গল্প
উপন্যাস
জীবনী

পিসি ডাকাত – মহাশ্বেতা দেবী

পিসি ডাকাত

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে হাজার হাজার মানুষ মরেছিল৷ তারপর দেশে মড়ক লাগল, কত গ্রাম আস্তে আস্তে জঙ্গলে ঢেকে গেল৷ শেয়াল আর বাঘ হাটেবাজারে ঘুরতে লাগল৷ সেইসময় অনেকেই পেটের জ্বালা সইতে না পেরে ডাকাত হয়ে গেল৷

ভরত মণ্ডলও গিয়ে ডাকাত হল৷

ছোটোবেলা ভরত ভারি নাক নেড়ে মেয়েদের মতো ঝগড়া করত৷ সবাই ওকে নাম দিয়েছিল পদিপিসি৷ ডাকাত হবার আগে লম্বা লম্বা বাবরি চুল রাখল৷ কানে দুটো রুপোর লবঙ্গফুল আর গলায় ভক্তিমালা পরল৷ সে হল গিয়ে দু-শো বছরের কথা৷ তখন যাদের ভদ্রলোক বলা হয় তাদের পুরুষরা গয়না একটা-আধটা পরত৷

ভরত যেই কানে লবঙ্গ, গলায় মালা পরল, অমনি সবাই বলল, তুই পদি পিসি ছিলি৷ এখন পিসি ডাকাত হয়েছিস৷’

ভরত বলল, ‘হুম!’

ওর সঙ্গীরা বলল, ‘তা একপক্ষে ভালোই হল৷ সায়েবরা টের পাবে না ব্যাটাছেলে ডাকাতি করছে না মেয়েছেলে৷’

সত্যি সত্যি তাই হল৷ পিসি ডাকাতের দল সৈদাবাদ থেকে কাশী পর্যন্ত ডাকাতি করে বেড়াতে লাগল৷ কলকাতায় বসে বসে হেস্টিংস সায়েব তো মহা খাপ্পা, ‘মেয়েছেলে ডাকাতি করে, ধরতে পার না?’ আর ধরতে পারবে৷ দুটো পায়ে রণপা বেঁধে ভরত দশ মাইল দূরে ডাকাতি করে চলে আসে বানঝাটিয়া৷ বাড়ি এসে হাত-পা ধুয়ে ঘুমোয়৷ চৌকিদার এসে যখনই ভরতকে ডাকে তখনই দেখে ভরত কাঁথামুড়ি দিয়ে মাচায় ঘুমোচ্ছে আর ভরতের বউ শোলমাছটা, কোনোদিন ঝিঙে পোস্ত, কোনোদিন থোড় চিংড়ি রান্না করছে৷ পিসি ডাকাতের টিকিটাও কেউ ধরতে পারে না৷ যারা জানে তারা চুপ করে থাকে৷

গল্পটা কিন্তু ভরতের নয়৷ টুনির দুই পিসির৷ দক্ষবালা আর রক্ষামণির৷

টুনির ওঁরা আসল পিসিও নয়৷ দক্ষ আর রক্ষের ছোটোবেলা বিয়ে হয়েছিল৷ বিধবা হয়ে ওঁরা এসে দাদার সংসারে থাকতেন৷ যেমন দজ্জাল ছিলেন, তেমনি কাজের৷ তখন কারও বাড়ি পুজো বা বিয়ে বা পইতে হলে তারা পালকি পাঠিয়ে দিত৷ পালকি চেপে দু-বোন গিয়ে সে বাড়ির রান্নাবান্না করে দিয়ে আসতেন৷ বাড়িতে বসে পইতে তৈরি করতেন৷ সুপুরি কুচোতেন, খই মুড়ি ভাজতেন, ধান ভেনে চাল করতেন৷

আর দু-বোন বুড়ো হয়েছিলেন বটে, কিন্তু যত ভাব ছিল তত ঝগড়া করতেন৷ কেউ যদি বলত দক্ষপিসি ভালো পায়েস রাঁধেন, রক্ষেপিসি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন৷ রক্ষেপিসি ভালো কাঁথা সেলাই করেন বললে দক্ষপিসির মুখ তোলো হাঁড়ির মতো থমথমে হয়ে যেত৷

খুব দজ্জালও ছিলেন৷ সবাই ভয় পেত৷ ছেলে-বুড়ো সবাই ওঁদের পিসি বলত৷ টুনিও পিসি বলত৷ টুনি আসলে গয়লাবাড়ির থাকোমণির মেয়ে৷ থাকোমণি টুনিকে দক্ষপিসিদের উঠোনে কুলগাছের নীচে বসিয়ে রেখে বাড়ি বাড়ি দই মাখন দিতে যেত৷ টুনি কম পাজি ছিল না৷ দক্ষপিসি রক্ষেপিসি কাজ ভালোবাসেন বলে ও ওঁদের দেখিয়ে দেখিয়ে উঠোন ঝাঁট দিত, ওঁদের নাইবার ঘটি ঝকঝকে করে মেজে দিত৷

দুপুরে ওঁদের পাকাচুল তুলে দিত, দুই পিসি বলতেন টুনির মতো মেয়ে হয় না৷

সেই টুনির ছ-বছরে বিয়ে হল৷ টুনির বয়স যখন তেরো হল তখন থাকোমণি ওকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দিয়ে এল৷ শ্বশুরবাড়ি বহরমপুর-গোরাবাজারে৷ টুনির শ্বশুরের খুব নামডাক৷ অনেক গোরু আছে, অনেক দুধ-দই-মাখন-ঘি ও গোরাবাজারের গোরা সেপাইদের বেচতে যায়৷

থাকোমণি যখন ফিরে এল তখন দক্ষপিসি রক্ষেপিসি বললেন, ‘অ থাকো, টুনির ঘরদোর কেমন দেখলি?’

থাকোমণি বলল, ‘তারা সব শহরের মানুষ গো পিসি৷ পিঁড়ি নয়, চৌকি পেতে আমায় বসালে৷ টুনির শাশুড়ি আমায় মুড়ি বাতাসা দিল না গো! কেমন সন্দেশ দিলে জল খেতে! তবে হ্যাঁ, কষ্ট হবে৷’

‘কী কষ্ট?’

‘দেখলাম ওরা খায়দায় রাত্তির করে৷ আমরা পাড়াগাঁয়ে রাত হলে তো পিদিম জ্বেলে কাজকর্ম তেমন করি না৷ ওরা কিন্তু ভাত খায় তেতপ্পর রাতে৷ টুনি তো জান সন্ধ্যে হতে ঘুমোয়৷ ওকে বললাম, ঘুমোসনি টুনি৷ শাশুড়ি তোকে বকবে৷’

‘খাওয়াদাওয়া বেশ ভালো?’

‘তা আর নয়? জেলেনিরা রোজ মাছ দিয়ে যায় গো৷ সম্বচ্ছর মাছ জোগান দেয় আর বছুরকি কাপড়টা, টাকাটা ধান চালটা নেয়৷ এই বড়ো বড়ো চারটে উনোন৷ এই বড়ো হাঁড়িতে ভাত হয়! কী বড়োলোক ওরা! ভোরবেলা ঘি ঢেলে গরম ভাত খায়৷ বেলায় দুধ মুড়কি দিয়ে ফলার করে৷ ফলার করে টুনির শাশুড়ি রাঁধতে যায়৷ সে কী চিৎকার যদি শুনতে! মাছ কুটে দে, জল এনে দে, হলুদ বেটে দে!’

‘শাশুড়ি মানুষ কেমন রে থাকো?’

‘মানুষ কি আর মন্দ হবে? ওই একটু চিৎকার করে আর রাগ হলে পরে গোরুর খোঁটা নিয়ে রাখালদের একটু মারে৷ আর ওই এক অব্যেস! টাকাপয়সা সোনাদানা মাটিতে পুঁতে তার ওপর চৈকি পেতে ঘুমোয়৷ জান না? ওর বাড়িতে পিসি ডাকাত যেয়ে যেয়ে ঘুরে এসেছে, কিছুই করতে পারেনি৷’

সবাই বেশ খুশি হল৷ টুনি ভালো আছে, ভালো খাচ্ছেদাচ্ছে৷ দক্ষ আর রক্ষে ঠাকরুন বললেন, সুযোগ পেলে টুনিকে গিয়ে দেখে আসবেন৷

বানঝাটিয়া গ্রাম থেকে কেউ কখনো হটর হটর করে বিদেশে যায় না৷ তা সেবার বেশ ঝড়জল হল৷ তারপর ভালো ধান হল খেতে৷ দক্ষ আর রক্ষে ঠাকরুন দাদাকে বললেন, ‘মনে করছি একবার যেয়ে কিরীটেশ্বরীর পুজো দেব আর আমাদের ইচ্ছেদিদিকে দেখে আসব৷’

ইচ্ছাময়ী ওঁদের দিদি৷ তিনি থাকেন ভাগীরথীর ওপারে৷ দাদা বললেন, ‘কেমন করে যাবি? গোরুর গাড়ি চেপে?’

‘কেন? পায়ে কি বাত ধরেছে আমাদের?’

দাদার পায়ে বাত আছে৷ বারোমাস গরম তেল মালিশ করতে হয়৷

দাদা বললেন, ‘রাখাল ছোঁড়া সঙ্গে যাবে?’

‘কেন? আমরা কি পথ চিনি না?’

দাদার বউ বললেন, ‘তা ভালো কথা৷ তবে আমার একটা কথা ছিল৷’

‘কী?’

‘ওই তোমাদের দিদি সেবার এসে আমার বঁটি দেখে বড্ড পছন্দ করেছিলেন৷ কামারবাড়ি থেকে গড়িয়ে এনেছি৷ ওঁকে দিতে পারবে?’

‘পারব না কেন? আমাদের কি তোমার মতো সুখের শরীর যে একখানা বঁটি নিয়ে হাত ভেঙে যাবে?’

দক্ষপিসি রক্ষেপিসি কারও সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলে না৷ উত্তর দিয়েই দু-বোন ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে খড় কুচোতে বসলেন৷ রাখাল আছে, মাহিষার আছে, কিন্তু গোরুর খড়টি নিজেরা কাটা চাই আর গোরুকে যত্ন করা চাই-ই চাই৷

ওঁদের গ্রাম থেকে কিরীটেশ্বরীর মন্দির আর ইচ্ছেদিদির গ্রাম মাত্রই সাত মাইল৷ কিন্তু তোড়জোড় দেখে মনে হল দু-বোন যেন কোথায়-না-কোথায় যাচ্ছেন৷

পথে জল খাবার ঘটি নেওয়া হল, চান করবার গামছা, দু-খানা কাপড়, ইচ্ছেদিদির বঁটি৷ তা ছাড়া চারটি সরু চিঁড়ে, বাতাসা, সুপুরি, সব বেঁধে নেওয়া হল৷

গ্রামে সবাই বলল, ‘ঃও, দুই পিসি ধর্মস্থানে যাচ্ছেন, চলো পেন্নাম করিগা৷’

তারা পেন্নাম করলে, পায়ের ধুলো নিলে৷ ভরত বেশ গান গাইতে পারে৷ সে এসে কীর্তন গেয়ে গেল খোল বাজিয়ে৷

দক্ষপিসি বললেন, ‘হ্যাঁ রে ভরত, তোর নাকি খুব পয়সা হয়েছে শুনতে পাই৷ তুই বউকে মুড়িকিমালা গড়িয়ে দিইছিস?’

‘পেতলের গো পেতলের!’

ভরত সরে পড়ল৷ বড়ো দিনকাল খারাপ৷ ভরত কাউকে মারে না, ধরে না৷ কত কষ্ট করে ডাকাতি করতে যায়, শুধু টাকাকড়ি গয়নাগাটি কেড়ে আনে৷ তবু শোনোগে দিনরাত সায়েবরা ঢ্যাঁড়া দিচ্চে পিসি ডাকাতকে ধরা চাই৷

পিসিরা যখন রওনা হবেন সেই সময়ে থাকোমণি টুনিকে নিয়ে এসে কেঁদে ওদের পায়ে পড়ল৷

‘কী হয়েছে?’

‘না, টুনি সন্ধ্যে হতে ঘুমোয়, দরজা বন্ধ করতে ভুলে যায় বলে ওর দজ্জাল শাশুড়ি ওকে মেরেধরে গয়নাগাটি কেড়ে নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে৷’

‘গয়নাগাটি?’

থাকোমণি বলল, ‘হ্যাঁ গো ঠাকরুনরা, মাকড়ি, মাথার চিরুনি, সব কেড়ে নিয়ে খোঁটা মেরে গা গতরে ব্যথা করে পাঠিয়ে দিয়েছে৷’

দক্ষপিসি আর রক্ষেপিসি বললেন, ‘বউঠানের কাছে কবরেজি তেল আছে চেয়ে নি গে যা৷ ঘুরে আসি, তা বাদে দেখব৷’

পথে বেরিয়ে দু-জনে কী খুশি৷ আলপথ ধরে ধান খেত দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলেন আর যাকে দেখেন তাকেই বলেন, ‘বিদেশে যাচ্ছি৷’

সন্ধ্যে যখন হয় তখন ওঁরা বহরমপুরে৷ ওদিকে সায়েব গোরাদের ছাউনি৷ সে তো মেলেচ্ছ জায়গা৷ এখন কোথায় রাতটা কাটান?

এখানে বামুনবাড়ি আছে নাকি জিজ্ঞেস করতে মোটাসোটা একটা লোক ওঁদের পেন্নাম করে বলল, ‘মা ঠাকরুন! বামুনবাড়ি এট্টু দূরে৷ আমার বাড়ি চলো না কেন? আমি গয়লা বটি, তা আপনারা গেলে নতুন ঘরে থাকতে দেব৷ গাই দুইয়ে কাঁচা দুধ, পাকা আম আর বাতাসা দেব৷’

দক্ষপিসিরা বললেন, ‘তা চলো৷’

দু-বোনের ভয় ভয় করল, আবার মজাও লাগল বেশ৷ পথে বেরোবার মজাই তো এই৷ নতুন নতুন জায়গায় থাকা হয়, নতুন নতুন লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়৷ দু-জনে গিয়ে তো গয়লাবাড়ি উঠলেন৷ খুব বড়ো বড়ো ঘর, চারিদিকে উঁচু পাঁচিল৷ ওদের পয়সা আছে৷ ইট পুড়িয়ে পাঁচিল দিয়েছে৷ উঠোনের একপাশে নতুন ঘর একখানা৷ তাতে চৌকি পাতা৷ বাড়ির গিন্নি এসে ওঁদের পা ধোয়ালে, চুল দিয়ে মোছালে৷

ওঁদের চৌকিতে বসিয়ে গিন্নি বলল, ‘মা গো! এই ঘরে মেঝের ওপর চৌকিতে আমি ঘুমোই৷ এই ঘরটা শক্তপোক্ত কিনা!’

‘তা বটে৷ ইটের দেওয়াল, খড়ের চাল৷ চালের নীচে কাঠের পাটাতন৷’

‘মা ঠাকরুনদের নিবাস কোথা গো?’

‘অনেক দূরে৷’

গিন্নি পাখা নেড়ে হাওয়া খেতে খেতে বলল, ‘কত ভাগ্যে তোমরা আমার ঘরে পা দিলে গো, তা সেবাযত্ন যে করব তার উপায় কী? ছিল একটা বউ, সেবাযত্ন করত৷ এমন পাজি মেয়ে আর বোলো না৷ সন্ধ্যে হতেই ঘুমোবে, বাড়িতে চোর ঢুকল কি ডাকাত তার খেয়াল নেই৷’

দক্ষ আর রক্ষেপিসির চোখ গোল গোল হয়ে গেল৷ রক্ষেপিসি বললেন, ‘বউটার নাম কী?’

রক্ষেপিসি এই সময়ে দক্ষপিসিকে রামচিমটি কাটলেন৷ গিন্নি আপন মনে বকবক করে করে একসময়ে ঘুমিয়ে পড়ল৷

দুই বোন কানে কানে ফিসফিস করে কথা বললেন, মতলব আঁটলেন৷ তারপর রাত যখন তিন প্রহর, সবাই যে-যার ঘরে ঘুমে অচেতন, ওঁরা গিন্নিকে ঠেলেঠুলে তুললেন৷ গিন্নি তো চোরডাকাতের ভয়ে মরে, ধড়মড় করে উঠে বসল৷

উঠে দেখে সর্বনেশে কাণ্ড৷ দুই ঠাকরুন মশারির দড়ি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, একজনের হাতে নাকি খাঁড়া৷ আসলে সেটা ইচ্ছেদিদির বঁটি৷ গিন্নির মাথা তখন বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে, তাই ও স্পষ্ট দেখল একজনের হাতে খাঁড়া৷ আরেকজনের চোখ আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলছে৷

‘পিসি ডাকাতের নাম শুনেছ? আমরা পিসি ডাকাত৷’

‘অ্যাঁ?’

‘আমরা পিসি ডাকাত৷ শিগগির সর, আমরা গয়না নেব৷’

‘পিসি ডাকাত? আমার ঘরে পিসি ডাকাত?’

দক্ষপিসি বললেন, ‘হ্যাঁ৷ আমাদের ভাইপোরা বাইরে আছে৷’

‘বাঁচাও গো!’ বলে গিন্নি উলটে পড়ে গেল৷

‘একটি ট্যাঁ ফোঁ করলে পরে…’

গিন্নি দাঁতে দাঁত লেগে অজ্ঞান হয়ে রইল৷ দক্ষপিসিরা পাটাতনের নীচ থেকে মাকড়ি, চিরুনি, হেনতেন চারটি গয়না পোঁটলা করে নিলেন৷ তারপর দোর খুলে দেখেন অন্ধকার পাতলা হচ্ছে৷ দু-জনে নেমে গুটিগুটি খিড়কির দোর খুলে পথে বেরোলেন৷

অন্ধকারে পথ চিনে একটু এগিয়ে বট গাছের নীচে বাঁধানো থানে একটু বসে রইলেন৷ ভোরের আলো ফুটেছে-কি-ফোটেনি দু-বোন গিয়ে নদীর ধারে পৌঁছোলেন৷ শেষরাতেই মাটির কমণ্ডলুর ভেতর পিদিম বসিয়ে মাঝিরা নৌকা চালায়৷ হাটুরেরা চাল আনে, কুমড়ো আনে৷

ইচ্ছেদিদির বাড়ি দেখতে দেখতে দশ দিন থাকা হল৷ ভাগীরথীর এপারে-ওপারে সকলের মুখে শুধু পিসি ডাকাতের কথা৷ পিসি ডাকাত ভাইপোদের নিয়ে জগন্নাথ ঘোষের বাড়ি ঢুকে গিন্নিকে মেরেধরে একধামা সোনার গয়না নিয়ে গেছে, হেনতেন৷ চারদিকে হইচই খোঁজাখুঁজি চলছে৷ জগন্নাথ ঘোষ নাকি কিছুই বলতে চায় না৷ যত বলবে কইবে, ডাকাতদের রাগ ততই বাড়বে৷

দক্ষপিসি রক্ষেপিসি সব শুনে ভয়ে কাঁপতে লাগলেন৷ শেষ অধি পালকি ভাড়া করে দু-বোন গ্রামে ফিরলেন৷ পালকি বেয়ারার খরচ ভেবে দাদার রাগ হয়েছিল৷ কিন্তু পিসিরা গুড়, পটল, নারকেল, ঘি, সরু চাল, সোনামুগের ডাল সবসুদ্ধ নিয়ে যখন নামলেন, তখন দাদার রাগ জল হয়ে গেল৷ তখনই গরম ভাত, মুগের ডাল, লাউয়ের পায়েস, কত কী রান্না শুরু হল৷ বেয়ারা চারটেও হুপুসহাপুস করে খেল৷

থাকোমণিকে ডেকে দক্ষপিসিরা কী যেন কানে কানে বলে দিলেন৷

ক-দিন বাদে টুনির সর্বাঙ্গে গয়না পরিয়ে থাকোমণি টুনিকে শ্বশুরবাড়ি দিয়ে এল৷ বলল, ‘তোমার বউকে তার পিসিরা এইসব মাকড়ি, চিরুনি, পায়ের মল, খোঁপার কাঁটা দিয়েছে৷’

‘অ্যাঁ? পিসিরা দিয়েছে?’

‘হ্যাঁ৷ বলে দিয়েছে টুনিকে যদি মারধর করে তাহলে তেনারা খুব রাগ হবেন৷’

টুনির শাশুড়ি তিন-চার বার ঢোক গিয়ে বললে, ‘না না৷ রাগ করে কে? ওর পিসিরা কি আপন পিসি?’

‘আপনার চেয়ে বেশি আপন৷’

থাকোমণি মুচকি হাসলে আর একটা কালো হাঁড়ি নামিয়ে দিয়ে বললে, ‘চাট্টি ক্ষীরের নাড়ু রেখে গেলাম দিদি, খেয়ো৷’

শাশুড়ির মুখে আর কথা নেই৷ কে কথা বলতে যাবে? কে ডাকাতদের চটাতে যাবে?

খবরটা কিন্তু চাপা রইল না৷

টুনিই ক্রমে ক্রমে বলে ফেলল সব৷

ভরতের নাক-কান যেন কাটা গেল৷ পিসি ডাকাত বলতে যে তাকেই বোঝায় তা কে বিশ্বাস করবে? ওর দলের লোকদের বাপ-কাকা-মামারা বলতে লাগল, তাই যদি হবে তবে জগন্নাথ ঘোষের বাড়ি কারা গিয়েছিল?

ভরতও মনে মনে ভেবে দেখল যা হবার তা হয়েছে৷ এখন আর ডাকাতি না করাই ভালো৷

সবচেয়ে মজার কথা হল, দক্ষপিসি রক্ষেপিসি মোটেই জানতেন না ভরতই আসলে পিসি ডাকাত৷

ভরত ডাকাতি ছাড়বার পর বেজায় খুশি হয়ে ওর বউ একধামা লাউ-বেগুন-শসা-কলা আর এক ছাঁচ মিছরি উঠোনে রেখে ওঁদের পেন্নাম করে গেল৷

বলে গেল, ‘কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম মা কালী বলতেছেন, পোড়ারমুখি! ঝগড়াটি! যা! ওনাদের চরণ ধরে পেন্নাম করগা যা৷ রোজ পেন্নাম করবি, নইলে তোকে মজা দেখাব৷’

পিসি ঠাকরুনরা খুব খুশি হলেন৷ নিজেরা বলাবলি করলেন, ভরত যেমন ভালো, ওর বউও তেমনি লক্ষ্মী৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *