গল্প
উপন্যাস
জীবনী

আবার ন্যাদোশ – মহাশ্বেতা দেবী

আবার ন্যাদোশ

একটা বেজায় ঝুটঝামেলা হয়েছে বলতে পার৷ ‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি, পূজার সময় এল কাছে,’-রবীন্দ্রনাথের কবিতাটা নিশ্চয় পড়োনি৷ না পড়ে থাকো তো পড়ে নিয়ো৷ পড়ে থাকলে সেটা পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়ের ব্যাপার৷ তা এরকমটা যখন ঘটে, মানে ব্যাকরণের ভাষায় বলতে গেলে এটা তো নিত্যই ঘটবে৷ ভাদ্রের পর আশ্বিনই আসবে, কার্তিক আসবে না৷ আশ্বিন এলে পুজো হবে৷ পুজো হলে পুজোর লেখা যেমন করে পার লিখতে হবে৷ কবে খাতায় ‘লেখক’ বলে নাম লিখিয়েছ, ছাড়ানো-ছোড়ানো নেই৷

এবং ন্যাদোশ আসবে৷ পুজো মানেই ন্যাদোশ৷

চলেও এল খচমচিয়ে৷ না, স্বর্গে থাকার সুফল আছে৷

চেহারায় হেভি চেকনাই৷ ন্যাদোশ চোখ বুঁজে বলল, ‘মন্দাকিনীর জলে স্নান, ভরপেট ভুরিভোজন, আধ ঘণ্টা জিরোও, তারপরেই ক্রিকেট প্র্যাকটিস করো৷ চেহারা দেখে চমকে গেলে তো?’

‘খানিকটা৷ মর্তলোকে তোমার মতো কুচ্ছিত গোরু তো দেখা যেত না৷’

‘হয়, মগজে ব্রেন থাকলে চেহারা বিকশিত হতে পায় না৷ দেখছি তো নানা রাজ্যের গোরুদের! ক্যুইজ-এর আয়োজন করো, সুরভিলোকের হুকুম এল, বেঙ্গল কাউজ! বেঙ্গল কাউজ!’

‘ইংরিজিতে?’

‘সুরভিলোকে, অর্থাৎ গো-লোকে সব ভাষাই চলে৷ বলতে কী, এখন আমাদের নানাভাষাই শিখতে হবে৷’

‘হামবা কি বাতিল হয়ে যাবে?’

‘হলে অবাক হব না৷’

‘সে কী, আমি আঘাত পেলাম ন্যাদোশ!’

ন্যাদোশ যেন হওয়ায় ভেসে আমার অভিধান সংগ্রহের ওপর বসল৷ বলল, ‘একজন খাম্বাজ স্ত্রীলোক ঘর ঝেঁটোতে আসছে৷’

‘ওকে দেখা দিয়ো না, প্লিজ!’

‘পাগল না কি? আমি পড়ার ঘরে ঢুকলে তোমাদের মেনকা আমাকে লাঠি দেখাত না?’

‘তাই ওর শাড়ি চিবিয়েছিলে৷’

‘সত্যি! চিবিয়েছিলাম! সাবানে কাচা, নীলে ডোবানো সাদা কাপড় আমাকে পাগল করে দিত৷ যাকগে, মেয়েটা বেরিয়ে গেল৷’

ন্যাদোশ নেমে এসে টেবিলেই বসল৷ কী ফুরফুরে, যেন হাওয়া দিয়ে গড়া!

চোখ বুঁজে বলল, ‘ভাষা! বই খেয়েছিলাম তাই মুখস্থই আছে৷

‘নানান দেশে নানান ভাষা

বিনা স্বদেশি ভাষা

পুরে কি আশা?

‘আহা হা! কী সব গ্রেট পোয়েট্রি না ছিল!’

‘তোমার স্বদেশি ভাষা হামবা!’

‘কিন্তু হরদম ইংরেজি চলছে৷ বিলিতি গোরুরা মু-উ-উ বলে৷ হিন্দিভাষী গোরুরা বলবে মু মানে মুখ৷ সত্যি বলতে কী, তোমার বোনের বরটা তো হরদম অভিধান লিখছে৷ ওকে বলো না, ভারতের রাজ্যে রাজ্যে গোরুর ডাককে কী বলে, তার একটা তালিকা বানাক!’

‘বলব৷ তা বেঙ্গল কাউ ক্যুইজ বানাবে কেন?’

‘আর কে বানাবে? বেঙ্গল কাউদের হেডের মধ্যে ব্রেন আছে না? আমি…যাকে বলে গোরুদের মধ্যে গণতন্ত্র আনছি, অর্থাৎ গো-লোকের গোরুদের ওপর নন্দিনী-কপিলা-সুরভিদের ছড়ি ঘোরানো বন্ধ করছি৷ যতসব সংস্কৃত শব্দে লেকচার শুনতাম! দোগধ্রী, ঋষভ, বস্কয়সী, কী সব শব্দ! বলেছি, স্বাধীন ভারতে নানান ভাষা, সব ভাষাই সাবালক৷ বলতে হলে বলো গাই, ভুঁইষা, বয়াল, বাছুর! বলে কী! দেবলোকে নাথিং বাট সমস্কৃত! বললাম, গো-লোককে স্বাধীন ভাবে নিজ ভাষা বলার অধিকার দিন৷’

ন্যাদোশ মুষড়ে পড়ল৷ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল৷ কী তাক করে না শ্বাসটা ছাড়ল! যে সব চিঠির জবাব দিতে চাই না, স-ব উড়িয়ে নিয়ে ছেঁড়া কাগজের ঋুড়িতে ফেলে দিল৷ মুচকি হেসে বলল, ‘টেবিলটা তো ডাস্টবিন! মাঝে মাঝে এসে সাফ করে দেব৷’

‘তা ক্রিকেট খেলার কথা কী বলছিলে?’

‘ওই যে নয়া প্রজন্মের গোরুরা আসছে, দুর্বিনীত ছোকরা সব! ওরা অস্ট্রেলিয়াকে হারতে দেখে…৷’

‘বলো কী? দেখলে কোথায়?’

‘না, তোমার হেডে ব্রেন নেই৷’

‘কী আছে?’

‘গোঁয়ার তুমি!’

‘আমার সন্দেহও তাই৷ কিছু গো-লোকের বাসিন্দারা ম্যাচ দেখছে কী করে?’

‘আমি তোমার কাছে আসছি কী করে?’

ন্যাদোশ বলল, ‘ছোকরা গোরুরা ক্রিকেট দেখে, ফুটবল দেখে, জনগণের রাস্তা অবরোধ দেখে৷ হ্যাঁ, ব্যায়াম আমরা করতাম৷ যোগাসন, সাঁতার, গোরু-দৌড়, হাই জাম্প, সবই করি৷ শিবের বাহন যে ষাঁড়, তাঁর এসব বেজায় পছন্দ৷ ঠিক আছে! তিনি বললেন, আমরা মানলাম৷’

‘কৃষ্ণও তো একসময়ে গোরু চরাতেন!’

‘আজও চরান!’

‘সে কী?’

ন্যাদোশ সামনের পা তুলে কান চুলকে নিল৷ বলল, ‘যখন গোলকধামে ধড়াচুড়ো পড়ে বসে থাকতে ভালো লাগে না, তখন চলে যান৷’

‘বৃন্দাবনে?’

‘দেখো! আজকের বৃন্দাবনে তো যান না৷ স্বর্গে এক কোনে ওঁর বৃন্দাবন বানানোই আছে৷ ছোটো ছেলেটি হয়ে সেখানে ঢুকে যান৷ গোরু চরান, বাঁশি বাজান, ছেলেদের সঙ্গে খেলা করেন৷ এসব আমরা জানি৷ কিন্তু আমাদের তো সেখানে ঢোকার হুকুম নেই৷ খবর সবই পাই৷ যাক গে…ক্রিকেটের কথা৷’

‘ক্রিকেট খেলবে তোমরা?’

‘আরে, ছোকরা গোরুদের আলাদা ইউনিয়ন! তারা আমাদের বলে বিংশ শতক আর নেই! তোমাদের আদ্যিকেলে ধ্যানধারণা ছাড়ো৷ আমরা খেলব ক্রিকেট!’

‘খেলুক না৷’

‘এটা তো আমাদের নেতারা পছন্দ করছেন না৷ তাই আমাদের, মানে বেঙ্গল কাউদের বললেন, ক্যুইজ শুরু করো, নয়তো অন্য কিছু বুদ্ধির খেলা৷ আর দেখো, মহাকাব্য, পুরাণ, এসব থেকেই তৈরি করো৷’

‘মহাকাব্য! তবে তো সোজা৷’

‘সোজা! ছোকরাগুলো না দেখেছে টি ভি তে রামায়ণ, না দেখেছে মহাভারত! কিচ্ছু জানে না৷’

‘তোমার তো সুবিধে৷ সেই সব প্রশ্ন দাও, যার…’ বলেই আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘পেয়েছি!’

আর ন্যাদোশ তো এক লাফে ফ্যানের মাথায় উঠে গেল৷ দেখি ঘন ঘন শ্বাস টানছে৷

‘কী হল?’

‘অমন চ্যাঁচায়? ভয় খেয়ে গেছি৷’

‘ভয় কেউ খায়? ভয় পায়৷’

‘খায়৷ আমরা খাই৷ যাক গে!’

ন্যাদোশ আবার পালকের মতো আলগোছে হেসে নেমে এল৷ এবার বসল বিছানায়৷

‘বলো কী পেয়েছ?’

‘লাইন বানিয়ে দেব৷ কিন্তু তোমরা পুরস্কার কী পাবে?’

‘স্বর্গে আমরা তো গো-লোক, বা সুরভি-লোকের বাইরে যেতে পারি না৷ পুরস্কার, স্বর্গের সকল লোকে বেড়াবার ফ্রি পাস৷ যথা ইচ্ছা, তথা যাও৷ আর সান্ত্বনা পুরস্কার, বুড়োদের ব্যায়াম মকুব৷ ছোকরাদের ক্রিকেট ব্যবস্থা৷ ঃও! স্বর্গটা এবার লিবারাল হয়ে যাবে৷’

‘ঃও! ভালো বুদ্ধি তো!’

‘বেঙ্গলি কাউ! হেডের মধ্যে ব্রেন! বলো, বলো, একটু খেই ধরিয়ে দিলেই পারব৷’

‘ন্যাদোশ! ক্যুইজ বানাতে সময় লাগবে, যা এখনি করা যায়, তা হল…’

‘পয়েট্রি রচনা!’

‘কী করে বুঝলে?’

‘তোমার ব্রেন আর আমার ব্রেন একই রকম তো!’

‘তাই?’ আমি বেশ মুষড়ে পড়লাম বলতে পার৷

‘তোমাকে তো গ্রিন ভাইরাসে ধরেছে৷ দু-বেলা ঝিঙে, পটল, পেঁপে, শসা, লাউ খাচ্ছ?’

‘যাকগে, যাকগে, বলো৷’

‘তুমিই বলো…’

‘ক্যুইজে দাও ‘রাম না জন্মাতে রামায়ণ’ প্রবাদের উৎপত্তি কী ভাবে হল?’

‘রাম তেড়ে আসে যদি?’

‘ঘেবড়ে যাবে৷ সেও তো জানে না৷’

‘তারপর৷ ‘হরি ঘোষের গোয়াল’ প্রবাদ কেন হল?’

‘বেশ তো!’

‘সীতা আর কচ্ছপে মিল কোথায়?’

‘কোথায়?’

‘জন্মে৷ সীতাও ডিমের মধ্যে ছিলেন, কচ্ছপও ডিমের মধ্যে থাকে৷’

‘হাঁস মুরগি যেমন! কম খেয়েছি? তবে সে তো বলা যাবে না!’

‘রাম, বলরাম, পরশুরাম, কে কবে জন্মান!’

‘ভিরমি খেয়ে যাবে৷’

‘বাতাপি ও বাতাপিতে তফাত কী?’

‘সে আবার কী?’

‘বাতাপি লেবু খাওয়া যায়, বাতাপি রাক্ষসকে খাওয়া যায় না৷’

‘বাঃ, বেশ তো বলছ!’

‘তারপর এই শব্দগুলো চার লাইনে লিখে দাও৷ ওরা বুঝে-শুনে সাজিয়ে লিখবে৷ দেখবে গ্রেট পয়েট্রি হয়ে গেছে৷’

‘কীরকম?’

‘এইরকম-

‘রু গো লো বা মা স গো কে র য় নু ষে র ন গো য় হ কে ন ক ম লো র না ষে নু বে ত মা কা ন্দ ন ন ন ন অ বি প ত্র বি ন বি কা ণ গ ব দে থা সে খে সু বি ক র চ রে ণ’

‘এটা কি ঠাট্টা হচ্ছে?’

‘আরে, সাজালেই তো কবিতা-

‘গো-লোকে গোরুর বাস মানুষের নয়

তবে মানুষের নাম গোলোক কেন হয়?

নন্দন কানন অতি পবিত্র কানন

দেবগণ সুখে সেথা করে বিচরণ৷৷’

‘আরে, এ তো আমিই লিখতে পারব৷ কম পদ্যের বই খেয়েছি সে সময়ে? বাঁচালে! এইটে নিয়েই শুরু করি৷ ছোকরাগুলো ভাবুক৷ খালি ম্যাচ দেখব, সিনেমা দেখব, টি ভি দেখব! পয়েট্রি একটা…কী বলো তো?’

‘আমার ঘুম পাচ্ছে৷ সুস্থ সংস্কৃত!’

‘সংস্কৃত নয়, সংস্কৃতি! আজ আসি! ধন্যবাদ!’

‘ধন্যবাদ! ডুরিডুবায় দেখা হবে…’

ব্যাস৷ ন্যাদোশ নেই৷ জানলা দিয়ে চেয়ে মনে হল হুশ করে খানিকটা ধোঁয়া বেরিয়ে গেল৷ ডুরিডুবা কী?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *