গল্প
উপন্যাস
জীবনী

খুদে ডাকাত – মহাশ্বেতা দেবী

খুদে ডাকাত

খুদে ডাকাত মানে ছোট্ট ডাকাত নয়৷ ওর নাম ছিল ক্ষুদিরাম৷ সবাই ওকে ‘খুদে’ বলে ডাকত৷ বড়োরাও ডাকত, ছোটোরাও৷ ও ছিল কোয়ালি৷ মানুষের বাড়ি গোরু-বাছুরের অসুখ হলে ও সারাত ঝাড়ফুঁকে, মন্তরে, ওষুধে৷ তারপর গোয়ালিয়া গাইত৷ তার আগে গোয়াল পরিষ্কার করতে হত৷ যে গাই-বাছুর সারাল, তাদের পরে ওর ছিল ভারি মমতা৷ অনেক দিন অব্দি ও খবর নিতে যেত, তারা কেমন আছে৷

বৈরাগী স্বভাবের লোক ছিল৷ পাঁচুড়ে গ্রামের ক্যাওট-পাড়ার লোকজন ওকে একটা চালাবাড়ি তুলে দেয়৷ গোয়ালিয়া গেয়ে ও যে চাল-ডাল ও পয়সা পেত, এনে দিত আজ এ বাড়ি, কাল ও বাড়ি৷ যাদের বাড়ি তারাই রেঁধে দিত৷ সেখানে খেয়েদেয়ে ও নিজের ঘরে গিয়ে মাচাঙে শুয়ে পড়ত৷ ঘরের মধ্যে বাঁশের মাচা, তাই ওদের খাট৷

ইংরিজি ১৯৪২-৪৩ সালের মধ্যে পাঁচুড়েতে নানা বিপদ ঘটে যায়৷ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে মেদিনীপুর জেলা খুব মেতে ওঠে৷ আন্দোলন দমন করতে পুলিশ অকথ্য অত্যাচার করে৷ গ্রামের মানুষ নানারকম খাজনা দিতে দিতে জেরবার হয়ে পড়ে৷

তারপর আশ্বিন মাসে হয় ভয়ংকর ঘূর্ণীঝড়৷ পাঁচুড় তো দিঘারই কাছে৷ ফলে সমুদ্রের নোনা জলে গ্রামের ধান খেত নষ্ট হয়ে যায়৷

তারপর এল পঞ্চাশের মন্বন্তর৷ কী দুর্ভিক্ষ যে লাগল! কারা যে সব ধান, সব চাল কিনে নিল! তারপর তার দাম হল হিরে-মুক্তোর সমান৷ ধান-চাল কিনতে পারল না বলে মানুষ না খেয়ে পথে পড়ে পড়ে মরল৷

এরই পরে শোনা গেল পাঁচুড়ের আশপাশ দিয়ে ভীষণ ডাকাতি শুরু হয়েছে৷ একটা লোক নাকি দু-হাতে দুটো খাঁড়া ধরে ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে, পেছনে মশাল হাতে কারা যেন নাচছে৷ আর ধানের বস্তা, টাকা কাপড় যা পাচ্ছে তাই নিয়ে যাচ্ছে৷ তাকে ধরা খুব মুশকিল৷ আজ এ গ্রামে, কাল ও গ্রামে, কোথাও সে দু-বার যায় না৷

ডাকাতি হচ্ছে মহাজন আর জোতদার আর বড়ো বড়ো চাষিদের গদিতে আর বাড়িতে৷ পুলিশের খাতায় তার নাম উঠে গেল৷ কুসুমবনিতে থানা৷ দারোগা মৈজুদ্দিন খুব দুঁদে লোক৷ তিনি বললেন, ‘ডাকাত তো হবেই মানুষ৷ আকালের পর মানুষ চুরি-ডাকাতি ধরে না?’

‘শুধু বড়ো বড়ো চাষি-মহাজন…’

‘তবে কি গরিব চাষির বাড়ি যাবে?’

‘না, তা নয়!’

‘তবে আবার কী? বকরবকর কোরো না৷ যেখানে ডাকাতি হচ্ছে, সেখানে গিয়ে জেনে এসো, লোকটা কত লম্বা, কীরকম বয়স, গলার আওয়াজ কীরকম, তাকে কেউ চিনেছে কি না?’

জিজ্ঞেসবাদের ফলে যা জানা গেল, তা প্রায় ধাঁধার মতো৷ প্রাণহরি সাহা বলল, ‘লোকটা বেজায় লম্বা, কুচকুচে কালো, বাজখাঁই গলা, ইয়া মোটা৷’

রামকান্ত দত্ত বলল, ‘কী ফর্সা রং, যেন শিবঠাকুর! কী প্রশান্ত চেহারা! কাঁধ অব্দি জটা, আমায় বললেন, অনেক টাকা করেছিস, অনেক টাকা করবি, এখন চাবি দে! মধুমাখা গলা!’

হারামণি পাড়ুই বলল, ‘বেঁটে গুড়গুড়ে, তার এক পা খোঁড়া, ঢাকের মতো গলা, লেংচে লেংচে এসে আমায় বলল-গোলার চাবি! চাবি দিয়েই আমি মূর্ছা গেলাম৷’

মৈজুদ্দিন দারোগা বললেন, ‘অ! বোঝা গেছে৷ এখন খবর নাও, আশপাশে কে কে বহুরূপী সাজে৷ মজিদকে ধোরো না, ও আমার বাড়ি থাকে৷ বহুদিন জ্বরে শুয়ে আছে৷ এই খবরটা আসলেই ডাকাত ধরে ফেলব৷’

আশপাশের গ্রামে বহুরূপী কোথায়? বহুরূপী সাজে যারা, তারা হয় আকালে মরেছে, নয় পুলিশের গুঁতো খেয়ে ভেগেছে দেশ ছেড়ে৷

মৈজুদ্দিন গোঁফ চুমরে বললেন ‘খোঁজ চালাও৷ আর গাঁয়ে গাঁয়ে হাটবারে জানিয়ে দাও, ডাকাতের সঠিক খবর আনলেই একশো টাকা৷’

পাঁচুড়ে গ্রামেও সে খবর পৌঁছোল৷ ক্যাওটপাড়ায় এখন হালচাল অন্যরকম৷ খুদে যে কোথায় গোয়ালিয়া গাইছে, কে জানে! রোজ না হোক, দু-তিন দিন অন্তর সে চাল-ডাল তেল-মশলা এনে বাড়ি বাড়ি দিচ্ছে৷ খুব রাঁধাবাড়ার ধুম, খুব খাওয়াদাওয়া৷ দুখে হল রতন ক্যাওটের ছেলে৷ বয়স বছর চোদ্দো৷ বাবুদের গোরু চরায়৷ খুদের ভারি ন্যাওটা৷ খুদেকে ও বলল, ‘একশো টাকা তো তুমিই পেতে পার৷ কত জায়গায় যাচ্ছ, চোখ-কান বুজে না থেকে একটু ঠাহর করে দেখো৷’

‘বলো কী দুখে? একশো টাকা?’

‘হ্যাঁ, খুদে৷’

খুদেও কম নয়৷ পরদিনই কুসুমবনি গিয়ে বলল, ‘একটা লোককে আমার সন্দেহ হচ্ছে৷ সন্ধ্যে হলেই লোকটা বেরিয়ে পড়ে আর বনের মধ্যে ঢুকে যায়৷ বনের মধ্যে একটা পোড়ো বাড়িও আছে৷’

দেখা গেল লোকটা একজন গোয়ালা৷ বনের মধ্যে পোড়ো বাড়িতে ওর বাথান আছে৷

দু-দিন বাদে খুদে বলতে গেল, ‘এই গ্রামের হারান মুদি ডাকাত নয় তো? কী বাজখাঁই গলা! ও রাতেভিতে চাদর মুড়ি দিয়ে বেরোয়৷’

দারোগা রেগে বললেন, ‘তাস খেলতে যায়৷ তাসের নেশা ওর৷’

খুদে বলল, ‘তাহলে আমাকে দিয়ে হল না৷ যে খবরটা আনছি, সেটাই ফক্কা! আপনারা থাকতে ডাকাতের ভয় বা এত বাড়বে কেন?’

‘ডাকাত তোমার কী করবে?’

‘বা, আমি গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরি, রাতেভিতে পাঁচুড়ে ফিরি, আমার ভয় নেই?’

‘তোমার কাছে থাকে কী?’

‘চালটা ডালটা বড়িটা!’

‘যাও যাও, বোকো না খুদে৷’

খুদে গ্রামে ফিরে দুখেকে বলল, ‘আমার কপালে একশো টাকা নেই দুখে৷ যাকে ধরতে বলি দারোগা আমলই দেয় না৷’

এর পরেই খাস কুসুমবনির হাটের দোকান থেকে এক গাঁটরি ধুতি-শাড়ি ডাকাতি হয়ে গেল৷ মৈজুদ্দিনের সে কী রাগ! তিনি নিজেই টাট্টু ঘোড়া চেপে তদন্তে বেরোলেন৷

এবার খুদে গাঁয়ে এসে দুখে আর দুখের মাকে গেরিমাটি ছোপানো নতুন ধুতি আর কাপড় দিল৷ বলল, ‘আমদা গ্রামের রায়গিন্নি সাক্ষাৎ লক্ষ্মী, বুঝলে পিসি? এত দেব, ত্যাত দেব, তা বললাম, আমাকে কম দিন, দু-খানা নতুন কাপড় দিন৷ দিতে হবে পিসিকে আর পিসির ছেলেকে৷’

দুখের মা বলল, ‘বেঁচে থাক খুদে৷’

দুখে সব শুনল৷ শুনে বলল, ‘খুদে, একবার আমি তোমার সঙ্গে যাব৷ কত জায়গা দেখ, কত মানুষ! একবারটি দেখে আসব৷’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দাঁড়াও না, গোয়ালিয়া গানটা আর ওষুধবিষুধও শেখাব৷ আমি তো চিরকাল থাকব না, তখন কী হবে বল?’

‘শেখাবে? সত্যি?’

‘সত্যি, সত্যি, সত্যি৷’

‘তিন সত্যি কাড়লে কিন্তু!’

‘হ্যাঁ গো হ্যাঁ৷’

পরদিনই খুদে দু-তিন দিনের মতো ডুব মারল৷ কোথায় গেল, কী করল, কে জানে! খোঁজ নেই, আর খোঁজ নেই সাত দিন৷ এদিকে এমন উত্তেজক খবর পাওয়া গেল, যে পাঁচুড়ের লোকের খাওয়া-ঘুম ছুটে গেল৷

মঙ্গলদী গ্রামে হাট ছিল৷ হাট বন্ধ হয়ে যাবার মুখে মৈজুদ্দিন নাকি নিজে হাটুরে সেজে এক রামপুরী চাদর নিয়ে হাজির হন৷ হাট বন্ধ হচ্ছে দেখে গাঁটরি নিয়ে গোরুর গাড়িতে শুয়ে থাকেন৷ রাতে সেই সর্বনেশে ডাকাত এসেছিল, সঙ্গে তার লোকজনও ছিল, দারোগা ডাকাতের পায়ে গুলি করেন৷ গুলি নিয়েই সে পালিয়েছে৷ এখন খোঁজ চলছে৷ পায়ে গুলি নিয়ে তো বেশি দূর পালানো সম্ভব নয়৷

এ খবরের উত্তেজনায় সবাই খুদের কথা ভুলে গেল৷ দুখে বলল, ‘গেল কোথায়?’

‘কোথায় যাবে? ঠিক আসবে৷’

‘অ্যাত দিন তো দেরি করে না!’

‘আসবে, আসবে৷’

দুখে গেল গোরু নিয়ে চরাতে৷ ও একা যায় না, আরও দু-চারজন রাখাল যায়৷ তাদের কাছে গাইগোরু রেখে দুখে গেল নদীর পাড়ে আমলকীর খোঁজে৷ গাছপাকা আমলকী এক কোঁচড় দিলে কবিরাজমশাই ওকে দুটো পয়সা দেন৷

আমলকীর গাছ এখানে অনেক৷ গাছের ওপারে শিবমন্দির৷ সেখানে ঠাকুর নেই৷ মন্দিরটায় দুখেরা এসে বসে৷

‘দুখে!’

কে ওকে ডাকল? দুখে অবাক হয়ে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে, মন্দির থেকে বেরিয়ে খুদে ওকে ডাকছে৷ একটা লোকের কাঁধে ভর দিয়ে৷

অসম্ভব অবাক হল দুখে৷ আমলকী ফেলে রেখে ছুটে গেল৷

‘তুমি! এখানে! পায়ে কী হল?’

‘চুপ, চুপ!’

খুদে ওকে টেনে নিল ভেতরে৷ বলল, ‘দারোগার গুলি লেগেছে৷’

‘তোমার পায়ে…?’

‘হ্যাঁ দুখে৷ আমিই ডাকাতি করতাম৷’

‘এরা কারা?’

‘আমার স্যাঙাত৷’

‘তুমি…৷’

‘শোনো৷ আজ ক-দিন কিছু খাইনি৷ আমরা চার জন৷ চারটি মুড়ি নিয়ে এসো রাতে৷ আর খানিকটা ছাতু৷ এখন যাও, নইলে তোমায় খুঁজতে ওরা আসবে নির্ঘাত৷’

দুখে ঘাড় নেড়ে চলে এল৷ চারটি আমলকী কুড়িয়েই ফিরল৷ নইলে ওরা সন্দেহ করবে৷

বাড়ি ফিরে ও প্রথমে ভাবল, মাকে বলবে, কি বলবে না৷ তারপর আর থাকতে না পেরে মাকে বলেই ফেলল কথাটা৷

সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হল, মা মোটেই অবাক হল না৷ বলল, ‘এ তো আমি আগেই সন্দেহ করেছি৷ ইশ! গুলিতে খুব লেগেছে?’

‘সন্দেহ করেছ? কী করে?’

‘আমি একা নাকি? রতনের মা, বুড়োর জেঠি, মানকের মাসি, আমরা সবাই একথা বলাকওয়া করেছি৷ আমদা গ্রামের রায়গিন্নি কাপড় দিছল? সেখানে রায়বাড়ি বলে কোনো বাড়িই নেই৷ আমি তখনই জানি৷’

‘কিছু তো বলনি?’

‘নিজেরা জেনেছি, বলাকওয়া করেছি, দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করেছি ওকে৷ যদ্দিন দেশঘরের অবস্থা মন্দ হয়নি, গোয়ালে গেয়ে যা পেত, এনে এনে আমাদের খাইয়েছে৷ দেশঘরের অবস্থা মন্দ হতে ডাকাতি করে এনে খাইয়েছে৷’

রাত হতে রতনের মা, দুখের মা, বুড়োর জেঠি, মানকের মাসি, সবাই একে একে জমা হল, একসঙ্গে গেল দুখের সঙ্গে৷

খুদেও কম যায় না৷ সেও অবাক হল না৷ বলল, ‘মা লক্ষ্মীরা, কত কী এনেছ মা?’

‘কেন? তুমি সম্বচ্ছর খাওয়াতে পার, আমরা একদিন খাওয়াতে পারি না?’

‘ওটা কী? ফোঁস ফোঁস করছে?’

‘দুখে বাবুদের গাইগোরু চরায়, বাবুরা এই এঁড়ে মোষটা দিয়েছে ওকে৷’

‘ওর পিঠে তুমি চাপবে৷ ওরা হেঁটে যাক৷ খেয়ার কাছে যেয়ে মোষ ছেড়ে দিয়ো৷ দুখে সঙ্গে যাচ্ছে৷ নৌকোয় তোমাদের পার করে দিয়ে তবে আসবে৷ ওপার থেকে যা হয় করে চলে যেয়ো মেচেদা৷’

‘এটা কী দিচ্ছ?’

‘তোমার ঘরেই এই থলিটা ছিল৷ তোমার ওষুধ-বাকড়ের থলি৷ ঠ্যাং সারলে আবার গোয়ালে গাইতে গাইতে ফিরবে না? গোয়ালে গাওয়া! ওষুদ দেওয়া! যত সব ভিরকুটি!’

খুদে হেসে ফেলল৷ তারপর বলল, ‘যদি দারোগা না ধরে, তবে ঠিক ফিরে আসব, তোমার ছেলেকে সব শিখিয়ে দেব৷’

রতনের মা বলল, ‘এই মাদুলিটা চুলে বেঁধে রাখো, কোনো বিপদ হবে না৷’

খুদে মোষের পিঠে চাপল৷ তারপর দুখে আর ওর স্যাঙাতরা রওনা হল৷ খেয়াঘাট অনেক দূর৷

দুখের মা বলল, ‘চলো, আমরা ফিরি৷’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *