গল্প
উপন্যাস
জীবনী

চিতে ডাকাত – মহাশ্বেতা দেবী

চিতে ডাকাত

লবাত বড়ো আদরের ছেলে৷ এদিকে এক ছেলে, ওদিকে মামার বাড়িতে মামা, মামি, দিদিমা সবাই তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করে৷ এত আদরের ছেলের নাম লবাত কেন হল, তা বোঝা কঠিন৷ লবাত দেখতেও মন্দ নয়৷ ঘন ভুরু, মোটা ঠোঁট, জ্বলজ্বলে চোখ, ফর্সা রং, জন্মের সময় থেকেই ওর এত এত নাম রাখা হয়েছিল, কিন্তু লবাতের বাবা বলল, ‘কাল স্বপ্ন পেলাম বাবা বক্কেশ্বর চিৎকার করে বলছেন, ছেলেটির নাম রাখো গে নবীন চন্দর৷’

কিন্তু একটু বড়ো হবার পর থেকেই তাল-পাটালি বা লবাতের উপর নাতির টান দেখে তার দাদু বলল, ‘ওকে লবাত বলে ডাকবি৷’

সেই নামই রইল৷

কিছুকাল পরেই লবাতের স্বভাবের মিষ্টি গন্ধে কাদাই গ্রাম ম-ম করতে লাগল৷ বড়োই দুরন্ত ছেলে৷ বাতাসের আগে ছোটে৷ একটু বড়ো হতেই একদিন সে ভটচাজপাড়ার পাঠশালায় গেল৷

‘কে বাবা, লবাত চন্দর, এখানে কী মনে করে?’ ভটচাজমশায় লবাতকে মোটেই পছন্দ করেন না৷ বিশেষ করে ইদানীং ঘন ঘনই তাঁর গাছে ডাব চুরি করে খাচ্ছে৷ কাউকে কিছু বলতেও পারেন না৷ ঘোর সন্দেহ, তাঁর নিজের ছেলেটি, আর পাঠশালার অধিকাংশ ছেলেই লবাতের চেলা৷

‘আজ্ঞে, আমার বড়ো পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে৷’

‘তাই নাকি? তা বাবু, তোমার দাদুকে গিয়ে বলো তবে তোমাদের তাঁতিপাড়ায় একটা পাঠশালা বসিয়ে দিক! বামুনের ছেলেদের সঙ্গে বসে পড়া শিখবে? সেটি তো হবার নয়৷’

একথা শুনে লবাত দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘তবে তর্কচুঞ্চুমশায়ের কাছেই যাই৷ আপনি সেদিন বৃত্তি নেবার সময়ে ওঁর নামে সেনবাবুদের মুহুরির কাছে চুকলি খাচ্ছিলেন, সেটি বলে দিই গে৷’

লবাতের ওই আর একটা ভয়ংকর ক্ষমতা৷ যা যেখানে শুনবে, সে যদি পথের লোকের কথাবার্তাও হয়, তাহলেও সেটি সে আউড়ে যেতে পারে, কথা বুঝুক আর নাই বুঝুক, সবাই বলে, ও যদি উঁচু ঘরের ছেলে হত তাহলে লেখাপড়ায় রত্ন হতে পারত৷

লবাত দৌড় দিল৷ ‘ও লবাত, সামনে শুনে যা!’ বলতে বলতে ভটচাজমশায় ছুটে বেরোলেন বটে কিন্তু ততক্ষণে লবাত হাওয়া৷

লেখাপড়া শেখবার ঝোঁক লবাতের এমনি হয়নি৷ এই সেদিন শুনেছে বাবার কাছে বসে দাদু দুঃখ করছে, ‘পয়সা এখন কলকাতায়৷ নিদেনপক্ষে লেখাপড়া জানলেই এখন সেখানে কোম্পানির চাকরি৷ তাঁতের মাকু ঠকঠকিয়ে আর কী হবে? ঘরে তাঁতিরা জাতব্যাবসা তুলে দিচ্ছে, দেখছ না?’

‘এই বয়সে লেখাপড়া? তার চেয়ে দোরে দোরে ঘুরে গামছা বিক্রি করব৷’

‘যা করবে কর বাবু৷ বলে দিলাম দিনকাল অতি কঠিন হচ্ছে৷ কোম্পানির সাহেবরা আর কিছু বোঝে না৷ তারা শুধু বলে, লেখাপড়া শেখো, কাজ করে খাও৷’

‘সব হল ওই চিতে ডাকাতের জন্যে৷’

‘তা বটে৷ কোনোমতে ব্যাটাকে আঁটতে পারছে না৷ অমনি ডাকাতে ডাকাতে নাকি সব জায়গা ছেয়ে গেছে৷ সায়েবরা বলছে এত এত খরচ করে ডাক বসিয়েই বা কী লাভ হল৷ এখন যদি অনেক লোক লেখাপড়া শিখে হরকরার কাজ করত আর ঘন ঘন খবর দিত, তাহলে আর কোম্পানির এত খাজনা নষ্ট হত না৷’

এই কথা শুনেই লবাতের ইচ্ছে হল নিমেষে লেখাপড়াটা শিখে হরকরার কাজে লেগে যায়৷ তার কারণ আর কিছুই নয়৷ কাদাই থেকে বেরিয়ে কোম্পানির গোরস্থানের দিকে যেতে অনেক দিনই সে পবন হরকরাকে ঝুমঝুম করে ডাক নিয়ে যেতে দেখেছে৷

কোম্পানির হরকরাদের সাজের ঘটা খুব৷ কেমন ঘোড়া, গায়ে লাল জামা৷ মাথায় আড়াই প্যাঁচ পাগড়ি, হাতে উঁচু বর্শা৷ তাতে ঘুঙুর বাঁধা৷ ঘোড়ার পিঠে চামড়ার থলি, তাতে চিঠিপত্র থাকে৷ যখন টাকাপয়সা থাকে, তখন হরকরার সাথে আগে পেছনে দু-জন বরকন্দাজ যায়৷

তাই লবাত সাততাড়াতাড়ি পাঠশালায় গিয়েছিল৷ কিন্তু তাঁতির ছেলের লেখাপড়া করবার কথায় ভটচাজমশায় আমল দিলেন না বলে তার রাগ হল৷

পেছনে ঘাসজমিতে ভটচাজমশায়ের যে ক-টা গোরু বাঁধা ছিল সে ক-টাকে খুঁটো উপড়ে লবাত তাড়িয়ে দিল, তারপর সেখান থেকে সিরিদত্ত সেনদের আম বাগানে ঢুকে দেখল গাছের গায়ে গায়ে ঢ্যারা কাটা৷ ভবানী চৌবশ বা সাদৌলায় এখনও রং ধরেনি৷

নবাবদের বোলবোলাও শেষ হয়ে কোম্পানির লাট নামে না হোক কাজে সর্বেসর্বা হয়েছে বছর দশেক হল৷ সেনরা ভারি লেখাপড়া জানা লক্ষ্মীমন্ত বংশ৷ কোম্পানির সামনে তাদের শ্রী, লবাতের মার ভাষায় ‘চচ্চড়িয়ে বাড়ছে৷’ আম বাগানের ভেতর দিয়ে সুঁড়ি পথ ধরে বেরোতেই নবাবদের রেশম কুঠি, তুঁতের বাগান৷ এখন কেমন হতশ্রী চেহারা৷ অথচ লবাত তার দাদুর কাছে শুনেছে একসময় মুর্শিদাবাদ, সৈদাবাদ, জিয়াগঞ্জ, ওদিকে মালদহ সর্বত্র তুঁতের চাষ আর পলু পোকার কুঠি ছিল৷ তখন রেশমের চাষ থেকে হাজার হাজার লোক ভাত-কাপড় পেত৷

লবাত জানে দাদামশায়ের কাছে এখনও উৎকৃষ্ট একটি রেশমের থান আছে৷ সেটা নাকি দাদুর দাদু, তস্য দাদুর বোনা৷ আরও জানে দাদামশায়ের ভারি ইচ্ছে সুবিধেমতো একবার কোম্পানির বড়োলাটকে থানখানা দিয়ে সুবিধে আদায় করে নেয়৷

ভাবতে ভাবতে রেশমকুঠির জংলা মাঠ, পুরোনো কুঠি সব পেরিয়ে লবাত বানঝাটিয়ার রাস্তায় সায়েবদের গোরস্থানে পৌঁছে গেল৷ গোরস্থানের বাইরে দিব্যি বসবার জায়গা, এই বড়ো বড়ো গাছ৷ সেখানে শুয়ে শুয়ে চোখ বুজে লবাত ভাবতে লাগল, কতক্ষণে ঝুনঝুন শব্দটা থামে৷ এই রাস্তা দিয়ে একটু বাদে পবন হরকরা আসবে, রোজই আসে৷

আসে, এই গোরস্থানের মালী আর পাহারাদারের সঙ্গে কথা বলে, তামাক খায়৷ পবনের ভারি দেমাক৷ কোম্পানির চাকর ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলে না৷ কিন্তু দিব্যি মোটাসোটা একটা কাঠবেড়ালি তুরতুরিয়ে গাছের গায়ে কেমন করে উঠছে তাই দেখতে দেখতে লবাত ভাবল তার দাদামশায় আর বাবা, কারোই বুদ্ধি নেই৷ হরকরা হওয়া যেন ভারি আরামের কাজ! চিতে ডাকাত তো কোম্পানির হরকরাদেরও পারলেই মেরে-কেটে টাকা লুঠ করে৷

তবু, পবন হরকরার কী সাহস! ওকে কেউ মারতে পারে না৷ মাত্র দুটো বরকন্দাজ সঙ্গে, তোড়াবন্দি টাকা নিয়ে ও কেষ্টনগর থেকে মুর্শিদাবাদ স্বচ্ছন্দে চলে আসে, অথচ ওটাই হল চিতে ডাকাতের আসল ঘাঁটি৷ এই কেষ্টনগর আর মুর্শিদাবাদের মাঝামাঝি জায়গা৷ হবে না কেন, এই সব জায়গায়, নবাবদের আমলে কত যে আম বাগান, কুঠিবাড়ি, বাগানবাড়ি, জলটুঙ্গি হয়েছিল তার লেখাজোখা নেই৷ এখন কি আর সেদিন আছে! পয়সা তো কোম্পানির হাতে আর কিছু কিছু রাজা জমিদারের হাতে৷ এসব জায়গায় ঘোর জঙ্গল৷ দিনমানে বাঘ ঘুরছে সাপ বেড়াচ্ছে, যেমন ওই রেশমকুঠিতে৷ চিতে ডাকাত তার দলবল নিয়ে এসব জায়গায় যে ঘাপটি মেরে থাকবে তাতে আর আশ্চর্য কী!

চিতে ডাকাতের অত্যাচারে এখন সবাই ব্যতিব্যস্ত৷ লবাতদের ভাবনা নেই, কেননা তাদের ঘরে চুরি করার মতো নেইও কিছু৷ দাদামশায়ের ঘরে কাঠের সিন্দুকের নীচে পোঁটলার মধ্যে নিমপাতা কর্পূরে জিইয়ে রাখা রেশমের খাসা থানখানার কথা তো চিতে জানে না৷

যেখানে ডাকাতি করে সেই সেখানেই চিতে ডাকাত একখানা কাগজে চিতাবাঘের থাবার ছাপ রেখে আসে৷ সবাই জানে চিতে ডাকাত আসলে মহা ফুলবাবু৷ একবার নাকি কাশিমবাজারের রাজবাড়িতে ছড়ি ঘুরিয়ে দিব্যি রাসের মেলা দেখে এসেছিল৷ রাজবাড়ির প্রসাদও খেয়েছিল৷ তারপর চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছিল, ‘প্রসাদের সন্দেশে পিঁপড়ে থাকলে মান্যগণ্য অতিথিদের না দেওয়াই উচিত৷ চিতুবাবু৷’

কাশিমবাজারের রাজবাড়িতে রাসের সময় মহা ধুমধাম হত৷ তত লোকের মধ্যে কোন লোকটা চিতুবাবু তা কে বলবে৷ কিন্তু কোনো একটা ঘটনা হলেই যারা পরে গল্প ফেঁদে বসে তারা এসে বলল, ‘যখনই দেখেছি ইয়া গালপাট্টা, ইয়া মোচ, আর থেকে থেকে হাঁকুর (গর্জন) দিচ্ছে, তখনই জেনেছি ইনি আর কেউ লয়, ইনি চিতুবাবু৷’

এই সব ভাবতে ভাবতে লবাত বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ হঠাৎ ‘বিষুৎবারে সাঁঝের দিকে!’ কথা শুনে চমকে উঠল৷ মিটমিট করে চেয়ে বুঝল সে এদিকে কথা হচ্ছে-গোরস্থানের পাঁচিলের ভেতরে৷

আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে সে পাঁচিলের ফোকর দিয়ে দেখতে লাগল৷ পবন হরকরাই বটে৷ একটা চৌকিতে বসে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে তামাক খাচ্ছে৷ এদিকে গোরস্থানের মালী আর চৌকিদার তার পায়ের কাছে হাতজোড় করে বসে আছে৷

‘এবারই শেষ৷ সায়েবরা সব টের পেয়ে গেছে৷’

‘আজ্ঞে৷’

‘এদিকে দুর্লভ রায়, ওদিকে ভ্যানসিটার্ট সায়েব, দু-জনে এখন হরকরাদের ধরে ধরে জবানবন্দি নিচ্ছে৷’

‘আজ্ঞে!’

‘আমি তো দেখে এলাম ভ্যানসিটার্ট আর লরেন্স সায়েব হবু বাগদিকে ডেকে পাঠিয়েছে রাস্তার দু-দিকে কোথায় কোথায় কুঠি আছে হিসেব-টিসেব নিতে৷’

‘হবু বাগদি নিজেও একসময় টেঁটা লেঠেল ছিল৷ ওর দলটা ভেঙে গেলে কী হবে, সব খবর রাখে৷’

‘তাই তো এবার লরেন্স সায়েব বলল, পবন বিষ্যুৎবার তোমার সঙ্গে প্রচুর টাকা থাকবে৷ তুমি চার জন বরকন্দাজ নাও, হবুও সঙ্গে থাকবে৷’

‘তার মানেটা কী বুঝতে পারছ? পবন এবার নিকেশ! একেবারে মরতে হবে৷’

‘তা কেন, সুবিধেমতো যদি ওদের বাগিয়ে ফেলা যায়?’

‘তাহলে একমাত্র হতে পারে বটে৷ তারপর লালগোলার ওধারে পদ্মা পেরিয়ে পালালে পরে আর ভাবনা কী!’

‘কিচ্ছু না, কিচ্ছু না, কিচ্ছু না! আপনি বিষ্যুৎবারের জন্যে ভাববেন না৷ আমরা প্রাণ দিয়ে যা হয়…৷

‘আরে বোকা, প্রাণ যদি দিবি তবে রেশমকুঠির কবরখানায়-‘

‘সোজা কথা নয়, তিন হাজার…’

এই পর্যন্ত শুনেই লবাত হেঁচে ফেলল৷

‘কে রে!’ পবনের গলার হাঁকে একেবারে সবসুদ্ধ কেঁপে উঠল৷ কবরখানায় যত যত পুরোনো কবর ছিল সে সবও৷

‘আজ্ঞে আমি লবাত৷’

‘বটে! তবে এখানে কেন, অ্যাঁ? আড়িপাতা হচ্ছে! দাঁড়া, তোকে দেখাচ্ছি!’

গোরস্থানের মালীকে ধমক দিয়ে পবন বলল, ‘থাম বাবু!’

লবাতকে বলল, ‘তুই কাদের ছেলে?’

‘আজ্ঞে তাঁতিদের৷’

‘তবে এখানে কেন?’

মহামান্য পবন হরকরাকে আর জীবনেও এমন সামনাসামনি পাবে কি না তা তো জানে না লবাত, তাই কপাল ঠুকে বলে ফেলল, ‘আজ্ঞে আপনাকে দেখবার জন্যে’৷

‘দেখবার জন্যে? ছেলেটা বলে কী, অ্যাঁ?’

পবন তার মাথার পাগড়ি আর হাতের বর্শা কাঁপিয়ে হাসল৷

‘আমাকে দেখে কী হবেটা কী, শুনি?’

‘আজ্ঞে, আমারও হরকরা হবার ইচ্ছে৷’

‘তাই নাকি? বেশ ভাই, বেশ৷’ পবন লবাতের ওপর হাতের গুলি টিপেটুপে দেখতে দেখতে বলল, ‘বুদ্ধিটা তো তোর ভালোই আছে, কিন্তু শুধু বুদ্ধিতে কি হরকরা হওয়া যায় রে বাবা! শরীরে চাই মাংস৷ রোজ হাঁস খাবি, জানলি? ফাঁদ পেতে ডাহুক ধরবি, হাঁস ধরবি, মাংস খাবি, আর হ্যাঁ, দশ-পঁচিশটা করে বৈঠকি মারবি৷ তারপর তোকে আমার চেলা করে নেব৷’

পবন শরীর কাঁপিয়ে আর একবার হাসল৷ তারপর লাফিয়ে তার ঘোড়ায় চড়ল৷

লবাত সুখের সাগরে যাকে বলে চিতসাঁতার দিতে দিতে ফিরল৷ চারিপাশে টুলো পণ্ডিতদের বাড়ি, এখানে পাখি ধরে মাংস খাওয়া অসম্ভব৷ তা ছাড়া কোনো কিছু ধরে মেরে খেতে লবাতের গা ঘিনঘিন করে৷ সে যা হোক৷ অতবড়ো একটা লোকের মুখের কথা পাওয়া চারটিখানি কথা নয়৷ ছেলেদের একবার কাছে পেলে হয়৷ ভালো করে সে শুনিয়ে দেয় সব৷

ছেলেদের সঙ্গে কথা বলবার সময় হল সেই দুপুরে৷ খাওয়াদাওয়া মিটে গেল ঘরে ঘরে৷ টোলের পণ্ডিতমশায়রা তর্কচুঞ্চুমশায়ের বড়ো ঘরের মেঝেতে বসে এই এত তুলোট কাগজে আঁক কষেন, আর চশমাআঁটা চোখ তুলে ঘরের চালের দিকে চেয়ে হিসেব কষেন চন্দ্রগ্রহণ কবে হবে, আগামী বছর বিষ্টি হবে না অজন্মা, এই সব!

কাদাই-এর পণ্ডিতরা, নৈহাটি-ভাটপাড়ার পণ্ডিতরা, নবদ্বীপ আর কাটোয়ার পণ্ডিতরা তাঁদের গণনার ফল একত্র করে তবে পাঁজি লেখেন৷ যাঁদের বুদ্ধি আছে তাঁরা সেই সব পাঁজি শিষ্যদের দিয়ে নকল করিয়ে রাজা জমিদার বা রাজপুরুষদের কাছে বিক্রি করেন৷ যদিও এসব টাকাপয়সা বাগিয়ে নেবার বুদ্ধি পণ্ডিতদের বড়োই কম৷ কোম্পানির সাহেবরা কলকাতায় নিয়ে যাবার জন্যে পণ্ডিতদের কী খোশামোদটাই না করে৷ করলে কী হবে! এমনকী নৈহাটি-ভাটপাড়ার পণ্ডিতরাও যেতে চান না৷

কলকাতায় গেলে তাঁদের মন, শরীর কিছুই টেকে না৷ স্বাস্থ্যও খারাপ হয়৷ সায়েবদের দেওয়া টাকা নিলে অধর্ম হবে বলে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে চলে আসেন তাঁরা৷ পাটনাই মাঝিদের নেংটিপরা ছেলেগুলো জলে ডুব দিয়ে টাকা মোহর তুলে নেয়৷

নেহাত দরকার পড়লে সায়েবরাই পণ্ডিতদের কাছে আসেন৷

দুপুর বেলা পণ্ডিতরা ঘন ঘন হুঁকো টানতে টানতে আঁক কষতে লাগলেন৷ তাঁদের গিন্নিরা কর্তাদের বিদায় করে, ছাত্রদের খাইয়ে নিজেদের ছেলেদের, আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী এমনকী গোরু-ছাগলদের অবধি খাওয়াদাওয়া মিটিয়ে নিজেরা খেয়েদেয়ে উঠোনের গাছতলায় গিয়ে বসলেন৷

সেখানে তাঁদের পাঠশালাতেও কম ভিড় নয়৷ ছোটো ছোটো বউরা মেয়েরা এসে বুড়িদের কাছে এমাসে কী কী ব্রত করতে হবে, কেমন করে তিল-সুক্তনি রাঁধতে হয়, এসব শিখতে লাগল৷ গিন্নিরা তকলিতে সুতো কাটতে কাটতে জাঁতিতে সুপুরি কুচোতে কুচোতে গল্প করতে লাগলেন৷ একেবারে ছোটো মেয়েরা বড়োদের পান, জল দিতে লাগল, পা টিপে মাথার পাকাচুল তুলে সেবা করতে লাগল৷

লবাতের পাঠশালা মেয়েদের আম বাগান৷

আমের রাজা কোহিনুর৷ সেই গাছের ডালে বসে লবাত তার চেলাদের সকালের সব কথা খুলে বলল৷ ঠিক যা যা কথা হয়েছে সব বলে-টলে বলল, ‘এই বিষ্যুৎবার আমি ঠিক বুঝতে পারছি একটা কিছু হবে৷’

‘কী হবে?’

‘চিতে ডাকাত পবনকে ধরবে৷’

ছেলেদের মধ্যে ভয়ের শিহরণ খেলে গেল৷

‘তোরা সবাই এক একটা যাচ্ছেতাই৷ এখন আমাদের কী করতে হবে বল তো?’

‘তুই-ই বল!’

লবাত বলতে লাগল৷ পণ্ডিতদের ছেলেরা শুনতে লাগল৷ শুনতে শুনতে তাদের চোখ চড়কগাছ হবার দাখিল৷

‘কিন্তু অতগুলো লাঠি কোথায় পাব?’

‘কেন তোর বাবা, পঞ্চুর জ্যাঠা, কেলের কাকা, কার ঘরে আঁটি বাঁধা বেত নেই শুনি?’

‘তাতে কি চিতে ডাকাত ভয় পাবে?’

‘পাবে রে পাবে! ওদের ভড়কি দিয়ে আমরা শুঁড়ি পথ দিয়ে হাওয়া হয়ে যাব৷ ততক্ষণে পবন হরকরা পালাবে এখন!’

কিন্তু সেখানেই থেমে থাকবে, লবাত সে ছেলে নয়! বানঝাটিয়ার কাছে সায়েবদের যে নতুন মশলাকুঠি হয়েছে, সেখানকার ক্ল্যারেন্স সায়েবকে সে চেনে৷ ক্ল্যারেন্স সায়েবের বাপকে তার দাদামশায় চিনত৷ সেই সুবাদে মাঝে মাঝে তার দাদামশায়ের সঙ্গে সে ওখানে গিয়েছে৷

ক্ল্যারেন্স দিব্যি বাংলা বোঝে৷ লবাত ওকে মাছ ধরার টোপ তৈরি করে দিয়েছিল দু-বার, শজারু, খরগোশ ধরবার ফাঁদ করে দিয়েছিল সাঁওতালদের কাছ থেকে, তারপর থেকে সায়েবদের সঙ্গে ওর চেনাশোনা হয়ে গেছে৷

এখন তার কাছেই চলল লবাত৷ নিজেদের বেত বিছুটির ওপর ভরসা করে এতজনকে নিয়ে যাচ্ছে না সে৷ সায়েবের কাছে একটা বন্দুক আছে৷ সায়েব এবং বন্দুকের ওপর লবাতের অসীম ভরসা৷ পবনের এ বিপদে সাহায্য করলে তবে হয়তো পবন সায়েবদের বলে-টলে তাকে হরকরা করে দেবে৷ বিপদের সময়ে লবাত প্রাণ বাঁচালে পবন তাকে কী বলবে লবাত তাই ভাবতে লাগল৷

পবন লবাতকে বলল, ‘হতভাগা যেমন ছুঁচো, তেমনি বজ্জাত, সেদিন কেন নিকেশ করে দিইনি তাই ভাবছি৷’

বানঝাটিয়ায় ক্ল্যারেন্স সায়েবের বাংলোর উঠোনে৷ হবু বাগদি আর তিন জন বরকন্দাজের সাধ্য কী পবনকে ধরে রাখে! পাহাড়ি সাপ যেমন বেতের বাঁধন কটমট করে ভাঙে, মনে হল পবনও আষ্টেপিষ্টে দড়ির বাঁধন তেমনি করেই ছিঁড়বে৷

পবনকে বাঁধাছাঁদা অবস্থায় দেখে লবাতের কীরকম কষ্ট হচ্ছিল তা বোঝানো যায় না৷ নেহাত বোলতার কামড়ে তার মুখখানা ফুলে ঢোল তাই বোঝা যাচ্ছিল না৷

ক্ল্যারেন্স লবাতের পিঠ চাপড়ে বললে, ‘বাহাদুর ছেলে৷’

তারপর ভ্যানসিটার্ট, দুর্লভ রায় আর বেশ কয়েক জন প্ল্যানটার সায়েব যেখানে বসে জটলা করছিল ক্ল্যারেন্স সেইখানেই গেল৷

‘নাঃ, ছেলেগুলো না থাকলে আজ আমাদের চিতু ডাকাতকে ধরতে হত না৷’

‘পবনই যে ডাকাতদলের মাথা, আসলে চিতু রায় তা কেমন করে বুঝেছিলে?’

আর কেমন করে! পবন যেদিন থেকে নিজেকে অতিরিক্ত চালাক ভাবতে শুরু করল সেইদিনই হল সর্বনাশ৷

ভ্যানসিটার্ট বলল, ‘যা চুরি হয় সব হরকরাদের টাকা, অথচ পবনের গায়ে আঁচটি লাগে না৷ এই দেখেই আমার সন্দেহ হয়৷ তবে ও যে এত বড়ো দুঃসাহসী হবে যে, আজকের ডাকাতিটার সময়ে হরুদের মেরে রেখে টাকা নিয়ে লালগোলায় পালাবার মতলব আঁটবে তা কিন্তু আমি বুঝিনি৷’

‘আমাদের নাকের ডগায় রেশমকুঠিতে চোরাই মাল রাখবে আর আমাদেরই গোরস্থানের মালী আর চৌকিদারকে ওর দলে রাখবে তাই বা কে ভেবেছিল?’

‘অবশ্য আমরা আসছিলাম পেছন পেছন৷ সামনে ওরা পৌঁছোতে-না-পৌ^ঁছোতে যে ওর সেথোরা লাফিয়ে পড়বে, ওদিক থেকে ছেলেগুলো ওর সেথোদেরই পেটাবে, আর তুমি শূন্যে বন্দুক দাগবে তাই বা কে ভেবেছিল?’

‘তবু কিছু হত না হে, লবাত যদি পবনের চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে ওর উপকার করছে মনে করে হরুর হাতে না দিত৷’

‘পবন ও ব্যাগটা ফেলে দেবার চেষ্টাই করেছিল৷’

‘হ্যাঁ৷ পবনের সেই ব্যাগেই ছিল এক তাড়া কাগজ, তাতে চিতাবাগের থাবার ছাপ দেওয়া৷ ডাকাতিটি করে, কাগজটি রেখে সে সরে পড়ত৷ লবাত দেখল চারদিকে সাহেব, বন্দুক ফাটছে, এর মধ্যে পবন হরকরার ব্যাগটা গড়াগড়ি যাচ্ছে৷ তাই তো ঝাঁপিয়ে সেটা কুলঝোপ থেকে তুলতে গিয়ে বোলতার চাকের মধ্যে পড়ল৷’

পবনকে ঘরে বন্দি করা হল৷ সেই সঙ্গে তার সঙ্গীসাথিদেরও৷ কান টানলে মাথা আসে বলে তো কথাই আছে৷ তা দলের মাথা পবন যখন ধরা পড়ে গেল তখন আর তার সঙ্গীসাথিরা দলের অন্যদের নাম বলবে না কেন? তারা নামধাম সব দিল৷

বেশ কয়েকটা ডাকাতির টাকা পুরোনো রেলকুঠিতে পাওয়া গেল৷ সশরীরে চিতাবাঘকে ধরবার জন্যে ভ্যানসিটার্ট আর দুর্লভ রায়ের খুব নাম হল৷ এমনকী কোম্পানির লাট বলল, এখন থেকে শান্তিরক্ষার জন্যে জেলায় দেশি পুলিশও রাখা হবে৷

আর লবাত?

লবাতের আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি আর সব কথা ঠিক ঠিক ক্ল্যারেন্সকে বলে দেওয়াই কিন্তু ডাকাত ধরা পড়বার মূলে৷ তাকে সবাই প্রশংসা করলে কী হবে, বোলতার কামড়ে জ্বরে ভুগে ভুগে লবাত এই টিংটিঙে গঙ্গাফড়িং হয়ে গেল৷

‘কোম্পানির লাট’ হেস্টিংস সায়েব যখন কানাত ফেলে দরবার করলেন গোরস্থানের পেছনের মাঠে, ততদিনে লবাত অন্ন পথ্য করেছে৷

কানাতে যাবার সময়ে লবাত ওর দাদামশায়ের সেই রেশমের থানটাও সঙ্গে নিলে৷

‘কি লবাত, কোম্পানির হরকরা হবে?’

মুনশির প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে কুটিপাটি৷ কিন্তু লাটসাহেব বললেন, ‘লবাত, আমি খুব খুশি হয়েছি৷ এখন আর শুধু শক্তি খাটালেই হবে না৷ বুদ্ধিও চাই৷ বুদ্ধির যুগ পড়েছে৷ বুদ্ধির জোরেই তুমি এত বড়ো কাজটা করলে৷’

কথাগুলো তো চমৎকার! কিন্তু পবনের বাঁধাছাঁদা চেহারা মনে পড়লে যে এখনও কান্না পায়৷

‘তোমার কি হরকরা হবার ইচ্ছে আছে?’

‘না৷’ লবাত জোরে জোরে মাথা নাড়ল৷ তারপর রেশমের থানটি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দাদামশায়ের তাঁত চলে না কেন? এসব থান দাদামশায়ের বুড়ো কর্তাদাদার বোনা৷ দাদামশায় সুতো আর তাঁত পেলে এখনও এ থান বুনতে পারবে৷’

‘পারেই তো! আর এ জেলায় রেশম-তাঁতিদের তাঁত যাতে বন্ধ না হয় তা আমি দেখছি৷’

সত্যি দেখবে, না কলকাতায় গিয়ে ভুলে যাবে, একথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলেও সে জিজ্ঞেস করল না৷ হাজার হোক লাটসায়েব৷ যদি রেগে যায়৷ দাদামশায় বলে লাটসায়েব যার ওপর রাগে, তার বাস্তুভিটেয় নাকি বেগুন চাষ হয়৷ কে জানে তার মানে কী!

‘তুমি কী চাও?’

‘আজ্ঞে, টোলে পড়তে চাই৷’

‘সে কী, হরকরা হতে চাও না?’

‘না, টোলে পড়তে চাই৷ ক্ষুদিরামের বাবা আমায় সেদিন হেনস্তা করে তেইড়ে (তাড়িয়ে) দিলে৷’

‘হোআট! তোমার মতো ছেলেকে হেনস্তা?’

রেগে হেস্টিংস বারকয়েক কান আর নাক চুলকোলেন৷ অমনি নাক চুলকোতে চুলকোতেই ওঁর মনে বুদ্ধি আসে, আর সেই বুদ্ধির জোরে একদিনের পান্তাখেকো সায়েব থেকে বড়লাট হয়েছেন৷ পান্তা খাওয়ার গল্প সত্যি নাকি লবাতের জানতে ইচ্ছে হল, সাহস হল না৷

‘তুমি কোম্পানির মুনশির কাছে ফারসি পড়বে, ক্ল্যারেন্সের কাছে ইংরাজি৷ ইচ্ছে হলে তুমি একদিন মুনশি হবে৷’

আর লবাতকে পায় কে? মুনশি নবকৃষ্ণের কোমরে এই মোটা জরির পেটি, মাথায় সাচ্চা পাগড়ি৷ এসব পেলে হরকরা হতে কে চায়! একগাল হেসে সে সাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ করল৷

লবাত আর তার বন্ধুরা সবাই একটা করে নতুন কাপড় আর এক হাঁড়ি মিষ্টিও পেল৷

তা ছাড়া ক্ল্যারেন্স নিজে মস্ত একটা সিধে পাঠিয়ে দিলে লবাতের বাড়ি৷

যত সব টুলোপণ্ডিতরা লবাতকে আশীর্বাদ করতে এলেন৷ এমনকী ভটচাজমশাই পর্যন্ত৷ মনের খুশিতে লবাতের দাদামশায় একটা গান অবধি বেঁধে ফেলল৷

রাত্তিরে অনেকক্ষণ অবধি, যতক্ষণ না পাড়া প্রতিবেশীর কানের পরদা ফাটে, ততক্ষণ অবধি লবাত আর বন্ধুরা সেই গান গাইল৷ আনন্দের আর সীমা রইল না৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *