কিশোর সাহিত্য – মহাশ্বেতা দেবী
সম্পাদনা – অশোককুমার মিত্র
Mahasweta Devi : Kishor Sahitya
(Selected Works of Mahasweta Devi)
ed. Ashokekumar Mitra
.
প্রকাশকের কথা
শিশু সাহিত্য সংসদের বয়স হল তিন কুড়ি৷ ছড়ায়-পড়ায়, গদ্যে-পদ্যে, জ্ঞানে-মনোরঞ্জনে এতখানি৷ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, সুনির্মল বসু, সুখলতা রাও সেই থেকে আজও আছেন৷ খগেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, হেমেন্দ্রকুমার রায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত শিশু-কিশোর সাহিত্যের সে ভাঁড়ারে আজও জোগান দিচ্ছেন৷ এ ছাড়া এখন যাঁরা দিয়ে চলেছেন : ছোটোদের জন্য গৌরী ধর্মপাল, শৈলেন ঘোষ ও বলরাম বসাক, ছড়া-কবিতায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শঙ্খ ঘোষ, কিশোর সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবী, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, নবনীতা দেবসেন এবং সদ্যপ্রয়াত মতি নন্দী৷ শিশু সাহিত্য সংসদের হীরকজয়ন্তী উদযাপন এঁদের নিয়েই, যাঁরা দিয়ে চলেছেন, তাঁদেরই স্ব-নির্বাচিত লেখার সংকলন নিয়ে৷ জয়ন্তী উদযাপনের এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে!
এ প্রসঙ্গে শ্রীঅশোককুমার মিত্র মহাশয়কে ধন্যবাদ৷ তিনিই অক্লান্ত পরিশ্রমে লেখা জোগাড় থেকে সম্মতি সংগ্রহ পর্যন্ত সব কাজ করে সংকলনগুলিকে সম্ভব করে তুলেছেন৷ তাঁর উৎসাহের তুলনা নেই৷ সর্বোপরি তাঁর যোগ্য সম্পাদনাতে সংকলনগুলি আশা করি পাঠকদের মনের মতো হয়ে উঠতে পেরেছে৷
দেবজ্যোতি দত্ত
কলকাতা
মার্চ ২০১১
.
সম্পাদকের কথা
ইংরেজিতে ছোটোদের জন্য রংচঙে কত বাহারি বই, বিদেশি ভাষাতেও৷ বাংলায় তো তেমন একখানি বই-ও নেই৷ কেন? বাংলায় কি তেমন লেখক নেই, তেমন ছবি-আঁকিয়ে নেই? এমনই ভাবনা জেগেছিল এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর মনে৷ এতদিন তো জীবন কেটেছে বিদেশি নাগপাশ ছেঁড়ার লড়াইয়ে৷ সদ্যস্বাধীন দেশে ছোটোদের জন্য আনন্দ আর শিক্ষাদানের বই প্রকাশে উদ্যোগী স্বাধীনতা সংগ্রামী মহেন্দ্রনাথ দত্ত প্রকাশ করলেন ছড়ার ছবি-১৷ পুরোনো দিনের ছড়ায় ছবি আঁকলেন প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ১৯৪৯ সালে বেরোল চার রঙে ছাপা ছোটোদের মন-কাড়া বড়ো মাপের সেই বই, যা এতকাল তিনি চেয়ে এসেছিলেন৷ পরের বছরে বেরোল ছড়ার ছবি-২ আর ছড়া-ছবিতে অ আ ক খ৷ আর তখনই ঠিক হল স্থায়ী প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা৷ ১৯৫১-র ১ আগস্ট জন্ম নিল নতুন ধারার প্রকাশন-প্রতিষ্ঠান, ছোটোদের সাহিত্যের জন্য ‘শিশু সাহিত্য সংসদ’ আর বড়োদের বইয়ের জন্য ‘সাহিত্য সংসদ’৷ এ প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য শুধু মুদ্রণ সৌকর্যেই নয়, বিষয় নির্বাচনেও৷ প্রকাশিত প্রতিটি গ্রন্থের পিছনে থাকে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নিখুঁত সম্পাদনা ও অনুপম প্রকাশনা৷ শুরু থেকে প্রকাশনা মানের যে ঐতিহ্য নির্মাণ করেছিলেন মহেন্দ্রনাথ, তাকে আজ এই হীরকজয়ন্তী বর্ষেও ধরে রেখে উন্নত করার সাধনায় ব্রতী রয়েছেন তাঁর উত্তরসূরীগণ৷ এখন বিষয় নির্বাচনে তারা অতি সতর্ক, নিত্য উদ্ভাবক৷ প্রকাশন সৌষ্ঠবে দরদি ও নিপুণ৷
বাংলা সাহিত্যে অন্যধারার লেখিকা শ্রীমতী মহাশ্বেতা দেবী৷ লেখিকা জীবনের শুরুতে এই বৈশিষ্ট্য ধরা না পড়লেও ক্রমেই তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর বিশ্বাসের ভূমি৷ অন্তেবাসী মানুষ, গ্রামের গরিব আদিবাসী সম্প্রদায়, প্রান্তিক সমাজের লোকজন, তাঁর লেখায় যেন প্রাণ প্রায়৷ তিনি যখন ছোটোদের জন্য লেখেন তখনও সেই পৃথক ধারাটির আভাস পাওয়া যায়৷ তবে কি কেবলই ওই ধারার লেখিকা তিনি? না না, তাঁর লেখায় বিচিত্র জগৎ পাঠকের মনে নানা ধরনের স্বাদ এনে দেয়৷ লৌকিক জীবনের অন্তরঙ্গ ছবি যেমন ফুটে ওঠে তাঁর লেখায়, তেমনি আধুনিক জীবনকথা দেখা যায় তাঁর নির্মাণে৷ বাবা মণীশ ঘটক (যুবনাশ্ব) ছিলেন তাঁর প্রিয় তুতুল-তাঁকে নিয়ে যে স্মৃতিচিত্র এঁকেছেন তাতে একটি যুগের বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের ছবিটিও ধরা পড়েছে৷
ন্যাদোশ একটি গোরু৷ না, ন্যাদোশ একটি চরিত্র৷ সে গাছে ওঠে না, সে খটখটিয়ে একেবারে দোতলায় উঠত৷ এই ন্যাদোশকে মা ছোটো চাপরাশির কাছ থেকে কিনেছিলেন তাঁর দলের লোকেদের পরামর্শে৷ বাড়িতে দুধের সমস্যা ছিল, ন্যাদোশ আসায় সে সমস্যার সমাধান হল কি না জানা গেল না, কিন্তু দেখা গেলে ছোটো চাপরাশিকে দেওয়া গাই-বরণের নতুন ধুতির আধখানা ছিঁড়ে বাকি আধখানা সে খেয়ে ফেলল৷ তারপরে সে তালিকায় যুক্ত হল বই-খাতা৷ সর্বভুক নয় ন্যাদোশ, সে কালি বা কলম খেত না৷ সেই ন্যাদোশকে নিয়ে কত কাণ্ড যে ঘটল!
শুধু কি ন্যাদোশ? টাটকা জীবনের গল্প থেকে ভূত কি রূপকথার গল্পেও তাঁর কলমের জুড়ি মেলা ভার৷ ধরা যাক খুদে ডাকাত-এর গল্প৷ খুদে তো ছোট্ট ছেলেও নয়, ডাকাতও নয়৷ সে তো ছিল কোয়ালি৷ কারও গোরু বাছুরের অসুখ করলে চিকিৎসা করত, ঝাঁড়ফুঁক করত, মন্তর পড়ত, ওষুধ দিত৷ তারপরে গোয়ালিয়া গাইত৷ গোয়ালিয়া গেয়ে যে চাল-ডাল আর পয়সা পেত তা কোনো এক গরিব গেরস্থকে দিয়ে তার ঘরে খেয়ে নিজের মাচাঙে উঠে যেত৷ অন্যদিন আরেক গেরস্থর ঘরে৷ কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে একবার দেশ ডুবল, সব ফসল নষ্ট হল, দেশজোড়া শুরু হল মন্বন্তর, সঙ্গে ডাকাতি৷ কেউ ডাকাত ধরতে পারে না৷ দারোগা মৈজুদ্দিনও পারে না৷ শেষে কি ডাকাত ধরা পড়ে?
এক চাঁপার গাছ ছিল বহরমপুরে আরমানি গির্জার উঠোনে৷ এই টুকু টুকু সাদা ফুলে গাছ ভরে যেত, সুগন্ধে বাতাস ভরে যেত৷ ওই চাঁপা গাছের তলায় এসে একদিন আশ্রয় নিল বুনোপাড়ার মাতো তার প্রিয় ছাগলছানা অর্জুনকে বুকে করে৷ গাঁয়ে তাদের অনেক হেনস্থা হয়েছে৷ দোষের মধ্যে অর্জুন মানী কাপালিকের পিঠে গুঁতো মেরেছিল৷ অমনি কাপালিক জানিয়ে দিলেন এ ছাগল মাকালীকে মানত করা-ওকে এখুনি বলি দিতে হবে৷ কাপালিক আর গাঁয়ের লোকেদের খর দৃষ্টি আড়াল করে অর্জুনকে নিয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে পৌঁছে গেল মাতো৷
এমনি অনেক গল্প-উপন্যাস-কাহিনি-জীবনীর সমাহার মহাশ্বেতা দেবীর কিশোর সাহিত্য সংগ্রহ, হীরক জয়ন্তী বর্ষে শিশু সাহিত্য সংসদের অভিনব উপহার৷
কলকাতা ৭০০১০৬ অশোককুমার মিত্র
মার্চ ২০১১
.
1st Blurb
ঝাকড়দা গ্রামে অনবরত-র বাড়ি৷ সেখানে ইশকুল বসিয়েছিলেন ছত্রধরবাবু৷ ছাতার ব্যাবসা থেকে তাঁর অনেক আয়৷ একবার কোনো বই থেকে তিনি জানলেন ছত্রধর বলে আরও একজন ছিলেন৷ জেনেই তাঁর আরেকটি কথা জানতে সাধ হল৷ তিনি নিজে বিশ বছরে দশ লাখ ছাতা তৈরি করেছেন৷ বইয়ের লোকটির কত ছাতা ছিল? তাঁর সে সাধ মেটাতে অনবরত এক জটাবাবার কৃপায় শিবাজির দেখা পেয়ে জেনেছিলেন-অভিষেকের সময়ে যে ছাতাটির নীচে বসেছিলেন সেটি ছাড়া তাঁর আর ছাতা ছিল না৷
মহাশ্বেতা দেবী জানিয়েছেন-গল্পের গোরু গাছে ওঠে আর তাঁর মায়ের গোরু ন্যাদোশ তালের রস খেয়ে মাতাল হয়ে গোয়ালঘরে না গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ছাদে উঠে পড়ে৷ তাঁর ভুলো ভূতের গল্পও কি কম আকর্ষণীয়? তপনবাবুর মন খুব সজাগ, কোনো কাজে ভুল করেন না, কেউ ভুল করলে চটে যান৷ সেই তিনি চাঁদনি রাতের হালকা আলোয় দেখলেন একটা মুণ্ডু ভেসে ভেসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে৷ সে নাকি কাকে ভয় দেখাতে গিয়ে মনের ভুলে ধড়টা কোথায় ফেলে এসেছে৷ কিছুতেই মনে পড়ছে না৷ একে নিয়ে তপনবাবু কী করবেন?
এমনি নানান স্বাদের অনেক গল্প-উপন্যাস আর বিদ্রোহী বীরসা মুন্ডার জীবনকথার সংকলন মহাশ্বেতা দেবীর কিশোর সাহিত্য৷
2nd Blurb
মহাশ্বেতী দেবী জন্মেছিলেন ঢাকায় ১৯২৬-এর জানুয়ারিতে৷ বাবা ছিলেন কল্লোলযুগের বিখ্যাত লেখক মণীশ ঘটক (যুবনাশ্ব), পটলডাঙার পাঁচালি লিখে খ্যাতি পান৷ মহাশ্বেতার পাঠগ্রহণ শান্তিনিকেতনে৷ বহরমপুরে বহুকাল কাটিয়েছেন৷ বাবা ‘বর্তিকা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতেন, এখন সেটির ভার নিয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী৷ অধ্যাপনার কাজও করেছেন দীর্ঘদিন৷ সমাজ সেবামূলক কাজের স্বীকৃতিতে ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়েছেন৷ ঝাড়গ্রাম অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শবরদের নিয়ে প্রথমে কাজ শুরু করে পরে সেই ক্ষেত্র প্রসারিত করে এরাজ্য ও ভিন রাজ্যের আদিবাসী কল্যাণে কাজ করছেন৷ তাঁর উপন্যাস ঝাঁসির রানী, নটী যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল৷ পরে লিখেছেন অরণ্যের অধিকার, হাজার চুরাশির মা৷ তাঁর নতুন ধারার লেখা৷ ছোটোদের জন্য বিখ্যাত গ্রন্থ: গল্পের গরু ন্যাদোশ, এককড়ির সাধ, নেই নগরের সেই রাজা, বাঘা শিকারি ইত্যাদি৷ সাহিত্য রচনার জন্য আকাদেমি পুরস্কার-সহ বহু পুরস্কারে নন্দিত৷


Leave a Reply