গল্প
উপন্যাস
জীবনী

ভয়ংকর দুর্গাপূজা – মহাশ্বেতা দেবী

ভয়ংকর দুর্গাপূজা

এই গল্পটা অন্য কোথাও তিন পাতায় বলেছি৷ কিন্তু অসম্ভব এই দরকারি গল্পটা তোমাদের জানা বিশেষ দরকার৷ কেন দরকার তা যদি জানতে চাও, তাহলে বলতে হয়, ফল্গু বলেছে তাই দরকার৷ ফল্গু কী বলেছে আর কেন বলেছে তাও কিন্তু খুবই দরকারি কথা৷ আসলে অনেক গল্প শোনা যে খুব দরকার, গল্পটা যে অসম্ভব দরকারি জিনিস তা ফল্গু ওর সূর্যের মতো তেজস্বী ছেলে সুজা আর জ্যোৎস্নার মতো ঝিকমিকে মেয়ে শিঞ্জাকেও শিখিয়ে দিয়েছে এ যা রক্ষে৷ ওরা এখনও সবসময়ে গল্প বলে৷

এখন যে গল্পটা বলব সেটা আমার আর ফল্গুর মধ্যে কথাবার্তার ফাঁকে হঠাৎ-গজানো গল্প৷

গল্পটা গজিয়েছিল বছর বাইশ আগে, গড়িয়াতে আমার পুকুরপাড়ের গাছপালা ঢাকা বাড়িতে, ঝিমঝিমে বৃষ্টির দিনে৷ ফল্গু হঠাৎ বলতে শুরু করেছিল-

অনেকদিন আগেকার কথা৷ ‘অনেকদিন আগে’ শব্দগুলো লক্ষ করো৷ অনেকদিন আগেই সব ভালো ভালো জিনিস ঘটে যায় সর্বদা৷ অনেকদিন আগে ছিলেন পাগলা দারোগা৷

আমি,-প্রথমত তাঁর নামই ছিল পাগলাচরণ মুখোটি৷ দ্বিতীয়ত তাঁর ঠাকুরদার মা একশো দশ বছর বেঁচেছিলেন৷ শেষ চল্লিশ বছর তাঁর ভীমরতি হয়েছিল৷ পাগলাচরণেকে তিনি দেখলেই বলতেন, সাধুবাবা৷ পেন্নাম হই৷

তাতে পাগলাচরণের মাথায় সন্ন্যাসী হবার ভূত চেপে যায়৷ থেকে থেকেই তিনি ‘রইল তোমাদের পরীক্ষা আর পাড়াশোনা’ বলে রান্নার চিমটে নিয়ে বোনের শাড়ি পড়ে বেরিয়ে যেতেন৷ বোন কেঁদেকেটে সারা৷ ‘শিউলি ফুলের বোঁটার রঙে রং করা হলদে কাপড়টি দাদা নিয়ে নিল৷’

পাগলাচরণের বাবা লোকজন পাঠিয়ে ছেলে ধরে আনতেন৷ একবার পাগলাচরণ বছর খানেক উধাও হয়ে থাকতে পেরেছিলেন৷ ফিরলেন যখন, তখন খুব গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা৷ যাকে বলে, হট্টাকট্টা জোয়ান৷ পাগলাচরণের বাবা বললেন, ‘আর নয়! এবার তোমাকে বিয়ে করতে হবে৷’

পাগলাচরণ বললেন, ‘বিয়ে?’

বললেন, ‘বিয়ে করতে হবে, দারোগার চাকরিতে ঢুকতে হবে৷ সবাই বলছে, সন্ন্যাসী হওয়াটা বাজে কথা৷ তুমি স্বদেশি দলে ঢুকেছ৷ সাহেব তাড়াবে বলে মতলব এঁটেছ৷’

পাগলাচরণ বললেন, ‘বিয়ে করব আবার দারোগা হব? বিয়ে করতে-টরতে পারব না৷ দারোগা হতে পারি৷’

পাগলাচরণ দারোগা হলেন৷ দারোগা হবার পর সারাদিন তিনি দারোগাগিরি করতেন আর থানাতে কালীকীর্তনের ব্যবস্থা করতেন৷ বেজায় কড়া নজর ছিল তাঁর৷ তখন, যাকে বলে, ছিঁচকে, সিঁধেল, গোরু, সবরকম চোররাই যে-যার টাইমে কাজ করত৷ ছিঁচকে চোর সারাদিন ছিঁচকে চুরি করত, সিঁধেলরা রাতে বেরোত, গোরুচোর গো-হাটের দিন গোরু চুরি করে গো-হাটে বেচতে যেত৷ ইংরেজ আমল সেটা, সময়টা আজ থেকে ষাট বছর আগে, গ্রামদেশে সবাই নিয়ম মেনে চলত৷

নিয়ম বলে নিয়ম! তা পাগলা দারোগা ছিঁচকে চোরদের সারাদিন থানায় আটকে রেখে কালীকীর্তন গাওয়াতেন আর থানার চৌহদ্দিতে শাকসবজি চাষ করাতেন৷ ফলে ছিঁচকে চুরি কমে গেল৷ ছিঁচকেরা সন্ধ্যে হলে হাই তুলে ঘুমোতে চলে গেল৷

আর সিঁধেলরা সারারাত যদি থানায় বসে কালীকীর্তন গায় আর নারকোলের খোল ছাঁদা করে হুঁকোর ডাবা বানায়, তাহলে সিঁধ দেবে কে?

গো-হাটের আগেরদিন থেকে গোরুচোররা যদি পুকুরের কচুরিপানা সাফ করে সেগুলো বয়ে এনে সারের গর্তে ফেলে আর গো-হাটের দিন থানায় বসে কালীকীর্তন গায়, তাহলে গোরু চুরি করবে কে?

এভাবেই সে থানা এলাকায় খুব শান্তি বিরাজ করতে লাগল৷ থানা চৌহদ্দির মধ্যে একমণি কুমড়ো ফলল আর দশসেরি ফুলকপি৷

কৃষিপ্রদর্শনীতে ফি-বছর ঝিনহাট-নাগরপাছা ফুলতলি থানা প্রথম পুরষ্কার পেতে থাকল৷ আর সাহেবরা ঠিক করল যে, পাগলা দারোগা নির্ঘাত ভয়ানকরকম স্বদেশি৷ নইলে কেন সে চুরি-বাটপাড়ি বন্ধ করছে? কেনই-বা থানা চৌহদ্দিতে অতিকায় কুমড়ো হয়? কেন চোরেরা কালীকীর্তন গায়?

পাগলা দারোগা কিছুই জানে না৷ কিন্তু তার ওপর নজর রাখার জন্যে ডাকঘরের ডাকবাবুকে সরিয়ে এক গোয়েন্দা বসানো হল৷ সে খবর পাঠাতে থাকল: অবস্থা উত্তরোত্তর জটিল হইতেছে৷ গত তিন মাস এগারো দিনে একটি দাঁড়কাক জমিদার মহাশয়ের নাতির রুপার ঝিনুক মুখে নিয়া উড়িয়া গিয়াছে৷ সন্দেহ করি কাকটি মগরা থানার দিকে গিয়াছে এবং ঘোষালদের মানসিক কালীপূজায় দারোগাবাবুর কীর্তনদল কালীকীর্তন গাহিয়াছে৷ এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশ প্রার্থনা করি৷

এর উত্তরে কোনো নির্দেশ আসেনি এবং ডাকবাবু যখন তার পাঠান ‘বোথ দাঁড়কাক অ্যান্ড সিলভার অয়েস্টার স্টিল আনট্রেসড৷ ফাউল প্লে বাই দারোগা সাসপেকটেড’ তখনই তাঁকে বদলি করে দেয়া হয়৷ পুলিশের বড়োবাবু বলেন, ‘লোকটা ফালতু খবর দিচ্ছে৷ ওর কথা শুনে দারোগাকে ঘাঁটালে ঝিনহাটে বিশাল বিদ্রোহ বাধবে৷ ঝিনহাটে মায়ের সেবক নামে লেঠেলদের কালীপুজোর দল আছে৷ দারোগাকে তারা দেবতার মতো ভক্তি করে৷ তারা খেপে গেলে সর্বনাশ হবে৷’

সাহেবরা হুম বলে বসে থাকে৷ কিন্তু এসময়েই রতন, দুখে আর চুড়োরাম নামে তিন জন গুরুস্থানীয় সিঁধেল চোর জেল থেকে ছাড়া পায়৷ এদের মতো সিঁধ কেটে গর্ত করতে কেউ পারত না৷ জেলে থাকবার কথা এক বছর৷ কিন্তু এরা দু-বছর করে জেলে থেকে যায়৷

কেননা এদের রেলদপ্তর থেকে ধার নেয়া হয়৷ পাহাড় কেটে রেলের লাইন পাতা হবে৷ তাবড়ো তাবড়ো ইঞ্জিনিয়াররা ফেল করে যায়৷ কেননা পাহাড় কাটতে হবে সাঁওতাল পরগনায়৷ সাঁওতালরা ওদের পুজো করা পাহাড় ডিনামাইটে ওড়াতে দেবে না৷ তখন চুড়োরাম, রতন আর দুখেকে ধার চায় রেলদপ্তর৷ ওরা এক বছর ধরে সিঁধকাটার নিয়মে পাহাড় কেটে দেয়৷ ফলে তাদের ছবি কাগজে বেরোয় আর ধরা পড়ে যায়৷ সেই তিন বিখ্যাত সিঁধেল ফিরে এল৷

সঙ্গেসঙ্গে দারোগাবাবু তাদের পেছনে দু-জন সেপাই লাগালেন৷ দুই সেপাই আর তিন সিঁধেল সারাদিন ঘুমোয়৷ রাতে বড়ো পেট্রোম্যাক্সের আলো জ্বেলে সিঁধেলরা বাগান কোপায়৷ পাগলা দারোগার বাগানে উৎসাহ দেখে জমিদার সামনের জমি দান করে যাচ্ছেন৷ কত কোপাবে কোপাও না! তিন সিঁধেল আর দুই সেপাই খুব বন্ধু হয়ে গেছে৷

এর মধ্যে পুজো এসে পড়ল৷ তারপর কী কাণ্ড, কী কাণ্ড! যত চোর, সব থানায় আটকা, অথচ সেনবাবুর বাড়ির আদ্যিকালের রুপোর দুর্গাপ্রতিমা কারা যেন সিঁধ কেটে চুরি করল৷ ঝিনহাটে হইচই৷ মায়ের সেবক দলের লেঠেলরা লাঠি ঘুরিয়ে হাটে-বাজারে বলল, ‘সাধুজন! সাবধান! ইয়ার পিছনে গোর ষড়ন্তর-জড়ন্তর কাম করতেয়াছে, হদ্দ করি, কে বা কাহারা আমাদের মায়ের ভতকো দারোগাবাবুকে ফাসাইবার লিগ্যা দুষ্টবুদ্ধিতে সিদ দিছে৷ পরমান করতে চায় যে দারোগা কামের অযুগ্য৷ বাই হকল! আপনারা এই চকরান্তরে ভোলবেন না৷’

পঞ্চমীর দিন সকালে এই চুরি! দারোগাবাবু দেখতে গেলেন৷ সঙ্গে নিয়ে গেলেন চুড়োরামকে৷ ‘কী চুড়োরাম! তুমি তো সব সিঁধেলের হাতের কাজ জান, কী মনে হয়?’

চুড়োরাম বলল, ‘এ কাজ যে করেছে সে জীবনে সিঁদেল হতে পারবে না৷ ছি ছি ছি! কেমন পাকাবাড়ি বাবুর৷ রহিম মিস্তিরির হাতের গাঁথা দেয়াল! তাকে কী বিশ্রী করে কেটেছে৷ দারোগাবাবু, এ কোনো আনাড়ির কাজ হবে৷ আমরা কাজ মেরে বেরিয়ে যাব, এক মানুষ ঢোকার মতো গর্ত কাটব৷ তাতে কেন খ্যাঁচ রেখে যাব? গেরস্ত তাহলে গর্ত মেরামত করতে কষ্ট পাবে না? এ কী গর্ত হয়েছে?’

একথা বলে চুড়োরাম এক মস্ত হাই তুলল৷

সেনবাবুও বললেন, ‘না না, চুড়োরাম তো আমার বাড়ি বার দশেক সিঁধ কেটেছে৷ সে কী পাকা হাতের কাজ! গর্ত বোজাতে কষ্ট হয়৷ মনে হয় আহা হা! এমন একটা শিল্পকর্ম নষ্ট করব?’

সেনবাবুর পিসিমা বললেন, ‘জ্বালাস না ভেঁটু৷ চোরের সিঁধকাটা শিল্পকর্ম! আহা হা! মরে যাই একেবারে৷ ইদিকে যে সর্বনাশ হল৷ শিগগির পিতিমে গড়তে দে৷ নইলে ঘট পুজোর ব্যবস্থা কর৷ ই কী কাণ্ড মা! তোমাকেও বলি বাছা দারোগা! তুমি আছ, তো রামরাজত্বে আছি৷ চুরি নেই, গোরু চুরি নেই, আমরা তো রাতে ঘুমোই নিশ্চিন্তে৷ সেই নিশ্চিন্ত হওয়াই কাল হল? এ চোর তোমাকে ধরে দিতে হবে৷’

গ্রামের বুড়োরা মাথা নেড়ে বললেন, ‘বিধাতার নিয়ম উলটে দিলে মহাপাপ হয়৷ চোর চুরি করে বলে গেরস্ত সজাগ থাকে৷ চোরের চুরি বন্ধ, গেরস্তের চোখে ঘুম, চৌকিদার তো বেরোনো ছেড়ে দিয়েছে৷ সে বলে রাতে পাহারা দেব কাকে? যাহোক, দুর্গামূর্তি উদ্ধার করো বাবা! ওদিকে মায়ের সেবক যত লেঠেল-বর্শেল নেচে বলে বেড়াচ্ছে যে, দুষ্টলোক তোমাকে অপদস্থ করবে বলে চুরি করছে৷ তারা আবার তোমার ভক্ত৷’

দারোগার গোঁফ ঝুলে পড়ল৷ তিনি বললেন, ‘চোর আমি ধরবই৷ আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন৷ মায়ের সেবক লেঠেলরা রাতে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে৷ এখন চুরি হবে না৷’

ডাকবাবু তার করলেন ‘সিলভার দুর্গা মিসিং৷ দারোগা ইজ হতভম্ব৷’ আর দারোগাবাবু স্নানাহার ছেড়ে দিলেন৷ রাতদিন শুধু ভাবছেন৷ মায়ের সেবক লেঠেলদের সর্দার চরণ ঢালী বলল, ‘বাবু! খাওয়াদাওয়া করেন, মনে জোর রাখেন৷ মায়ের নাম লইছেন যখন ভাবেন ক্যান৷’

পাগলা দারোগার চিন্তা গেল না৷ রাত নেই দিন নেই ভাবছেন আর ভাবছেন৷ শেষে সপ্তমীর দিন সেনবাবুর পিসিমা জোর করে তাঁকে পুজোর ভোগের খিচুড়ি-ভাজা-পায়েস খাওয়ালেন৷ খেয়েদেয়ে তাঁর ঘুম পেল৷ দিব্যি ঘুমিয়ে পড়লেন৷

রাত তখন অনেক৷ হঠাৎ কেমন যেন অস্বস্তিতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল৷ কী যেন হচ্ছে, ধূপধুনোর গন্ধ আসছে, ব্যাপার কী? থানার বাগান থেকেই শব্দটা আসছে যেন? দারোগা ঘর ছেড়ে বেরোলেন৷ মস্ত বাগানের কোনে একটা চালাঘর, সেখানে গিয়ে তাজ্জব৷

সেপাই রামভজন সেনবাবুর দুর্গাপ্রতিমা পুজো করছে৷ তিন সিঁধেল আর আরেক সেপাই ভক্তিভরে হাতজোড় করে বসে আছে৷ রামভজন মিসির দিব্যি মন্ত্র বলছে৷ দেখেই তিনি বিকট চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন৷

জ্ঞান ফিরতে দেখেন, মায়ের সেবক লেঠেল দল, সেনবাবু, গ্রামের লোকজন, সে এক মস্ত ভিড়৷ চুড়োরাম বলল, ‘সবাই মায়ের প্রসাদ খান, তারপর বলছি৷’

