গল্প
উপন্যাস
জীবনী

বীরে ডাকাত ছিরে ডাকাত – মহাশ্বেতা দেবী

বীরে ডাকাত ছিরে ডাকাত

কথায় বলে:

মাসিপিসি বনগাঁবাসী

বনের মধ্যে ঘর

কখনো মাসি বললে না গো

খই মোয়াটা ধর৷

তা বলে খেতার মাসি তেমন নয়৷ পৌষের হিম হিম ভোরে খেতা কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল৷ মাসি ওকে ডেকে দিল৷

বলল, ‘অ খেতা, উঠবিনি আজ? দেখগা যেয়ে, ফাঁদ পেতে এসেছিনু, তাতে কী পড়েছে৷’

‘কী পড়েছে?’

‘শজারু এট্টা৷ কেমন মোটা দেখেছিস? বেন্নুন হবে৷’

‘কখন?’

‘আতে৷’

‘এখন করবি না?’

‘ধুর বোকাটা৷ আতে আজ তোর মেসো আসবে, বলাই, কানাই আসবে, তা জানু?’

‘মোর তরে কী আনবে?’

‘সে দেখিসখন৷ এখন যা বাবা, পলোটা চাপা আছে, চাট্টি মাছ পড়ল কি না দেখগা৷ আর শিম ক-টা পেড়ে দে যা৷ বামুনবাড়ি যেতে হবে৷’

খেতা মুখ ধুল, কড়কড়ে ভাত খেল৷ মাসির পুকুরের নীচে চার-চারটে কুয়ো আছে৷ চৈত্র-বৈশাখেও পুকুরের জল দেখো গে কানায় কানায়৷ পুকুরের পাশে জঙ্গল৷ জঙ্গলের ওপাশে রাস্তা৷ অনেক আগে, খেতার বাবা যখন ধুতি পরতে শুরু করেছে, তখন নাকি দেশে বর্গিরা এসেছিল৷

তখন দেশে খুব যুদ্ধ হত৷ যুদ্ধ দেখতে দেখতে খেতার বাবা জোয়ান হয়ে গেল৷ ন-দশ বছর ধরে শুধু যুদ্ধ হয়েছিল৷

সেই সময় এইসব রাস্তা তৈরি হয়৷ রাস্তা দিয়ে নবাব হাতি, ঘোড়া, সেপাই, লশকর নিয়ে যুদ্ধ করতে যেতেন৷

খেতার বাবা যুদ্ধে যায়নি৷ তবে খেতার জ্যাঠা, জ্যাঠার শালা, ছোটো ঠাকুরদা, সবাই যুদ্ধে গিয়েছিল৷ খেতার যে মাসি, তার শ্বশুরও নাকি যুদ্ধে গিয়েছিল৷ যুদ্ধে গিয়েছিল, যুদ্ধ করেছিল, আর নবাবের দরবার থেকে সর্দার খেতাব নিয়ে ফিরে এসেছিল৷

তখন এই ইন্দ্রাইল, নাড়াজোল, কান্দী, চাকুলে, সব জায়গার লোকেরা লড়াই করত৷ সড়কি চালাত, বর্শা চালাত, বল্লম ছুড়ত৷ কেউ-বা তির-ধনুকে ওস্তাদ হত৷ কেউ লাঠি চালাত বন বন বন৷ লাঠির মাথাটা লোহায় বাঁধানো, তাতে কাঁটা বসানো৷

কেউ বাঁশের লাঠি চালিয়েই অবাক করে দিত৷ তখন দেশের অবস্থা অন্য রকম ছিল৷ সেই যে যুদ্ধ হয়েছিল সে সময়ে নবাব ছিলেন আলিবর্দি খাঁ৷

নবাবের রাজত্ব ছিল বাংলা, বিহার, ওড়িশা জুড়ে৷ নবাবের রাজত্বে অনেক জমিদার, ভুঁইয়া রাজা ছিলেন৷

খেতার বাপ-ঠাকুরদার মতো মানুষরা সেই সব জমিদারের কাছ থেকে জমি পেত আর চাষ করত৷

তার বদলে তারা কী করত?

জমিদারের দরকারে অদরকারে লাঠি, বর্শা, তির হাতে লড়তে যেত৷

বর্গিদের সঙ্গে যখন সেই কবে যেন যুদ্ধটা হয়, তখনও নবাবের হাজার সৈন্য৷ তার মধ্যে রাঢ় আর দক্ষিণ দেশের বাঙালি যে কত তার লেখাজোখা নেই৷

নবাবের নিজের সৈন্যরা লড়েছিল৷ তা ছাড়া বর্গিরা যখন বছরের পর বছর আসতেই থাকল, তখন জমিদাররা যে-যাঁর জায়গায় যে-যাঁর সৈন্য নিয়ে লড়তে লাগলেন৷

খেতাদের সবাই হল গিয়ে বুনো-বিষ্টুপুরের রায়রাজাদের প্রজা৷

যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের মধ্যে খেতার মাসির শ্বশুর এখনও যুদ্ধের গল্প-টল্প বলে৷

এই সব কথা ভাবতে ভাবতে খেতা পলো তুলে দেখল ক-টা ল্যাঠা, গজাড় আর এক কোঁচড় ময়া মাছ৷

খেতার মাসি পুকুরের ঘাটের কাছে ভাত ছড়িয়ে দেয়৷ ঘাটের কাছে খানিকটা জল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘেরা৷ কঞ্চিগুলো খুব ঠাসাঠাসি করে পোঁতা৷ শুধু একটা জায়গা ফাঁক৷ সেই ফাঁক দিয়ে মাছ ঢুকে পড়ে৷

মাসি সন্ধ্যে বেলা যখন হাঁসগুলোকে ঘরে তোলে তখন জলে পলো চাপা দিয়ে চলে আসে৷ মাসির নিজের হাতে বোনা পলো৷ খুব চওড়া৷ সকালে গিয়ে পলো তোলো, দেখবে দু-তিনটে বেন্নুনের মাছ ঠিক পেয়ে গেছ৷ খেতা রোজ ভাবে মাছগুলো কী বোকা৷ রোজ দেখে যে-মাছগুলো ঘেরের মধ্যে ঢোকে সেগুলো ধরা পড়ে, তবুও শিক্ষা হয় না একটু৷

মাছ ধরে খেতা ফিরে এল৷ মাছগুলো দাওয়ায় রাখল৷ তারপর মাচা থেকে একটা বড়োসড়ো লাউ কাটল৷ গোটাকয় শিম ছিঁড়ল৷ মাসি বলল, ‘থাকো কোথা গেল রে?’

থাকোমণি মাসির মেয়ে, খেতার দিদি৷ গত বছর মন্বন্তরের পর থাকোর শ্বাশুড়ি থাকোকে মাসির কাছে রেখে গেছে৷ বলে গেছে, ‘চাষবাস ভালো হোক, নে যাব৷’

থাকো গাছে উঠে কাঁঠালপাতা ভাঙছিল৷ বুনো বাগদির মেয়ে, গাছে চড়া, সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, ওর খুব অভ্যেস আছে৷ থাকো বলল, ‘কেন চেঁচাতেছ? পাতা ভাঙতেছি, জানো না?’

‘কেন, পাতার কী হবে!’

‘ছাগল খাবে৷’

‘গাছ থে নাম তুই, তা বাদে তোর পিঠে একখানা চেলা ভাঙতেছি৷’

‘তবে নামব না, যা৷’

থাকো গাছের ওপর পা ঝুলিয়ে জুত করে বসল৷ মাসি বলল, ‘ভাত আঁধবি৷ মাছের বেন্নুন করবি৷ তোর কত্তাদাদা জানিস মাছের টক না আঁধলে খাবেনি৷ গাছ থে বেগুন তুলে নিস কটা৷ আর শোন৷ বামুনরা ডাল দিয়েছিল, তাতে দিস৷’

‘কেনে? তিন তিনটে বেন্নুন কেনে?’

‘হরিচরণ আসতেছে৷ ঘর নিকোবি, ছাগলটা জানি পালায় না৷ নিজে পসকের হয়ে থাকবি, জানলি?’

মাসি তরকারির ধামাটা কাঁধে নিল৷ গাঁয়ে বামুন বলতে বামুন ওই শিরোমণি বাড়ি৷ ওদের বাড়ি মানুষ অনেক, তবে ডাঙা জমিতে বাড়ি, তাই গাছগাছালি ভালো হয় না৷ ও বাড়িতে শাক বল, বেগুন বল, কচু, লঙ্কা কুমড়ো, লাউ, করলা, ঝিঙে, শশা, বারোমাস এই খেতার মাসি জোগান দেয়৷

‘খেতা যেয়ে বাছুরটা খোঁজগা যা৷ সাতসকালে যেয়ে কত্তাদাদার কতা শুনতে বসবি না৷’

মাসি বেরোতে-না-বেরোতে হরিচরণ এসে পড়ল৷

হরিচরণ থাকোর বর৷ হরিচরণের বছর চোদ্দো বয়স, থাকোর এই দশ৷ হরিচরণ কোঁচড় ভরে মুড়ি এনেছিল, আর শসা৷ থাকো বলল, ‘কেন, নারকেল আনতে পারলে না এট্টা?’

‘মা দিচ্ছে তোকে নারকেল!’

‘কেন, দেবে না কেন?’

‘সায়েব আসতেছে যে৷ সায়েব এসে ডাকাত ধরবে যত৷ তা জমিদারবাড়ি যে কী বলব প্যায়দা এসে হ্যাঁকুর কী! নারকেল, চাল, শশা, কুমড়ো, ঘি, তেল, ভারে ভারে নে যাচ্ছে৷’

‘কেন?’

‘দিতে হবে না? সায়েবের সাথে লোকলশকর আছে তারা খাবে কী!’

‘ঃহু, ডাকাত ধরবে৷ বীরে ছিরের গায়ে হাত দেয় সায়েবের সাধ্যি আছে?’

‘তেমন সায়েব লয় রে থাকো৷ বলে কী! আমাদের কালীমন্দিরে পুজো দেবে৷ বলে ডাকাতেরা যদি ওনাকে পুজে ত্যাত শক্তি ধরে তবে আমি বা না পুজব কেন?’

‘সায়েব দেখতে যাব না?’

‘তাই বলতেই তো এনু৷ মা আসতেছে, পিসি আসতেছে৷ শাউড়ি বামুনবাড়ি থে আসতেছে, তাড়াতাড়ি নেয়ে-খেয়ে চ, যেয়ে সায়েব কেমন কালীপুজো করে তা দেখব৷’

থাকো বলল, ‘তবে তুমি যেয়ে ঝপ করে দু-কলসি জল নে দাও দেখি, কাজ সেরে নি৷’

খেতা শিকে থেকে বড়ো তিজেলটা পেড়ে দিল৷ এই এত বড়ো তিজেলের এক তিজেল ভাত খেতা, হরিচরণ, থাকো, মাসি, কত্তাদাদা, পাঁচ জন খাবে৷ রাতে যখন মেসো আর দুই দাদা আসবে তখন দুই তিজেল ভাত হবে, কচু মুলোর ঝাল আর লঙ্কা গরগরে শজারুর মাংস৷

খেতাই খায় সবচেয়ে বেশি৷ অথচ শরীরটা ওর একরকম থাকে৷

থাকো বলে, ‘পেট ফেটে মরবি৷’

‘খাক৷ ভাতের কষ্ট বড়ো কষ্ট, এত বড়ো মন্বন্তরটা যে গেল তা তোদের জানতে দিইনি৷ ওদের গেরাম কে গেরাম কী হয়েছিল জানিস?’

‘কী?’

‘শোঁসান৷’ মাসি নিশ্বাস টেনে টেনে বলে৷ মাসির শরীরটা কালো পাহাড়ের মতো৷ রুক্ষ চুলগুলো শূন্যে ঝুঁটি বাঁধা৷ হাতে মাটির লাল কড়*৷ এমন কড় কুমোরবাড়িতে শাকটা বেগুনটা দিয়ে মাসি গোছা গোছা আনে৷ মাসির কাঠের কাঁকইটা তেলের ভাঁড়ে ডোবানো থাকে৷ ওরা মাথায় সর্ষের তেল মাখে, সর্ষের তেলে রাঁধে৷ পিদিম জ্বালে কড়ুয়া তেলে৷

মাসি মাসে দু-তিন দিন মাথা আঁচড়ায় আর ক্ষার কাচে৷ যখন মেসো ঘরে আসে৷ খেতার মেসো আর কানাই বলাই একজন খুব বড়োমানুষের কাছারিতে কাজ করে৷ মেসোর গলাটা খুব সরু৷ মেসো বলে-

‘পসকের রইতে পার না? মাথায় তেল দিতে পার না? জান, আমার সঙ্গীসাথিরা সব তা-বড়ো তা-বড়ো লোক৷ তারা দেখলে পরে কী ভাববে?’

মেসো যে কত বড়োলোকের খবর রাখে তার ঠিক-ঠিকানা নেই৷

মেসোর মান রাখতে মাসিকে মাসে দু-তিন বার ক্ষার কাচতে হয়৷ নইলে দেখ আটহাতি গড়ে কাপড়* পরে, খেতার মাসি হয় খেত কোপাচ্ছে, নয় বন থেকে শিমুল ফল এনে ফাটিয়ে তুলো বের করছে, নয় তো বন ঘুরে ঘুরে কোথায় বনডুমুর, কোথায় মাদার ফল, কোথায় নোনা ফল, কোথায় ধুঁধুল তাই দেখছে৷ নদীর চরে কাছিমের বাসা৷ বুনোপাড়ার ছেলেগুলো যা পারে না, ও তা পারে৷ ও ঠিক কাছিমের ডিম, কাছিম নিয়ে আসে৷

মাসির শ্বশুর বলে, ‘বউটা যদি পুরুষ ছেলা হত তবে অ্যাতদিনে ওটোনের চারদিক দে চারচালা ঘর উঠত চারখানা৷ আমার একখানা আটচালা আখড়া হত৷’ খুব, খুব ভক্তি কর্তাদাদার৷ গোয়ালঘরের মাঝে বেড়া দিয়ে ওপাশে ও থাকে৷ মাচার ওপর ঘুমোয়৷ মাচার নীচে ছাগল বাঁধা থাকে৷ রাতে সবাই ঘুমোক, ও ঠিক প্রহর গুনে গুনে তিন প্রহরে তিন বার ‘ক্যা ও! সাবধান’ বলে চেঁচাবে৷ তারপর ভোরেই তারা* দপদপ করতে দেখে তবে চোখ বুজবে৷

ঘরের সামনে ও নীচু করে মাচা বেঁধে রেখেছে৷ সেখানে ও সন্ধ্যে বেলা নিত্যি বসে৷ বুনোপাড়ার মানুষরা, জমিদারের পাইক-পেয়াদা, সায়েব লশকর, সারে সারে মানুষ ওর কীর্তন শুনতে আসে৷

‘যে হরিনাম ভবে রইতে পারের ভাবনা ভাবিস কী রে?’

গানটা কর্তাদাদার সঙ্গে খেতাও গায়৷ খেতা রাতে ওর কাছেই ঘুমোয়৷

কর্তাদাদা মাংস খায় বটে কিন্তু বলে, ‘বউমা! এত বুদ্ধি তোমার, কিন্তু জীবকে বড়ো হিংসে কর৷’

কর্তাদাদার কথা শুনলে খেতার মাসি খুব ভয় পায়৷ বলে, ‘কেন গো?’

‘এই ধরগা, শজারুটা, খরাটা (খরগোশ), হরিণটা, কাছিমটা, এ তুমি মারবে, তবে মা! টেটা দে মেরো না৷ আমরা হলাম যেয়ে বোষ্টুম৷ তুমি বেশ খন্দ করে মাটি খুঁড়ে ফাঁদ পাত গা৷ ফাঁস দাও গা! ফাঁসে বেঁধে অমনি ব্যাটা হরিচরণে চলে যাবে৷ বোষ্টুমঘরে জীবরক্ত পড়াটাঊকি ভালো?’

কর্তাদাদা বেজায় গুণী, বেজায় জ্ঞানী৷ খেতারা রক্ত পড়লে বলে, ‘ঃও কত লোউ ছুটছে দেখো?’

কর্তাদাদা বলে, ‘রক্ত পড়ছে দেখো৷’

তাই মাসি শজারু, খরা, হরিণ ফাঁদেই ধরতে চেষ্টা করে কিন্তু কাছিমের বেলায় তা হয় না৷

কর্তাদাদা মশাটা মারলেও একবার ‘হরিবোল’ মুখে বলে৷

মন্বন্তরটা বাংলা ছিয়াত্তর সালেই হল৷ কিন্তু অজন্মা পঁচাত্তর সালে৷ সেই যে অনাবৃষ্টি শুরু হল তাতেই বাংলার হাজার হাজার মাইল জোড়া ধানখেত জ্বলে গেল৷ মানুষ যতদিন পারল গাঁয়ে রইল৷ তারপর যে-যার মতো চলে গেল৷ কত গ্রাম যে আস্তে আস্তে জঙ্গল হয়ে গেল তা কী বলি৷

এগারোশো ছিয়াত্তরের বাংলায় একজন নবাব ছিলেন বটে তবে তিনি নামেই নবাব৷ আসলে দেশের কর্তা তখন ইংরেজরা৷

ছিয়াত্তর সালের এই ভীষণ মন্বন্তরের সময়ে দেশের একভাগ মানুষ মরে যায়৷ দু-ভাগ বেঁচে থাকে৷

তবু সায়েবরা খাজনা নিতে ছাড়েনি৷ খেতাদের জমিদার রায়রাজার বাড়িতে কোম্পানির লোক এল৷ সকলের ডাক পড়ল৷

খেতার বাবা বলল, ‘খাজনা দিতে পারব না৷’

‘পারবি না বললে হল?’

খেতার বাবা চিরকাল বেপরোয়া, গোঁয়ার আর একরোখা৷ খেতার বাবা বলল, ‘কার হুকুম?’

‘কোম্পানির হুকুম৷’

‘কোম্পানি জানে মোদের ভিটেয় বাঘ ঘুরতেছে, ধানখেত জ্বলে গেছে?’

‘কোম্পানি কি দেখতে গেছে?’

‘কোম্পানিকে বলো গা চাষবাস করে ধান তুলে খাজনা আদায় করতে৷’

রায়রাজার রাজত্ব এখন আর নেই৷ তবু তিনি গাঁয়ের মানুষের কাছে রাজা তো বটেন! তিনি খেতার বাবার কথায় চটে গিয়ে বললেন, ‘চেটাংমেটাং বলিস না বাঁকারাম৷ যা! তোদের আমি জরিমানা করে দিলাম৷’

পরদিন দেখা গেল বাঁকারাম ওর মতো মানুষদের নিয়ে গাঁ ছেড়ে পালিয়েছে৷ গোরু ছাগল যা ছিল সে তো আগেই মরে গিয়েছিল৷ সংসার বলতে একটা মাটির হাঁড়ি আর পেতে শোবার মাদুর৷

অমন মাদুর ওরা নিজেই বোনে৷ মাদুর চাটাই বুনে নেয়৷ বাঁশের চাটাইয়ের ওপর বেতের বাঁধনি দিয়ে ধান চাল রাখবার ডোল তৈরি করে৷ ঘর পড়ে গেলে বাঁশ দিয়ে, তালপাতা দিয়ে ঘর বেঁধে নেয়৷

কোম্পানির লোক বলল, ‘তোমার প্রজারা পালাল?’

‘ব্যাটারা অতি পাজি’ বলে রায়রাজা চুপ করে রইলেন৷

সেই সময়েই খেতাকে মাসির বাড়ি রেখে গেল বাবা৷ বাবা, মা, তিন দাদা কোথায় যে গেল কে জানে? বলে গেল, ‘লুক্কে লুক্কে থাকি গা৷ সময় হলে ফিরব৷’

সেই থেকে এই সাতাত্তর সাল অব্দি ওদের খোঁজ নেই৷ মাসির তেমন অভাব নেই৷ চারপাশে বন আর বন৷ বন থাকলে বৃষ্টি, খনার বচন৷ এদিকে বৃষ্টি হয়েছিল, ধানও মন্দ হয়নি৷

তা ছাড়া খেতার মেসো আর দুই দাদা যে কী ভালো লোকের কাছারিতে কাজ করে তা বলা যায় না৷ এই এমন মন্বন্তরেও ওরা রাতের আঁধারে চাল এনেছে, ধান এনেছে, খেতার মাসি ডোল ভরে ঘরে তুলেছে৷

খেতা ওর মাসির কাছে চিরকালই ভালো থাকে, তবে মনটা মাঝেমধ্যে পোড়ে বই কী৷ মনে হয় গ্রামে ফিরে যাই৷ মাসি বলে গ্রামে নাকি এখনও ঘরকে ঘর শুন্যি হয়ে আছে৷

খেতা আজ সায়েবের কালীপুজো দেখতে যাবে বলে খুব ব্যস্ত৷ ও তাড়াতাড়ি বাছুর খুঁজতে গেল৷ বাছুর যদি ওই অজগর জঙ্গলে ঢোকে তবে নির্ঘাত বাঘের পেটে যাবে৷

ডাকাতের ভয়টাও কম নয়৷ কে জানে বীরে ডাকাত কে, আর ছিরে ডাকাত কে৷ তবে কোম্পানি যেদিন থেকে খাজনা তুলছে তার আগে থেকেই ডাকাতে ডাকাতে দেশ যেন ছেয়ে গেছে৷

কর্তাদাদা তো সেই জন্যেই বলে দেশটা পাপে ভরে গেছে৷ কর্তাদাদা যে রোজ নামকীর্তন করে তাতে নাকি পাপ কমে যায়৷

বনে ঢুকতে প্রথমটা খেতার ভয় করেনি৷ পৌষের শীতে আর যাই বল সাপের ভয় থাকে না৷ সাপগুলো সব পাতালে, গাছের কোটরে, গর্তে, ইটের পাঁজায় সেঁধিয়ে গিয়ে ঘুমোয়৷

এ সময় ভয় যাঁকে তিনি চিতাবাঘ৷ বড়ো বাঘ সদাসর্বদা বনে ঘেঁষে না৷ বড়ো বাঘ ঘোরে-ফেরে বড়ো জঙ্গলে৷ সেই যে বড়ো গাং, যার নাম পদ্মা তার কাছাকাছি কী বড়ো বড়ো জঙ্গল৷ সেখানে হরিণ খেয়ে বড়ো বাঘ সুখে থাকে৷

চিতাবাঘের মতো পাজি আর কে আছে বল৷ গাছে উঠবে, ঘরের চালে উঠবে, সাঁঝপিদিম জ্বলতে-না-জ্বলতে গেরস্ত বাড়ির কানাচে সেঁধোবে৷ তারপর ছাগলটা, হাঁসটা, নিদেনপক্ষে কুকুরটা নেবে৷ গাঁয়ে কুকুর অমন অনেক থাকে৷ গেরস্ত যা দু-মুঠো দেয় তাই খেয়ে গ্রাম পাহারা দেয়৷

চিতাবাঘের ওই কুকুর বেজায় পছন্দ৷ তাইতো মাসি বলে, সায়েবরা কাশিমবাজারের, বানঝাটিয়ার কুঠিতে যে কুকুরগুলো রেখেছে তাদের গলায় পেতলের পাত পরানো৷ চিতাবাঘ যে ঝপ করে দাঁত বসাবে আর খপ করে তুলে নেবে সে উপায় নেই৷

এ বাছুরটা এখনও ছোট্ট আছে৷ মাসির গোয়ালে যখন এক-একটা নতুন বাছুর বা ছাগল ছানা হয়, মাসি সেগুলো খেতা বা থাকোর হেফাজতে দিয়ে দেয়৷ খাওয়ানো, নাওয়ানো, চরানো, গোয়ালে তোলা, সব ওদের কাজ৷

বনের ভেতর গজাড়, শাল, পাকুড়, তেঁতুল, শ্যাওড়া কতরকম যে গাছ৷ খেতারা কোনোদিন উনোন ধরাবার কাঠের অভাব জানে না৷ বনে শুকনো ডালপালা পড়েই থাকে৷ যত পার কুড়িয়ে নাও৷

‘মদন রে! মদন রে!’

খেতা ডাকতে ডাকতে চলল৷ মদন, পবন, বদন, খেতা গোরুবাছুরের নাম দেয় বেশ৷ অনেক দূরে যেন পাতা ছেঁড়ার শব্দ৷ বাছুরটা কি পাতা ছিঁড়ছে আর খাচ্ছে?

‘মদন রে!’

খেতা ডাকল৷ আর এমন সময় কে যেন বলল, ‘কে রে ডাকাডাকি করে?’

খেতা বেজায় অবাক হল৷ এপাশে চায়, ওপাশে চায়, হঠাৎ দেখল চারচৌকো ইটের ঘরের দাওয়ায় একটা লোক বসে আছে৷ যেমন লম্বা, তেমনি সিড়িঙ্গে রোগা৷ মাথার চুল কাঁধ অব্দি৷ গায়ে একটা সত্যিকারের পিরান৷ খেতারা যেমন বুকের ওপর গামছাখানা আড় করে বেঁধে পিরান পরে সায়েব সাজে, তেমন নয়৷

বোতাম আঁটা সত্যিকারের পিরান৷ তা ছাড়া কানে দুটো রুপোর বউলি*, মাথায় পাগড়ি, পায়ে জুতো৷ এক হাতে একটা লাঠি, তার মাথাটা লোহা দিয়ে বাঁধানো৷ দেখে খেতা যেন ধড়ে প্রাণ পেল৷ লাঠির মাথায় লোহা আছে! তবে এ মানুষ, অপদেবতা নয়৷

কে না জানে অপদেবতারা লোহা দেখলে ভয় পায়? লোকটা কলকেতে টান দিচ্ছিল৷ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে সে বলল, ‘আমায় ডাকছিস কেন?’

খেতারা সচরাচর কারুকে ‘আপনি’ বলে না, কিন্তু কর্তাদাদার শিক্ষাদীক্ষা অন্যরকম৷ খেতা বলল, ‘আমি বাছুরটা খুঁজছি৷ আপনি হেথা বসে আছ তা কি আমি জানি, না আপনার নাম জানি?’

‘বাছুরের নাম মদন?’

‘আজ্ঞা৷’

‘ভালো ভালো৷ তা, তুই কাদের ছেলা?’

‘আমাদের নিবাস বুনোবিষ্ণুপুরে আজ্ঞা, হোই পথের ওধারে৷’

‘কার ছেলা তুই?’

খেতা বাবার নাম বলল৷ লোকটা এখন হাসল৷ বলল, ‘তাই বল৷ তা তোর মেসোর বাড়িতে আমি অতিথ হব আজ৷’

‘অতিথ হবে আপনি?’

‘হ্যাঁ৷ তোর কত্তাদাদা আমার গুরু হয় যি৷ যা, বলগা যেয়ে মদন ঢালি আজ আপনার চরণ ধরতে আসবে৷’

‘এখনই?’

‘না না, সাঁঝ হক, আঁধার হক, তা বাদে যাব৷ মাসি জানি ভাত রেঁধে রাখে৷’

‘সায়েব আজ কালীপুজো করবে আপনি যাবে না দেখতে?’

‘না না৷ সায়েব দেখলে আমি বড়ো ডরাই৷ আর দেখ, যা বলবি শুধু কত্তাদাদা আর মাসির কানে৷ কেও যেন জানে না৷’

খেতা অবাক হয়ে ঘাড় নাড়ল৷ লোকটা বলল, ‘আমি বলে বসে আছি ডাকাত ধরব বলে, জানলি? আমি হলাম যেয়ে কোম্পানির পেয়াদা৷’

‘তবে সায়েব দেখে ডরাও কেন?’

‘সে তুই কী জানবি? সি দিনের ছোঁড়া? যা যা, ঘর যা!’

খেতা বাছুরটা খুঁজে নিয়ে বাড়ি চলে এল৷ কর্তাদাদা তো ওর কথায় মহাখুশি৷ বলল, ‘মাসিকে বলগা ভাত বেন্নুন রেঁধে থুয়ে জানি বেলা থাকতে চলে যায়৷’

‘আপনি কি পওরা দেবে?’

‘দেখি কে পওরা দেয়!’

কর্তাদাদা হাসল৷ কর্তাদাদা সামান্য লোক নয়৷ সবাই তো বলে কর্তাদাদা মন্ত্র জানে৷ গাছ চালাতে পারে৷ বান মেরে পুকুরের মাছ মেরে দিতে পারে৷ পিদিম মন্ত্র পড়ে চেলে দিতে পারে৷ সে পিদিম ভেসে ভেসে দূর গ্রামে গিয়ে শত্রুর ঘরদোর জ্বালিয়ে দিতে পারে৷

হয়তো একটা ভূত-প্রেতকেই কর্তাদাদা মন্তর পড়ে রেখে দেবে৷ ভূতটা এসে মাসির হেঁসেল পাহারা দেবে৷

খেতার হঠাৎ কী মনে হল৷ বলল, ‘ও কত্তাদাদা৷ আমার বাপ এলে আমি চলে যাব যি, তা আপনি আমায় মন্তরটা শেখাবে না? আমি তোমার পায়ে নিত্য তেল মালিশ করি, তোমার মাজা টিপি?’

‘কোন মন্তরটা?’

‘সেই ডাকাত ধরার মন্তরটা?’

‘মন্তর শিখে কী করবি?’

‘বীরে ডাকাত, ছিরে ডাকাত দু-ব্যাটাকে ধরে গামোছা বেঁধে নে যাব৷’

‘দেব দেব, তোকেই মন্তর দেব৷’

‘থাকোটাকে দিয়ো না৷’

‘ধুর ওটা মেয়েমানুষ, ভাত রাঁধবে, বাসন মাজবে৷ ওকে কখনো ও মন্তর দিই?’

মাসি যেমন হুসহাস করে গিয়েছিল তেমনি হুসহাস করে বামুনবাড়ি থেকে ফিরে এল৷ সঙ্গে হরিচরণের মা আর পিসি৷ শাশুড়ি আসছে বলে থাকো তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় দিল৷ হরিচরণ দাওয়ায় সভ্যভব্য হয়ে বসল৷

মাসির ধামায় মুগকলাই, একটা বড়ো লাউ৷ লাউটা হরিচরণের মা বেয়ানের জন্যে এনেছে৷

মাসি বাড়ি ঢুকতেই খেতা বলল, ‘ইদিকে শোন মাসি৷’

‘দাঁড়া বাছা, টুকুন জিরিয়ে নি৷’

‘জিরোবি পরে, এখন শোন৷’

খেতা মদন ঢালির কথা বলল৷ মাসি তখন খেতাকে অবাক করে বলল, ‘পুকুরধারে চল বাছা, তোর ব্যাগ্যোতা করি৷’

মাসি কারও ব্যাগ্যোতা করে নাকি? খেতার তো মনে পড়ে না৷

পুকুরধারে গিয়ে মাসি চুপে চুপে আঁচল খুলে খেতাকে হাতে একটা জিনিস দিল৷

লোহা আর তামা মেশানো ঢ্যাক পয়সা৷ একটা জলজ্যান্ত গোটা পয়সা৷

‘মোকে দিচ্ছ?’

‘নয় তো কি থাকোটাকে দেব?’

একটা পয়সা আবার খেতারা কবে হাতে পায়! এখনও ওরা শাকটা মুলোটা, লঙ্কা, লাউটা বাড়িতে ‘আরজায়’=৷ বনজঙ্গল থেকে জ্বালানি আনে৷ পুকুর-নদী-বিল থেকে মাছ কাঁকড়া গুগলি কচ্ছপ ধরে৷ পাখি শজারু খরা শিকার করে৷

বাকি রইল তেলটুকু, নুনটুকু, পরনের কাপড়টা গামছাটা৷

খেতার অবশ্য মেসো আছে৷ যাদের মেসো নেই তারা গ্রামের মুনিববাড়ি, বামুনপাড়া, কায়েতপাড়া, সব জায়গায় যায়৷ জমি চষে, ধান পায়৷ ধান ভানে, চাল করে৷ জমি তাদের নয়, তাই আকালে, বানে, খরায় উপোস করে৷

ওরা জঙ্গল কাটে, মাটি কোপায়, নালা কেটে জল বইয়ে দেয়, পুকুর খোঁড়ে, বর্ষা গেলেই বাড়ি বাড়ি দাওয়া বাঁধে, ঘর ছায়৷

পয়সা পায় না, কড়ি পায়৷ এই রাঙা রাঙা তেলতেলে কড়ি৷

কাপড় পায়, গামছা পায়৷ যখন পায় না, তখন কড়ি দিয়ে কলুবাড়ি থেকে তেল কেনে৷ জোলাপাড়া থেকে কাপড় গামছা আনে৷

পয়সা আবার কে কবে হাতে পায়? কর্তাদাদা তো বলে পয়সা ছিল সেই কবে, সেই সত্য যুগে, যখন দেশে অন্যরকম নবাব ছিল৷

একটা পয়সা৷ আহা, এমন একটা পয়সা দিলে বুঝি গিরিকাকা ছোটো একটা রথ বানিয়ে দেয় খেতাকে৷ রথের দিনে রথ টানতে মজা কত!

‘পয়সাটা তোরে দিছি খেতা, শোন, মদন ঢালি মানুষ সামান্য লয়, উনি যখন রইবে, তোর কর্তাদাদার সঙ্গে কথা কইবে, ততক্ষণ তুই যেয়ে চালে উঠবি গা!’

‘চালে?’

‘হ্যাঁ৷ লুক্কে থাকবি৷ শুনবি কী বলে ওরা৷ তা বাদে যতক্ষণ দেখবি মেসো আসতেছে, ততক্ষণ লুক্কে রইবি৷ মেসো কী বলে, উনি কী বলে, কত্তাদাদা কী বলে সব শুনবি৷ শুদু মোকে বলবি, আর কারেও লয়৷ যদি পারিস তবে তোকে এট্টা সামিগ্রী দেব৷’

‘কী দেবে?’

মাসি বিরসবদনে বলল, ‘যাতে পরান দিয়ে এখেছ সেই সামিগ্রী৷ তোমার বাপের সেই সড়কি গাছা৷ না দিলে কামারশালে যেয়ে ধন্না দেবে তো?’

খেতার বুকটা ধুক ধুক করতে লাগল৷ মাসি কেমন করে জানল কামারশালায় ধন্না দেয় খেতা? নিশ্চয় কামার জেঠার ছেলে ফেলারাম বলে দিয়েছে৷

‘তোর কত্তাদাদার বুদ্ধি আর ভালো হবে না’, বলে মাসি চলে গেল৷

দেখো কাণ্ড! কর্তাদাদাই যে খেতাকে বুদ্ধিটা দিয়েছিল, বলেছিল নিজের হাতে সড়কি একটা থাকলে খুব ভালো হয়৷

কর্তাদাদা জানে৷ কর্তাদাদা তো সেই কবে যেন বর্গিদের সঙ্গে লড়েছিল৷ সে যুদ্ধ হয়েছিল দশ বছর ধরে৷ যে ছেলেগুলো ছোটো ছিল যুদ্ধ করতে করতে তাদের গোঁফ গজিয়ে গিয়েছিল৷

সেই সময়কার মানুষ কর্তাদাদা৷ এখনও যদি যুদ্ধের গল্প করে তাহলে খেতার বুকের ঠিক ভেতরটা চমকে ওঠে৷

কর্তাদাদা বলে, ‘সি কী যুদ্ধ! বালুচরের হোথা সে ধান খেতে পাকা ধানের গন্ধ ম-ম করতেছে৷ বর্গিরা শুধু বলে ‘হর হর মহাদেও’ আর ধান খেতে ঘোড়া ঢুকিয়ে দেয়; তখন তোর বাপের কাকা, উই ছিচরণদাদা বললে, হারে! তোরা ধানের চালে ভাত খাসনি? মোরা বললাম নিশ্চয়৷ তিনি বললে হাতে সড়কি নি? মোরা বললাম নিশ্চয়! তখন উনি মাথায় ফেটা বেঁধে নিলে আর বললে সড়কি হাতে চেপে ধরে চল যেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি৷’

‘তারপর?’

‘আমি জানি ডর খেলাম৷ শুধালাম ছিচরণদাদা? ওরা যে অগণন! দাদা বললে, মোরা যে বীরবংশী! চল, মোরা যেয়ে বানের জলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি! একথা বলে, গায়ে মাথায় ধুলো মেখে উনি যখন হাঁকুর পাড়লে, কুড়ুল- বুনোবিষ্টুপুর-মাথলা-সাভাস গেরামের নাম-তোরা চলরে! তখন আমার বুকের ভেতর জানি কেঁপে গেল৷’

‘তা বাদে? ও কত্তাদাদা, তা বাদে?’

‘তা বাদে মোরা যেয়ে বানের জলের মতো ঝাঁপ দিলাম৷’

‘তা বাদে?’

‘মোরা গেলাম ভাগীরথীর বানের মতো, ওরা এল সমুদ্দুরের বানের মতো৷ মোদের রক্তে ওদের রক্তে বাতচরের মাটি আঙিয়ে দিয়ে এলাম সিদিন৷ এই দিনের যুদ্ধে মোদের গেরাম তোদের গেরামের কতজন যে মরেছিল তার লেখাজোখা নি খেতা! নবাব য্যাখন মোকে খেতাব দেলে ত্যাখন আমি তাঁর দেওয়া পাগড়ি নিই, মোর আঙুল বেঁকে যেতে থাকল৷ ছিচরণ দাদা, করালী ঢালি, মোহনকালি সাঁতরা যদি থাকত, তবে নবাব তাদেরকে সোনার তাজ দেত৷ আমি তাদের পায়ের নখটা বটি৷ তাই যেমুছেমু শিরপা নে চলে এলাম৷’

কর্তাদাদা এখন শুধু কীর্তন গায় আর হরিনাম করে৷ তবু কর্তাদাদা ওকে প্রায়ই বলে, ‘মাসির থে তোর বাপের সড়কিটা যদি চে নিতে পারিস খেতা, বেশ হয়৷’

মাসি বলল সড়কিটা দেবে৷

কিন্তু মদন ঢালি কর্তাদাদাকে কী বলে তাও শুনতে হবে৷

খেতা সাত-পাঁচ ভেবে বাড়ির ভেতর গেল৷ ভেতরে গিয়ে ওর হাসি পেল৷ থাকোর শাশুড়ি থাকোর চুলে তেলজল দিয়ে থাবড়ে থাবড়ে একটা এতবড়ো খোঁপা বেঁধেছে৷ তেলজলে গামছা ভিজিয়ে থাকোর মুখ মুছে একটা এতবড়ো টিপ পরিয়ে দিয়েছে৷ থাকো বলল, ‘পায়ে মল পরব না?’

শাশুড়ি বলল, ‘তা আর পরবে না? দেশজোড়া আকাল, তুমি পেতলের মল বাজাতে বাজাতে যাবে না? তা বাদে ডাকাত এসে পড়ুক৷’

থাকোর শাশুড়ির ডাকাতের ভয় খুব৷

খেতা স্নান করল৷ মাসি অনেকদিন বাদে তেল মেখে, সরষের খোল দিয়ে গা মেজে স্নান করল৷ কর্তাদাদার ভাত বেড়ে থাকো দাওয়ায় দিল৷

ওরা সবাই পৌষের রোদে পিঠ দিয়ে উঠোনে বসে ভাত খেল৷ থাকোটা শুধু ঘোমটা কেড়ে* পেছন ফিরে খেতে বসল৷ হরিচরণ আছে শাশুড়ি আছে, লজ্জা করতে হয়৷

ল্যাঠা মাছ, গজাড় মাছ, বেগুন লঙ্কা দিয়ে ঝাল হয়েছে, ময়ামাছের টক৷ মটর ডাল ন্যাকড়া বেঁধে ভাতে দেওয়া হয়েছিল, মাসি সেটা শুকনো লঙ্কা পোড়া আর তেল দিয়ে মেখেছে৷ হরিচরণের পিসি কলাপাতা মুড়ে একটা নতুন জিনিস এনেছে৷

খরার মাংস তেঁতুল লঙ্কায় মজিয়ে শুকনো করে রেঁধেছে৷ মাসি বলল, ‘কেমন করে মজালি?’

পিসি কথাই বলল না৷ থাকো বলে, ‘পিসি কেমন করে বেন্নুন করল, কোথা থেকে ফলপাকুড়টা পেল কখনো তা বলতে চায় না৷’

খেয়েদেয়ে সবাই হাতে হাতে বাসন মাজল৷ মাসি জল তুলে জালা ভরে রাখল৷ আজ মেসো আসবে, কানাই বলাই আসবে৷ কালীপুজো দেখতে এখন এক ক্রোশ যাবে, এক ক্রোশ আসবে মাসি৷

তারপর রাঁধতে বসবে৷ মেসো এলে বড়ো ভালো লাগে খেতার৷ মেসো যখন আসে, তখনই রাতে রান্নাবান্না হয়৷ নইলে মাসি দু-বেলা রাঁধতে চায় না৷

হাঁস, ছাগল, গোরু-বাছুর সব ঘরে তুলল মাসি, খেতা আর থাকো৷ মাসির ঘরখানা খুব বড়ো৷ চারচালা ঘর, মেসো আর খেতার বাবা বেঁধেছিল৷ ঘরের মাঝামাঝি থেকে দেওয়াল পর্যন্ত বাঁশের বেড়া দেওয়া৷ ঘরখানা দু-ভাগ করা, দু-দিকেই বাঁশের মাচা৷

ওই মাচা ওদের খাট-পালঙ্ক৷ মাচার ওপর চেটাই পাতা৷ আর তার ওপর মোটা গড়ান* বেছানো৷ গড়ানের নীচে খড় পুরু করে পাতা৷

পৌষ মাসের শীতে খড়ের গরমে খুব আরাম৷ পিঠের নীচে খড়৷ গায়ে পুরু কাঁথা৷ মাসি যে মাচায় শোয় তার নীচে মাটিতে একটা সিন্দুক বসানো আছে৷ সিন্দুকে কী থাকে খেতা তা জানে না৷ মাসি বলে, ‘এই চালটা ডালটা, আর কী রইবে বল?’

মাসির ঘরে মাসি কুলুপ আঁটল৷ মাসি কুলুপ বলে না, বলে কুলুশ৷

তারপর বলল, ‘খেতা, ঘর মুনে* রইবি, জানিস?’

‘বলেছি তো রইব৷’

খেতার এখন কান্না পেল৷ কেন ওরা সবাই যাচ্ছে? কেন খেতা একা থাকবে? কিন্তু মাসি ওর দিকে কটমট করে তাকাল৷ মাসির পরনে ক্ষার দিয়ে কাচা কাপড়, হাতে মাটির কটকটে শক্ত রাঙা কড়৷ মাথায় মোটা সিঁদুর৷

থাকোর শাশুড়ি বলল, ‘নক্কি ছেলে খেতা৷ তু কাঁদিস না খেতা৷ তোরে আমি এট্টা নারকেল আর ছাতুর লাড়ু দে যাব৷ এবার আনতাম বাপ, তা সায়েবের সাথে দেখ গা অগণন পাক-প্যায়দা-লশকর৷ তারা কানাত ফেলেছে কত বড়ো দেখে এলাম যি৷ তারা থাকে বলে সামিগ্রী জোগাতে যেয়ে বড়ো হায়রান হয়েছি বাপ৷’

ওরা চলে গেল৷

তারপর একসময় চারদিক ছায়া ছায়া করে সন্ধ্যে নামল৷ শীতের সন্ধ্যে তাড়াতাড়িই নামে৷ সন্ধ্যে হতে-না-হতে মেসো আর কানাই বলাই এসে পড়ল, বলল, ‘মাসি কোথা খেতা?’

‘সায়েব কালীপুজো করছে তাই দেখতে গেছে৷’

‘তুই গেলি না?’

‘ঘর মুনতে বলে গেছে৷’

‘তা ভালো তা ভালো৷ তা মাসি ভাত রাঁধবে না?’

‘এসে রাঁধবে৷’

‘তা আমি তো এসে পড়েছি৷ তুই যাবি নাকি? যাবি তো যা৷’

‘না৷ মাসি মারবে৷’

‘তা ভালো তা ভালো, এই নে৷’

মেসো গামছার বাঁধন খুলে খেতাকে দু-খানা বড়ো বড়ো ক্ষীরের ছাঁচ দিল৷ বলল, ‘খেয়ে ঘুমো গে যা৷’

খেতা বলল, ‘আমি মাসির কাছে শোব আজ৷ তা দেখো, রান্না হলে মোকে জাগিয়ে দিয়ো৷’

‘দেব রে দেব৷’

ওরা চিঁড়ে আর ক্ষীরের ছাঁচ খেল, জল খেল৷ তারপর কর্তাদাদার ঘরে গেল৷ যাবার আগে কানাই উঠোনে একটা বড়ো মশাল পুঁতে জ্বেলে দিয়ে গেল৷

কাঁঠালের আঠা, গন্ধক, এই সব দিয়ে মাসি বছরভর মশাল তৈরি করে রেখে দেয়৷ আগুন হেঁসেলে সর্বদা থাকে৷ শুধু ঝড় এলে আগুনে জল ঢালে মাসি৷ ঝড় এলে জ্বলন্ত কাঠকয়লার ফুলকি উড়ে পড়লে ঘর জ্বলে যায়৷

নয়তো মাসির উনোনের গর্তে সবসময় কাঠকয়লার গনগনে আগুন ছাইচাপা থাকে৷ চকমকি পাথর তো সবসময় হাতের কাছে থাকে না৷ ঠুকে ঠুকে আগুন জ্বালবে মাসি?

মশালটা জ্বেলে দিয়ে গেল কানাই৷ খুব আলো হয় মাসির তৈরি মশালে৷ চারদিক রোশনাই হয়৷ এমন আলো দেখলে শেয়াল বল, হুড়ার বল, এমনকী চিতাবাঘ চট করে কাছে ঘেঁষে না৷

ওরা চলে গেল আর খেতা উঠে পড়ল৷ হাতে হাতে পাওয়া একটা পয়সা এখনও ওর ট্যাঁকে৷ গায়ে বেশ করে দোলাইটা জড়িয়ে নিল৷ তারপর ঘরের দোর ভেজাল৷

গোয়ালঘরের পেছনে বাঁশের খুঁটি৷ খেতা খুঁটি ধরে ওপরে উঠল৷ তারপর খড়ের চালে মুখ ডুবিয়ে আস্তে আস্তে খড় ফাঁক করতে লাগল৷

কর্তাদাদা মাচার ওপর বসে আছে৷ কর্তাদাদার পাশে সেই লোকটা৷ মদন ঢালি৷ মেসো, কানাইদাদা, বলাইদাদা আর ফেলার বাবা গিরি কামার৷ কর্তাদাদা বলছে, ‘আরে সায়েব তো সবাই৷ তো ব্যাটারা তো গায়ে পিরেন আর পায়ে জুতো দেখলেই বলবি সায়েব!’

‘পান্তাসায়েবের চেলা লয় কো!’

ওয়ারেন হেস্টিংস নাকি একবার প্রাণের ভয়ে না নবাবের ভয়ে মুদির দোকানে লুকিয়েছিল৷ মুদি হেস্টিংসকে পান্তাভাত আর কাঁচা লঙ্কা খাইয়ে প্রাণ বাঁচায়৷ সেই থেকে খেতারা হেস্টিংসকে পান্তাসায়েব বলে৷

‘কেমন করে জানলি পান্তাসায়েবের চেলা লয়?’

‘আরে, খবর না লিয়ে কি আসা করেছি?’

মেসো একটু বিরক্ত হয়ে কর্তাদাদাকে বলল৷ মদন ঢালি একটু হাসল৷ বলল, ‘আমার খবর আরেকরকম৷’

‘কীরকম হে মদন?’

মদন ঢালি আঙুল গুনে গুনে বলল, ‘এট্টা খবর সায়েব এয়েছে খবর নিতে৷ শিরোমণি কত্তার বড়ো ছেলে খবর রাখতেছে কারে কারে ডাকাত বলে সন্দ করে৷’

কর্তাদাদা চোখ বুজে বলল, ‘বড়ো ছেলেটা? তা তাঁরে একবার গোলোকে দেখ্যে দিলে হয়? হরি বলো মন!’

খেতার চোখ গোল গোল হয়ে গেল৷ হাত-পা বেঁধে চারপ্রহর উপোসি রাখবার নাম গোলোকে দেখানো৷

‘আর খবর এই সায়েব মৌজা হতে তিন হাজার টাকা খাজনা তুলেছে৷ আর খবর হল কালীপুজো ছলা মাত্র৷ সায়েব কাল খাজনা নে কলকেতা ফিরবে৷ সঙ্গে পাইক-পেয়াদা বরকন্দাজ রইবে তিরিশ জন৷’

‘তিরিশ জন!’

‘আজ্ঞা তিরিশ জনের মধ্যে বিশ জন অপোনারই আপনজন৷’

মদন ঢালি হাতজোড় করে বলল, ‘এ অধীনের চাকরি এ কম্ম যি! সায়েবরা এখন দেশের দেওয়ান৷ কোম্পানি দেওয়ানি নিলে যতক্ষণ, ততক্ষণ পাইক-প্যায়দা চাই! যেমন-তেমন হলি চলে না৷ লড়ুয়ে পাইক-প্যায়দা চাই৷ তা মদন ঢালি কোম্পানির কাছারিতে প্যায়দা-পাইক নে আসে৷’

‘হরি বলো মন!’

‘এই দেখেন গা খেতা নামে যি ছেলেটা, ওর বাপ, ভাই, কাকা, জ্যাঠা সব প্যায়দা হয়ে এয়েছে৷ আরও প্যায়দা সব গে তেঁতুলে, নিবলে, আঁবুই, সরাসে, এই চারখানা গেরামে আপোনার যত জ্ঞাতগুষ্টি আছে তারা সবাই৷’

‘সবার হাতে সড়কি আছে?’

‘আজ্ঞা লাঠিসড়কি বিনে কি প্যায়দা চলতে আছে? এক ব্যাটার কাঁধে আবার বন্দুক একখানা৷’

‘হরি বলো মন! তা কাল তালে যাত্রা কখন!’

‘ভোরে৷’

‘তবে এট্টা সংকীর্তনের দল চাই যে৷’

‘সংকীর্তনের দল?’

‘ইদিক হতে ওনারা যাচ্ছে, সাথে সাথে দলটা যাবে৷ সে যেয়ে মানকড়ার কাছে এক গেরামে কীর্তনের বায়না হয়েছে৷ তা দিনকাল বড়ো মন্দ তো? পথে ডাকাতের ভয়৷ সায়েবের প্যায়দা সঙ্গে রইলে ভয়ডরটা কম থাকে মনে৷ এট্টা পালকি৷’

‘পালকি কী হবে?’

কর্তাদাদা মুখ খিঁচিয়ে বলল, ‘নন্দ কামার আমার চে কয় পত্তরের ছোটো৷ মোরা কি হেঁটে যাব?’

‘আপনি যাবে?’

‘কুটুমবাড়ি যাব না?’

খেতার মেসো এই সময় গলা খাঁখারি দিয়ে বলল, ‘এট্টু গান ভাঁজলে হয় না? খেতার মাসি এসে পড়লে পরে…৷’

ওরা সবাই গাইতে লাগল, ‘আরে হরি বলো মন, রসনা আহা হরিনাম কেমন জান না৷’

খেতা চুপিসারে নেমে এল৷ খেতার মাসি বাড়ি এসে সকলকে খেতে দিল৷ তারপর রাতে বিছানায় শুয়ে খেতা যখন সব কথা বলল, তখন কী হল জান? পিদিমটা নিভিয়ে দিয়ে খেতার মাসি খিক খিক করে হাসতে লাগল৷ বলল, ‘কাল ওরা তোকে সাথে নেবেনিকো৷ তুই যেমন জিদ করে চলে যাসনি খেতা৷ কাল ঘরে থাকিস৷’

খেতা কোনো কথাই বলল না৷ খেতার বাপ, ভাই, জ্যাঠা সকলকে দেখতে পাবে তবু খেতা যাবে না? তা কখনো হয়?

তারপর সে কী কাণ্ড, সে কী কাণ্ড!

সায়েব তো থলি বোঝাই রুপোর টাকা ঘোড়ার জিনপোশের নীচে বেঁধে রওনা হয়েছে৷ রাস্তাটা বেশ চওড়া৷ তাই পাশে পাশে কীর্তনের দল চলেছে বলে কোনো অসুবিধেই হয়নি৷

দুই বুড়ো পালকি চড়ে চলেছে৷ তাদের ঝগড়া শুনতে শুনতেই সময় কেটে যাচ্ছে৷ যত চেঁচায় খেতার কর্তাদাদা তত চেঁচায় নন্দ কামার৷

‘নন্দকুমার রাজার বাড়ি দুর্গোচ্ছব করিছিল, যতজনা মানুষ তত গণ্ডা চিনির সাঁচ, মুড়কি আর দই দিয়েছিল৷’

‘ঃই! তাই যদি দেবে তবে তুই পরের বছর দুর্গোচ্ছবে গেলি না কেন?’

‘গেলাম না কেন? পায়ে ফোঁড়া হয়েছিল কার?’

‘তোর ফোঁড়া হল যদি তবে তিনকোশ পথ হেঁটে মাছ চুরি করতে গিয়েছিল কে?’

সায়েবের পাশে পাশে চলেছে মদন ঢালি৷ পথটা মন্দ নয়৷ কখনো ধান খেতের পাশ দিয়ে, কখনো-বা বাবলা বনের ভেতর দিয়ে চলেছে৷ ক্রমে ওরা জঙ্গলের কাছে এল৷ জঙ্গলের ওপারে মানকড়া আর মানকড়ার কাছের একটা গ্রামে কীর্তনের বায়না হয়েছে৷

সায়েব বলল, ‘বেলা বাড়ছে৷ বড়ো গরম৷ ছায়ায় ছায়ায় গেলে হত৷’

মদন ঢালি বলল, ‘জঙ্গলে নাকি ডাকাতের ভয়?’

‘এত লোক থাকতে ডাকাত আসে কখনো?’

‘আসে না?’

‘কেমন করে আসবে?’

মদন চেঁচিয়ে বলল, ‘অ কর্তাদাদা, সায়েব বলতেছে ত্যাত লোক রইলে ডাকাত আসে কেমন করে?’

বুড়োকর্তা পালকি থেকে মুখ বের করে বলল, ‘কী বলতেছে?’

‘ডাকাত আসে কেমন করে?’

‘কেন এমনি করে৷’

এই না বলে কর্তাদাদা পালকি থেমে নেমে পড়ল৷ নন্দ কামারও বলল, ‘সায়েবটা তো মহা জ্বালাল দেখছি৷’

নন্দ কামারও নেমে পড়ল৷ খেতার বুক ঢিপ ঢিপ করছিল, ও ছুটে গাছের আড়ালে গেল৷ তখন কর্তাদাদা আর নন্দ কামার দুই খুনখুনে বুড়ো কী করল জান? মেয়েরা যেমন করে উলু দেয় ঠিক তেমনি করে মুখের ভেতর আঙুল নেড়ে জিভ ঘুরিয়ে হা রে রে বলে চেঁচিয়ে উঠল৷

কর্তাদাদা বলল, ‘বীরে ডাকাত ছিরে ডাকাতের নাম জান না? মোরা মন্বন্তরে পোকামাকড়ের মতো মরে আছি আর তোমরা দেওয়ান হয়ে সব্বস্ব নিয়ে যাবা? মোরা কি কীটের মতো মরে থাকব?’

সায়েবের কাজ হল খাজনার টাকা নিয়ে যাওয়া৷ সে কি সহজে খাজনার টাকা ছেড়ে দেয়? সায়েব বলল, ‘আমার হাতে বন্দুক আছে, তা ছাড়া তিরিশ জন পেয়াদা৷ খাজনা আমি ছেড়ে দেব না৷’

তিরিশ জনের মধ্যে কুড়ি জনই যখন কর্তাদাদার পাশে গিয়ে দাঁড়াল তখন সায়েব আর কী করে?

খেতার মেসোমশাই ঘোড়াগুলোর লাগাম কেড়ে নিয়ে বনে ছেড়ে দিল৷ মিহিগলায় বলল, ‘সায়েব, এবার তুমি হেঁটে হেঁটে যাও৷ আমরা এবার গান গাইতে গাইতে চলে যাই?’

পালকিতে আবার দু-বুড়ো চড়ে বসল৷ মাঝে টাকার তোড়াগুলো রইল৷ আট-দশ জন পেয়াদা হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল পালকি নিয়ে ওরা ধান খেতের আল ধরে চলে যাচ্ছে৷ যারা এতক্ষণ গলার দু-দিকে গামছা ঝুলিয়ে কোঁচা দুলিয়ে বাবরি চুল নাচিয়ে ‘হরিবোল হরিবোল’ গাইছিল তাদের চেহারা এখন অন্যরকম৷

কোমরে গামছা বেঁধে, সড়কি আর লাঠি আকাশে নাচিয়ে ওরা নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে চলে যাচ্ছে৷ ওরা গাইছে :

বেপদে পড়িলে সবে ছিরের চরণ ধোরো রে!

বীরের চরণ ধোরো রে!

সবচেয়ে পেছনে একটা রোগা হ্যাংলা পেটমোটা ছেলে চলেছে৷ সে-ই নাচছে সবচেয়ে জোরে জোরে লাফ মেরে৷

সায়েব বলল, ‘বুড়ো দুটো বীরে ডাকাত, ছিরে ডাকাত?’

পাইকরা বলল, ‘আজ্ঞা, কলকেতা যেয়ে ভালো পাইক নে এসে ওদেরকে ধরা করাব৷’

সায়েব বলল, ‘চোপরাও! কী বলবে? দুটো বুড়ো আমাকে বোকা বানিয়ে দিয়ে চলে গেল? তাই বলবে?’

বলতে বলতে কী হল জান? পাইকরা হতভম্ব হয়ে দেখল সায়েব হো-হো করে হাসছে আর হাসছে৷

*গড়ে কাপড় [গড়া] : মোটা কাপড়; ভোরেই তারা [চোরাই] : ভোর বেলার তারা; রুপোর বউলি : বোল বা মুকুলের মতো দেখতে রুপোর গয়না৷ কানে ও নাকে পরে; আরজায় : আজ্জায়৷ আজ্জানো বপন বা বোপন করা, গাছপালা লাগানো, বীজ বা চারা বসানো : ঘোমটা কেড়ে : ঘোমটা টেনে; ঘর মুনে : ঘর পাহারায়; কড় : মণিবন্ধে পরার বালা; গড়ান : রঙিন পাড়-ছাড়া মোটা কাপড়৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *