চার ভাই
সে অনেক, অনেক কাল আগের কথা৷ গভীর বনে ছিল এক ভরত পাখি৷ পাখি-মায়ের চারটি ছেলে! বাঘ, সাপ, একশিং ঘোড়া আর মানুষ৷ মায়ের যত্নে চার ভাই হেসে-খেলে বড়ো হতে থাকল৷ সবাই যখন বড়োসড়ো হল, মা ছেলেদের ডেকে কাছে বসাল৷ তারপর বলল, ‘বাছা! তোমরা তো বড়ো হয়েছ৷ এখন যে-যার জায়গায় যেতে হবে৷ বাঘ! তুমি যাও জঙ্গলে৷ জঙ্গলই তোমার ঘর৷ সিংহ, চিতাবাঘ, জাগুয়ার, পুমা, কাউগার, বনবিড়াল, সকলের ওপর তুমি রাজত্ব করো৷
‘তাই হবে মা!’
‘সাপ! তুমি যাও জলের দেশে৷ সব জলজন্তুর ওপরে তুমি রাজত্ব করো৷’
একশিঙা ঘোড়া আর মানুষ ছেলেকে মা বলল, ‘তোমরা বাছা যেখানেই যাও, কেউ কাউকে ছেড়ো না৷ একসঙ্গে থাকবে৷ দেখবে কত সুখ পাবে! আর চার ভাই চার ভাইকে এ-ওর বিপদে দেখবে৷’
মায়ের কথা মেনে নিয়ে বাঘ গেল জঙ্গলে আর সাপ গেল জলে৷ একশিঙা ঘোড়া আর মানুষ ছেলে চলল দুনিয়া দেখতে৷ চলতে চলতে দু-ভাই এক হ্রদের ধারে পৌঁছোল৷ সে দেশের রাজার ছেলেরা জলে ঝাঁপাঝাঁপি করে স্নান করছিল৷ একশিংওয়ালা অমন তেজস্বী ঘোড়া তো তারা আগে দেখেনি৷ তারা বলল, ‘অ ভাই ঘোড়াওয়ালা, কী দেখছ?’
‘তোমাদের স্নান দেখছি!’
‘আমাদের সঙ্গে খেলবে?’
‘কেন খেলব না?’
‘তবে শোনো৷ আমরা জলে ঝাঁপ দিয়ে লুকাব৷ তুমি যদি আমাদেরকে ধরতে পার, আমাদের ছোটো বোনের সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব৷ আর যদি তুমি হেরে যাও, তাহলে তোমার ওই চমৎকার ঘোড়াটি আমরা নিয়ে নেব৷ একশিঙা ঘোড়া হয় তা তো কখনো দেখিনি৷ পাহাড়ের মতো উঁচু, কী তেজস্বী, কী চমৎকার দেখতে৷’
একশিঙা তার মানুষভাইকে বলল, ‘তুমি জলে নামলে আমিও নামব৷ দু-জনে মিলে ওদের হারিয়ে দেব৷’
কাজের বেলা ঠিক তাই হল৷ যতবার রাজপুত্ররা জলের নীচে লুকায়, মানুষভাই আর একশিঙা ভাই তাদেরকে ঠিক ধরে ফেলে৷ কিন্তু মানুষভাই যখন জলের নীচে লুকায়, রাজপুত্ররা তো তাকে ধরতেই পারে না৷
হেরে গিয়ে কেঁদেকেটে রাজপুত্ররা বাড়ি ফিরে গেল৷ গিয়ে যে-যার খাটে শুয়ে থাকল৷ না, তারা উঠবে না, খাবে না, কিচ্ছুটি করবে না৷ মা-বাবা এসে সাধাসাধি করলেন কত৷
‘বলো বাছারা, তোমাদের কী হয়েছে৷ কেন-বা এমন করছ৷ কেন খেতে চাইছ না৷’
‘জলে ঝাঁপাঝাঁপি করতে গিয়ে একশিঙা ঘোড়াওয়ালার সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম৷ তার কাছে হেরে গিয়েছি৷ এখন আদরের ছোটো বোনটিকে তার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে৷ তাতে যদি রাজি হও, তাহলে আমরা খেতে পারি৷’
রাজা-রানি এ কথা শুনে বললেন, ‘এই কথা! তাতে ভাবনা কী বাছা! আমরা কি আর অমন একটা উটকো ছেলের সঙ্গে আমাদের মেয়ের বিয়ে দেব?’
বিয়ের দিন ঠিক হল৷ একশিঙাভাই বলল, ‘মানুষভাই! আমার মনে হচ্ছে, ওরা কোনো গণ্ডগোল করবে৷ আমি যেমন বলি, তুমি তেমন শুনে কাজ করো৷’
বিয়ের দিনে একশিঙা আর মানুষভাই তো এসেছে৷ দেখে, একটি সুন্দরী মেয়ে সেজেগুজে বসে আছে৷ অন্য মেয়েরা তাকে চামর দুলিয়ে বাতাস করছে৷ অনেক দূরে একটি মেয়ে বসে আছে৷ তার গায়ে মুখে চটচট করছে গুড়৷ ভনভন করছে মাছি৷ পরনে তার ছেঁড়া কাপড়৷
একশিঙা বলল, ‘তুমি ওই মেয়েটির হাত ধরো৷ বলো, ওকেই আমি বিয়ে করব৷’
সঙ্গেসঙ্গে মানুষভাই তো সেই মেয়েটির হাত ধরেছে৷ তখন রাজা আর কী করেন? রাজকন্যাকে নাইয়েধুইয়ে সাজিয়েগুজিয়ে এর সঙ্গেই বিয়ে দিতে হল৷
বিয়ে হলে কী হবে? কোথাকার কে ছেলে৷ চালচুলোর ঠিক নেই৷ উদ্ভট একটা একশিঙা ঘোড়া তার সঙ্গী৷ রাজা তার মন্ত্রীদের বললেন, ‘কেমন করে এর হাত থেকে রেহাই পাই? একটা বুদ্ধি বাতলাও৷’
‘মহারাজ! এ আর এমন কথা কী! ওকে বলুন বন থেকে বাঘের দুধ
আনতে৷’
‘বাঘের দুধ দিয়ে কী হবে?’
‘মহারাজ! বাঘের দুধ আনতে গেলে বাঘ ওকে মেরে ফেলবে৷ তখন নিজের মেয়েকে নিয়ে সুখে থাকবেন৷’
‘তা বেশ বলেছ৷’
বাঘের দুধ আনবার কথা শুনে মানুষভাই তো ভয়ে সারা! একশিঙাভাই বলল, ‘ভাবছ কেন? আমাদের বাঘভাই তো বনেই আছে৷ তার কাছে চলে যাও৷
মানুষভাই একটা কলসি নিয়ে বনের দিকে চলল৷ কত হিজুবন, বিজুবন, খাল, পাহাড়, নদী, নালা পেরোল৷ তারপর পৌঁছোল বাঘের দেশে৷
মানুষের গন্ধ পেয়ে বাঘেরা সব ব্যস্ত হয়ে উঠল৷ বড়ো বড়ো বাঘ তো বটেই৷ খোকা বাঘেরাও খুব খুশি৷ মানুষ পেলে বাঘ তো খুশিই হবে৷ সব বাঘ মানুষ খায়নি৷ যারা খেয়েছে, তারা বলে যে, মানুষের মাংস ভারি মিষ্টি৷
কিন্তু বাঘভাই তো সবার রাজা৷ সে ভাইকে দেখে কী খুশি, কী খুশি!
‘কোথায় আছ, কেমন আছ, একশিঙাভাই কেমন আছে!’
মানুষভাই বলল, ‘বড়ো বিপদে পড়েছি দাদা৷ রাজার মেয়েকে বিয়ে করেছি৷’
‘সে তো ভালো কথা৷’
‘রাজা বলছে বাঘের দুধ নিয়ে এসো৷’
‘এই কথা! আমি যে বাঘের জাতে রাজা, সেকথা তোমার মনে পড়ল না? আমরা এক মায়ের চার ছেলে৷ তুমি হলে মানুষভাই!’
যে কথা সেই কাজ৷ বাঘিনি দুয়ে এক কলসি দুধ ভরা হল৷ তারপর একটা বাঘের পিঠে চাপল মানুষভাই, আরেকটা বাঘের পিঠে চাপাল দুধের ঘড়া৷ দুই বাঘের সঙ্গে সে যখন রাজবাড়িতে হাজির, রাজা তো ভয়ে সারা৷
‘বেশ করেছ, মস্ত বাহাদুরি তোমার৷ এখন ওদের বনে ফিরে যেতে বলো৷’
দুই বাঘ হেঁকে বলল, ‘রাজামশাই! তোমার জামাইকে অর্ধেক রাজত্ব দাও৷ নইলে আমরা দলে দলে এসে তোমাকে মজা দেখাব৷’
অর্ধেক রাজত্ব নিয়ে মানুষভাই তো সুখেই আছে৷ একশিঙাভাই রাজত্ব পাহারা দেয়, কচিঘাস খায় আর সবসময়ে সুপরামর্শ দেয়৷ দলে দলে লোক এসে এই রাজত্বে বাস করতে থাকল৷ সবাই বলল, ‘এ যেন সোনার রাজ্য৷’
তাতে রাজার বেজায় হিংসে হল৷ তিনি একদিন জামাইকে ডেকে পাঠালেন- ‘সাপ কিলবিল এক হ্রদে ফুটেছে পদ্মফুল৷ সেই সোনালি পদ্ম ফুল নিয়ে এসো৷’
মানুষভাই সেখানে গেল৷ হ্যাঁ, সমুদ্রের মতো নীল হ্রদ৷ তাতে সোনারাঙা পদ্ম ফুটে আলো করে রেখেছে৷ কিন্তু বিশাল বিশাল সাপ ফুলগুলো পাহারা দিচ্ছে৷ কাছে যায় তার সাধ্য কী?
কিন্তু সেই যে তার সাপভাই, সে তো তার মানুষভাইকে ঠিকই চিনেছে-‘এসো ভাই, কাছে এসো৷ কোথায় আছ, কেমন আছ, সব কথা বলো৷ আমার একশিঙাভাই কেমন আছে?’
মানুষভাই বলল, ‘আছি তো ভালোই! রাজার মেয়েকে বিয়েও করেছি৷ রাজত্বও পেয়েছি৷ একশিঙাভাই আমার কাছেই থাকে৷ কিন্তু আমার শ্বশুর যে বলছে এই হ্রদ থেকে সোনালি পদ্ম ফুল নিয়ে যেতে, তা কেমন করে আনব তাই বলো৷’
সাপভাই বলল, ‘এ কী কথা ভাই? আমি থাকতে তোমার কীসের ভাবনা? এ হল সাপের রাজত্ব৷ কিন্তু আমি তো এদের রাজা৷ তুমি এখানে বসো৷ আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি৷’
সাপভাইয়ের হুকুমে শত শত পদ্মফুল জোগাড় হল৷ তারপর একটি সাপ পিঠে নিল ফুলের ঝুড়ি, আরেকটি সাপ পিঠে নিল মানুষভাইকে৷
দুই সাপ নিয়ে জামাইকে ফিরতে দেখে রাজা তো ভয়ে অজ্ঞান৷ মানুষভাই হেঁকে বলল, ‘এক ঝুড়ি ভুট্টা বেশ করে সেঁকে বাগানে ছড়িয়ে দাও৷ ওরা খুঁটে খেয়ে চলে যাবে৷ ভয় পাবার কিছু নেই৷ এরা আমার চেনা সাপ৷’
রাজার মনে বিশ্বাস হল, ওই একশিঙা ঘোড়া কোনো জাদুমন্ত্র জানে৷ ও আছে বলেই ছেলেটাকে জব্দ করা যাচ্ছে না৷ রাজা জামাইকে বলল, ‘দেখো! তোমার একশিঙা ঘোড়ার সঙ্গে আমার হাতির যুদ্ধের ব্যবস্থা করো৷ একশিঙা ঘোড়াও কেউ দেখেনি আর আমার হাতিও যুদ্ধের হাতি৷ এদের লড়াই হলে দেখে সবাই খুব আমোদ পাবে৷’
মানুষভাই বলল, ‘একশিঙা ভাই! যুদ্ধের হাতির দাঁত যেমন বড়ো গায়ে তেমন জোর৷ আমার ভয় হচ্ছে, ও তোমাকে বুঝি মেরেই ফেলবে৷’
‘এ যুদ্ধে আমিই জিতব! আমার শিংটা যেমন বড়ো, তেমনি সুচালো৷ তুমি কিচ্ছু ভেবো না৷’ সত্যি সত্যি তাই হল৷ একশিঙা ঘোড়া শিং দিয়ে হাতির পেট চিরে দিল৷
রাজা বেজায় খেপে গেলেন৷ বললেন, ‘এবারে আমার সৈন্যরা তরোয়াল নিয়ে আসছে৷ তাদের সঙ্গে তোমার একশিঙা লড়াই করুক৷’
মানুষভাই বলল, ‘ভাবনা কী একশিঙা! তোমার সঙ্গে লড়াই করে ওরা হেরেই যাবে৷’
একশিঙা ঘোড়া মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘না ভাই! এবারে আমার মৃত্যু হবে৷ তা দেখো, মরে গেলে পরে আমাকে টুকরো টুকরো করে কাটবে৷ মাংসের টুকরোগুলো কলসিতে ভরবে৷ কলসির মুখ চাপা দেবে৷ ওরা যখন রাজকন্যাকে নিয়ে যাবার জন্যে আসবে, তখন তুমি কলসির ঢাকনা খুলে দিয়ো৷’
‘সত্যি মরে যাবে?’
‘হ্যাঁ ভাই৷ তবে মায়ের কথা আমি ভুলিনি৷ সেই কবে মায়ের কাছে চার ভাই মনের সুখে ছিলাম৷ কত আনন্দ ছিল সে জীবনে৷ মায়ের কথা মেনে নিয়ে আমরা দু-জনে এতকাল একসঙ্গে কাটালাম সুখে দুঃখে৷ কিন্তু ভাই! একদিন না একদিন মৃত্যু আসবেই৷ দুঃখ কোরো না, আর এটা জেনো যে আমি প্রাণপণে লড়াইটা করব৷’
তা সে ভীষণ যুদ্ধই হল৷ একশিঙা ঘোড়ার শিঙে যেমন ধার, শরীরে তেমন শক্তি৷ সূর্যের মতন সে তেজস্বী, ঝোড়ো বাতাসের মতো দুর্দান্ত৷ কিন্তু শত শত লোক বড়ো বড়ো তরোয়াল নিয়ে আক্রমণ করলে সে কেমন করে বাধা দেবে? যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়ে একসময়ে সে ঢলে পড়ল৷
মানুষভাই অনেক কাঁদল৷ তারপর একশিঙা যেমন বলেছিল, তেমনি করে তার শরীর টুকরো টুকরো করে কলসিতে কলসিতে ভরল৷ সেগুলো নিয়ে সে বসে থাকল৷
তারপর রাজা তাঁর ছেলেদের বললেন, ‘এবারে যাও! সৈন্যসামন্ত নিয়ে ওই রাজ্য ধ্বংস করে আমার মেয়েকে নিয়ে এসো৷ তারপর ছেলেটাকে তাড়িয়ে দাও৷’
মানুষভাই তো সারি সারি কলসি নিয়ে বসে আছে৷ যেমনি দেখেছে যে, রাজার সৈন্যরা আসছে, অমনি ও কলসির ঢাকনা খুলে দিয়েছে৷ সঙ্গেসঙ্গে কলসি থেকে বেরিয়ে এল লক্ষ লক্ষ মৌমাছি, ভিমরুল, বোলতা৷ তারা রাজার সৈন্যদের ছেঁকে ধরল একেবারে৷ কামড়ে ঝালাপালা হয়ে সৈন্যরা দৌড়োল বনের দিকে৷
ও বাবা! বাঘভাই তার বাঘসৈন্যদের নিয়ে সেখানে তৈরি৷ সৈন্যরা দৌড়োল জলের দিকে৷ সাপভাই তার সাপদের নিয়ে তৈরি৷
সৈন্যরা ফিরে এসে মানুষভাইয়ের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল৷ বোলতার কামড়ে মুখ ফুলিয়ে রাজামশাই এসে তার মুকুটটি খুলে মাটিতে রাখলেন৷ বললেন, ‘বার বার তোমাকে হারাতে গিয়েছি৷ বার বার আমারই হার হয়েছে৷ নির্দোষীকে কষ্ট দিতে গেলে এমনি শাস্তিই পেতে হয়৷ নাও, এ মুকুট তুমিই পরো৷ বাকি রাজ্যও তুমিই নাও৷’
মানুষভাই এখন মস্ত বড়ো রাজ্যের রাজা হয়ে গেল৷ বাঘভাই, সাপভাই আর পাখি-মা, সবাই এসে তাকে আশীর্বাদ করে গেল৷ সে রাজ্যে সবাই পরম সুখে বাস করতে লাগল৷
