট কয়েক তার মুখে একটাও সান্ত্বনার কথা বার হোল না।

একটু পরে বললে, বিশ্বাস করো সুমিত্রা, আমি নিজেও এর জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না।

সুমিত্রা ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে ওর দিকে চাইলে।

তারপর বললে, আমাকে তুমি কচি খুকী পেয়েছ, না? তাই বোঝাতে চাইছ, তুমি কিছু জানতে না?

শ্রীমন্ত অভিনয় মন্দ করে না।

কাতরস্বরে বললে, আমাকে তুমি অবিশ্বাস কোরো না সুমিত্রা।

তীব্রকণ্ঠে সুমিত্রা বললে, তাহলে তুমি বড়বাবুকে নিমন্ত্রণ করেছিলে কেন?

—এমনি। একটু তোয়াজ করবার জন্যে। বুঝতেই তো পারছ।

—বুঝতে সবই পারছি। তুমি জানতে সন্ধ্যের পর আমি আসব। তার পরেও বড়বাবুকে নিমন্ত্রণ করেছিলে। খাবার আয়োজনও করেছিলে তিন জনের জন্যে। বড়বাবু এলেন মত্ত অবস্থায়। বললেন, We are all friends here! তার পরেও বলতে চাও, এর পিছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না?

প্রতিবাদে শ্রীমন্ত কি একটা বলতে যাচ্ছিল। বাধা দিয়ে সুমিত্রা বললে, বড়বাবুকে তোয়াজ করবার জন্যে? আমি শুধু এই কথাটা জানতে এসেছি, বড়বাবুকে তোয়াজ করবার জন্যে কতদূর যেতে পারো তুমি? শেষ পর্যন্ত?

শ্রীমন্ত রাগ করলে না। আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে শান্তকণ্ঠে বললে, রাগ কোরো না সুমিত্রা। রাগ করবার কী আছে এতে? কী এমন হয়েছে?

অবাক হয়ে সুমিত্রা ওর দিকে চাইলে :

—তুমি বলছ কি?

খুব বিজ্ঞের মতো শ্রীমন্ত হাসলে।

বললে, এমন কিছু হয়নি। একটা গলিতনখদন্ত কামার্ত বৃদ্ধ…

আকাশে দুই হাত তুলে সুমিত্রা বললে, থামো, থামো, থামো। ঘেন্নায় আমার সমস্ত শরীর পাক দিয়ে উঠছে!

—তবে?

শ্রীমন্ত হো হো করে উচ্ছ্বসিত হেসে উঠলো :

—তাহলেই বোঝ, রাগের কিছু নেই।—ব্যাপারটা ঘেন্নার। তবু লোকটির সম্পূর্ণ পরিচয় তুমি জানো না। যে লোকটি কাল স্বচ্ছন্দে তোমাকে সিগারেট এগিয়ে দিয়েছিল, বাড়িতে সেই লোকটিরই রূপ আলাদা। গৃহিণীর ছাদে যাবারও হুকুম নেই। রাস্তার দিকের জানালা কাঠ দিয়ে পেরেক মেরে বন্ধ করে দিয়েছে। পাছে তার গৃহিণী তার অনুপস্থিতিতে জানালায় এসে দাঁড়ায় এবং বাইরের কেউ দেখে ফেলে।

—বলো কি?

সুমিত্রা সব ভুলে অবাক হয়ে বললে।

—তাই। অফিসে বেরুবার আগে স্ত্রীকে ঘরের মধ্যে তালাবন্ধ করে রেখে দেয়, বড় বড় ছেলেমেয়ের সামনে।

—যাঃ—সুমিত্ৰা হো হো করে হেসে উঠলো।

—সত্যি কথা।

ওকে হাসতে দেখে শ্রীমন্তর সাহস বেড়ে গেল।

বললে, স্বার্থের খাতিরে এই লোককে যদি একটু নাচানো যায়, কী এমন দোষ?

-–এর জন্যে তুমি আমাকে পর্যন্ত ব্যবহার করবে?

অম্লান বদনে শ্রীমন্ত বললে, যদি তুমি দয়া করে রাজি হও।

মুহূর্তের জন্যে সুমিত্রা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর হো হো করে হেসে বললে, তুমি একটা Villain। তবু আশ্চর্য তুমি! সকালে উঠে ভেবেছিলাম, জীবনে বুঝি তোমার কাছে আর মুখ দেখাতে পারব না। ভালোই হোল এলাম। তোমায় চিনলাম, তোমার বড়বাবুকেও চিনলাম। মনটা হালকা হোল। ব্যাপারটা সত্যিই রাগের নয়।

সুমিত্রা হাসলে।

বললে, একটু চা খাওয়াবে?

সুমিত্রার কথাগুলি কেমন যেন বাঁকা বাঁকা। একবার শ্রীমন্ত একটু দ্বিধা করলে। তারপর বললে, চলো না, হোটেল-ডি-রিও?

—হোটে-ল-ডি-রি-ও? চলো।

শ্রীমন্ত তাড়াতাড়ি জামাটা গায়ে গলিয়ে নিলে। মানি-ব্যাগটা পকেটে পুরে উঠে দাঁড়ালো।

বললে, চলো।

অন্যমনস্কের মতো সুমিত্রা উঠে দাঁড়ালো। শ্ৰীমন্ত বুঝলে, মুখে যাই বলুক, কালকের ধাক্কা সুমিত্রা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

হোটেলের একটি কোণে একখানা নিরিবিলি টেবিলে ওরা দু’জন বসলো।

চারিদিকে যেন তরুণ-তরুণীর মেলা বসে গেছে। যেন অসংখ্য প্রজাপতি গুচ্ছে- গুচ্ছে ফুলে-ফুলে বসে গেছে। তারই এক কোণে ওরা দু’জনে বসলো।

শ্রীমন্ত খাবারের ফরমাশ দিয়ে অপাঙ্গে সুমিত্রার দিকে চাইলে। মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলে, রাগ পড়লো?

কৃত্রিম কোপে ভূভঙ্গি করে সুমিত্রা শুধু বললে, Brute।

এই জায়গাটার একটা বিশেষ গুণ আছে। এই আলো-ঝলমল প্রশস্ত সুসজ্জিত হল, এই গুচ্ছ-গুচ্ছ প্রজাপতির সুসংযত ভিড়, খাদ্য ও পানীয়, সমস্ত মিলে মানুষের মনকে যেন সমাজ, স্বদেশ ও সংস্কার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আনে। তাকে শুধু হালকা হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

কামার্ত বৃদ্ধের আচরণে যে গ্লানি সকাল থেকে সুমিত্রার দেহ ও মনকে পীড়িত করছিলো, তার কিছুটা গিয়েছিল শ্রীমন্তের ঘরে; অবশিষ্ট এই সুন্দর হলে প্রবেশ করামাত্র নিঃশেষ হয়ে গেল।

সুমিত্রার মন আবার আগের মতো হালকা হয়ে গেল। শ্রীমন্তের দিকে চেয়ে সে অকারণে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলো।

শ্রীমন্ত বললে, তোমাকে একটা সুখবর দিই শোনো।

সুমিত্রা উৎসুক দৃষ্টিতে চাইলে।

—পরেশ হালদারকে তুমি চেনো?

—কে পরেশ হালদার?

—আমাদের অফিসে চাকরি করে। Parmanent staff। দিল্লীতে বদলী হয়ে যাচ্ছে।

-—তারপরে?

একটু থেমে মুচকি হেসে শ্রীমন্ত বললে, তার জায়গায় আমি যাচ্ছি।

—বলো কি? তুমি তো এখনও temporary!

—Permanent হয়ে যাব। সঙ্গে সঙ্গে তিনশো পঁচাত্তর টাকা মাইনে।

সুমিত্রা ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখলে। তারপর চায়ে একটু চুমুক দিয়ে হেসে বললে, এর মূল্য দিতে হোল আমাকে তো?

—হুঁ। তুমি করুণাময়ী, তোমার জয় হোক।

শ্রীমন্ত হাসলে।

—Good evening Miss Roy.

দু’জনেই চমকে উঠলো। একটি শ্বেতাঙ্গ সৈনিক ওদের টেবিলে এসে দাঁড়িয়েছে।

সুমিত্রা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো :

Good evening, Capt. Alexander! তুমি এখানে? ভারি খুশি হলাম। দাঁড়াও তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। মিঃ মিত্র, ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার of the American Army.

ওরা পরস্পরের করমর্দন করলে।

সুমিত্রা ওকে চায়ে আহ্বান করলে। মার্কিন সৈনিকটি বড় অমায়িক লোক, তখনই রাজি হয়ে গেল।

শ্রীমন্তর দ্বিধা ঘোচেনি। সন্দিগ্ধভাবে ওর দিক চাইতে লাগলো। তবু বিদেশী অতিথি। চুপ করে থাকা ভদ্রতা নয়।

জিজ্ঞেস করলে, কেমন লাগছে এ দেশ?

—Splendid! আশ্চর্য তোমাদের এই দেশ! আমাদের সঙ্গে তোমাদের মিল নেই আচারে-ব্যবহারে। বাইরে থেকে যারা তোমাদের দেখবে, তাদের অদ্ভুত লাগবে। কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো, আমি তোমাদের সঙ্গে মেশবার সুযোগ পেয়েছি। তোমাদের যত দেখছি…

সুমিত্রা বাধা দিলে। হাসতে হাসতে বললে, থামো, থামো। তারপর দেশে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে বই লিখবে তো? তোমাদের আমরা চিনেছি।

আলেকজান্ডার গম্ভীর হয়ে গেল। বললে, সে অপরাধ আমি স্বীকার করি মিস রায়। আমার লজ্জা হচ্ছে, আমি সেই সব অভিযোগ বিশ্বাস করেছিলাম।

শ্রীমন্ত বললে, কেন, এখন বিশ্বাস করো না? আমি তো দেখছি, তার অনেক অভিযোগ একেবারে মিথ্যা নয়।

—না।—আলেকজান্ডার উৎসাহিত হয়ে উঠলো,–সেইটেই আরও অনিষ্টকর। আধখানা সত্যের চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু নেই।

চায়ে চুমুক দিয়ে আলেকজান্ডার বললে, আসল কথা কি জানো, আচার-অনুষ্ঠানটা বাইরের জিনিস। তার পেছনের যে ফিলজফি সেইটে না বুঝলে কিছুই বোঝা হয় না। তার জন্যে সময় দরকার। দরকার সহানুভূতির। এ ট্যুরিস্টের কাজ নয়।

আলেকজান্ডার উৎসাহের সঙ্গে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল।

হঠাৎ সাইরেন বেজে উঠলো আহত কুকুরের আর্তনাদের মতো।

চক্ষের পলকে এত বড় হল-ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল। শুধু দু’প্রান্তে দুটি আলো মিটমিট করে জ্বলতে লাগলো। এক মুহূর্তে সমস্ত পরিবেশ যেন ভয়ে ও দুর্ভাবনায় স্তব্ধ হয়ে গেল!

সাইরেন অনেকক্ষণ ধরে কারে-কারে কেঁদে চুপ করলো।

কোথাও একটা শব্দ নেই।

বাইরে রাজপথের যান-বাহন, জন-কোলাহল বন্ধ হয়ে গেছে।

সকলে রুদ্ধ-নিশ্বাসে প্রতীক্ষা করতে লাগলো।

কিসের? মৃত্যুর?

এরোপ্লেনে চড়ে আসছে মৃত্যুর দূত। বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ দান! অদৃশ্য ঊর্ধ্বলোক থেকে করবে মৃত্যুবর্ষণ। বাড়ি উড়ে যাবে। মাঠ পুকুর হয়ে যাবে। আর মানুষ মরবে কীটের মতো।

আহত কুকুরের আর্তনাদ থেমেছে। চারদিক নিস্তব্ধ। শোনা যাচ্ছে, শুধু নিজের হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ী-পেটার মতো শব্দ।

এমনি কাটলো মিনিট দশেক।

তারপরে,—

দুমদুম… দুমদুম…

খুব দূরে…অস্পষ্ট ভাবে—

ওই! আলো নেবাও, আলো নেবাও!

হলের দুই প্রান্তে যে দুটো আলো জ্বলছিল, তাও নিবিয়ে দেওয়া হোল। কে জানে, এই আলো কোনো ছিদ্রপথে যদি বাইরে যায়। মৃত্যুদূতের মোটামোটা ফীল্ডগ্লাসপরা চোখের দৃষ্টি শকুনের মতো তীক্ষ্ণ।

গুম্… গুড়ুম্…

আরম্ভ হয়ে গেল।

খুব দূরে বোধ হয় নয়। হয়তো ড্যালহৌসী স্কোয়ারে কিংবা ফোর্টে।

উপর থেকে পড়ছে বোমা। নিচে থেকে ছুঁড়ছে অ্যান্টিএয়ার-ক্রাফট কামান। শব্দ হচ্ছে প্রচুর। এ বাড়ির দরজা-জানালাগুলো থেকে থেকে কেঁপে উঠছে।

বু-উ-ম্!

প্রচণ্ড শব্দ! এবারে যেন বেশ কাছে। ও-কোণে কে একটি মেয়ে সুতীক্ষ্ণ চীৎকার করে উঠলো।

ভয় সবাই পেয়েছে। সুমিত্রাও। ভয়ে সে আলেকজান্ডারের একখানা হাত জড়িয়ে ধরেছে খুব জোরে। কে জানে, এ জীবনের আজকেই শেষ দিন কি না!

তবু নিজের নিজের আসনে বসেই পুরুষেরা যথাসম্ভব শান্তকণ্ঠে ও-কোণের মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিলে : ভয় কি, ভয় কি!

.

পঁয়তাল্লিশ মিনিট এমনি কাটলো।

.

বোঁ-ও ও ও…

অসংখ্য মৌমাছি যেন একসঙ্গে গুঞ্জন করে উঠলো।

অল ক্লীয়ার!

আঃ?

আলো, আলো!

আলো জ্বললে দেখা গেল, ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার নেই,সেই সঙ্গে সুমিত্ৰাও নেই।

অল ক্লীয়ার দিতেই কখন তারা উঠে চলে গেছে!

শ্রীমন্ত স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *