গল্প
উপন্যাস
জীবনী

বিরসা মুন্ডা – মহাশ্বেতা দেবী

বিরসা মুন্ডা

‘দিকু জাতি দুকু দাসা আতুতান দিসুম…’
জমিদারের অত্যাচারে মানুষের উপর অবিচারে দেশ উত্থালপাথাল
চলো নিই ধনুক আর তির আর কুড়োল
আজ আমাদের কাছে জীবনের চেয়ে মরণ প্রিয়
বিরসা ভগবান আমাদের নেতা
আমাদের জন্য সে ধরায় নেমেছে আজ
তৃণ, তির ও তরোয়াল নিয়ে তৈরি হই চলো
আমরা জমায়েত হব ডোমবারি পাহাড়ে
ধরতিআবা সেখানে কথা বলছে
বানরের ভয় করি না আমরা
জমিদার মহাজন দোকানি বিদেশিদের ছেড়ে দেব না
তারা আমাদের জমি দখল করেছে৷
আমাদের খুঁটকাট্টি হক ছেড়ে দেব না
চিতাবাঘ আর সাপের সঙ্গে লড়ে হাসিল-করা জমি
সেই সুফলা জমি ওরা কেড়ে নিয়েছে৷৷

সিংভূম-রাঁচিতে কখনো কোনো মুন্ডা গ্রামে কি তুমি গেছ যখন শীতকালে সন্ধ্যায় আগুন জ্বেলে গোল হয়ে সবাই বসে, আর গান গায়? যদি তোমাকে দেখে ওরা গান না থামায়, তবে জানবে যে তোমাকে ওরা শত্রু মনে করে না৷ যদি তেমন সৌভাগ্য তোমার হয়, তাহলে তুমিও শুনতে পাবে এই গানটি৷

এটি কীসের গান?

উলগুলানের গান৷

উলগুলান কী?

মুন্ডাদের বিদ্রোহ৷

সে কোন বিদ্রোহ?

বিরসা ভগবানের বিদ্রোহ৷

বিরসা কি ভগবান? বিরসা কি মানুষ? বিরসা আজ ওদের কাছে ভগবান৷ কিন্তু এই ‘ভগবান’ই মুন্ডা জাতিকে যুদ্ধ করতে নামিয়েছিল ইংরেজের সঙ্গে৷ তাই বিরসা মুন্ডা সকল মুন্ডার কাছে, সকল আদিবাসীর কাছে, সিদু ও কানুর মতোই এক পরম প্রিয় নাম৷ গরিব মুন্ডা মায়ের ছেলে বিরসা চলে গেছে সেই কবে৷ কিন্তু আজও যারা জমিদার, মহাজন, ঠিকাদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা বিরসার সেই শেষ-না-হওয়া লড়াইটা লড়ছে৷ বিরসাও তো লড়েছিল সিদু-কানুর শেষ-না-হওয়া এক লড়াই৷ আজ যেখানে যে আদিবাসী হকের লড়াই লড়ে, সে লড়ে সিদু-কানু ও বিরসার লড়াই৷ শাল গাছে ফুল ফোটার যেমন শেষ নেই, তেমনি শেষ থাকে না এসব যুদ্ধের৷

বিরসার যুদ্ধের নাম উলগুলান, সাঁওতালদের ১৮৫৫-৫৬ সালের গণবিদ্রোহের নাম হুল৷ এ ছাড়াও আদিবাসীদের মধ্যে বার বার বহু বিদ্রোহ হয়েছে ও হয়ে চলেছে৷ কী কী কারণে এইসব বিদ্রোহ হয়েছে ও হয়? হয় তখন-

১. যখন বাইরের লোকজন এসে আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেয়৷ অরণ্যের কী কী অধিকার হারিয়ে যায়? এগুলি হল, জঙ্গল কেটে আদিবাসীরা যেসব জমি তৈরি করে চাষবাস করছে, তাদের যখন সে-জমি থেকে ছলে-বলে-কৌশলে উচ্ছেদ করা হয়৷ বনজ সম্পদ, যেমন কাঠ, মধু, ফল, পাতা, কন্দ জোগাড় করে জীবন চালানো, পশুপাখি মেরে খাওয়া, এসব অধিকার যখন চলে যায়৷

২. যখন মহাজনরা নিরক্ষর ও সরল, আইনের মারপ্যাঁচ-না-জানা আদিবাসীদের ঋণের জালে বেঁধে ফেলে৷

৩. যখন আদিবাসীদের এলাকায় খনিজ সম্পদ, বনজ সম্পদ এসব নেবার জন্যে বড়ো বড়ো শিল্প আর ব্যবসা গড়ে ওঠে৷ কিন্তু তা থেকে যত টাকা আসে, তার কিছুই আদিবাসী অঞ্চলের লোকজনের উন্নতির জন্যে খরচ হয় না৷

৪. যখন আদিবাসীদের শুধু সস্তায় কুলি খাটানো হয়, আর সে-কাজও তারা সব সময়ে পায় না বলে দূর দূর দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়৷

৫. যখন তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প সবকিছু একদিকে অবহেলা করা হয় আর অন্যদিকে তাদের ওপর অন্যরকম ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়৷

এইসব ব্যাপারকেই মোটামুটি কারণ বলে ধরতে পার৷ অবশ্য তা বলে ১৮৩১-৩২ সালের কোলবিদ্রোহ, ১৮৫৫-৫৬ সালের সিদু-কানুর হুল, এগুলি যখন ঘটে তখন এইসব কারণের সবগুলি তো নিশ্চয় একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল না, যেমন আদিবাসী অঞ্চলে খনিজ সম্পদের লোভে বড়ো শিল্প-কারখানা তখনই গড়ে ওঠেনি৷ কিন্তু অন্য কারণগুলি তো ছিলই৷ আদিবাসী জনসংখ্যা যেখানে বেশি, বিহার-ওড়িশা-মধ্যপ্রদেশ-পশ্চিমবঙ্গ, এসব জায়গায় কারা ধনী জমিমালিক, কারখানা-মালিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি আর আদিবাসীরা তাদের মধ্যে কতজন, সে হিসেবটা নিলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ যাক গে, অত কথায় না গিয়ে বিরসার আন্দোলনের কথাই বলা যাক৷

বিরসার নেতৃত্বে উলগুলান চলেছিল ১৮৯৫-১৯০০ সাল অবধি৷ তার আগের কথা একটু জেনে নেওয়া দরকার৷ আগের কথা সবসময়ে জেনে নিতে হয়৷ না জানলে মনে হবে এই উলগুলান বুঝি একেবারে ভুঁইফোড় একটা ঘটনা৷

না না, তা নয়, বড়ো বা ছোটো বিদ্রোহ তো ভানুমতীর খেলা নয়৷ তোমরা সবাই বোধ হয় পথের ম্যাজিকঅলার কাছে সেই ম্যাজিকটা দেখেছ৷ সেই যে, যে-ম্যাজিকঅলা টবে একটা আমের আঁটি পুঁতে দেয় আর নিমেষে আঁটি থেকে গাছ হয়, গাছে ফল ধরে৷ এ তো ম্যাজিক৷ দেখি, কিন্তু বিশ্বাস করি না৷ আম গাছ বড়ো হতে, ফল ধরতে কতদিন লাগে তা তো আমরা জানি৷ সে কি নিমেষে হয়?

বিদ্রোহ বা বিপ্লব ঘটাতে হলেও তেমনি, হঠাৎ কিছু হবার নয়৷ অনেক আগে থেকে তার কাজ শুরু হয়ে যায়৷ বিরসা মুন্ডার বিদ্রোহ সেদিন ইংরেজশাসকরা বন্দুকের জোরে থামিয়ে দেয়৷ কিন্তু এমন এক আদিবাসী বিদ্রোহে তো ইংরেজদের জয়ে কোনো গৌরব নেই৷ তাদের ছিল তিরধনুক, ইংরেজদের ছিল বন্দুক, তাই জিতেছিল৷ তাতে কী? ইংরেজদের সে-জয় নিয়ে কি নিরক্ষর দুঃখী মানুষরা গান বেঁধেছে৷ বিরসাকে নিয়ে কিন্তু তারা আজও গান গায়-

দিকু জাতি দুকু দাসা আতুতান দিসুম-

বিরসার সেদিনের পরাজয় ইংরেজদের সেদিনের জয়ের চেয়ে অনেক বড়ো৷ বিরসার নাম আজও আদিবাসীদের প্রেরণা দেয়৷

ছোটোনাগপুরের অন্তর্গত সিংভূম, রাঁচি, পালামৌ এসব জেলায় মুন্ডা, ওরাওঁ, হো আদিবাসীদের বসতি ছিল৷ অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ ১৭৫০-১৮০০ সালের সময়ে এখানে বাইরের জমিলোভী মানুষজন ঢুকে পড়ে৷ এর ফলে আদিবাসীদের চাষবাস ও গ্রাম-সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়তে লাগল৷ জঙ্গল হাসিল করে তারা যে খুঁটকাট্টি গ্রাম (‘মুন্ডাদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যে সমস্ত পরিবার বনজঙ্গল কেটে জমি তৈরি করে বসতি স্থাপন করত, তারাই সমবেতভাবে সে জমির মালিকানাস্বত্বও ভোগ করত৷ তাদের বলা হতো খুঁটকাট্টিদার৷ খুঁটকাট্টিদাররা সবাই মিলে প্রতি পরিবারের ব্যবহারের জন্য জমি নির্দিষ্ট করে দিত’৷ এভাবেই গড়ে ওঠে খুঁটকাট্টি গ্রাম-স.*) পত্তন করেছিল, তা আর তাদের রইল না৷ মুন্ডা সমাজে পহান বা পুরোহিত ধর্মীয় ক্রিয়াকাজ উৎসব দেখতেন৷ গ্রাম-মানকি বা মোড়ল গ্রামব্যবস্থা দেখতেন৷ আখাড়া বা ইউথ হস্টেল ছিল ছেলেদের ও মেয়েদের আলাদা আলাদা৷ সেখানে তারা একসঙ্গে থাকার সামাজিক শিক্ষা পেত৷

ছোটোনাগপুরের রাজা তার আত্মীস্বজনকে জমি ও গ্রাম দিয়ে জায়গিরদার করে দিল যখন, তখন মুন্ডারা সরে যায় দক্ষিণ খুঁটি ও পশ্চিম তামাড় অঞ্চলের পাহাড়ি জঙ্গল এলাকায়৷ ১৮৩১-৩২ সালের কোলবিদ্রোহের পর সেসব জায়গাতেও জমিদার ও জায়গিরদাররা চলে এল৷ এরা রাজা আর আদালতের কাছে দখলের কাগজ বা পাট্টা নিয়ে মুন্ডা গ্রামগুলি অধিকার করতে থাকল৷ ১৮৬৩ সাল অবধি ইংরেজ সরকার জমিদারদের পুলিশের কাজ করার ক্ষমতাও দিয়ে রেখেছিল৷

ফলে মুন্ডারা হারাল স্বাধীনতা৷ ভেঙে পড়ল তাদের গ্রাম ও সমাজব্যবস্থা৷ জমির দখল তাদের চলে গেল৷ পহান ও মানকির কোনো ক্ষমতা রইল না৷ জমিদাররা তাদের কাছ থেকে খাজনা হিসেবে ফসল তো নিলই৷ আবার জোর করে বিনা মজুরিতে বা বেঠবেগারিতে খাটিয়ে নিতে থাকল৷ এইসব বাইরের অত্যাচারী লোকরাই মুন্ডা সাঁওতাল-হো-ওরাওঁদের কাছে ‘দিকু’ নামে পরিচিত৷ ১৮৬৯-৭০ সালের একটি সরকারি রিপোর্টে এই অত্যাচারের কথা জানা যায়৷ তাতে লেখা হয়েছে:

অত্যাচারীর যখন ঘোড়া দরকার, দাম দেবে কোল (কোল-এখানে মুন্ডা ও ওরাওঁদের বোঝানো হচ্ছে)৷ যখন সে পালকি চায়, কোলরা দাম দেবে, পালকি বইবে৷ জমিদারের গায়ক, দুধেলা গাই, পান, সব খরচ কোলদের৷ তার বাড়িতে কেউ মরেছে? ওদের কাছে খরচা নাও৷ কোনো শিশু জন্মাল? পার্বণী তোলো৷ বিয়ে অথবা পুজো হবে? কোল তার পার্বণী দেবে৷ কাছারিতে ঠিকাদারের শাস্তি হল, জরিমানা হল? কোলরা টাকা দেবে৷ কোলের বাড়িতে শিশু জন্মাল, ছেলে বা মেয়ের বিয়ে হল, কোল সেজন্যও পার্বণী দেবে৷ এই লুঠ, শাস্তিদান আর বাটপাড়ি চলতে থাকে৷ হতভাগ্য কোলটি দেশ ছেড়ে পালায়৷ এই অত্যাচারীরা কোলদের যথাসর্বস্ব শুধু কেড়ে নেয় না, তাকে ঋণ নিতে বাধ্য করে৷ আর ঠিকাদার যদি কাছারিতে, কোনো বিয়েবাড়িতে বা তীর্থদর্শনে যায়,-সে যতদূর হোক না কেন, কোলদের সঙ্গে যেতে হবে ও বেঠবেগারি দিতে হবে৷

গ্রামে গ্রামে চলত এই বেঠবেগারি৷ বছরভর বেশ কিছুদিন বিনা মজুরিতে মালিকের জমি চাষ করতে হত৷

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ছোটোনাগপুর যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে এল তখন ১২,৫০০ বর্গ মাইলের এলাকায় একজন ইংরেজ শাসক৷ হিন্দু ও মুসলিম কর্মচারীদের তো আদিবাসীদের ওপর কোনো দয়মায়া নেই৷ তাই শোষণ ও অবিচার বেড়ে চলল৷ সাহেবদের চোখে আদিবাসীরা ‘চোয়াড়’ ও ‘ডাকাত’৷ ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থায় আদিবাসীরা আরও মার খেল৷ আদালতে কাজের ভাষা হিন্দি ও উর্দু তারা জানে না, বোঝে না৷ তাদের ঠকাতে থাকল উকিলরা৷ ফলে আদিবাসীদের মনে দিকু, ব্রিটিশশাসন, সব কিছু সম্পর্কে অবিশ্বাস জন্মে গেল৷ গ্রামে তাদের পারহা ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আর চলে না৷

সুবিধা বুঝে আসামের চা-বাগানে কুলি নেবার জন্যে আড়কাঠিরা চলে এল৷ দলে দলে হতভাগ্য আদিবাসীরা দেশ-ঘর ছেড়ে চলে যেতে থাকল৷ ১৮৬৪-৬৭ সালের মধ্যে

মুন্ডা … ৩৯৮৬

ওরাওঁ … ১০৫৮

ভুইয়াঁ … ১৫৪৬

সবসুদ্ধ ৬৫৯০ জন এভাবে চলে যায়৷ তারপর আদিবাসীরা নিজেরা চাল থেকে যে হাঁড়িয়া তৈরি করে খেত, তাতে তাদের ক্ষতি হত না৷ এখন ব্রিটিশ সরকার আবগারি লাইসেন্স দিয়ে পাঁচ-দশ মাইল দূরে দূরে মদের দোকান বসিয়ে দিল৷ হাঁড়িয়া আদিবাসীদের পানীয়, তা পূজা ধর্মকাজে লাগে৷ তাতে তাদের মধ্যে মদের নেশা ঢোকেনি৷ ব্রিটিশ সরকার তাদের নেশাড়ে করে তুলল৷

আর এই সময়েই, হিন্দু রাজা ও জমিদারের দৌলতে আদিবাসীদের মধ্যে নানারকম হিন্দু সাধুসন্ন্যাসীর দল ঢুকে পড়ল৷ তারা ভেঙে-পড়া মুন্ডাসমাজের আদি ধর্মবিশ্বাসে নানারকম প্রভাব বিস্তার করল৷ তারপর এল ১৮৪৪ সাল থেকে নানারকম মিশনারির দল৷ তারা যেমন স্কুল চালাত, সেবার কাজ করত, তেমনি আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করে খ্রিস্টানও করত৷ এভাবে মুন্ডাদের নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি, সবই যেন বিপন্ন হয়ে পড়ল৷ সব দিকে এক প্রলয়ের থমথমে সর্বনাশের অন্ধকার দেখা দিল৷

যতগুলি কারণ বললাম, বিরসার বিদ্রোহের পেছনে এর সবই ছিল৷ ছিল বলেই বিরসার আগেও সে-অঞ্চলে বার বার হয়েছে আন্দোলন৷ এখানে আরেকটি কথা বলে নেওয়া খুবই দরকার৷

মিশনারিরা আদিবাসীদের খ্রিস্টান করত ঠিকই৷ আবার সঙ্গেসঙ্গে লেখাপড়াও শেখাত৷ আদিবাসীদের প্রধান অসুবিধা ছিল, যে-ভাষায় আদালতে বা জমি সেটলমেন্টের অপিসে কাজকর্ম চালানো হয়, তা তারা বোঝে না৷ বোঝে না, জানে না, তাতেই তারা এমন করে ঠকে৷ এই খ্রিস্টান হয়ে-যাওয়া আদিবাসীরা হিন্দি ও ইংরেজি শিখল৷ এখন তারা সরকারি আইনকানুন কিছু কিছু বুঝল৷ আর একথাও বুঝল যে, জমিদারের গোলাম হয়ে থাকলে চলবে না৷ এই প্রথমদিকের খ্রিস্টান আদিবাসীরা এইভাবে সচেতন হয়ে উঠল৷

জমি হারাবার, সংস্কৃতি ও ধর্ম বিপন্ন হবার, দুই বিপদকে মুন্ডারা কিন্তু শান্ত হয়ে মেনে নেয়নি৷

মুন্ডারি গানে আমরা শুনি-

‘সেনোতানা দিসুম সেনোতানা…’

দেশ ছারখারে যাচ্ছে

কচ্ছপ যেমন জলে গড়ায়, জমি তেমন ভেসে যাচ্ছে

জমিতে লেগেছে লাল আগুন

যেন গাছে জাগছে নতুন লাল পাতা

জমি ছারখারে যাচ্ছে চলে

ওই ধুলো-ওড়া পথ ধরে

ধুলো-ওড়া পথে ধুলোর কণা যেমন,

জমি তেমনি উড়ে বেড়াচ্ছে

ও বিরিসা, তুমি উঠে এলে, জোয়ান মোষ যেন

(ছিন্নভিন্ন) জমিকে গেঁথে ফেললে একটা সুতোয়

ও বিরিসা, মুন্ডাদের ফিরিয়ে দিলে জমি৷৷

এভাবে যখন জমি হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকল, তখন ১৭৮৯ সাল থেকেই বিদ্রোহ শুরু হয়৷ ছোটোনাগপুরের পাঁচ পরগনাতে সবচেয়ে আগে ঢোকে বহিরাগতরা আর সেখানে মুন্ডা খুঁটাকাট্টি গ্রাম ধ্বংস হয় প্রথমেই৷ ১৭৮৯-১৮২০ অবধি একত্রিশ বছর ধরে ছোটো ছোটো বিদ্রোহ করে মুন্ডারা৷ এসব বিদ্রোহে হেরে গিয়ে ও পিছু হটেই তারা তামাড় ও খুঁটি অঞ্চলে যায়৷ এমন আদিবাসী কৃষকবিদ্রোহের কোনো ইতিহাস লেখা হয়নি৷ কিন্তু গানে গানে ধরা আছে সেই ভুলে-যাওয়া অতীত৷

একটি গানের কথা হল বিরসার মায়ের কথা৷ মা যেন তাঁর ছেলেকে বলেছেন,

‘ওকো কোতিম বিরিদ-আনা, মাধো সিং খণ্ডাম হিচিরে

সুসুনতেম সেনোতানা, দিরি সিং গুগুরাম সারিয়া…’

‘কোথা যাস বাছা?’

‘মাধো সিং তরোয়াল ঘোরাচ্ছে৷’

‘কোথা যাস বাছা?’

‘দিরি সিং ঘণ্টা বাজাচ্ছে৷৷’

এই দিরি সিং ও মাধো সিং মুন্ডা লোকগীতিতে খুব প্রিয় দুই বীর যোদ্ধা৷ বিরসা এঁদের ডাক শুনে চলে যাচ্ছেন৷ এই বক্তব্যটি কত সুন্দর৷ আগেকার যোদ্ধা আর বিরসা এইভাবেই এক হয়ে গেছেন৷

আরেকটি গানে কোলবিদ্রোহের সময় সিনজুরি গ্রামের কাছে দু-জন গোরা সৈন্যের মাথা কেটে ফেলার কথা বলা হয়েছে৷ গানটি এভাবে রচিত-

‘ও বিরসা, কী জন্য দেশ রক্তে ভিজে উঠেছে?

‘ও বিরসা, খুঁটকাট্টি অধিকার ফিরে পাবার জন্য

দেশের মাটি রক্তে ভেজা৷৷’

১৭৮৯-১৮২০ সালের মধ্যে বহু রক্তঝরা লড়াইয়ের পর মুন্ডারা পিছু হটে বটে৷ কিন্তু তাদের বিক্ষোভ থেকেই ১৮৩১-৩২ সালের ভয়ংকর কোলবিদ্রোহ জন্ম নেয়৷

ছোটোনাগপুরের রাজার ছোটো ভাই হরনাথ সাহী সোনপুরের মানকি ও মুন্ডাদের পৈতৃক গ্রামগুলি শিখ, মুসলিম ও অন্য ঠিকাদারদের দিয়ে দেয়৷

ফলে সোনপুর, তানার ও বন্দগাঁওয়ের হো, ওরাওঁ ও মুন্ডারা সমবেত হল৷ যুদ্ধ হবে৷ তিরের সংকেত পাঠানো হল দিকে দিকে৷ হো আদিবাসীরা অসম্ভব লড়াকু৷ লড়াকু হো-রা আসছে এ খবর ছড়িয়ে গেল৷ সুদূর পালামৌ জেলায় খেরোয়াররা এ যুদ্ধে যোগ দিল৷

কয়েক দিনেই জমিদার, মহাজন, ঠিকাদারা পালাল৷ এক বছরের কিছু বেশিকাল যুদ্ধ চলে৷ তারপর বিদ্রোহের দুই নেতা বিন্দরাই মানকি ও সুর্গা পরাজিত হলে ক্রমে বিদ্রোহ থামে৷ তারপর নেমে আসে ভীষণ অত্যাচার৷

তখন ধলভূম ও মানভূমে শুরু হয় ভূমিজ বিদ্রোহ৷ বিন্দরাই মানকি চলে যান সেখানে এবং ভূমিজ নেতা গঙ্গানারায়ণের সঙ্গে যোগ দেন৷ গঙ্গানারায়ণ ১৮৩৩ সালে নিহত হন৷

এখন ব্যাপক হারে আদিবাসীদের জমি থেকে উচ্ছেদ চলতে থাকে৷ যে কর্ণেল ডালটনের নামে ডালটনগঞ্জ শহর, সেই ডালটনের লেখা পড়লে বোঝা যায় কীভাবে আদিবাসী ভুঁইহার বা ছোটোজমির মালিক ও রায়তদের এ সময়ে জমির দখলে বঞ্চিত করা হয়৷ কোলবিদ্রোহের পর আদিবাসীদের দেশত্যাগ করে ভাতের খোঁজে বেরিয়ে পড়া আরও বেড়ে যায়৷

চলো চা-বাগানে চলো বাগানে গো

ঘর তোমার নাই

যাব চা-বাগানে যাব বাগানে গো

জমি আমার নাই৷৷

এসব গানে আদিবাসী জীবনের দুঃখই ফুটে ওঠে আর এদেশে আদিবাসী হয়ে জন্মাবার অভিশাপ এমনই যে, এই গান গাওয়া আদিবাসীদের আর শেষ হতে চায় না৷ শেষ হবে কী করে? সাঁওতাল, হো, ওরাওঁ, মুন্ডা, মাহাতো, এরা যে আজও শুধুই ঘর হারায় আর জমি হারায়! তাদের যে দৌড়োতে হয় কয়লাখাদানে, চা-বাগানে, ইটভাটিতে কাজের খোঁজে! তাই তো গানটা ওদের গাইতেই হয়৷

১৮৫০ সাল থেকে মিশনারি সায়েবদের কাজকর্ম খুব বেড়ে গেল৷ এ সময়ে আদিবাসীরা মিশনে যোগ দিতে থাকে ধর্মের কারণে নয়৷ তাদের বিশ্বাস ছিল যে মিশনের সাহেবরা তাদের প্রতি অবিচারের প্রতিকার করবেন৷ এ ব্যাপারটি যে কত গুরুত্বের, তা আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না৷ মিশনের সাহেবরা খ্রিস্টান মুন্ডাদের কিছু সাহায্য করলেন৷ তাতে জমিদাররা তো রেগে টং৷ খ্রিস্টান আদিবাসীরা তো জমিদারদের প্রজা৷ মজা হল, যাদের জমি থেকে তাড়িয়েছে, জমিদাররা চায় তারা তাদের খেতমজুরি করুক৷

জমিদাররা মিশনারিদের ওপর খেপে যায়৷ তাই ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে জমিদাররা রাঁচির জার্মান মিশন আক্রমণ করে আর খ্রিস্টান আদিবাসীদের ওপর জুলুম করে৷

এই মিশনারি হবার ব্যাপারটা একটু বলতে হল৷ কেননা খ্রিস্টান আদিবাসী রায়তরাই করেন সর্দার-আন্দোলন ১৮৫৮ থেকে চল্লিশ বছর ধরে, আর এই সর্দার-আন্দোলনের পটভূমিতেই সৃষ্টি হয় বিরসার গণবিদ্রোহ ‘উলগুলান’৷

সর্দার-আন্দোলনের লোকজন মিশন-প্রভাবিত৷ তাঁদের আন্দোলনের মজাটা দেখো৷ তামাড়বিদ্রোহ, কোলবিদ্রোহের সঙ্গে এঁদের মিল কোথায় তা আগে দেখো৷

ক. এঁরাও বললেন যে আমরা হচ্ছি ছোটোনাগপুরের আদি বাসিন্দাদের বংশধর৷ তাই জঙ্গল-পাহাড় শস্যক্ষেত্রে ঢাকা ছোটোনাগপুরের অধিকার আমাদের৷

খ. এঁরাও বললেন যে বেঠবেগারি বন্ধ করো৷ নারী ও ক্ষুধার্তের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো৷

গ. এঁরা বার বার তামাড় ও কোলবিদ্রোহের নেতাদের বীরত্বের কথা মানুষকে মনে করিয়ে দিলেন৷

এগুলো হল মিল৷ আর বেমিল কোথায়? সাহেবদের প্রভাব সর্দারদের ওপর পড়েছিল৷ তাই এঁরা হাতিয়ার নিয়ে লড়াই করার পথে সোজাসুজি গেলেন না৷

এঁরা বললেন, দিকু, ভারতীয় বিচারক ও জমিদারদের আত্মীয়স্বজন যেসব প্রশাসক, তাদের বিশ্বাস করি না৷ জমিদারদের খাজনা দিলেন না এঁরা, খাজনা নেয় যে তহসিলদার তাদের তাড়িয়ে দিলেন৷ তাঁদের যেসব জমি দখল করেছে দিকুরা, তা থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে চাইলেন৷

এইসব হারানো অধিকার ফিরে পাবার জন্যে তাঁরা আদালতে গিয়ে লড়লেন৷ মামলার খরচ চালাবার জন্যে চাঁদা তুললেন৷ প্রথম দিকে সর্দাররা ছোটোনাগপুরের রাজার বিপক্ষে হননি, ইংরেজেরও নয়৷ কিন্তু সর্দারদের এ জমির জন্যে লড়াই চলে চল্লিশ বছর ধরে৷ তারপর, ছোটো নদী যেমন একা একা সমুদ্রে পৌঁছতে পারে না-তাকে বড়ো নদীতে গিয়ে মিশতেই হয়-তেমনি করে বিরসার উলগুলানে গিয়ে সর্দার-আন্দোলন মিশে যায়৷

সর্দার-আন্দোলনের তিনটি অধ্যায়:

ক. জমির আন্দোলন ১৮৫৮-৮১

খ. মিশনের সঙ্গে গণ্ডগোল ১৮৮১-৯০

গ. রাজনীতিক আন্দোলন ১৮৯০-৯৫

ক. ১৮৫৮-৫৯ সালে এ আন্দোলন শুরু হয় আর বনের আগুন যেমন ছড়ায় তেমন তা ছড়িয়ে পড়ে সোনপুর, লোধমা, বেলকাড়ি, বাসিয়া, দোয়েসা ও খুখরা অঞ্চলে৷ ১৮৫৮ তে খাগরার খ্রিস্টান মুন্ডারা এক অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়৷ বালা অঞ্চলে এক জায়গিরদার ও তার প্রজাদের মধ্যে বাধল লড়াই৷ লড়াই বিষয়ে একটি হো গানে বলছে-

লড়াই হল তুষের আগুন

তুমি ভাবছ তা নিভে গেল

কিন্তু তা নেভে না৷

বাতাসে যদি তুষ ওড়ায়

এদিক-ওদিক আগুন জ্বলে

শুকনো ঘাসে শুকনো কাঠে৷

সে-আগুনে গা সেঁকা যায় না

সে-আগুন থেকে কাঠ জ্বেলে নিতে হয়৷৷

ঠিক তাই হল৷ আদিবাসী ভুঁইহার এলাকার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল৷ এবার সরকারের টনক নড়ল৷ আরে! আদিবাসীগুলো তো বেজায় পাজি! জমিদার দিয়ে ওদের উচ্ছেদ করালাম, ঠিকাদার এত অত্যাচার করল, বেঠবেগারির পাষাণভার বুকে চাপালাম, মিশনারিদের দিয়ে কত উলটো-পালটা বোঝালাম, তাতেও দেখছি ওদের কোমর ভাঙা যাচ্ছে না!

সর্দাররা হেঁকে বলল ‘এ আমাদের জমির লড়াই৷ এর নাম মুলক-ই লড়াই৷’

ইংরেজ সরকার দেখল এ তো মহা বিপদ৷ তামাড়, কোল, ভূমিজ, এসব বিদ্রোহ থামানো গেছে৷ ১৭৮০ সালে এক সাঁওতাল বীর বাবা তিলকা মাঝি ভাগলপুর অঞ্চল কাঁপিয়ে দিয়েছিল৷ ১৮৫৫ সালে ভাগনাডিহি গ্রামের সিদু-কানু দুই ভাই কী বিদ্রোহটা না করল৷ এই খ্রিস্টান আদিবাসীরা আবার কী শুরু করে তার ঠিক কী? এসব অঞ্চলে অভ্র, তামা, লোহা, কয়লাখনির মধ্যে আছে সাত রাজার ঐশ্বর্য৷ সেসব নিয়ে কারখানা হচ্ছে৷ আদিবাসীদের জমি থেকে তাড়িয়ে সেখানে পাঠানো হচ্ছে, আর চা ও কফি-বাগানে সস্তায় কুলি খাটানো হচ্ছে৷ এখন আর ওদের মধ্যে একতা গড়ে ওঠা ঠিক নয়৷ মুন্ডা-ওরাওঁ-সাঁওতাল-হো, সকলের সঙ্গে সকলের বিভেদ ঘটাতে হবে৷ ওদের নিরক্ষর করে রাখতে হবে৷ নইলে কুলিমজুর মিলবে না৷

সরকার বলল, লাল লোকনাথ সাইকে পাঠাচ্ছি৷ সে ১৮৬০ থেকে ১৮৬২ পর্যন্ত ভুঁইহারি জমি বিষয়ে খোঁজ খবর নিক৷ ৪২৭টা গ্রাম সমীক্ষা করুক৷ তোমরা বাপু একটু ধৈর্য ধরো৷

সবই হল৷ মুন্ডাদের কোনো লাভ হল না৷ লাল লোকনাথের রায় তাদের সাহায্যে লাগল না৷ সর্দাররা বলল ‘যে নিজে মুন্ডা নয়, সে কখনো মুন্ডাদের স্বার্থ দেখে?’

১৮৬২-৬৮ চলল খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ৷ ১৮৬৭ সালে ১৪০০ খ্রিস্টান মুন্ডা ছোটোনাগপুরের রাজা আর সরকারি কর্মচারিদের বিরুদ্ধে আর্জি করেন৷ ফলে ১৮৬৯ সালে এক আইন জারি হয়৷ ছোটোনাগপুরের ২৫টি পরগনার ২৪৮২টি গ্রামে ভুঁইহার ও মাঝিয়ারা হারানো জমির দখল ফিরে পায়৷

সর্দাররা মোটেই খুশি হল না৷ তারা বলল:

১. আমরা এমন ব্যবস্থায় খুশি নই৷ আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে শুরু করে আজ অবধি যত আদিবাসীর যত জমি খোয়া গেছে, সব ফেরত চাই৷

২. রাঝা, খুঁটকাট্টি ও কোরকার ভূমিব্যবস্থার জমিকে আজ জমিদাররা জোর করে নিজেদের আবাদি জমি বলে প্রমাণ করছে, দখল নিচ্ছে৷ যাদের জমি, তারা বাধা দিচ্ছে৷ ভুঁইহার আর মাঝিয়া জমির ব্যবস্থা করলেই হল? সব জমির ব্যবস্থা চাই৷

তারা ভারতীয় কমিশনারদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আর্জি দিল৷

সরকার বলল, ও আর্জি মানি না৷ কোলরা যদি ভাবে তারা খ্রিস্টান হয়ে মাথা কিনে নিয়েছে সরকারের, তাহলে ভুল করেছে৷ খ্রিস্টান কোলদের কোনো কথা শোনা হবে না৷

এর ফলেই মিশনের সঙ্গে গণ্ডগোল বাধল৷

খ. ১৮৭৯ সালে এক আর্জিতে মুন্ডারা দাবি জানায় যে, ছোটোনাগপুরের প্রকৃত মালিক তারা৷ ১৮৮১ সালে একদল সর্দার (এরা তো খ্রিস্টান ছিলই) ঘোষণা করল, ‘আমরা মায়েলের সন্তান৷ এক ‘জন দি ব্যাপটিস্ট’ আমাদের নেতা৷ দোয়েসাতে আমরা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলাম৷’ এই নেতাদের বিচার ও শাস্তি হল আদালতে৷

১৮৮৬-৮৭ সালে জার্মান লুথেরান চার্চের পাদ্রি নরকোটের কাছে ওই চার্চের মুন্ডারা দাবি জানাল, ছোটোনাগপুর ভূমিস্বত্ব আইনমতে তাদের হারানো জমি ফেরত দেওয়া হোক৷ নরকোটের তখন মাথায় হাত৷ লেখাপড়া শিখিয়েছি তা বলে কি বাপু আইনসম্মত অধিকার চাও?

নরকোট সিধা ‘ওসব হবে না’ বলে দিল৷ মুন্ডারা জার্মান মিশনারিদের প্রচুর গালাগাল করে চলে গেল তোরপায় পাদ্রি লিয়েভেনসের কাছে রোমান ক্যাথলিক চার্চে৷

দুটো চার্চে তফাত কী?

জার্মান লুথেরান মিশন প্রোটেস্টান্ট চার্চ৷ তারা যিশুর মূর্তি পূজো করে না৷

রোমান ক্যাথলিক চার্চ যিশুর মূর্তি পুজো করে৷ খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে রোমান ক্যাথলিকরা আগে এসেছে, প্রোটেস্টান্টরা পরে এসেছে৷ ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট চার্চের মধ্যে ‘তুমি খারাপ, আমি ভালো’ গোছের একটা লড়াই বরাবরই আছে৷ তাই জার্মান চার্চ ছেড়ে মুন্ডারা চলে আসাতে লিয়েভেনস খুব খুশি৷ দুটো চার্চেরই আসল উদ্দেশ্য হল খ্রিস্টধর্ম ছড়ানো৷ লিয়েভেনস তার নতুন খ্রিস্টান মুন্ডাদের খুব মদত দিতে থাকল৷ ‘যাও, অত্যাচারী জমিদারের সঙ্গে লড়ো৷ আমি সঙ্গে আছি৷’

ব্যস,-বাসিয়া পালকোট, সিসাই, চৈনপুর থেকে শুরু করে বহু থানায় এই নতুন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল৷ খ্রিস্টান মুন্ডারা সকলকে ধরে ধরে ক্যাথলিক খ্রিস্টান বানাতে থাকল৷ এবার ব্রিটিশ সিংহ গর্জে উঠল৷ ছোটোনাগপুরের কমিশনার বলে দিল, মিশনের কাজ করছ করো৷ জমির অধিকার ফিরে পেতে মুন্ডাদের সাহায্য কোরো না৷ লিয়েভেনস বদলি হল৷ শত শত মুন্ডা জেলে গেল ও খালাস পেল কিছুদিন বাদে৷

মিশনারিদের ওপর চটে গেল মুন্ডারা৷ কে তাদের সাহায্য করবে? এসব আন্দোলনে তারা কলকাতার ইংরেজ ব্যারিস্টার জেকবের সাহায্য পেয়েছে৷ চল্লিশ জন মুন্ডা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে, জেল খাটছে, আর আট-নয় জন তো জেলে মরেই গেছে৷

রাঁচি ছোটোনাগপুরের সদর শহর৷ খুব সুন্দর শহর৷ গাছেপালায় ঠান্ডা আর মনোরম৷ সে শহরে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের মতো বড়ো বড়ো জমিদাররা বড়ো বড়ো বাগান দেওয়া খাসা খাসা বাড়ি বানিয়ে রেখেছে৷ বাঙালি উকিল, ডাক্তার, এদেরও ভালো ভালো বাড়ি৷ চক ও বাজারে দোকানপাট সব অন্য জায়গায় লোকদের৷ সাহেবদের বাড়ি আর ক্লাব আর গির্জা আছে৷ সেখানে কিন্তু কোথাও মুন্ডা বা ওরাওঁ বা হো লোকের মাটির বাড়িও নেই৷

রাঁচির সরকারি কর্মচারি, আদালতের লোকজন আর জমিদাররা যে মুন্ডাদের বিপক্ষে তা তো মুন্ডারা জানে৷ কলকাতার উকিলরা বোধ হয় ভালো৷ জেকব যে ভালো৷

সর্দাররা কলকাতার ‘বাবু’ বা উকিলদের সঙ্গে যোগাযোগ করল৷ এইসব উকিল হাজার হাজার মুন্ডার অনেক কষ্টে জোগাড় করা তামার পয়সায় এক লক্ষ টাকারও বেশি হাতিয়ে নিল আর তাদের বোঝাল যে মহারানি ভিক্টোরিয়া, বড়োলাট, পার্লামেন্ট, সব জায়গায় মুন্ডাদের ওপর অবিচারের কথা উকিলরা জানিয়ে দেবে৷ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তারা চম্পট দিল৷

এবার শুরু হল সর্দার আন্দোলনের রাজনীতির পথ চলা৷

গ. ১৮৯০ সাল থেকে সর্দাররা ঘোষণা করল যে, তাদের আন্দোলন ইওরোপীয়, মিশনারি ও সেইসব কর্মচারীদের-যাদের জমিদাররা ঘুস খাইয়ে কিনে নিয়েছে৷ কলকাতার বাবুরা প্রতারক৷ মিশনারিরা সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে একজোট৷ সায়েবরা সবাই সব আদিবাসীর বিরুদ্ধে৷ এখন কারও সাহায্যের ভরসা না রেখে নিজেদের লড়াই নিজেদেরই লড়তে হবে৷ মিশনে শেখা ‘প্রার্থনা করো ঈশ্বরের কাছে, প্রতিবাদ জানাও, লিখিত আর্জি পাঠাও’ নীতিতে চললে, কিংবা সংবিধানের আইনসম্মত পথে চললে কিছু হবে না৷

এখন কিছু সর্দার একেবারে ছেড়ে দিল আন্দোলন৷ কিছু সর্দার এখনও জেকবকে ধরে থাকল৷ ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থাই তাড়াতে হবে৷ এ ব্যবস্থা অত্যাচারী জমিদারদের মদত দেয়৷ ১৮৯২ সালে সর্দাররা সমস্ত ঠিকাদার ও জার্মান মিশনারিদের মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে৷ কিন্তু নেতা নেই, সংগঠন নেই, এ পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে গেল৷

মুলক-ই লড়াইয়ে ক্লান্ত সর্দাররা একজন নেতার খোঁজ করতে থাকল৷ এই নেতাকে মুন্ডা হতে হবে৷

পাদ্রি হফম্যান মুন্ডারি ভাষার অভিধান লিখে বিখ্যাত হয়ে আছেন৷ মুন্ডাদের বিষয়ে তিনি অনেক জানতেন, একথা সত্যি৷ অনেক খেটেখুটে মুন্ডারি ভাষায় অভিধান লেখেন একথা সত্যি, আবার সেইসঙ্গে একথাও সত্যি যে, মুন্ডাদের বিদ্রোহে তিনি ব্রিটিশকে খুব সাহায্য করেন৷ ইংরেজরা পাদ্রি লিয়েভেনসের নাম মোটেই করে না, কেননা লিয়েভেনস মুন্ডাদের জমির লড়াইয়ে উৎসাহ দেয়৷ হফম্যানের নাম তারা একশো হাজার বার করে, তার কারণ হফম্যান বিরসার বিদ্রোহে বিরোধিতা করে প্রাণপণে৷

হফম্যান সর্দারদের ওপর নজর রাখছিল আর কমিশনারকে সেকথা লিখে জানাচ্ছিল৷ সে লিখল : ‘আমি সর্দার নেতাদের আর অন্য মুন্ডাদের বলতে শুনছি, আমরা সরকারের কাছে প্রতিকার চাইলাম, কিছুই পেলাম না৷ মিশনগুলির কাছে গেলাম, তারাও আমাদের দিকুদের হাত থেকে বাঁচাল না৷ এখন আমাদের নিজেদের কোনো লোকের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই৷’

সেই নতুন মুন্ডা নেতা কে? কে সর্দার-আন্দোলনের ছোটো নদীকে সমুদ্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেবে বড়ো নদীর মতো প্রবল স্রোতে মুন্ডাদের পাহাড়-জঙ্গল, তাদের দুঃখ ও অপমানে ফাটা-চটা বুকগুলো ভাসিয়ে দিয়ে?

অনেক, অনেক কাল আগে চটু আর নাগু নামে দুই ভাই, (এঁরা পূর্তি গোত্রের লোক) ঘর বাঁধার জায়গা খুঁজে খুঁজে আজকের রাঁচি শহরের কাছে বানে উত্তাল ডোমডাগারা নদীর তীরে পৌঁছোন৷ এই ডোমডাগারা হয়তো ডুরাংডা বা ডুরান্ডা অঞ্চলে বইত৷ ‘ডুরাংডা’ মানে আদি মুন্ডারিতে ‘গান গেয়ে বহে চলা নদী’৷ এই নদীর বুকে একটা গাছের গুঁড়ি ভেসে যাচ্ছিল৷ সেটা ধরে দুই ভাই নদী পেরোলেন৷ দেখেন, ওমা! গাছের গুঁড়ির গর্তে একটা ‘চটু’ বা ইঁদুর বসে আছে৷ এটি খুব শুভ লক্ষণ মনে করে যেখানে তাঁরা ঘর বাঁধেন তার নাম হল চুটিয়া৷ চুটু আর নাগু, দু-জনের নামে দেশের নাম ছোটোনাগপুর হয়েছে, এমন কিংবদন্তি আছে৷ এই চুটিয়াবাসী মুন্ডারা চুটিয়াপূর্তি গোত্রে লোক৷

আবার একদিন চুটিয়াপূর্তিরা ঘর বাঁধার জায়গা খুঁজতে বেরোলেন৷ বাইরের লোকেরা এসে তাঁদের খুঁটকাট্টি গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করল৷ ঘুরতে ঘুরতে মানকিডি, সিংভূম, সিদামা, মৈলপিরি, কোটনা, বাগরি, সেলদা কত জায়গায় কত গ্রাম তাঁরা পত্তন করলেন আর ছড়িয়ে পড়লেন৷ রাঁকা ও লকা পত্তন করলেন উলিহাতু৷

এঁদের, এই রাঁকা বা লকার বংশধর লাকারি মুন্ডা৷ চালকাদে তাঁর শ্বশুরঘর৷ লাকারির তিন ছেলে৷ মেজো ছেলে সুগানা মুন্ডা৷

আয়ুভাতু গ্রামের দিবর মুন্ডার বড়ো মেয়ে করমির সঙ্গে সুগানার বিয়ে হয়৷ এঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে৷ বড়ো ছেলের নাম, কোমতা, তারপর মেয়ের নাম দাসকির, তারপর মেয়ের নাম চাম্পা, তারপর ছেলে-নাম বিরসা, তারপর ছেলের নাম কনু৷

বিরসার জন্ম নিয়ে অনেক গানেই জন্মস্থান চালকাদ বলা হচ্ছে৷ জন্মের বছরও অনেকরকম বলা হয়েছে৷ তবে মেনে নেওয়া হয়েছে যে, সুগানা তাঁর ভাই পাসনা ও স্ত্রী করমিকে নিয়ে কাজের খোঁজে উলিহাতু ছেড়ে যখন কুরুমবদা যান, সেখানে কোমতা ও দাসকির জন্মান৷

কুরুমবদা ছেড়ে বামবা পৌঁছোলে এক বাঁশের বেড়ার ঘরে চাম্পা ও বিরসা জন্মান৷ তখন ভাদ্রমাস৷ বৃহস্পতিবার৷ বিষ্যুদবারে ছেলে হলে সে তো বিরসাই হবে৷ বারের নামে নাম রাখা তখন খুব নিয়ম ছিল৷ সেটা ১৮৭৪ বা ১৮৭৫ সাল৷

বিরসার জন্মের পরেই সুগানারা চলে এলেন চালকাদ৷ সেখানে বীর সিং মুন্ডা তাঁদের আশ্রয় দেন৷ বিরসার জাতকর্ম চালকাদেই হয়৷ এর আগে উলিহাতুতেই সুগানার বড়োদাদা বড়া কনু পুলুস জার্মান চার্চে খ্রিস্টান হন৷ বামবাতে সুগানা ও পাসনা খ্রিস্টান হলেন৷ ক্রমে বিরসাও খ্রিস্টান হন৷ তাঁর নাম হয় দাউদ মুন্ডা বা দাউদ বিরসা৷ এ সময়ে অবশ্য বিরসা এক ছোটো শিশু৷ সেই যে চালকাদে আসা হয়, বিরসার বাবা-মা উলগুলান অবধি সেখানেই থাকেন৷ আজও মুন্ডারা গান গায়-

এই দেশেতে ধরতিআবা জন্ম নিলেন ভাদ্রমাসে

সবাই আনন্দ করে ভাদ্রমাসে

ওরা ধরতিআবাকে প্রার্থনা জানায়

সার বেঁধে আসে সার বেঁধে চলে যায়

ওরা শোক করে ভাদ্রমাসে

হে ধরতিআবা! জন্ম তোমার চালকাদেতে ভাদ্রমাসে

অন্ধজনের চোখ মিলল ভাদ্রমাসে

চলো যাই ধরতিআবাকে দেখি

এ বড়ো আনন্দ হে, তাঁকে প্রণাম করি

আমাদের শত্রুদের তিনি হারিয়ে দেবেন ভাদ্রমাসে৷৷

ছোটো বিরসা মা-বাবার কাছে থাকে চালকাদে৷ সব মুন্ডা ছেলের মতো সেও বোহানডার জঙ্গলে ছাগল চরায়৷ সে বড়ো হয়৷ ক্রমে বাঁশি বাজায়, আর একটি তারের যন্ত্র, টুইলা৷ তার বাঁশি শুনলে যেন বনের পশুপাখি ভিড় করে আসে৷ কালো ছিপছিপে ছেলেটি৷ অন্য মুন্ডা ছেলেদের থেকে অন্যরকম মুখ চোখ৷ গ্রামের উৎসব-প্রাঙ্গণ আখড়ায় সে অনেকক্ষণ থাকে৷

কিন্তু সুগানা যে বড্ড গরিব৷ কোথা থেকে এতগুলো মানুষের পেটে খাবার জোগাবে? করমি আর সুগানা ভেবে পায় না কী করবে৷ বড়ো ছেলে কোমতা সব বোঝে৷ সে চলে যায় কুন্ডিবরতোলি৷ এক মুন্ডার চাকর হয়৷ সেখানে বিয়ে করে, আর থেকে যায় কয়েক বছর৷

বিরসা যায় মামাবাড়ি আয়ুভাতুতে৷ সালগা গ্রামে জয়পাল নাগের ইশকুলে সে পড়তে শুরু করে৷ তারপর ছোটো মাসি জোনির যখন বিয়ে হয়, তার সঙ্গে বিরসা যায় খাটাঙ্গা৷ খাটাঙ্গাতে আসে এক মিশনারি প্রচারক৷ মুন্ডাদের আদি ধর্ম যে খুব খারাপ আর খ্রিস্টান ধর্ম যে খুব ভালো, তা শোনে বিরসা৷

ভারি অবাক হয় সে৷ খ্রিস্টান ধর্ম ভালো বলে তো তার বাবা সুগানা খ্রিস্টান হয়নি৷ খ্রিস্টান হলে সরকারি কর্মচারি আর পুলিশের জুলুম কমবে বলে খ্রিস্টান হয়েছে৷

এসব কথা ভাবতে গিয়ে তার মেসোর ছাগল-ভেড়ার ওপর নজল রাখা হয় না৷ ছাগল ঢুকে যায় পরের খেতে৷ এ নিয়ে খুব অশান্তি হয়৷ এ কী ভাবুনে ছেলে গো? এতটুকুন ছেলে তুই, দু-মুঠো খাবি, ছাগল চরাবি, কারও বাড়ি বাঁধা মজুর হবি, তোর কী এত ভাবনা সাজে?

বিরসা তো ভেবে পায় না কী করবে৷ তার যে বড্ড পড়ার ইচ্ছে৷ সে বড়ো ভাই কোমতার কাছে পালায়৷ তারপর পুরজুর জার্মান মিশনে চলে যায়৷ এখানেই সে লোয়ার প্রাইমারি স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করে৷

সুগানা আর করমি খুশি, কোমতা খুশি৷ চালকাদ থেকে আয়ুভাতু, সেখান থেকে খাটাঙ্গা, সেখান থেকে কুন্ডিবরতোলি, সেখান থেকে বুরজু? ও বিরসা, তুই তো অনেক পথ হাঁটলি রে৷ টুইলা বাজিয়ে বাঁশি বাজিয়ে, পাখি ধরে বেড়াতিস যখন, তখন কি জানি যে তুই কত পথ হাঁটবি? আয় বাছা, ঘরে আয়, আর পড়তে হবে না৷ এসব কথা বলে বাবা-মা, ভয়ে ভয়ে চায়৷ এ ছেলে তো কোমতার মতো নয়, এ তো অন্যরকম৷ মুখের কথা, মুখের হাসি কী মধুর কিন্তু এর মতো এত প্রশ্ন কোনো মুন্ডা বালক কোনো মুন্ডা বাবাকে করেনি কখনো৷ কত যে ওর প্রশ্ন! আর ঘুরে ফিরে একই কথা : ‘শুনেছ আবা? এবার মুন্ডা মায়ের ঘরে জন্মাবে এক ছেলে৷ সে মুলক-ই লড়াইকে ফিরে বাঁচাবে৷’

‘কোথায় এসব কথা শুনলি রে?’

‘আবা, তুমি যেন কী! এসব কথা তো সবাই জানে৷ সবাই বলে, কত গান গায়, শোননি?’

‘শুনেছি রে শুনেছি৷’

করমি সুগানাকে বলে, ‘এ ছেলে ঘরে থাকবে না গো৷’

‘ওকে দেখলে আমার সেকথাই মনে হয়৷ খাটাঙ্গা থেকে কুন্ডিবরতোলি চলে গেল৷ সেখান থেকে বুরজু? অতটা পথ একা গেল? ওকে ঘরে থাকতে বলো-আর যেতে হবে না কোথাও৷’

বিরসা কোনো কথা শুনল না৷ সে বলল, ‘আবা! এঁগা (মা)! আমি পড়তে যাব৷’

‘কোথায় যাবি?’

‘কেন? চাঁইবাসা?’

সুগানা মুন্ডার গরিব কুঁড়েঘরে তোমার জন্ম

বন্ধুদের সঙ্গে ধুলোবালি নিয়ে খেলতে তুমি

বড়ো হলে যখন, তখন যেমন জোয়ান তেমন সুপুরুষ

কত কত জায়গায় গেলে পড়তে

জ্ঞানের সন্ধানে কত জায়গায় না গেলে

শত্রুকে তুমি ভয় করনি

ভরসা রেখেছ

ধনুক তির আর শিকার করার কুঠার৷৷

১৮৮৬ সালে অভিরাম, ইসাক ও বিরসা চাঁইবাসার জার্মান মিশনে গেল আপার প্রাইমারি স্কুলে পড়তে৷ তখন ছেলে ভরতির সময় নয়৷ কিন্তু পথ হেঁটে বিরসার পায়ে তখন ক্ষত৷ বিরসা ভরতি হল৷

১৮৮৬ থেকে প্রায় ১৮৯০ অবধি চাঁইবাসাতে পড়ল বিরসা৷ খ্রিস্টান ধর্মের প্রার্থনা ও অন্যান্য রীতি তাকে কীভাবে আকৃষ্ট করে তা আজ আমরা বুঝব না৷ ক্রমেই তার বিশ্বাস হতে থাকে যে মুন্ডা জাতি প্রাচীনকালে যে সরল ও সুন্দর ধর্ম মানত, এখন তার মধ্যে অন্যান্য জাতির প্রভাব পড়েছে৷ এসব কথা সে ভাবে৷

সর্দার-আন্দোলনের কথা তো বাতাসে ভাসে৷ ইলিয়াজার, গিডিয়ুনয়োÿনা, মাইকা, টেংগা, ভুটকা, মিশনের এসব মুন্ডারা সর্দার-আন্দোলনের মধ্যে ছিল৷ তারাও বিরসাকে চুপিচুপি বলে৷ আবার আন্দোলন হবে একটা৷ মুন্ডা ছেলে হবে তার নেতা৷

কে সেই মুন্ডা ছেলে? কে সে? যে তামাড়-কোল ভূমিজ-সাঁওতাল সর্দার এমন অনেক আদিবাসী বিদ্রোহের ধারাকে আবার বইয়ে দেবে অরণ্যে-পাহাড়ে-শস্যক্ষেত্রে-আদিবাসী গ্রামে-মানুষের বুকে? বুনো ষাঁড়ের মতো যে জোয়ান আর তেজি, পাথরের মতো যে কালো, হাতে যার ঃআ (ধনুক) সার (তির)?

সে কে গো? কেমন তার বাবা, কেমন তার মা?

এমন সময়ে চাঁইবাসার পথে বিরসাকে ডেকে দাঁড় করায় এক মুন্ডা বুড়ি৷ বলে ‘ওরে, তুই তো সেই ছেলে৷ কত বড়ো কাজ করবি তুই৷ সরকার আর দিকু তোকে মন্দ বলবে কিন্তু তুই তো সামান্য নোস? এই ধরতিটাকে, পৃথিবীটাকে তুই বুকে ধরে রেখেছিস৷’ না না, বিরসা সে ছেলে নয়৷ মিশনের সাহেব বলেছে, মুন্ডারা খ্রিস্টান ধর্ম মেনে চললে সব জমি ফেরত পাবে৷

কিন্তু সেই সাহেবই একদিন প্রার্থনাসভায় বলে ‘মুন্ডা সর্দাররা সবাই ঠগ, সবাই জোচ্চোর৷’

‘না, জোচ্চোর নয়, ঠগ নয়!’ গর্জে ওঠে বিরসা৷ ‘তুমি মুন্ডাকে জোচ্চোর বল? মুন্ডা ওরাওঁ কোলজাতি জোচ্চুরি জানে না৷ মুন্ডা সর্দাররা ঠগ? তারা কাকে ঠকিয়েছে? তারা সাহেবদের বিশ্বাস করেছে, মিশনকে বিশ্বাস করছে, উকিল বাবুদের বিশ্বাস করে ঝুড়ি ঝুড়ি পয়সা বাঁক বয়ে দিয়ে এসেছে৷ ঠগ তারা নয়, ঠগ তারা যারা মুন্ডা সর্দারদের এত বছর ঠকাচ্ছে৷’

এমন কথা বলার পর বিরসাকে স্কুল ছাড়তে হয়৷ যাবার সময় বিরসা বলে যায় ‘মিশনের সাহেব আর অফিসার সাহেব সবাই এক জাতের৷ সাহেব সাহেব এক টোপি হ্যায়৷’

সর্দার-আন্দোলনের কথা যা বলেছি, প্রোটেস্টান্ট চার্চ থেকে রোমান ক্যাথলিক চার্চ-তা এখন স্মরণ করো আর মিলিয়ে নাও৷ তার সঙ্গে মিল রেখে সুগানা মুন্ডা আর আরও অনেক মুন্ডা বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে জমি পাবার ভরসায় রোমান ক্যাথলিক চার্চে গেল৷ তারপর তাও ছেড়ে দিয়ে আদি মুন্ডা ধর্মে ফিরে এল৷ এ সময়ে বিরসা চলে যায় কান্দার৷ সেখানে তার মারাং (বড়ো) দাই (দিদি) দাসকিরের শ্বশুরবাড়ি৷ সেখানে সে এক মুন্ডার ঘরে এক বছর থাকে ও মজুরের কাজ করে৷

ধর্ম বিষয়ে একটা জিজ্ঞাসা কিন্তু বিরসাকে ছেড়ে যায় না৷ মুন্ডা সমাজের মধ্যে মনের জোর আর একতা আনতে হলে তাকে যে একদিন বিরসা ভগবান হতে হবে তা সে এখনও জানে না৷ কিন্তু মনের নীচে যেন ভীষণ তোলপাড় চলে৷

বিরসা চলে গেল বন্দগাঁও৷ সেখানকার জমিদার জগমোহন সিংয়ের মুনশি আনন্দ পাঁড়ে আর আনন্দের ভাই সুখনাথ পাঁড়ে বৈষ্ণব৷ তাদের কাছে সে হিন্দু ধর্ম, বৈষ্ণব ধর্ম, এসব বিষয়ে অনেক কথা শুনল৷ তিন বছর কাটল এখানে৷ আনন্দ পাঁড়ে বেজায় খুশি৷ বিরসা সেদিনও খ্রিস্টান ছিল৷ আজ সে এসেছে আনন্দের কাছে৷ এখন সে বুঝুক হিন্দু ধর্ম কত ভালো৷ ধর্মকর্মে মন থাকলে সর্দার আন্দোলনে সে জড়াবে না৷

তাই কি হয়? যে বিরসা আদিবাসী বিদ্রোহে ইতিহাস রচনা করবে, সে কি তুলসী গাছ পুজো করে পইতে গলায় দিন কাটাতে পারে? তার কাছে খবর এল, পোরহাটের গিডিয়ুন, তার পুরোনো সাথি এক নতুন লড়াইয়ে নেমেছে৷

কী সে লড়াই?

হঠাৎ সিংভূম-মানভূম-পালামৌ অঞ্চলে সরকার কানুন জারি করেছে, গ্রামে গ্রামে যত খাস (সরকারি) জমি আছে সব বন বিভাগের৷ জঙ্গলের মধ্যেকার গ্রামের ম্যাপ তৈরি হচ্ছে৷ সব বন হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত বন৷ আদিবাসীরা আর জঙ্গলকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারবে না৷

ব্রিটিশ সরকার যে আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নিতে পারে, এ কথা আদিবাসীরা স্বপ্নেও ভাবেনি৷

জঙ্গল তাদের কাছে, সাঁওতাল-বিরহড়-খেরোয়া-লোধা-মুন্ডা-ওরাওঁ-হো-ভূমিজ-মাহাতদের মা৷ ঘরের মা যেমন, তেমনই মা৷

জঙ্গল দেয় কাঠ, ঘাস, শালপাতা, কন্দ, মূল, ফল, মধু, মাংস৷ গাছ আদিবাসীদের কাছে গড়াম (গ্রাম) দেবতা৷ যখন দুর্ভিক্ষে খেত জ্বলে যায়, জঙ্গল তখন বাঁচায়৷ অরণ্যের অধিকার আদিবাসীর প্রথম অধিকার৷

অরণ্যের অধিকার ছিনিয়ে নেবে?

মায়ের কোলে শিশুর জন্মগত অধিকার কেড়ে নেবে?

জীতা, রাসা, মনি, দলে দলে মুন্ডা যাচ্ছে এর বিরুদ্ধে আর্জি নিয়ে৷ বিরসার কাছে এসে দাঁড়াল সিগরিদা গ্রামের মুন্ডারা৷ হায় বিরসা! তুমি আজ দিকুদের কাছে ধর্মের পাঠ নিচ্ছ৷ এদিকে আমাদের যে মায়ের কোলে থেকে ফেলে দেয় সরকার৷

বিরসার মাথা নীচু হয়ে গেল৷ সত্যিই তো৷ হাজার হাজার মুন্ডার মধ্যে কত সামান্য দু-একজন শেখে লেখাপড়া৷ সে লেখাপড়া যে মস্ত দামি, দশটা গ্রামের লোক যে বলে, ওরে! আমাদের সুগানার ছেলে বিরসা যে মস্ত বিদ্বান হয়েছে রে৷ বুরজুতে পড়া শেষ করে সে চাঁইবাসাতেও পড়েছে৷ বাঁচলাম বাবা! একটা লেখাপড়া জানা ছেলে গ্রামে থাকলে ভরসা কতখানি৷

বিরসা চলল সিগরিদার মুন্ডাদের সঙ্গে চাঁইবাসা৷ আনন্দ পাঁড়ে কত বারণ করল ‘অমন কাজ কোরো না৷ হতভাগা সর্দারদের কথায় নেচো না৷’

বিরসা বলল, ‘আমার বুকের ভিতর থেকে রক্ত বলছে, যাও বিরসা, যাও৷’

‘তাহলে এখানে ফেরা হবে না৷’

‘কে চায় ফিরতে?’

চাঁইবাসাতে আর্জি দিয়ে জঙ্গল-আইন রদ করা গেল না৷ বিরসা আনন্দ পাঁড়েদের ছেড়ে গেল৷

১৮৯৪ সাল এটা৷ বিরসা ও-অঞ্চলের মুন্ডাদের আন্দাজে বেশ লম্বা৷ মাথায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি৷ কাটা কাটা মুখ-চোখ৷ রং গাঢ় কালো নয়, তবে কালো৷ চোখ দু-টি চঞ্চল, হাসি হাসি মুখের ভাবটা মন-কেড়ে-নেওয়া৷ এর মধ্যে বেশ কিছু মেয়ে তাকে ভালোবেসেছে, বিরসা কিন্তু বিয়ের কথা তেমন করে ভাবেনি৷ একটি মেয়ের নাম যেন আমরা কখনো না ভুলি৷ সে হল সালি৷ সালি ও তার স্বামী শেষ অবধি বিরসার যুদ্ধে অনুগত ছিল ও বিরসাকে শ্রদ্ধা করত৷ এই সালির ছেলে পরিবাকেই বিরসা একদিন বলেছিল, ‘যুদ্ধে তোরা সব দিবি? বেশ! এই শিশুকেও দে৷ তোদের মতো এই শিশুও আমার সন্তান৷’

বিরসার আশীর্বাদধন্য পরিবার ছেলে নারায়ন সিং বছর পঁয়ত্রিশ আগেও খুঁটির এরকি ব্লকের বরিগারা গ্রামে জীবিতই ছিল৷

১৮৯৫ সালের মধ্যেই বিরসা বুঝে ফেলে যে খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্মের কাছে তার কিছু পাবার নেই৷ সর্দার আন্দোলন যেভাবে এতদিন চলেছে, তাতে যে কাজ হবার নয় তাও সে বুঝে ফেলে৷ এখন তাকেই এই মুন্ডা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে৷ সেজন্য চাই এক নতুন ধর্ম৷

কেন? নতুন ধর্ম কেন? মুন্ডাদের আদি ধর্ম তো আছেই৷ কিন্তু বিরসা দেখে যে সে ধর্মের ওপর হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব পড়েছে৷ মুন্ডাদের মধ্যে ডাইনি, তুকতাক, অলৌকিক, পুরোহিতের অসীম ক্ষমতা-এসব বিশ্বাস যেন রক্তে ঢুকে গেছে৷ এদের ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হলে যা প্রাচীন, তা ফেলে দিতে শেখাতে হবে৷ যে যুদ্ধের যে কৌশল৷ এখনকার মতো এই নিয়ম দরকার৷

নতুন ধর্ম এদের যুদ্ধ করতে, হাতিয়ার নিতে শেখাবে৷ শত্রু তো একটা নয়৷ মূল শত্রু ইংরেজ৷ তারপর মিশনের লোকজন, সরকারি কর্মচারী, আদালতের উকিল ও বিচারক, জমিদার, মহাজন, ঠিকাদার, আড়কাঠি-সবাই মুন্ডা এবং সকল আদিবাসীর দুশমন৷

মুন্ডার শত্রু সরকারের সুকৌশলে বসানো মদের দোকানগুলি, আর মদের ব্যবসায়ীরা মুন্ডাদের আর সব আদিবাসীদের শত্রু৷ নতুন ধর্মে বিরসা মদ খাওয়াই বন্ধ করে দেবে৷ আদিবাসী জীবনে অল্প মদ সবাই তৈরি করে ও খায়৷ তাতে তারা সর্বনাশের পথে যায়নি৷ সরকার লাইসেনস দিয়ে যে মদের দোকান বসিয়েছে তাতে যে সর্বনাশ!

অনেক শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে হবে মুন্ডাদের৷ এ এমন এক অন্ধকার, অন্ধকার সময়! মুন্ডাদের জীবনে গভীর হতাশা৷ চল্লিশ বছর ধরে সর্দার-আন্দোলন চলল৷ কখনো সর্দাররা বলল না ‘এসো তির-ধনুক-বল্লম-টাঙি-কুড়াল নিয়ে৷’ আজ আর্জি, কাল আদালত, পরশু মিশন, এই করে করে সর্বনাশ হল৷

নতুন ধর্ম চাই, নতুন ধর্ম৷ ধর্মের ডাক জাতি শুনবে৷ এ ধর্মে সব হবে নতুন৷

বিরসার মনে যখন তোলপাড় চলছে, তখন দেশে এল খরা আর অজন্মা৷ জঙ্গলের ফল-মূল-কন্দ হল মুন্ডাদের জীবন রাখার উপায়৷ এই সময়ে বিরসার মনে সে কী যন্ত্রণা! লেখাপড়া জানা ছেলে সে, বাবা-মাকে একমুঠো অন্ন দিতে পারছে না! ঘরে ঘরে মানুষ মরছে না খেয়ে৷ বিরসার গ্রামেই যখন একটি মেয়ে মরে গেল, বিরসা শ্মশানে৷ মুন্ডা সমাজের নিয়মমতো মেয়েটিকে সমাধি দেওয়া হল৷ সঙ্গে দেওয়া হল তার গয়নাগাঁটি সামান্য যা ছিল, আর একটা সিকি৷ দেখে বিরসার মনে হল, জ্যান্ত মানুষটা মরল না খেয়ে৷ তার রোঁয়ার (আত্মা) জন্যে এসব দেওয়া কি কুসংস্কার নয়? কার দাবি বড়ো? জীবিতের, না মৃতের?

রাতে কবর খুঁড়ে বিরসা সে গয়না ও পয়সা তুলে নিল৷ পরদিন বীরবাঁকির হাটে গিয়ে কিনে আনল চাল৷ কিন্তু একথা তো জানাজানি হয়ে গেছে৷ এখন সবাই বলল ‘বালু বিরসা’-বিরসা পাগল৷ আর তার মা করমি সে চাল ছুঁলো না৷

আবার বিরসা চলে গেল জঙ্গলে৷ জঙ্গল যেন কাঁদে আর তাকে বলে ‘বিরসা! আমি সেই আদি বনভূমি, তোদের মা! ইংরেজ সরকার আমার কোল থেকে তোদের কেড়ে নিচ্ছে৷ আইনকানুনের ফাঁসে বেঁধে ফেলছে আমাকে৷ তোদের কিছু দেবে না রে, সব নেবে অন্যরা৷ আমার গাছের কাঠ, পাতা, ফল, মধু, সব! মা হয়ে মিনতি করছি, বাপ যেমন মেয়েকে অপমান থেকে বাঁচায় তেমন করে তুই আমাকে অপমান থেকে বাঁচা৷’

‘বাঁচাব মা, বাঁচাব৷’

‘তুই তো ধরতিআবা৷’

‘ধরতিআবা আমি!’

‘হ্যাঁ, বাছা৷ তোমার বুকখানা যে মস্ত বড়ো৷ জঙ্গল-পাহাড়-শস্যক্ষেত্র-কালো কালো অপমানিত মানুষ যে সে-বুকে ঠাঁই চায়৷’

‘আমি ধরতিআবা?’

‘হ্যাঁ বিরসা!’

ঘুম আসে না, আবার আসে৷ আষাঢ়ের বৃষ্টিতে বনভূমি কাঁদে৷ গাছে গাছে ঝোড়ো বাতাস হা হা করে৷ বুনো হাতি শুঁড় তুলে ডাকে৷ বাঘ গর্জায়৷ বনের ছেলে বিরসা গাছের নীচে ঘুমায়৷

স্বপ্নে দেখে এক খুনখুনে বুড়ো একটা মহুয়া গাছ পুঁতল৷ তার মাথায় রাখা সাত রাজার ধনরত্ন৷ মুন্ডাদের পূজিত এক বোঙা, এক রাজা আর এক বিচারক সে ধনরত্ন পাড়তে পারল না৷ গাছের গায়ে তেল ও ঘি মাখানো৷ বিরসা নিমেষে তা পেড়ে আনল৷

চমকে জেগে উঠল বিরসা৷ স্বপ্নে সে কী দেখেছে তা সে বুঝল৷ ওই বুড়োটি আদি দেবতা হরম হোরো৷ ওই বোঙা হল কুসংস্কারে জড়ানো প্রাচীন মুন্ডা ধর্ম৷ রাজা হল আজকের যত জমিদার ও সামন্ত রাজা৷ বিচারকটি হল ইংরেজের আইনব্যবস্থা, যে ব্যবস্থায় মুন্ডা বা অন্য আদিবাসী কখনো সুবিচার পায় না৷ অরণ্যজননী তাকে জানিয়ে দিচ্ছে কার কার বিরুদ্ধে তাকে লড়তে হবে৷

আবার বিরসা পাগল হয়ে ঘোরে বনে বনে৷ ঘরে তার মা ‘বিরসা! বিরসা!’ বলে কাঁদে৷ বিরসা বোঝে এই বনভূমি তার মুন্ডা জননী করমির মতোই দুঃখিনী আর অপমানিতা৷

তারপর একদিন, সে এক প্রচণ্ড প্রলয়ের রাত৷ চালকাদের সবাই বনে চলেছে তাদের সবার প্রিয় পাগল ছেলে বিরসাকে ঘরে ফিরাতে৷ ঘন ঘন বাজ পড়ছে৷ আকাশ আর বনভূমি যেন একই সঙ্গে পাগল হয়েছে আজ৷ করমি হাত ধরে সকলকে বলেছে ‘যেমন করে পার ফিরিয়ে আনো আমার ছেলেকে৷’

হঠাৎ ঝড়ের আর বাজের আর বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে কানে এল নাগাড়া বাজার শব্দ৷ অনেক গলায় ঘন ঘন চিৎকার৷

‘বুঝি কী বিপদ হল গো৷’ বলে আর্ত চিৎকারে দরজা হাট করে খুলে দিয়ে করমি পাথর হয়ে গেল৷ বিরসা সকলের সামনে৷ দুই হাত তার ওপরে তোলা৷ পিছনে অনেক লোক৷

‘বিরসা!’

‘আমি বিরসা নই, আমি ধরতিআবা৷ এই পৃথিবী আমার সন্তান৷ আমি মুন্ডাদের নতুন ধর্ম শিখাব৷ আমি তোদের কোলে নিয়ে ভুলাব না৷ দুলাব না৷ আমি মুন্ডাদের মরতে আর মারতে শিখাব৷’

নাগাড়া বেজে উঠল৷

-‘বির দিসুম চালকাদ হাটুরে ধরাতি আবাদোয়ে জনম লেনা’

-বনের গভীরে চালকাদ গ্রামে ধরতিআবা জনম নিল

তোমাকে পরখ করে দেখা হল৷ তুমি লড়তে চাইলে

সুগানা মুন্ডার দুলাল ছেলে৷ ছাগল চরাতে তুমি

পঁচিশ বছর বয়সে মুন্ডাদের দেখালে পথ

তোমার ধর্মে জানালে সিমবোঙা একা ও একমাত্র

নিজের নাম নিলে ধরতিআবা

তোমার ধর্ম আমরা শেষ অবধি মানব

মানব তোমার আদেশ

সৃষ্টির শুরুতে সিমবোঙার আমাদেরকে দেওয়া জমি কেড়েছে দুশমন

হাতিয়ার হাতে আমরা দলে দলে জড়ো হব

ধর্মের নতুন সূর্য উঠল, পাহাড় ও বন হল আলোয় আলো

জমিদাররা আমাদের কষ্ট দিত কত!

ধরতিআবা এখন বিরসা৷ সবার কাছে সে বিরসা ভগবান৷ চালকাদে তার ঘর এখন তীর্থভূমি৷ এ ভগবান বসন্ত রোগের মড়কে ছুটে যায় সেবকদল নিয়ে, রুগিকে আলাদা রাখে, তার দেহে মলম ও চন্দন লেপে দেয়৷ তার জামাকাপড় আলাদা ধুতে বলে৷ মড়কের গতিপথ বন্ধ হয়ে যায়৷ বিরসার খ্যাতি ছড়ায় গ্রাম থেকে গ্রামে৷ মুন্ডাদের সকলের জন্য তার নিঃস্বার্থ সেবার কথা সবাই বলে৷

দলে দলে লোক যখন আসতে থাকে তখন ধরতিআবা প্রচার করে তার ধর্ম৷

চুরি, মিছে বলা ও খুন করা অন্যায়৷ ভিক্ষা কোরো না কেউ৷ গরিব তোমরা, পহান ও দেওঁরার কথা শুনে বলি দিয়ে পূজা কোরো না বহু দেবতা৷ ভূতপ্রেত-ডাইনি-পিশাচ মেনো না৷

হাঁড়িয়া-তাড়ি-মহুয়া সব মদই শয়তান৷ তোমাদের হাবা, জড়বুদ্ধি, নেশাখোর ও অমানুষ করে৷ কেউ মদ খেয়ো না৷

পিঁপড়ের মতো পরিশ্রমী হও, পশুপাখির মতো মিলেমিশে থাকতে শেখো, সকলকে ভালোবাসা৷

দলে দলে লোক আসে৷ তাদের ভেঙে-পড়া বুকে জাগে আশার আলো৷

হ্যাঁ গো কোন পথে যাব চালকাদ?

যাও চলে যাও-

ধূমকেতু তোমায় পথ দেখাবে, তারার দল পথ দেখাবে

লক্ষ লোক চলেছে

তাদের পথে চলে যাও৷৷

এখন মিশনের সাহেবদের টনক নড়ে৷ খ্রিস্টান মুন্ডারা মিশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে৷ গরিব মায়ের মুন্ডা ছেলে ধরতিআবা হয়েছে, আর তোমাদের সাদা যিশুকে কে চায়?

টনক নড়ে মদের দোকানির, সরকারি আবগারি বিভাগের৷ থানার দারোগা নজর রাখে৷ জমিদার মহাজনরা নড়েচড়ে ওঠে৷ ১৮৯৫-৯৬ সালে আকাল আসে৷ ধরতিআবা বলে ‘ভীষণ আকাল আসছে৷ মাঠের শস্য মাঠে নষ্ট হবে৷ যে যা পার কেটে খাও৷ নতুন কাপড় পরে নাও আশ মিটিয়ে৷’

আকাল আসে৷ বিরসার ভবিষ্যদবাণী সফল হয়৷ তার নাম ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতগামী পাখির ডানায় বাতাস কেটে দূরদূরান্তে৷ এখন বিরসা বলে ‘সাহেবদের রং সাদা, সাদা মুরগি ও ছাগল আমরা দরকারে বলি দেব৷ তোমরা শোনো, সাহেব জমিদার মহাজন সবাই আমাদের শত্রু৷’

আর বুড়ো ও প্রৌঢ় সর্দাররা, যারা এতদিন দূর থেকে সব দেখছিল, তারাও বোঝে যে সুগানা মুন্ডার ছেলে ধরতিআবা হবার ফলে মুন্ডাদের ভাঙা বুকে আবার যে জোয়ার ডেকেছে, তার অন্য মানে আছে৷ তারাও বিরসার কথা প্রচার করতে থাকে৷

সরকারের টনক নড়ে৷ সব যদি হবে নির্দোষ ও নিষ্পাপ, এক মুন্ডা ছেলের পাগলামি, তাহলে মুন্ডা জাতির মধ্যে এ অস্থিরতা কেন? কেন সর্দাররা দলে দলে চালকাদে চলেছে?

সর্দাররা ভেবেছিল, বিরসাকে তারা বুঝতে পারবে৷ বিরসা তাদের প্রথমেই বলল ‘তোমাদের মতো আমি ব্রিটিশকে বন্ধু মনে করি না৷ মুন্ডাদের বলোয়া (বিদ্রোহ) উঠাতে হবে, সব কালা ও ধলা বিদেশিকে মারতে হবে ও তাড়াতে হবে৷ আগে স্বাধীন মুন্ডারাজ চাই৷ তারপর তোমাদের কথা আসছে যে, আর কেউ খাজনা দেবে না৷’

এই সময়েই বিরসা সিংভূমের গ্রামে গ্রামে খবর পাঠাতে থাকে ও দলে দলে লোক আসতে থাকে তার কাছে৷ পড়ে রইল জ্যৈষ্ঠে-আষাঢ়ে ধানবোনা, পড়ে রইল খেতখামারের কাজ৷ জমিদার ঠিকাদাররা আর বেঠবেগার পায় না৷

সিংভূমের ডেপুটি কমিশনার বিরসাকে ধরার জন্যে তামাড় থানায় খবর দিলেন৷ হেড কনস্টেবল গেল চালকাদে দুই কনস্টেবল নিয়ে৷ গিয়ে দেখে সে কী কাণ্ড! বিরসার ভক্তরা পঞ্চাশ ষাটটা ঘর তুলেছে৷ গিজগিজ করছে লোক, যেন মেলা বসেছে সেখানে৷ বিরসাকে সে ধরতে এসেছে শুনে সবাই তাকে এই মারে তো সেই মারে৷ বিরসা বলল, ‘তোমরা সাহেবদের চাকর, হুকুম তামিল করতে এসেছ মাত্র৷ খাও-দাও, জিরোও এই আঁধার বাদল রাতে৷ কাল চলে যেয়ো৷’

পরদিন হেড কনস্টেবল গিয়ে পলুস প্রচারক আর শ-দুয়েক লোক নিয়ে এল৷ বিরসাকে ধরতে হবে শুনে ‘না’ বলে সব মাহাতো আর মুন্ডারা এসে বিরসার পাশে দাঁড়াল৷ বিরসা বলল ‘এরা আতিথ্যের মর্যাদা রাখতে জানে না৷ প্রাণে মেরো না, তাড়িয়ে দাও৷’

আর কী কথা আছে? কনস্টেবল আর রাজপুতগুলোকে শত শত গ্রামবাসী কুকুরের মতো তাড়িয়ে বের করে দিল কয়েকটা গ্রাম পার করে৷

এতে বিরসার নাম আরও ছড়িয়ে পড়ল৷ এর আগে কনস্টেবলরা কত সহজে ধরেছে মুন্ডাদের৷ পুলিশ দেখে কত ভয় পেয়েছে তারা৷ বিশাল এক এলাকা জুড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠল৷ তারা যেন বুঝল খুব আশ্চর্য কিছু একটা ঘটে গেছে৷ কী সে ঘটনা? পুলিশ, যে নাকি গ্রামের লোকের কাছে সরকারের প্রতিনিধি, সেই পুলিশ বিরসাকে ধরতে পারেনি৷ যারা পুলিশ দেখে ভয়ে কাঁপত, সেই মুন্ডারা পুলিশদের তাড়িয়ে দিয়েছে৷

এখন সুবিস্তীর্ণ মুন্ডা অঞ্চলে কতকাল পরে প্রাচীন নিয়মে পঞ্চায়েত বসতে থাকল৷ হ্যাঁ হ্যাঁ, পঞ্চায়েতি প্রথায় নতুন করে বিচার করে দেখে নাও হে, মুন্ডাজীবনে জুলুম করছে কারা৷ রাজা, জমিদার, আর কে কে? বিরসা আমাদের ভাবতে শিখিয়েছে৷

গভরমেন্টের কথা বোলো না হে৷ সাহেব বিচারক কি মুন্ডার উপর জুলুম হল কি না তার তদন্তে আসে? নামটা হয় তদন্ত হচ্ছে, খরচাটা তারা পায়, কিন্তু শিকারটা খেলতে আসে হে, শিকারটা খেলতে আসে৷ সাহেবটা শিকার করে৷ তদন্ত-কাজটা চালায় এদেশের কালা চামড়া অফিসার আর বিচারে রায় দেয় মুন্ডাদের বিরুদ্ধে৷ দারোগা আসে জোরজুলুমে পয়সা পিটাতে৷

আমরা যেন এবার ইতিহাসে চিরকাল যা ঘটে থাকে সেই মজার নিয়মগুলো সুযোগ হলেই দেখে নিই৷ এখন তোমরা দেখো আর দেখতে শেখো, কোনো গণআন্দোলন গড়ে ওঠে যখন, তখন কারা গিয়ে সে-আন্দোলনের শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলায়৷

বিরসাকে ঘিরে এখনও তেমন করে আন্দোলন গড়ে ওঠেনি এই ১৮৯৫ পর্যন্ত৷ তবে বিরসা এক সুবিস্তীর্ণ এলাকায়, যেখানে পথঘাট নেই, সেখানে মানুষের মনে আশাভরসা ফিরিয়ে এনেছে৷ সে সবসময়েই বুঝিয়ে বলেছে যে, কী মিশনের সাহেব কী সরকারের সাহেব, সব সাহেবরাই আমাদের দুশমন৷ সাহেব সরকারের পেয়ারের লোক হল জমিদার, মহাজন, ঠিকাদার, আড়কাঠি৷ এরা আমাদের দুশমন৷ স্বাধীন মুন্ডারাজ হবে, তাতে এদের কেউ থাকবে না৷

এ তো একটা স্বপ্ন! কুড়ি বছরের এক তরুণ মুন্ডার স্বপ্ন৷ সে শোষণমুক্ত মুন্ডাদেশের স্বপ্ন দেখছে৷

যারা দেশ শাসন করে, কোনো আদিবাসী এক শোষণমুক্ত আদিবাসী সমাজের স্বপ্ন দেখুক, তা তারা কোনোদিন চায় না৷ স্বপ্ন দেখলেই সর্বনাশ৷ বাবা তিলকা মাঝি স্বপ্ন দেখেছিল, সিদু-কানু স্বপ্ন দেখেছিল৷ বিরসাও স্বপ্ন দেখছে? সর্বনাশ!

রাঁচির ডেপুটি কমিশনার সঙ্গেসঙ্গে ফতোয়া দিল, বিরসাকে ধরা দরকার৷ বিরসার প্রতি ভক্তিতে পাগল হয়ে মুন্ডারা আর অন্য আদিবাসীরা চাষবাস ছেড়ে দিচ্ছে৷ আ হা! চাষ না করলে বেচারারা খাবে কী?

পাদরি হফম্যান সরকারকে আভাস দিল যে, বিরসা স্থির করেছে, এই ১৮৯৫ সালের ২৪/২৫ আগস্ট তার নির্দেশে সব মিশনারিদের হত্যা করে হবে৷

বন্দগাঁওয়ের অত্যাচারী জমিদার জগমোহন সিং আর অন্যান্য জমিদাররা, মহাজনরা খবর দিতে থাকল যে, বিরসার ওখানে প্রার্থনা সভা, গান, এসব চলেছে বটে৷ তবে তা হল ভাঁওতা৷ আসলে সর্দাররা ভিতর ভিতর মতলব ভাঁজছে৷ বিরসার হুকুম চলে গেছে দিকে দিকে৷ তামাড় ও কোল-বিদ্রোহের পর এ আরেক বিদ্রোহের ডাক৷

খাঁটি কথাটা হল, সাহেব-সরকারের যারা খুঁটি, সেই মিশনারি আর জমিদার আর মহাজন আর ঠিকাদার, তারা ভয় পেয়ে এসব কথা ছড়ায়৷ জগমোহন সিং থাকত কোচাং গ্রামে৷ সেই নিজেই এর ষাট ভাগ কথা ছড়ায়৷

এর পর রাঁচিতে সরকারি অফিসারদের এক জরুরি বৈঠক হয়৷ ঠিক হয় যে, বিরসাকে নতুন কৌশলে ধরতে হবে৷ পুলিশের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট মিয়ার্স নিজে যাবে৷ ধরা হবে-ফৌজদারি আইনের ৩৫৩ ও ৫০৫ ধারায়৷ অপরাধ, বলপ্রয়োগে হেড কনস্টেবলকে সরকারের কাজ করতে বাধা দান (৩৫৩ ধারা) আর বক্তৃতা ও প্রচার দ্বারা জনসাধারণকে উত্তেজিত করা (৫০৫ ধারা)৷

‘সরকার জমিদার মিশনারি এক টোপি হ্যায়!’

মিয়ার্সের সঙ্গে বিশ জন পাঠান কনস্টেবল, মুরহু মিশনের পাদরি লাসটি, বন্দগাঁওয়ের জমিদার জগমোহন সিং ও তার সেপাইরা সব চলল৷ জগমোহনের হাতিতে মিয়ার্স, লাসটি ও সে নিজে৷ কমিশনারের হুকুম,-১, অবস্থা আয়ত্তের বাইরে না গেলে গুলি চালাবে না৷ ২. দিনের আলোয় প্রচুর লোকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাত এড়াবে৷ ৩. বিরসাকে ধরবে রাতের আঁধারে৷ ৪. এই বিষয়ে কাজ সারবে ঝটপট, কেননা যত সময় যাবে পরিস্থিতি তত বিপজ্জনক হবে৷

রাতের আঁধারে বিরসার ঘর সশস্ত্র পাহারায় ঘিরে ফেলে ঘুমন্ত বিরসাকে ধরা হয়৷ বিরসা বাধা দেয় ও চ্যাঁচায়৷ কিন্তু চালকাদে তখন পুরুষমানুষ মাত্র দশ-বারো জন৷ সকাল সাড়ে-আটটায় বিরসাকে নিয়ে ওরা বন্দগাঁও পৌঁছোয়৷ আর আদিবাসীরা দৌড়ে আসতে থাকে৷ জঙ্গলের পথে ছোটাছুটি৷ বিরসাকে তোলো ডোলিতে (ছোটো পালকি), চলো রাঁচি৷ বিরসা হেসে কী বলে হেঁকে৷ আদিবাসীরা মাথা হেলায় ও চলে যেতে থাকে৷

কী বলল বিরসা? জগমোহনের মুখ শুকিয়ে গেল কেন? বিরসা বলল, ‘এ একটা পরীক্ষা মাত্র৷ আমি ফিরে আসব৷ তোমরা কোনোমতেই ভেঙে পড়বে না৷’

বন্দগাঁও থেকে রাঁচি এক বিশাল জনতা সঙ্গে চলে৷ ধরো, আমাদের বন্দি করো৷ রাঁচিতে আদালতে কী ভিড়, কী ভিড় বাইরে৷ ওদিকে ভিড় চালকাদে৷ করম পরবের আনন্দের রং জ্বলে যায়৷ ক্রুদ্ধ মুন্ডাদের হাতে বলোয় (কুঠার)৷ চালকাদে পুলিশ মোতায়েন৷ রাঁচিতে কমিশনারের নির্দেশে সিভিল সার্জন বিরসাকে পরীক্ষা করে, সে উন্মাদ না কি তা দেখে৷ ওদিকে জগমোহন সিং ভয়ে কাঁপে৷ খুঁটি ও তামাড় থানায় আরও পুলিশ৷ চল্লিশ জন কনস্টেবল বন্দুক নিয়ে জগমোহনকে পাহারা দেয়৷ সারজুমড়ি ও তরাইয়ের জমিদার, খরসোয়ানের জমিদার ও সিংভূমের ডেপুটি কমিশনার সতর্ক হয়৷ বিক্ষুদ্ধ মুন্ডারা জগমোহন ও অন্য জমিদারদের কাজ ছেড়ে চলে যেতে থাকে৷

কলকাতায় বসে ছোটোলাট বলে ‘একটা বিশ বছরের পাগলা ছেলেকে নিয়ে রাঁচির অফিসাররা বেজায় হইচই জুড়েছে৷ মিয়ার্স বাড়াবাড়ি করছে৷’

এখন ঠিক হয়, রাঁচি নয়, খুঁটিতে বিরসার বিচার হবে৷ মুন্ডাদের দেখানো দরকার যে, বিরসা কোনো ‘ভগবান’ নয়, সে সামান্য মানুষ মাত্র৷

খুঁটিতে এসে ভেঙে পড়ে এক সুবিশাল জনস্রোত৷ দাও, ভগবানকে দেখতে দাও৷ কেন তাকে বিনাবিচারে আটক রেখেছ? জনতাকে আয়ত্তে আনা যায় না৷ ডেপুটি কমিশনারের মুখ শুকিয়ে যায়৷ বিরসাকে তাড়াতাড়ি পাঠায় রাঁচি৷ রাঁচি থেকে কমিশনার আসে পুলিশ নিয়ে৷ বহুজনকে ধরা হয়৷ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বাবু কৃষ্ণকালী মুখার্জি এদের সকলকে খালাস করে দেন৷ ডেপুটি কমিশনারকে বদলি করা হয়৷ বিরসাকে খুঁটিতে নিয়ে বিচার করার পরিণামে প্রমাণ হয়ে যায় যে বিরসা বন্দি হওয়াতে তার প্রভাব এতটুকু কমেনি মানুষের মনে৷ বিরসা ও আরও পনেরো জনের বিচার হয়৷ এরতরফা বিচার৷ বিরসাকে কোনো উকিল দেওয়া হয় না৷ বিরসা বলে সে দোষী নয়৷ আত্মপক্ষ সে সমর্থন করবে না৷ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড৷

মুন্ডা জনপদে চলে পুলিশের অকথ্য অত্যাচার৷ এ সময়ে মুন্ডারা আবার মিশনে যেতেও শুরু করে৷ কিন্তু যেসব পাদরি সরকারকে রিপোর্ট পাঠায় তারা জানায়, প্রথম সুযোগেই মুন্ডারা খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে চলে যাবে তাতে সন্দেহ নেই৷

কিছুই বোঝেনি ব্রিটিশ শাসকরা৷ যে সময়ে বিরসা গ্রেপ্তার হল, তখনও স্বাধীন মুন্ডারাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এক গণবিদ্রোহ স্বপ্ন মাত্র, সবে অঙ্কুর জেগেছে তার৷ শাসক ভাবল, বিরসাকে বন্দি করলে ব্যাপারটি সমূলে উপড়ে ফেলা যাবে৷ আসলে দেখা গেল, এর ফলে বিদ্রোহের কাজ তাড়াতাড়ি এগিয়েছিল৷

১৮৯৬-৯৭ সালে, বিরসা যখন জেলে, তখন অনাবৃষ্টির ফলে মুন্ডা অঞ্চলে দুটো ফসল নষ্ট হল৷ সাতশো মাইল জুড়ে নামল দুর্ভিক্ষ৷ জিনিসপত্রের দাম বাড়ল, অনাহারে মানুষ মরল, সরকারি খয়রাতি লাল ফিতার ফাঁসে আটকে বিকল হল৷ মিশনারিরা কিছু সাহায্য ও ত্রাণের কাজে নামল৷ জমিদাররা এ-সময়ে এক মুঠো চালও দিল না আর্তকে৷ তার ওপর কচি বাঁশের ডগা খিদের জ্বালায় ভেঙে খেয়েছে বলে কঙ্কালসার মানুষদের নামে আদালতে কেস করতে থাকল৷

এসময়েই সরকার এক খাজনাবৃদ্ধি আইন করে ও পরে তা সংশোধন করে৷ এতে মুন্ডাদের কোনো উপকার হয়নি৷ সর্দাররা তাদের বন্ধু ব্যারিস্টার জেকবকে আবার ডাকে৷ জেকব বলেন ‘এ আইনে তোমাদের উপেক্ষা করা হয়েছে৷ তোমরাও এ আইনকে উপেক্ষা করো৷’

দুর্ভিক্ষ চলে৷ ধান লুট ও খাজনা বনধ চলে৷ বিরসা জেলে থাকার সময় গিডিয়ুন, প্রভুদয়াল, এসব প্রাচীন সর্দাররা বিরসার নামে প্রচার চালায় ও আন্দোলনের জমিন তৈরি রাখে৷ তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে না৷ বিরসা আসুক৷

কারাবাসের বেশি সময়টা বিরসা থাকে হাজারিবাগ জেলে৷ রাঁচিতে তাকে রাখতে ভরসা পায়নি সরকার৷ তারপর রাঁচি৷ ১৮৯৭ সালের ৩০ নভেম্বর সে মুক্তি পায়৷

সঙ্গেসঙ্গে মুন্ডা ও ওরাওঁ জনপদে লাগে উৎসবের জোয়ার৷ মুন্ডারা ছেড়ে আসে মিশন৷ বাজে নাগাড়া ও ধামসা৷ নাচ ও খাওয়া-দাওয়া চলে৷ চালকাদে মেলা বসে৷

সাতই ডিসেম্বর ডেপুটি কমিশনার চালকাদে যান৷ ‘বিরসা, জেলে তোমায় কাছ থেকে দেখলাম৷ খুবই খুশি আমি তোমার ব্যবহারে৷ আর কোনো ঝামেলা বাধিয়ো না৷ কথা দাও৷’

বিরসা স্বচ্ছন্দে মাথা হেলায়৷

‘প্রচুর ধান লুট হয়েছে৷’

‘সাহেব সরকারও তো ঘোষণা করেছে যে, জমিদারদের ধান বাঁচাবার জন্যে গ্রামে গ্রামে পিটুনি পুলিশ বসাবে আর তার খরচ দেব আমরা৷’

ডেপুটি কমিশনার চলে যায়৷ বিরসা বলে ‘আমার ধর্ম এখন নতুন চেহারা নেবে৷ বোর্তোদিতে ডোনকা ও সালির ঘরে হবে প্রথম সভা৷’

এই সভাতে বিরসা বুঝিয়ে দেয় যে, তার ধর্ম ও রাজনীতি এক এবং অভিন্ন৷ বিরসা নিজেকে ‘ভগবান’ বা ‘ধরতিআবা’ বলেছিল আর বিদ্রোহ-সংগঠনের ভার দিয়েছিল তার ধর্মের লোকদের৷ এ ব্যাপারটিকে খুব ভালো করে বুঝতে হবে৷ সে-সময়ে সকল মুন্ডাই বিরসাইত হয়ে যায়৷ বিরসার নেতৃত্বে কাজ করলেই বিরসাইত হওয়া হত৷ এই ধর্মের গান, যা আজও বেঁচে আছে, তা জানলে বোঝা যাবে যে এ ধর্ম সেদিন মুন্ডাদের বিদ্রোহ টেনেছিল৷

একটি প্রার্থনা-

…পৃথিবীর এই নতুন রাজা আমাদের আশীর্বাদ করুন, যাতে আমরা পুরোনো রাজা, সরকার, জমিদার, শয়তান ও শত্রুকে নদীর জল ও অরণ্যের আগুন দিয়ে ধ্বংস করতে পারি৷

একটি ভজন সংগীত-

জমি যেন জ্বলছে

বোন, আগুনের মতো জ্বলছে

শুকনো ঘাসের মতো জ্বলছে জমি প্রলয় আগুনে

আগুন ছড়াচ্ছে যেন গাছে জাগছে নতুন পাতা

বট পাতা যেমন ওড়ে বাতাসে

তেমন চলে যাচ্ছে জমি

পিপল পাতার মতো ছড়াচ্ছে

হে বিরসা, তুমি জমিকে ধরলে শক্ত মুঠে

যেন জোয়ান তাজা ষাঁড় তুমি

কষ্ট সইলে, জেল খাটলে

মুন্ডা জাতিকে এক করে বাঁধলে

মুন্ডাদের নাম করলে দীপ্ত

হে বিরসা, তারা স্মরণ রাখে তোমায়

কাঁদে তোমার জন্য

মুন্ডারা যুগ যুগ তোমায় অভিবাদন জানাবে৷

বিরসার ধর্মের অনুগামী আজ কম মুন্ডাই৷ বেশির ভাগই আদি মুন্ডা ধর্মে বিশ্বাসী৷ কিন্তু যে মুন্ডা যেখানে গেছেন সেখানকার স্থানীয় ধর্মের উৎসবও তাঁরা অনেকসময়ে মানেন৷ বহুজন খ্রিস্টান৷ সে আজকে৷ বিরসার সময়ে যে তার ধর্মে বিশ্বাসী সে-ই হাতিয়ার ধরেছে৷ বিরসার নতুন ধর্মের উদ্দেশ্যেই হল মুন্ডা জাতির মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে ব্রিটিশের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নামানো৷

ডোনকার বাড়ির সভায় জালমাইয়ের সোমা মুন্ডা পায় ধর্ম প্রচারের ভার, ডোনকা রাজনীতিক প্রচারের ভার পায়৷

বিরসাইতদের বাড়িগুলিতে সাধারণের ঢোকা নিষেধ হল৷ সেসব বাড়িতে হাতিয়ার জমা করা হবে৷ প্রচারক বা গুরুদের বাড়িতে হবে সভা৷ পুরাণকরা খোলাখুলি বিদ্রোহের কথা প্রচার করবে৷ নতুন বিরসাইতরা যুবক, তারা নানক৷ তারা কাজ করবে সংগঠনের৷

মুন্ডারাজ হবে৷ মুন্ডারা যে ছোটোনাগপুর ও সিংভূমের আদি বাসিন্দা তা আবার জানতে হবে৷ চুটিয়ার মন্দির, জগন্নাথপুরের মন্দির যেখানে দাঁড়িয়ে আছে-তা মুন্ডাদের প্রাচীন ধর্মস্থান৷ নওরতনগড় যেখানে ছিল সেখানে প্রাচীনতম মুন্ডা জনপদ৷ ২৫০ বছরের মধ্যে হিন্দু রাজারা এসব জায়গায় গেড়ে বসেছে৷ মন্দির দু-টি থেকে দেবমূর্তি ফেলে দিয়ে চুটিয়া থেকে তুলসী ও জগন্নাথপুর থেকে চন্দন নিতে হবে৷ নওরতনগড় থেকে নিতে হবে ‘বিরদা’ (পবিত্র জল) আর মাটি৷

‘কেন এ কাজ করতে হবে?’

‘রাজা আর জমিদারদের সঙ্গে তাদের দেবতাদের কথাবার্তা চলে ওইসব মন্দিরে৷ এই রাজা আর জমিদাররা আমাদের রক্ত চুষে শেষ করেছে, জাতটাকে বানিয়েছে বেঠবেগার৷ আমরা ধুতি, পাগড়ি, জামা, জুতো, ছাতা ব্যবহার করব, তা নিষেধ করে দিয়েছে৷ আমাদের উঁচু জায়গায় বসা, মন্দিরে ঢোকা, কাঁসাপিতলের বাসনে খাওয়া নিষেধ৷ এভাবে আমাদের মান কেড়ে নেয়নি তারা? মুখে ধুলো ঘষে দেয় না, নিষেধ না মানলে? আমরা এ কাজ করলে তোমাদের সাহস ফিরবে, তারা বুকে চোট খাবে৷ জমিন যেমন আঁধির মুখে ধুলোর মতো উড়ে গেছে, আমাদের আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মানও ওদের আক্রমণে তেমনি চলে গেছে৷’

‘আমরা, মেয়েরা কী করব?’

‘তোমরা নতুন মাটির পাত্রে আনবে নওরতনগড়ের ঝরনার জল৷’

এই তিন জায়গায় যাওয়ার কাজ চলে ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ১৮৯৯ সালের নভেম্বর অবধি৷ আর চলতে থাকে বিদ্রোহের প্রস্তুতি৷ এখন বিরসার কাজের প্রধান ঘাঁটি হয় ডোমবারি অঞ্চল৷ চালকাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিঁড়ে যায় আর করমির বুক ভেঙে যায়৷

‘তুই ভগবান হলি, জেলে গেলি৷ ফিরে এলি, আবার কাজে মাতলি৷ নতুন ঘরে থাকিস, মানুষজন ঘিরে থাকে তোকে৷ সব মেনে নিয়েছি৷ তবু কেন চলে যাবি? চোখের দেখাও দেখতে পাব না?’

করমির কথা রাখেনি বিরসা৷ রাখা সম্ভব ছিল না৷ চালকাদ হল বন্দগাঁওয়ের বড্ড কাছে আর বন্দগাঁও থেকে এদিকে রাঁচি, ওদিকে চাঁইবাসা খুবই সহজে যাওয়া যায়৷

ডোমবারি হাসাদা অঞ্চলের বুকে৷ হাসাদা আজও খাঁটি মুন্ডা এলাকা৷ ডোমবারি ঘিরে আছে সৈল রাকাব, কেরা-ওরা, বিচা-বুরু পাহাড়গুলি৷ একদিকে তার ডোমবা অথবা সাইকোর বনঢাকা উপত্যকা৷ দূরে তামাড় ও খুঁটির পর্বতমালা৷ কাছেই আছে নদী ও ঝরনা৷ এখানে বিরসা তার শৈশব কাটিয়েছে৷ এই পাহাড় ও জঙ্গল তামাড় ও কোল-বিদ্রোহে জ্বলে উঠেছিল৷ মুন্ডা ও লড়াকু-হো এখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়ে৷ ইচা হোরাং, লাংগোলোর, ডোমবা ঘাট উপত্যকা ও জিকিলাতা মালভূমির প্রতিটি গাছে ও ঘাসে বাতাস বয় যখন, তখন সেই যুদ্ধের কথাই পৌঁছে যায় মুন্ডাদের কুটিরে৷

সাতশো বর্গমাইল ব্যাপী মুন্ডা অঞ্চলের প্রতিনিধি হয়ে শত শত মুন্ডা আসে এ সভায়৷

বিরসা বলে ‘তোমরা বেছে নাও, কোন পথ চাও৷ যুদ্ধের, না শান্তির?’

‘যুদ্ধের, যুদ্ধের৷’

‘যুদ্ধের পথে গেলে অনেক নির্যাতন৷’

‘যুদ্ধের পথে যাব৷ নিয়ে চলো৷’

ডোমবারির সভা ১৮৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে৷ সারোয়াডা মিশনের কাছে সিমবুয়া পাহাড়ের সভা মার্চ মাসে৷ এখানে গানে গানে স্মরণ করা হয় তামাড় বিদ্রোহের নেতা ডুন্ডিগাড়ার দুখন সাই ও রামগড়ার রতন সাইকে৷ গাওয়া হয় কোলবিদ্রোহের গান-

ছোটো পিঁপড়ের মতো হাতিয়ার নিয়ে কোথায় লড়ছে ওরা?

কোথায় ছুড়ছে তির বড়ো পিঁপড়ের মতো হাতিয়ার বয়ে?

ওরা লড়ছে বুন্ডুতে

ওরা তির ছুড়ছে তামাড়ে৷৷

এখানেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতীক হিসেবে একটি কলা গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি মানুষের মাথা কাটা হয়, আর সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার প্রতীক ওইরকম আরেক মূর্তি পোড়ানো হয়৷ এরপর বিরসা আবার যুদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, দুই পথের একটি বেছে নিতে বলে ও একই উত্তর পায়৷

কেন বার বার বিরসা জমায়েতের সামনে দু-টি পথের প্রস্তাব রাখছে? তার কারণ, দু-টি:

১. বিরসা প্রতিবার নতুন জমায়েতে যাচ্ছে, তাই বার বার তাকে প্রশ্ন করতে হচ্ছে৷

২. বিরসা আদিবাসী৷ আজও, এতবার তাদের সমাজন-ব্যবস্থায় এত বিপর্যয় আসার পরেও, আদিবাসী রক্তে সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ আমাদের চেয়ে অনেক উঁচু মানের৷ তারা সকলের কথাকে মান্য করে ও সকলের কথা শোনে৷ নিজের মত অন্যের উপর প্রথমেই চাপায় না৷ তাই বিরসা বার বার এ প্রশ্ন করেছিল৷ খুবই দুঃখের কথা, আজ অনেকে এভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে বিরসা নিজে সশস্ত্র গণবিদ্রোহ চায়নি, সর্দারদের প্রভাবে গণবিদ্রোহে নেমেছিল৷ যারা এ বই পড়ছ, তারা তো জানছ যে তা সত্যি নয়৷ সর্দারদের আন্দোলন শুরু থেকেই আইনমানা পথে চলেছিল৷ মুন্ডা জাতির মনে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও যুদ্ধ করার জঙ্গি মনোভাব জাগাবার ক্ষমতা সর্দারদের সে সময়ে ছিল না৷ বিরসাই পারত মুন্ডা জাতিকে প্রবল পরাক্রান্ত ইংরেজের মুখোমুখি দাঁড় করাতে৷

সর্দারদের আন্দোলন নিশ্চয়ই বিরসার আন্দোলনে মিশে যায় ও তাকে সাহায্য করে৷ কিন্তু সর্দাররা চেয়েছিল আংশিক প্রতিকার৷ বিরসা বুঝেছিল যে, ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করলে জমিদার-মহাজন সকলের শোষণ উচ্ছেদ করা যাবে৷ সে চেয়েছিল, ব্রিটিশ নেই-এমন এক স্বাধীন মুন্ডারাজ্য৷ যে এত বড়ো স্বপ্ন দেখতে পারে সে কি এমন ব্যক্তিত্বহীন যে অন্যের কথায় যুদ্ধের নীতি বদলাবে?

এরপর, ১৮৯৯ সালের অক্টোবর বা নভেম্বরে সোহরাই পরবের এক সপ্তাহ আগে ডোমবারি পাহাড়ে সভা হল৷ সেখানে বিরসা নিজে বয়ে নিয়ে যায় মুন্ডারাজের প্রতীক সাদা নিশান ও ব্রিটিশ রাজের প্রতীক লাল নিশান৷ কলা গাছের একটি কাণ্ড রাখা হয়৷ বিরসা বলে ‘দিকুদের সঙ্গে যুদ্ধ হবে৷ এই নিশানের মতো লাল রক্ত বইবে মাটিতে৷’

লাল নিশান শোভিত কলা গাছে তির মেরে গাছটি জ্বালানো হয়৷ ব্রিটিশ শাসনের অন্ত এভাবে বোঝানো হয়৷ মুন্ডাদের সাদা নিশানের সামনে শপথ করা হয়, এখন থেকে মুন্ডারা চুলে কাঠের চিরুনি, গায়ে গয়না ও ফুল পরবে না, নাচবে না করম পরবে৷ উলগুলান বা বিদ্রোহ সম্পূর্ণ করা প্রথম কাজ৷ এই করম দিকুদের উৎসব৷

এখানে আমাদের মনে পড়ে, ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল গণবিদ্রোহের সময়ে নেতারা সাইহা বিবাহ নামে নতুন বিয়ের রীতি ও ছাতা পরব প্রচলন করেছিলেন৷

এরপর সমগ্র মুন্ডা অঞ্চল ও তার বাইরেও ঝড়ের মতো চলতে থাকে গোপন জমায়েত৷ দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড় হল সভার জায়গা৷ সভা হয় বাসিয়া, সিপাই, কোলেবিরা, বানো, লোহায়ডাগা, তোরপা, কারা, খুঁটি, মুরহু, তামাড়, বুণ্ডু, সোনাহাতু, জোড়হাট, জালমাই, বেলনিয়া, বালিহাতু, জালসার আরও কত জায়গায়৷ একশোর মতো সভা হয়৷ বিরসা প্রায় সবগুলিতে যায়৷ বিরসা ছাড়াও ডোনকা, চান্দা, নুবাস, দিলগু, চারা ও অনেকের নাম আমরা পাচ্ছি৷ কারিকার সভার ছবি আমি যেন দেখতে পাচ্ছি৷ অমাবস্যা, কৃষ্ণপক্ষ৷ পাহাড়ের নীচে কুড়ি জন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুচরের সঙ্গে বিরসা৷ সামনে কাঠের ধিকিধিকি আগুন৷ পাথরে বসেছে বিরসা, মাথায় সাদা পাগড়ি, গায়ে জড়ানো চাদর, সামনে তার তরোয়াল৷

‘আমাদের দাবিদাওয়া নিয়ে হাইকোর্ট অবধি লড়ে কোনো লাভ হয়নি৷ হাকিম চিরকাল মুন্ডার বিরুদ্ধে রায় দিয়ে গেল জমিদারের সপক্ষে৷ আজ আমাদের মায়ের কোল যে জঙ্গল, সেখানে ছাগল চরালেও তা অপরাধ৷ আইন যা হয়েছে, তা লোক-দেখানো আইন৷ সাহেবদের উৎসব ২৫ ডিসেম্বর, বড়োদিন৷ সেদিন থেকে উলগুলানের শুরু৷ জমিদার-ঠিকাদার-পাদরি-মহাজন সবাইকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে কাজ শুরু করো৷ প্রচার চালাও৷’

পথ নেই, যানবাহন নেই, টেলিগ্রাফ নেই, প্রচারটা হয় কী করে? পথঘাট-যানবাহন-টেলিগ্রাফ-টেলিফোন, এসব তো চিরকালই আমাদের জন্যে৷ গ্রাম-পাহাড়-জঙ্গলের আদিবাসীর জন্যে তো নয়!

তাই-

সাঁওতালরা পাঠাত শালগাছের ছালের গিরা-

হো আর মুন্ডারা পাঠাত তির-

অন্যরা পাহাড়চূড়ায় জ্বালত আগুন-

কেউ উঁচু গাছের মাথায় দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত মশাল ঘুরাত-

খবর পৌঁছে যেত হাওয়ার আগে৷৷

খবর পৌঁছে৷ খবর যখন চলল, তার চলার পথে জঙ্গল বা পাহাড়, নদী বা বুনো জন্তু, পুলিশচৌকি বা জমিদারের চর কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারল না৷

এ সময়ে সরকারি তরফে বিরসাকে ধরার চেষ্টা হয়নি কি? হয়েছিল৷ কিন্তু রাঁচি ও সিংভূম, দুই জেলার পুলিশ কর্তৃপক্ষের মধ্যে বনিবনা ছিল না৷ ধরার চেষ্টা কোনো সময়েই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করা হয়নি৷ বিরসাকে বড়ো সাহেবরা তেমন আমল দিতেই নারাজ৷ ধরতে চেষ্টা করবে কনস্টেবলরা৷ চুটিয়া ও জগন্নাথপুরের ঘটনার পর বিরসাকে ধরলে পরে বকশিশ মিলবার কথা ঘোষণা করা হয়৷

কিন্তু কনস্টেবলরা মুন্ডা জনপদে ঘুরতে নারাজ হয়৷ তারা কোনো সময়েই গ্রামবাসীদের সাহায্য পায়নি৷ জগমোহন সিংয়ের মতো লোককে মদত দিতে গিয়ে তারা তির খেতে রাজি নয়৷ জগমোহন সিং নিজে সরকারি বাংলো লুঠ করে তা বিরসার নামে চালিয়েছিল৷ এখন সে বিরসার ভয়ে কাঁপছে ও পুলিশ পাহারা চাইছে৷

পুলিশ কর্তৃপক্ষ ধরে নিল যে বিরসা বড়োজোর চাঁদের আলোয় সভা করছে ও পাহাড়চূড়ায় নাচগান করছে৷ তা নিয়ে ভাবার দরকার নেই৷

আজ আমরা জানি আর আজও দেখতে পাই, যারা আদিবাসী নয়, তারা আদিবাসীদের চিন্তাধারা একেবারে বোঝে না৷ ১৮৯৯-১৯০০ সালের মুন্ডা বিদ্রোহ বা উলগুলানের লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় বা সরকারি আমলা ও মিশনারি নেই এমন এক মুন্ডা জীবন৷

সে-জীবন থেকে জমিদার-মহাজন-দিকুরা সাহেবদের সঙ্গেসঙ্গেই পালাবে৷ এভাবে স্থাপিত হবে বিরসার নেতৃত্বে এক স্বাধীন মুন্ডারাজ৷ যে মুন্ডারাজে চলবে বিরসার ধর্ম৷ এই ধর্ম আদিম মুন্ডা ধর্মের খুব কাছাকাছি৷ তাতে ভূত-প্রেত-ডাইনি-পুরোহিত, এসব নেই৷ পাদরি হফম্যান কিন্তু দু-বছর ধরে মুন্ডাদের মনে দিকু ও সাহেব বিষয়ে ভয়ংকর ঘৃণার কথা সাহেবদের জানিয়ে আসছে৷ টাকা দিয়ে সে মুন্ডাদের হাত করতে চেষ্টা করেছে৷ কোনো লাভ হয়নি৷

১৮৯৯ সালের শেষের দিকে সরকারের টনক নড়ল৷ এ কী শুনছি? বিরসা নাকি আবার আসছে? এ কী খবর? তখন ওদিকে মুন্ডারা কী করছে?

আমাদের হাতে হাতিয়ার ঝলকায়

বিরসা, আমরা তৈয়ার

বাঁ-হাতে ধনুক ডান হাতে তির

হাতে হাতিয়ার ঝলকায়

বিরসা, আমরা তৈয়ার

কোমরে পট্টি, মাথায় পাগড়ি, হাতে হাতিয়ার ঝলকায়

বিরসা, আমরা তৈয়ার

হাত বাড়িয়েছি, দুশমন, ভয় পাও!

বুক চিতিয়েছি, দুশমন, ভয় পাও!

হাতে হাতিয়ার ঝুলকায়

বিরসা, আমরা তৈয়ার৷৷

এভাবেই আসে ১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর৷ বড়োদিনের আগের দিন৷ খানাপিনা উৎসব আনন্দের দিন সহেবদের৷ আজ ভারতবর্ষে যারা সেদিনের সাহেব আর সাহেবদের দালালদের জায়গা নিয়েছে, তারাও প্রচুর ধুমধামে খানাপিনায় ২৪ আর ২৫ ডিসেম্বর পালন করে৷ তাহলে সেদিনের সাহেবরা কত উৎসব করত, তা কি বলে দিতে হবে?

১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বরই সাহেবদের উৎসবের ওপর বিরসা নিষেধ জারি করে৷

সিংভূমের চক্রধরপুর, রাঁচির খুঁটি, কারা, তোরপা, তামাড় ও বাসিয়া এই ছয়টি থানায় ১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আগুন জ্বলে, তির চলে৷ এই আগুন জ্বেলে ও তির চালিয়ে উলগুলানের সূচনা করা হয়৷ এ সময়ে লক্ষ্য মিশন ও মিশনসংক্রান্ত সব লোকজন৷

বহু মিশন জ্বলে, মিশনারিরা আহত হয়, কিছু লোক নিহত হয় চৌকিদার সমেত৷ রাঁচিতে তির চলে৷ একজন নিহত হয় ও পুলিশ সুপারের বাংলোতে এক ইংরেজ আহত হয়৷ বহু গির্জা ও মিশনবাড়ি জ্বলে যায়৷ বিরসাইতরা গান গায়-

হেনদে রামব্রা কেচে কেচে

পুনদি রামব্রা কেচে কেচে৷৷

কাটো কালো ক্রিশ্চানদের

কাটো সাদা ক্রিশ্চানদের৷৷

রাঁচির ডেপুটি কমিশনার স্ট্রিটফিলডের নির্দেশে এখন রাঁচি ও সিংভূম, দুই জেলার মধ্যে অবস্থিত বন্দগাঁও হয় বিরসার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবার সদরঘাঁটি৷ স্ট্রিটফিলড নিজে থানার পর থানা ঘোরে ও বিরসার প্রভাবে মুন্ডা জাতির পরিবর্তন দেখে হতভম্ব হয়৷ ঠিক হয়, রাঁচি ও সিংভূমের সাড়ে পাঁচশো বর্গমাইল এলাকায় পড়বে পুলিশ ছাউনি৷ পুলিশের অত্যাচারে মুন্ডারা নাস্তানাবুদ হয়ে বিরসাকে ধরিয়ে দেবে৷ দুমকা ও চুঁচুড়া থেকে মিলিটারি পুলিশ আনা হয়৷ বড়ো বড়ো পুলিশদল নিয়ে বিরসাকে ধরার চেষ্টা বিফল হয়৷ দুর্গম জঙ্গল দিয়ে পথ দেখিয়ে যেতে যেতে পথপ্রদর্শকরা জঙ্গলে মিলায়৷ পুলিশ পৌঁছোয় জনহীন গ্রামে৷ ক্রমে পুলিশের মাথায় ঢোকে যে উঁচু গাছের মাথা থেকে তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে ও খবর চালাচালি হচ্ছে৷ আতঙ্কে অস্থির পুলিশ ফিরে আসে৷ গ্রামগুলিতে মেয়েরা, শিশুরা, বৃদ্ধারা নেই৷ ‘বুড়োবুড়িরা আর মেয়েছেলেরা যখন বিরসাইত হয়েছে তখন আমরা কি ভরসায় বনের পথে হাঁটছি?’

‘তোমরা সরকারের কাজে এসেছ৷’

‘কাজ গেলে মানুষ বাঁচে বাবু, তির খেয়ে জানটা চলে গেলে কোন লোক আবার বাঁচে?’

পুলিশ ফিরে আসে৷

স্ট্রিটফিলড লেখে, ‘২৪ ডিসেম্বরের ঘটনাকে মুন্ডা অভ্যুত্থান বা বিদ্রোহ বলা যায় না এখনও৷ কিন্তু এর ও প্রতিঘাত বহুদূর ছড়িয়েছে৷ এক প্রকৃত বিদ্রোহের শুরু যে হয়েছে, ভুল নেই তাতে৷ আমার সন্দেহ নেই যে বিরসা যদি সন্ত্রাসবাদী কাজের সাহায্যে অধিকাংশ লোককে তার দলে টানে, আক্রমণমূলক কাজ বেড়ে যাবে আর এ আন্দোলনের পরিণাম দাঁড়াবে বিদ্রোহে৷’

স্ট্রিটফিলড বোঝেনি যে, বিরসা সন্ত্রাসবাদের পথ মুন্ডাদের মন জয় করেনি৷ তা যদি হত, আজও আমরা এ গান শুনতে পেতাম না-

কোচাং সিনজুরিয়া বিরিসাম…

হে বিরসা, তুমি কাঁপিয়ে দিয়েছ কোচাং ও সিনজুরি

কাঁপিয়েছ রাঁচি ও ডোরানডা

ঝাঁকিয়ে দিয়েছ রাঁচি আদালত

লাথি মেরেছ চুটিয়া মন্দিরে

পায়ে দলেছ সীতা ও রামের মূর্তি৷৷

বিরসা নেচেছিল দোয়েসা ও খুখরায়

ডোরানডার পর্বতে গেয়েছিল গান

সে উড়িয়েছিল খুঁটকাট্টির নিশান

মুন্ডাদের সবুজ নিশান উড়িয়েছিল নওরতনে৷৷

পোড়াহাটে স্ট্রিটফিলেড যখন বিরসাকে খুঁজছে, বিরসাইতরা তখন খুঁটি অঞ্চলে ব্যাপক অভ্যুত্থানের জন্যে তৈরি হয়ে গেছে৷ ২৪ ডিসেম্বর ‘আগুন জ্বালাও তির চালাও’ আহ্বানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে৷ দূর থেকে খ্রিস্টান মুন্ডারা চলে এসেছে বিরসার দলে৷ বিরসা এখন ঘোষণা করছে, ‘বিরসাইতরে লড়াই সরকার ও দিকুর সঙ্গে৷ খ্রিস্টান হও বা না হও, কোনো জাতির সঙ্গে বিরসাইতের বিবাদ নেই৷’

আন্দোলনের কৌশলও বদলে যায়৷ গির্জা বা মিশন নয়, সরাসরি সরকারের সঙ্গে লড়াই যুদ্ধ হোক তবে৷ বিরসা ভগবান, সে প্রচার করেছিল, ধর্ম এক৷ এখন তার ধর্ম মুন্ডাদের বলে, যুদ্ধ হোক৷ বুরজু মিশনের পাদরি পুটশিং জানায়, ‘জঙ্গলে মুন্ডাদের বিশাল জমায়েত হচ্ছে৷ ওরা পুলিশ ও সৈন্যদের সঙ্গে লড়বে এবার৷’ ১৯০০ সালের ৬ জানুয়ারি বিদ্রোহীরা বুরজুর কাছে এক জার্মান জঙ্গল-ঠিকাদার ও তার চাকরদের মেরে ফেলে৷

এই মেরে ফেলাটি আমরা যেন লক্ষ করি৷ মুন্ডা ও অন্য আদিবাসীদের জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ আজও চলছে আর যুক্তি হিসেবে সরকার বলে, ‘আদিবাসীগুলো জঙ্গল নষ্ট করে৷’

খুব বিচ্ছিরি আর সত্যি কথাটা হল, আদিবাসী কখনো জঙ্গল নষ্ট করে না৷ তাদের হাতে বনজ সম্পদ নষ্ট হয় না৷ জঙ্গল মা হয়ে তাদের বাঁচায়, তারাও জঙ্গলকে রক্ষা করে৷

সরকারের বনবিভাগের অসাধু কর্মচারী আর জঙ্গল-ঠিকাদার, দুই শয়তানের জোটে বন নষ্ট হচ্ছে৷ তারা বন কেটে নির্মূল করছে, কাঠের কারবার ফুলেফেঁপে উঠছে৷ গাছ কাটার সময়ে তারা একটা দুটো গাছও রাখে না যা থেকে নতুন গাছ জন্মায়, মাটি সরস থাকে৷ বন কেটে কাঠ চালান দিতে যত টাকার কারবার করতে হয়, সে লক্ষ লক্ষ টাকা কোন মুন্ডা-সাঁওতাল-মাহাতো-ওরাওঁয়ের থাকে! জঙ্গল-ঠিকাদার যে অরণ্য নষ্ট করে, তাকে ধনী করার জন্যেই যে আদিবাসীর অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তা বুঝেই বিরসাইতরা একে মেরেছিল৷

এরপর বিরসাইতরা জিউরিতে সভা করে৷ এতকেদিতে গয়া মুন্ডার বাড়ি পরের সভা হবে৷ তারা দানালির জমিদারকে কাটতে যায়, কিন্তু তাকে পায় না৷

৫ জানুয়ারি এতকেদিতে গয়া মুন্ডার বাড়িতে পঞ্চাশ-ষাট জন বিরসাইত জমায়েত হয়৷ তখনই দুই কনস্টেবল ও তিন চৌকিদার নিয়ে খুঁটির হেড কনস্টেবল সেখানে আসে৷ কনস্টেবল দু-জন যেমন নদীর বুকে নেমেছে, গয়া চেঁচিয়ে ওঠেন-

সামারে হিজুলেনাকো মার গোয়ে কোপে

সম্বর হরিণ এসেছে, মারো মারো-

দুই কনস্টেবল জয়রাম ও বুদুকে তারা মেরে ফেলে৷ গয়া ও তার ছেলে সানরে এতে নেতৃত্ব দেয়৷ ওরা ফিরে এলে মেয়েরা ওদের গায়ে জল ঢেলে দেয় ও পুরুষরা গায় শিকারপরবের গান৷

এ খবর পেয়ে স্ট্রিটফিলড বন্দগাঁও ছাউনি থেকে এতকেদি ছুটল৷ তার নিজের লিখিত রিপোর্টেই জানা যায়, সেদিন গ্রামে কোনো বিরসাইত ছিল না৷ গয়া, তার স্ত্রী মাকি, তাদের ছোটো ছেলে, চোদ্দো বছরের নাতি রামু, দুই পুত্রবধূ, তিন মেয়ে থিগি, নাগি ও লেমবু প্রত্যেকে কুড়াল-লাঠি-ধনুক-টাঙি-দা-বলোয়া নিয়ে মস্ত এক পুলিশবাহিনীর সঙ্গে ভীষণ লড়ে ও বাধা দেয়৷ ঘরের মধ্যে তারা, এরা বাইরে৷ মেয়েরা ও পুত্রবধূদের কোলে শিশুরা আছে জেনেও স্ট্রিটফিলড গুলি ছোড়ে ও ঘরে আগুন দিয়ে ওদের বের করে৷ স্ট্রিটফিলড, দারোগা ইলতাফ হোসেন, সেপাইরা, গয়া ও মাকি জখম হয়৷ তারপর গয়াকে সপরিবারে বন্দি করা যায়৷ ছোটোলাট পরে স্ট্রিটফিলডের গুলি ছোড়াকে ‘ঠিক কাজ’ বলে অভিনন্দন জানায়! মেয়েদের নির্ভীক লড়াকু ভূমিকা দেখে স্ট্রিটফিলড ঘাবড়ে যায়৷ গয়া আগাগোড়া, এমনকী গুলিতে জোর জখম হয়েও সমান তেজে লড়ে৷ স্ট্রিটফিলডের ভয় হয়, বিরসাইতরা বুঝি মিশনে মিশনে হানা দেবে৷

না, মিশনে নয়৷ বোর্তোদিতে জরুরি সভা সেরে ৭ জানুয়ারি সকালে বিরসাইত বিদ্রোহীরা খুঁটি থানার দিকে চলে৷ উলগুলানে সে-ই বিরসাইত, যে বিদ্রোহী৷ তামাড় ও হাসাদার আদিবাসীরা চলে সঙ্গে৷ ওদের ঢাল-তরোয়াল-তিরের ফলায় শত সূর্য হাসে৷ খুঁটি থানা হল মুন্ডা এলাকায় সরকারের প্রতিনিধি৷ চলো, থানা চলো৷

খুঁটি বে রহর জারোমাকানা, দোলাবু মেইয়া৷

খুঁটিতে অড়হর পেকেছে, চলো কাটা যাক-বলে তারা চ্যাঁচায়৷ হুতুবদাগ, পাতরা গৌরমারা পাহাড়তলির লোকরা চলে আসে৷

থানার পাঁচ কনস্টেবলের একজন আর এক চৌকিদার গ্রামে দৌড়োয় সাহায্য চাইতে৷ তারা আর ফেরে না৷ মুন্ডাদের বুক-কাঁপানো ‘কুলকুলি’ বা যুদ্ধের ডাক শুনে থানা ছেড়ে সবাই পালায়৷ মুন্ডারা রঘুনিরাম কনস্টেবলকে ধরে, ডোনকা ও মাঝিয়া মুন্ডা তাকে মেরে ফেলে৷ থানা জ্বলে৷ বেনেদের দোকান জ্বলে কোনো লুটপাট হয় না৷ এখন আর সরকারের সন্দেহ থাকে না যে এ আরেক কোল-বিদ্রোহ৷

রাঁচি শহর ভয়ে কাঁপে৷ ডোরানডা থেকে সেনাবাহিনী, দুমকা ও রাঁচি থেকে পুলিশবাহিনী, রিজার্ভ পুলিশবাহিনী, সিংভূম ও রাঁচির কমিশনার ও ডেপুটি কমিশনার, নানা দিক থেকে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এগোয়৷ গ্রামে গ্রামে বসে পিটুনি পুলিশ৷ জমিদার ও মিশনারি সাহেবরা ‘মুন্ডা বসতিকে রক্তে স্নান করানো হোক’ বলে চ্যাঁচাতে থাকে৷ যিশুর দয়া ও ক্ষমার ধর্ম প্রচারের কথা এসময়ে মিশনের সাহেবরা শিকেয় তুলে রাখে৷ মুন্ডা কেন, যেকোনো আদিবাসীই তির ও ধনুক ও বলোয়া ঘরে রাখে৷ সেগুলি বাজেয়াপ্ত করা হতে থাকে৷ চাষের লাঙল কেটে দেওয়া হয়, চাল-ডাল কেড়ে নেওয়া হয়, মেয়েদের বেয়নেটের আগায় হাঁটিয়ে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে৷ তারপর ৯ জানুয়ারি খবর আসে, সাইকোর তিন মাইল উত্তরে ডোমবারি এলাকায় সৈলরাকাব পাহাড়ে বিরসাইতরা জমায়েত হয়েছে৷

১৮৯৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকেই সৈলরাকাব পাহাড়ে বিরসা তার যুদ্ধের ঘাঁটিতে লোক পাঠাতে শুরু করে৷ এ পাহাড়ে অনেক গুহা৷ এখানে লড়াকু মুন্ডারা সপরিবারে চলে আসে৷ পাথর জড়ো করা হয় ছুড়ে মারার জন্য৷ হাতিয়ার, ছাতু ও লবণ, জল, সব রাখা হয়৷ জঙ্গল ও নালা, তারপর তিরিলকুটি বুরু পাহাড়৷

সে ডোমবারি, সে পাহাড় আজও আছে৷ শুধু বিরসা নেই, নেই সেদিনের মানুষরা৷ নেই সে জঙ্গল৷

ওদিকে রাঁচি শহর ভয়ে থরথর কাঁপে৷ শোনা যায়, আর রক্ষা নেই৷ বিরসাইতরা ৮ জানুয়ারি রাঁচি আক্রমণ করল বলে৷

এদিকে কমিশনের চলে আসে বুরজু থেকে৷ পুলিশ ও সেনাবাহিনী দূরবিনে দেখে পাহাড় চূড়ায় সশস্ত্র বিদ্রোহীদের৷ জঙ্গল ও নালা ধরে চলে তারা সন্তর্পণে৷ পুলিশবাহিনী চলে যায় পিছন দিক দিয়ে পালাবার পথ আটকাতে৷ এভাবে বাহিনী এগোয়৷

খুঁটি থেকে আসে সেনাবাহিনী, বুরজু ও বন্দগাঁও থেকে আসে পুলিশবাহিনী৷ কমিশনার ফর্বস বাহিনী নিয়ে তিরিলকুটি বুরুতে ওঠে৷ সৈলরাকাব ও তিরিলকুটির মাঝে এক গভীর খাত, কিন্তু একজায়গায় দু-টি পাহাড় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত৷ বেলা একটা নাগাদ সৈলরাকাব ঘেরা হয়ে গেল৷

ডেপুটি কমিশনার স্ট্রিটফিলড দোভাষীর সাহায্যে মুন্ডারি ভাষায় চেঁচিয়ে বলে, ‘তোমরা আত্মসমর্পণ করো৷ হাতিয়ার দিয়ে দাও৷’

উত্তরে ভেসে আসে প্রতিবাদ, আর কুঠার ঝলসে ওঠে৷ নেচে ওঠে টাঙ্গির ফলা৷

‘নেতারা এসো, কথা বলো!’

নরসিং মুন্ডা হেঁকে বলে ‘রাজ আমাদের, তোমাদের নয়৷ মুন্ডারা হাতিয়ার সঁপবে না, তোমরা হাতিয়ার সঁপে দাও৷ আমরা শেষ নিশ্বাস অবধি লড়ব৷’

‘আত্মসমর্পণ না করলে গুলি ছুড়ব৷’

‘ছোড়ো তোমাদের গুলি৷’

ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে যায়, ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি৷ ছুটে আসে পাথর৷ কমিশনার চমকায়৷ বন্দুক বনাম পাথর-টাঙ্গি-কুড়াল তির-ধনুক৷ এ যুদ্ধে জিত ইংরেজের৷ কিন্তু তাকে কি ‘জয়’ বলা যায়? মুন্ডারা সাহেবের নামে কেঁপেছে৷ আজ কেন তাদের বুকে মরণকে তুচ্ছ করার সাহস? এ কী পরিবর্তন!

দু-তিন জন বিদ্রোহী পড়ে যায়৷ ফর্বস বলে ‘আর দূর থেকে নয়৷ এবার পাহাড় চড়াও করো৷ রিজার্ভ পুলিশ ও সেনাবাহিনী যেন অযথা গুলি না ছোড়ে৷ জীবিত অবস্থায় বন্দি করাই ঠিক হবে৷’ এবার পুলিশ ও সেনাবাহিনী একসঙ্গে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পাহাড়ে ওঠে৷ এখনও পাথর আসে৷ আর বন্দুকবাজরা খুব কাছে এসে গেলে কুঠারে টাঙ্গিতে লড়াই৷ মেয়েরা লড়ে, লড়ে বালক ও কিশোররা৷ ‘বন্দুক অযথা ছুড়ো না’ কথাই ক্যাপ্টেন রোশ মনে রাখতে পারে না৷ মেয়েদের ওপরেই গুলি চলে৷ হাতের পাথর ফুরোলে বিদ্রোহীরা পুবদিক বেয়ে চকিতে নামে ও জঙ্গলে মিলায়৷ পলাতক মেয়েদের ওপর গুলি৷ রোশ পরে বলেছিল ‘পাহাড়ে মেয়েরা থাকবে, তা বুঝতে পারিনি৷ ওদের চেহারা দেখে মেয়ে না পুরুষ তা বোঝা যায়নি৷’

এত গুলি চালাবার পর সরকারি হিসেবে সৈলরাকাবের যুদ্ধে চার জন পুরুষ, তিন জন রমণী ও একটি শিশু নিহত হয়৷ অনেক মেয়ে, অনেক হাতিয়ার পাওয়া যায়৷ দু-দিন বাদে এক গভীর গর্ত খুঁড়ে মৃতদেহগুলি কবর দেওয়া হয়৷

বিরসা আর তার সাথিরা সেই যে জঙ্গলে মিলায় আর তাদের দেখা মেলে না৷ সকালে কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায় না জঙ্গলে৷ রাতে বিরসাইতরা লাশ সরিয়ে ফেলে৷ আমরা জানি না, সৈলরাকাবের আশপাশের কোন পাথর, কোন গাছের নীচে সেদিনের বীর সেনানীরা ঘুমিয়ে আছে৷ মেয়েদের ওপর গুলি চালানোর রিপোর্ট না দেবার জন্য বড়োলাট কমিশনার ফর্বসের কৈফিয়ত চাইলে, ফর্বস অবাক হয়ে যায়৷ ‘ব্যাপারটির কোনো গুরুত্ব আছে’ বলে সে মোটেই বোঝেনি৷ সে খুব ব্যস্ত ছিল কয়েকদিন৷

খুব ব্যস্ত থাকে ফর্বস৷ কেননা মাইলের পর মাইল মুন্ডা জনপদ তছনছ হয়৷ শস্যক্ষেত্র আর ঘর জ্বলে৷ লাঙল কেটে দেওয়া হয়৷ গোরু-ছাগল হয় বাজেয়াপ্ত৷ বিরসাকে ধরিয়ে দাও৷ মুন্ডা পুরুষরা গ্রেপ্তার হতে থাকে৷ ‘যেভাবে তারা গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল তা মনে রাখতে হবে আর ওদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে৷ সরকারের নরম হাওয়া চলবে না৷’

বিরসার সার্থকতা এখানে বোঝা যায়৷ কেননা মুন্ডারা সর্বরকমে সরকারের অত্যাচার প্রতিরোধ করতে থাকে৷ পাদরি হফম্যান চ্যাঁচাতে থাকে ‘আরও কড়া শাস্তি চাই৷’ সে মিশনের প্রতি ‘বিশ্বস্ত’ মুন্ডাদের আলাদা করে ফেলতে বলে৷ বিরসাইত গ্রামগুলিতে মেয়েদের গ্রামবন্দি করে রাখতে বলে৷ মেয়েরাই তো জঙ্গলে-পাহাড়ে খাবার পৌঁছে বিদ্রোহীদের বাঁচাচ্ছে৷ তারাই সৈন্য-চলাচলের খবরও পৌঁছে দিচ্ছে৷

মিশনে মিশনে পাহারা বসে৷ পুলিশ ঘোরে গ্রামে গ্রামে৷ পুলিশ ও সৈন্য ঘাঁটি বসে৷ হিন্দি মুন্ডারিতে রাঁচি ও সিংভূমে বিরসাকে ও বিরসাইতদের ধরিয়ে দেবার কথা ঘোষণা করা হতে থাকে৷ গ্রামে গ্রামে পুলিশ, খরচ দেবে গ্রামবাসী৷ মুন্ডা গ্রামমণ্ডলীর প্রধান হল ‘মানকি মুন্ডা’৷ মানকিদের কাছেও কাগজ চলে যায়৷ তাতে লেখা থাকে, বিরসাকে ধরালে ৫০০ টাকা আর ডোনকা মুন্ডা, মাঝিয়া মুন্ডা, বুধু মুন্ডা ও পরান পহানকে ধরলে ১০০ টাকা হিসাবে বকশিশ পাবে৷

রাঁচি ও সিংভূমের সব জমিদার, সরগুজা-উদয়পুর-যশপুর ও রামগড়ের রাজারা হাতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বিরসাকে খুঁজতে৷ আর অত্যাচারিত গ্রামে গ্রামে মুন্ডাদের মনের জোর থাকে এখনও অটুট৷ ভগবান আছে তার উলগুলানটা আবার হবে৷ হাতিয়ার চাই, লড়াকু চাই৷ সিংভূমের পোড়াহাট, রাঁচির খুঁটি ও তোরপা-এই তিন থানার অধীন এলাকায় চলে খোঁজ৷ জাঠ ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহিরা চালায় অকথ্য অত্যাচার৷ গ্রাম থেকে নিঃশেষে খুঁটে নিয়ে যায় চাল ও গম৷ শুকিয়ে মার, শুকিয়ে মার৷ এর নাম ‘বিট অ্যান্ড সার্চ অপারেশন’৷ পোড়াহাটের ও সেরাইকেলার রাজারা পাঠায় সেপাই৷ চলে আসে মিলিটারি পুলিশ৷ কমিশনার থেকে শুরু করে রাঁচি ও সিংভূমের সমস্ত ইংরেজ অফিসার ঘুরতে থাকে৷ আর সরকারি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২৫ জানুয়ারির পর মুন্ডা জনপদে ‘রেইন অফ টেরর’ বা সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করা হয়৷ বিরসা তখন কী করছিল? সে তখন একটির পর একটি গোপন বৈঠক করে চলেছে৷ এ সময়ে সে যত পথ হাঁটে, যত পাহাড় পেরোয়, যত বনজঙ্গল পার হয়, তার লেখাজোখা নেই৷ সে বলে, ‘সৈলরাকাবের পরাজয় কিছুই নয়৷ কাজ আমাদের অনেক বাকি, উলগুলান কি শুরু হতে-না-হতে শেষ হয়ে যাবে?’

সৈন্য ও পুলিশ, জমিদার, রাজা ও সাহেব শিকারি কুকুরের মতো তার পিছন পিছন ফেরে৷

এ সময়ে ভীষণ অত্যাচারের জন্য মুন্ডারা যখন একদিকে ঘরবাড়ি, খেত-জমি সব হারাচ্ছে, বিরসা ও বিরসাইতরা যখন নতুন করে উলগুলান সফল করার চেষ্টা করছে, সে সময় মিশনারিরা আবার শুরু করল তাদের প্রচার৷ মিশনে যোগ দাও, সাহেব সরকারের কাছে ক্ষমা পাবে৷ তারা যে সফল হয়, তা কেমন করে বোঝা যায় বলো তো? ১৯২২ সালে দেখছি, রোমান ক্যাথলিক মিশনেই ২২,০০০ মুন্ডা নাম লিখিয়েছে৷ এ ছাড়া তো ছিল লুথেরান ও অন্যান্য মিশন৷ সেগুলির হিসাব জানা যায় না৷

রোগাতো গ্রামে বিরসা শেষ বৈঠক করে৷ তখনও মুন্ডারা তার প্রতি অচল বিশ্বাস রেখেছে৷ সে তো ধরতিআবা৷ সে তো বলেনি যে হাতে চাঁদ ধরিয়ে দেব৷ সে বলেছিল ‘তোমাদের এনে দেব উলগুলান৷ দোলাব না কোলে নিয়ে, ভোলাব না মিছে কথায়৷ জমিদার-হাকিম সবাই আমাদের শত্রু৷ সাহেব-সরকার সবচেয়ে বড়ো শত্রু৷ তাকে উচ্ছেদ করব৷ স্থাপনা করব স্বাধীন মুন্ডারাজ৷ সাহেব-সরকার গেলে যাবে রাজা-জমিদার-ঠিকাদার মহাজন-হাকিমের শোষণ৷’ বিরসা তাদের, তাদের নিজেদের৷ ছিন্নভিন্ন পদদলিত মুন্ডাদের সে এক করেছে, ভাঙা বুকে দিয়েছে সাহস৷

তারপর এল ৩রা ফেব্রুয়ারি৷ মনমারু ও জারাইকেল গ্রামের সাতটি লোক সুদূর সেনত্রার জঙ্গলে ধোঁয়া উঠতে দেখেছিল৷ সেখানে গিয়ে তারা দেখে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য৷ বিরসা ঘুমোচ্ছে৷ ডোনকার স্ত্রী বীর রমণী সালি ঘুমোচ্ছে৷ আরেক বিরসাইত মেয়ে অনেক কষ্টে জোগাড় করা চালে ভগবানের জন্য ভাত রাঁধছে কাঠকুটো জ্বেলে৷ এই সাতটি লোকই বিরসাকে ধরে৷ পাঁচশো টাকা পুরস্কার এরাই পেয়েছিল৷ এমন মানুষ চিরকালই থাকে ও থাকবে৷ তার জন্যে মানুষে বিশ্বাস হারানো কোনো যুক্তির কথা নয়৷ ওরা পুরস্কার নেয় আর চিরকালের জন্য অন্যদের কাছে তাদের নাম হয়ে যায় কলঙ্কিত৷

বিরসাকে আনা হয় বন্দগাঁও৷ লোক ভেঙে পড়ে সেখানে৷ কাঁদতে কাঁদতে মানুষ ছুটে আসে৷ এখন বিরসাইতরা ধরা দিতে থাকে৷ পাঁচশো একাশি জন বন্দি হয়৷ জনসমুদ্রে দেখে সাহেবরা বিরসাকে নেয় রাঁচিতে৷ মাথায় সাদা পাগড়ি, ঠোঁটে আর চোখে হাসি, বিরসার সে ছবি দেখলে বুক ফেটে যায়৷

আবার আসেন জেকব৷ আবার বিনা বিচারে বন্দি বিরসা ও বিরসাইতরা৷ বিরসা শুধু ভাবে আর ভাবে, কী করে অন্য মুন্ডাদের বাঁচাবে৷

‘ভরমি! ভরমি মুন্ডা!’

‘বলো ভগবান৷’

‘হাকিমের সামনে আমার সঙ্গে!তামাদের যোগাযোগের কথা একেবারে বলবে না৷ তাহলে বেঁচে যাবে৷ নইলে নয়৷ আমিও তাই করব৷’

‘ভগবান!’

‘ভরিম! এই কাদামাটির দেহটা ছেড়ে আমি না চলে গেলে তোমরা বাঁচবে না৷ হতাশ হোয়ো না৷ তোমাদের ভাসিয়ে যাচ্ছি না৷ সব হাতিয়ার দিয়েছি লড়াইয়ের, শিখিয়েছি সব সত্য৷ তাই নিয়ে থাকলে তোমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে৷’

তখনই বিরসা জানে যে, সাহেবরা তাকে জেল থেকে জীবিত বেরোতে দেবে না৷ এ সময়ে তার কথাগুলি যেন অমর কোনো মন্ত্র৷

‘আবার ফিরে আসব আমি, আবার জ্বালাব হোলির আগুন বুন্ডু-তামাড়-সিংভূম-কেওনঝড়-গাংপুর আর বাসিয়াতে৷ ধুলোর জড় তুলব শোনপুরে৷’

একদিন সে সান্ত্রিকে বলেছিল ‘আজ তুমি আমাকে পাহারা দিচ্ছ৷ দেখবে একদিন কী করি দেশের মাটি নিয়ে৷ দেশ টুকরো টুকরো হয়ে যাক, আমার লড়াই ফুরাবে না৷ ছোটোনাগপুরের বাহান্ন পরগনায় দুশমনকে হারিয়ে দেব৷ নিঃশেষ করব একদিন৷’

ফেব্রুয়ারিতে বিরসা বন্দি হয়৷ শেষ অবধি ৫৮১ জন বন্দির মধ্যে ৪৭৬ জনের বিচার হয়৷ হিসেবটা এরকম :

বন্দি হয় : ৫৮১ জন৷ বিচার হয় : ৪৭৬ জনের৷ কেস করা হয় : ১৭টি৷ শাস্তি হয় : ৯৮ জনের৷ শান্তিপূর্ণ ভাবে থাকতে বলা হয় : ৬৮ জনকে৷ খালাস পায়: ২৯৬ জন৷ বিচারাধীন অবস্থায় : মারা যায় ১৪ জন৷

যে ৯৮ জনের শাস্তি হয়, তাদের মধ্যে-

ফাঁসি হয় : ৩ জনের৷ যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয় : ৪০ জনের৷ ৭ বছর বা তার কম কারাদণ্ড হয় : ৩৭ জনের৷ বাকি ১৮ জনের বিষয়ে কাগজপত্র পাওয়া যায়নি৷

বিচারাধীন অবস্থায় ১৪ জন মারা গেল কীভাবে? কোনোদিন জানা যাবে না সেসব কথা৷ তবে মে মাসের আগে বিচার শুরুই হয়নি৷ ১৯০০ সালের মে থেকে ডিসেম্বর চলে বিচার৷ সরকারের তরফ থেকে বিচার তাড়াতাড়ি সারবার কোনো চেষ্টা করা হয়নি৷ ডেপুটি কমিশনার স্ট্রিটফিলড ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় হয়নি’ বলে বিচার পেছোতে থাকে৷ জেকব এসে পড়ার পর তবু একটু নড়ে বিচারের চাকা৷

আর বন্দি মুন্ডারা অসহ্য কষ্ট পেতে থাকে জেলখানা থেকে কোর্ট, বসে থেকে আবার ফিরে আসা৷ হাতে হাত-কড়া, পা ও কোমরের ভারী শিকল৷ তা টেনে টেনে দুরন্ত গরমে যাওয়া আর আসা, আসা আর যাওয়া৷ ‘বেঙ্গলি’ কাগজের নিজস্ব সংবাদদাতা এই নির্মম দৃশ্য বর্ণনা করেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘স্ট্রিটফিলড তামাশা করছেন৷ এ বিচার ব্রিটিশ-বিচারের সুনামে আনছে কলঙ্ক আর সরকারের প্রতিহিংসার মনোভাব প্রকাশ করছে৷’

রাঁচির সে জেলে আজও বন্দিরা একভাবেই থাকে৷ আদালত তেমন দূরে নয়৷ সেদিন জেল-কুঠরিতে মুন্ডারা লোহার শেকলে বাঁধা হয়ে পড়ে থাকত৷ বিরসা ছিল একলা এক ঘরে৷ সে শিকল টেনে টেনে হাঁটত আর হাঁটত৷ স্বাধীন মুন্ডারাজের স্বপ্ন দেখেছিল সে একদিন৷ আজ আলো-বাতাস থেকে সে নির্বাসিত৷ ভরমি, মাঝিয়া, ডোনকা, গয়া, ওরা বিরসার শিকলের সেই ঝনঝন শুনত৷ কিন্তু একদিন আর শিকলের শব্দ শোনা গেল না৷

৩০ মে বিরসা খেতে চায়নি৷ সেদিন সে আদালতে অজ্ঞান হয়ে যায়, তাকে জেলে ফিরিয়ে আনা হয়৷ তাকে ওষুধ দেওয়া হয়৷ সেদিন তার নাড়ি ক্ষীণ, জিভ শুকনো ও খসখসে৷ তার চোখ কোটরে ঢুকে যায়, গলা বসে যায়৷

পরদিন ১ জুন স্ট্রিটফিলডকে বলা হয় যে, বিরসার কলেরা হয়েছে, সে আর বাঁচবে না৷

তারপর কী আশ্চর্য, সে বেশ ভালো হয়ে ওঠে৷ ৭ জুন বিরসা বেশ ভালো৷ ৮ জুন হঠাৎ সে আবার অসুস্থ হয়৷ ৯ জুন, ১৯০০ সালে সে হঠাৎ রক্তবমি করে সকাল ৮টায় অজ্ঞান হয়ে যায়৷ সকাল ৯টায় তার মৃত্যু হয়৷

অসুস্থ অবস্থাতেও সে শৃঙ্খলিত৷ মৃত্যুর পর তবে সরকার নিশ্চিন্ত হয়ে মৃতদেহ থেকে শেকল খুলে নেয়৷ তার মৃত্যুতে জেল ফেটে পড়ে মুন্ডাদের হাহাকারে৷ বন্দিদের দিয়ে মৃতদেহ শনাক্ত করানো হয়৷ সেদিনই বেলা সাড়ে-পাঁচটায় মৃতদেহ ময়না করা হয়৷ বলা হয়, সে কলেরায় মারা গেছে৷ কিন্তু কলেরার কোনো কারণ পাওয়া যায় না; মৃত্যুর আগেকার অবস্থার সঙ্গে কলেরার লক্ষণও মেলেনি৷ সেদিনের সংবাদপত্রগুলি এই ‘কলেরা’-র কথা বিশ্বাস করেনি৷ পঁচাত্তর বছর বাদে একদিন কথা বলতে বলতে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে ময়না রিপোর্টটি আমি বলি৷ তাঁদের মতে, আর্সেনিক বিষ প্রয়োগে বিরসাকে মারা হয়৷ একথা মানি বা না মানি, কলেরা যে তার হয়নি তা বলতে সংশয় নেই৷

সেদিন মুন্ডা মাত্রেই মৃতদেহকে সমাধি দিত৷ সরকার বিরসার দেহকে সেদিনের হরমু নালার তীরে জেলের মেথরদের দিয়ে ঘুঁটে পুড়িয়ে সৎকার করায়৷ মৃতদেহকে এভাবে অপমান করাই ছিল উদ্দেশ্য৷

এমনি করে শেষ হয় বিরসার জীবন৷ পঁচিশ বছর হতে-না-হতে চলে যায় ধরতিআবা কিন্তু মৃত্যুতে কি বিরসার জীবন সত্যিই শেষ হয়? না, তা হয় না৷ সে উলগুলান করতে এসেছিল, উলগুলান না হওয়া অবধি বিরসার মৃত্যু হয় না৷ তার উলগুলান তো আজও হয়নি৷

অরণ্যের অধিকারের জন্য

জমির অধিকারের জন্য

শোষণ নেই, এমন এক দিনের জন্য

যতদিন আদিবাসী লড়বে

ততদিন-

উলগুলানের শেষ নেই

ভগবানের মরণ নেই

বিরসার মৃত্যু নেই

সেইসব যুদ্ধই যে বিসরার, বিরসার, বিরসার যুদ্ধ৷

যারা তেমন লড়াই লড়ে

তাদের সঙ্গে সে এসে দাঁড়ায়

তাদের সঙ্গে সে মরে আবার

তাদের সঙ্গে বাঁচে

বিরসা তাদের

বিরসা আমাদের

ধরতিআবার কি মরণ থাকে?

সে যে এই মাটির, মানুষের, রক্তের৷৷

বিরসা মুন্ডা আর তার উলগুলানের কথা তো বললাম৷ তবু শেষ কথাটি বলা হয়নি৷ এ কাহিনি থেকে আমরা কী কী পেলাম?

আমরা দেখলাম যে রাঁচি-সিংভূম-পালামৌ-এ ইংরেজ শাসকদের হাত ধরে ঢুকেছিল জমিদার-রাজা-ঠিকাদার-মহাজন৷ এসেছিল মিশনারিরা৷ পরে, এ অঞ্চলের লোহা-কয়লা-অভ্র-বক্সাইট-ম্যাঙ্গানিজ আর আরও অনেক খনিজ পদার্থের লোভে ঢুকে পড়ে শিল্পপতিরা৷ আড়কাঠিরা কম যায় না, তারাও ঢুকে পড়ে৷

এভাবে এ অঞ্চলের আসল বাসিন্দারা সরকারের হৃদয়হীন শাসনে জমিদার ও রাজা ঠিকাদারদের কাছে জমিজমা হারায়৷ মহাজনদের কাছে ঋণে বাঁধা পড়ে৷ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বছরে বছরে বিনে পয়সার বেগার দেবার ঘৃণ্য বেঠবেগারি প্রথা৷ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ার ফলে তাদের নিজেদের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, উৎসবের নিয়ম, সব হারিয়ে যেতে থাকে৷ মিশনারিদের প্রভাবে তারা নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ছাড়তে থাকে৷ শিল্পপতিরা তাদের দেশের খনিজ সম্পদ নিয়ে অন্য জায়গায় বড়ো বড়ো কারখানা তৈরি করে৷ এই শিল্পসম্পদ থেকে আদিবাসীদের কোনো উপকার হয়নি৷ তারা সেখানে সস্তার কুলি মাত্র৷ আড়কাঠিরা এই দুঃখী ও গরিব মানুষদের ভুলিয়ে চা-বাগানে কুলির কাজে চালান দিতে থাকে৷ এই এত দুঃখকষ্টে এরা বনের ফলমূল খেয়ে, বনের কাঠ বেচে, বনের পশুপাখির মাংস খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকতে চেয়েছে৷ সরকার সে অধিকারও কেড়ে নিয়েছে৷

এর প্রত্যেকটি কথা বিরসার সময়ে যেমন, আজও তেমনি সত্য৷ এই জন্যেই তামাড়-বিদ্রোহ, হুল, সর্দার-আন্দোলন-আজকেরই আন্দোলন৷

বিরসার কাহিনি পড়লে৷ একথা ভুলেও ভেবো না যে, বিরসা একাই সব করেছিল৷ লক্ষ মানুষের দুঃখদুর্দশা দেখে সে অবস্থা বদলে দিতে চায়৷ সেভাবেই সে নেতা হয়৷ তার সঙ্গে শেষ অবধি ছিল হাজার মুন্ডা৷ বিরসার সঙ্গে বহুজন জেলে যায়, কতজন মারা যায়৷ এই আন্দোলনের জন্যে মুন্ডাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়৷ তারা দেশ ছেড়ে চলে যায় কত জন৷ সেজন্যেই আজকের পশ্চিমবাংলার অনেক জায়গায় মুন্ডারা বসবাস করছে৷

বিরসা ছিল তার জাতির নেতা৷

কেন তার বিদ্রোহ এত গুরুত্বপূর্ণ?

কেননা সে শুধু দিকুদের বিরুদ্ধে নয়, ভারতবর্ষের আসল শত্রু যে ইংরেজ, তার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করেছিল৷ সে ভালো করেই বুঝেছিল যে রাজা-জমিদার-মহাজন-আড়কাঠি-মিশনারি এরা এক-একটা রক্তচোষা শুঁড়৷ এরা আদিবাসীদের রক্ত শুষছে আর ইংরেজ মোটা হচ্ছে৷

এটা হল গিয়ে প্রথম কারণ৷ দ্বিতীয় কারণ হল, ছিন্নভিন্ন মুন্ডা জাতির মনে সে সাহস এনে দিয়েছিল, স্বাধীনতার আদর্শে তাদের এক করেছিল৷ কুড়ি বছর বয়সে প্রথম সে জেলে যায়, পঁচিশ বছরে মারা যায়৷ এই পাঁচ বছরে এক স্বল্পশিক্ষিত আদিবাসী যুবক, পুরুষ ও মেয়েদের যুদ্ধের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল৷ তার মধ্যে এই সংগঠন করার ক্ষমতা দেখেই ইংরেজ সেদিন পাহাড়ে ও বনে, গ্রামে গ্রামে পুলিশ ও সৈন্য নামিয়ে দেয়৷ বিপ্লব গড়ে উঠছে বুঝলে শাসকরা চিরকাল এরকমই করে৷

বিরসার বিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হল?

তার আন্দোলন চলবার সময়টিকে বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে৷ তখন ইংরেজ হল পৃথিবীতে এক বিশাল শক্তি৷

রেল, টেলিগ্রাফ, সেনা ও পুলিশ, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র সবই তার দখলে ছিল৷ খ্রিস্টান ও অ-খ্রিস্টান মুন্ডায়, ক্যাথলিক মিশনের মুন্ডা ও লুথেরান মিশনের মুন্ডায় বিভেদ তৈরি করা সেদিন আদিবাসী অঞ্চলের ব্রিটিশের নীতি৷ মিশনারিরা ব্রিটিশের এজেন্ট বা দালাল মাত্র৷ বিভেদ সৃষ্টি যেখানে নীতি, সেখানে ঐক্য সৃষ্টি যে করবে, তাকে সব শক্তি নিয়ে শাসক আক্রমণ করবে৷ বিরসার বেলায়ও তাই হয়৷ সময় পেলে বিরসা তার আন্দোলনের ভিত আরও পাকা করতে পারত৷ যুদ্ধের ক্ষেত্র আরও ছড়াতে পারত৷ তাহলে তিরধনুক নিয়েও বন্দুকের সঙ্গে লড়া যেত৷ কেননা তখন খোলা জায়গায় যুদ্ধ হত না৷ এসব হতে পারেনি বলেই উলগুলান সেদিন দমন করা সম্ভব হয়েছিল৷

আজ এ উলগুলানের সার্থকতা কোথায়?

আদিবাসী কৃষকদের বিদ্রোহ যে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অংশ, সেদিন আমরা সবাই তা বুঝিনি৷ আমাদের কবিরা শিবাজিকে নিয়ে, রাজপুতদের নিয়ে কবিতা লিখেছেন৷ কালো মানুষদের তিরধনুকের লড়াই থেকে তাঁরা প্রেরণা নেননি৷

আজ আমরা উলগুলান কী, তা বুঝেছি৷ বিরসা আজ শুধু মুন্ডাদের নয়, সব দেশপ্রেমিক মানুষকে প্রেরণা দেয়, তাই উলগুলান সার্থক৷ আদিবাসী অঞ্চলের শোষিত মানুষের জন্যে যে লড়ে, সে উলগুলানের কাজকেই এগিয়ে নিয়ে যায়৷ আজ কী খ্রিস্টান কী অ-খ্রিস্টান কী আদিবাসী, কী অন্যরা, সবাই বিরসাকে ইতিহাসের এক প্রধান পুরুষ মনে করেন, তাতে উলগুলান সার্থক৷ এইসব কথা ভেবে দেখতে হবে৷ তাহলে আমরা বুঝব যে-

উলগুলানের শেষ নেই৷

বিরসার মৃত্যু নেই৷৷

*স.-সম্পর্ক- ‘বিরসা মুন্ডা’ বইটির প্রথম সংস্করণের প্রকাশক৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *