শিবাজির ঘোড়া
আমার জানাচেনা লোকের মধ্যে একমাত্র অনবরত বাগচি ছত্রপতি শিবাজির ঘোড়ায় চেপেছিলেন৷ বিশ্বাস যদি না করো তবে আমি নাচার৷ অনবরত বাগচির নাম ‘অনবরত’ নয়৷ কিন্তু উনি অনবরত কথা কইতেন বলে নাম হয়ে যায় অনবরত বাগচি৷
খাকি হাফপ্যান্ট আর খাকি শার্ট এবং সেপাইদের বুটজুতো পরে উনি অসম্ভব সব অ্যাডভেঞ্চার করে বেড়াতেন৷ আর মাঝে মাঝে এসে আমাদের গল্প বলতেন৷ ইয়া লম্বা, পেটানো শরীর, মাথার চুল ছাঁটকদম৷
ওঁর কাছেই আমরা জানতে পারি, পৃথিবীতে সব কিছুই নাকি বারেন্দ্র বামুনরা, মানে বাগচি-সান্যাল-ভাদুড়ি-লাহিড়ি, এরাই করেছে৷ কলম্বাস নাকি আমেরিকা আবিষ্কার করতেই পারত না, জাহাজে যদি জনার্দন সান্যাল না থাকতেন৷ আর রামতারণ ভাদুড়ি যদি পাবনার ভাষায় ‘আউগাও আউগাও, ন্যাপারে পাইড়া ফালাও’ বলে প্রেরণা না জোগাতেন, ওয়েলিংটন নেপোলিয়নকে হারাতে পারতেন না৷
আমি বলতাম, ‘এসব কথা তো বইয়ে লেখা নেই? সত্যি হলে লেখা থাকত৷’
তিনি বলতেন, ‘সায়েবরা হল ভারতবিদ্বেষী৷ সেই জন্যেই তারা এসব কথা চেপে গেছে৷’
তাঁর কাছেই জানতে পারি, এভারেস্টের চূড়ায় তিনি বার দশেক উঠেছেন৷ যোগ বলে৷ সায়েবরা ভারতীয়দের দেখতে পারে না বলে খবরটা চেপে যাচ্ছে৷ সে মনে কর ১৯৩৯ সালের কথা৷
একদিন ঝুপঝুপে বর্ষায় তিনি এসে হাজির হলেন৷ আমি ইতিহাস পড়ছিলাম৷ উনি বললেন, ‘শিবাজির কথা সবাই পড়তে পারে৷ শিবাজির ঘোড়ায় চেপেছি একা আমি৷’
‘তা কখনো হয়?’
তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তোদের দোষ হল, বিশ্বাস করতে মোটে জানিস না৷ বিশ্বাস করতে পারিস না বলে তোদের জীবনে ভালো কিছু ঘটে না৷’
বর্ষা এই সময়ে আরও ঘনিয়ে এল৷ দিনের বেলাই অন্ধকার৷ ভিজে ভিজে বাবা এক টাকায় সাত-আটটা ইলিশ মাছ নিয়ে এলেন৷ মা গেলেন খিচুড়ির তদারকিতে৷ আজ আপিস নেই, স্কুল নেই, বাবা এলেন না, তবে সেজোকাকা বসে গেল গল্প শুনতে৷ এখনও চোখ বুজলে সে বর্ষার সকাল দেখতে পাই আর মনে হয়, তেমন রাত ঘনিয়ে সকালে বর্ষা আর নামে না৷ নামলে শহরে বান ডাকে৷
এই গল্প-শুনিয়ে সেজোকাকাও কম বারেন্দ্র ছিল না৷ একদিন বলল, ‘ঢাকুরিয়ায় লেক খোঁড়া হয়েছে তো? সেখানে সন্ধ্যে বেলা এক ভদ্রলোককে ধরে ডাকাতরা মুখে গামছা ঠুসে দিল৷ তিনি হাত তুলে চেঁচিয়ে পুলিস ডাকলেন৷’
‘মুখ বাঁধা ছিল, চেঁচিয়ে ডাকলেন?
সেজোকাকা সুন্দর মুখ গম্ভীর রেখে বলল, ‘সেই তো কথা৷ ভদ্রলোকের বগলে আরেকটা মুখ ছিল৷’
যাক গে, অনবরত বাগচিও খেয়ে যাবেন৷ জমিয়ে গল্প বলতে বসলেন৷
তখন নাকি ওঁর বয়স বছর বারো৷ ছত্রপতি শিবাজির ওপর এক রচনা লেখার হুকুম হল৷ স্কুলে৷ লিখতেই হবে৷ ক্লাস সেভেন থেকে টেন পর্যন্ত একশো বিশ জন ছেলেকেই লিখতে হবে৷ নইলে স্কুলে ফুটবল খেলার মাঠ হবে না৷
ওঁদের ঝাকুড়দা গ্রাম ছিল পদ্মা-যমুনা পেরিয়ে৷ সেখানে কেউ কোনোদিন ফুটবল খেলার মাঠের কথাই ভাবেনি৷ কিন্তু স্কুলটা করেছেন ছত্রপতিবাবু৷ নাম ছত্রপতি৷ ছাতার ব্যবসাতেই তাঁর পয়সা৷ হাজার হাজার ছাতা বানাতে আর বিক্রি করতে ব্যস্ত থাকেন৷ এ ছাতা অন্যরাও বানায়, কিন্তু তিনি বানান সিগনাল ছাতা আর রেসকিউ ছাতা৷
সিগনাল ছাতার বাঁট বেজায় লম্বা৷ পুজোর সময়ে যখন সব পদ্মাপারের লোক ঢাকা মেলে চেপে গোয়ালন্দে আসে, তখন সিগনাল ছাতা শূন্যে ঘুরিয়ে ‘বলি ভারাঙ্গার সন্ধ্যা চৌধুরি শুনছেন? আমি অবনী’ অথবা ‘পাইকর হাটের বুমু পাকড়াশি, কাম টু ইস্টিমার’ বলে চ্যাঁচাতে হয়৷ পরস্পরকে জানান দিতে সিগনাল ছাতা৷
রেসকিউ বা ত্রাণকারী ছাতা আরও মহৎ উদ্দেশ্যে তৈরি৷ তার হাতলের মুখ বেজায় বাঁকানো৷ ফলে বন্যার সময়ে ওই ছাতার হুক গলায় বাধিয়ে মানুষকে উদ্ধার করা যায়৷ একবার ও ছাতার হুকে বাধিয়ে মেছো কুমিরও ধরা হয়েছিল৷ কিন্তু সেকথা এখন নয়৷
এই ছত্রপতিবাবু একবার ঝাকুড়দা এসে তিন মাস বসে রইলেন৷ তিনি জানতেন তিনি একমাত্র ছত্রপতি৷ এই সময়ে হঠাৎ কী করে যেন একটা বই পড়ে ফেললেন৷ ফেলেই তিনি থ! অ্যাঁ? আরেক ছত্রপতিও ছিল? সে বড়ো, না তিনি বড়ো? তার ক-টা ছাতা ছিল? তাঁর কারখানায় তো বিশ বছরে দশ লাখ ছাতা তৈরি হয়েছে৷ সে ক-টা ছাতা করেছিল? তাঁর ছাতা দিয়ে মানুষকে ডাকা যায়, জল থেকে তোলা যায়, দরকারে পেটানো যায়৷ এ নিশ্চয় আরও কোনো কৌশলী ছাতা তৈরি করেছিল৷ নইলে এর নাম কেতাবে লিখছে কেন?
ভীষণ চিন্তায় পড়লেন তিনি৷ তারপর ওই ঢালাও রচনা লেখার হুকুম দিলেন৷ যার রচনা সবচেয়ে ভালো হবে সে পাবে একটা সিগনাল, একটা রেসকিউ ছাতা৷ স্কুল পাবে একটি ফুটবল খেলার মাঠ৷ গোল পোস্ট থাকবে তাতে৷ তবে হ্যাঁ৷ ছত্রপতি শিবাজির ক-টা ছাতা ছিল, সে খবর লেখা চাই৷
অনবরত বাগচিদের বাড়িতে থাকতেন আর খেতেন ইতিহাস স্যার৷ স্কুলের মাস্টাররা গ্রামে এক-একজনের বাড়িতে থাকতেন৷ তাই ছিল নিয়ম৷ দৌড়ে ভালো না হলে মাস্টার নেওয়া হত না৷ বজ্জাত ছেলে হলেই দৌড়ে পালাত৷ মাস্টার দৌড়ে তাকে ধরে আনতেন৷ সব ক-জন মাস্টার দৌড়বাজ ছিলেন৷ পালিয়ে সুবিধে নেই দেখে ছেলেরাও পড়ায় মন দিচ্ছিল৷ এর মধ্যে এই গণ্ডগোল৷
অনবরত বাগচি বললেন, ‘সার! আপনি মোটে কুড়িখানা ইলিশ মাছ খেলেন বাইশটা কই মাছ৷ মা বললেন, আপনার কি শরীর ভালো নেই?’
‘আর শরীর! ছত্রপতি শিবাজির ক-টা ছাতা ছিল তা তোরা লিখতেও পারবি না, আমার চাকরিও চলে যাবে৷’
অনবরত বাগচির মনে বেজায় কষ্ট হল৷ তিনি বললেন, ‘স্যার! আপনি কোথায় যাবেন?’
মনোকষ্টে সার বলেন, ‘দ্যাশে যামু, চাষ করমু!’
অনবরত বাগচির মনে খুবই কষ্ট হল৷ ইতিহাস স্যার আরও বললেন, ‘ছত্রপতি শিবাজির কয়ডা ছাতা আছিল, তা কি আমিই জানি? কেউ জানে? শিবাজি যুদ্ধ কইরা বেড়াইত, ছাতা মাথায় দিবে কখন? ছাতার কারবার তার আছিল? কেউ জানে না৷’
যাহোক, হঠাৎ রহস্যময় ভাবে ইতিহাস স্যার হলেন উধাও, আর মনোকষ্টে অনবরত বাগচি ঠিক করলেন, তিনিও বাড়ি ছাড়বেন৷ বাড়ি ছাড়বেন, ছত্রপতি শিবাজির খবরাখবর সব বের করবেন৷ ম্যাপে দেখে নিয়েছেন পুনা শহর কোথায়৷ ঝাকুড়দা হল খালবিলের দেশ৷ সেখান থেকে পুনা যাওয়া কী সোজা? অনেক দিন লাগবে৷ অবশেষে একদিন সকালে তিনি গৃহত্যাগী হলেন৷ সঙ্গে একটি ঝোলা৷ তাতে অনেক নাড়ু, সন্দেশ, মোয়া৷ সকালে কাঁটাল বিচি, বেগুন সেদ্ধ ও গাওয়া ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছেন, গৃহত্যাগ করার পর এক ঘণ্টাও হয়নি, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে ঝাকুড়দার শেষ প্রান্তে রায় বাবুদের পোড়ো কাছারিবাড়ি দেখতেই বুঝলেন, তাঁর বেজায় খিদে পেয়েছে৷ সেদিকে যাবেন কি যাবেন না ভাবছেন, হঠাৎ কোত্থেকে একটা লোমওয়ালা সাপ তাঁকে জড়িয়ে টেনে নিয়ে সেখানে হাজির করল৷ হাজির করেই তাঁকে ছেড়ে দিল৷
তখন দেখেন, সেখানে বসে আছেন এক সন্নেসী৷ তাঁর মাথায় এক আধ-মাইল লম্বা জটা৷ দেখেই বুঝলেন, ইনিই হচ্ছেন সেই একজটা বাবা৷ ইনি তিব্বতে থাকেন, মাঝে মধ্যে আসেন৷
এঁর জটা হল স্বয়ং মহাদেবের দান৷ এই জটা যাকে ছোঁয়, সে সব পায়৷ এঁর বয়েস হাজার বছর৷
একজটা বাবা বললেন, ‘পালানো হচ্ছে?’
‘বাবা! একজটা বাবা!’
‘বলি, ঝোলায় কিছু আছে-টাছে? সিধে হিংলাজ থেকে আসছি, বড়ো খিদে পেয়েছে৷’
ঝোলায় যা যা ছিল সব খেয়েদেয়ে একজটা বাবা বললেন, ‘কেন পালাচ্ছিলি বল দেখি? তাড়াতাড়ি বলবি, আমার তাড়া আছে৷ কাল নেপালে পশুপতিনাথের পুজো৷ গঙ্গাসাগর থেকে গঙ্গাবাবা আর বেন্দাবন থেকে সিদ্ধি গোঁসাইকে নিয়ে যেতে হবে৷ গঙ্গাসাগরই যাচ্ছিলুম, হঠাৎ তোর জন্যে নেমেছি৷’
অনবরত বাগচি সব খুলে বললেন৷ একজটা বাবা বললেন, ‘ছত্রপতি শিবাজি? সেকথা আগে বলিসনি কেন?’
‘আপনি তাকে দেখেছেন?’
‘আরে, দেখিনি কাকে! আমি আর শঙ্করাচার্য ধর গে এক বয়েসি৷ তা বারোশো বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, চিনিনে কাকে! সে তো খুব ভালো ছেলে৷ দেবদ্বিজে ভক্তি আছে, আমাকে খুব খাতির করে৷’
‘সে কী? তিনি বেঁচে আছেন?’
‘তাতে তোর কী? দেখতে চাস, দেখিয়ে দেব৷ কথাবার্তা কইবি৷ কিন্তু ধরতে-ছুঁতে যাসনে৷ পান খাওয়াতে পারিস?’
‘পারি বাবা৷’
অনবরত বাগচি তখনি ছুটলেন৷ মালোপাড়ার মতিবুড়িকে বললেন, ‘পান সেজে দাও তো দুটো৷’
পান-দোক্তা গালে ঠুসে একজটা বাবা বললেন, ‘শিবাজির বাপু মেজাজ বেজায় কড়া৷ ওই তিরিক্ষে মেজাজ, আর ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধ, ওতে শরীর টেকে? যাক গে, যা বললাম মনে রাখিস৷ ধরতে-ছুঁতে যাসনে৷’
‘কেন বাবা?’
‘কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে৷ এই রাজারাজড়াগুলো ইদিকে পটল তুললে কী হয়, ওদিকে দেখগে, বেঁচে থাকতে যে যা করত, মরে গিয়ে সে তাই করছে৷ শিবাজি এখনও হয় যুদ্ধ করছে, নয় ফন্দি আঁটছে৷ নে, জোড়াসনে বোস৷ গঙ্গুবাবা আবার না রওনা দেয়৷’
‘তিনিও কী আপনার মতো?…’
‘সে তো বটেই৷ সিদ্ধ সাধক বলতে আমরা সাতাশি জন আছি তো! এই এখানে, ওই রামেশ্বর সেতুবন্ধ, নইলে কামিখ্যে৷ সিদ্ধি গোঁসাই তো চোখ বুজে শূন্য পথে চলে৷ পুব দিকে যাবে কামাখ্যায়৷ তা চোখ বুজে চলতে চলতে জাপান চলে গেছল৷ সে কী হাঙ্গামা৷ তোরা আকাশ দেখে টেরও পাবিনে, ওখানে নিরন্তর চলাফেরা হচ্ছে৷ নে, চোখ বোজ৷’
অনবরত বাগচি চোখ বুজলেন৷ বাবার জটা তাঁকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে ছুড়ল৷ ধপাত করে পড়লেন একজায়গায়৷ সবই দৈবী কৃপা৷ একটুও আঘাত লাগল না৷ দাঁড়িয়ে দেখেন সে এক বিদঘুটে জায়গা৷ চারিদিকে পাহাড় আর জঙ্গল৷ সেখানে ঘোড়ার পিঠে চেপে একজন লোক বর্শা বাগিয়ে আছেন৷
চেহারা দেখে আর বলে দিতে হয় না ইনি কে৷ সেই ধারালো নাক, জ্বলজ্বলে চোখ, হাত দুটো বেজায় লম্বা৷ পোশাক-টোশাক তেমন জাঁকজমকের নয়৷
শিবাজি ধমকে বললেন, ‘কে হে বাপু তুমি? একজটা বাবার হুকুম হল, তোমার সঙ্গে কথা কইতে হবে৷’
‘আজ্ঞে আমি বামুনের ছেলে৷’
‘তা কাল রায়গড়ে এলেই পারতে?’
‘কেন মহারাজ?’
‘কেন? জান না কাল আমার অভিষেক ছিল? সেখানে গেলেই গোরু, জমি, সোনাদানা পেতে পারতে৷’
অনবরত বাগচি বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন, ‘আমায় ঢুকতে দিত না কি? ভালো জামাকাপড়ই নেই৷’
‘চাও না কি? চাইলে বলে ফেলো৷’
‘না মহারাজ৷ আপনাকে দেখলাম, এই যথেষ্ট৷’
শিবাজি বেজায় নিশ্চিন্ত হলেন৷ বললেন, ‘আমার ঘোড়ার পেছন এসো বাপু৷ অচেনা লোক দেখে ঘোড়া রেগে যাচ্ছে৷ ব্যাটা বেজায় পাজি৷’
‘কোথায় মহারাজ?’
‘চলোই না৷ এই যে তুমি কিছু চাইলে না৷ তাতে আমি খুব খুশি হয়েছি৷ চাইলেই আমাকে আবার রায়গড় ফিরতে হত৷ আবার সেই হইচই, হট্টগোল৷’
‘খুব গণ্ডগোল গেছে, তাই না?’
‘বেজায়, বেজায়৷ এই এত এত লোক৷ এত পুজোপাট, এত মন্ত্রপাঠ, সে কী ভ্যানতাড়াই রে বাবা৷ মাথা ধরে গেছল একেবারে৷ কী চিৎকার আর বাজনাবাদ্যি৷’
‘আজ কী করছেন এখানে?’
‘আজ বাপু পালিয়ে এসেছি৷ ঘোড়া ছুটিয়ে একটা বড়োসড়ো মদ্দা হরিণ মেরেছি৷ এই পাহাড়ের বাসিন্দেরা আমার কত কালের বন্ধু৷ ঃও, কত কালের!’
‘তারা কী করছে?’
‘স্বপ্ন, স্বপ্ন, বুঝলে? এর কাছে রাজা হওয়ার আনন্দ তুচ্ছ৷ ওরা ঝরনার ধারে জঙ্গলের সুগন্ধি কাঠ জ্বেলে হরিণটা রান্না করেছে৷ জঙ্গলে ঘোড়া ছুটিয়ে আমি খিদে বাড়িয়ে এলাম৷ এবার ঝরনার জলে স্নান করব৷ মোটা মোটা বাজরার রুটি, হরিণের মাংস খাব৷ তারপর রায়গড় ফিরব৷’
‘আমি তাহলে ফিরি?’
‘কেন? মাংস আর রুটি খাও৷’
‘রাজাও তো হলেন, আরও যুদ্ধ করবেন?’
‘তা বাপু করব৷ যুদ্ধ না করতে পারলে আমি বাঁচব না৷ আর আওরংজেব যতদিন আছে-জান? ব্যাটা আমায় বলে পাহাড়ি ইঁদুর! শুনেছ এমন কথা?’
‘বইয়ে পড়েছি৷’
‘আমার কথা পড়েছ?’
‘নিশ্চয়৷’
‘তাতে ভালো লিখেছে, না মন্দ?’
‘সব ভালো ভালো কথা৷’
‘লিখতেই হবে, লিখতেই হবে৷ বুঝলে, শায়েস্তা খাঁ…’
‘আপনি তাকে শায়েস্তা করেন৷’
‘তাও জান? শাবাশ, শাবাশ! এই যে, এসে গেছি৷ কী রে, মাংস হল? তোরা বড়ো দেরি করছিস৷’
ঝরনার জলে শিবাজি কী ঝাঁপাঝাঁপিটা করলেন! তারপর পাতার বাসনে রুটি আর মাংস খেলেন তারিয়ে তারিয়ে৷ অনবরত বাগচিও খেলেন৷
এই সময়ে অনবরত বাগচির হঠাৎ কাজের কথা মনে পড়ল৷ বললেন, ‘মহারাজ, একটা কথা!’
‘তাড়াতাড়ি বলো৷ সন্ধ্যার ভেরি বাজছে রায়গড়ে৷ আমাকে ফিরতে হবে৷ যুদ্ধবিগ্রহের ব্যাপার আছে, পরামর্শ করতে হবে৷’
‘আমাদের স্কুল…’
‘স্কুল কী?’
‘ইতিহাসের মাস্টার…’
‘ইতিহাস কী? মাস্টারই বা কী?’
‘একটা রচনা লেখার কথা-‘
‘রচনা? লেখা? সে আবার কী? এত এত যুদ্ধ করলাম, আওরাংজেবকে ঘোল খাওয়ালাম, কই এসব কথা তো কখনো শুনিনি? একজটা বাবা কি একটা পাগলা ধরে পাঠিয়েছে না কি?’
একজন পাহাড়ি চেঁচিয়ে বলল, ‘ছত্রপতি! বিজাপুরের সঙ্গে তোমার শত্রুতা৷ এ নিশ্চয় বিজাপুরের গোয়েন্দা৷’
‘ছোটোছেলে তো?’
‘বিজাপুরে সবাই ভানুমতী জানে৷ জাদুমন্তরে একটা বড়োসড়ো মানুষকে ছোটোছেলে বানিয়ে পাঠিয়েছে৷’
‘অ্যাঁ? গোয়েন্দা?’
শিবাজি লাফ মেরে ঘোড়ায় উঠে বসলেন৷ আর অনবরত বাগচি একজটা বাবার নিষেধ ভুলে ঘোড়ার ল্যাজ ধরে উঠে বসে শিবাজির পেট-কোমর খিমচে ধরলেন৷ বললেন, ‘ছত্রপতি নাম কেন৷ আপনার ছাতা ক-টা?’
‘ওরে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, পেট-কোমরে সুড়সুড়ি লাগছে৷ খিক-খিক-খিক-ছেড়ে দে-‘
‘ছাতা ক-টা?’
‘একটা৷ মোটে একটা৷ ছেড়ে দে৷ হি-হি-হি-‘
‘সত্যি বলছেন?’
‘হ্যাঁ রে বাপু৷ তার নীচে অভিষেক হয়েছিল, ছেড়ে দে বলছি৷ সুড়সুড়ি আমি সইতে পারি না৷’
ছেড়ে দেবেন কী? শিবাজির ঘোড়া তখন শূন্যে উঠেছে, শূন্য দিয়ে ছুটছে৷ শিবাজি চ্যাঁচাচ্ছেন, ‘ওই চলে গেল গোরখবাবা, ওই যাচ্ছে সিদ্ধি গোঁসাই, ছেড়ে দে, সবাই দেখে ফেলল৷ কী বিচ্ছু ছেলে রে বাবা বাংলা মুলুকের! এই জন্যে আমি জব্দ করার পর আওরংজেব শায়েস্তা খাঁকে শাস্তি দিতে বাংলায় পাঠিয়েছিল…৷’
বাকুড়দা এসে গেল৷ অনবরত বাগচি ধপ করে মাটিতে পড়লেন৷ সেই রামুদের পোড়ো কাছারিতে৷
অনবরত বাগচি বললেন, ‘আমার রচনাটাই ভালো হয়েছিল৷ দুটো ছাতা পেলাম, স্কুলে সাত দিন ছুটি হল, স্কুলে খেলার মাঠ হল৷ আর ইতিহাস স্যারও ফিরে এলেন৷’
‘ফিরে এলেন?’
‘ফিরবেন না কেন? তিনি তো নিজের গ্রামে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন৷’
‘এ গল্প আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?’
‘বিশ্বাস করিস না বলেই তোদের জীবনে ভালো কিছু ঘটে না৷ নইলে তোরাও তো-‘
‘শিবাজির কাছে কিছু চাইলেন না কেন?’
‘বারেন্দ্র হয়ে তার কাছে চাইব? সে নিজে দিতে পারত না? শিবাজির গুরু রামদাস কে? রামদাস লাহিড়ি নয়? সে বলত না, শিবু, ভুইল না, তোমারে দ্যাশের নাম রাখতে অইব?-সেকথা জেনেও আমি চাইব? ছিঃ৷’
সেদিন উনি তিরিশটা ভাজা ইলিশ খেয়েছিলেন৷