আসল কথাটা হল যে, ধর্মভাব এসে গিয়েছিল৷ ওদের মনে হচ্ছিল, এত বড়ো বিদ্যেটা দান করা দরকার৷ সেপাইদের রাত জেগে জেগে সময় কাটছিল না৷ তাই চুড়োরামরা সেপাইদের সিঁধ কাটতে শেখায়৷

তা, সিঁধ কাটতে শিখল কি না পরীক্ষা তো দিতে হবে৷ একদিন রাতে পাঁচ জনেরই মনে হল যে, টুকটুকে এক মেয়ে বলছে, ‘যাও না বাপু! দেবতার আশ্রয়ে আছ, ভালো কাজ করো একটা৷ সেনবাড়ি থেকে এনে আমাকে এখানে পুজো করো৷ সিঁধ কাটা শিখেছ কি না সে পরীক্ষাও হবে আর আমারও সাধ মিটবে৷’

একথা শুনে লেঠেলরা বলল, ‘জয় মা! জয় মা! আগেই হদ্দ করছি ইয়ার মধ্যে দ্যাবতার বুঝি কী লীলা আছে!’ সেনবাবু তো চুড়োরামের পায়ে পড়েন৷

চুড়োরাম বলছে, ‘সেপাইদের দিয়ে সিঁধ কাটা যে কেমন হল, তা সবাই দেখলেন৷ যাহোক, মাকে এনে তো পুজো করব, জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁ গো মা! দারোগাবাবুর যে বদনাম হচ্চে? মা বলল, তাতে তোদের কী?’

পাগলা দারোগা কটমট করে চেয়ে বললেন, ‘বটে! মা এসে বলল?’ তাতে চুড়োরাম বলল, ‘সিঁধ দিতে পারি বাবু, মিছে কথা সিঁধেল বলে না৷ তা ছাড়া আপনাকে ঠাকুরের মতো ভক্তি করি, মিছে বলব কেন?’

দারোগা বললেন, ‘তা বলে রাতে পুজো?’

চুড়োরাম বলল, ‘মাকে বললাম, হ্যাঁ গো মা! সারাদিন ঘুম পায়৷ রাতে পুজো করলে চলবে? মা বলল, তোরা যা করবি তাতেই হবে৷ থানা এখন গয়াকাশী৷’

একথা শুনে সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল৷ লেঠেলদের আনন্দ দেখে কে! তিন দিন ধরে পুজো হল৷ তারপর দারোগাবাবু সেনবাবুকে মূর্তি ফিরিয়ে দিলেন৷ চুড়োরাম, রতন, দুখে আর দুই সেপাইয়ের নামে ধন্য ধন্য পড়ে গেল৷ লেঠেলরা ‘ধর্মের জয় আইজও হয়’ বলে হইহই করলে৷

আর পাগলা দারোগা কী করলেন? তিনি বললেন, ‘এই রইল চাকরি, এই রইল পেননাম, আমি চললাম!’ বলে সন্ন্যাসী হয়ে চলে গেলেন৷ সেই যে গেলেন আর তিনি ফিরলেনই না৷

এই হল পাগলা দারোগার গল্প৷ বছর বাইশ আগে, যখন আমার আর ফল্গুর হাতে অনন্ত অপার অবসর ছিল, গাছপালা ঢাকা একটা অসম্ভব সুন্দর বাড়িতে ঝিমঝিমে বর্ষার দিনে এমন অনেক গল্প আমরা মুখে মুখে বানাতাম৷ কখনো কোনো কিছু ভুলতে পারি না, সেটাকে অভিশাপ বলেই মনে করেছি কত সময়৷ যা যখন পড়েছি, সব কেন মনে থাকে এত, এত মুখ, এত কথা? সেই মনে থাকা যে কত ভালো তা আজ বুঝলাম৷ ফল্গুর আর আমার পরস্পরকে হারিয়ে দেবার চেষ্টায় এমন করে কতই গল্প গজিয়েছিল সেইসব দিনে৷

এখন যত কথা ওর সঙ্গে, সব মনে মনে৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *