এককড়ির সাধ
ভোরের আলো তখনও ফোটেনি৷ মহাস্থানগড়ের ভাঙা স্তূপের নীচে করতোয়ার জল একটু একটু করে লাল হচ্ছে৷ কায়েতদের ছেলে এককড়ি গিয়ে আম গাছের ডগায় উঠল৷
ভোর থাকতে গা ঢাকা না দিলে উপায় নেই৷ আলো ফুটলেই পাঠশালা বসবে আর আজকে পিসি তাকে নির্ঘাত পাঠশালায় দেবে৷ এ আম গাছটা চৌহদ্দির বাইরে৷ পেল্লায় ফজলি আমের গাছ৷ এককড়ির ঠাকুরদা নাকি একদিক থেকে গাছ লাগিয়ে যেত, ঠাকুরমা অন্যদিক থেকে উপড়ে ফেলত৷ এখনও সেকথা মনে করলে পিসির দুঃখ হয়৷ সে বলে, ‘আহা গো, এখন বাড়িটা বাগানটা যেন নিঝুম-নিশ্চুপ৷ আগে বাবা আর মা রাতদিন ঝগড়া করত, কেমন চারদিক গমগম করত৷’ গাছের ডগায় বসে বসে এককড়ি ভাবতে লাগল কী করা যায়৷ পড়াশোনা তার মোটেই ভালো লাগে না৷ ‘মুখে আকুশী ক’ বলে গুরুমশায় যেই বেতগাছাটা তোলেন, অমনি এককড়ি ‘নাটের গুরু নন্দ, গায়ে তাহার গন্ধ’ বলে দাওয়া থেকে নীচে লাফ মারে৷
‘ধর-ধর’ বলতে বলতে এককড়ি নিমেষে হাওয়া!
এই তো সেদিন গুরুমশায় ‘এক সের তৈলের এককড়ি দাম’ বলে আর্যা শেখাচ্ছিলেন, এককড়ি মেঝেয় মাটিতে ছবি আঁকছিল৷ হঠাৎ গুরুমশায়ের তার দিকে চোখ পড়তেই ‘চিত্র আঁকা হচ্ছে? ব্যাটা পোটো-কুমার হবি?’ বলে যেই না হুংকার দেওয়া, অমনি এককড়ি পাঠশালা ছেড়ে দৌড়৷
দৌড়ে গিয়ে উঠল একেবারে সেই ভীমের জঙ্গলে৷ সেই কবে আদ্যিকালে কৈবর্ত রাজা ভীম তার দিব্য রাস্তা কেটে রেখে গিয়েছে, এখনও সবাই বলে ভীমের জঙ্গল৷
বসাবার জন্যে মাটির চৌকো টালি গড়ে তাতে লক্ষ্মীপ্যাঁচা, ধানের শিষ, ধামাকুলো, ঝাঁপি, শুঁড়-তোলা জোড়াহাতি, জোড়ামাছ, পদ্ম ফুল, নরুন দিয়ে খুদে তুলতে ব্যস্ত৷ ধানলক্ষ্মী, পউষলক্ষ্মী, ভাদ্রলক্ষ্মীর মূর্তি হয়৷ সে মূর্তিতে আবার রং ধরানো হয়৷ কোজাগরীর দিন এককড়ি নানারঙে পিটুলি গুলে আলপনা দিয়ে পুজোর জায়গা সাজায়৷ তারপর, লক্ষ্মীর চৌকির নীচে তার রং করা টালিগুলো যখন সাজিয়ে দেয়, তা দেখে সকলের চোখ জুড়োয়৷
মহাস্থানগড়ের ভাঙাচোরা স্তূপে এককড়ি আপনমনে শুধু দেখে দেখে বেড়ায়৷ রকম বে-রকমের মূর্তি দেখে ভাবে, আহা, যদি কেউ বলে দিত কেমন করে পাথর খোদাই করতে হয়, তাহলে শিখে নিতাম৷
কুমোরপাড়ার পোটোবাড়িতে এককড়ির খুব যাতায়াত৷ সেখানে বসে সে পুতুল গড়ে, ছবি আঁকে৷ এই তো সেদিন বলরাম পোটোকে সে বলল ‘বলরামদা, মহাস্থানগড়ে যেমন দেখি, আমাদের বটগাছতলায় যেমন আছে, তেমন পাথরের মূর্তি গড়তে জানো না? জানলে শিখতাম!’
‘আর দাদা! তখন ছিল রাজা-মহারাজার রাজত্ব৷ তাঁরা হুকুম করেছেন আর সবাই পাথর বয়ে এনে দিয়েছে৷ এমন পাথর তো এদেশে মেলে না দাদা, আর রাজা-মহারাজার দিনও নেই৷ তাই কারিগররা পাথরের কাজ ভুলে গিয়েছে৷’
‘কারও মনে নেই?’
‘কারও মনে নেই৷ তবে শুনেছি নাটোরের রানি নাকি কোথায় রাঢ়দেশের বিষ্ণুপুর না কোথা থেকে এক সাতকেলে খুনখুনে বুড়োকে নিয়ে এসেছে৷ বুড়োর নাম ক্ষুদিরাম মৃৎপাল৷’
ক্ষুদিরামের নাম এখন সব কুমোরদের মুখে মুখে৷
তারই পূর্বপুরুষরা নাকি একদিন পাহাড়পুরে, মহাস্থানগড়ে, বিক্রমশিলার তরুণ শিল্পী ছিল৷ এখন তার ঠাকুরদাই নাকি বিষ্ণুপুরে আর সুতোনুটির কাছে মাটির টালিতে দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করে নকশা টালি দিয়ে আশ্চর্য সব মন্দির গড়েছে৷এখন চারদিকে সবাই মরেহেজে গিয়েছে৷ ক্ষুদিরামকে নাটোরের রানি অনেক খুঁজে খুঁজে নিয়ে এসেছেন৷
‘কেন বলরাম কাকা?’
‘রানি যে গঙ্গার তীরে, বড়োনগরে দ্বিতীয় কাশী গড়ে তুলতে চান৷’
‘সে কী?’
‘আর বল কেন৷ রানি হও আর যেই হও, মেয়েছেলে তো৷ কাশী গড়েছিল দেবতারা৷ বড়োনগর কে গড়বে শুনি?’
‘ক্ষুদিরামকে সেজন্যেই আনা?’
‘না না৷ বড়োনগরের বাড়ি, দালান, নদীর ধারের পোস্তা, সেসব তৈরি করবে অন্যলোক৷ ক্ষুদিরাম পাল শুধু মন্দিরগুলো তৈরি করবে৷’
‘তবে যে বললে সে খুনখুনে বুড়ো?’
‘বুড়ো হয়েছে বলেই তো তার এখন মহাভাবনা৷ সে দিনরাত্তির রানিকে খুঁচিয়ে অস্থির করছে আমায় ভালো ভালো কারিগর দাও৷ আমি তাদের শিখিয়ে-পড়িয়ে মন্দিরের কাজ করিয়ে দেব৷’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ গো হ্যাঁ৷ তাই তো এখন হাটে-গঞ্জে ঢেঁঢরা দিয়ে কুমোরের লোভ দেখাচ্ছে৷’
‘তুমি যাচ্ছ না কেন?’
‘যেতে তো ইচ্ছে করে দাদা কিন্তু যাই কী করে বল দেখি? সাদা গাইটার বাছুর হবে, ছেলেটা মহাদুষ্টু, সে কি আর গাইটাকে যত্ন করবে? এদিকে, বুঝলে দাদা, ওই গাইটা হল আমাদের লক্ষ্মী৷ ওকেও হাট থেকে আনলাম, আর আমার রায়বাবুদের পিরতিমে গড়বার বরাত পেলাম৷’
‘আচ্ছা বলরামদাদা, আমি গেলে আমাকে ক্ষুদিরাম কাজ শেখাবে?’
‘ক্ষুদিরামের কাছে যাবে কী করে দাদা? নাটোরে জান তো জলটুঙ্গি আছে? সেই জলটুঙ্গিতে বুড়ো একলাটি বসে আছে৷ পছন্দমতো অন্তত একটি কারিগর না পেলে সে নড়বে না৷’
‘তাহলে?’
‘আসল কথা হল রানির ছেলে রাজা রামকৃষ্ণ তো বলতে গেলে পাগল৷ রানি তাকে ছেড়ে নড়তে চান না৷ সে আবার ভবানীপুরের ভবানীমন্দিরে থাকে, পুজো-টুজো করে৷ তার জেদ, ক্ষুদিরামকে দিয়ে আগে তাকে একটি সুন্দর মন্দির করিয়ে দিতে হবে, তবে সে রানিকে বড়োনগরে যেতে দেবে৷’
‘ভবানীপুরে আরেকটা মন্দির করিয়ে দিলেই হয়?’
‘এখানে একটা মন্দির করবে, ওখানে আর একটা-বুড়ো অতদিন বাঁচবে কি? পাগলরাজা রানিকে বলে রেখেছে, মা, যেদিন আমি ক্ষুদিরামকে যেতে বলব, সেদিন ও যাবে৷ তার আগে যেতে পারবে না, তুমি আমায় কথা দাও৷’
সে কথাও সত্যি৷ রানি এখন আধখানা বাংলাদেশ, ওদিকে কোম্পানির সায়েবদের খাই খাই, অরেকদিকে প্রজাদের নানারকম চাই চাই, দুষ্টু গোমস্তাদের সদাই নাই নাই, এমনি হাজারটা বাই বায়না সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন৷
ব্রাহ্মণরা দলে দলে আসেন৷ কেউ বলেন, মেয়ের বিয়ে দেব টাকা দাও, কেউ বলেন টোল খুলব, কেউ বলেন তীর্থে যাব৷
চাষিদের হয়ে বুড়ো-বুড়ি গাঁ-মোড়লরা আছে৷ বলে, মা গো, তোমার ছেলেটি পাগল, মেয়েটি বিধবা, মনে কোনো সুখ নেই জানি৷ কিন্তু গোমস্তাদের অত্যাচারে আমাদের যে খেতের ধান গোলায় ওঠে না, ছেলেদের পেটে ভাত জোটে না, আমরা কার কাছে যাব?
দুঃখী-ভিখিরি অনাথ-আতুর এসে দাঁড়ায়৷ তারা বলে, অন্নপূর্ণার আশ্রয়ে আছি, আবার কোথায় যাব বল তো?
কাশী থেকে ছত্রীরা লেখে, মা গো, তুমি অন্নছত্র খুলে দিয়েছ এবার একটি ধর্মশালা করে দাও৷
বাংলাদেশের জমিদারি থেকে ঢাকাই-তাঁতিরা লেখে, মা গো, কোম্পানির জুলুমে কাপড় বোনা বন্ধ হতে চলল৷ তুমি ব্যবস্থা করে তুলোর ওপর মাশুল তুলে দাও৷ আমরা একবার দেখিয়ে দিই ঢাকার তাঁতিদের তৈরি মসলিন এখনও পৃথিবীর রাজা-মহারাজাদের তাক লাগিয়ে দিতে পারে৷
রাজা-মহারাজারাও কম যায় না৷ কুঞ্জঘাটার নন্দকুমার লেখেন, হেস্টিংস সায়েব আমার সঙ্গে দিন দিন শত্রুতা বাড়াচ্ছেন৷ হয়তো জমিদারি রাখতেই পারব না৷ আপনি যদি লেখেন যে এইসব তালুক-মুলুক আপনি আমায় ব্রহ্মত্র দিচ্ছেন, তাহলে ভালো কাজে মিছে বললে আপনারও দোষ হয় না, আবার ছেলে গুরুদাসও সম্পত্তিগুলো পায়৷
অন্দরমহলেও শান্তি নেই৷ যত আত্মীস্বজন আছে তারা মোটেই বুঝতে চায় না৷ রানিভবানীর কাঁধের উপর কী বিশাল দায়িত্বের গন্ধমাদন চাপানো৷ তারা কোথায় তাঁর একটু সাহায্য করবে, তা না করে কে দুধ পায়নি, কার নিখার চাল কম হয়েছে, কাকে ভাণ্ডারী লেপতোশক দেয়নি, কাকে খাজাঞ্চি ধমক দিয়েছে এই নিয়ে ভারি অশান্তি লাগিয়ে দেয়৷
তার ওপর আধখানা বাংলাদেশ জুড়ে নাটোরের জমিদারিতে যেখানে যত দেবমন্দির আছে, যত দেবমন্দির তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, সব জায়গা থেকে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর সেবায়েতরাও চিঠি লেখেন৷ কোনো মন্দিরের ঘাটলা বাঁধাতে হবে, কোনো মন্দিরের অতিথিশালা মেরামত করতে হবে, কোথায় প্রায়শ্চিত্ত পুজো করাতে হবে৷
তার উপর পাগলারাজার আবদার৷ ক্ষুদিরামকে ছাড়া চলবে না৷ রানি যখন মাঝেমধ্যে একটুখানি সময় পান, তখনই তাঁর মনে সেই সাধ জেগে ওঠে৷
গঙ্গার তীরে মনে মনে তিনি তাঁর সাধের বড়োনগর দেখতে পান৷ কেমন চিত্র-বিচিত্র মন্দির, কেমন প্রাসাদ, কেমন অতিথিশালা৷
ইচ্ছে করে মনের মতো জায়গাটি গড়ে নিয়ে সেখানে চুপটি করে বসে থাকেন৷ সারাটা জীবন, সেই ছোট্টবেলা রানি হয়ে এসেছিলেন, সেই থেকে শুধু কাজ আর কাজই করছেন৷ এতটুকু ছুটিও নেননি, ছুটিও পাননি৷
ছিলেন গরিব বামুনের মেয়ে৷ হলেন রাজরানি৷ তারপর লেখাপড়া শিখে এই বিরাট রাজ্যের ভারও নিতে হল একদিন৷ রাজাও, যেন তিনি আছেন বলেই নিশ্চিন্তে চোখ বুজলেন৷ মেয়ে তারা বিধবা হলেন৷ দত্তক ছেলে রামকৃষ্ণ, তিনি হলেন কালী কালী কালী করে পাগল৷
মনে সুখশান্তি কিছুই নেই৷ আছে শুধু কাজ৷ তিনি কোনো কথা না ভেবে কাজই করে চলেছেন৷
তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, ছোটোবেলায় সেই রানি না-হওয়া নোলকপরা জেদি, তেজি, জ্বলজ্বলে-চোখ মেয়েটা কোথায় যেন বসে আছে৷ তাঁকে যেন সে ঘুমের মধ্যে পাশে বসে অভিমানের সুরে বলে যায়, ‘পুতুলখেলার সময় থেকে তো শুধু কাজই চিনেছ, কাজই করছ৷ এখন মনের মতো গঙ্গাতীরে একটা থাকবার জায়গা, তাও কি গড়বে না? কত দেরি করবে?’
কিন্তু রাজা রামকৃষ্ণের ওই এক জেদ৷
‘হ্যাঁ রে, ক্ষুদিরাম যাবে কবে? কবে তুই যেতে বলবি?’
‘আমার মন্দিরটার নকশা যখন আমার মনে আসবে তখনই বলব৷’
‘নকশা তোর মনে আসবে কী রে? যারা নকশা করে তাদের নকশা দেখে দেখে তুই একটা পছন্দ কর৷’
‘বেশ তো৷ তাদের তুমি আমার ভবানীমন্দিরে পাঠিয়ে দিয়ো৷’
বলে রামকৃষ্ণ চলে যান৷
ভবানীমন্দিরে তাঁর পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে৷ সেখানে পঞ্চবটির মূলে পাঁচটি মড়ার মাথা পোঁতা৷ সেইখানে বসে রামকৃষ্ণ দেবীকে ডাকেন৷ সেখানে, সেই ভবানীমন্দিরে কতজন গেল, কত নকশা দেখাল, রাজার পছন্দই হল না৷
এইসব গল্প আদ্যোপান্ত শুনে এককড়ির খুব ইচ্ছে হল সে একবারটি যায়৷
গিয়ে রাজা রামকৃষ্ণকে একটা নকশা দেখায়৷ গিয়ে ক্ষুদিরামকে দেখে৷
রানির খাস কবিরাজ বটুক সেনকে যদি পায় তাহলে রতনকে সারিয়ে দিতে বলে, সে ইচ্ছেও আছে৷
সেজন্য বাড়ি ছেড়ে পালানো দরকার৷
নইলে পিসি তাকে নির্ঘাত হাত-পা বেঁধে গুরুমশায়ের কাছে নিয়ে যাবে৷
তারপর বেত খেয়ে আর চোখের জল ফেলে হাতের লেখা, শুভংকরী, সব লিখতে হবে৷ কায়েতদের ঘরের ছেলে হয়ে নরুন দিয়ে ইট খোদাই, সন্দেশের সাঁচ করা, বেরিয়ে যাবে৷
কিন্তু গুরুমশায় এত চটতেন না৷ চটেছিলেন এককড়ির জন্যই৷
সেবার এককড়ি বড়োই দুষ্টুমি করেছিল৷ গুরুমশায়কে সবাই বলত হাড়কেপ্পন, তাই উনি পুজো করেন না৷ সেবার এককড়ি কাউকে না জানিয়ে এই তিন হাত একটি দুর্গাপ্রতিমা গড়ে গুরুমশায়ের দোরগোড়ায় বোধনের দিন নামিয়ে দিয়ে এসেছিল৷
সকালে উঠে দোরগোড়ায় প্রতিমা দেখে তো গুরুমশায়ের চক্ষু চড়কগাছ৷
‘এ নিশ্চয় এককড়ের কাজ৷ ব্যাটার পিঠের ছাল বেতের ঘায়ে তুলব৷’ বলে নেচেকুঁদে তিনি অস্থির৷
কিন্তু দোরগোড়ায় প্রতিমা তো আর পড়ে থাকতে পারে না৷ গিন্নিকে চণ্ডীমণ্ডপ নিকোতে বলে তিনি রায়দের বাড়ি গেলেন৷ বড়োরায়কে বললেন, ‘ও জটাধর, এককড়েটা কী করেছে শুনেছ? প্রতিমা নামিয়ে দিয়ে এসেছে দোরগোড়ায়৷ আমার অবস্থা তো সবই জান? এ বিপদে উদ্ধার করো বাবা!’
বড়োরায় একটু হেসে বলেছিলেন ‘কী করতে হবে বলুন৷’
‘সবই তো জান বাবা৷ পুজোর মধ্যে সেরা পুজো, এ তো সামান্য জিনিস নয়৷’
‘তা তো বটেই৷’
বড়োরায় তখনই পুজোর সব উপকরণ চাল, ডাল, ঘি, তরকারি, মশলাপাতি, ফুলুরি, মিষ্টান্ন, সব পাঠিয়ে দিয়েছিলেন৷ এক দিন নয়, তিন দিনই৷ একটু হেসে বলেছিলেন, ‘গুরুমশায় আমাকেও বেত মেরে মেরে লেখাপড়ার ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন৷ সেইজন্যেই তো আমি চাষবাসের দিকে গেলাম৷ নিজের চাষবাস দেখতে লাগলাম বলেই বাড়ির লক্ষ্মী ফিরল৷ তা ওঁর বাড়ির পুজোয় এ আমার গুরুদক্ষিণা৷’
দুর্গাপুজোয় সেবার এককড়ি গ্রামের সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে ‘সেন মশায়ের বাড়ির পুজো’ বলে সিধে জোগাড় করে এনেছিল৷ গুরুমশায়ের বয়স আশি হলে কী হয়, এখনও দিব্যি শক্তসমর্থ আছেন৷ ছেলে থেকে বুড়ো, সবাই তাঁর হাতের বেত খেয়েই বর্ণপরিচয় শিখেছে৷
সবাই সিধে দিয়েছিল৷
সেই সিধে আর রায়বাড়ির সিধে দিয়ে পইতে-হওয়া বামুন-পোড়োরা ভোগ রেঁধেছিল৷ এককড়িরা সবাইকে পরিবেশন করে খাইয়েছিল৷
সবাই গুরুমশাইকে ধন্য ধন্য করেছিল৷ এমনকী শ্রীমাল ঢাকি, যে জোড়াকাপড় না পেলে ঢাকে কাঠি, ঢোলে চাঁটি দেয় না, সে-ও এসে ঢাক বাজিয়ে জয় জয় করে নেচেছিল৷
তবু গুরুমশায় খুশি হননি৷ কেননা তার পরেই তিনি বলে বেড়াচ্ছেন, ‘এক বছর তো নয়, পুজো এখন বছর বছর করতে হবে৷ তখন কি সবাই ভারে ভারে সিধে পাঠাবে? এককড়েটা আমাকে ভারি বিপদে ফেললে তো৷’
গুরুমশায় রেগে আছেন৷ ছড়ি তুলে বলছেন, ‘তোকে ওই কুমোরগিরি করা ছাড়াব৷ লেখাপড়া শেখাব, তবে আমার নাম নন্দ চক্কোত্তি!’
অতএব, অনেক কথা ভেবে তবে এককড়ি এসে এই গাছে বসেছে৷ একটু বেলা হলে পিসি যখন গাই দোয়ানো দেখতে যাবে, তখনই এককড়ি গাছ থেকে নেমে পালাবে৷ পালিয়ে, সেই ফাঁকে একেবারে ভবানীপুরের মন্দিরে গিয়ে উঠবে৷
ভবানীপুরের মন্দিরের পেছনেই সেই শাঁখারিপুর৷ স্বয়ং দেবী কেমন করে ছোট্ট মেয়ে সেজে ওই পুকুরের পাড়ে এসে শাঁখা পরেছিলেন, আর কেমন করে পুকুরের জল থেকে রাঙা হাত তুলে পুরুতকে দেখিয়েছিলেন তা সবাই জানে৷
ভবানীপুরের মন্দিরে তো প্রতিদিন পুজো হয়, আর যেই দুপুর বেলার বলিটি হয়, অমনি সেই খবর নিয়ে ঘোড়ার ডাক ছুটে যায় নাটোরের দিকে৷
ঘোড়ার ডাক গিয়ে খবর দিলে তবে ওখানে রানি জলপান করেন৷ নইলে যত দেরিই হোক, তিনি কিছুই খান না৷
এককড়ির যদি কপাল ভালো হয় তাহলে ওই ঘোড়ার ডাকে চড়েই হয়তো নাটোরে পৌঁছে যাবে৷ সেখানে একবার পৌঁছোতে পারলে বুড়ো ক্ষুদিরামের হাতে ধরে হোক, পায়ে ধরে হোক, ঠিক সে বুঝিয়ে দেবে সে-ই হল আসল শাগরেদ৷ যদি বিশ্বাস না করে, তাহলে সে ক্ষুদিরামকে হাতে-পায়ে ধরে তাদের গ্রামে নিয়ে আসবে, তাদের বাড়িতে৷
দেখিয়ে দেবে সিন্দুক, কাপড়ে আর পাটায় বাঁধা তার ঠাকুরদার আমলের যে-সব পুঁথি আছে তাতে নতুন নতুন তালপাতা জুড়ে সে কেমন রং দিয়ে দিয়ে রামের বিয়ে, সিন্ধুমুনি বধ, হনুমানের লঙ্কাদহনের চিত্র এঁকেছে৷ যে-কাপড়টি দিয়ে পুঁথি বাঁধা, তার উপর কেমন কোমরবাঁকা কুঁজি বুড়ির চিত্র লিখেছে৷
দেখিয়ে দেবে তাদের ঘরের একটি দরজায় বরাহাবতার, অন্য কপাটে অনন্তশয়ানে বিষ্ণুর ছবি খোদাই করা৷ যে-কাঠের দোলমঞ্চে বালগোপালের রথ-দোল হয়, তার গায়ে গায়ে গোষ্ঠের ছবি কুঁদে কুঁদে তোলা৷
গোপবালকেরা গাই দুইছে, বাছুর গলা তুলে ছটফট করছে৷ মাথায় ঝুঁটি বেঁধে যশোদা কৃষ্ণকে নাওয়াচ্ছেন, পেছন থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়ের শুকপাখিটি দেখছে৷ গাছে বানর ফল খাচ্ছে, যমুনায় মাছ সাঁতার দিচ্ছে, মেঘের পিঠে শুয়ে কৃষ্ণ একখানা হাত ঝুলিয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে ব্রজে যাচ্ছেন৷ আরেক চিত্রে যশোরানি পিদিম হাতে দাঁড়িয়ে, পিসি যেমন পিদিম হাতে তাকে এগিয়ে নিতে আসে৷
সব দেখিয়ে দেবে সে! দেখালে পরে নিশ্চয় ক্ষুদিরাম তাকে শিষ্য করে নেবে৷
অনেক কথা ভেবে এককড়ি গাছ থেকে নামল৷ পিসিকে ছেড়ে যেতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে৷ কিন্তু যখন তার অনেক নাম হবে, সবাই বলবে ধন্য এককড়ি, ধন্য এককড়ি, তখন পিসিও হয়তো খুব খুশি হবে৷
তখন এককড়ি আর এমন ছোট্ট একটা হেঁটো ধুতি পরবে না৷ সে কাকার মতো ধুতি, পিরান, পায়ে চটি, মাথায় ছাতি সেজেগুজে, পালকি চড়ে, হুম-হাম করে বাড়িতে এসে নামবে৷ সঙ্গে থাকবে বটুক সেন কবিরাজ, সে রতনের সব অসুখ সারিয়ে দেবে৷
পিসির জন্যে আনবে একখানা চন্দনপাটি, চন্দনপাখা, আর পেতলের দুধের কড়া৷
পিসি যে সব সময়ে বলে, ‘ভাদ্দুরে গরমে প্রাণ আইঢাই করে, চন্দনপাটি পাই তো পেতে শুই৷ চন্দনপাখা পাই তো বাতাস খাই৷’
কখনো কখনো বলে, ‘ইচ্ছে করে পেতলের কড়াতে দুধ জ্বাল দিই৷ পেতলের কড়াই মাজলে পরে সোনার মতো ঝকমক করে, তা জানিস?’
পিসির কথা ভাবতে ভাবতে এককড়ি ছুটে গিয়ে রাস্তায় উঠল৷
রাস্তা দিয়ে সারি সারি গোরুর গাড়ি চলেছে৷ গাড়ির উপর বোঝাই করা কলসি, হাঁড়ি, সরা৷ কোনো গাড়িতে তরিতরকারির বোঝা, কোনোটাতে কাপড়ের গাঁটরি৷ আজ দুপুর থেকে হাট বসবে, শেরপুরের হাট৷ তাই হাটুরেরা দূর দূর থেকে আসছে!
‘ও কাকা, আমায় একটু পৌঁছে দেবে ভবানীপুরে?’ এককড়ি একজনকে বলল৷
সে গাড়ি থামাল না৷ চালাতে চালাতে বলল, ‘হাটের গাড়ি কি থামে গো? যাবার মন থাকে তো উঠে পড়ো না কেন৷’
এককড়ি গিয়ে গাড়িতে উঠল৷
যেতে যেতে লোকটা বলল, ‘কাদের বাড়ির ছেলে রে?’
এককড়ি চুপ করে রইল৷ সে জবাব দিল না দেখে লোকটা বলল, ‘ছেলেটা ঢেঁটা আছে৷’
ভবানীপুরের মন্দির দেখে এককড়ির চোখ কপালে উঠে গেল৷ কী বড়ো মন্দির, কেমন থামের ওপর চাঁদোয়া দেওয়া নাটমণ্ডপ৷ অতিথিশালা, রান্নাবাড়ি, কাছারিবাড়ি, ভোগ-ঘর, সবসুদ্ধ যেন গমগম করছে৷
এককড়িকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না৷ ভাণ্ডারী তাকে দেখে একখানা গামছা আর ধুতি বের করে দিলে৷ পুকুরে ডুব দিয়ে এসে এককড়ি তখন সকলের সঙ্গে বসে পুজোর অন্নভোগ খেল৷ তারপর দর দালানে বসে অনেকক্ষণ ধরে এঁটো ভাত নিয়ে কাকদের কোলাহল, পায়রাদের গোলমাল, শালিকদের ব্যস্ততা, কুকুরদের হাঁকডাক দেখল৷
সবচেয়ে ভক্তি হল ভাণ্ডারীকে দেখে৷
এই মোটাসোটা মানুষ৷ গায়ে ফতুয়া, কোমরে চাবি৷ বগলে খাতা নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব অতিথিদের কার কী দরকার, তা লিখে নিতে লাগল৷
তারপর বলল, ‘বাবা সকল, সন্ধ্যের সময়ে তাড়াতাড়ি অতিথিশালায় চলে যাবেন সবাই৷ কৃষ্ণপক্ষের সময়ে রাজা নিত্য আসেন৷ মন্দির ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হবে, তাই এই নিয়ম৷’
‘রাজা এসে কী করবেন?’
একথা শুনে ভাণ্ডারী অমনি রাশভারী গলায় বলে উঠল, ‘কে রে? কে কথা বললে?’
সঙ্গেসঙ্গে এককড়ি থামের আড়ালে মুখ লুকোল৷ ভাণ্ডারী যদি তার ওপর রেগে যায়, তাহলে তো মহারাজের দেখা পাওয়া আর নাটোরে যাওয়া ঘুচে যাবে৷ সোজা কথা নয়-নাটোরের রাজা৷ সে শুনেছে নাটোরের নামে লোক থরথর করে কাঁপে৷
সন্ধ্যে বেলা মন্দিরের সামনে খুব আরতির ঢাকবাদ্যি বাজল৷
সন্ধ্যের ফলবাতাসা গালে দিতে-না-দিতেই ওদিকে গানের দল বসে গেল৷ তারা গলা ছেড়ে কালীকীর্তন গাইতে লাগল৷ এখন মন্দিরে কালীকীর্তনটাই বেশি হয়৷ রাজা রামকৃষ্ণ কুমারহাটিতে গিয়ে স্বয়ং রামপ্রসাদের মুখে কালীকীর্তন শুনে এসেছেন৷ তারপর থেকে তাঁর আর অন্য গান ভালো লাগে না৷ শুধু ইচ্ছে করে কালীর গান শোনেন৷ এই তো সেদিন নাকি ছুটে গিয়ে রানিভবানীকেই জড়িয়ে ধরেছিলেন, ‘ও মা, মাগো তুমি কালীর গান জান না? গান না শুনলে যে আমার ঘুম হবে না৷’
রানি নিশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘তার চেয়ে বাবা তুমি গাও, আমি শুনি৷’
‘আমি গাইব মা? আমার গান তোমার ভালো লাগে?’
‘ভালো লাগে বই কী৷’
গান শুনতে শুনতে রানি চোখ মুছলেন৷ মনে হয়েছিল এত বুদ্ধি যার, এমন শিক্ষা, এত রূপ, সে কেন একটু বিষয়ী হল না? একা তিনি আর কত ভার বইবেন? কতদিনের জন্যে?
ভবানীমন্দিরে কালীকীর্তন যখন শেষ হল, তখন রাত হয়তো প্রথম প্রহর হবে৷
ভোগ শেষ হল, শয়নারতি হল, দেবী শয়নে গেলেন৷ এককড়িরা সবাই প্রসাদ পেল৷ তারপর একটু একটু করে রাত পার হতে থাকল৷ বাইরে আর ভেতরের গোলমাল, হট্টগোল কমে এল ক্রমে৷
অতিথিরা একে একে অতিথিশালায় গিয়ে শুয়ে পড়ছে৷ দরজাগুলোর চাবি ঠিক আছে নাকি দেখে নিয়ে ভাণ্ডারীও খড়ম খটখটিয়ে চলে গেল নিজের ঘরে৷
পুরুতঠাকুর এসে নাটমণ্ডপের মস্ত পিদিমটা জ্বেলে দিলেন৷ এই এত বড়ো রেড়ির তেলের পিদিম৷ আর তার সলতেটা নৌকোর কাছির মতোই মোটা৷ পিদিমটায় দশ সের তেল ধরে এমনই বড়ো আর গভীর৷ তার আলোয় চারপাশের অন্ধকারকে আরও গাঢ় মনে হতে লাগল৷
বাইরে শেরপুরের ভীষণ জঙ্গলে কোথায় বাঘ ডেকে উঠল৷ সঙ্গেসঙ্গে বাইরে মন্দিরের রক্ষীদের গলায় হট্টগোল৷
এককড়ির বুকটা চমকে উঠল৷ তাই তো৷ রাত যে এখন অনেক৷ এ নাটমণ্ডপ খোলা৷ ওই দেখা যায় বট-অশ্বত্থের মাথা৷ ওরই পেছনে পঞ্চবটিতে পঞ্চমুণ্ডির আসন৷ সেদিক থেকে কটু গোকুল আসছে নাকি?
গোকুলদাদার কথা মনে পড়ল৷ বলরামকাকাও বলে, ‘তেনারা যখন বেরোন তখন বাতাসে কটুগন্ধ ছোটে৷ গন্ধে টের পাওয়া যায়৷’
এককড়ি দেখল নাটমন্দিরের থামগুলোর ফাঁক দিয়ে গাছপালা, আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ চারিদিক খোলা৷ ওপর থেকে যদি বাঘ উঠে আসে তাহলেও আশ্চর্য নেই৷ তা ছাড়া, এতক্ষণ মনে হয়নি, এখন যেন মনে হচ্ছে প্রতিটি খিলানের পেছনে, থামের আড়ালে কারা যেন মুখ লুকিয়ে আছে৷ কে জানে কে? কে জানে কারা?
ভয়ে সে চোখ বড়ো বড়ো করে রইল৷ চোখ বুজলেই কোত্থেকে সেই ভয় দেখানো ভয়ংকর এসে তাকে ধরে ফেলবে৷ তার চেয়ে চোখ খুলে থাকাই ভালো৷ এখন আবার মনে পড়ছে, শেরপুরের রাস্তায় ডাকাতের ছড়াছড়ি৷ ডাকাতরা এইসব বড়ো বড়ো বট-অশ্বত্থের গাছে লুকিয়ে থাকে৷ হয়তো রাত্তিরে তারা মন্দিরে ঢুকে পড়ে চুরি করার ফন্দি খোঁজে, কে জানে?
কতক্ষণ এভাবে কেটেছে তা এককড়ি নিজেই জানে না, আর ভয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে তার চোখটা বুজে এসেছে আর কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে তাও তার খেয়াল নেই৷
হঠাৎ সে চমকে উঠল৷ কানের কাছে কে চেঁচিয়ে উঠেছে৷
ভয় পেয়ে, থামের আড়াল থেকে মুখ বাড়াতেই সে থ হয়ে গেল৷ মন্দিরের সামনে, যেখানে হাড়িকাঠ তার একটু এদিকে, থামের গায়ে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন একজন যুবক৷ দেখে আর বলে দিতে হয় না তিনি কে!
এমন রূপ কি মানুষের হয়? আগুনের মতো রং৷ কাঁধের কাছে চুল লুটিয়ে পড়েছে ছোটো জটায়৷ হাতে বোধ হয় একটা তাবিজ, পায়ে জুতো৷ অমন চামড়ার ফিতে পেঁচানো জুতো বোধ হয় ঘোড়ায় চড়বার জন্যে পরতে হয়৷ কাঁধ থেকে শাল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে৷ এক হাতে একটা সোনার তাবিজ৷ দেখা যায় মাথাটা থামের গায়ে গোঁজা, চোখ দু-টি বোজা৷
‘আমি চোখ তুলে চাইব না, তোকে দেখব না৷’
গলার স্বরে নাটমন্দির গমগম করে উঠল৷ এককড়ি চেয়ে দেখল দেবীপ্রতিমা যেমন নিশ্চল ছিলেন, তেমনি আছেন৷
‘শাঁখারি তোকে দেখল, পুরুত তোকে দেখল, যে চায় তাকেই তুই দেখা দিস৷ আমায় কেন দেখা দিবি না?’
ঝনঝন করে শেকলটা নেড়ে দিলেন৷ এ শেকল এখানে ছাত থেকে ঝোলে, পাশে থাকে একখানা লোহার থালা৷ অতিথিদের খাবার সময় হলে, বা অন্য কোনো কাউকে অন্য কোনো প্রয়োজনে ডাকতে হলে এই শেকলটা ধরে ভাণ্ডারী নেড়ে দেয়৷ দিনেমান তো নয় যে, নানা কোলাহলে ডুবে যাবে! এখন নিশুতরাতে শেকলের শব্দ অনেক-অনেক দূরে গেল৷ যেন মন্দিরটা ঝনঝন করে উঠল৷ যেন চারদিক থেকে কারা জিজ্ঞেস করে উঠল, এতরাতে নাটমণ্ডপের শেকল কে নাড়ে?
‘তুই ভেবেছিস আমার সামনে এসে দেখা না দিলে আমি তোর দিকে মুখ তুলে চাইব? কখনো চাইব না৷’
বলে আবার চুপ করে রইলেন৷ যেন কারও কথা শুনতে পাচ্ছেন, কে তাঁকে ছলনা করছে, কে দেখা না দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে৷ এককড়ির মনে মনে দুঃখ হতে লাগল৷ সবাই বলে ভবানীমন্দিরের দেবী জাগ্রত৷ শাঁখারির কাছ থেকে শাঁখা পরেছিলেন একদিন৷ আবার, রাজা রামকৃষ্ণ যখন পঞ্চমুণ্ডিতে আসন করতে বসেছিলেন, তখন একদিন তাঁর পাশে বসে বাতাস করে তাপ জুড়িয়ে দিয়েছিলেন৷
তাই যদি হবে, তাহলে একবারটি দেখা দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়৷
‘আমি তো জানি তুই এখানে থাকবি না৷ তাই তো মাকে স্বপ্ন দিয়েছিস যাতে বড়োনগরে তোর মন্দির হয়, তুই চলে যেতে পারিস৷ আমি তো ক্ষুদিরামকে যেতে দেব না, কিছুতেই যেতে দেব না৷ আগে আমি মনোমতো মন্দির করব তবে ও বড়োনগরে মন্দির করবে৷’
আবার যেন, থামের গায়ে কান রেখে কার জবাব শুনে নিলেন৷
‘আমার দুঃখটা বুঝি কিছুই না? রাজ্য চাই না, মাকে মনে দুঃখ দিই, সিংহাসনের দিকে ফিরেও চাই না৷ সবই তো তোর দিকে চেয়ে৷ তুই দেখ একবার দেখা দিয়ে বলে দে না কী চাস? কী বললি? মন্দির আমি গড়তে চাই না, সব ফাঁকি? মিছে কথা? কী করব বল, ওদের নকশা আমার পছন্দ হয় না৷’
এককড়ি এবার কান পেতে শুনতে লাগল৷ এতগুলো সুন্দর সুন্দর কথা একসঙ্গে সে কখনো শোনেনি৷ শব্দগুলো তার মনের পাতায় যেন ছবি এঁকে চলল৷ ‘আকাশ, চাঁদ, তারা, সূর্য, সব তোর বন্দনা করে৷ তোকে কেমন মন্দির গড়ে দেব যা দেখে তুই খুশি হবি, এসে বসবি? তুই যে সব কিছুর ওপরে, সব চেয়ে বড়ো৷’
বলতে বলতে রাজার শরীর কেঁপে উঠল৷ ‘মা গো!’ বলে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন৷
‘কেমন মন্দির চাস তোকেই বলে দিতে হবে৷ আর কারও কথা আমি শুনব না৷ চালাকি নাকি? এত করে ডাকছি তবু কানে যায় না!’
তখন কয়েকটি লোক ছুটে এল৷ সসম্ভ্রমে তাঁর হাত ধরে তাঁকে নিয়ে যেতে লাগল৷
‘ভারি চালাক! আমি বুঝি জানি না৷ কুমারহাটিতে রামপ্রসাদের মেয়ে সেজে তার বেড়া বেঁধে দেওয়া হয়েছে৷ কেন? সে গান গাইতে পারে বলে? গান গাইতে আমিও পারি৷’ সঙ্গে প্রৌঢ় লোকটিকে বলতে লাগলেন ‘ছেড়ে দাও আমায়, ছেড়ে দাও! আমায় স্বপ্ন দিয়ে বলেছে আমি রামকৃষ্ণের সামনেই প্রকাশ হব৷ একথা বলবার মানে কী? আমায় ছেড়ে দাও আমি ওর মুখে শুনতে চাই৷’
খুব কষ্ট হতে লাগল এককড়ির৷ যেন রতনকেই কেউ ধরে নিয়ে যাচ্ছে অমনি করে৷ রাজা রামকৃষ্ণ যেন রতনের মতোই অসহায়৷ কেমন মন্দির চাই তা তো রাজা বলেই দিলেন, তবু কেন কেউ ছবি এঁকে দেখান না৷ এককড়ি তাই ভাবল৷ ভাবতে ভাবতেই ঘুমোল৷
সকাল হল কাঁসি-ঝাঁঝর-মৃদঙ্গ-করতালের বোলে৷
এই এত বড়ো মন্দির, যেন দেবী ভবানীর সংসার৷ সকাল বেলা দাসীরা এসে মন্দির ধুয়ে দিল, পুরুতঠাকুর দেবীকে জাগিয়ে ভোরের আরতি করলেন৷
ততক্ষণে ওদিকে অতিথিশালা থেকে সাধু, সন্ন্যাসী, লোকজন বেরিয়ে এসেছে৷ কেউ স্নান করতে যাচ্ছে, কেউ হাতমুখ ধুয়ে তাড়াতাড়ি নাটমন্দিরে এসে বসছে৷ কেউ বিদেশি সাধু পেয়ে তার সামনে হাত পেতে বসেছে আর সাধু ছাইমাখা দেহে জোড়াসনে দুলতে দুলতে তার হাত দেখছে৷
ভাণ্ডারী দু-হাতে ধান-খই-ছোলার দানা ছড়িয়ে যাচ্ছে৷ যেখানে পায়রা, ঘুঘু, শালিক, চড়াই, টুনটুনি, ছাতারে পাখির ভিড়৷ পাখিদের মধ্যে ভাব হলেও যত গোলমাল, ঝগড়া হলেও তত৷
ওদিকে ফুল আসছে, মালা গাঁথা হচ্ছে, চন্দন বাটা হচ্ছে খট খট শব্দে৷ পুজোর সময় হয়ে আসছে৷ তাই পুরুতঠাকুর যত ব্যস্ত, সেবায়েতরাও তত৷
এককড়ির দিকে কেউ তাকাল না৷ বিরক্তও করল না৷ শুধু কালকের কীর্তনীয়াদের একজন বলল, ‘কাদের বাড়ির ছেলে অ্যাঁ! মা-র কোল খালি করে চলে এসেছ?’
এককড়ি জবাব দিল না৷ তার সদাই ভয়, কে তাকে দেখে ফেলে, কে তাকে ধরে পাঠিয়ে দেয় পিসির কাছে৷ তাহলেই সব চিত্তির! একবার পিসি আর গুরুমশায়ের খপ্পরে পড়লে আর বেরোনো যাবে না৷
পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে, সকালের জলপান খেয়ে সে বাইরে গেল৷ বাইরে শেরপুরের রাস্তার ধারে এক কোনে দোকান! কোনের দোকান থেকে সে দু-কড়ি চকখড়ি আর দু-একরকম মেটে ঢেলা রং কিনল৷ দুটো কড়ি তার গাঁটেই ছিল৷
কিন্তু নিশ্চিন্তে বসে যে আঁকবে, তেমন জায়গা কোথায়? নাটমন্দিরে তো লোকে গিসগিস করছে৷ আঁকতে বসলেই হয়তো মাড়িয়ে দেবে৷ অথচ ছবি তাকে আঁকতেই হবে৷ ছবি এঁকে দেখাতে পারলে তবে হয়তো রাজা তাকে ক্ষুদিরামের কাছে যেতে দেবেন৷ সেখানে একবারটি পৌঁছোতে পারলে তবে সাধ তার পূর্ণ হবে৷ নকল করা টালি দিয়ে মন্দির গড়তে পেলে তো সে ধন্য হয়ে যাবে৷
একবার যদি অবস্থাটা ফিরিয়ে ফেলতে পারে, তাহলে আর তাকে কে পায়৷ আর হেঁটো ধুতি, পুরোনো দোলুই নয়৷ এবার কোকিলপেড়ে ধুতি, গায়ে পিরান আর চাদর, পায়ে জুতো, মাথায় ছাতা৷ পালকি করে একেবারে সে চলে যাবে তাদের বাড়ির দোরগোড়ায়৷
পিসি বলবে, ‘কে?’
কাকি বলবে, ‘কে?’
রতন বলবে, ‘ও এককড়ি, বাড়ি এলি?’
সে কোনো কথা না বলে পালকি থেকে জিনিসপত্র নামাতে থাকবে৷ দেখে সবাই অবাক হয়ে যাবে৷ হয়তো-বা তার গুরুমশায়ও৷
মন্দিরের আশেপাশে ঘুরে দেখে, তার আঁকবার জায়গাই পছন্দ হয় না৷
শেষে দেখল, বাঃ বট-অশ্বত্থের পাশে, ওই যে বাঁধানো জায়গাটি, যাকে বলে পঞ্চমুণ্ডির আসন, সেখানেও বেশ ছবি আঁকা যায়৷
জায়গাটি বেশ ধুয়ে-মুছে নিল এককড়ি৷
তারপর পা মুড়ে আঁকতে বসল৷ বলরামদাদা যখন কালীর মূর্তি গড়ে তখন সে-ই তো পাশে বসে সব জোগাড় করে দেয়৷ উমুড়ির কাছারি বাড়িতে সে একবার কালীপুজো দেখেছিল৷ যেমন কুচকচে কালো রং তেমনি মস্ত উঁচু প্রতিমা৷ দেখলে যেন ভয় ভয় করে৷ তা ছাড়া, উমুড়িতে কী এক অদ্ভুত নিয়ম আছে৷
পুজো শুরু করবার আগে খুব উঁচু ঝাঁপের ওপর প্রতিমা বেঁধে শূন্যে গোটা গ্রামখানা ঘুরিয়ে আনতে হয়৷ আকাশের দিকে চেয়ে প্রতিমাকে দেখে নিতে হয়৷ তাই তাঁর এক নাম আকাশকালী৷
উমুড়ির কালীপ্রতিমা কেমন যেন ভয় জাগানো৷ বলরামকাকা যে শ্যামা প্রতিমা গড়ে তা দেখলে একটুও ভয় করে না৷ বেশ শান্ত মুখের ভাব!
এককড়ি সেই কথাটি মনে রেখে মাকে আঁকল শ্যামা৷ তারপর তাঁর পায়ের নীচে দিতে লাগল চাঁদ, সূর্য, তারা, রামধনু৷ সকলের উপরে তিনি, সবাই তাঁর পায়ের নীচে, একথাটি মনে রেখে লিখল, সৃষ্টির যত কিছু আছে বলে সে জানে৷ কতরকম পশু, পাখি, মাছ৷ হাটুরে হাটে যাচ্ছে, মা ছেলেকে দড়ির দোলায় ঘুম পাড়াচ্ছে৷ গোয়ালিনি গাই দুইছে, কুমোর চাকা ঘোরাচ্ছে, কলুর বলদ ঘানি টানছে৷ জলের মাছ লিখলে এককড়ি, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, নদী৷
সব থরে থরে লিখে সে এবার ভবানীমন্দিরের গল্প লিখতে লাগল৷ মন্দিরের পেছনে শাঁখারি শাঁখা বেচছে, দেবী শাঁখা পরছেন৷ পুরুত চেয়ে দেখছেন পুকুরের জলের ওপর দু-টি হাত৷ ভাণ্ডারীর কোমরে চাবির থোকা৷ আঙুল তুলে রাঁধুনিকে বকছে৷ এমনি আরও নানা ছবি৷ আঁকতে আঁকতে বেলা গেল৷ সে উঠে এল যখন, তখন নির্জন পঞ্চবটি পাখির ডাকে মুখর৷ সন্ধ্যে হবে তাই পাখিরা সব বাসায় ফিরছে৷
এককড়ি যখন নাটমন্দিরে এল, তখন ভাণ্ডারী বড়ো বড়ো মশাল বের করছে৷ মন্দির থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত পথের দু-দিকে মশাল পুঁততে পুঁততে চলেছে পাইক৷ রাতে মশাল জ্বেলে রোশনাই করে দিতে হবে, রাজা রামকৃষ্ণ বলেছেন, অনেক আলো চাই৷
‘আলো না হলে নাকি দেবীকে দেখতে পাবেন না,’ একজন পেয়াদা আস্তে বলল৷
আরেকজন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘তুমি যেমন! কাজ করতে এসেছ কাজ করে যাও৷ ওসব কথা শোনো কেন?’
‘বললেন যে!’
‘বলতাম ভাই, আমিও বলতাম৷ আমার যদি অমন লক্ষ কোটি টাকার রাজত্ব হাতে থাকত, রানিভবানীর মতো মা থাকত৷ তাহলে আমিও খোশখেয়ালের কথা বলতাম৷’
সন্ধ্যে বেলার শেতল খেয়েই এককড়ি ঘুমিয়ে পড়ল৷ কাল রাত জেগেছে আজ সারাদিন বিশ্রাম করেনি, সন্ধ্যে হতেই সমস্ত শরীর ঘুমে জড়িয়ে এল৷
সে জানতেও পারল না কখন রাজা রামকৃষ্ণ এসেছেন, কখনই বা তিনি পঞ্চবটির দিকে চলে গেলেন৷
এককড়িকে নিয়ে সবাই মাতামাতি, কাড়াকাড়ি জুড়ে দিল৷
রাজা মশালের আলোয় এককড়ির আঁকা ছবি দেখে চমকে উঠেছিলেন, তারপর ‘পেয়েছি, পেয়েছি’ বলে হাত তুলে যা শুরু করে দিলেন তাকে নাচ বললেই ভালো হয়৷
কী পেয়ে গেলেন রাজা? কী ছিল ওই পঞ্চবটিতলায়?
সবাই ছুটে এল৷ সবাই জানতে চায়৷
রামকৃষ্ণ তো হেসে বাঁচেন না৷ ‘ওরে, কে আমার কথা শুনে আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বল দেখি? এই যে অমন দেখে দেখে এঁকেছে, এ তো সত্যি৷ আকাশ যার চাঁদোয়া চাঁদসূর্যি যার পায়ের নীচে গড়াগড়ি যায় তার মন্দির করব আমি? কক্ষনো করব না৷’
‘সে কী কথা!’ সবাই অবাক৷ মাটিতে পড়ে যায় আর কি৷
কিন্তু রামকৃষ্ণ আর কিছুতে কোনো কথা শুনবেন না৷
একদিন তিনিই মন্দির মন্দির করে খেপেছিলেন, এখন তিনিই বলতে লাগলেন ‘এত বড়ো মন্দির কি করতে পারব যাতে ওই আকাশ, চাঁদ, সূর্যি সব ধরে?’
‘তা কখনো হয়?’
‘তাহলে মন্দির করবই না৷ তিনি তো এই গাছপালা, চাঁদ, তারা দিয়ে নিজের মন্দির গড়েই নিয়েছেন! আমার মা বোঝে না যখন, তখন ক্ষুদিরামকে দিয়ে দশটা মন্দির করাকগে যাক! আমি আর ওসব করছি না৷’
সবাই তাঁর হাসিমুখ দেখে অবাক মানল৷
‘এবার শুধু খাবদাব আর গান গাইব৷ দেখা দে বলে বসে বসে ঝগড়া করব৷ তাহলেই দেখা দিতে হবে৷ সোজা কথা? আমায় স্বপ্নে বললে, রামকৃষ্ণ আমার দেখা পাবে৷ তা আমি ছাড়া কি অন্য রামকৃষ্ণ আছে নাকি মায়ের নামে পাগল৷’
তারপর, নাটমন্দিরে এসে বললেন, ‘ডেকে আন৷ দেখি কে এমন ছবি আঁকলে?’
এককড়িকে দেখে তো তিনি অবাক৷
মুখের কথা থেমে গেল তাঁর৷ বার বার বলতে লাগলেন ‘শেষ অবধি এই টুকুন ছেলের কাছে জব্দ হলাম? সে আমায় বুঝিয়ে দিলে আমি ভুল করছিলাম? তাহলে তো বলতে হয় আমার ভীমরতি হয়েছে৷ তাহলে তো আমায় রাজত্বি ছেড়ে দিতে হয়৷ ও ভাণ্ডারী তুমি বলো না গো! তোমার তো বুদ্ধি আছে৷ বুদ্ধি আছে বলেই তো মা তোমায় ভাণ্ডারী করেছে৷ তুমি বলো না৷ এরপরেও কি আমার রাজত্বি রাখা উচিত?’
এককড়ি খুব আস্তে আস্তে বলল, ‘আপনি সেদিন যা যা বলেছিলেন আমি তো তাই এঁকেছি৷ তার বাইরে তো একটি জিনিসও আঁকিনি৷’
‘অ৷ তাহলে আমিই তো বুদ্ধি দিয়েছি, তাই না? তা বেশ৷ তা বেশ৷ তা বেশ৷ তা আমার তোকে বেশ লাগছে৷ চল৷ আমাদের সঙ্গে নাটোরে যাবি?’
যেন এককড়ি আর কিছু চাইতে পারে এরপর! নাটোরে যাবে এ তো তার চিরদিনের স্বপ্ন৷
ক্ষুদিরাম এককড়িকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল৷
তার হাতে বাটালি দিয়ে দেখল, নরুন দিয়ে নরম পাথর খুদিয়ে দেখল৷
তারপর বলল, ‘হবে, তোর হবে৷ আর দু-একটা লোক জোগাড় করে নিই, তারপর নকশা টালি দিয়ে এমন মন্দির গড়ে দেব যার জোড়া বাংলাদেশে কেউ দেখেনি৷’
শেষে এককড়ির ডাক অন্দরেও পড়ল৷
কিছুতে ছাড়বেন না রাজা৷ রানিও দেখতে চান, কে সেই ছেলে যার জন্যে রামকৃষ্ণ জেদ ছাড়লেন৷ এত মন্দির থাকতে আর এক মন্দির করে জেদ রাখতে গেলে ক্ষুদিরামকে নিয়ে আর বড়োনগর যাওয়া হত না৷
এককড়ি সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ করে চোখ বুজে রইল৷ বাপরে, রানির যেসব গল্প শুনেছে, চোখ তাকিয়ে দেখতে ভরসা হয় না৷
রানি দেখলেন সেই ছোটোবেলা, ছাতনা গ্রামে তাঁর যেসব খেলুড়ি ছিল তাদেরই মতো একটা হেঁটো ধুতি পরা গেঁয়ো ছেলে৷
খাড়া খাড়া কান দেখে তাঁর হাসি পেল৷
‘লেখাপড়া কদ্দূর?’ তিনি কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন৷
ঠিক পিসিমার গলা৷ এককড়ির কান্না পেল৷
‘বুঝেছি৷ তা কায়েতের ছেলে হয়ে এসব কাজে মতি গেল কেন?’
এককড়ি ফিঁচ করে একটু কাঁদল৷
‘কী চাস টপ করে বলে ফেল তো? চোখের জল পরে ফেলিস৷ শুধু কি ক্ষুদিরামের সঙ্গেই যেতে চাস, না আরও কিছু চাস?’
এককড়ি সাহস সঞ্চয় করে বলে ফেলল, ‘আমার কিছু চাই না৷ তবে পিসি বলে শীতলপাটি আর চন্দন পাখা চাই৷ তা ছাড়া একটা পেতলের কড়া৷ তা ছাড়া বটুক সেনকে চাই৷’
‘কেন?’
‘রতনার ভারি অসুখ যে৷ সেটি সারিয়ে দেবে৷ নইলে রতন মরে যাবে৷’
‘আর কিছু চাই না?’
রানিভবানীর খুব ইচ্ছে হল আরও কিছু চেয়ে নিক এককড়ি আরও কিছু বলুক৷
‘আমি কিছুই চাই না৷’
‘বেশ, আমার সঙ্গে আয়৷’
এককড়িকে নিয়ে চলতে লাগলেন তিনি৷ ঘরের পর ঘর, বারান্দার পর বারান্দা৷ সব পেরিয়ে গিয়ে তিনি মস্ত একটা ঘরে ঢুকলেন৷
তাঁকে দেখেই দু-পাশের মানুষরা সরে সরে যাচ্ছিল, এ-ঘরের মেঝেতে চুল এলো করে একজন বসেছিলেন, চাওয়া যায় না, এত রূপ৷
‘তোরা, বাইরে যা৷ দেখিস কেউ যেন আমায় বিরক্ত না করে৷’
তারা বাইরে গেলেন৷
তখন একটু নীচু হয়ে রানি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘উমুড়িতে তোর কাকা থাকেন বললি না? তা উমুড়িতে এখনও মেয়েরা পুজোর মাসে শিউলি কুড়োতে যায়? সবেশ্বর মামা এখনও ফেনিবাতাসা বেচে?’
‘হ্যাঁ৷’ এককড়ি অবাক৷
‘আমি ছোট্টবেলা একবারটি গিয়েছিলাম৷ সেই শেষ পুজোর ফুল কুড়োনো৷’ রানি গর্বভরে বললেন৷ চারদিকে চেয়ে বললেন, ‘কাউকে বলিস না৷’
এতক্ষণে এককড়ির মনে পড়েছে তার আরও কী চাই! সব ভুলে গিয়ে সে রানির আঁচল চেপে ধরল, ‘সেনমশায়ের পুজোর ব্যবস্থা করে দিতে হবে৷ আমি প্রতিমা গড়ে দিয়ে ভারি দোষ করেছি!’
জানালা দিয়ে সবাই অবাক হয়ে দেখলেন গেঁয়ো ছেলেটা মার কাপড়ের আঁচল ধরে কী বলে যাচ্ছে, মা শুনছেন৷ দেখে তাঁদের মুখে আর কথা সরল না৷
আমরা যতদূর জানি, বড়োনগরে রানিভবানী দ্বিতীয় কাশীই করেছিলেন৷ সেখানে মন্দিরে মন্দিরে নকশা-টালির কাজ ক্ষুদিরাম আর এককড়ি দু-জনেই করেছিল৷
এককড়ির পিসি বাকি জীবনটা চন্দন পাখাতেই বাতাস খেয়েছিল৷
আরও শুনেছি, পণ্ডিতমশায়ের বাড়ির দুর্গোৎসবের খরচ নিয়েও আর কোনো অসুবিধে হয়নি৷
এককড়ির সব সাধই একে একে পূর্ণ হয়েছে৷
