গল্প
উপন্যাস
জীবনী

গোরু একটি গৃহপালিত জন্তু – মহাশ্বেতা দেবী

গোরু একটি গৃহপালিত জন্তু

সুলতার শখ ছিল কুকুর পুষবে কিন্তু রমেশবাবু গোরু কেনবার জন্য খেপে উঠলেন৷ দারুণ তর্ক হয়ে গেল দু-জনের৷ রমেশবাবু অবিশ্যি প্রোফেসার কিন্তু সুলতাও বি.এ. পাশ৷ সুলতা বলল, ‘একটা কুকুর থাকবে৷ সঙ্গে নিয়ে বেড়াতেও বেরোব, চোর এলে তাড়াবে কত ভালো বলো তো!’

‘আর কিনব দেড়শো টাকা দিয়ে-মাসে মাসে চল্লিশ টাকা-কুকুর তো দুধ দেবে না৷’

‘গোরুর খরচ নেই?’

‘কিন্তু সুবিধে কত বলো!’

এইসব বাকবিতণ্ডার পর রমেশবাবু গোরু কিনে ফিরলেন একদা৷ বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন গোরু, রং ফর্সা, চোখ ট্যারছা এবং ল্যাজ বাঁকানো৷ গোরুর ভূতপূর্ব মালিক বনমালী বলল, ‘মা আসুন, সিঁদুর তেল দিয়ে বরণ করে তুলুন৷

সুলতা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসতে-না-আসতে গোরু আশ্চর্যরকম ক্ষিপ্র-গতিতে লাফ মেরে ডাক্তারগিন্নির হাতের কুমড়োডগাটি টেনে নিয়ে উঠোনে শুয়ে পড়ল৷ তারপর বনমালী, ‘ওঠো বাবা ওঠো’ বলে গায়ে হাত বুলোতেই বিদ্যুৎবেগে শিং বাঁকিয়ে বনমালীকে তাড়া করে গেল গোরু৷ এ পর্যন্ত কোনো গোরুর আচরণ এরকম দেখেননি বলেই বোধ হয় রমেশবাবু হতভম্ব হয়ে তাকিয়েছিলেন৷ বনমালী তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল৷ পেছনে পেছনে পাড়াপড়শিরাও৷

রমেশবাবুর দিকে একবার তাকিয়ে সুলতা চলে গেল ভেতরে৷

রমেশবাবুর ধারণা ছিল, গোরু থাকবে গোরুর মতো, শান্ত ব্যক্তিত্ববিহীন৷ উঠোনে বাঁধা, খড় খাবে, এবং দুধ দেবে৷ বরঞ্চ তা-ই দেখেছেন তিনি অন্যান্য গোরুদের মধ্যে৷ তা ছাড়াও যে গোরুদের বুদ্ধি আছে, বলার আছে এবং সক্রিয় হবার ইচ্ছা আছে এভাবে ভাবেননি কখনো৷ কিন্তু মঙ্গলার একটি চিন্তাশীল মন ছিল৷ মঙ্গলা তার মাকে, এবং তাদের সমগোত্রীয় সব গোরুকেই দেখেছে বরাবর গোজাতীয় সবরকম কর্তব্য সুসম্পন্ন করে পটাপট মরে যেতে৷ বনমালী সুযোগ পেলেই মারধোর করত বলে সেখানে কাবু ছিল মঙ্গলা৷ রমেশবাবু আর সুলতাকে দেখেই সে বুঝল, এরা হচ্ছে অত্যন্ত গোবেচারা এবং ভালো মানুষ৷ এবং প্রথম থেকেই ঠিক করল, এদের ওপর তাকেই ওপর-হাত রেখে চলতে হবে৷ দুপুরে খাওয়াদাওয়া ভালোই হয়েছিল৷ খড়, খোল, ফ্যান ইত্যাদি৷ হাজার হলেও শিক্ষিত তো! বিকেলের দিকে তারই পুরোনো মনিব বনমালী যখন বালতি নিয়ে এল তখনই মেজাজ চড়ে গেল মঙ্গলার৷ দুধ দোহানো শেষ হতে, বনমালী যখন হাসিমুখে বোকা বোকা চেহারার বউটাকে বলল, ‘দেখুন মা, একেবারে তিন সের,’ রমেশবাবু পর্যন্ত নেমে এলেন দেখতে৷ তখন মঙ্গলা পেছনের পা দিয়ে বালতিটা ফেলে দিল৷ সমস্ত দুধ গেল গড়িয়ে৷

‘ও মা! আহা-হা অতখানি দুধ! লক্ষ্মীছাড়া গোরু-‘

এসব শুনে যে ভালো লাগবে না মঙ্গলার, সে তো বলাই বাহুল্য৷ সুলতাকে দেখেই সব থেকে খারাপ লাগল, তার এতটুকু শিক্ষা নেই! দুধ পড়ে গেছে বলে চ্যাঁচাচ্ছে দেখো না৷ মঙ্গলা সুলতার কাছে উঠে এল বারান্দায়৷ এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল তাকে৷ তাতেই একটা শোরগোল শুরু হয়ে গেল৷ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে চলে গেল মঙ্গলা! উঠোনে লাল রঙের একটা সিল্কের ব্লাউজ ছিল৷ এইরকম লাল রংটা বরাবরই মঙ্গলার পছন্দ৷ ভিজে থাকতে থাকতেই খেয়ে ফেলল সে৷

দুপুর বেলা সুলতার বিলাপ কান্নাকাটির পর্যায়ে গিয়ে উঠল৷

‘ওগো ওটা যে আমার শখের জামা গো!’

রমেশবাবু বললেন, ‘দরকার নেই আমার গৃহপালিত জন্তু দিয়ে৷ ও আমি কালই বেচে দেব৷’

শুনে মঙ্গলার মেজাজ গেল চড়ে৷ সুলতা নাহয় মেয়ে, ন্যাকা, প্যানপেনে কাঁদুনে৷ কিন্তু রমেশবাবুর এতটুকু বোঝার ক্ষমতা নেই? দুপুর বেলা চোখ বুজে ভাবতে লাগল সে এর পরে কী করা যায়৷ রমেশবাবুর একটু ওষুধ খাবার অভ্যাস ছিল৷ সেটা নাকি সুলতা মোটেই পছন্দ করত না৷ বোতল-টোতল সাধারণত ছাদেই রাখতেন রমেশবাবু৷ সন্ধ্যা বেলা একলা বসে ঘাপটি মেরে ঢুক ঢুক করে খেতেন৷ তারপর এসে একটু হাসতেন বেশি, অনাবশ্যক সুলতার গালে ঠোনা মারতেন আদর করে৷ প্রথম দিনেই সেটা চোখে পড়ল মঙ্গলার৷ বুঝল এর মধ্যে নিশ্চয়ই ব্যাপার আছে৷ সমস্ত দিনমান যে লোকটা ভিতু ভিতু, সন্ধ্যার পর সে লোকটা বেপরোয়া হাসে কী করে? নতুন কিছু করবার এবং অবাক করে দেবার ইচ্ছে একবার উদ্দীপিত হলে থামানো কঠিন! খুবই অন্যমনস্ক হয়ে গেল মঙ্গলা৷ তাই, বিকেলে দোয়াবার সময়ে ও গোলমাল করল না এতটুকু৷ অবশ্য সোৎসাহ হয়ে প্রশংসা করবার উৎসাহ পেলেন না কেউই! রমেশবাবু বুঝেছিলেন মঙ্গলাকে ঠান্ডা রেখে চলতে হলে সর্বাংশেই ওকে না ঘাঁটানো ভালো৷ বুঝে সুলতাকে তেমনি নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ সুলতাও তাই নানা রকম গার্হস্থ্য ক্ষতি নির্বিকারে হজম করবার চেষ্টা করতে লাগল৷ স্বামী-স্ত্রী দু-জনেরই চুপচাপ ভাব দেখে মঙ্গলার উৎসাহ ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এল৷ বনমালী বলল, ‘দেখছেন তো? ধীরে ধীরে পোষ মানছে কি না!’

প্রথম ক-দিন গোরুর চরিত্র সম্বন্ধে সন্দিহান থাকাতে জামাকাপড় তার নাগালের মধ্যে রাখার সাহস হয়নি সুলতার৷ মঙ্গলাও যখন আপাত-শান্ত হয়ে উঠল, তখন তার ভয়ও গেল কেটে৷ জাবর কাটার সময়ে, মাঝে মাঝে সাহস সঞ্চয় করে গায়ে হাতও বোলাতে লাগল সুলতা৷ রমেশবাবু যখন দেখলেন, গোরু বনাম সুলতা, সবসুদ্ধ বেশ একটা আপোশজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তখন আস্তে আস্তে বেশ গুছিয়ে-গাছিয়ে বাঁচবার দিকে মন দিতে লাগলেন৷ সুলতাও আজ ক্ষীর, কাল পায়েস, পরশু দই পাততে এবং একটি গেরস্ত জীবনের স্বাদ পেতে লাগল৷ এমনি দিনে এল গোবিন্দ ঘোষ, ইলিশ মাছ নিয়ে৷ শহরে বাড়ি বাড়ি মাছ বিক্রি করাই নিয়ম৷ গোবিন্দ এসে ঢুকতেই চোখ পড়ল তার, মঙ্গলার দিকে৷ মঙ্গলার সঙ্গে গোবিন্দর প্রথম পরিচয় হয়েছিল ছ-মাস আগে, বেশ অন্তরঙ্গভাবেই৷ কেননা গোবিন্দ, নতুন ধুতি পরে ঘুমোচ্ছিল বনমালীর বাড়ির পাশের বট গাছতলায়৷ নতুন মিলের ধুতি খেতে ভালোবাসে বলে, গোবিন্দর পেটের ওপর সামনের পা রেখে, সযত্নে শার্ট বাঁচিয়ে খেয়েছিল ধুতিখানা মঙ্গলা৷ ধুতিখানার দাম মোটে চার টাকা, কিন্তু তখন তাই নিয়ে যেরকম হইচই করেছিল গোবিন্দ কোমরে শার্ট জড়িয়ে, আজও সেকথা মনে করলে হাসি পায় মঙ্গলার৷ অবিশ্যি ছ-মাস বাদে দেখা৷ তার দিক থেকে অভদ্রতা বাঁচিয়ে একটু হাসল মঙ্গলা৷ গোবিন্দ কিন্তু বিশ্রীরকম দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠল৷ বলল, ‘আর কি গোরু ছিল না টাউনে, শেষে এই বনমালীর গো-দত্যি কিনলেন?’

মঙ্গলা শুনেই এরকম মর্মাহত হল যে, সর্বাঙ্গ জ্বলতে লাগল তার৷ গোবিন্দকে বোধ হয় প্রশ্ন করতে চেয়েছিল সে, এবং সেই উদ্দেশ্যেই এসেছিল৷ গোবিন্দ ভুল বুঝল, এবং ছোটো একটা ছড়ি দিয়ে মঙ্গলার নাকের ওপর মারল৷ নাক যে তার বোঁচা, একথা মল্লিকবাবুদের এঁড়ে অনেকবার তাকে বলেছে৷ সকালে উঠে তাই বলে নাকে মার খেলে ভালো লাগে না৷ মঙ্গলা কাজেই ভদ্রভাবে প্রতিশোধ নেবার কোনো উপায় না পেয়ে, মুখে ছিল বিচালি আর খড়কুটো, তাই ছিটিয়ে দিল তার চোখে-মুখে৷ গোবিন্দ অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে, ‘তবে রে’ বলে লাফিয়ে মাছের ওজনের আধপোখানা তাক করে মারল মঙ্গলার দিকে৷ এবং ভবিতব্য এমনই যে, সেই আধপো গিয়ে লাগল সুলতার কপালে৷ ‘ওগো, বাবা গো,’ বলে সুলতাকে চ্যাঁচাতে শুনে ভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল গোবিন্দ, এবং তার পেছনে ছুটল মঙ্গলা৷ দিঘিতে ধোপারা কাপড় কাচছিল৷ তাদের পাশ দিয়ে জলে লাফিয়ে পড়ল গোবিন্দ৷ মঙ্গলা তখন বেপরোয়া৷ ধোয়া জামাকাপড়ের ওপর ভরতনাট্য নেচে, দয়া ধোপানির তৃতীয় পক্ষের ধোপা হরে রামের পিঠে গুঁতো মেরে সদর রাস্তা দিয়ে ছুটতে লাগল মঙ্গলা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে৷

বিকালে থানা থেকে পুলিশ এল রমেশবাবুকে ডাকতে৷ গিয়ে যা যা অভিযোগ শুনলেন তাতে চক্ষু চড়কগাছ হল তার৷ মঙ্গলা ইতিমধ্যে দীনতারণবাবুর বাড়ির গেট ভেঙেছে, সরকারি স্কুলের হেডমাস্টারকে ফেলে দিয়েছে, থানাতে ঢুকে কনস্টেবলের তোলা উনোন ফেলে দিয়েছে, দারোগার ভাইয়ের দিদিশাশুড়ি গঙ্গায় নেয়ে আসছিলেন, তাঁর ক্ষৌমবস্ত্র খেয়ে ফেলেছে৷ এইসব কারণে তাঁকে সরকারকে জরিমানা দিতে হবে দশ টাকা, তা ছাড়া দীনতারণবাবু নালিশ করেছেন, তাঁকেও খেসারত দিতে হবে৷ সমস্ত শুনে এবং টাকা দিয়ে সব মামলা মিটিয়ে বাড়িতে ফিরলেন যখন, তখন সন্ধ্যা৷ আজ রমেশবাবুও বেপরোয়া৷ বাড়ির ছাদে যে বোতলটি লুকোনো আছে সেটির সদ্ব্যবহার না করতে পারলে, মন মেজাজ দুরস্ত হবে না তাঁর৷

ছাদে চুপচাপ উঠে গেলেন৷ বোতলটি ছিল খড়ের গাদায়৷ সবে খুলতে গেছেন তিনি, এমন সময়ে রাত্রির দুঃস্বপ্নের মতো খড়ের গাদার ওপাশ থেকে উঠে দাঁড়াল মঙ্গলা৷ সারাদিন খাওয়া হয়নি, যথেষ্ট অত্যাচার গেছে, কিন্তু শেষ মোকাবিলাটা রমেশবাবুর সঙ্গে না করে ক্ষান্ত হতে পারছে না মঙ্গলা৷ কিন্তু তাকে দেখে রমেশবাবু, ‘ওঁ…ওঁ…ওঁ…!’ করে নেমে এলেন হুড়মুড়িয়ে৷ সুলতাকে টেনে নিয়ে শোয়ার ঘরে দরজা বন্ধ করে দিলেন৷ মঙ্গলা ওঁকে দেখল৷ বাবুকে বোতলও বনমালীই সরবরাহ করে, সে খারাপ জিনিস দেবে না জানা কথা৷ নিশ্চিন্ত হয়ে, ভেজা খড়গুলো খেল মঙ্গলা৷ মাটিতে যেটুকু পড়েছিল খেল চেটেপুটে৷ তারপর অত্যন্ত খুশি, আনন্দিত এবং নৃত্যপরা লাগল তার৷ চার পা জড়িয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে তারার আলোয় নাচতে লাগল সে৷ নীচে একটি ক্রমবর্ধমান জনতা তখন রুদ্ধ নিশ্বাসে রমেশবাবুর ছাদে, অন্ধকারে মঙ্গলার নাচ দেখছিল৷ চার পা খটমটিয়ে নামল মঙ্গলা৷ একবার রমেশবাবুর দরজাটা ঠেলল৷ তারপর খটাখট করতে করতে নেমে এল৷ এবং রওনা হয়ে গেল তার মুক্ত জীবনের অভিযানে৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *