বুড়ি মায়ের মোরগ-ছেলে
অনেক কাল আগেকার কথা৷ এক গরিব গ্রামে ছিল এক গরিব বুড়ি৷ বুড়ির তো সাতকুলে কেউ ছিল না৷ যতদিন পেরেছে, বুড়ি কাঠ কুড়িয়েছে, ঘুঁটে দিয়েছে৷ কিন্তু থুড়থুড়ে বুড়ি হতে সে তো আর কাজ করতে পারে না৷ বড়ো দুঃখে বুড়ি ভিক্ষে করতে শুরু করল৷
গ্রামের মানুষও তো বড়োই গরিব৷ তারা কেমন করে রোজ ভিক্ষে দেয় তাই বলো৷ একদিন গ্রামে কেউ ভিক্ষে দিতে পারল না৷ শুধু একটি বউ বলল, ‘বুড়িমা! আমার ঘরে আজ তো কিছুই নেই৷ তবু বুড়ো মানুষ তুমি৷ এমন আগুনঢালা দুপুরে খালি হাতে ফিরে যাবে? একটা ডিম আছে, তাই নাও৷’
‘তাই দাও বাবা!’
ঘরে গিয়ে বুড়ি ভাবছে আজ নয় উপোস করে থাকি৷ কাল ডিমটা খাব৷ এই ভেবে সে যত্ন করে ডিমটা তুলে রেখেছে৷ ওমা! সকাল হতেই চিক চিক শব্দ৷ বুড়ি দেখে ডিম ফুটে একটা মোরগ বেরিয়েছে৷ এতটুকু ছানাটি৷ দেখলেই মায়া হয়৷ তখনই বুড়ি ঠিক করল যে, মোরগটিকে বাঁচিয়ে রাখবে৷
ভিক্ষের খুদকুঁড়ো খাইয়ে খাইয়ে বুড়ি তো মোরগকে বড়ো করল৷ বড়ো হতে হতে সে মানুষ সমান উঁচু হল৷ এখন আর বুড়ি তাকে খেতে দেয় না৷ পোকামাকড়, খেত-কুড়ানো গমের দানা সে নিজেই জোগাড় করে৷ একদিন সে বুড়িকে বলল, ‘মা, কাল আমি কাজ করতে যাব৷’
বুড়ি বললে, ‘ওমা! মানুষ কাজ পায় না, তুই কোথা থেকে কাজ পাবি যে করবি?’
‘সে তুমি দেখো৷’
পরদিনই মোরগ গিয়ে হাজির ভিনগাঁয়ের মোড়লের বাড়ি৷ মোড়লের মাঠজোড়া ধান খেত৷ ধান কাটার ব্যবস্থা হচ্ছে৷ মোরগ বলল, ‘আমাকে ধান কাটতে দেবে?’
‘তুমি পারবে?’
‘পারি কি না পারি দেখে নিয়ো৷’
মোড়ল আর তার লোকজনেরা খানিক ধান কেটে বাড়িতে গেছে নাইতে-খেতে৷ ফিরে এসে দেখে তাজ্জব ব্যাপার৷ সব ধান কেটেছে মোরগ৷ বয়ে নিয়ে গেছে গোলায়৷ তারপর উঁচু গাছের ডালে বসে আছে৷
মোড়ল অবাক মানল৷ তারপর বলল, ‘ভাই! যেদিন ধান মাড়াই হবে, সেদিন এসো৷ যত কাজ করেছ, তার দাম আমি ধান দিয়ে শোধ করে দেব৷’
মোরগ বাড়ি ফিরে এল৷ বুড়ি বলল, ‘কী কাজ করলি? কত পয়সা পেলি?’
‘মা! ধান মাড়াইয়ের দিনে মজুরি পাব৷’
ধান মাড়াইয়ের দিনে মোরগ তো গিয়ে হাজির৷ দেখে তার জন্যে অনেক ধান রেখেছে মোড়ল৷
‘কী ভাই, বস্তা তো আনোনি৷ এত ধান তুমি নেবে কেমন করে বলো তো?’
‘ভাই, আমি মাথা হেলাচ্ছি৷ আমার কানের ফুটোয় ধান ঢেলে দাও৷’
‘তোমার কানের ফুটোয় কত ধান ধরবে?’
‘যতটা ধরবে ততটাই নেব৷’
মোড়ল ভাবল, মোরগটা কাজ করতে পারে৷ কিন্তু বুদ্ধি তার নেই৷ এক মুঠো ধান ঢাললেই ওর কানের ফুটো ভরে যাবে৷ এ একরকম ভালোই হল৷
মোড়ল আর তার লোকেরা মোরগের কানের ফুটোয় ধান ঢালছে তো ঢালছেই৷ ফুটো আর বোজে না৷ শেষে সব ক-টি ধান নিয়ে মোরগ বাড়ি ফিরে এল৷
বুড়ি বলল, ‘বাছা! এত কাজ করলে সেদিন, আজ শুধু হাতে বাড়ি এলে?
‘তাই কখনো আসি?’
মোরগ মাথা কাত করে দিতেই ধান পড়তে থাকল৷ ধান পড়ে পড়ে পাহাড় সমান উঁচু হল৷ তখন বুড়ির আনন্দ দেখে কে! আর তো ভিক্ষে করব না৷ আর কষ্ট পাব না৷ সব দুঃখই ঘুচে গেল৷
মোরগ বলল, ‘মা! এবারে আমাকে বিয়ে দাও৷ এত ধান সিদ্ধ করতে হবে৷ শুকোতে হবে, ভানতে হবে৷ তবে তো চাল হবে৷ এত কষ্ট তুমি একা কেন করবে? বউ আসুক, সে তোমাকে সাহায্য করবে৷’
বুড়ি তো বউ খুঁজতে বেরোল৷ কিন্তু যাকেই একথা বলে, ‘সে বলে, ওমা!মোরগের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব কেমন করে? মোরগ কি রোজগার করবে, না বউকে খেতে দেবে? সে কখনো হয় না বাছা৷’
বুড়ি তো ফিরে এল৷ মোরগ বলল, ‘কী গো মা! মোরগের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে কেউ রাজি নয়? দাঁড়াও, আমি নিজেই নিজের বউ জোগাড় করব৷’
পরদিন সকালে মোরগ বেরিয়ে পড়ল বউয়ের খোঁজে৷ সে তো চলেছে হনহনিয়ে৷ পথে এক শেয়ালের সঙ্গে দেখা৷ শেয়াল বলল, ‘মোরগ ভাই, যাচ্ছ কোথায়?’
‘বিয়ে করতে যাচ্ছি ভাই৷’
‘চলো আমিও বরযাত্রী হয়ে যাই৷’
‘চলো না, সে তো ভালো কথা৷’
‘তা, বরযাত্রী হয়ে কি হেঁটে যাব?’
‘কেন, আমার কানের মধ্যে ঢুকে পড়ো৷’
শেয়াল তখনই কানের ফুটোয় ঢুকে গেল৷ মোরগ চলছে তো চলছে৷ এক বাঘের সঙ্গে দেখা৷
‘এমন ব্যস্ত হয়ে চলছ কোথায়?’
‘বিয়ে করতে যাচ্ছি ভাই৷’
‘চলো চলো৷ আমিও যাব৷ তবে বাঘ দেখে ভয়ের চোটে মেয়ে পালাবে না তো?’
‘তুমি আমার কানের ফুটোয় ঢুকে পড়ো৷’
একে একে বরযাত্রীর দলে জুটল এক দঙ্গল বোলতা, আগুন আর জল৷ মোরগ তো সামান্য মোরগ নয়৷ সকলকেই কানের ফুটোয় ঢুকিয়ে নিল৷ সামনে এক গ্রাম৷ সে গ্রামের রাজার মেয়েরা কেউ ধান ভানছে, কেউ কাঠ কাটছে, কেউ বাগান কোপাচ্ছে৷ তা দেখে মোরগ ভাবল, এমনি মেয়েই আমার দরকার৷ খাটতে পারবে, হাসিমুখে কাজ করবে, রাজাটা কেমন লোক কে জানে! দেখাই যাক৷
শিমুল গাছের ডালে বসে মোরগ হেঁকে বলল, ‘কোঁকর কোঁকর কোঁ৷ বলি অ রাজামশাই ভালোয় ভালোয় আমার সঙ্গে একটি মেয়ের বিয়ে দেবে, না আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবে? যুদ্ধ করলে তুমি হেরে যাবে তা তো নিশ্চয়৷ তার চেয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দাও৷’
রাজা বললেন, ‘এমন কথা? কে কোথায় আছিস? মোরগটাকে ফেলে দে তো গুড়ের জালার মধ্যে৷ হাবুডুবু খেয়ে মোরগটা মরে যাক৷’
যেমন কথা৷ তেমন কাজ৷ রাজার লোকজনরা মোরগকে ধরে গুড়ের জালায় ফেলল৷ মোরগ তখনই বোলতার দঙ্গলকে বের করে দিল, ‘ভাই বরযাত্রী এনেছি৷ চেটেপুটে গুড় খেয়ে নাও৷ একরত্তি ফেলে রেখো না৷’
বোলতার দঙ্গল তো মহাখুশি৷ তারা গুড় খেয়ে শেষ করে দিল৷ মোরগ বেরিয়ে এসে আবার গাছের ডালে বসল৷ রাজা তা দেখে খুব রেগে গেলেন, ‘এমন সোনারঙা খাসা গুড়৷ তা সব ওই মোরগটা খেয়ে ফেলল? দে ওকে ছাগলের খোঁয়াড়ে ফেলে৷ আমার ছাগলগুলো ওকে পা ঠুকে ঠুকে মেরে ফেলুক৷’
এই বলে রাজামশাই ঘুমোতে গেলেন৷ মোরগ তখনই শেয়ালকে বের করে আনল৷ ভাই বরযাত্রীকে খাওয়াতে হয়৷ তা এই তো তোমার খাসা বন্দোবস্ত৷’
শেয়াল তো মহাখুশি৷ সে আগেই সবগুলো ছাগলকে মেরে ফেলল৷ তারপর পেট পুরে মাংস খেয়ে বনে চলে গেল৷ বলে গেল, ‘ভাই! অনেক বিয়েতে বরযাত্রী হয়ে গিয়েছি বটে৷ তবে এমন ভোজ কখনো খাইনি৷ তোমার কথা আমার খুব মনে থাকবে৷’
পরদিন রাজামশাই রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন৷ একটা সামান্য মোরগ, সে কি না বারবার তাকে জব্দ করবে? ‘এবারে ওকে আমার মোষের গোহালে পুরে দাও৷ আমার মোষগুলো যেমন জোয়ান, তেমনি বড়ো৷ ওরা ওকে সিং দিয়ে মেরে ফেলবে৷’
তোমরা ভাবছ, মোরগটাকে রাজা নিজে কেন মারতে গেলেন না৷ রাজা হলেন অহংকারী মানুষ৷ সামান্য একটা মোরগকে মারলে তার তো মানহানি হবে৷ লড়াই হয় সমানে সমানে৷ রাজা নয়, বীর যোদ্ধা নয়, সামান্য একটা মোরগকে মেরে তিনি কি মান খোয়াবেন?
মোষের গোহালে ঢুকেই মোরগ বাঘকে বের করে দিল, ‘ভাই৷ কত খেতে চাও খাও৷ মোষের মাংস কত ভালো তা তো তুমি ভালোই জান৷’
বাঘকে পায় কে? সব কয়টা মোষের ঘাড় মটকে, সবচেয়ে মোটা মোষটার মাংস পেটপুরে খেয়ে, বাঘ বলল, ‘ভাই! তোমার বিয়ের ভোজের কথা চিরকাল মনে রাখব৷ বিয়ে না হতেই এমন ভোজ খাওয়ানো৷ এমন কথা শোনাই যায় না৷’
পরদিন সকালে রাজা রাগে মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলেন৷ বললেন, ‘ওরে হতভাগা! তোকে আমি নিজেই মারব এবারে৷’
মোরগ উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসল৷ আগুনকে বের করে এনে বলল, ‘ভাই! এবারে তুমি রাজবাড়িটা খেতে শুরু করো৷’
রাজবাড়ি জ্বলে উঠতে রাজা তো ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন৷ এ তো সামান্য মোরগ নয়৷ আগুন যদি জোরে জ্বলে তাহলে সব তো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে৷ এবারে তাঁর সুবুদ্ধি হল৷ হাত জোড় করে তিনি বলতে থাকলেন, ‘ও মোরগ, আগে বুঝতে পারিনি তুমি কত শক্তিশালী৷ তোমার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব, সে তো আমার সৌভাগ্য৷ এখন দয়া করে আগুন নেভাও৷ সব যদি জ্বলে যায়, তাহলে বিয়ে দেব কেমন করে?’
মোরগ তো এই কথাই শুনতে চাইছিল৷ কান থেকে জল বের করে সে আগুন নিভিয়ে দিল৷ এবারে সে মহানন্দে গাছ থেকে নেমে এল৷
তারপর রাজার এক মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হল৷ রাজা তো ভারে ভারে চাল, গম, ভুট্টা, গুড়, লবণ, তেল এমন কত কিছু যৌতুক দিলেন৷ বিয়ের সভায় বাঘ, শেয়াল, আগুন, জল আর বোলতাও এল৷
বাঘ বলল, ‘জীবনে তোমার বাড়ির কোনো মানুষকে বাঘে খাবে না৷’
শেয়াল বলল, ‘তোমার বাড়ির কোনো ছাগল ভেড়া শেয়ালের পেটে যাবে না৷’
বোলতা বলল, ‘তোমার বাড়িতে কখনো বোলতার পাখার গুঞ্জন শুনতে পাবে না৷’
আগুন বলল, ‘তোমার ঘরে কখনো আগুন লাগবে না৷’ আর জল বলল, ‘সারা দেশ বানের জলে ভেসে যাক৷ তোমার ঘর ঠিক থাকবে৷’
মোরগ যখন বউ আর বিয়ের যৌতুক নিয়ে মায়ের কাছে পৌঁছোল তখন তার মায়ের আনন্দ কতখানি হল সে কী বলা যায়?
তার গরিব গ্রামের সকলকে নেমন্তন্ন করে ভাত, ডাল, পিঠে আর গুড় খাওয়াল৷ এরাই তো এতদিন ভিক্ষে দিয়ে ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিল৷ গ্রামের সবাই বলল, ‘বুড়ি মা! এতদিন অনেক দুঃখ করেছ৷ এবারে তুমি সুখ করো৷’
