গল্প
উপন্যাস
জীবনী

ঝোড়ো সাধু – মহাশ্বেতা দেবী

ঝোড়ো সাধু

ট্রেনের কামরায় লোকটাকে দেখেছিল তথাগত৷ পুরী থেকে ফেরার সময়ে কী একটা স্টেশনে৷ চিলকার কাছে ভীষণ ঝড় হয়েছে৷ অনেক নৌকো ডুবেছে৷ অনেক গাছপালা বাড়িঘর তছনছ হয়েছে৷ সে কথাই সবাই বলাবলি করছিল৷

লোকটার বয়স কত, তা বোঝা যায় না৷ একটা পোঁটলা নিয়ে সে উঠল৷ দরজার কাছে দাঁড়াল৷ তথাগতকে অবাক করে টিকেট চেকার বললেন, ‘ওখানেই থাকো সাধু৷ ঝড় উঠলে ট্রেন থামিয়ে দেব৷’

‘এখন আর হবে না বাবু৷’

চেকার বিড়বিড় করে বললেন, ‘অপয়া!’

‘হ্যাঁ বাবু৷’

‘দোষটা কাটাতে পারছ না?’

‘খোঁজ পাচ্ছি না যে৷’

‘চিলকাতে আছে বলে শুনেছিলে?’

‘হ্যাঁ বাবু৷’

‘এখন কোথায় যাচ্ছ?’

‘একটা দ্বীপ খুঁজছি৷’

‘দ্বীপ?’

‘হ্যাঁ বাবু৷ নির্জন ছোটো ছোটো দ্বীপের মধ্যে মানুষজন থাকে না! সেখানে গিয়ে থাকব৷ ঝড় হলে আমার ক্ষতি হবে৷ মানুষ কষ্ট পাবে না৷’

‘বটে! নৌকো ডুববে না?’

‘তাও তো বটে!’

চেকার চলে গেলে তথাগত লোকটার সঙ্গে আলাপ করেছিল৷ মাধ্যমিক দিয়ে ওরা কয়েক বন্ধু পুরীতে এক বন্ধুর মামাবাড়িতে বেড়াতে এসেছিল৷ দিন চারেক যেতে-না-যেতে ফিরে যেতে হচ্ছে৷ মায়ের খুব অসুখ৷ মনে দুশ্চিন্তা নিয়ে যাচ্ছে৷ ফলে ট্রেনে ঘুম হচ্ছে না৷

কিছুতে লোকটা মুখ খুলতে চায় না৷ অনেক তোয়াজ করার পর সে একটি অবিশ্বাস্য কাহিনি বলে!

ওর দেশ ময়ূরভঞ্জে৷ বাংলা ও ভালোই জানে৷ নৌকো তৈরি ছিল ওর কাজ৷ আর সেজন্যেই ও ওড়িশা ও মেদিনীপুরের মাঝামাঝি কোনো জায়গায় গিয়ে পড়ে৷ সেখানে ও খবর পায় এক বুড়ো জেলের৷ যাকে সবাই ভয় করত৷ সে নাকি ঝড় তুলতে পারত৷ জল, ঝড়ের দানোরা ছিল ওর বশ৷

এমন একটা কথা শুনে ওর পেছন পেছন ঘুরতে থাকে৷ লোকটা বলেছিল, ‘না না, এ বিদ্যে শেখাব না৷ ঝড় তুলতে শিখলে, ঝড় থামাতেও শিখতে হবে৷ ওটা না শিখলে দানোরা তোমার সঙ্গে ফিরবে আর তুমি যেখানে যাবে সেখানে ঝড় উঠবে নিদারুণ৷’

দুটো বিদ্যে একসঙ্গেই শিখতে হয়৷ অনেক সাধ্যসাধনার পর লোকটা সাধুকে নিয়ে যায় এক নির্জন সমুদ্রতীরে৷ ও বারবার বলেছিল, ‘দুটো শিখে নেবে৷ তারপর পরখ কোরো৷ নইলে ঝড় তোমায় ছাড়বে না৷ থামাবার বিদ্যে জান না৷ থামাতেও পারবে না৷’

নির্জন সমুদ্রতীর ছিল৷ বালির ওপর কীসব আঁকিবুকি কেটে লোকটা সাধুকে মন্ত্র শেখাতে শুরু করে৷

সাধুকে সে দ্বিতীয় মন্ত্রটা শেখাবে, তার আগেই সাধু সব সতর্কতা ভুলে মনে মনে মন্ত্রটা উচ্চারণ করেছিল৷ লোকটা ধাপ্পা দিচ্ছে, না সত্যি কথা বলছে, তা দেখতে হবে না?

যেমন বলা, সেই যে ঝড় উঠল, সে একেবারে রাক্ষুসে ঝড়৷ সমুদ্রের জল ফুলে ফেঁপে আছড়ে পড়ল ওদের ওপর৷ ভয়ে সাধু জ্ঞান হারাল৷

জ্ঞান হতে দেখে যে, সে লোকটার পাত্তা নেই৷ সে একা পড়ে আছে৷ এসব কথা জানাজানি হলে আশপাশের লোকজন ওকে মেরে ফেলত বোধ হয়৷ সাধু ওখান থেকে পালাল৷

সাধু বলল, ‘সেই থেকে যারা জানে তারা আমাকে ঝোড়ো সাধু বলে বাবু! এই চেকারবাবু জানবে৷ আমি ট্রেনে যাচ্ছিলাম, ঝড় উঠে ট্রেন থামাতে হয়েছিল তো! কত জায়গায় কত সর্বনাশ হচ্ছে বাবু, আমার কোনো ক্ষতি দানোরা করে না৷’

‘তুমি দ্বীপ খুঁজে বেড়াচ্ছ?’

হ্যাঁ বাবু৷ এমন জায়গায় যেতে চাই, যেখানে কোনো মানুষজন থাকে না৷ সেখানে পড়ে থাকব৷ না খেয়ে মরে যাব৷ যা হবার, আমার হবে৷ এমন কোনো জায়গার হদিশ দিতে পার আমাকে?

‘আমি তো জানি না৷’

‘বুড়োরাই বলতে পারে না৷ তুমি তো ছেলেমানুষ৷ কোথায় যে যাই?’

‘ঝড় আসছে, তা তুমি বোঝ?’

‘হ্যাঁ বাবু৷ শরীর অস্থির করে তো!’

‘তোমার কেউ নেই?’

‘আছে তো৷ তাদের কাছে যেতে ইচ্ছে করে, আবার ভয় করে৷ ক্যানিং-এ আমার দাদা থাকে৷ বারবার বলছে যে এসো৷ আমার কাছে থাকো৷ বনগাঁর আমার এক ভাগ্নে মিষ্টির দোকান খুলেছে গাইঘাটায়৷’

‘তুমি ওসব জায়গা চেন?’

‘খুব চিনি৷’

‘এখন কোথায় যাচ্ছ?’

‘কালীঘাটে একটা ভিখিরি থাকে৷ সে নাকি দানো ছাড়াতে পারে৷ তাই যাচ্ছি৷’

হাওড়া পৌঁছে লোকটা টুপ করে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল৷ তথাগতও ক্রমে ওরা কথা ভুলে গেল৷

১৯৮২ সালে সুন্দরবনের দিকে প্রচণ্ড ঝড়ের কথা সম্ভবত তোমরা ভুলে গেছ৷

সে সময়ে তথাগত ডায়মন্ডহারবার শহরে বসেছিল৷ মা গিয়েছিলেন মামাবাড়ি ডায়মন্ডহারবারে৷ তাঁকে আনতে গিয়েছিল তথাগত৷ মামাবাড়ির আবদার খাবে৷ সজনেখালি-বকখালি বেড়াবে, এমন কত পরিকল্পনা৷ সবই ভেস্তে গেল৷ মামা মৎস্যউন্নয়ন বিভাগে বড়দরের অফিসার৷ তিনি তাঁর দপ্তরের নৌকো, লঞ্চ, সব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ছোটাছুটিতে৷

ডায়মন্ডহারবার স্টেশনেই একটা লোক অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিল৷ তাকে দেখেই তথাগত চমকে উঠল৷ হ্যাঁ, সেই ঝোড়ো সাধু! সেই কাঁচাপাকা কোঁকড়া চুল, গলায় তুলসীমালা, চোখে সেই করুণ চাহনি৷

‘তুমি এখানে?’

‘আপনি…আপনি…ও! তুমি তো সেই বাবু৷ রাতে রেলগাড়িতে দেখা হয়েছিল! হ্যাঁ বাবু, আমি! দাদার অসুখ শুনে দেখতে গেলাম, তা সকলকে সর্বনাশ করে এলাম…বাবু৷ খোকাবাবু! আমাকে ঠেলা দিয়ে রেলগাড়ির নীচে ফেলে দিতে পার?’ একথা বলে ও কাঁদতে লাগল৷

তথাগত বলল, ‘তুমি কলকাতায় আমাদের বাড়ি এসো৷ আমি তোমাকে একজায়গায় নিয়ে যাব৷’

‘কোথায় খোকাবাবু?’

‘আমার মাস্টারমশাইয়ের দাদা তোমার এ ব্যাপারটা… বুঝলে সাধুদা! একটা ক্ষমতা তো?’

সাধু কেমন অবাক হয়ে গেল৷ বলল, ‘তুমি আমার নাম মনে রেখেছ খোকাবাবু! তুমি আমায় দাদা বললে!’

‘ও কী, চোখে জল!’

‘কেউ বলে না খোকাবাবু৷ সবাই বলে তুই ঝোড়ো, তুই অপয়া, সবাই…বিস্কুট খাবে খোকাবাবু?’

‘না সাধুদা৷ আমার ট্রেন আসছে৷ তুমি এসো কিন্তু৷ আমার ঠিকানা লিখে দিচ্ছি৷ এসো কিন্তু৷’

‘খোকাবাবু! তোমার সেই মাস্টারমশাইয়ের দাদা আমাকে একটা নির্জন দ্বীপ খুঁজে দিতে পারবে না?’

‘দ্বীপের খোঁজ নিশ্চয় দেবে৷ তোমাকে একলা ছাড়বে নাকি? তোমার সঙ্গে অনেক লোক থাকবে, কত বিজ্ঞানী, কত পণ্ডিত, তারা দেখবে ব্যাপারটা৷’

‘কিন্তু…’

বলতে বলতে ট্রেন এসে গিয়েছিল! সাধু যে আরও কী বলতে যাচ্ছিল, তা শোনা হয়নি তথাগতের৷ তবে ট্রেনের জানলা থেকে ও দেখেছিল, সাধু ওর দিকে চেয়ে হাত নাড়ছে৷ তার মুখটা খুব হাসি হাসি৷

কলকাতায় ও ওর মাস্টারমশায়ের দাদার সঙ্গে কথা বলেছিল৷ ভূমিকম্প বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডক্টর দেবেন্দু রায়ের নাম কে না জানে৷ তিনি বলেছিলেন, ‘লোকটাকে বেশ দেখতে ইচ্ছে করছে৷ অবশ্য মনে হচ্ছে ওর উপস্থিত থাকা আর ঝড় ওঠার ব্যাপারটা নেহাত অস্বাভাবিক যোগাযোগ৷ এসব জাদু-বিশ্বাস আগে খুব ছিল৷ রবার্ট লুই স্টিভেনসন এমন বিশ্বাস নিয়ে গল্প লিখেছেন৷ আর এম. আর. জেমসের নাম কে না জানে৷ তিনিও লিখেছেন৷’

সাধু কিন্তু এসেছিল৷ ও কোনো বাড়িতে আসতে রাজি হয়নি৷ না, ফাঁকা জায়গাই ভালো৷ অবশেষে দক্ষিণ কলকাতার বিবেকানন্দ পার্কে সন্ধ্যে বেলা সবাই এসেছিল৷ দেবেন্দু রায়, মেঘ বিশেযজ্ঞ চিন্তামণি নরসিংহ, আবহাওয়াবিশারদ ড. মণিময় দত্ত-কলকাতাকে তুচ্ছ ভেবো না৷ এ শহরে অনেক গুণী, অনেক জ্ঞানী থাকেন৷ এঁদের সঙ্গে ছিল এক তরুণ সাংবাদিক মোহন প্যাটেল৷ সে-ই ছিল সবচেয়ে অবিশ্বাসী৷ মজা দেখতে এসেছে, এমনি ভাব তার৷

সাধু এসে বসল৷ সন্ধ্যে হয় হয় নির্মেঘ আকাশ৷ দক্ষিণে সাদার্ন অ্যাভিনিউ, তিন দিকে আলো ঝলমল কলকাতা৷ দেবেন্দু রায় কথা শুরু করলেন৷ তথাগত বেজায় ব্যস্ত, ‘বলো না সাধুদা, আমাকে যা যা বলেছিলে?’

সাধু সবই বলল৷

শুনে সবাই চুপচাপ৷ সাধু আপন মনেই যেন বলল, ‘এরা তো বিশ্বাস করছে না, এরা ভাবছে সবই গাঁজা৷’

মোহন প্যাটেল বলল, ‘সব ধাপ্পা৷’

‘ধাপ্পা? কেন বাবু, ধাপ্পা হবে কেন? আপনারাই আমাকে ডেকেছেন, আমি তো আপনার হতে আসিনি৷’

‘তুমি একটা ডিলিউশনে ভুগছ৷’

‘বটে! ইংরিজিতে কী বললে?’

‘এ হয় না, হতে পারে না৷’

সাধু খপ করে তথাগতর হাত দুটো চেপে ধরল৷ বলল, ‘তুমি বলো খোকাবাবু, ছোট্ট করে এদের একটু দেখাই৷’

কী যে বলল সে বিড়বিড় করে, তা শোনাই গেল না৷ যা ঘটল, তা তথাগত জীবনে ভুলবে না৷ প্রচণ্ড ঝড়ে গাছপালা সব দুলে উঠল, আর বাতাসের ধাক্কায় মানুষগুলি মাটিতে পড়ে গড়াতে গড়াতে ছড়িয়ে গেল৷ ঝড়টা পার্ক ছাড়িয়ে লেকের গাছপালা দুলিয়ে দক্ষিণে দৌড় মারল৷

তারপর সব শান্ত, শান্ত৷ তথাগত শুধু বলল, ‘থেমে গেলে?’

‘এ তো ডেকে আনা ঝড়৷ তাতেই থামল৷ কিন্তু নিজে থেকে আসে যখন, তখন থামে না৷ চলি খোকাবাবু৷’

দেবেন্দু রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘যেতে দিয়ো না ওকে৷ ধরে রাখো৷ ওকে নিয়ে আমি বিদেশে যাব, লোককে দেখাব৷’ মোহন প্যাটেল কাতর গলায় বলল, ‘আমার চশমা?’

সাধু দাঁড়াল না৷ চলে গেল হনহন করে৷

সেই শেষ৷ সাধুকে আর দেখেনি তথাগত৷ তবে গাইঘাটার ঝড়ের কথা তো তোমরা জান৷ কী কাণ্ড হয়ে গেল সেখানে৷ কত লোক মারা পড়ল৷

গাইঘাটা ঘুরে এসে মোহন প্যাটেল একটি ছবি দেখিয়েছিল তথাগতকে৷ গাছ বুকে নিয়ে একটি লোক মরে পড়ে আছে৷ মুখটা খুব প্রশান্ত, যেন হাসি হাসি৷

‘চিনতে পার?’

‘হ্যাঁ চিনেছি৷’

‘গাইঘাটা গিয়েছিল কেন?’

‘ওখানে…ওর…কে যেন থাকত…’

‘ঃও! মুখটা দেখেছ?’

‘দেখলাম৷’

‘হাসছে কেন?’

তথাগত হাসি দিয়ে মনের বেদনা ঢেকে আস্তে বলল, ‘ও মুক্তি পেয়ে গেছে, তাই হাসছে৷’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *