গল্প
উপন্যাস
জীবনী

চালাক কুমোর বোকা রাজা – মহাশ্বেতা দেবী

চালাক কুমোর বোকা রাজা

কোনো এক গ্রামে ছিলেন এক রাজা৷ রাজার অনেক খেত, অনেক জমিজমা, অনেক গোরু আর মোষ৷ রাজার কোনো অভাবই ছিল না৷

রাজার ছেলে ছিল ভারি দুষ্টু৷ সে কোনো কাজকর্মও করত না, খালি গ্রামের লোকের উপর উপদ্রব করে বেড়াত৷ গ্রামে অঘনু নামে এক কুমোর ছিল৷ অঘনুর বউটি ভারি সুন্দরী৷ কুচকুচে কালো রং, এক মাথা চুল৷ স্বামীর সঙ্গে সেও গড়ত হাঁড়ি কলসি, জালা৷ স্বামী সেগুলো হাটে বেচতে যেত৷ তখন বউ ভাত রাঁধত, ধান শুকাত, শাক-পাতা-মাছ-খরগোশ জোগাড় করে আনত৷ রেঁধেবেড়ে বসে থাকত৷

রাজার ছেলে অঘনুর বউকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেল৷ এমন সুন্দর মেয়ে, সে নাকি অঘনু কুমোরের বউ? সে বউটিকে বলল, ‘তুই আমার সঙ্গে রাজবাড়িতে চল৷ তোকে গহনা দেব৷ নতুন কাপড় দেব৷ রোজ ময়ূরের মাংস খাওয়াব৷’

বউ তো জানে অঘনু হাটে গেছে৷ সন্ধ্যে হলে তবে ফিরবে৷ সে মনে মনে হেসে বলল, ‘বেশ তো! সন্ধ্যের পর এসো৷ তখন তোমার সঙ্গে যাব৷’

রাজার ছেলে খুশি হয়ে বাড়ি চলে গেল৷ অঘনু বাড়ি ফিরতেই বউ সব কথা তাকে বলে দিল৷ অঘনু বলল, ‘বটে! রাজার ছেলের দেখি খুব সাহস হয়েছে৷ সে দেখি কেউটে সাপের ল্যাজ দিয়ে কান চুলকাতে চাইছে৷’

‘বেশ তো, আসুক না দেখা যাবে৷’

দু-জনে মিলে খেয়েদেয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে বসে থাকল৷ দরজাটা খুলে রাখল৷ অঘনু ভাবছে, বন, জঙ্গল, পাহাড়, মাঠ, সব জায়গায় দেব-দেবীকে পূজা করি৷ কোনো অন্যায় করি না৷ রাজার ছেলের এত বড়ো অন্যায়টা সইব?

রাজার ছেলে তো অত কথা জানে না৷ সে সন্ধ্যের পর চুপিচুপি অঘনুর ঘরে ঢুকেছে৷ সঙ্গেসঙ্গে অঘনু তাকে ধাঁই ধপাধপ পিটাতে লেগেছে৷ মারতে মারতে রাজপুত্রকে সে মেরেই ফেলল৷

তারপর, রাজপুত্রকে টানতে টানতে নিয়ে গেল গ্রামের মালীর বাগানে৷ মালীর মস্ত বাগান৷ তাতে নানা ফলের গাছ৷ বাগানের পাঁচিলের গায়ে রাজপুত্রকে দাঁড় করিয়ে বেশ করে ঠেলে উঠিয়ে মাথা ভিতরে ঠ্যাং ওপারে, এমনি করে ঝুলিয়ে দিল৷ দিয়ে তো অঘনু হাওয়া৷

মালী এদিকে রাতে বাগান পাহারা দিতে বেরিয়েছে৷ সে দেখে একটা লোক পাঁচিলের উপর ঝুলছে৷ তবে রে ব্যাটা চোর! বলে যেমন লাঠি মারা অমনি রাজপুত্র গড়গড় করে মাটিতে পড়েছে৷ তখন তো মালীর মাথায় হাত৷ ‘এ কী করলাম! রাজার ছেলেকেই মেরে ফেললাম? এখন আমার কী হবে? যাই, অঘনু কুমোরের কাছে যাই৷ সে কোনো বুদ্ধি দিতে পারে৷’

অঘনু বলল, ‘ভাই! যে কাজ করেছ, তার শাস্তি অতি ভয়ংকর৷ উদ্ধার তোমায় করতে পারি৷ তবে খরচা কিছু করতে হবে৷ দেখো! বাগানের আম জাম পেয়ারা কোনোদিন তো খেতে দিলে না একটা, বিপদআপদেও দেখ না! তা আমি আবার বড়োই নরম মনের মানুষ৷ পড়শি বিপদে পড়েছে অথচ তাকে সাহায্য করব না, এ আমি ভাবতেই পারি না৷ যাহোক, কিছু খরচা দাও, আমি দেখছি৷’

মালী তো তখনই রাজি৷ সে টাকা এনে দিল৷ অঘনু রাজার ছেলের গলায় একটা দড়ি বাঁধল৷ তারপর তাকে কাঁধে ফেলে রাজবাড়ির সামনে নিয়ে একটা গাছের ডালে ঝুলিয়েও দিল৷ তারপর রাজার ছেলের গলা নকল করে হেঁকে বলল, ‘দরজা খোলো৷ দরজা খোলো৷

তার বউ সেকথা শুনেও শুনল না৷ কে জানে মানুষ চেঁচাচ্ছে না ভূত!

‘দরজা না খুললে আমি গলায় দড়ি দেব৷’

রাজকুমারের বউ ভাবল, এ তো তাহলে ভূত৷ রাজপুত্র তো বলে গেছে, বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি, আজ ফিরবই না৷ সে কোনো সাড়াই দিল না৷ অঘনুও বাড়ি পালাল৷

সকাল হতে-না-হতে রাজবাড়িতে কান্নাকাটি লেগে গেল৷ শেষে রাজা বললেন, ‘কেঁদেকেটে আর কী হবে? যাও, তোমরা রাজপুত্রের দাহের ব্যবস্থা করো৷’

নিয়মমতো গ্রামের সব লোকই মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে চলল শ্মশানে৷ যেখানে চিতা সাজানো হল, তার নীচে একটা লম্বা সুড়ঙ্গ ছিল৷ ওই গ্রামে এরকম সুড়ঙ্গ অনেক ছিল৷ বাইরের শত্রুরা আক্রমণ করতে আসলে গ্রামের যত বুড়ো-বুড়ি, মেয়ে আর শিশু ওই সুড়ঙ্গে লুকিয়ে পড়ত৷ যুবকরা যুদ্ধ করত৷

অঘনু তেমন একটা সুড়ঙ্গ ধরে একেবারে চিতার নীচে এসে হাজির৷ চিতা যখন জ্বলছে, তখন অঘনু জোরে হেঁকে বলল ‘আমার বাবাকে বলো৷ অর্ধেক রাজত্ব যেন অঘনু কুমোরকে দিয়ে দেন৷’

গ্রামের লোকজন তো একথা শুনে বেজায় তাজ্জব৷ এ কী কাণ্ড! মৃত রাজপুত্র কথা বলছে?

‘তোমরা আমার বাবাকে এখুনি একথা বলো৷’

এই বলে অঘনু সুড়ঙ্গ দিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে গেল৷

এখন একথা তো সবাই গিয়ে রাজাকে জানাল৷ প্রথমে রাজা বিশ্বাসই করতে চান না৷ যখন গ্রামের অনেকে মিলে একথা বলতে লাগল, তখন তাঁর বিশ্বাস হল৷

পরদিনই তিনি অঘনুকে ডেকে পাঠালেন৷ অঘনু যেন কিছুই জানে না, এমনি ভাবে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে হাজির হল৷ রাজা বললেন, ‘আমার ছেলে বলেছে, তাই তোমাকে অর্ধেক রাজত্ব দিচ্ছি৷ আমার গোরু, মহিষ, খেতখামার, সব তুমি আধাআধি পাবে৷’

অঘনু বলল, ‘প্রভু! আমি সামান্য কুমোর মাত্র৷ আমি রাজা হব?’

রাজা বললেন৷ ‘বাপু হে! তোমাকে রাজত্ব দেবার কথা তো আমার স্বপ্নেও মনে হত না৷ নেহাত আমার ছেলের ইচ্ছে, তাতেই রাজত্ব পাচ্ছ৷’

অঘনু বলল, ‘তাই হবে মহারাজ!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *