গল্প
উপন্যাস
জীবনী

আরমানি চাঁপার গাছ – মহাশ্বেতা দেবী

আরমানি চাঁপার গাছ

ছিয়াত্তর সালে, মানে এগারোশো ছিয়াত্তর বঙ্গাব্দে এই বাংলাদেশে কী ভীষণ মন্বন্তর হয়েছিল তা তোমরা সবাই জান৷ এখন আকাল হলে যেমনটি হয়, কী আশ্চর্য, ঠিক তেমনটি হয়েছিল৷ ঠিক এমনি করেই মানুষ সেই দু-শো বছর আগেও ধান, চাল, মুগ, কলাই, গাছের পাতা, শেকড় যা পেয়েছিল সব খেয়েছিল৷ ঠিক এমনি করেই মানুষ ঘটি-বাটি গোরু-বাছুর সব বেচে দিয়েছিল৷

তারপর তারা শহরের দিকে রওনা দিয়েছিল৷ তখনও এদিকে শহর বলতে মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, হুগলি এইসব৷ কলকাতায় সবাই এসে উপস্থিত হয়নি, কেননা সে কলকাতা তো আজকের কলকাতা নয়৷ কলকাতা তখন দিব্যি জাঁকজমকের শহর বটে, তবু সে শহর এট্টুখানি জায়গায়৷ এখনকার বড়ো পোস্টাপিসের কাছে সাহেবদের কেল্লাটা৷ এসপ্লানেডে সাহেবদের জুড়িগাড়ি ঘোরে৷ শ্যামবাজার, বাগবাজার কোনো কোনো জায়গায়, বিশেষ করে খিদিরপুরের দিকে দিশি মানুষের বেশ ঘন বসতি৷

আবার অনেক জায়গাতেই জঙ্গল, বিল, বাদা, হোগলা বন৷ কালীঘাটে চুপেচাপে নরবলিও হয়৷ ওদিকে আবার লাটসাহেব, কানে কলমআঁটা মুনশির কাছে বাংলা শেখেন৷

এই সর্বনেশে মন্বন্তরের কথা তোমরা সবাই জান৷ কিন্তু মাতোর কথা জান না, আর বহরমপুরের আরমানি গির্জেতে সেই চাঁপা ফুলের গাছটার কথা জান না৷ এই এতটুকু-টুকু চাঁপা ফুল৷ পাতার মধ্যে একেবারে লুকিয়ে ফোটে৷ কিন্তু মাঝে মাঝে ভীষণ গরম, বাজারে গণ্ডগোলে, তরকারি মাছের গন্ধের ভেতরেও আশ্চর্য সুগন্ধ ভেসে আসে৷

আরমানি চাঁপার গন্ধ৷ আরমানি গির্জের বাগানের এক কোনে গাছটা রেলিং দিয়ে ঘেরা৷

জোছনা রাতে, শীতকালে যখন ভাগীরথীর দিক থেকে রাশিরাশি কাশ ফুল রঙের কুয়াশা ভেসে আসে, চারদিক নিশুতি হয়ে যায়, তখন নাকি চাঁপা গাছটাকে অচেনা অচেনা দেখায়৷

কখনো একটি ছোটোছেলের মতো, ছেলেটি হাত জোড় করে বসে আছে৷ কখনো সাদা জামাপরা একজন পাদরির মতো, তিনি হাত বাড়িয়ে আছেন৷

রোদ উঠলেই সব ফর্সা৷ যেমন গাছ তেমনি৷ যেমন গির্জে তেমনি৷ এসব কথা তোমরা কোথাও পড়োনি৷ সবকথা বইয়ে লেখা থাকে না৷ বুনোপাড়ার মাতো, ওর ছাগল অর্জুন, আর গির্জের বুড়ো পাদরিসায়েবের কথা কোনো কেতাবে লেখা নেই৷

লেখা না থাকলেও সব সত্যি৷ আমাকে একজন বুড়ো পণ্ডিত জিজ্ঞেস করেছিলেন-কে বললে সত্যি?

এই পণ্ডিতমশায় যেসব কথা, হয় কেতাবে, নয় পাথরের গায়ে, নয় তালপাতার পুঁথিতে লেখা নেই তা একেবারে বিশ্বাস করেন না৷ ওঁর বাড়ির বইয়ের পোকাগুলো অব্দি বেজায় পণ্ডিত আর বেড়াল-কুকুরেরা তো বিদ্যেদিগগজ৷

আমার মনে হয় নিশ্চয় সত্যি৷ মাতোকে আমি নাহয় চোখে দেখিনি৷ কিন্তু এমন ভাবুনে ছেলে কি কোথাও নেই যে, বিষ্টি দেখে মন খারাপ করে? মেঘলা দিনের বিকেলে ঘুম ভেঙে উঠে এটা সকাল না বিকেল বুঝতে না পেরে চটে যায়? অথবা হাড়হাবাতে একটা ছাগলছানাকে অসম্ভব ভালোবাসে? তাহলে মাতোই বা থাকবে না কেন? যদি বল ছাগলের নাম ‘অর্জুন’ হবে কেন, তাহলে তো তোমাদের আবার সেই কথাটা বলতে হয়, বাবার দক্ষপিসি কেন তাঁর দাঁড়কাকের নাম ‘ভরত’ রেখেছিলেন আর পিসেমশায়ের বেড়ালকে বলতেন ‘জ্ঞানবাবু’৷

তা, ছিয়াত্তর সালে, সর্বনেশে আকালই হয়েছিল বটে৷ মানুষ পোকামাকড়ের মতোই মরেছিল৷ কেষ্টনগর, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান আর হুগলির দিকে যারা রওনা হয়েছিল, তারা সবাই না-পেরেছিল শহরে পৌঁছোতে আর না-পেরেছিল গাঁয়ে ফিরতে৷ শরীরে শক্তিই ছিল না যে রাস্তা ধরে হাঁটে৷ পথে পড়ে তারাও মরে গিয়েছিল৷

সেই সময়ে জেমোকান্দীর জানকী সিং নাকি তার ধানের গোলা খুলে মানুষজনকে ধান মেপে মেপে দিয়েছিল৷ সবাই বলেছিল, জানকী সিং নাকি ভারি দয়ালু৷

শুধু একটি করে টিপছাপ নিয়েছিল কাগজে৷ ভুসো কাগজে ভুসোকালির ছাপ৷ হেসে হেসে বলেছিল ‘টিপছাপ না থাকলে হিসেব থাকবে কেন?’

বুনোপাড়ার মাতোর মা বলেছিল ‘হিসেব কী? দান করলে কেউ হিসেব রাখে?’

জানকী হেসে বলেছিল ‘তা নয় গো মাতোর মা! এ হল গিয়ে কোন ধানটা খরচ হচ্ছে, কোন ধানটা রইল, তার হিসেব৷ তোমরাই তো আমার একমাত্র নও গো! অন্য গাঁয়ে যারা আছে তাদেরও তো দিতে হবে৷’

‘তা তো হবেই৷’

সবাই খুশি হয়ে জানকীকে জয়ধ্বনি দিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল৷ ফিরে বছরে আউশ ধান পেকে উঠতে-না-উঠতেই ও মা, পেয়াদারা ইয়া গালপাট্টা, ইয়া পাগড়ি হাঁকিয়ে এসে হইচই বাঁধিয়ে দিলে৷

সবাই বললে ‘কী ব্যাপার গো পেয়াদাদাদা? পুজো-টুজো করবে তাই বুনোপাড়া হতে শাকসবজি নিতে চাও?’

পেয়াদারা সেকথা শুনে বললে, ‘মোটেই না৷ আমরা ঢেঁটরা দেব৷’

‘কীসের ঢেঁটরা গো?’

‘দুর্ভিক্ষের সময়ে জানকীনাথ সিং যত যত ধান কর্জ দিয়েছিল তার দাম দাও৷ দাম দিতে না পার তো ধান দাও৷ ধানও অব্দি যদি না দিতে পার, তাহলে তোমার খেত-পুকুর ধানজমি যা আছে সব দাও৷’

এরা যেমন-তেমন নয়, জুতোপরা পেয়াদা৷ কাদাই থেকে বহরমপুর জুতো মসমসিয়ে জানকীনাথ সিং-এর পেয়াদা বেজায় হাঁটতে শুরু করে দিল৷ জানকীর চুলগুলো পাকা, চোখে একটা চশমা, বয়স বছর পঞ্চাশেক হবে৷ মুখে সদাই বলে ‘আমি গরিবের মা-বাপ হে!’

এখন সেই জানকী সিংজির আসল চেহারা দেখে সবাই তটস্থ হতে লাগল৷

মাতোর দাদা ছিবিলাস বুনোপাড়ার বজ্জাত ছেলে৷ সে বললে ‘জানকীরে পাঠিয়ে দেন মশায়রা, তিনিকে দুটো ভালোমন্দ শুনিয়ে দেই৷’

পেয়াদারা বললে ‘বটে!’

মাতোর মা বললে ‘মহাজনের পেয়াদার সঙ্গে চেটাং চেটাং কথা বলতে নজ্জা নাগে না?’

‘বেশি ভেনভেন করিস না মা ঘুমোতে দে৷’

‘রাতভর বজ্জাতি, আর দিনভর ঘুম!’

ছিবিলাস রাতভর ডাকাতি করে৷ শুধু ছিবিলাস কেন, বুনো বাগদি, কেওট কৈবর্ত, ওরা অ্যাদ্দিন নবাবের ফৌজে লেঠেল হয়ে লাঠি চালিয়েছে, বর্শেল হয়ে বর্শা ছুড়েছে৷ সড়কিদার, তিরন্দাজ সব কাজ ওরাই করেছে৷ এদের দিয়ে ফৌজ করে নবাব কখনো বর্গিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন কখনো আফগানদের সঙ্গে৷

নবাব মানে নবাব আলিবর্দি৷ তা, তিনি মরে যাবার পর থেকে কোম্পানি সরকার ক্রমেই এদের ফৌজ থেকে বের করে দিয়েছে৷ যুদ্ধ লড়াই ছাড়া এরা তো অন্য কিছু শেখেনি তাই শেষ অব্দি কী-করি কী-করি ভাবতে ভাবতে মন্বন্তরের পর একে একে ডাকাতিতে লেগে গেল৷ সবাই কি আর চিতেবাঘের মতো বা ভবনাথ কালীর মতো বড়ো ডাকাত হতে পারল? মানুষের মধ্যে যেমন, ডাকাতদের মধ্যেও তেমন বড়ো-মেজো-ছোটো থাকে৷ কেউ সোনাদানা লুটে আনে, কেউ-বা চাল-ডাল কাপড়-গামছা৷

মাতোর দাদা ছিবিলাস তাদেরই একজন৷ মাতোর মা সব কথাই জানে৷ কিন্তু বাড়িতে দশটা মানুষ, জমি বলতে ছ-বিঘে, ডাকাতি না করলে চলেই বা কেমন করে?

ছিবিলাসদের উঠোনে লাউমাচার ওপর একটা কাগতাড়ুয়া আছে৷ ছিবিলাস যেদিন ডাকাতি করে কিছু পেয়ে যায়, ধরো ধামাভরা চাল, কুমড়ো অথবা কাপড়-গামছা, সেদিন সেগুলো দাওয়ায় নামিয়ে রেখে কাগতাড়ুয়াটাকে মাথা নীচে ঠ্যাং ওপরে করে রেখে চলে যায়৷

কাগতাড়ুয়াটা মাতোর তৈরি৷ পরনে ভুসো কোর্তা কামিজ৷ মুখে এত বড়ো বড়ো গোঁপ, মাথায় টুপি৷ মাতোর মা যেদিন জানালা দিয়ে চেয়ে দেখতে পায় কাগতাড়ুয়ার ঠ্যাং দু-খানা ওপর পানে তোলা রয়েছে, সেদিন বুঝতে পারে ছিবিলাস এসেছিল৷ দাওয়ায় বেরিয়ে চাল-ডালের ধামা নিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে যেতে বলে ‘পেন্নাম হই মা ডাকাতে কালী৷’

ছিবিলাস যে ডাকাতি করে তাতে মাতোর মা-র দুঃখ নেই৷ তবে কিনা, এখন কলকাতায় লাট ডাকাতদের পেলেই ধরে ধরে সাজা দেয়৷ ডাকাতদের যারা ধরিয়ে দেয় তাদের টাকাকড়ি দেয়, এইসব কারণে ওর ছিবিলাসের জন্যে ভয় ভয় করে৷

তাই, জানকীর পেয়াদাকে ছিবিলাস যখন গনগনে কতকগুলো কথা শুনিয়ে দিলে, তখন মাতোর মা রেগে গেল৷

বলল ‘য্যাতোদিন আকাল ছিল ত্যাতোদিন ডাকাতি করেছিস, বেশ করেছিস৷ অ্যাখন মনিষ্যের মতো কাজকর্মে করতে কী হয়?’

‘কী কাজ? মা তুই বড়ো ভেনভেন করিস৷’

‘চাষবাস, মাছধরা, ঝুড়ি চেটাই বোনা৷’

‘উ কাজে আর ভাত নেই মা৷’

‘তোকে বলেছে!’

‘এখন মহাদুর্দিন৷’

‘কেন?’

জন্ম থেকেই মাতোর মা শুনে আসছে এখন মহাদুর্দিন৷ তাই এসব কথায় ও আর ভয় পায় না৷

‘শিবতলায় এক সর্ব্বেনেশে কাপালিক এসেছে জানিস? সে বলেছে সুমুখ সনে মহাপ্লাবন হবে৷’

‘হাই গ! ই কী কথা?’

‘মহাপ্লাবন হবে৷ বড়ো গাঙ (পদ্মা), ভাগীরথী এমনকী খোড়ে নদীর জলেও সুমুদ্দুরে বান ডাকবে৷’

‘হাই গ! ইর উপায় কী?’

‘উনি আজ বলবে৷ তুই একবার যা৷ যাবার কালে এট্টা কুমড়ো নে যাস৷ উনি বলে সবায়ের নাকি মহাপাপ হয়ে বসে আছে৷ আমার দিকে এমন করে চাইলে যে আমি তো ভয়ে কেঁপে মরি৷’

ছিবিলাস গোয়ালঘরের মাচায় ঘুমোতে গেল৷ গোয়ালঘরের মাচায় ওর ঘুমটা ভালো হয়৷ নিত্যি ঘুঁটের ধোঁয়া দেওয়া হয়, গোয়ালে মশার কামড়টা কম৷

‘ছিবিলেস! তুই গোল্লায় গিছিস৷’

বলে মাতোর মা মোচাচিংড়ি কুটতে গেল৷ মোচাচিংড়ির মাথা মোটা, গা সরু৷ ধান খেতে যে জল হয় তাতেই মোচাচিংড়ি জন্মায়৷ কচু, কুমড়ো, বর্ষার মুলো আর লঙ্কা দিয়ে মোচাচিংড়ি মজে ভালো৷ তা ছাড়া ধর, জঙ্গলে জংলা ডুমুর, বন ধুঁধুল, নোনা, চালতে, ঢেঁকিশাক হয়৷

মাতোর মা বলে, ‘ই জঙ্গলটি আমাদের নক্ষী৷ এতখানি আকাল যে গেল, তা জঙ্গলটি আমাদের বেঁচিয়ে রেখেছিল গ!’

সব কুটে বেছে, পুকুরের জলে ধুয়ে বউকে রাঁধতে দিয়ে মাতোর মা হাঁস দেখতে গেল৷ জঙ্গলের ধারে ঘর হলে হাঁস দেখতে ঘন ঘন যেতে হয়৷ শেয়াল আছে, ভাম আছে, খাটাশ, বনবেড়াল কী নেই জঙ্গলে? গন্ধে গন্ধে সবাই হাঁস ধরতে আসে৷ অথচ, এই হাঁস থেকে মাতোর মা অনেক রোজগার করে, বানঝন্টিয়া বা ব্যারাকের সাহেবরা হাঁসও কেনে, ডিমও কেনে৷ হাঁস কেন, তিতির-হরিয়াল-ঘুঘু-ডাহুক সবরকম পাখির মাংসই ওরা খায়৷

মাতোর মা-র রং কুচকুচে কালো৷ লম্বা নয় কিন্তু এই চওড়া আঁটো শরীর৷ রুক্ষ চুল চুড়ো তুলে বাঁধা, ও সড়কি চালাতে পারে, গুলতি ছুড়ে এখনও পাখি মারে৷ এই পঞ্চাশ বছর বয়সেও ভূতের মতো খাটতে পারে৷ এ বাড়ির ছেলে-মেয়ে-বউ-বাচ্চা সবাই রাতদিন হয় পলো মাদুর চেটাই বোনে, নয় শাকসবজির বাগান করে, নয় মাছ ধরে, নয় বিল সেঁচে ঝিনুক তুলে চুনুরিপাড়ায় বেচে আসে৷ ঝিনুক পুড়িয়ে চুন হয় আমার কখনো কখনো ঝিনুক থেকে মুক্তোও বেরোয়৷

মাতোর মাকে সবাই বলে ‘মেয়ে বাঘ’৷ ও ছাড়া বুনোপাড়ার গতি নেই৷ পালাপার্বণে বামুন, কায়েত ও বদ্যির বাড়িতে এই বুনোদের ডাক পড়ে৷

শয়ে শয়ে মানুষ খায়৷ এই বুনোরা গিয়ে তখন জঙ্গলকাটবে, আটচালা তুলবে, রান্নার কাঠ আর কলাপাতা জোগাবে৷ বাঁক-ভরতি শাক-বেগুন-মুলো-কুমড়ো-লাউ-লঙ্কা নিয়ে যাবে৷ গোরুর গাড়িতে অতিথিরা আসবে, ভগবানগোলা থেকে চাল-ডাল আসবে, সে গোরুর ঘাসজল বুনোরাই জোগাবে৷ এছাড়াও কাজ থাকে৷ ধর, কেউ মায়ের নামে বা বাবার নামে বা গুরুর নামে রাস্তা কাটাবেন, কুয়ো খোঁয়াবেন, গঙ্গায় ঘাট বাঁধিয়ে দেবেন৷ এই কাজও বুনোদের৷

মাতোর মা হচ্ছে সর্দারনি৷ ও গিয়ে সব কথাবার্তা বলেকয়ে আসে৷ তারপর পাড়ায় এসে খবর দেয় ‘ই-বারে মজুরি দু-আনা তবে নিত্যি খাওয়া আছে৷ বিদায় পাবে মাথাপিছু, চাল-ডাল-কুমড়ো নারকেলের সিধে আর এট্টা গামছা৷’

‘কাপড় দেবে না?’

‘না৷ ই-বার উনাদের আদায় ভালো হয়নি তাই কাপড় দেবে না৷’

এই মাতোর মা৷ অমাবস্যের অন্ধকার জঙ্গলে ঘুরে আসবে৷ বয়সকালে চিতাবাঘ গোয়ালে এলে তো নিজেই তাড়াত৷ শুধু সাধু সন্ন্যাসীতে ওর ভীষণ ভয়৷ এই যে কোলের ছেলে মাতোটা অমনিষ্যি হয়ে রইল, কে জানে তা কোন সন্ন্যাসীর শাপে৷ মাতো শিকার দেখলে ভয় পায়৷ রক্ত দেখলে ওর গা কাঁপে৷ পুজোর বলি পর্যন্ত চোখ মেলে দেখে না এমন ছেলে৷

বুনোঘরের ছেলেরা যা যা করে, চেটাই মাদুর বোনা, ঘাস নিড়োনো, কোনো কর্মে ও পটু নয়৷ আরও কী সর্ব্বনেশে কথা, ও মাটি দিয়ে পুতুল গড়ে৷ তুই কী পোটোর ছেলে না কুমোরের? ও মাতো, তুই পুতুল গড়িস কেন? তোকে কী ঠাকুরের পুতুল গড়তে আছে যে দুগ্গা ঠাকুর, লক্ষ্মী ঠাকুর গড়লি? পাখি আর বেড়াল, কুকুর, বাছুর, কাঠবেড়ালির পুতুল যদি গড়িস তবে যেমনটি হয় তেমনটি কেন গড়িস না? সবুজ শালিক পাখি আর হলুদ বেড়ালের কথা কে কবে শুনেছে? মাতোর মা-র কান্না পায়৷

বুনোপাড়ায় দেখো গে ওর মতো বুনো কেউ নেই৷ বনেবাদাড়ে ঘুরবে, নয়তো গাছের নীচে বসে থাকবে৷ খেতে দিলে খাবে, নয়তো চেয়ে খাবে না৷ সর্বদা সঙ্গে কালোয় বাদামিতে ছোপ দেওয়া একটা ছাগলছানা৷ নাম অর্জুন৷ অর্জুন গাছের নীচে ও জন্মেছিল তাই ওর নাম অর্জুন৷ ওর চেয়ে দুষ্টু ছাগল এ তল্লাটে আছে কি না সন্দেহ৷ কিন্তু মাতোকে বামুন গিন্নি সে কথা বলতে যেতেই মাতো বললে ‘তোমার ছেলেরা মুড়ি লঙ্কা দিয়ে চারটে শসা খায়৷ আমার অর্জুন একটা খেলে দোষ?’

মাতোকে কে কী বলবে বল৷ ও হয়তো বলে বসবে ‘সত্যপীরের দোষ লাগবে তখন দেখো৷ আমার অর্জুনকে একটা শস্য দিতে পারছ না, ছেলেরা নষ্ট চাঁদের রাতে তোমার বাগান ঝেঁটিয়ে দিয়ে যাবে৷’

মাতো সত্যপীরের দোরধরা ছেলে৷ এ গ্রামের লোকেরা ষষ্ঠী ঠাকুর, সত্যপীর, পঞ্চানন্দ বাবা, শেতলা, মনসা সবাইকে ভয় পায়৷

মাতোর মাথার চুল কাঁধ অব্দি লুটোনো, লতানো৷ সত্যপীরের কাছে পাঁচসের বাতাসা আর পাঁচসের দুধ দিয়ে পুজো দিয়ে ওর দশ বছর হলে ওই চুল কাটা হবে৷

মাতোর মা হাঁস খুঁজতে গিয়ে দেখলে মাতো অর্জুনের গলা জড়িয়ে চুপ করে বসে আছে৷ ঠিক করলে সন্ধ্যে বেলা সন্ন্যেসীকে জিজ্ঞেস করবে ছেলেটার শুভবুদ্ধি কেমন করে হয়৷ জঙ্গলের মধ্যে ঢেঁকিশাল খুঁজতে গিয়ে মাতোর মা আবার সেই একচোখ কানা রাজসাপটা দেখতে পেল৷ দেখে ওর বুক ভয়ে কেঁপে গেল৷ কী অলক্ষুণ গো! এই সাপটিকে নড়তে-চড়তে দেখলেই মাতোর মা-র সংসারে একটা না একটা বিপদ হয়৷ এবার কী হবে কে জানে৷ ছিবিলেস বলে সাপটাকে মেরে ফেললেই হয়৷ মাতোর মা বলে ওরে বাবা! মা মনসা যে! এখন হাতজোড় করে মাতোর মা মনে মনে বললে ‘মা মনসা! মাতোটাকে একটু থিরবুদ্ধি দাও মা৷’

তারপর গলা তুলে ডাকতে লাগল ‘চই চই! আয় আয়! চই চই!’

কিন্তু সন্ধ্যে বেলা সেই সর্বনেশে খবর শোনা গেল৷ একেবারে ঢাকিরা ঢাক বাজিয়ে সে-খবর গাঁয়ের চারদিকে জানিয়ে দিলে৷

কী খবর?

মাতোর মা ছিল, গ্রামের পাঁচজন গণ্যিমান্যি মানুষ ছিল, জানকীনাথ স্বয়ং ছিল, লোকে লোকারণ্য৷ তরকারির ধামা, ঘিয়ের মটকি, কলার ছড়া একেবারে স্তূপ হয়ে উঠেছে৷ সবাই জোড়হাত, সবাই কাপালিকের দিকে চেয়ে বসে আছে৷ কাপালিক মড়ার মাথা হাতে বসে বসে কী ভাবছে তো ভাবছেই৷ পিঠটা একদিকে বাঁকানো৷

‘উনির পিঠে আজ অর্জুন এক শিঙের গুঁতো মেরেছে জানলি পিসি?’ বুনোপাড়ার উদ্ধব বললে৷

‘চুপ কর!’ কে ধমক দিলে৷

‘উনির সেবার জন্য মত্তমান কলা ছিল, অর্জুন য্যামন…’

‘চুপ যা ছোঁড়া!’

উদ্ধব চুপ করে গেল৷ দুপুর বেলা দিব্যি জমেছিল৷ কাপালিক অর্জুনকে মারতে যেতে মাতো কাপালিককে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছিল৷ কিন্তু সেসব কথা একন বলে লাভ কী?

‘মহাপাপ!’

হোমের আগুনে খানিকটা ঘি ঢেলে দিয়ে হঠাৎ কাপালিক চেঁচিয়ে উঠলে৷ কী গম্ভীর গলা! বট গাছ থেকে প্যাঁচার ছানাগুলোর অব্দি কিচমিচ করে উঠলে!

‘কী পাপ ঠাকুর!’ জানকীনাথ প্রায় কেঁদে ফেললে ‘পাপ কাটবে কী করে বলে দাও গো!’

‘মহাপাপী তোদের মধ্যে আছে৷ তোরা সবাই মহাপাপী৷ যদি ফাঁড়া কাটাতে চাস তাহলে অমাবস্যা থেকে তিন দিন তিন রাত্তির ধরে এখানে যজ্ঞ হোক৷ তারপর আমি বলি দিয়ে পুজো করব৷’

‘ঠাকুর, ক-টা পাঁঠা, ক-টা মোষ চাই আজ্ঞা করুন৷’

‘একটা৷ কালোতে খয়েরিতে-চিত্তির বিচিত্তির একটা পাঁঠা, এই এতটুকুনি৷ এই প্রাণীটি তোদের গাঁয়ে পাপ নিয়ে এসেছে৷ ওর জন্যেই গঙ্গায় বান আসবে৷’

কাপালিকা ‘হা-হা-হা-হা’ করে হাসতে লাগল৷

সেদিনই, সেই রাতেই এদিক-ওদিক দশখানা গাঁয়ের মানুষ জেনে গেল বুনোদের মাতোর ছাগলছানা অর্জুনকে বলি দিয়ে স্বস্ত্যয়নের যজ্ঞ হবে৷ মা কালী নাকি কাপালিকের স্বপ্নের মধ্যে দেখা দিয়ে নিজে বলেছেন৷

‘এই আকাল গেল, এতগুলো মানুষ মরল৷ আবার বন্যে আসছে, এবার তোদের নিকেশ করতে৷’

তারপর কাপালিক নাকি না খেয়ে না ঘুমিয়ে তিন দিন মন্দিরের সামনে জোড়হাতে পড়েছিল৷ এ গাঁয়ের মানুষদের সর্বনাশ হলে সে যায় কোথায়?

‘এরা আমার ভক্ত মা গো, এদের ফেলে আমি কোথায় যাই?’

তখন সদয় হয়ে মা স্বপ্ন দিলেন৷ সে কী সুন্দর স্বপ্ন, কী সুন্দর ভোর-ভোর ঘুমের মধ্যে চারদিক পদ্মগন্ধে ভরে গেল৷ আর কী আলো, যেন অনেক সূর্য একই সঙ্গে উঠেছে৷ কাপালিক যে ঠিক ঘুমিয়ে ছিল তাও তো নয়৷ কেননা অনেকদূরে কানা জগাই গান গাইছিল, শোনা যাচ্ছিল স্পষ্ট৷

‘ভোর সময় হলে কোকিল বুলয়ে ডালে

অঙ্গনে খঞ্জন দুলয়ে৷৷’

সেই সময়ে যখন ছোটোমেয়েরা কচুপাতা হাতে পুজোর ফুল তুলতে বেরোয়, তখন চারদিকে পদ্মগন্ধে ‘ম ম’ করে মা কালী এলেন৷ কাপালিককে বললেন, ‘আমার পুজো কর, একশো আটখানা রুপোর জবাফুল দিস, আর একটা ভালোমতো বলি দিস৷’

কাপালিক বললে, ‘আমার নিজের মাথা বলি দেব মা গো!’

মা কালী বললেন, ‘না রে! একটা বাদামিতে কালোতে চিত্তির করা…’

এখন মাতোর মা স্পষ্ট বুঝতে পারলে মাতোর ছাগলছানাটা অলক্ষুণে৷ সেইজন্যে ওই অলক্ষুণে ছাগলছানাটার সঙ্গে থেকে থেকে মাতোর ওইরকম বুদ্ধিসুদ্ধি৷

ওদিকে ঢেঁড়া পড়তে লাগল আর জানকীনাথ মাতোর মাকে বললে ‘শুনলে তো বুনো বউ? ওই অলক্ষুণে পাঁঠা ঘরে রেখেছ সেইজন্যেই তোমার বুদ্ধিও বেয়াড়া৷ এই ধরো ধান-চালটা ফেরত দিতে চাও না৷ আমাদের পুজোয়-আর্চায় দরকার হলে কাজকর্ম করতে এত এত পয়সা চাও৷ সেবার তো এক কলসি তেল চেয়ে বসেছিলে৷’

মাতোর মা বিরক্ত হয়ে বললে, ‘আপোনার ওপর বুনোবাগদি মাত্তোরে সবাই খেপে গনগন কত্তেছেন৷ একা আমার কাছে ভেনভেন করলে হবে? কাপালিক বাবার সুমুখেই বলতেছি আপোনি যি কবে থেকে বলতেছ মায়ের মন্দিরের চুড়োটি পেতলের করে দেবে, মায়ের হাতে সোনার বাউটি দেবে, কিছু দিয়েছিলে? আপোনার পাপ হবে না? না মহাজন সাজলে তার পাপের ভয় নাই?’

জানকীনাথ চোখ পাকালে৷

মাতোর মা বললে ‘আকালে ধান-চাল দিয়ে এখন ভিটেমাটি ছাড়া কত্তে চাও, ইজন্যি তো ছেলেরা বলে জানকী সিংগি তো ই দেশের লোক নয়৷ উ শেঠদের গোলাম হয়ে এইছিল৷ গিন্নিদের বকশিশের ট্যাকা দিয়ে জমিজমা করেছে তাই এমন ছোটো মন৷’

সবাই হাসতে লাগল৷ জানকী হয়তো মনে মনে চটল কিন্তু এখানে আর কী বলবে? কার কাছে বলবে? মাতোর মা এই গাঁয়ের মেয়ে, এই গাঁয়ের বউ৷ বুনোবাগদিরা লঙ্কা-কাঁকড়া, পোড়া শোলমাছ এইসব খরো খরো জিনিস খায়৷ চেটাং চেটাং কথা বলে৷ জানকী সিংজি তো দুধে-ঘিএ মানুষ৷ ও একবার ইদিকে চাইলে আরেকবার উদিকে৷ তারপর বললে ‘আহা, এরা কী সরল তাই বল ঠাকুর, কোনো লুকোছাপা শেখেনি৷’

মনে মনে ঠিক করলে, সময় মতো ছিবিলেস যে ডাকাত সে-খবরটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে৷ ডাকাতের মা-র এতবড়ো আস্পর্ধা যে তাকে অপমান করে?

মাতোর মা বাড়ির দিকে রওনা হল৷ বুনোপাড়ায় সবাই সন্ধ্যে নাগাদ খেয়েদেয়ে নেয়৷ পিদিম জ্বালিয়ে তেল পোড়াবে এত তেল কার ঘরে থাকে বল? মাতোর মা-র মনটাও ভালো নেই৷ ছেলে দিবারাত্তির একটা অলক্ষুণে পশুর সঙ্গে ঘুরছে সেটা কী ভালো লাগে?

মাতো তো প্রথমটা বিশ্বাসই করতে চায় না৷ শোনো কথা, এইটুকু একটা ছাগলছানা, ওর জন্যে গ্রামে বন্যে আসবে? তা কখনো হয়?

মা বললে “হয় রে হয়৷ আচার্যিদের বাড়ি অমনি একটা অলক্ষুণে গাই ছিল৷ য্যাদ্দিন তিনি বেঁচে ছিল ত্যাদ্দিন ওনাদের সংসার থেকে অমঙ্গল যায়নি৷ উটি মরে যেতে তবে সব ভালো হল৷ একটা পাঁঠা গেলে তুই দশটা পাঁঠা পাবি৷’

ছিবিলাস ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ ওর মতো অন্যরাও ভয় পেয়েছিল৷ এই জঙ্গলঢাকা গ্রাম৷ আকালের সময়ে দু-দিকে মানুষ বেড়াল-কুকুরের মতো মরেছে৷ মরণ দেখে দেখে মানুষেণ মনে আর দয়ামায়া আসে না৷ তার ওপর অভিশাপের ভয়, অমঙ্গলের ভয়৷

‘তোর অনেক ভাগ্যি যে তোকে বলি দিতে বলেনি৷’ ছিবিলাস রুক্ষগলায় ধমকালে৷ সকলের বুক কেঁপে উঠল৷ ছিবিলাস তো জানে, সবাই জানে তেমন দরকার হলে মানুষ বলি দিয়েও দেবতাকে পুজো দিতে হয়৷

মাতোর মা বললে ‘চল, খাবি চল৷’

ছিবিলাস বললে ‘আজ রাতে দরকার নেই৷ কাল সকালে ওই পাঁঠা নিয়ে গিয়ে ঠাকুরের সামনে বেঁধে রেখে আসবি মা৷’

মাতোর মুখ দেখে ওর মা-র বুক ফেটে যাচ্ছিল৷ ও শুকনো গলায় বললে ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নে বাপু৷ আমার মোটে মন ভালো নেই৷’

‘মা মাতো দুস্কু করে খাচ্ছে৷’ মাতোর দিদি বাতাসী বললে৷

‘মাতো, দুস্কু করিস না বাপ, আমি তোরে দশটা পাঁঠা এনে দেব৷’

‘কে বললে দুস্কু করতেছি? তুমি এট্টু ভাত দাও না আমায়৷’

মাতো হেসে বললে৷ মাতো ছাড়া বুনোপাড়ায় কোনো ছেলেটা মা-কে ‘তুমি’ বলে না৷

খাওয়াদাওয়া মিটে গেলে যে-যার মতো শুতে গেল৷ গোয়ালের এককোনায় আলাদা খোঁয়াড় ঘেরা জায়গায় অর্জুনকে রাখা হয়৷ মাতোর মা পিদিম হাতে দেখলে গেল হাঁস-গোরু-ছাগল সব ঠিকমতো আছে কি না৷ জঙ্গলের গোড়ায় বাড়ি হলে এই এক জ্বালা৷

ছিবিলাস মুখে কালিঝুলি মেঘে ঠ্যাঙা নিয়ে বেরুল৷ আজ পলাশিতে যাবার ইচ্ছে করেছে ওদের সর্দার৷ ভগবান মণ্ডল লোকটার ধানগোলায় ডাকাতি করবে৷ বেরুবার আগে ছিবিলাস মনে মনে ডাকাতে কালীকে পেন্নাম করলে৷ ডাকাতে কালীকে নমস্কার না করে ডাকাতিতে বেরুনো ঠিক নয়৷

তারপর আস্তে আস্তে সব চুপচাপ হয়ে গেল৷ সবাই ঘুমে ঢুলে পড়ল৷ মাতোদের নিম গাছের কোটর থেকে বেরিয়ে লক্ষ্মীপ্যাঁচাটা সাঁ করে উড়ে গেল কোথায়৷ আর জঙ্গলের ওদিকে হুটোপাটি শুনে বোঝা গেল খাটাশটা বোধ হয় খরগোশ ধরেছে৷

সবাই ঘুমোলে পরে মাতো বিছানা ছেড়ে উঠল৷ হাতে একখানা বড়োসড়ো গামছা৷ আস্তে দোরের শিকল খুলল, বাইরে বেরুল৷ শেকলটা আবার তুলে দিল৷ তারপর গিয়ে গোয়ালের আগল খুলল৷ অর্জুন গুটিসুটি খড়ের গাদায় ঘুমোচ্ছিল৷ ওকে দিব্যি করে গামছায় বেঁধে নিয়ে মাতো আর কথাবার্তা নেই, নির্ভয়ে জঙ্গলে পা দিল৷

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সুঁড়িপথ আছে৷ এইসব পথ ধরে উদ্ধবের পিসি আরও দু-একটা বুড়ি শুকনো কাঠকুটো কুড়োতে আসে৷ এখানেই ঘুরতে ঘুরতে, বনচালতা খুঁজতে খুঁজতে মাতোর দিদি বাতাসী একটা ছোটোছেলের মাথার এতটুকু রুপোর পুঁটে পেয়ে গিয়েছিল৷ পুঁটেটা ভেঙে মা ওর কানের লবঙ্গ ফুল গড়িয়ে দেয়৷

অর্জুন ওর কোলের মধ্যে গুটিসুটি আরামের পুঁটুলি হয়ে আছে৷ বোধ হয় ভাবছে মাতোর এ একটা নতুন খেলা৷ মাতোর বুকের ভেতরটা ব্যথা ব্যথা করছে৷ কবরেজ বলেছে ওটা জন্মদোষ৷ বেশি ছুটোছুটি, হাঁপাহাঁপি, লাফালাফি করলে নাকি মাতোকে বৃন্দাবন দেখতে হবে৷

সেকথা ভেবে মাতো করে কী? অর্জুনকে কেটে পুজো হবে৷ কেন হবে? অর্জুনকে মাতো পলতে করে দুধ খাইয়ে এত বড়োটা করেছে সেকথা কি মা জানে না? মা অব্দি ওদের দলে, ওই দুষ্টু সন্নেসীর দলে৷ আর মা-কালীরও বলিহারি যাই৷ স্বপ্ন দিয়ে অর্জুনের কথা বলবার কী দরকার ছিল?

মাতো জানে মাতোকে কোথায় যেতে হবে৷ এখান থেকে চার মাইল দূরে বহরমপুর শহর৷ সেখানে আরমানি গির্জে আছে৷ আরমানি গির্জের বাগানে একেবারে এতটুকু-টুকু চাঁপা ফুল ফোটে আর চাঁপা ফুলের লোভে লোভে মাতো সেখানে কতবার গিয়েছে তার ঠিক ঠিকানা নেই৷ গির্জের পাদরিকে মাতো চেনে, কতবার দূর থেকে দেখেছে৷ ওখানে একবার ঢুকে গেলে আর কোনো ভয় নেই৷

মাতো ওখানেই পালিয়ে যাবে, আর এখন যদি বেশি ছুটোছুটি করতে না পারে তাহলে মতিরায়ের মঠে লুকিয়ে থাকবে৷ উত্তরদিকে নবাবি সড়কের পাশে মতিরায়ের মঠবাড়ি৷ ওখানে মানুষজন যায় না৷ মতিরায় মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ের লোক৷ কোথাকার নাকি জমিদার ছিলেন৷ এখানে এসে মারা গিয়েছিলেন৷

ওঁর চিতার ওপর মঠ দেওয়া হয়েছিল৷ এই এত উঁচু মন্দিরের মতো মঠ৷ চুড়োগুলোকে নাকি ‘রত্ন’ বলে৷ পাঁচটা চুড়ো দেওয়া পঞ্চরত্ন মঠের চারদিকে এখন জঙ্গল৷ ওখানে মঠের পাশের বাঁশবাগানে ভূতের ভয়, তাই ওখানে বিশেষ কেউ যায় না৷

মাতো যখন অর্জুনকে নিয়ে মতিরায়ের মঠে পৌঁছে গেল তখন পুব আকাশে দুধের ছেঁড়া সরের মতো কুচি কুচি আলো দেখা যাচ্ছে৷ এখন ভাদ্দর মাস৷ চারদিকে নালা-ডোবা-খাল-বিল জলে টুবটুব করছে৷ মাতো নিজে খানিকটা জল খেল, অর্জুনকে খাওয়াল৷ তারপর মঠের মধ্যে ঢুকতে পথ খুঁজতে লাগল৷ কী জঙ্গল, কী জঙ্গল, তাতে মা মনসার ভয়৷ এই বৃষ্টিতে শুকনো জায়গায় খোঁজে কে কোথায় এসে বসে আছে কে জানে৷ কিন্তু মাতোর এখন সেসব কথা মনে নেই৷শুকনোমতো একটা চাতালে অর্জুনকে বুকের কাছে সাপটে ধরে মাতো শুয়ে পড়ল৷ অর্জুন মাতোর মুখ চেটে চেটে দেখল খেতে কেমন, তারপর গামছার বাঁধন আঁটসাঁট দেখে বুঝতে পারল এখন আর খেলাধুলো হবে না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই দু-জনে অঘোরে ঘুমোতে লাগল৷

কতক্ষণ যে ওরা ঘুমিয়েছে তা মাতো জানে না৷ যখন ঘুম ভাঙল তখন বেলা দিব্যি রোদ চনমনে৷ ওর ঘুম ভাঙল ঢোল পেটাবার শব্দে আর চেঁচিয়ে কী যেন বলবার শব্দে৷ শোনবার সঙ্গেসঙ্গে মাতো অর্জুনের কথা ভুলে-টুলে একেবারে বাইরের দিকে দৌড়৷ ঢোল শোহরতের শব্দে কোনো ছোটো ছেলে স্থির থাকতে পারে বল? হয়তো কোথাও যাত্রা হবে, নইলে ‘লখীন্দর ভাসান’ গান৷

নির্জন মাঠে কতদূরের শব্দ ভেসে আসে তা তোমরাও জান৷ বাঁশবাগানের কাছাকাছি গিয়ে মাতো দেখতে পেল একটা লোক ঢোল পেটাচ্ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা দিয়ে পিলপিল করে কয়েকটা লোক যাচ্ছে৷ যেন পুতুলদের মিছিল যাচ্ছে৷

ভাদ্দর মাস৷ বাতাস এখন বন্ধ৷ নতুন চালের ভাতের ফ্যান যেমন জমে থাকে তেমনি করে চারপাশ থমকে আছে৷ লোকটা কী বলে চ্যাঁচাচ্ছে তা মাতো স্পষ্ট শুনতে পেল৷

‘এট্টা ছেলে তার নাম মাতো৷ গেরামের বলির মানত করা পাঁঠা নিয়ে পেলিয়ে গেলছে, ই কথা বোলে সাবোধান করে দিই মাশায়রা৷ পাঁঠাটি সামান্য লয়৷ বড়োগঙ্গার বড়ো বন্যে মানাতে উটিতে পুজো দিতে হবে, লয়তো ই তল্লাটে গাঁ-গেরাম থাকবে না৷ সব জলে জলাক্কার হবে, আর মা বড়োগঙ্গা মকরের পিঠে বোসে সকলকে হাঁ করে খাবে৷ যি উ ছেলাটিকে ধরে দিবে, জানকী সিংজি তারে এট্টা সোনার মোহর দিবে কবুল যেয়েছে৷’

পেছন থেকে আরেকটা শব্দ শুনে মাতো চমকে উঠল৷ এই লম্বাচওড়া একটা লোক, বগলে একটা লাঠি, মাথায় গামছা বাঁধা৷

সে আবার বললে ‘হোঃ আরে ব্বাপু, যদি ছেলাটাকে ধরা করাতে চাও, তবে তার লামটি বলো, ধামটি বলো, তবে না দেখি! আমার লাম বাবা জটা সর্দার৷’

‘আপনি কীসের সর্দার গো?’ মাতো আর জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারল না৷ হয়তো ডাকাতের সর্দারই হবে, আর ডাকাতের সর্দারি করা যে মন্দ কাজ তা তো মাতো জানে না৷ ‘আপনি’ শুনে জটা সর্দার বেজায় খুশি৷ না, ছেলেটা কথা কইতে জানে বটে৷

‘আমি আতা সর্দারের চেলা বটি গো! সাঁপ ধরে বেড়াই৷ এই দেখো না, আজ ইখান থিকে এট্টা কালী গোখরা ধরে নিয়ে যাব৷’

‘আপনি সাপ খেলাও?

‘না গো!’ জটা সর্দার হেসেই খুন ‘আমরা সাঁপ ধরি, ধরে কবরেজদের কাছে বেচে দিই৷ উনাদের কাছে উনাদের সাপবেদে থাকে, তারা মাসে মাসে বিষ কামিয়ে কবরেজদের দেয়৷’

‘কেন?’

‘ওষুধ হয় যি!’ নাঃ, ছেলাটা ভালো বটে, তবে কিছু জানে না৷

‘আপনি যাবে কোথা?’

‘উ-ই যি আমার ঝোলাঝালি৷ সাঁপটো দুপুর লাগাত ধরব, তা বাদে সাঁ করে চলে যাব লতুন ডোমপাড়া৷ উ গাঁয়ে আমার এক বু থাকে৷ বু বুঝ? আমরা দিদিকে বু বলি৷’

‘বু বুঝি৷’ বলতে গিয়ে মাতোর কান্না পেল৷ এখন চনমনে দুপুর৷ না জানি কত মানুষ ওর আর অর্জুনের খোঁজে বেরিয়েছে৷ কেমন করে মাতো আরমানি গির্জেয় যাবে?

‘তুমি ছেলাটা কুন গাঁয়ের গো?’

‘ই গাঁয়ের৷’

‘কী, পাখির ছানা ধরতে চাও, লয় মাছ ধরতে এসেছিল? এখন ই-স্থানে থেকনি বাপ, আমি সাঁপটি ধরে চলে যাই৷’

‘আপনি ধরুন কেনে৷’

জটা সর্দার তামাক খাওয়া মুখ হাঁ করে খুব খানিকটা হাসল৷ তারপর বলল ‘ই কপালে টাকা লাই, কড়ি লাই বুঝলে ছেলা? লয় তো ছেলাটাকে আর পাঁঠাটাকে ধরা করাতাম, এট্টা মোহর পেতাম৷ এত এত সাঁপ ধরি, তা এট্টা ছেলারে ধরতে পারতাম না?’

‘আজ্ঞা!’ মাতো শুকনো গলায় বললে৷

জটা সর্দার আস্তে আস্তে, লাঠি হাতে গর্ত দেখতে লাগল৷ মাতো আবার আস্তে আস্তে মঠের মধ্যে ঢুকে গেল৷ লোকটা চলে যাক, তারপর অন্ধকার হলে মাতো আবার রওনা হবে৷ আজ মঙ্গলবার৷ এদিকে আবার হাট বসে৷ হাটের মানুষরা অব্দি জেনে যাবে তো!

‘ছেলাটা গেল কোথা?’ জটা সর্দার অবাক হয়ে বললে. তারপর সাপ খুঁজতে লাগল৷

জটা সর্দার কতক্ষণ ধরে খুঁজে খুঁজে সাপ ধরল তা মাতো জানে না৷ খিদেয়, তেষ্টায়, অর্জুনকে বুকে নিয়ে সারাটি দিন ওর কেটে গেল৷ সন্ধ্যে যখন ঘোর ঘোর হয় তখন ও জটা সর্দারের গলার গান শুনতে পেল :

‘হো আমার মনে বড়ো দুক্কু গো!

হো আমার কানাই ব্রজে এসতে চায় না

হো আমার বুক কান্নায় ফাটে গো

তবু চক্ষে জল এসে না৷’

গান গাইতে গাইতে জটা সর্দার চলে যেতে লাগল৷ কোথায় যেন ওদের গ্রাম? নতুন ডোমপাড়া? ওখানে ওর ‘বু’ থাকে৷ জটা সর্দার এখন গিয়ে নাইবে, ভাত খাবে৷ ওর ‘বু’ নিশ্চয়ই ভাত রেঁধেছে৷ মাতোর মনে হতে লাগল কতদিন ও ভাত খায়নি, রাঁধা ভাতের গন্ধ পায়নি৷ একবার মাতোর জ্বর হয়েছিল, তখন মাতোর মা ডোবা থেকে মাগুরমাছ ধরে এনে ঝোল রেঁধে দিয়েছিল৷ দুটো ভাত খেতে-না-খেতেই মাতোর যেন পেট ভরে গিয়েছিল৷ ভাত নিয়ে গিয়ে মাতো পুকুরে ঢেলে দিয়েছিল৷

এখন মাতোর শুধু বুকের ভেতরটা ব্যথা ব্যথা করছে৷ অনেকদিন অব্দি মাতো হাঁটতে পায়নি, খেলতে পায়নি৷ কবরেজ বলেছিল ‘ওটা জন্মদোষ বাগদিবউ৷ ওটা ওর সারলে হয়৷’

মাতোর মা চোখ বুজে বলেছিল, ‘সি আমার মন জানছে বাপ৷ উ ছেলা আমার ঘরে রইতে এসেনি৷’

কবরেজ বলেছিল ‘ওর রিদযন্ত্রটা, (মাতো পরে পণ্ডিতমশায়ের জামাইয়ের কাছে শুনেছে রিদযন্ত্র মানুষের বুকের মধ্যিখানে থাকে) বুঝলে কিনা… বেশি ছুটোছুটি করলে পরে বৃন্দাবন দেখতে হবে৷’

মাতোর মনে হল শরীর যেন থেকে থেকে ঢিলে হয়ে যাচ্ছে৷ এখন মাতো কী করে, কোথায় যায়? ভাদ্দরমাসের দিন৷ মাঠের গর্তগুলো জলে ভরে উঠলে মা-মনসার ছেলে-মেয়ের দল বেড়িয়ে আসে জানা কথা৷ তা ছাড়া এখন তাঁদের ব্যাং ধরবার সময়ও হয়েছে৷ মাতো দেখতে পেল আকাশের রং ধোঁয়াটে লাল৷ ক্রমেই অন্ধকার হচ্ছে৷

বাইরে এসে মাতো অর্জুনকে জল খাওয়ালে দুটো ঘাসও দিলে৷ তারপর ওকে গামছায় আঁটসাঁট করে বেঁধে মাতো রওনা হল৷

নতুন ডোমপাড়া, রায়চঙ্গ, ময়রা-ফুলবাড়ি, তিন-চারখানা গাঁয়ের চাষিহাট সব ভেঙেছে৷ মেলা নয়, কোনো পালাপার্বণ নেই, তাই ছেলেপিলের গোলমাল, বাঁশি-ভেঁপুর প্যাঁ-প্যাঁ, বৈরেগীর গান শোনা যাচ্ছে না৷

এই হাটে, এই সময়ে দরজা-জানালার কাঠের পাল্লা, গোরুর গাড়ির চাকা, আমকাঠের পিঁড়ে পাটা বিক্রি হয়৷ তা ছাড়া হাঁড়ি ভরতি করে মাছের পোনা-ডিম বিক্রি হয়৷ এ এক মজার কারবার৷ বড়ো গাঙ অর্থাৎ পদ্মায় মাছের ডিম ভাসে৷ তাই তুলে এনে জেলেরা হাটে হাটে বেচে যায়৷ এই সময়ে পুকুরে-ডোবায় টাপুর-টুপুর জল৷ বৃষ্টি পড়লে মনে হয় সাদা সাদা মল্লিকা ফুল পড়ছে, আর ফেটে যাচ্ছে ধুলো ধুলো হয়ে৷ এই সময়ে মাছের ডিম ছাড়, পোনা ছাড়৷ তারপর সারাটি বছর মজা করে মাছ খাও৷ মাতো জানে, সারাবছর ধরে যারা মাছ খায়, তারা বড়ো জাল ফেলে জল নাড়ায় না৷ রোজ খ্যাপলা জাল ফেলে আর রোজ খাওয়ার মতো দুটো চারটে মাছ ধরে৷

মাতোর মা মাছ ধরে, এই বড়ো বড়ো খলসে-ট্যাংরা৷ সেবার মাতো ওর মা-র সঙ্গে বামুনবাড়িতে প্রসাদ পেতে গিয়েছিল৷ কইমাছ যে অমন তেলে ডুবিয়ে রান্না হয় তা মাতো জানত না৷ মাতো অর্জুনকে বুকে সাপটে ধরে বড়ো রাস্তায় উঠল৷

বড়ো রাস্তা মানে কাঁচারাস্তা৷ তবে এদিকে একটা ওদিকে একটা গোরুর গাড়ি যেতে পারে৷ একখানা গাড়ি বহরমপুরের দিকেই যাচ্ছে৷ মাতো দেখলে গাড়িতে কতকগুলো শণের দড়ি আর খুঁটি৷ একপাশে একটি ছেলে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে৷ বেলা পড়ে এসেছে চারিদিকে আজানের শব্দ, মন্দিরের ঘণ্টা৷

‘কাকা গো, আমারে এটু নে যাবে?’ মাতো সাহস করে বলে ফেললে৷

‘কুনঠি যাবা বাপ?’ মানুষটার কথা যেন ভালো৷

‘হো…ই বিষ্ণুপুরের দিকে৷’

‘কালীথানে যাবা?’

‘হ্যাঁ কাকা৷’

‘ওটা কী?’

‘পাঁঠা, মানত করা পাঁঠা৷’

‘কালীথানে দেবে৷’ লোকটি আস্তে বললে৷ তারপর বললে ‘লাও, উঠে পড়! য্যাতটা যেতে চাও যাবা৷ মানত কেন? অসুখ করেছে?’

‘হ্যাঁ গো!’ মাতো অর্জুনকে বেশ করে সাপটে চেপে নিল৷ একটা ভালো এই, অর্জুনের মাথা আর কান দুই-ই কালো৷

‘কালো পাঁঠা কুলক্ষণ৷’ বলে নিশ্বাস ফেলে লোকটি চুপ করে রইল৷ তারপর বললে ‘আমিও দেখ না বাপ, সয়দাবাদ যেলছি৷ উ-ই ছেলাটার পিলারোগ জন্মে গেছে, বুঝি কে নজর দেলে, নাকি অপদেবতা ধরলে৷ সয়দাবাদে নে’ উরে রামনাপিতের জলপড়া খাওয়াব বলে স্থির করেছি, তা ওর মাসির বাড়ি দু-দিন থাকব৷ তানাদের গোলঘরটা (গোয়ালঘর) পড়ে যেলছেন কিনা তাই চাট্টি শণ নে’ যাচ্ছি, আর কাঁঠাল গাছের খুঁটো৷’

ছেলেটা রীতিমতো নিঝুম হয়ে নেতিয়ে আছে৷

‘আর কী বলব বলো বাপ, ওদিকে শুনতে পাচ্ছি এক অলক্ষুণে পাঁঠা নাকি বন্যে ডেকে এনতেছেন৷ ও কী, অমন নাম কাট (লাফ দেওয়া) কেন? গাড়ি উলটে তিনভঙ্গ হবেন না?’

‘কীসে যেন কামড়ালে৷’

‘দাঁড়াও, এই নাককাটির গাছের কাছে গাড়িটা এট্টু রাখি৷ আমার এক দাদা আছে, সে মস্ত জোয়ান৷ তারে এট্টু খবর দে যাই, ছেলাটা আর পাঁঠাটাকে ধরা করালে মোহর পাবে বলে শুনিতেছি৷ উনির নাম রাবণ মালাকার৷ উনির নামে সবাই ভয় খায়৷ উ কী, নাপ কেটে নামতেছ কেন?’

‘এই একটু…’

ব্যস৷ আর কোনো কথা শোনবার জন্যে মাতো দেরি করলে না৷ অর্জুনকে বুকে সাপটে বিষম ছুট লাগালে৷

‘ও খোকাডা, উ যে নাককাটির গাছ…’ লোকটি দু-একবার চেঁচিয়ে বললে, তারপর অবাক হয়ে ভাবলে ছেলেটা ছুটল কেন? খ্যাপা পাগল নয়তো?

সেই কথা সে ঘণ্টা ছয়েক বাদে রাবণ মালাকারকেও বললে৷ ‘ছেলেটা কেন ছুটল বলো তো? ভূত মানলে না, পেতনির ভয় পেলে না, ছুটে গেলটা

কোথা?’

রাবণ মালাকার তামাক টানতে টানতে ভাবছিল, কেমন করে গাঁয়ের ভুবন তেলীর ধানগোলা থেকে কিছু ধান সরানো যায়৷ ভায়ের কথা শুনে ও প্রথমটা হুঁ-হাঁ করে সেরে দিয়েছিল৷ তারপর বিরক্ত হয়ে বলেছিল ‘তোরা পাড়াগেঁয়ে লোকরা বড়ো বকবক করিস বাবু৷ আমার এখন দু-টি বেলা সৈদাবাদ আর খাগড়া হেঁটে হেঁটে বুজলি, শউরে কথা শুনে শুনে, তোদের কথা মোটে ভালো লাগে না৷ আমি বলে এখন নিজের জ্বালায় মরতেছি…’

রাবণ মালাকার লোকটা জমিজমা থাকলেও চাষবাস করতে ভালোবাসে না৷ এর বাগানের কলা, ওর পুকুরের মাছ, তার ধানগোলার ধান চুরি করেই কাটিয়ে দেয়৷ আশপাশে সবাই জানে রাবণ চোর৷ তা ছাড়া ও খানিকটা খ্যাপা মোষের মতো, রাগলে পরে রক্ষে নেই৷

তবু ওকে সবাই সয়ে যায়৷ তার একটা কারণ হচ্ছে রাবণ যাত্রাতেও রাবণ সাজে আর-

ওহে পবনলন্দন হলুমান

তোর ন্যাজে দিয়ে টান

এখনি করিব শাস্তিদান, বুঝলে কিনা এ-এ-এ

বলে বেদম চেঁচিয়ে গান গাইতে পারে৷ আরেকটা কারণ হচ্ছে রাবণকে চটানো বুদ্ধির কাজ নয়৷ যদি তোমার কলাবাগান, কুমড়োখেত আর ধানের গোলা থাকে৷

তা ছাড়া ওকে দিয়ে একটা উপকার পাওয়া যায়৷ মানুষ মরলে পাড়াগাঁয়ে পোড়াবার লোক মেলে না৷ বিশেষ করে বর্ষার রাতে বা শীতকালে৷ রাবণ কিন্তু ওই সময়ে মানুষের খুব উপকার করে৷ কাঠ কাটবে, মড়া বইবে, শ্মশানে যাবে৷ ওর কেউ হোক-না-হোক ও বুক ফাটিয়ে কাঁদবে৷

‘ও দামোদর কাকা গো! তুমি মরলে কেন গো! কে আমাকে কোমরে লাঠি মেরে বলবে চল চল, মাঠে চল, কে আর সকাল-সন্ধ্যে পরের গোয়াল থেকে গোরুর খড় চুরি করবে গো!’

রাবণকে মানুষ তাই খাতির করেই চলে৷ তবে ওর বুদ্ধি সহজে খেলতে চায় না, আর ওর মগজে কোনো কথা সত্যিই ঢোকাতে হলে অনেকবার ধরে কথাটা বলতে হয়৷ রাবণের ভাই তাই বলেই চলল৷

‘কেন ছেলাডা পাঁঠাটা জাপটে ধরে নাপ কেটে পালালে বলো তো? আমি তো য্যাত ভাবতেছি, ত্যাত আশ্চয্য যেতেছি গো দাদা৷ নাককাটির গাছের দিকে ছুটল যি…ছেলাডার চুল এই শূন্যপানে ঝুঁটিবাঁধা, বুজলে দাদা?’

শুনতে শুনতে অনেকক্ষণ বাদে রাবণের মাথায় বুদ্ধি খেলল৷

‘কী বললি?’ তামাক খেতে খেতে রাবণ তো লাফিয়ে উঠেছে৷

‘এ ছেলাডা, বুজলে দাদা?’

‘বুজলে দাদা? ওরে গাধা, ওরে বোকাপাঁঠা৷ ছেলাটা তার ছাগল লিয়ে তোর হাতে এসে পড়েছিল, তা তুই বুজলি না রে? এট্টা মোহর ফাঁক গেল৷ তা ছাড়া বন্যে হয়ে দেশ ভাসবে, তোরও মহাপাপ হবে না?’

রাবণ গলা তুলে একেবারে চ্যাঁচাতে শুরু করলে ‘ওরে মশাল জ্বালা, চ, ছুট্টে চ! সেই ছেলাডা বুঝি নাককাটির গাছের পানে পেলিয়েছে৷ ওরে চ রে চ! সবাই জানে মহাপাপে দেশ ভরে যেয়েছে৷ মা কালী বলেছে, উ পাঁঠার রক্ত খাব৷ না যদি দিতে পারিস, তা-লে তো ব্যাটাদের কাঁচা কাঁচা খাব৷

মশাল এল, গাঁয়ের ছেলেবুড়ো সবাই এল৷ সবাই রে-রে-রে-রে করে ছুটে চলল৷

মাতো তখন কী করছে?

এই ধর, আঁধার রাত, তারার আলো ছাড়া আলো নেই৷ ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে সে আলোও পষ্ট দেখা যায় না৷

নাককাটির গাছের কাছে নাককাটির খাল৷ কবে যেন এখানে একটা মন্দির ছিল৷ সেখানকার ঠাকুর নাকি জ্যান্ত ছিল৷ সে কি এখন নাকি? সেই আদ্যিকালে৷ একটা চোর নাকি প্রতিমার নাকের নথ ছিঁড়ে নিয়েছিল৷ সঙ্গেসঙ্গে পাথরের প্রতিমার নাক থেকে সে কী ঝরঝরিয়ে রক্ত পড়েছিল৷ ও মা, যে জমিদারের ঠাকুর, সেই জমিদার স্বপ্নে দেখেছিল-ঝমঝম করে মল বাজিয়ে এত সুন্দর একটা ছোটো বউ ছুটে পালাচ্ছে৷

‘কে রে,’ বলে যেমন তার আঁচল চেপে ধরা, অমনি বোঝা গেল উনি মানুষ নয় ঠাকুর৷ কেমন করে বোঝা গেল তা জিজ্ঞেস কোরো না৷ যারা ঠাকুর দেবতার স্বপ্ন দেখে তারা সব টের পায়৷

‘তুমি যাচ্ছ কেন?’ সেই আদ্যিকালের স্বপ্নে আদ্যিকালের জমিদার জিজ্ঞেস করেছিলেন৷

‘থাকব কেন? ওরে আমার তুমি রে! আমার নাক ছিঁড়ে দেবে, তেপান্তরের মাঠের মধ্যে আমায় রেখে দেবে, আমি থাকব কেন?’

জমিদার অমনি গ্রামের মধ্যে মন্দির করে ঠাকুরকে ঢাকবাদ্যি বাজিয়ে তুলে এনেছিলেন৷ শুধু যে গাছের নীচে মন্দির ছিল, তার নাম রয়ে গেল নাককাটির গাছ৷ আর যে খালটায় রাখাল ছেলেরা মোষকে চান করায়, পাঁকাল মাছ ধরে, তার নাম রয়ে গেল নাককাটির খাল৷

মাতো সেই খালের ধারে বসে হাঁফাচ্ছিল৷ ভেতর থেকে যেন সব নিভে আসছে, হাত-পা ঘামছে৷ যেন দেওয়ালির পিদিম সব নিভিয়ে দিচ্ছে কে, মন্দিরের ঘণ্টা যেন থেমে আসছে কোথাও৷

যখন গ্রামের দিক থেকে কোলাহল করে মশালগুলো নাচতে নাচতে ছুটে আসছে, তখন মাতো বুঝতে পারল সব৷

বুঝতে পেরে অর্জুনকে গামছার সঙ্গে পিঠে বেঁধে নিয়ে মাতো জলে ঝাঁপ দিলে৷

কী ঠান্ডা জল৷ জলে কত তারার ছায়া ফুটে রয়েছে৷ মাতো যে সাঁতার কাটে এমন শক্তি তার হাত পায়ে নেই৷ তবুও আস্তে আস্তে ভেসে চলল৷

খালের ওপারে বহরমপুরের রাস্তা, আর সেখানেই আছে সেই গির্জে, যেখানে মাতো পালিয়ে যেতে চায়৷ গির্জেতে আছে সেই আরমানি চাঁপার গাছ৷ সেখানে সেই আশ্চর্য চাঁপা ফুল ফোটে, আর সেখানে গেলে নরম ঘাসে পা ডুবে যায়৷

‘ঠাকুর গো!’ মাতো অসহায় সুরে যেন কাকে ডাকল৷ তারপর আস্তে আস্তে ভেসে চলল৷

মাতো যখন নাককাটির খাল দিয়ে ভেসে চলেছে, তখন রাবণ মালাকার আর তার গাঁয়ের লোকেরা কি হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেল? মোটেই না৷ তারা ওই খালের ধারে দাঁড়িয়ে জটলা করতে লাগল৷

একজন বললে, ‘ছেলাটাকে নিশ্চয় তেনারা ধরেছেন গো! নইলে এমন হঠাৎ কোথা উধাও হল তাই বল দি নি?’

তেনারা মানে যাদের নাম রাতে করতে নেই৷ কে না জানে নাককাটির খালের পাড়ে যে তেঁতুলগাছটা থাকে সেখানে মেছোপেতনি আর আলেয়াভূতের বাস৷ মেছোপেতনিরা বেজায় ফর্সা কাপড় পরে আর পা উলটোবাগে ঘুরিয়ে হাতে পলো নিয়ে মাছ ধরে বেড়ায়৷ মানুষজন দেখলেই হঠাৎ পেল্লায় একটা বেড়াল হয়ে গিয়ে ভুস করে মিলিয়ে যায়৷

আর আলেয়াভূতেরা মুখে আগুন নিয়ে ছুটে ছুটে মেঠো চাষা, হাঁটুরে মানুষ আর কোম্পানির ডাকপেয়াদাদের ভুলিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে আসে জলের কিনারে৷ তারপর জলে ডুবিয়ে মেরে রেখে চলে যায়৷ পাড়াগাঁয়ের মানুষদের যে কত বিপদ৷ সকাল থেকে রাত অব্দি একটার পর একটা ভূতের উপদ্রব৷ ঠিক দুপুর বেলা তো এখানে ভূতের খোকা-খুকিরা খেলা করে সবাই জানে৷ তাই সবাই ভাবলে ছেলেটাকে আর ছাগলছানাটাকে বোধ হয় ভূতপ্রেত নিয়ে গিয়েছে৷

শুধু রাবণ মালাকার গোঁপের গোড়া চুলকে হা-হা করে বিশ্রীমতো হাসলে৷ বললে ‘ছেলাটার বুদ্ধি কত রে! দেখ দেখ, বুঝি জলে নেমে পালায়ে গেল৷’

ও মশালের আলো দিয়ে দেখিয়ে দিলে৷ সত্যিই তো জলের ধারে ধারে নরম কাদা, যেমন কাদায় গেঁড়ি গুগলি পাওয়া যায়, তেমন কাদাতে ছোটোছেলের পায়ের ছাপ৷

রাবণ বললে, বেশ চেঁচিয়েই বললে ‘পলাতে তোমায় দেব না হে! আমরাও সাঁকো পেরিয়ে উ-পাড়ে যেলছি৷’ রাবণের এখন আর শহুরে কথা মনে নেই৷

একজন উৎসাহী ছেলে অবিশ্যি বললে ‘চলো না কেন, আমরাও সাঁতারিয়ে যাই?’ কিন্তু সবাই তাকে থামিয়ে দিলে৷ নাককাটির খালে এই ভরাভাদ্রমাসে গলায় গলায় জল৷ জলে আর কিছু না থাক ভীষণ আদ্যিকেলে পানা আছে৷ সে পানাতে পা জড়িয়ে যাবে৷ আর, গোখরোকেউটে জল দিয়ে ভেসেও যায়, সাঁতরেও ওপারে যায়৷ মা মনসার কাছে তো আর চালাকি নেই?

ওরা তাই, মাতোর সন্ধানে ছুটে গেল৷ সাঁকো পেরিয়ে, মশাল হাতে৷ সাঁকোর ওপারের খানিকটা জমি ফর্সা৷ ঝোপজঙ্গল নেই৷ কিন্তু অন্য জমি জংলা৷ এই বর্ষার জল পেয়ে ভাঁটি ফুল, ঘেঁটু গাছ, ধুতরো, কালকাসুন্দী আর কেয়া ফুলের ঝোপ জলের দিকে ঝুঁকে আছে৷ যেন ওরা সারি বেঁধে মাছ ধরতে বসেছে৷ এইসব ঝোপের নীচে নীচে সাপের আস্তানা৷ ওরা ব্যাং ধরতে আসে৷ আর জঙ্গল মাঝে মাঝে এমনই উঁচু যে, তার নীচে নীচে চিতাবাঘ আর খটাশও আসে৷ এখানে চুপটি করে বসে চিতাবাঘ চেয়ে চেয়ে দেখে, তারপর রাখাল ছেলেদের নজর এড়িয়ে যে ছাগলটা আসে অথবা গাঁয়ের কুকুর, সেটার ওপর লাফ দেয়৷ চিতাবাঘ কুকুরের মাংস খেতে বড্ড ভালোবাসে৷

আমাদের মাতো অবিশ্যি রাবণ মালাকারের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনতে পায়নি৷ অবসন্ন শরীরে একটু ভেসে যায়, একটু সাঁতারের চেষ্টা করে, এমনি করে ও একসময় বুঝতে পারল আর নয়, এবার ডুবে যাবে৷ আশ্চর্য কী, ডুবে যাবে বলে আর ওর ভয় হল না, যেন ডুবে যাওয়াই ভালো, মাতোর এমনি মনে হল৷ তাহলে আর ছুটতে হয় না৷ কোথায় গির্জে, কোথায় বুড়ো পাদরি তা ভাবতে হয় না৷ মাতো গির্জেতে কী চেয়েছিল? কেন চেয়েছিল বল তো? মাতো ডান হাত দিয়ে কী যেন একটা চেপে ধরল৷ গাছের শেকড় হবে৷

চেপে ধরল বটে, কিন্তু তখনও ওর মাথায় যেন সব ভোঁ ভোঁ৷ হাতে যে কিছু একটা ধরেছে, এখন যে ও আর ভেসে যাচ্ছে না, পিঠের ওপর অর্জুন যে ছোটো ছোটো খুরে লাথি মারতে চেষ্টা করছে এর কিছুই মাতোর মাথায়

ঢুকল না৷

খুব জ্বর হলে যেমন সব গণ্ডগোল হয়ে যায়, ভোর বেলা তালরস চুরি করে খেলে যেমন মাথার ভেতর সব ফুরফুরে হয়ে যায় মাতোর এখন তেমনি বোধ হচ্ছে৷ চব্বিশ ঘণ্টার ওপর ও কিছুটি খায়নি৷ এই চব্বিশ ঘণ্টায় সোজা পথে, কাদাইয়ের পথে সৈদাবাদ যাবে না বলে ও প্রায় পাঁচকোনা পথ হেঁটেছে আর ছুটেছে৷

‘এখনও দেড়ক্রোশ পথ বাকি!’ মাতো আপনমনে বললে৷ ওর শরীরটা এখন কোমর থেকে জলে ডোবা৷ ওপরের দিকটা ঘাসের ওপর বেছানো৷ হাতের মুঠোয় বুড়ো আকন্দ গাছের শেকড়খানা ধরা৷ মাতোর ইচ্ছে হল এখানেই ঘুমিয়ে থাকে, যেন জলের ওপর ওর বিছানা পাতা আছে৷

কিন্তু মনের ভেতর থেকে কে বলে উঠল, আরমানি চাঁপা যেখানে ফোটে সেখানে যেতে হবে না?

তাইতো? মাতো ঘুম ঘুম চোখে অবাক হয়ে ভাবলে, সেই কথাটাই ভুলে গিয়েছি? সেই কোথায় যেন আরমানি চাঁপার গাছে পাতার আড়ালে মুখ লুকিয়ে চাঁপা ফুল ফোটে৷ চারদিক গন্ধে ভুরভুর করে৷ সেইখানে একবার যদি পৌঁছে যেতে পারে তাহলে মাতোর ভয় নেই, অর্জুনেরও ভয় নেই৷

এই সময়ে, অর্জুনের কথা ভাববার সঙ্গেসঙ্গে মাতোর ভেতর থেকে যেন হুঁশ ফিরে এল৷ অর্জুনের কী হল? মাতো বুকে টেনে টেনে, শরীর ছেঁচড়ে পাড়ের ওপর উঠল৷ ওঃ রাত যেন খুব ভারী বলে মনে হয়৷ চারদিক শুনশান৷ মাথার ওপর তারা মিটিমিটি করছে এই যা রক্ষে, তাই একটু একটু আলো আছে৷ আবার বাতাসে যেন কেমন সোঁদা গন্ধ৷ কাছাকাছি কোথাও যেন বৃষ্টি হয়েছে৷ বাতাস সেখান থেকেই ভেসে আসছে৷ বৃষ্টি না হলেও কষ্ট, আবার বৃষ্টি বেশি হলেও মাতোর মা, আকাশের দিকে চেয়ে বলে, ‘মা ভাঁজোনক্ষী, কলসি উপুড় করে আর কত চলবে মা?’

মাতোর মা-রা ভাদ্দরে ভাঁজোর পরব করে, আর যখন যা হয় তখনই ভাঁজোলক্ষ্মীকে ডেকে নালিশ জুড়ে দেয়৷ এখন মাতো, এই নাককাটির খালের উপর দিকের আকাশের দিকে তাকাল৷ উত্তর দিকে, লালগোলা ঘাটের গাড়ে বড়োগাঙ বয়ে যাচ্ছে৷ এই ভাদ্দরে বড়োগাঙ রাক্ষুসে হয়ে ওঠে৷ উত্তরদিকের আকাশে মেঘ পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে৷ তারাভরা আকাশখানা ঢেকে ফেলবে বুঝি৷

মাতো আস্তে পিঠ থেকে অর্জুনকে খুলল৷ আহা, চৌপ্রহর মাতোর সঙ্গে খেলাধুলো করে, নেচে নেচে বেড়ায়, এখন আষ্টেপিষ্টে বাঁধা হয়ে থেকে রীতিমতো হাপসে গিয়েছে৷ মাতো ওর পেটে আর পিঠে হাত বোলাতে লাগল৷

অর্জুন ওর মুখ চেটে দিল৷ ডাকল আস্তে ‘ম্যা!’

একটু প্রশ্ন প্রশ্ন ভাব৷ যেন জিজ্ঞেস করল, আমাদের কী হয়েছে? আমরা কোথায় যাচ্ছি? এমন সময়ে তো আমি গোয়ালে শুয়ে ঘুমোতাম, তুমি তোমার ঘরে৷

‘তোরে ওরা মেরে ফেলত অর্জুন!’ মাতো আস্তে বললে৷ অর্জুন যেন বুঝতে পারল সব৷ এবার অন্ধকারে শুঁকে শুঁকে ও ঘাস খেতে লাগল৷

সেইজন্যেই রাবণ মালাকার আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা মাতোদের দেখতে পেলে না৷ ওরা সাঁকোর ওপারের সাফ-জমিতে দাঁড়িয়ে খানিকটা হইচই করলে, তারপর চলে গেল রাস্তা ধরে৷ এই গজাড়জঙ্গলে অন্ধকার রাতে সাপের ভয়ে ওরা এমনিতেও ঘেঁষত না৷

‘আরে আজ রেতে তারে সবাই খুঁজতেছে পেলিয়ে যাবে কুনঠি?’ কে যেন চেঁচিয়ে বললে৷ মাতো শুনতে পেল৷ এমন নির্জন জলের কাছাকাছি অনেকদূর থেকেও শোনা যায়৷

অনেক, অনেকক্ষণ শুয়ে থেকে মাতো উঠে পড়ল৷ এর মধ্যে সাপে খেলে, বাঘে নিলেও সে কিছু করতে পারত না৷ কিন্তু এখন তাকে উঠতেই হবে৷ ভোরের আলো ফুটলে মাতো কেমন করে আরমানি গির্জেয় পৌঁছবে? আকাশের দিকে চেয়ে দেখতে পেল কালো, ঘন মেঘের দল সাঁ সাঁ করে উঠে আসছে৷ কে যেন ওদের খবর দিয়েছে চলে এসো, তাই ওরা ছুটে আসছে অমন করে৷ আর কী ঠান্ডা হাওয়া৷ বৃষ্টি বুঝি এখনই নামে৷ মাতো অর্জুনকে তুলে আবার পিঠে বাঁধলে৷

হাতের নড়া দুটোয় কী ব্যথা গো! অর্জুন আবার ছটফট জুড়েছে৷ ঠান্ডা হাওয়া পেয়ে, তাজা ঘাস খেয়ে ও একটুখানি বেঁচেছে৷ এখনই কী আর বাঁধা পড়তে সাধ যায়?

‘অমন করিসনে অর্জুন!’ মাতো খুব আস্তে বললে. তারপর ও আস্তে আস্তে হোঁচট খেয়ে, কাঁপতে কাঁপতে হাঁটতে শুরু করলে৷ এখন শরীরে বেজায় কাঁপুনি৷ যেন জ্বর থেকে উঠেছে মাতো৷ আবার জ্বর আসছে৷ সেবার মাতোর খুব জ্বর হয়েছিল৷ ওর মা তখন কবরেজবাড়ি থেকে জেনে এসে পাঁচনের শেকড়-বাকড় এনে ওকে সেদ্ধ করে খেতে দিত৷ পাঁচন থেকে মাতো আমলকী গাছে ফেলে জল খেত, খুব মিষ্টি লাগত৷ আহা, আমলকী আর হত্তুকি বড়ো ভালো জিনিস৷ মা বলে, ওসব নাকি ঠাকুর দেবতারা অব্দি খায়৷

ততক্ষণে বহরমপুরের কাছাকাছি রাস্তার মোড়ে বেশ বিশ-পঁচিশ জনের ভিড় জমে গিয়েছে৷ ছিবিলেস, জানকী সিংগি, কাপালিক, সবাই দাঁড়িয়ে হইহই করে চ্যাঁচাচ্ছে৷ ছিবিলেস হাতে মশাল নিয়ে চ্যাঁচাচ্ছে৷ বলছে ‘সবাই একজায়গায় চাক বেঁধে রইলেন কেনে? এক-একজনে এক-একদিকে যেয়ে দেখেন না?’

‘তুই দেখ ব্যাটা৷ তোর ভাই হয় না?’

‘ভাই বলে কি ছেড়ে দিব মশায়? উরে অব্দি কালী মায়ের সামনে বুকে পাষাণ বেঁধে টেনে বেড়াব!’

‘মরে যাবে না?’ কে যেন বললে৷

‘তা, একজন মরবে মরুক গা! উ-দিকে মহাপাপ হয়ে যায়, সর্বনাশ হয়ে যায় তার ব্যবস্থা কী?’

জানকী সিংগি বললে ‘বাপুসকল, সকাল হতে দাও৷ আমি ঢাকিঢুলি ভাড়া করে, শোহর তুলে তামাম মনিষ্যকে জানিয়ে দেই কথাটি৷ তখন দেখবে ধরা পড়ে কি না পড়ে!’

‘ওঃ রেতে না বেরোলে ভালো হত গো!’ ছিবিলেস বললে৷ ভিড়ের কয়েকজন লোক হাসল৷ সবাই জানে সেই রাতে ছিবিলেস ডাকাতি করতে গিয়েছিল৷

এই সময়ে কাপালিক বললে ‘আমি এখানেই বসলাম৷ তোরা মায়ের বলি খুঁজে আনগা যা! না যদি পারিস, তালে দেখবি আমি এই একাসনে উপোস করে বসে রইব৷’

‘হেই বাবা!’ সবাই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল৷

‘উপোস করে করে দেখবি আমার শরীরটা ধু-ধু করে জ্বলে উঠবে৷ আমি সগগে চলে যাব৷’

শুধু মাতোর বন্ধু উদ্ধব বললে ‘ওঃ অর্জুনের কচি মাংস না খেতে পেয়ে প্রাণটা বেরোয়ে যাচ্ছে৷ অর্জুন ওনার কলার ছড়া খেয়েছে৷ পেটে গুঁতো মেরেছে৷ অর্জুনের ওপর ওনার বেজায় রাগ৷’

কিন্তু ওর কথা কেউ শুনল না৷ কাপালিককে ঘিরে সবাই জটলা করছে এমন সময়ে ওদিক থেকে হইহল্লা উঠল৷

‘ওরে! ধরা পড়ল বুঝি৷ চল রে চল!’

কী হল, কে ধরা পড়ল, কিছু না বুঝে সবাই সেদিকে ছুটে গেল৷ মাতো কী ওদের হাতে সহজে ধরা দেয়৷ ও এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে৷ ওকে ধরতে পারছে না কেউ৷

‘মাতো ফিরে আয়৷’

ছিবিলেস বেদম ধমক দিয়ে বললে৷ কিন্তু মনে মনে বললে বাঃ রে মাতো৷ দিব্যি ছুটছিস! সবাই দেখুক৷ সবাই যে বলত তুই রোগা, মেয়েলি, তোর হাতে পায়ে জোর নেই৷

‘মাতো যাসনে ভাই!’

উদ্ধব মাতোর কোঁকড়া চুলের ঝাপটা দেখতে পেয়েছে৷ হঠাৎ ওর কান্না পেয়ে গেল৷ কেন সকলের সঙ্গে হুজুগে মেতে ও চলে এসেছিল কে জানে৷ এখন ও দেখতে পেল মাতোর মুখ সাদাপানা৷ চুল জলে ভেজা৷ কাপড়ে কাদামাখা৷ উদ্ধব সেখানেই দাঁড়িয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললে৷

‘ধর ধর, ওই যায়!’ জানকী সিংগি চেঁচিয়ে উঠল৷

মাতো কুমোরদের প্রতিমা গড়ে রাখবার চালাঘর পেরিয়ে গেল৷ ফকিরের কবর আর মসজিদ বাঁয়ে রেখে সোজা গোচর নালাটায় নেমে গেল৷ এখানে এদিকের ডোমপাড়া৷ ওদের শুয়োরগুলো ওই নালার পাঁকে পড়ে গড়াগড়ি খায়৷

‘দে না কেউ একখানা সড়কি ছুড়ে৷’ কে বললে! ‘খবরদার! গায়ে চোট লাগলে বলি নষ্ট হয়ে যাবে৷’ কাপালিক চ্যাঁচালে৷ ‘ধর ধর৷ ওঃ ভূতে পাওয়া ছেলে গো! ও কি আর ঠ্যাঙের জোরে দৌড়চ্ছে? ভূতে ওকে টেনে নে যাচ্ছে৷’ জানকী বললে৷

ওরা যখন ওকে এই ধরে তো সেই ধরে, সেই সময়ে মাতো গির্জের রেলিং টপকে ঢুকে গেল৷ যখন ও উঁচু রেলিং বেয়ে উঠল, মশালের আলো যখন ওকে ছোঁয় ছোঁয়, সেই সময়ে ছিবিলাস বলিপুজোর কথা ভুলে গিয়ে হাতের মশাল ফেলে দিয়ে গর্জে বলল ‘বাঁ ঠ্যাংটা আগে তোল মাতো, তা বাদে ডান পা-টা উঁচু করে, নে ঝাঁপ দে!’

ওর কথা না শুনেই মাতো ভেতরে ঝাঁপ দিলে৷ আর কোথাও নয়, একেবারে গির্জের মধ্যিখানে৷ বড়ো দরজার নীচে ফোকর, যেখান দিয়ে সবসময় ঢোকা বেরুনো হয়, সেখান দিয়ে মাতো টুপ করে ঢুকে গেল৷

তারপর অনেক কিছুই হল৷

গির্জের সামনে লোকদের গোলমাল শুনে বুড়ো পাদরি এলেন৷ সবকথা শুনে বললেন ‘ওকে আমি কিছুতে যেতে দেব না৷ তা ছাড়া গির্জেয় ঢুকলে তো ওকে দিয়ে আর মায়ের বলি হয় না? তোমরাই তা বল৷’

অনেকক্ষণ ধরে গণ্ডগোল করে, তবে ওরা সেখান থেকে সরে গেল৷

এই তো মাতো আর ওর ছাগলছানা অর্জুনের গল্প৷

যদি বল তারপরে কী হয়েছিল? তাহলে বলি৷ অর্জুন ওই গির্জাতেই থাকত বুড়ো পাদরির কাছে৷

আর সেই বন্যা?

সে বানও হয়নি৷ আর গ্রামের পর গ্রামও ভেসে যায়নি৷ কাপালিককে নাকি মেরেধরে ওই ছিবিলাসই তুলে দিয়েছিল গ্রাম থেকে৷

গির্জাতে নাকি একজন মেয়ে এসেছিল৷ এই আধবুড়ো মানুষ, মিশমিশে কালো রং৷ বলেছিল ‘ও পাদরিবাবা, আমার মাতোরে তুমি দেখেছে? এই ধরগা দশ বছরের ছেলা, এমন ঝুমরো চুল৷ আমার মাতো অক্ত দেখে কাঁদে৷ বনে বসে বসে পুতুল গড়ে৷ সে পুতুল কী আশ্চয্য পুতুল গা! অমনটি কেউ দেখে না৷’

‘মাতো তোমার ছেলে?’

‘হ্যাঁ গো পাদরিবাবা, সবাই বলে সে নাকি তোমার মন্দিরে যেমন ঢুকেছিল তেমনি উঁই যে ঠাকুরগো, মায়ের কোলে ছেলে উনি নাকি হাত বাড়িয়ে মাতোরে বুকে টেনে নেছে?’

পাদরি ওকে ভেতরে ডেকে এনেছিলেন৷ আরমানি চাঁপার গাছের নীচে বসিয়ে ওকে কত কথা বলেছিলেন! ওই গাছের নীচে নাকি মাতো ঘুমোতে গেছে, যেমন করে ছোটোবেলা মায়ের কোলে ঘুমোত৷

‘তাই বুঝি?’ মাতোর মা গালে আঙুল রেখে অবাক হয়ে বলেছিল ‘ঘরে দেখগা উর বেছনা পাতা অয়েছে৷ আমার ঘর ছাওয়ায় ঢাকা! কী ঠান্ডা বাতাস৷ সেখেনে তুই ঘুমোতে নারলি, এই এতখানি পথ পেরিয়ে এখেনে এসে…মাতো, তুই আমার ছেলে, কিন্তু তোকে আমি বুঝতে পারলাম না৷’

তারপর মাতোর মা চলে গিয়েছিল৷

আর, আরমানি চাঁপার গাছটায় অনেক, অনেকদিন ধরে ফুল ফুটত, ফুল ঝরত৷ আস্তে আস্তে শহর যখন বড়ো হল, ওখানে বাজার বসল, ঘাট বাঁধা হল, তখনও ফুল ফুটত৷

এখনও ফোটে৷ মাঝে মাঝে শীতের রাতে জ্যোৎছনার সঙ্গে কুয়াশা মাখামাখি হয়ে যখন চারিদিক আবছা হয়ে যায়, তখন নাকি মনে হয় গাছটা একটি ছোটো ছেলের মতো৷ ছেলেটি হাতজোড় করে হাঁটুগেড়ে মুখ তুলে আছে৷

কখনও মনে হয়, গাছটা একজন বুড়ো পাদরির মতো৷ মাথা নীচু করে কার মাথায় হাত রেখে উনি যেন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন৷

কিন্তু, রোদ উঠলেই দেখা যায় সব ফর্সা, সব অন্যরকম৷ গাছে শুধু সবুজ পাতা আর ফ্যাকাশে হলুদ সাদাটে চাঁপা ফুল৷ সকালের রোদ মেখে গাছটা যেন বাতাসে মাথা দুলিয়ে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে৷ যেন মেঘ বাতাস আর রোদ ওর সঙ্গে ভারি ঠাট্টা করেছে, তাই এত হাসি৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *