সাধু শিয়াল
সাধুচরণের পদবি হল কয়াল কিন্তু ওকে পলাশি থেকে মানকড়ার মানুষ সাধু শিয়াল বলেই জানে৷
সাধুর মতো শেয়ালডাক কেউ ডাকতে পারে না৷ শুধু কি শেয়ালডাক? যতরকম জীবজন্তুর ডাক ও শুনেছে সব ও ডাকতে পারে৷ মানকড়ার গোপাল পণ্ডিতের অট্টাহাসি আর ছিরে বাগদির নাকিসুরে গান, সব ও নকল করে৷
ঘর নেই, দোর নেই সাধুর! ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর দেশে চোরডাকাতের যা উপদ্রব, সাধুর বউ আর জঙ্গলে গ্রামে থাকতে চায় না৷ থাকবে বা কোন ভরসায়? সাধুর দেরি করে ফেরবার কথা, তাই বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে সাঁঝ না হতে দোর দিয়েছে৷ দু-চোখের পাতা জুড়েছে কি জোড়েনি, অমনি দাওয়ার ওদিক থেকে বাঘের ডাক৷
বউ ঠিক বুঝেছে এ সাধুর কাজ৷ রাত করে এসে মশকরা করা হচ্ছে৷ আর কিছুই ভাবেনি বউ৷ বাঘের কথা তো ভাবেইনি৷ বাঘ ওদের ঘর অব্দি কোনোকালে আসেনি৷
ঝনাৎ করে শেকল খুলেই দেখে চাঁদের আলোয় বাঘের চোখ৷ দোর আবার বন্ধ করে বউ দরজা ঠেস দিয়ে বসল৷ পরদিন সকালে সাধু ফিরতে-না-ফিরতে বউ বলল, ‘পোঁটলা-পাঁটলি বেঁধেছি এখন ভাতপান্তা খেয়ে চলো৷ আমি নশীপুর যাব৷’
‘কেন? নশীপুর কেন?’
‘উঠোনে থাবার দাগ দেখে এসো গে! ভাসুর এসেছিল রাতে, তা জান?’
সাধুকে সবাই সাধু শিয়াল বলে৷ বাঘকে গ্রামদেশের মানুষ বড়ো শেয়াল বলে৷ সব শেয়ালের চেয়ে বড়ো শেয়াল বড়ো৷ তাই বউ বাঘকে ‘ভাসুর’ বলল৷ সাধুর দাদা ওর ভাসুর তো বটেই৷
নশীপুরে এক কিনারে বউয়ের বাপের বাড়ি৷ মন্বন্তরের পর গাঁ কে গাঁ শ্মশান হয়ে গিয়েছিল, কত মানুষ যে মরেছিল আর কতজন যে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার লেখাজোখা নেই৷
আবার এক-একটা গাঁ যেন কেমন করে বেঁচে যায়৷ নশীপুর গ্রামে পুকুর-দিঘি ছিল বলে খেতে জল পড়েছিল, ধান হয়েছিল দুটো৷
বউয়ের বাপের বাড়ির উঠোনে বাতাবিলেবুর গাছে টসটসে সোনারং বাতাবি লেবু, ঘরের আড়ায় শিকেয় বাঁধা বড়ো বড়ো পাকা কুমড়ো আর মাটিতে জালা পোঁতা আছে, তাতে ধান৷ সাধুর শাশুড়ি জঙ্গলে ফাঁদ পেতে খরগোশ ধরেছিল৷ কুমড়োর ঝাল, খরগোশের মাংস আর ভাত খেয়ে সাধু বাইরে গিয়ে বসল৷ সাধুর শ্বশুর বাঁশের মাচায় সুতো জড়িয়ে মাছধরা জাল বুনছিল৷ সে বলল, ‘হরবোলা জামাই৷ কী করবে ঠিক করলে কিছু?’
‘তাই তো ভাবতেছি৷ ঘর এট্টা না হলে পরে…’
‘ঘর হয়, ভালো গেরামে ঘর হয়!’
‘কেমন করে?’
ঘর তোলা কি সোজা কথা? জন আসবে, দাওয়াল আসবে, তারা উঠোনে কাদা ফেলে তাতে জল ঢেলে পা দিয়ে মাটি ছেনে ছেনে নরম করবে আর গাইবে :
‘হেই মাটি! পায়ে গাড়ি
ঘর তোল! দক্ষিণ দোরি!’
সেই মাটিতে দাওয়া হবে৷ দেওয়াল হবে, রাঙামাটি আর সোনালি খড়ের কুচি মিশিয়ে শক্ত করে৷ দেওয়ালের ওপর বাঁশ চিরে বেতের বুনোট দিয়ে মাটির মতো ধানবুনোট করে চালছত্র হবে৷ তার ওপর বাঁশের মাচায় খড়ের চালা৷ বাঁশের মাচা থাকবে ঘরে, সেই হল গিয়ে চাষাভুসোর খাটপালঙ্ক৷ দরজা জানালা সব হবে হলুদরঙা কাঁঠাল কাঠের৷
জন-দাওয়াল-ঘরামি সবাই কাপড় নেবে, ধান নেবে, দু-বেলা পেট ভরে ভাত ডাল মাছের ঝাল খাবে৷
দাওয়ালরা কম চালাক নয়৷ সব সময়ে চেনাজানা লোকের নাম করে করে বলবে অমুকে যখন ঘর তুলেছিল তখন শোল মাছ আদাকচু দিয়ে রাঁধত৷ অমুক বাড়ির গিন্নি মাছ অম্বল করে হাঁড়িতে সাজিয়ে রাখত৷ বর্ষাকালে গরম গরম চাল ছোলা-ভাজা লঙ্কা দিয়ে খেতে দিত৷
ঘর তোলা সোজা নয়৷ কিন্তু সাধুর শালা বলল, ‘বুদ্ধি থাকলে তোমার দশটা ঘর ওঠে৷ এই তো সময়৷ বুদ্ধি থাকলে তোমার দুটো পুষ্কর্নি হয়৷ একটাতে মাগুর-কই ছাড়ো, আর একটায় রুই-কাতলা৷ তারপর আর কী! আমার বোন তখন সোনার বঁটি পেতে মাছ কুটবে৷’
বুদ্ধির কথা বলতে সাধু শিয়াল বলল, ‘বলো না সুমুন্দি! কী বলতেছ?’
‘বলতেছি কাশিমবাজার যাও৷ যেয়ে ভুবন ঘোষের চরণ ধরে পড়ো গা! দেখো কী হয়!’
‘কী হবে?’
‘দেখতে পাবে৷’
ভুবন ঘোষ সামান্য নয়৷ ওর জোত-গাই-বলদ আছে৷ পাকা দালানে থাকে ও, মস্ত মহাজন৷ তা ছাড়া, কুঠির সায়েবদের সঙ্গে ওর ভাব খুব৷ এখন বড়োলাট হল পান্তাসায়েব, ওয়ারেন হেস্টিংস৷ ডাকাতদের ওপর মহাখাপ্পা৷ ডাকাতদের জব্দ করার জন্যে এখন কুঠিতে কুঠিতে পাইক লেঠেল থাকে৷ ভুবন ঘোষের ওপর ভার আছে ডাকাতি হলে সদরে খবর পৌঁছে দেওয়া৷
ভুবন ঘোষের গায়ের রং কুচকুচে কালো৷ খাটো ধুতি আর মোটা নাগরা পরে মসমসিয়ে ও কাশিমবাজার কুঠিতে যায় মাথায় পেতলের একটা বাটি চেপে বসিয়ে তার ওপর লাল গামছা বেঁধে৷ হঠাৎ রাতবিরেতে মাথায় লাঠি পড়লে পেতলের বাটিটা ফাটবে, মাথা বেঁচে যাবে৷
পঞ্চাশ বছর বয়েস হলে কী হয়! এখনও দুষ্টু মোষ বিগড়ে গেলে ও একা সে মোষ গোয়ালে তুলতে পারে৷ খরিশ সাপের মাথা নাগরাজুতোয় চেপে ল্যাজ টেনে টেনে সাপটাকে লম্বা করে ফেলে দিতে পারে৷ পোচকামিনীর বিলে বিকেলে জাল পেতে এসে ভোরে গিয়ে জাল থেকে মাছ আনতে পারে আট ক্রোশ হেঁটে৷
আর পারে গর্জন করতে৷ ‘কে র্যা!’ বলে ভুবন ঘোষ যদি তিন বার ডাকে তাহলে নাকি এখনও কাশিমবাজারে সায়েবরা মনে করে আবার বর্গিরা যুদ্ধ করতে এল, নয়তো ডাকাত পড়ল কোথাও!
ভুবন ঘোষের নাম শুনেই সাধু শেয়ালের ঠ্যাঙে ঠোকাঠুকি লেগে গেল৷ অমন ডাকাবুকো লোক দেখলেই ওর ভয় করে! ‘কী দরকার বাপু বাঘসিংগি ঘাঁটিয়ে, আমি শেয়াল, শেয়ালের মতো থাকি৷’
এই না বলে সাধু শিয়াল রোজগারের চেষ্টায় বেরোল৷ গ্রামদেশে হাটের অন্ত নেই৷ কোথাও হাট বসে সোম-শুক্কুরে, কোথাও শনি-মঙ্গলে৷ হাটে হাটে হরবোলা ডেকে, দু-চারটে গান গেয়ে তবু পয়সা নাহোক, চালকাপড়টা হয়৷ কিন্তু এবার আষাঢ় মাস থেকে সেটুকুও যেতে বসল৷ হাটে মানুষ আসে৷ বেচে কিনে পালাতে পারলে বাঁচে সবাই৷ আকাশ ভেঙে বর্ষা নেমেছে৷ মাঝে মাঝে সাতসকালে আকাশ এমন কালো হয়ে থাকে যে, গাছের দিকে চেয়ে মনে হয় কালোজামের থোলো আর পাকা তাল মেঘের সঙ্গে মিশে গিয়েছে৷ কে আর হরবোলার ডাক শুনছে আর কেই-বা চাল দিচ্ছে ঢেলে৷ লজ্জায় সাধু নশীপুরের রাস্তা মাড়ায় না৷ ভেবেছিল ঘর তুলবে, নতুন ঘরে থাকবে সবাই৷ নাহয়, কয়েকজন গাঁয়ের মানুষ ডেকে, বনজঙ্গল কেটে নিজেদের গ্রামেই ঘরবসত করবে৷
সব আশায় ছাই৷ পাটুলির হাটের দিন কী বর্ষা, কী বর্ষা! হাটতলা ভেসে গেল৷ যাদের ঘরদোর আছে তারা ঘরে ঝাঁপ দিলে৷ দোকানঘরের বারান্দায় বসে সাধু ভাবতে লাগল-আহা, যদি নিজের বাড়ি থাকত, তাহলে চালভাজা, কাঁঠালবিচি পোড়া তেল লঙ্কা দিয়ে খেতাম৷ এমন জলে পুকুর ভাসে, তা খালের মুখে ছাঁকা দিতাম৷ কই-মাগুর-খলসে ধরে আনতাম৷ তারপর কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে ছেলে-মেয়েকে রাম-লক্ষ্মণের গল্প বলতাম৷
সাধুর ছেলে দুটো বড়ো কামড়াকামড়ি করে৷ তাই সাধু ওদের ভাইয়ে ভাইয়ে ভালোবাসার গল্প বলে৷
এইসব ভাবছে সাধু এমন সময়ে, ‘তেল লঙ্কা দেও তঙ্কা! বুড়ো-বুড়ি গরম মুড়ি! তেল গরম জোর কদম!’ পালকিবেহারাদের ডাক শোনা গেল৷
‘ও ভাইরা! কমনে যাচ্ছ?’
‘কেশিমবাজার!’
‘আমি সঙ্গে যাব গো!’
‘এসো না গো!’
পালকিবেহারাদের মাথায় টোকা, কোমরে গামছা৷ ওপর-হাতে পেতলের তাগা, গলায় রুপোর মাদুলি৷ দেখে সাধুর সমীহ হল৷
‘আপোনারা কার পালকি বইতেছ?’
‘ভুবন ঘোষের৷’
‘তিনি কই?’
‘পালকিতে শয়নে আছেন৷’
একদিন তো সুমুন্দিকে ‘না’ বলে চলে এসেছিল সাধু, আজ যে তার কী হল, পালকির দরজা হড়াস করে খুলে কেঁদে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কাজ আমায় একটা দেন গো ঘোষমশায়! পায়ে পড়ি আপোনার৷’
কাঁচা ঘুম ভাঙতে ঘোষের মেজাজ আকাশে উঠেছে৷ ‘কে রে তুই! কী তোর নাম?’
‘এঁগ্যে, সাধু শিয়াল বলে সবাই৷ আমি হরবোলা৷’
‘অ্যাঁ? হরবোলা?’
‘হ্যাঁ মশায়৷ সবরকম ডাক ডাকব৷’
‘কীরকম?’
ভুবন ঘোষ যেই না বলেছে কীরকম, সাধু তো ভেবেছে বুঝি ওর কথায় অবিশ্বাস৷ অমনি সাধু এইরকম! বলে বাঘের মতো ঘ্যাঁক করে ডেকে উঠেছে আর বেহারারা চমকে গেলেও ভুবন ঘোষের মুখে কী হাসি! ‘চল তুই! বছরভর কাপড় গামছা পাবি, রোজ একখানা সিধে আর মাস ফুরালে এক সিকি মাইনে৷’
‘যে আজ্ঞে!’
ভুবন ঘোষের বাড়িতে এসে সাধুর কোনো কাজই নেই৷ এবেলা এক পালি (পাঁচ পোয়া) ওবেলা এক পালি চালের সিধে পায় সাধু৷ তেল-লবণ-লঙ্কা-কুমড়ো-বেগুন৷ মাছ খেতে ইচ্ছে হলে পুকুরে ছিপ ফেলে নয়তো বুনোপাড়া থেকে খালুই ভরা মোচাকাঁকড়া আনে৷ বুনোরা অমন এক খালুই কাঁকড়া বিনেকড়িতেই দিয়ে দেয় কত সময়ে৷
বড়ো কাজের মানুষ ভুবন ঘোষ৷ সেই জন্যেই সন্ধ্যে বেলা ছাড়া ওর সময়ই হয় না৷ সন্ধ্যে বেলা নিরিবিলি বসে উনি সাধুকে ডাকেন৷
‘অ সাধু, শেয়ালের ডাক ডাক তো!’
সাধু শেয়ালের ডাক ডাকে৷ শেয়ালের মধ্যে কতরকম ডাক আছে৷ বড়ো শেয়াল আগে ডাকবে, মেজো শেয়াল পরে৷ তারপর বাকি সব শেয়ালেরা বলবে ক্যা হুয়া হুয়া হুয়া৷
খ্যাঁক শেয়াল, গুঁপো শেয়াল, পাতি শেয়াল, মাথায় লোম কম নেড়ে শেয়াল, সকলের ডাক এক-একরকম৷ কাঁকড়ার গর্তে ল্যাজ ঢুকিয়ে শেয়াল বসে থাকে৷ কাঁকড়া কামড়াবে, ল্যাজ টেনে তুলবে, সেই কাঁকড়া খাবে শেয়াল৷ মাঝে মাঝে কাঁকড়া শেয়ালের ল্যাজ দেয় কেটে৷ আর ল্যাজ কাটা গেলেই শেয়ালদের লজ্জা চলে যায়৷ তাদের বলে গিধোড়৷ গিধোড় শেয়াল দিনেমানে লালবাগের আম বাগানে কুকুরের মতো শুয়ে শুয়ে ঘুমোয়৷
একদিন সাধু বলল, ‘ঘোষমশাই! আমি বাড়ি যাব৷’
‘কেন রে?’
‘এঁগ্যে, হাটে মাঠে ঘুরে দুটো পয়সা করতে হবে৷ এই অঘ্রানে মানুষের ট্যাঁকে ধানবেচা কড়ি৷ পয়সা না হলে মশাই, আমার ঘরদোর হবে না৷’
‘হবে রে হবে৷ দেখ না, তোকে রাজা করে দিচ্ছি৷’
সেই রাত্রেই সাধুকে ডেকে পাঠালেন ঘোষমশাই৷ বললেন, ওঁর পাইকদের সঙ্গে সাধুকে যেতে হবে৷ সাধু শেয়ালের মতো ডাকবে আর ওরা বলবে হোয়া হোয়া৷ এমনি করে কাশিমবাজার সাহেবদের কুঠিতে যেতে হবে৷
‘তার পরে?’
‘পরের কাজ ওরা করবে৷’
‘এঁগ্যে, তেমন করে তো ডাকাতরা যায়৷’
শুনে ভুবন ঘোষের সে কী হাসি৷ ‘ডাকাতরা যায়! আরে ডাকাত তো আমি তৈরি করি৷ আমার পেয়াদারাই রাতে ডাকাতি করে, দিনে ডাকাত ধরে৷ যখন সায়েবরা বেশি ট্যাঁ-ফোঁ করে তখন এক-এক জনকে ধরিয়ে দিই৷ আমার ঘরের নীচে ক-টা মানুষের মাথা পোঁতা আছে জানিস? দেখাব একদিন৷’
‘আজ্ঞে আমার সুমুন্দি?’
‘সবার সুমুন্দিই আমার পোষা রে!’
শুনে সাধুর মাথা বোঁ করে ঘুরে গেল৷ ডাকাতের দলের সঙ্গে শেয়াল ডাকা?
ভুবন ঘোষ দাঁত খুঁটতে খুঁটতে বললেন, ‘যদি কাউকে বলতে যাস তাহলে কী হবে জানিস তো? হরি হে নারায়ণ!’
সাধু কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘জানি মশায়৷’
সায়েবদের কুঠি মানে রেশমের কুঠি, সোরার আড়ত৷ সায়েবরা ব্যাবসা করে আর টাকা দিয়ে রেশম চাষ করায়৷ তোড়াবন্দি টাকা ওদের সিন্দুকে থাকে৷
তারপর সেই সর্বনেশে রাত এল৷ সাধু শিয়ালকে মাঝে নিয়ে বাঘা বাঘা পাইক-পেয়াদারা তো শেয়াল ডাক ডাকতে ডাকতে এগোল৷ যেমন কাছে এগোল, অমনি তো কুঠির সায়েবরা দমাদ্দম দোর বন্ধ করেছে৷ এরাও গিয়ে-জয় মা কালী! বলে মশাল নিবিয়ে কুঠির দোর ভেঙে ঢুকেছে৷
সাধু ততক্ষণে কুঠির আম গাছে উঠে পড়েছে৷ সেখানে বসে শুধু কাঁদছে আর-ভগবান! ভগবান! বলে ডাকছে৷
সেখান থেকেই সায়েবরা ওকে ধরল৷
সকাল বেলা তো হইচই কাণ্ড৷ কুঠি থেকে চুরি হয়েছে তিনশো টাকা৷ রুপোর গড়গড়া আর দাদখানি চালের ধামা৷ ভুবন ঘোষ এসে হম্বিতম্বি জুড়ে দিল৷ চারদিকে পাইক-পেয়াদা চলে গেল৷ পাইকরা রাতে গিয়ে ভুবন ঘোষকে বলেছে, ‘সাধুকে আমরা ঠেঙিয়ে দেশছাড়া করে এসেছি মশায়! ভয় পাবেন না৷’
সাধু যে আগেই পালিয়েছে আর লাঠির বাড়ি খেয়েছে রামচরণ কে তার খবর রাখে৷
ফর্স্টার সাহেব বললে, ‘ভুবনবাবু! আমরা এক ব্যাটাকে ধরেছি!’
‘কাকে ধরেছেন? কেমন করে ধরলেন?’
‘গাছে উঠে বসেছিল৷’
সাধুকে দেখে ভুবন ঘোষের মুখে কথা হঠাৎ আটকে গেল৷ সাধু ভ্যাঁ করে কেঁদে বললে, ‘সায়েবের চড়চাপড় বাজের মতো ভ্যায়নক! কিন্তু মশায়! তুমি কত মাছ কাঁকড়া খাইয়েছ, সিকি দিয়েছ গো! আমি প্রাণ থাকতে বলিনি তুমি ডাকাত পোষো৷ আমি শুধু বলেছি আমি তোমার চাকর, তোমায় শেয়াল ডেকে শোনাই আর তোমার ঘরের নীচে মাঝেমাঝে মানুষের মুণ্ডু পুঁতে রাখ!’
‘হরি হে!’ বলে ভুবন ঘোষ চোখ উলটে পড়ে গেল৷
সাধুর ঘর হল, দোর হল, গাইবলদ জমি হল৷ কিন্তু সাধুর সুমুন্দি মুরলীকে সায়েবরা দশ হাত জমিতে নাকখত দিইয়েছিল আর গ্রামে চৌরাস্তায় দু-হাতে ইট মাথায় ইট দিয়ে বসিয়ে রেখেছিল৷ মুরলীর নাকটা চিরতরে বোঁচা হয়ে যায়৷ সেইজন্যে সাধুর বউ চিরকাল সাধুকে কথা শোনাত৷
‘কী হিংসুটে মানুষ গো! দাদার নাকটা উঁচু ছিল বলে চুকলি খেয়ে নাকখত খাওয়ালে!’
‘তোমার দাদা ডাকাতি করেনি?’
‘ডাকাতের চাকরি করে তুমি ঘরদোর করনি?’
গরম তেলে পুঁইশাক আর চিংড়িমাছ ছেড়ে দিলে কড়াইয়ে কলকল শব্দ হত আর সাধুর বউ সাধুর সঙ্গে গলা ছেড়ে ঝগড়া করত৷
গ্রামের লোক বলত দিনমানে শেয়াল-শেয়ালনি দেয়ালা করছে৷
