গল্প
উপন্যাস
জীবনী

মানিক দুলের বন্ধু – মহাশ্বেতা দেবী

মানিক দুলের বন্ধু

মানিকের চোখ থেকে ঘুম তখনও যায়নি, মানিকের মার চিলচিৎকারে পাখপাখালিও জেগে উঠল৷ কী হয়েছে? ডাকাত পড়েছে? না অন্য কিছু?

‘চার-চারটে ছেলে থেক্যে লাভ কী? সড়কি, টেঁটা, তিরধনুক, কী নেই ঘরে? আমার এমন মেটেআলুর বন! সব খুঁড়েতেড়ে খায়্যে গিছে দাঁতালটা? কবে থেকে বলছি দুর্দান্ত দাঁতাল! ওটা বরা নয়, রাক্ষস! মার উটোকে৷ তা মারবে কেন? চারটেই তো অমনিষ্য৷’

‘অমনিষ্য’ শুনে মানিকের হাসি পেল৷ মা রাগলে অমন বড়ো বড়ো কথা বলে বটে৷ সেদিন রামের পিসি সর্ষের তেল ধার করতে এসেছিল৷ মাকে খুশি করার জন্যে যেই বলেছে, ‘তোর মতো ভাগ্যি কার বউ? পাঁচ ছেলে যেন পাঁচটি অত্ন বললে হয়৷ কী গলার জোর, কী হাঁকুড়ি, আহা দেকতে যেমন দশানন!’ অমনি মা বলল, ‘পাঁচটি অত্ন, না চখে ছানি পড়েছে তুমার? চারটে ছেলে মানুষ না কি? দেখতে নরাকার৷ আসলে ভুস্যি! আর মানিকটো? উটো আমার গলার কাঁটা বললে হয়!’

‘ছি বউ, অমন কথা বলতে নাই৷’

‘দুলে বাগদির ঘরে অমন ছেলে জন্মায় কেনে বলতে পার? না লাঠি, না সড়কি, তোর দাদারা লাঠি ঘুর্যে গোবর সিংগির খাজনা লুটতে গেছে, কালীনাচ লেচ্যে চাল, নারকেল, কাপড় আনে, রুপোর আধুলি৷ তুই? তুই জানিস বনেবাদাড়ে ঘুরতে৷’

‘পাঁচটো আঙুল কি সমান হয়?’

‘সব ক-টা অমনিষ্য৷’

‘কী বললি বউ?’

‘অমনিষ্য! কথা বুঝ না?’

‘তোর মতো কতা আমরা জানি?’

হ্যাঁ৷ মা চারটি কথা জানে বটে৷ মানিকের মামাবাড়ি সৈদাবাদের ওপারে কুঞ্জঘাটা৷ সেখানে নাকি মহারাজ নন্দকুমার এত এত বামুন পণ্ডিত এনে বসত করিয়েছে৷ সবাই টুলো পণ্ডিত৷ অনেক মন্তর, শোলোক জানে৷ মা দিদিমার সঙ্গে বামুনদের তালপাতা জোগান দিত৷

তালপাতা জলে ভিজিয়ে সেদ্ধ করে পাট পাট করে তবে লেখার যুগ্যি হয়৷ দুলে বাগদি ছাড়া তালপাতা জোগাবে কে? জোগাত আর বামুনদের কথাবার্তা শুনত৷ শুনতে শুনতে মা অমনি বড়ো বড়ো কথা শিখেছে৷ অমনিষ্য, পঙ্গপাল, অরন্ধন, গভ্যস্রাব, অম্রেত, কত কী! এই বনের কানাচে ঘোনাপাড়া গ্রামে মানিকের মায়ের সম্মান খুব৷ মা স্বচক্ষে মহারাজা নন্দকুমারকে দেখেছে৷ কুঞ্জঘাটা রাজবাড়ির রথ, দুর্গাপুজো দেখেছে, গঙ্গার বুকে নৌকো বোঝাই সেপাই-লশকর দেখেছে৷ মায়ের মতো কে আছে?

সে জন্যে মাকে সবাই খাতির করে৷ আর বলতে কী!

মানিকের দাদারা মাঝে মাঝে অধর সিংগির লেঠেলগিরি করে, মাঝে মাঝে গোবর সিংগির৷ গোবরের নাম গোবর্ধন, কিন্তু মা বলে গোবর সিংগি৷ যখন এর লেঠেল, তখন ওর বাগান, পুকুর, হাটের সওদা লুঠ করে৷ যখন ওর লেঠেল, তখন এর৷ সেজন্যে মানিকের মায়ের ঘরে এটা-সেটা থাকত৷ মা অবশ্য ধারও দেয় পাড়াপড়শিকে৷ রামের পিসিকে এক ঘটি তেল দিয়েছিল মা৷ বলেছিল, ‘তেল নাম বুঝি৷’

‘আর থাকে বউ? হুঁদো হুমকো তিন ছেলে কোত্থেকে লাঠি আনছে তো আনছেই৷ তেল মাখাচ্ছে তো মাখাচ্ছেই৷ জিজ্ঞেস করলে কথা ভাঙে না মোটে৷’

‘ভাঙবে কেনে? একোর চ্যালা হয়েছে না সব ক-টা?’

‘চলি বউ৷ এক খালুই কই মাছ রেখে গেলাম, খেয়ো৷ যেমন, তেমন নয়৷ বাদার কই!’

রামের পিসি চলে গেলে মানিকের মা বলেছিল, ‘মাথায় এক ছিটো বুদ্ধি নাই! অযচ্ছল কই মাগুর হাওড়ে, মানিক আনছে তো আনছেই৷ আমার বাড়ি কেউ মাছ দেয়?’

কিন্তু আজ সকালে মা খেপল কেন?

মানিক চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল৷

‘কী হয়েছে মা?’

‘সর্বনাশ করে গেছে দাঁতালটা৷’

‘ইশশ!’

‘তোর দাদারা কুথাক?’

‘তেতপ্পর রাতে ফিরেছে তো, ঘুমোচ্ছে৷’

‘বটে! কাল মাচাঙে বসার কথা ছিল না একো আর দুকোর? যা! সব

ক-টাকে তোল৷ তোরে দে হবে নাই৷ আমি ঝ্যাঁটা মেরে বাড়িতে সবগুলানকে তুলছি৷’

মানিক সরে পড়ল বাঁকে বসানো দুটো মেটে কলসি নিয়ে৷

‘তুই যাচ্ছিস কুথাক?’

‘বড়ো পুকুরের জল নে আসি, ভাত বসাবি না? খেতেও তো জল লাগবে৷’

যেতে যেতেই মানিক শুনতে পেল, মা চেঁচাচ্ছে, ‘উঠলি? মুখপোড়া অমনিষ্য সব! কুনো কাজে মন নি! বনের ধারে ঘর, কত সোবধানে থাকবি, না কোনোরকম হুঁশপব্য নাই গা? শিয়াল এসে হাঁস ধরছে, ময়াল সাপে ছাগল খাচ্ছে, দাঁতাল এসে ভুস্যিনাশ করছে, সব আমার ঘাড়ে? আমিও পবন লেঠেলের মেয়ে, তোদের ঠ্যাং ভেঙে রেখে দিব…’

বড়ো পুকুর বলতে পাশের বনের মাঝে পুকুর৷ ছিল, সিংগিদেরই কোনো শরিকের বাড়ি ছিল, বাগান ছিল, পুকুর ছিল৷ বর্গির হাঙ্গামার সময়ে, বর্গিরা তো লুটপাট খুনজখম করত, ঘরে আগুন দিত৷ হাঙ্গামা শুরু হয় অনেক আগে৷ মানিক তখনও জন্মায়নি৷ সে সময়েই দেশঘর ছেড়ে ওরা পালিয়ে যায়৷

কোথায় কোন পদ্মাপারে চলে গেছে সব! বর্গির হাঙ্গামার কথা মা বলে না, ঠাগমা বলে৷ ঠাগমার বয়স অনেক৷ রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখেছে যে, তার বয়স হবে না? ছোটোবেলা মানিক বলত, ‘সত্যি, মা?’

‘কী সত্যি?’

মা খেজুরপাতার চেটা বুনতে বুনতে বলত৷ মা বসে থাকতে পারে না কোনোদিন৷ এই চ্যালা চ্যালা কাঠ চ্যালাবে, এই বড়ো বড়ো মাটির হাঁড়িতে ভাত রাঁধবে, মাটির কড়াইয়ে মাছ কাঁকড়ার বেন্নন, ধপাধপ কাচবে কাঁথা মাদুর আর যখন কোনো কাজ নেই, তখন খেজুর পাতার চেটা বুনবে পিদিমের আলোয়৷

ঠাগমা বলবে, ‘সেই সাতবছুরে খুকি আনলাম৷ পাঁচ বেটা এক বেটির মা হলি, কপাল পুড়ল, তখনে নয় ভেস্যে ভেস্যে বেড়ালছি৷ আখুনও দু-দণ্ড বসতে জানিস না?’

‘না মা! বসে থাকলে আমার রঙ্গ যেমন রবশ হয়ে পড়ে৷’

‘এত খাটনি খাটলি?’

‘তুমি বা শোঁসা পাড়তে যেয়ে নাপ মেরে মাজা ভাঙলে কেন? নইলে তো একটু সাহায্য হত৷’

‘পেরথম ফলটা…ষাঁড়াতলায় দেব…’

‘নাও, এখনে ঘুমোও দেখি?’

‘তুই শুবি না?’

‘অমনিষ্যগুলো আসুক?’

মানিক বলবে, ‘হ্যাঁ মা, ঠাগমা রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখেছে? সত্যি?’

‘ই কী ছেলে রে! ঠাগমার কথায় অবিশ্বাসী? এখনে ঘুমোবি না মানিক! দোরআগড় দিতে হবেক৷’

‘বুঁচি যে ঘুমোচ্ছে?’

‘কতখন জেগে থাকতে পারে? ছাগল তুলল, হাঁস তুলল, পিদিম জ্বালল, মশালে কাঁটালআটা জড়াল, আর পারে? ঠাগমা বলবে, বউগুলো নে আয়৷ বুঁচিকে শউর ঘর পাটা!’

‘তুমি ঘুমোবে? না কি দক্তাপাতা মুখে দিউনি আজ?’

‘দিইছি, ঘুমোই৷’

ব্যস, বুঁচির পাশে ঠাগমা শুয়ে পড়ে, আর সঙ্গেসঙ্গে নাকডাকানি কী!

না, মানিকদের অনেকগুলো ঘর নেই৷ বনের বাঁশ কেটে, মাটি কেটে এক উঠোনে পাশাপাশি দুটো বড়ো বড়ো ঘর৷ একটা ঘরে উঁচু মাচাঙে, মা, ঠাগমা আর বুঁচি শোয়৷ মাচাঙের নীচে চারটে ছাগল বাঁধা থাকে, কোনে থাকে বাঁশের খাঁচি চাপা হাঁসগুলো৷ কাঁঠাল কাঠের ভারী দরজা বন্ধ করলেই ঘরের ভেতরটা কী নিশ্চিন্ত, কী নিশ্চিন্ত! মানিকরা পাঁচ ভাই ঘুমোয় পাশের ঘরে৷ ঘরের ওপর পাটাতনে শুধু বর্শা, বল্লম, দা৷ ওদের মাচাঙের নীচে সর্ষে, কলাই, চাল৷

মার ঘরে দেয়ালে বাঁশের গজালে ঝোলে বাবার মাথার মাথাল, বাবার হাতের সড়কি, আর ধনুক৷

বাবাকে মানিকের মনে পড়ে না৷ সে নাকি মস্ত শূরবীর মানুষ ছিল৷ পবন দুলে যখন হাঁকাড় মেরে তির ছুড়ত, বা সড়কি চালাত, বাঘ বল, ডাকাত বল, ভয়ে পালাত৷

বর্গির হাঙ্গামা, বর্গির হাঙ্গামা! সে সময়ে নাকি বাবা ছিল দুর্লভ রায়ের ডান হাত৷ দুর্লভ রায়ের এই কোঠাবাড়ি, ঘরের নীচে পাতালঘর, সুখবাড়ি আর মোহনপুর মৌজার খাজনা বাবার পাহারায় পাতালঘরের তৌজিখানায় রাখা হত৷ বাবা পেয়েছিল চাকরান জমি, বছরে দু-মোহর মাইনে, পায়ের মশমশে জুতো, গায়ের পিরান, আর সম্বচ্ছরের চাল৷ বর্গিরা যে বছর প্রথম মুর্শিদাবাদ ঢোকে, তখন দুর্লভ রায় নবাবের ফৌজদার৷ তিনি লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকেন, পরিবার থাকে সুখবাড়িতে৷ বাবা, গঙ্গাকাকা, দুলে-বাগদি-ডোমরা সুখবাড়ি আর মোহনপুরে বর্গি ঠেকাত৷ দুলে-বাগদি-কাওরা-ডোম সব তো শূরবীরের জাত৷ সাধে কি মতি ডোম বল্লম নাচিয়ে কালীনাচ নাচে আর গায়, আগে ডোম, বাগে (পাশে) ডোম, পিছে ডোম সা-জে! ঢাঁই-মেগর-ঘাগর বা-জে! এদের মেটে বাড়ি, সে বাড়িতে তো বর্গির লোভ নেই৷ ওরা হানা দিত, ঘিরে ফেলত পাকা বাড়ি, বেটাছেলেদের বলত, যা আছে সব আনো-টাকা, সোনা, রুপো, স-ব! তা দুর্লভ রায়ের বাড়ি চার বার লুঠ হয়৷ গোয়াল পোড়ে, গোলা পোড়ে, চতুর্থবার বাবা বলেছিল, ‘মা জননী! আর তো পারা যায় না৷ জান বল, জান দেব৷ কিন্তু যা যাচ্ছে, তা তো ফেরাতে পারব না?’

ভীষণ, ভীষণ সময় সেটা৷ ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ কতবার যে বর্গিরা এল! রাঢ়ভূমি, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান ছেড়ে মানুষ পদ্মাপারের বঙ্গে, নয় গঙ্গাপারের দেশে৷ পরিত্যক্ত বাড়ি জঙ্গলে ঢাকল, দেবদেউলে সাপ-বাঘের আস্তানা, ধান খেত অনাবাদি পড়ে থাকে৷ তা দুর্লভ রায় যেবার ওড়িশার যুদ্ধে মারা গেলেন, সেবার দুর্লভ রায়ের বাড়ির সবাইকে বাবারা তুলে দিয়ে এল ভাওয়ালী নৌকোয়৷ ‘যাও, গঙ্গাপারে যাও, বেঁচেবর্তে থাকো৷ কর্তার বংশটা থাকুক৷ ভিটের জিম্মাদার পবন দুলে৷’

ওই ভিটে কেন, বাড়িও রক্ষা করতে চেয়েছিল বাবারা৷ তাই বর্গিরা এসে পড়লে বাবা বলেছিল, ‘বাড়িতে মেয়েরা নেই, ছোটো ছেলে-মেয়ে নেই৷ আছি আমরা৷ লড়াই করে মারলে তবে ঢুকতে পাবে৷’

বর্গিরা একশো দু-শো,-বাবারা বিশ জন৷ কী ভীষণ লড়াই যে হয়েছিল ঘোড়সওয়ার বর্গি আর পায়ে হাঁটা পবনদের! তির উড়ছিল, বর্শাবল্লম ছুটছিল, ওরা বলছিল, ‘হর হর মহাদেও!’ বাবারা বলছিল, ‘জয় কালী!’

সেই যুদ্ধেই অনেকজনকে মেরে তবে বাবা মারা যায়৷ গঙ্গারামকাকা, রামের জ্যাঠা, মতি বাগদি, ধনুর্ধারী বাগদি, অঙ্গদ কাওরা, এরা মরে গেছে মনে করে বর্গিরা বাড়িতে সোনাদানা না পেয়ে চলে যায়৷

গঙ্গারাম কাকারা বাবাদের টেনে টেনে নিয়ে বাড়ির কাছারি ঘরে তুলে ঘরে আগুন দেয়৷ বলে, ‘সগ্যে চলে যাও! লড়াই করে মরলে সগ্যেই যায়৷ কত্তাকে বলবে, তার বংশ বেঁচ্যে আছে৷’

বাবার পেতলের মাথাল, সড়কি আর ধনুকটা এনে মার সামনে নামিয়ে রেখেছিল গঙ্গরাম কাকারা৷ মা মুখে আঁচল গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল৷

ঠাগমা হাহাকার করে কেঁদেছিল৷ সুখবাড়ির ঘরে ঘরে কান্না, ঘরে ঘরে কান্না৷ গঙ্গারাম কাকা বলেছিল, ‘সুখবাড়িতে আর সুখ নেই গো! এবারে গাঁ-বসত তুলতে হবে৷’

শুনে ঘোনাবুড়ো বলেছিল, ‘সে তো হবেই৷ সুখবাড়ি যারে বলছ, সে তো ছিল ফকির চক৷ তার আগে ছিল বিজুবন৷ তাই তো হয়৷ আজ বিজুবন, কাল গেরাম, পরশু শোঁসান৷ আবার নতুন গেরাম হয়৷’

সে এক সময় গেছে বটে! আলিবর্দি যুদ্ধ করে করে বাংলার নবাব হলেন, আর নাগপুর থেকে মারাঠারা এল চৌথ চাইতে৷ বাবা মাকে বলেছিল, ‘দিল্লিতে বড়ো বাদশা থাকে৷ তার কাছে বর্গিদের রাজা নাকি অনেক টাকা চেইছিল৷ সে এক গজকচ্ছপ বুড়ো বটে! বলে দিল, টাকা হেথা কোথা? যাও বাংলা মুলুক৷ সেখেনে আলিবর্দি মহা সুখে রাজত্যি করছে৷ সে জনা দিল্লিতে টাকা পাঠায়, তবে আমার চলে৷ দেখো! খাজনার সিকি ভাগ, চৌথ তার কাছে যেয়ে নাও গা! সেই থেকেই বর্গিরা এসে মারকাট-লুটপাট শুরু করল, আর আলিবর্দিও নাকি আজ এ দেশ, কাল সে দেশ, তাদের সঙ্গে লড়াই করতে থাকল৷’

বাবা বলেছিল, ‘যেগুলো ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে নে মোটে, শুকনো ছোলা চিব্যে যুদ্ধ করে, সেগুলোই বর্গি৷ বড়ো নদী দেখলে ভয় পায়৷ ঘোড়া যে নদী পেরুতে পারে তেমন নদী পেরোয়, ঘোড়ার পিঠ ছেড়ে তো নামবে না৷ সড়কি চাল্যে দিলাম, বুক ফুঁড়ে পিঠ দে বেরুল, ব্যাটা মরল ঘোড়ার গলা আঁকড়ে৷ বুঝেছ?’

সে সময়ের কথা মার কাছে মানিক এত শুনেছে, এত শুনেছে যে চোখ বুজে গড়গড়িয়ে বলে যেতে পারে৷

তখনই নাকি দেশ ছেড়ে অগণন মানুষ পদ্মা পেরিয়ে পালায় কোন দেশ, কে জানে! আরেক দল পালায় কলকেতা-সুতোনুটি৷ সেথা মস্ত নদী! ঘোড়ার পিঠে চেপে পেরোবে এত সুখ নেই৷

ঠাগমা বলে, ‘আমাদের সোনার রাজ্য শোঁসান হয়ে গিছল রে! জগৎরে কলকেতা নে গিছল দুল্লভের দাদা মাতঙ্গ আয়৷ জগৎ থাকতে পারেনি৷ বলে ও বাবা! শওর যদি দেকতে হয়, তবে মুশশিদাবাদের মতো শওর থাকতে হোথা থাকবে কেন? সেখানে নাকি সায়েবরা ঘোড়ায় চেপে ঘোরে, এই বড়ো বড়ো বাজার, আর বর্গির ভয়ে যারা ধনীমানী পালিয়ে আসছে, তারা শুধু কাঠের ধোঁ দিয়ে ইট পোড়াচ্ছে আর কোঠাবাড়ি তুলছে৷ তা বাবারা কয়েকজন শূরবীর মানুষই মরে গেল যখন, দুলে-বাগদি-ডোম এরা কী ভরসায় সুখপাড়ায় থাকত? সে সময়েই ঘোনা বাগদি, বাগদি পাড়ার সবচেয়ে বুড়ো আর জ্ঞানীগুণী লোক বলল, চ! আমরা নতুন গেরাম পত্তন করি৷’

ঘোনা বাগদির নাম ছিল ঘনশ্যাম, কিন্তু সবাই বলত ঘোনাদাদা! ঘোনাকাকা! ঘোনাঠাউরদা, ঘোনাকর্তা! ঘোনা বাগদির নাকি অনেক বিদ্যে জানা ছিল৷ সে অনাবৃষ্টিতে মেঘ ডেকে জল নামাত, অতিবৃষ্টিতে মেঘদের পাঠিয়ে দিত পুবে পশ্চিমে৷ সাপ কাটলে রোগী সারাত, গোরু হারালে গুনে গেঁথে এনে দিত৷ জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে গাছপালার সঙ্গে কথা কইত৷ মানিকের দাদারা দেখেছে, বর্ষায় পুকুর ভেসেছে তো ঘোনা বাগদি হাঁটু জলে একটা ডোঙা ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷

‘অ ঠাউরদা! নিমনিমে আঁধার যে!’

‘চুপ কর মাছ ডাকছি৷’

‘ডাকলে আসবে?’

‘তোর বাপ তো লাই, গঙ্গারামরে শুধা গে যা! মাছ ডাকলে না এসে

পারে?’

সত্যি সত্যি মাছ সার বেঁধে আসছে, আর লাফ দিয়ে ডিঙিতে পড়ছে৷

মানিক যখন দেখেছে, ঘোনাঠাউরদা তখন খুব বড়ো৷ বুকের লোম, মাথার চুল, চোখের ভুরু, সব সাদা৷ তখনও একটা গোটা কাঁঠাল খায়, এক পালি চালের ভাত খায় দুপুরে, কাঁঠালবিচি পোড়া, তেল-নুন-লঙ্কা দিয়ে৷

মা তো বুঁচির বিয়ের কথা ওকেই জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল৷ গ্রামে এমন মানীগুণী লোক আছে, যেন বটবৃক্ষের মতো সকলকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে৷ বিয়ের পরামশ্য নিতে যাবে, টাটকা ভাজা মুড়ি, এক খালুই মাছ, একছড়া কলা আর এক কলসি গুড় নিয়ে গিয়েছিল মা৷ গাঁয়ের শিউলিরা হচ্ছে গাছি৷ ওরা তাল-খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে পাটালি বানায়৷ তালের পাটালি হল ‘লবাত’ আর খেজুরের পাটালি হল ‘পাটালি’৷ সব শুনে মেনে ঘোনাবুড়ো বলল, ‘ছেলের নাম দুজ্জোধন?’

‘হ্যাঁ বাবা!’

‘বাপের নাম সুধন্য? সোনাডাঙায় ঘর?’

‘হ্যাঁ বাবা৷’

‘বলি, তারা আল্য, না তুই গেলি?’

‘তারা আল্য৷’

‘কী দেবে বলছে?’

‘উপোর নত, বালা, জসম, মুড়কিমালা!’

‘তা আর দিবে নাই? দুল্যভ রায়ের যত বাসনকোসন পোঁতা ছিল, সব সরিয়েছে সুধন্য আর তার বাপ কালা৷ সরিয়ে খাগড়ায় বেচেছে৷ মাহাপাপী, মাহাপাপী! দুল্যভ রায়ের বউ ভাবছে, বাসনপত্তর নিয়ে এল বলে, এরা তো এদিকে গিয়ে সোনাডাঙা উঠেছে৷ এখনই নাকি মহা মাতব্বর হয়েছে সুধন্য৷ মাথায় তালপাতার ছাতা, হাঁটু অব্দি ধুতি, গালে পান চিবোয় আর হাটে যেয়ে তোলা ওঠায়৷’

‘ও মা! তবে আমার দোরে হাঁটছে কেনে?’

‘পবনের কোলপোঁছা মেয়ে বলে কথা! তারে বউ করে আনলে মান পাবে সমাজে৷ পবনের বিটি!’

‘তাহলে?’

‘কেন, তালুটের নয়ন দুলে? শূরবীর মানুষ! বাঁশ কাটে, বেচে, চাকরান জমি চষে, তিনটে ছেলেই নবাবের লেঠেল হবে৷ হোথা মেয়ে দাও গা!’

নয়ন দুলের ছেলে গণেশের সঙ্গেই লক্ষ্মীর বিয়ে হল৷ ঘোনাবুড়ো ঘোনাপাড়ার পত্তন করেছিল তো! পুব-দক্ষিণে হাঁটতে হাঁটতে এখানে পৌঁছে ষাঁড়াতলায় শাবল পুঁতেছিল৷ বলেছিল, গাঁয়ের ঠাকুর গাঁয়ে ফেলে সব পালিয়েছে গো!’

‘কোথায় ঠাকুর?’

‘ঠিক বলিছি৷ সকালে দেখিস!’

সকালে ষাঁড়াতলা খুঁড়ে আহা কী সুন্দর ঠাকুর বেরোল৷ পাথরপাটায় মা ষষ্ঠী, কোলে ছেলে, কাঁখে ছেলে, পাশে একটি বেড়াল মুখে মাছ ধরে আকাশপানে চেয়ে আছে৷

সেই ঠাকুরই ষাঁড়াতলায় পিতিষ্ঠে হলেন৷ আর সকালে দেখা গেল, গ্রাম পত্তনের এমন জায়গা হয় না৷ চার-চারটে পুকুর, আম-জাম-কাঁঠাল-বাতাপি-পেয়ারা-কুল, নানা নিধি ফলের গাছ৷ বাঁশঝাড় অনেকখানি জুড়ে, এক দিকে কানাইয়ের বিল, তাতে পানকৌড়ি আর মাছরাঙা৷ পুবদিকে ভাঙাচোরা বাড়ি৷ ঘোনাবুড়ো বলেছিল, কোথা হতে-বা এল বর্গি, জাগ্যত গাঁ শোঁসান হচ্ছে, মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে কোথা কোথা৷ আবার দেখো! আমরা হেথা নতুন বসত কত্তেছি৷’

মানিকের ঠাগমা বলেছিল, ‘এ কে করাচ্ছে, অ ঘোনাদাদা!’ হ্যাঁ, ঘোনাকে ঘোনা বলে ডাকেনি কেউ৷ জ্ঞানীগুণী মানুষ একটা, যেন গাঁয়ের মাথা হবে বলেই জন্মেছিল৷

‘কে জানে কে করাচ্ছে? চত্তির মাসে যখন উলটোপালটা বাতাস বয়, কে বওয়ায়? কোথাও চত্তির মাস লেগেছে গো পবনের মা! বর্গিদের টেনে আনছে এখানে, আবার হেথাকার মানুষকে কোথায় পাঠাচ্ছে, অত ভেবে কী করব? হেথাই ঘর বাঁধি৷ কেমন বিজুবন হয়ে রয়েছে, আহা সব ছেড়ে গেছে গো!’

‘ওই যে ঘর দেখা যায়?’

‘না না, তারা ছিল মৌজামালিক নিশ্চয়৷ নইলে ইটের দালান দিত? পরের ঘরে বাস করতে নেই গো! অমন সাধের ঘরে থাকতে পারেনি৷ হোথা গেলে তাদের অভিশাপ লাগবে৷ আমরা দুলে-বাগদি-ডোম-কাওরা বই তো নয়৷ যেমন ঘর ছেড়ে এসেছি, তেমন ঘর বাঁধব৷ ইটের দালান দেখলে বর্গি আসবে৷’

‘হেথা বর্গি আসবে না?’

‘এই বিজুবনে? আমাদের কাছে পাবে কী?’

জোয়ান ছেলেরা বলেছিল, ‘কী পাবে? লেঠেলের কাছে লাঠির ঘা, বর্শেলের কাছে বর্শার ঘা৷ ধানুকির কাছে তির? বকিস না পিসি, আমাদের কাছে পোঁটলা পোঁটলা কড়িও লাই, ঘরে সোনাদানাও লাই৷’

সেই থেকে গ্রাম পত্তন৷

তা ঘোনাপাড়া নাম আপনা আপনি হল৷ নতুন গাঁ পত্তন হয়েছে শুনে ক্রমে ক্রমে লোক এল আরও৷ বর্গির ভয়ে তখন কোথাকার মানুষ কোথা ছিটকে পড়ছে কে হিসেব রাখে! কোথা মানকরা, কোথা সারগাছি, কোথা আবুইডাঙা, কোথা খালুড়ি, সব জায়গা থেকে ক্রমে ক্রমে লোকজন চলে এল৷ সবাই তো ঘোনাবুড়োর কাছেই আসত৷

‘খানিক জায়গা দেন আজ্ঞা৷ বগ্যির ভয়ে ঘুরে মরছি, আর মরে ঘুরছি৷’

‘জায়গা দেবার আমি কে?’

‘কার মৌজা জানি না কিছু৷’

‘এ একটা কথা বটে, মৌজা কার! আলিবর্দি যদি বাংলার নবাব হয়, তবে সকলি তো তার?’

‘হ্যাঁ কত্তা৷’

‘সব যদি তার হবে, তবে নাতিকে পগগে বেঁধে সে ঘুরে মরছিল কেন? আলিবর্দি-যার মৌজায় নবাব, সে জনা আকাশে বসে সব দেখছে৷ তার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে, যাও, নির্ভয়ে বসত করগা! তবে বাবু এই কানাইয়ের বিল আর বাঁশবনটা ছেড়ে৷’

ঘোনাবুড়োর নামেই গ্রাম ঘোনাপাড়া হল৷

যতকাল ছিল, সকলের মাথা হয়ে বাস করে গেছে৷ দোতলা মেটে ঘর ওরই ছিল৷ সকালে গরম ভাত রাঁধত, বিকেলে জল ঢেলে তাই খেত৷

কার বিয়ে হবে, কে মরেছে, কার গোরুর চোখ উলটে গেছে, কাকে সাপে কাটল, কোথায় বাঘ বেরিয়েছে, সব কাজে ঘোনার পরামর্শ৷

ষাঁড়াতলায় ষষ্ঠীপাটা তো গ্রামের রক্ষয়িত্রী দেবী হয়ে গেলেন৷ বিকেলে ঘোনাবুড়ো সেখানেই বসত৷ পাঁচজনের খবর শুধোত৷ বসে থাকত যেন রাজা৷

মরে গেছে এই গত ফাল্গুনে৷ গঙ্গারাম, মুকুন্দ, হাড়িরাম, পাঁচজাতের প্রৌঢ়রা এসে বসেছিল৷ মরণকালে ঘোনাবুড়ো বলে গেল, ‘আবার বর্গি আসবে নিঘঘাত৷ আমি সব মনে জানছি৷’

‘কোত হতে? অ কাকা!’

‘অনে-ক ধুর হতে৷’

‘সেই বগ্যিরা?’

‘নতুন বর্গি!’

‘কী হবে?’

‘সব শোঁসান হয়ে যাবে ক্রেমে ক্রেমে৷’

‘কী দেখছ চোখ ঘুর্যে?’

‘চোত থেকে জষ্টি জলছত্তর দিবি আমার নামে, আর, আর হলায়গলায় থাকবি, গাঁয়ে যেন সব একত্তরে থাকে, আর আমার কানাইয়ের বিলের ওপারে শোঁসানে দিবি৷’ এত কথা বলে বুড়ো মরে গেল৷

মানিকের ঠাগমাই কাঁদল বেশি৷ ‘বউ নেই, ব্যাটা নেই, বর্গির হাঙ্গামার সময়ে মেয়ে-জামাই কোথা শিউড়ি না কোথা পালিয়ে গেছে, কেমন জ্ঞানীমানী লোক দেখ৷ ভুগল না, ভোগাল না৷ আহা, ওই তো আমারে রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখিয়েছিল গো! আমি তখন লতুন বউ৷ সবে ঘর কত্তে এসেছি৷’

আগে তো মানিক বিশ্বাসই করত না যে ঠাগমা রাম-রাবণের যুদ্ধ দেখতে পারে৷ মানিকের বন্ধুও বিশ্বাস করত না৷ এখন দু-জনেই বিশ্বাস করে৷

কেন করবে না বল?

ঠাগমার বাপের বাড়ি জেমোকাঁদির ওপারে৷ সেখানে ছিল আকুশির রাজা ত্রিলোচন রায়ের হাতিশাল৷ ত্রিলোচন রায় ছিল মহা শূরবীর মানুষ৷ নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর দরকারে ত্রিলোচন রায় হাতি পাঠাতেন৷ সে আস্তাবল, হাতির স্নান করবার, জল খাবার আকুশির বিল, সব গঙ্গার ভাঙনে না পদ্মার ভাঙনে চলে গেছে তা ঠাগমা জানে না৷

ত্রিলোচন রায় বিজয়াদশমীর দিন হাতির লড়াই করাতেন৷ দেখতেন মাহুতরা কেমন শেখাচ্ছে হাতিদের৷ অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আর সবাই দেখত হাতির লড়াই৷

একটা হাতির নাম ভীম, একটার নাম দুজ্জোধন৷ একটার নাম কালীনাগ, একটার নাম কেষ্ট৷ একটার নাম রাম, একটার নাম রাবণ৷

তাই যদি হয়, তাহলে ঠাগমা দেখবে না রাম-রাবণের যুদ্ধ? দেখবে না কেমন করে দু-জনে লড়ে?

এ কথাই মানিক ওর বন্ধুকে বলেছিল৷ আর বন্ধুর সে কী হাসি৷ হেসে কুটিপাটি যাকে বলে৷ সেদিন বন্ধু ওকে একটা আশ্চর্য জিনিস খেতে দিয়েছিল৷

‘এমন মিষ্টি মিষ্টি, কী গো?’

‘খোবানি, তুমি খাওনি কখনো?’

‘কখখোন খাইনি৷’

‘সকালে কী খেয়েছ?’

‘কেন, জল দেয়া ভাত?’

‘খেতে ভালো লাগে?’

‘খু-ব৷ মা যদি একটু আচার দেয়…’

‘মা খেতে দেন বুঝি?’

‘আর কে দিবে?’

বন্ধু দিঘির জলে ছোট্ট একটা ঢিল ছুড়ে বলেছিল, ‘আমাকে আমার মা কোনোদিন খেতে দেয়নি৷ কোনোদিন না৷’

‘তোমার মা লাই বুঝি?’

বন্ধুর চোখে অমনি ঘোমটা নেমে এসেছিল যেন৷ যেন নিজেকে আড়ালে ঢেকে নিয়ে বন্ধু বলেছিল, ‘আছে, আবার নেইও৷’

‘সে আবার কী?’

‘সে তুমি বুঝবে না৷ বোঝার দরকার কী? আর, কত কম দেখা হয় আমাদের, কত কম কথা হয়, এসব কথা বলে কী হবে?’

বন্ধুর কথা ভাবতে ভাবতে মানিক বড়োপুকুরের কাচের মতো জল ভরল কলসিতে৷ মানিক শুনেছে, এ পুকুর যাদের ছিল, দেশ ছেড়ে পালাবার কালে তারা নাকি এখানে ঠাকুরদেবতার মূর্তি, পুজোর বাসন সব ডুবিয়ে রেখে গিয়েছিল৷

দাদারা একবার বলেছিল, ‘ডুব দে হাঁড়িগুলো তুলব?’ মা বলেছিল, ‘তা আর তুলবে না? একে খাটনির অন্ত লাই, তাতে পেতলের হাঁড়ির কালি তুলে মরি৷ আর, পরের দেব্য নিবি বা কেন?’

‘না, তুমিই তো বল, নলেনকাকা আজকাল তেমন হাঁড়ি তিজেল গড়ে না৷’

‘বুঝেছি৷ যা, গাছের গুঁড়িটা চ্যালা করে ফেল একো৷ দুকো আর তেনো তালপাত কেটে ঘরের ছামনি সারবি৷ পেঁচো দু-সারে আগড় বাঁধবি৷ কী বাপের কী ছেলে! সে আগড় বেঁধেছে তো দাঁতাল হেলাতে পারেনি৷ তোরা অমনিষ্যি, কুপুত্তুর!’

খুব যত্ন করে জল ভরল মানিক৷ মানিক ছাড়া কেউ বড়োপুকুরে আসে না কষ্ট করে৷ আসবে কেন বল? ষাঁড়াতলার ষষ্ঠীপুকুরের জলই খায় সবাই৷ ও পুকুরে কাপড় কাচা, বাসন মাজা, স্নান করা নিষেধ৷

চত্তির মাসে দু-কোশ দূরে শাটতলার পথে যে জলছত্তর দিল ঘোনাপাড়ার লোকরা, সেও তো এখান থেকেই জল নিয়ে৷ একা মানিক বড়োপুকুরে আসে৷

একা একা বনবাদাড়ে ঘুরতে তার ভালো লাগে, গাছপালার সঙ্গে কথা কইতে ভালো লাগে৷

দাদাদের মতো বর্শেল, লেঠেল হতে ভালো লাগে না৷ এমনি একা একা ঘুরত বলেই তো মানিক তার বন্ধুকে পেয়েছিল! এখনও ভাবলে বিশ্বাস হয় না৷

বন্ধুর কথা কেউ জানে না, জানবেও না৷ বন্ধুত্বের শর্তটাই এরকম৷ সেজন্যেই মানিকের ভালো লাগে এত৷ কেউ জানে না, কেউ জানে না৷ তার এমন একজন বন্ধু আছে, যে ঘোনাপাড়া বল, তালুট বল, সরাটি বল, কোনো জায়গায় কোনো মানুষের মতো নয়৷

অবশ্য মানিকের বিশ্বভুবনটাই একটুখানি৷ ঘোনাপাড়া ছেড়ে কোথাও যায়ওনি মানিক৷ যেতই বা কী করে? জন্ম থেকেই ওর একটা পা সরু, দুর্বল৷ যে জন্যে ছোটোবেলা থেকে আজ এগারো বছর বয়স অব্দি মানিক অন্য ছেলেদের সঙ্গে সাঁতরে কানাইয়ের বিলের অনেকখানি গিয়ে পদ্মফুল তোলেনি৷ বর্ষার জলে ঝাঁপাঝাঁপি করেনি৷ গাছে উঠে আম পাড়েনি৷ পাখির ডিম চুরি করেনি৷

কালীপুজোর এক মাস আগে থেকে ছেলেরা, জোয়ানরা কালীনাচ নাচতে যায়, চাল-কড়ি-কুমড়ো তোলে৷ মানিকের দাদাদের কালীনাচের দলের এতই নাম, যে দূরে দূরেও ডাকে৷ একবার নাকি ওরা কুঞ্জঘাটা গিয়ে নন্দকুমারের কাছারিতে নাচ দেখাবে৷ এমন আশা রাখে৷

যায়নি, কোনোদিন যায়নি মানিক কালীনাচ নাচতে৷

শূন্যে লাফ মেরে হাতে তালি বাজিয়ে গায়নি-

‘লাচ মা লাচো গো রণকালী!

হেই মা তুমি লাচো শোঁসানে মশানে

লেচে লেচে দেখাও হে মা চতুরালি!’

কেমন করে নাচত? তার কি পা আছে?

চৈত্র মাসে রুদ্রদেবের উৎসব দেখতে যায়নি সরাটির পাশে গজালগাছায়৷

দাদা বলেছে, ‘তুই যাবি সেথা? মনসাকে হাঁস বলি দেই মুণ্ডু ছিঁড়ে, দেখে পলাস৷ সেথা মড়ার খুলি নে লাচ, আগুন লাচ, মশাল নাচ, দেখল্যে পরে আটাশ খাবি৷ কোথাও যায়নি মানিক৷ মানিক সবসময়ে একলা৷ এখন তো ওর বয়সি ভোমা, সহদেব, ছিরে, জগা, সব ছেলেরা গুলতি দিয়ে পাখি মারে৷ জালে আঠা মাখিয়ে টিয়া ধরে, বেচতে যায় বেদেদের কাছে৷ ছিরে তো জ্যান্ত গোখরোর লেজ ধরে নিমেষে মাথার ওপর বোঁ বোঁ ঘুরিয়ে আছড়ে মারতে পারে, মানিক পারে না৷ মানিককে নিয়ে ওর মার কম ভাবনা ছিল? কোলের ছেলে মানিক, বাপ বলতে কিছু জানে না৷ মানিকের পরে পরেই বুঁচিটা জন্মাল৷ কেমন করে যত্ন করত মা? ঠাগমাই তেল মাখাত, ঝিনুকে দুধ খাওয়াত৷ কিন্তু ডান পা তো অমনি থেকে গেল৷

শেষে সরাটিতে মাটির ঘোড়া মানত করে এল মানিকের মা৷ আর পুজো দিতে নিয়ে গেল মানিককে৷ গঙ্গারামকাকার গোরুর গাড়ি এসেছিল৷ মা, মানিক, ঠাগমা, বুঁচি, সবাই গেল৷ রামের পিসিও সঙ্গ ধরল৷

কী সুন্দর দিনটা ছিল! বিষ্টি নেই, অথচ রোদ কড়া নয়৷ আকাশটা যেন ইচ্ছে করে সূয্যি ঠাকুরকে বলেছে, আজ তেতপ্পর তাত ঢেলো না ঠাকুর! আজ মানিক সরাটিতে যাবে৷ পথে তিনখানা গ্রাম, একটা জমজমাট হাট দেখেছিল মানিক৷ অবাক হয়ে মাকে বলেছিল, “শম্ভুদা এখানে সাপ খেলা দেখাচ্ছে, দেখো মা!”

ঠাগমা বলেছিল, ‘দেখায়! ঘুরে ঘুরে দেখায়! কত বড়ো হাটরে বউ!’ রামের পিসি বলল, ‘কাটরার বাজার দেখল্যে কী বলতে গো জ্যেঠি?’

‘নে! হাট আর দেখাস না আমাক৷ আকুশির হাটে হাটবারে বিশটা হাটমুনশি তোলা উঠাত৷ গোহাটাই কত বড়ো! শত শত গোরু!

বুঁচি বলেছিল, ‘আমরা খাব্য না মা?’

‘না৷ পূজা মানব্য, মাটির ঘোড়া দিব্য৷ মা বিশালাক্ষী বড়ো জাগ্যত৷ মানিকের পা ভালো হব্যে, আমার দুখ্য ঘুচব্যে, এত খিদা কীসের? খেতে পেছিস তাতেই খিদা জাগ্যে৷ নাই পেতি, তো লাড়ি মর্যে যেত৷’

মানিক বলেছিল, ‘আমাদের মা ষষ্ঠী জাগ্যত নয়, মা? তিনি আমার পায়ে জোর দিতে পারে না?’

‘তিনি কচি-কাঁচাদের দেখ্যে৷’

সরাটি মস্ত গ্রাম৷ বর্গির হাঙ্গামার সময়ে বিশালাক্ষী নাকি থানের পূজারিকে বলেছিলেন, ‘গাঁবাসীকে বল কেনে? গাঁ ঘেরেমাটির আড়া দিক? আমি কি ঘোড়ার লাথ খাব্য? তা গাঁবাসী সরাটি ঘিরে মাটির উঁচু পাঁচিল দিয়েছিল৷ এত মাটি কেটেছিল, এত মাটি যে, সে এক দিঘিই হয়ে গেল৷ সে দিঘিতে স্নান করে পুজো দিতে হয়৷ দিঘি থেকে মায়ের থান অব্দি পরপর দোকান৷ কুমোররা মাটির হাতি, ঘোড়া বেচে৷ মুড়ি, চিড়ে, বাতাসার দোকান, মাটির হাঁড়িপাতিলের দোকান৷

ভক্তিভরে পুজো দিয়েছিল মানিকের মা৷ মানিকের হাতে লাল সুতোর তাগা বেঁধে পুজারি বলেছিল, ‘যা ঘরে৷ আজ হতে তোর পায়ের জ্বালা বেথা মা ল্যিল৷ মনে জোর করগা৷ সকল কাজ করবি, মায়ের নাম ল্যিবি, সাষ্টাঙ্গে পেন্নাম কর, থানের ধুলো খা৷’

বিশালাক্ষী বলতে এক বিশাল বটগাছ৷ তার কোটরে নাকি মা আছেন৷ মস্ত মাটির বেদি৷ সেখানে কত হাতি, কত ঘোড়া! হাতি মেনেছে, মা! হাতির পিঠে বইতে হয়, তত ধান-সোনা-কাঁসা-পেতল দাও! ঘোড়া মেনেছে, খোঁড়া-কানা-হাকা বোবাকে ভালো করে দাও, তাগড়া ঘোড়ার মতো ছনমনে৷ পুজো দিয়ে মা সকলকে অবাক করে একটা ঢেবু পয়সা দিয়েছিল৷ বলেছিল, ‘পা ভালো হলে মানিক এসে টাকা দিয়্যে পূজা দিব্যে গো মা!’

মা চাল, বেগুন, লবণ, লঙ্কা আর ডালবাটা এনেছিল৷ দিঘির পাড়ে নতুন হাঁড়িতে রান্না ভাত, বেগুন, আর ডালবাটা সেদ্ধ, লবণ লঙ্কা দিয়ে খাবার স্বাদই আলাদা৷ পলাশপাতার থালায় সেই প্রথম খাওয়া মানিকের৷ পোষলা করে ওরা, তখন তো কলাপাতায় খাওয়া হয়৷

বাড়িতে ওরা কানা উঁচু পিতলের থালায় খায়, পিতলের ঘটিতে জল৷

ঘরে ফেরার সময়ে সব দেখতে দেখতে আসবে, মানিক ঘুমিয়েই পড়েছিল৷

কী আশ্চর্য, এর পরেই মাকে আজরা বেদেনি তেল দিয়ে গেল৷ বলল, ‘কবে বল্যেছিলি, তা অষুদপালা পাব্য, তবে তো তেল বানাব্য৷ বিষলক্ষীর পূজা দিলি, ই তেল তো উ ঠাকুরথানে বেচ্যি আমি৷’

ঠাগমা বলেছিল, ‘মায়ের মানসা এক বছরের, তা বাদে ত্যাল লাগাবি বউ৷’

সে এক বছর কবে কেটে গেছে৷

মানিক এখন তেলও মালিশ করে৷ আর জোর করে কষ্ট করে বাঁকে জল বয়, ছাগল-হাঁস-মুরগিকে খেতে দেয়, মাছ ধরে ফটাফট৷ ছাঁকনি জাল ফেলে ধরে, ছিপ ফেলে ধরে, পুকুর ভাসলে গামছা দিয়ে ছাঁকে৷

এগুলো মানিকের কাজ৷ কলুবাড়ি সরষে ভাঙিয়ে তেল করে আনে৷ উঠোনে লঙ্কা, বেগুন, লাউ, কুমড়ো, শসা, ডাঁটা আজ্জায়৷

অনেক, অনেক কাজ করে৷

বড়োছেলে এককড়ি, একো বলে, ‘মা! আমরা অমনিষ্য, মানিক তবে কী?’

‘ও মানিক৷’

মেজো ছেলে দু-কড়ি, দুকো বলে, ‘মা! মানিকের বিয়ে হব্যে না?’

‘মা বিশালাক্ষী জানে৷’

সেজো ছেলে তিনকড়ি, তেনো বলে, ‘মা মানিকটা পাগল! কোথা কোথা ঘুর্যে?’

‘মা ওকে দেখব্যে৷’

ন-ছেলে পাঁচকড়ি, পেঁচো বলে, ‘মা! ঘোনাদাদু বলত, মানিক সুলক্ষণ ছেলে৷’

মা নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘নয়তো কী? আপন মনে থাক্যে বটে, কিন্তুক ঘরের কথা ভুল্যে না৷ যতটুকু পার্যে, কর্যে৷ তোদের মতো নয়, তাতে কী?’

‘আমরা কি মন্দ?’

‘না, সনা হেন ছেলা সব! লাঠি-সড়কি-বল্লম বাগাছিস কেনে? ডাকাত

হবি?’

‘যেয়্যে নাম লিখাব চাঁদ রায়ের কাছে৷’

‘তা বাদে?’

‘ফৌজে যেয়ে লড়াই করব৷’

‘তাতেই দল পাকাচ্ছিস সব?’

একো বলেছিল, ‘আখুন অবধি বাবার নাম লয় সব৷ তার ব্যাটা হয়্যে আমরা…৷’

‘যা করবি করগা যা! সে তার মায়ের কথা শুনে না৷ স্তিপুত্তর কথা ভাবে না৷ চিনত গুধা লুঢাই৷ সোমসার আমার! আর আমার ব্যাটারা? চার ব্যাটার চার বউ, গেঁদা গেঁদা মিয়া সব! আখুন আনতে পারি না৷ বুঁচিরে তো লিয়্যে যাবে তারা, তখুন? ঘরের কথা মনে ভাবিস? আমি কতদিন আর?’

‘না না, আখুনি তো যাব নাই৷ ঘর-বা দেখব না কেনি? চার ব্যাটা ফৌজে গেলে মা! উঠানে গোলা বাঁধব্য৷’

‘বুঝলাম!’

‘বিশ্বাস যায় না তোর?’

‘গেলম বিশ্বাস৷ কুন কালে বিয়া, তা হতে সোমসার, সোমসার, সোমসার! তুরাদের বাপ ঘর আসতে রাত কত্য! আখুন সোমসার যেমুন তিতা লাগে গ! কবে বা তুরা বুঝবি, কবে ছুটি পাব্য?’

ঠাগমা বলে, ‘আমি আছি না? ছুটি কুথা তোর? মানিক আখুনো আবুঢ়া৷’

‘না, উয়ার বিয়া দিব নাই৷ একোদের বিয়া আমি দিলাম না তুমি?’

মানিকের চার দাদার বিয়ে, সেও গল্পকথা৷ বন্ধু সে গল্প শোনে আর হাসে৷

‘কত বছর হল?’

‘অ্যানে-ক কাল৷ তখুন আমি ছোটো৷’

‘একসঙ্গে চারটে বিয়ে?’

‘হাঁ৷ ঠাগমার পা ধরল্য পরম দুলে৷’

পরমেশ্বরের চার মেয়ে৷ মানিক যখন হয়নি, তখনই পরমেশ্বর ঠাগমাকে বলত, ‘পিসি! কী বুদ্ধি করে জন্মেছে সব! চারটে মেয়েই তোমার চার নাতির চেয়ে খানিক খানিক ছোটো৷ সময় হলে আমি আর পবন বেয়াই হব৷’

তখন ওরা সুখবাড়ি থাকে৷ উঠোনের তিনদিকে তিনটে ঘর৷ একদিকে গোয়াল৷ মানিক শুনেছে, শত কাজের মধ্যে বাবা গোরুর খোল জাবনা মাখত, গরুর গা দলাই-মলাই করত, গোয়াল ঝাঁটা দিয়ে ধুত৷ বলত, ‘দুদ দিয়ে কচিকাঁচাদের বাঁচ্যে রাখে, এটোকা যতন কত্তে হবে৷’

সুখবাড়িতে না কি অনেক সুখ ছিল৷

কিন্তু সে সুখ তো থাকল না৷

ঘোনাপাড়ায় এসে তবে পরমেশ্বর দুলে মানিকদের বাড়ি এল তিন বছর আগে৷ ঘোনাদাদুও বলল, ‘বিয়ে হোক, বিয়ে হোক, অ্যানেক দিন গাঁয়ে বিহাপরব নাই৷’

দাদার নাম এককড়ি, বউয়ের নাম তারা৷

মেজোদাদা দু-কড়ি, বউয়ের নাম পরি৷

সেজোদাদা তিনকড়ি, বউয়ের নাম ভুতি৷

ছোটোদাদা পাঁচকড়ি৷ বউয়ের নাম দুলি৷

বিয়ে হয়েছে, গোরুর গাড়িতে বউ এসেছে ঘরে৷ বিলের মাছ৷ রাঙা চালের ভাত, কাঁটাচচ্চড়ি আর চালতার টক সবাই খেয়েছে পেট ভরে৷

আট দিনের দিন বউরা বাপের বাড়ি কাটজুড়ি ফিরে গেছে৷ বন্ধু বলে, ‘বউরা আসবে না?’

‘আখুনো ছোটো, খানিক বড়ো হোক৷’

‘বড়ো হলে আসবে?’

‘হ্যাঁ, তখন ওরা বাসনকোসন, পাঁচমশলা, তেল, চিঁড়ে, মুড়কি দিয়ে সাজ্যে পাঠাবে৷ বুঁচিরও তো বিয়ে হয়েছে, সেও ঘর কত্তে যাবে৷ আর, মা বলে, ‘দাদারা ঘর তুলুক আরও৷ বউ এনে রাখবে কোথায়?’

‘তোমার বিয়ে হবে না?’

মানিক মাথা নাড়ে৷

‘মা বলে, আমার নাকি সংকটা ফাঁড়া আছে৷ যদি নাই বাঁচি?’

‘সেই জন্যে বুঝি গলায় মাদুলি পরেছ?’

‘হ্যাঁ…’

‘আচ্ছা বন্ধু! আমি তোমাকে খুব বড়ো পিরের মাজার থেকে খুব ভালো মাদুলি এনে দেব৷’

‘কবে দেবে গ?’

‘এরপর যেদিন আসব?’

বলেই চলে যায় বন্ধু৷ মানিকের ওপর নিষেধ আছে, সে কক্ষনো উঠে দেখতে যায় না বন্ধু কোথা দিয়ে গেল৷ কিন্তু ঘোড়ার পায়ের খটাখট শব্দ শুনতে পায়৷

তখন মানিক উঠে পড়ে৷ এ বাগানটা যেন গল্পের দেশের বাগান৷ বিশাল, বিশাল বাগান৷ সবটা উঁচু পাঁচিলে ঘেরা৷ ঘোনাপাড়া ছাড়িয়ে, কানাইয়ের বিলের পূবে এমন একটা বাগান আছে তা মানিক জানতই না৷ কী সাহস করে পাঁচিলের নীচে জল বইবার নালা দিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল একদিন৷

কী আশ্চর্য, কী আশ্চর্য, শত শত আম গাছ, প্রতিটি গাছ নীচু পাঁচিলে ঘেরা৷ বাগানের মধ্যে দিয়ে জলবাহী নালার জাল বেছানো৷ কানাইয়ের বিল থেকে তিরতিরে জল ঢুকছে তো ঢুকছেই৷

একপাশে এক মস্ত দিঘি৷ তার বাঁধানো ঘাটের মাথায় চবুতরা৷

বাগানে মখমলের মতো সবুজ ঘাস৷ জলে পদ্ম ফুটে আলো হয়ে আছে৷

মানিকের মনে হয়েছিল সগ্যে চলে এসেছে সে৷ কী সুন্দর, কী সুন্দর! আর যেই দেখল এক জোড়া নীলকন্ঠ পাখি ডানা মেলে উড়াল দিয়ে নেমে এসে ঝুপঝাপ জলে স্নান করছে, সেই মানিকের মন যেন আলো হয় গেল৷ কেন হবে না বল? এ তো সবাই জানে যে অনেক ভাগ্য করে এলে তবেই জোড়া নীলকন্ঠ পাখির দেখা মেলে৷

ঘাটের সিঁড়ি ধরে নেমে মানিক জল খাবে বলে মাথা নীচু করল৷ জলে একটা পাতলা রোগা ছোটো ছেলের ছায়া৷ ছেলেটার রং তামাটে৷ কোমরে ছোট্ট ধুতি, কোঁকড়া চুল তেলে-জলে চকচক করছে৷ গলায় কালো সুতোর সঙ্গে একটা মাদুলি৷ ছেলেটার মাথার ওপর কী নীল আকাশ!

মানিক ফিসফিস করে বলল, ‘এটা আমার বাগান৷ ভগমান আমার তরে ই বাগানটো সির্জেছে৷’

একটা পাতা ছিঁড়তে ইচ্ছে হল না মানিকের, একটা ফুল ছিঁড়তেও না৷

কিন্তু বাড়িতে ফেরার সময়ে মানিক কানাইয়ের বিলের কিনারা থেকে এত এত সুষনি শাক তুলে এনেছিল৷ মা বলে, ‘সুষনি শাক কেউই আনে না গ! ওই শাক খেলে গা ঢেলে ঘুম আসে৷

বাগানটা যে কতদূরে তা মানিক বাড়ি ফেরার সময়ে বুঝেছিল৷ মা বলেছিল, ‘কুন বনবাদাড়ে ঘুরিস?’

‘দেখো মা, কেমন শাক!’

‘পেলি কুথা?’

‘কানায়ের বিলে৷’

ঠাগমা নিশ্বাস ফেলে বলেছিল, ‘এমন অবেলায় বিলের ধারে কু বাতাস বয়৷ ভূতে ঢেলা মারে৷’

মানিক যে কবে ভূতের লাথি খাবে!

বুঁচি বলেছিল, ‘ইস! ছোটদাদার মাদুলি আছে না? ভূত ওর কাছকে ঘিঁষবে নাই৷’

বুঁচির জন্যে লাল লাল গুঞ্জা ফল এনেছিল মানিক৷ বুঁচি গুঞ্জা ফলের মালা গাঁথে, গলায় পরে৷ মা বলেছে, ঘর করতে যাবার কালে বুঁচিকে রুপোর মটরদানা আর লাল পুঁতির মালা দেবে৷ তারপর মানিকের মুখ দেখে বলেছিল, ‘কী হল্য? এমন চোখ মুদে কী ভাবিস?’

মানিক মাথা নেড়েছিল৷ সগ্যে ঘুরে এসেছে ও, সেকথা কি বলা যায়?

আর, মা যখন সন্ধ্যে বেলা মশালে আঠা জড়াচ্ছে, তখন মানিক বলেছিল, ‘বাবা না কি সগ্যে গেছে, সগ্য কেমুন গ মা?’

‘সগ্য? কুন-অ দুখ্য নাই৷ সব্যদা সুবাতাস বয়৷ সগ্যবাসীরা দুধের নদীতে ছান কর্যে আর সনার থালে পরমান্ন খায়৷ তা বাদে পালঙ্কে ঘুম যায়৷’

‘দেখতে কেমন?’

‘গাছে গাছে ফল, নদীতে নদীতে জল, পাখি ডাকে, ফুল ফুট্যে, সোন্দর

জাগা!’

‘হ্যাঁ মা! সোন্দর, খুব সোন্দর!’

মানিক তো সগ্য দেখেই এসেছিল৷

বাগানটা যে কার, কেন কেউ ওদিকে যায় না, মানিক কাউকে জিজ্ঞেস করেনি৷ বড়ো দাদারাও কানাইয়ের বিলের ওদিকটায় যায় না৷ ওদিক দিয়ে নাকি মুর্শিদাবাদ যাবার পথ৷ মাঝেমাঝে ঘোড়ার পিঠে নবাবের ডাক যায়৷ ওদিকে, ও পথে একদিন সকাল থেকে সন্ধ্যে হাঁটলে মুর্শিদাবাদ পৌঁছোনো যায়৷

ঘোনাপাড়া গ্রামের লোকদের মধ্যে একা গঙ্গারামকাকা দেখে এসেছে মুর্শিদাবাদ, সেও অনেক কাল আগে৷

গঙ্গারামকাকাই এল মায়ের কাছে৷ না, ঘোনাকর্তা নেই৷ গাঁয়ের মাথা বলে একটা মানুষ দরকার৷

‘কেনে ঠাকুরপো?’

‘একো, দুকোর মতো ছেলারা তো লঢ়াই করতে চায়, নবাবের ফোজে যেতে চায়, ই কাজ করা, কি না করা?’

নিশ্বাস ফেলে মা বলল, ‘লেঠালের বিটি আমি৷ উয়াদের বাপও ছিল শূরবীর৷ তা ছেলাদের মনও ঘরে নাই৷ কিন্তুক আখুন তো সে দিন নাই, যে উয়াদের কথা বলব্যে কুন-অ মুরুব্বি৷ ল্যিয়ে যাবে উদের, বল্য?’

‘উপায় বল্য একটো?’

‘আখুন চত্তিরে রুদ্দ ঠাকুরের মেলা, আষাঢ়ে মনসা মেলা, বছরে চারটা কালীমেলার ধুম! আগে এত ছিল নাই৷ আখুন বোশেখি কালী, আশ্বিনা কালী, ভাদ্দর কালী, পোষ কালী, বাপ রে রায় দেশে আর ঢাক-ঢোল থামে না৷’

‘বর্গির হাংগামাও নাই, বুড়া নবাব নাই, লাতিটো তো বয়সে গিঁদা আখুনো৷ উদিকে কিছু লোকের অ্যানেক টাকা, তারাও মেলা ডাক্যে৷ আবার চিন্তাভয় দূরে গিছে, গঞ্জে গঞ্জে মানুষ আনন্দ কর্যে৷’

‘মেলাগুলানেই যাক কেনে? লাঠি খেলাক, বর্শা খেলাক, তির চালাক, উপাজান করুক! মুরব্বি জুটে, তো ল্যিয়ে যাবে ফোজে৷ না জুটে তো লেঠালপাইক তো হতে পারব্যে৷’

‘সেই ভালো!’

‘তাই বল্য! লয় তো ছেলাগুলান ডাকাত হয়্যে যাব্যে৷ আমার ছেলাদের…তুমিই ল্যিয়ে যাব্যে…বাপ নাই তো কাকা আছে৷’

‘নয় তাই হল্য৷ মানিক কী কর্যে দেখো!’

‘কী করল্য মানিক?’

‘ওঠা বন্যেবাদাড়ে ফির্যে বুল্যে৷’

‘করুক! উর যা মন ল্যায় করুক! একটো ছেলা কাছে থাকুক আমার!’

‘বউঠান! পাঁচটো ব্যাটা তুমার!’

‘দুলে-বাগদির ব্যাটা, হাতে লাঠি টেঁটা, ঘর্যে থাকব্যে কুনঅটা? উয়াদের বাপ থাকত্য?’

‘না তুমার মতন, না পবনদাদার মতন…’

মা ঈষৎ হাসল৷ বলল, ‘উ নিজের মতন!’

গঙ্গারামকাকা চলে গেলে মা গালে হাত দিয়ে বসে থাকল৷ অনেক, অনেক দিনের কথা! ঝিমঝিমে দুপুরে বাঁশ গাছের পাতা সরসর, কাঠবেড়ালির ছুটোছুটি৷ বুঁচি মাটির হাঁড়িকুড়ি নিয়ে খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ ওর ঠাগমাও ঘুমোচ্ছে৷ মানিকের মা গালে দোক্তাপাতা আর চুনের ঢিপি গুঁজে চুল শুকোতে বসে আনমনা হয়ে গেল৷

কাকে বলবে, কে মনে রেখেছে, পবন বলত, ‘এ ছেলাটো সন্নেসী হয়্যে যাবে একোর মা! স-ব লক্ষণ তেমুন!’

মানিকের মা কি সে কথা ভুলেছে না ভুলতে পারে? একটু বড়ো হবার পর থেকে রোগা পা টেনে টেনে মানিক বনেবাদাড়ে ঘোরে৷ আগে ঘুরত ষষ্ঠীতলা অবধি, এখন দূরে দূরে যায়৷ হয়তো একদিন এত দূরে চলে যাবে যে আর ঘরে ফিরবে না৷ ও যা ছেলে! বনের ফল, বিলের পানফল, এটা সেটা খেয়ে কাটিয়ে দেবে৷ এই যে ঘোরে, বাঘ, সাপ, ডাকাত, ভূতপ্রেত, কিচ্ছু ভয় করে না ওর৷ তাই তো মানিকের মা ছেলেকে দিব্যি দিয়ে রেখেছে, যেখানে খুশি যা৷ কিন্তু সাঁঝে ঘরে ফিরবি৷ এখন তো সাতসকালেই পান্তা খাইয়ে দেয় মানিকের মা৷ আবার ঘরে এলে খেতে দেয়৷ ছিপ ফেলে মাছ ধরে, শাকসুলপো, মানকচু, বুনো ধুঁধুল আনে৷ সময়ে মাছ কুটেবেছেও দেয়৷ বুঁচির সঙ্গে ছাগল-হাঁস-ঘরে তোলে৷ খুরপি নিড়েন নিয়ে উঠোন, ঘরের আশপাশ পরিষ্কার করে৷ স-ব করে, কিন্তু ওর মন পড়ে থাকে বাইরে৷

দুপুর তাতে কৃষ্ণতুলসীর মৃদু গন্ধ ছড়ায়৷ এত এত কৃষ্ণতুলসী এনে ঘর ঘেরে বসিয়েছে মানিক৷ বেদেনিরা বলে কৃষ্ণতুলসীর গাছ, ইষেরমূল গাছ বসাও৷ সাপ আসবে না৷ সত্যিই বড়ো গোখরোটাকে আর দেখে না মানিকের মা৷ এসব দিকে মন আছে ওর৷ সে তো থাকেই কতজনের৷ আবার তারা সন্নেসীও হয়ে যায়৷

ভাবতে ভাবতে চোখ বুজে আসে মানিকের মার৷ কড়ে আঙুলের মতো ছোট্ট মেয়ে বউ হয়ে এসেছিল, শাশুড়ির কোলে ঘুমোত৷ একটু বড়ো হতে মাথায় চাপল সংসার৷ এখনও চেপে আছে৷ কবে বউরা আসবে, তাদের কাজকর্ম শিখিয়ে দিয়ে ছুটি নেবে মানিকের মা?

এমন দুপুর, পাতা ঝরাতে, আনচান বাতাসে, পাখির ডাকে, বনসোঁদালির তীব্র গন্ধে, কোথাও গোরুর গাড়ির চাকার ক্যাঁ ক্যাঁ শব্দে মৌতাতি দুপুর৷ এই ভরা দুপুরের মৌতাতে মানিক তার সগ্যের বাগানে চলে গিয়েছিল৷

নালার গর্ত বেয়ে ভেতরে ঢুকে মানিক দৌড়েছিল পুকুরপাড়ে৷ জলে হাতমুখ ধুয়ে নেবে, গাছের ছায়ায় বসবে, লজ্জাবতী ফুলের পাতায় আঙুল ছোঁয়াবে আর পাতাগুলো মুড়ে যাবে, হঠাৎ মনে হয়েছিল কে যেন তাকে দেখছে৷

‘কে, কে তুমি?’

চমকে উঠেছিল মানিক৷

‘এসো, এদিকে এসো৷’

কী সুন্দর মানুষ, কেমন পোশাক-আশাক, গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷

মানিক পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল৷ তারপর বলেছিল, ‘তুমি কে?’

‘তুমি কে, তাই বলো? আমি বড়ো, আগে জিজ্ঞেস করেছি৷’

মানিকের একটুও ভয় করেনি৷ এটা তো সগ্যের বাগান! এখানে সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে পারে৷

‘আমি মানিক দুলে৷’

‘এখানে কেন?’

‘এটা তো আমার বাগান৷’

‘তাই বুঝি?’

‘নিশ্চয়৷ এটা আমার সগ্যের বাগান!’

‘স্বর্গ! বেহস্ত! তা তুমি এখানে কী কর?’

‘গাছ দেখি, ফুল দেখি, জলের সঙ্গে কথা বল্যি৷ পাখিরা আমার কাছে আস্যে৷’

‘ফল ছেঁড় না?’

‘না না না৷ তুমিও ছিঁড়ো না৷ এ বাগানের ফল কি ছিঁড়তে আছে?’

‘তা বটে, তা বটে!’

‘তোমার ঘর কুথা?’

‘ঘর? …সে, সে অনেক দূরে৷ তোমার ঘর?’

‘হো -ই ঘোনাপাড়া৷ দক্ষিণে…দূরে…অনেক দূরে৷’

‘এত দূরে এসেছ?’

‘ঘাসে বস্য না খানিক? আমার পা কনকন কর্যে৷’

‘বোসো, বোসো৷’

দু-জনেই দেখছিল দু-জনকে৷

‘কী, আমাকে দেখে ভয় করছে?’

মানিক একটু হেসে বলল, ‘ভয় করব্যে কেনে? তুমার চখ কত সুন্দর!’

‘তুমি খুব ভালো৷’

‘কিন্তু তোমার বাগানে এসে পড়লাম যে?’

‘বুঝলাম৷ ই টো তুমার বাগান?’

‘তুমিই তো বললে সগ্যের বাগান৷ আমি মাঝে মাঝে আসি৷ তাতে তোমার আপত্তি নেই তো?’

‘তা কেন থাকব্যে? আসো কেনে?’

‘একলা বসে থাকি… ভালো লাগে৷’

‘বন্ধু নাই তুমার?’

‘না…বন্ধু তো নেই…একজন বন্ধুও নেই৷’

‘আমারও নাই৷ তুমি আমার বন্ধু হবে?’

হেসে উঠেছিল মানুষটা৷ নিজেকেই যেন বলেছিল, আশ্চর্য! আশ্চর্য! আমার ভালো লাগছে৷

তারপর মানিককে বলেছিল, ‘হব তোমার বন্ধু৷’

‘তুমার নাম?’

‘কেন বন্ধু? দু-জনে দু-জনের বন্ধু কেমন? দু-জনে দু-জনকে বলব বন্ধু?’

‘হ্যাঁ…বন্ধু…আমার এই পায়ে তো জোর নাই…খেলতে নেয় না কেউ…’

কান পেতে কী শুনছিল বন্ধু৷ ভুরু কুঁচকে মন দিয়ে৷

‘কী শুন্য?’

‘কে চ্যাঁচাল না?’

‘ধুর! উ তো কুড়াল পাখি৷ বিলের ধারে উড়াল দিয়ে মাছ ধর্যে৷ কাশঝোপে বাসা৷’ গভীর মমতায় মানিক বলল, ‘মা পাখিটাক সেদিন বাজে তাড়া করল্য৷ ধরতে পারে নাই৷ বলি, কেনে বা তুমি বাসা ছেড়্যে দূরে যাও?’

‘পাখিটা কী বলল?’

‘বলল, আর যাব নাই৷’

‘তুমি ওদের কথা বুঝতে পার?’

মানিক ঘাড় হেলাল৷ বন্ধু ওর মাথার চুলে হাত রাখল৷ বলল, ‘ঠিক এখন আমার দরকার ছিল তোমার মতো একজন বন্ধু৷ যে পাখির কথা বোঝে৷ আর স্বর্গের বাগানে বসে থাকতে ভালোবাসে৷ আচ্ছা! আমি চলি আজকে, কেমন?’

‘আমিও ঘর যাব৷ তুমি কি ঢুকলে ই নালাপথে?’

‘না না, দেখছ না আমি কত বড়োসড়ো? আর তুমিই বা এ পথে ঢুকবে কেন? চলো৷ অন্য পথ দেখাই৷’

বাগানটা এত বড়ো যে এদিক থেকে ওদিক অনেকটা পথ৷ যেতে যেতে বন্ধু মানিককে আম গাছ চেনাচ্ছিল৷

‘এই গাছটা জান তো?’

‘আম গাছ৷’

‘এ গাছের আম খুব মিষ্টি৷ এ আমের নাম কোহিতুর৷’

‘কো-হি-তু-র!’

‘পাঁচশো রকম আমের পাঁচশো গাছ আছে এখানে৷’

‘ও বাবা!’

‘কতরকম আম! সাদৌলা, কোহিতুর… আর, আর কী কী…’ হেসে ফেলল বন্ধু৷ বলল, ‘আমি জানি না৷’

‘কেনে? তুমি তো বড়ো!’

‘কিছু না জেনে বড়ো হয়ে গেছি৷ স-ব অন্যরা জানে৷ স-ব সময়ে৷ এসো!’

এদিকে মস্ত কাঠের ফটক৷

মানিকের বন্ধু টোকা দিল৷

ফটক খুলে গেল৷

মানিকের বন্ধু বলল, ‘চলি?’

‘আবার কবে আসব্যে গ?’

‘সেই তো বলা মুশকিল বন্ধু৷ আবার এসে যাব৷ কী যেন জায়গায় থাক?’

‘ঘোনাপাড়া৷’

‘দেখি, মনে থাকে কি না৷ আর শোনো৷ আমার কথা কাউকে বলবে না, কেমন?’

‘না, না, তাই বলি? বাগানের কথাও তো বলি নাই৷ কেউ জানব্যে নাই৷’

‘পাখিদের কানে কানে বলতে পার৷’

গেট বন্ধ হয়ে গেল৷ মানিক পেছন ফিরল, দু-কানে আঙুল দিয়ে দৌড় লাগাল৷

বাড়ি ফেরার পথে মানিক যেন হাওয়ায় ভেসে ভেসে চলল৷ একটুও অবাক লাগল না ওর৷ ও তো মানিক! সবাইয়ের মতো তো নয়৷ কারও সঙ্গে ওর মেলেই না৷ সেবার পেঁচোদাদা তো শজারুটা মেরেই ফেলত৷ মানিক হাত চেপে ধরেনি?

‘মের্যে না, মের্যে না ছোটদাদা, উ-টো মাদি, পেটে বাচ্চা আছে৷’

‘তোকে বলেছে!’

‘আমি উয়ার ঘর জানি যে!’

‘ঘর জানিস?’

‘হ্যাঁ গ! উই বুড়া তেঁতুল গাছটার পিছনে থাকে, চোখে চোখ পড়ল্যে গায়ের কাঁটা খাড়া! উ কী কর্যেছে, যি মারব্যে?’

‘মাংস কত ভালো৷ জানিস?’

ছোটদাদা নামিয়ে রেখেছিল ধনুক৷ মাকে বলেছিল, ‘মানিক কি পাগল?’

মা নিশ্বাস ফেলে বলেছিল, ‘খড়ারুটা মারবি-বা কেনে? কতটুকু মাংস,

বল?’

মা মানিককে বলেছিল, ‘পাখপাখালির কথা বুঝিস মানিক?’

‘বুঝি৷’

ঠাগমা মাথা নেড়েছিল বারবার৷ এমন ছেলে তো তাদের ঘরে জন্মাবার কথা নয়৷ কেমন করে জন্মাল?

ঘোনাকর্তা বলত, ‘পাখির ছানা! বড়ো হল্যে উড়ে যাবে৷ যতদিন থাক্যে, সযতনে রাখ্য৷’

মানিক তো সকলের মতো নয়৷ কোনোদিন নয়৷ সে শুনতে পায় লক্ষ্মীপ্যাঁচারা অর্জুন গাছের মাথায় বাসার মধ্যে বসে কী ঝগড়া করে৷ মাছরাঙা কেমন বুড়ো আকন্দ ডালে বসে মাঝে মাঝে বলে, ‘অ জল! মাছ দে!’

ও তো গাছপালার কথাও শোনে৷ গাছে গাছে কি কম কথা হয়? মানিক সব বুঝতে পারে৷ বুঁচিকে ও যে মাটির পুতুল গড়ে দিয়েছিল বর আর বউ, তাদের মনে কম দুঃখ ছিল?

মানিক ওদের খোকা-খুকি গড়ে দিল৷ তখন পুতুলদের কী দুঃখ, খোকা-খুকি দুধ খাবে কোথা থেকে? সে জন্যেই একটা দুধেলা গাই গড়ে দিয়েছে মানিক৷ বুঁচি বলে, ‘ও ছোটদাদা, এটা ছাগল বটে৷’

আর কেউ দেখবে না৷ মানিক দেখবে সগ্যের বাগান এটাই তো স্বাভাবিক৷

পেয়ে যাবে একটা অবাক করা বন্ধু, সেও স্বাভাবিক৷ মানিক কোনো কথাই কাউকে বলতে যায় না, এসব কথাও বলবে না৷ কিন্তু বাড়ি ফেরার সময়ে ওর বুক আনন্দে ভরে উঠছিল, আর পা যেন জোরে জোরে চলছিল৷

মানিক যখন বাড়ি ফিরল, তখন বেলা গড়িয়ে মা খেতে বসেছে৷ মাথার ভিজে চুল চুড়ো করে বাঁধা৷ হেঁসেলের দাওয়ায় বসেছে পা ছড়িয়ে৷ কাঁসার উঁচু থালায় ভাত, উচ্ছে বেগুন ভাতে আর বোয়াল মাছের ঝুরি৷ তেল তেল, লাল লাল, সবুজ কাঁচালঙ্কা টিপে খেতে কী ভালো, কী ভালো! মানিক পুকুরে ঝুপঝাপ ডুব দিয়ে মার সঙ্গেই খেতে বসে গেল৷

তখন ঝিমঝিমে দুপুর৷ ঠাগমা তকলি ঘুরিয়ে সুতো কাটছে৷ বুঁচি হাঁসদের জল ভাত দিয়েছে ডাবায়, হাঁসেরা খাচ্ছে, বুঁচি দেখছে৷ দূরে দূরে, কাছে কাছে, ডিম ডিম বাজনা শোনা যায়৷ চড়ক পুজো আসছে, কালা রুদ্দুর পুজো হবে, মেলা হবে৷

‘চড়ক পূজা চৈতি সাঁকান্তিতে, মা?’

‘হ্যাঁ মানিক৷’

‘বোশেখে কী?’

‘নে, আমাদের আবার চোত-বোশেখ!’

গঙ্গারামকাকা পাতুলের কবিরাজ সেনমশায়ের বাড়ি গিয়েছিল বলে কত কথা যে জানা গেল৷ তা ঘোনাপাড়াতে কেউ জানত না৷

পাতুল এখন জাঁকজমক গ্রাম৷ বামুনপাড়া, কায়েতপাড়া, বৈদ্যপাড়া, গোয়ালপাড়া, এমন এগারোটা পাড়া আছে এখানে৷ বুনোরা ঘর তুলে চলে গেছে৷ এত লোকজন, হাটবাজার, গোরুবাছুর৷ এত কেচালে তারা থাকতে পারে না৷ তারা চলে গেছে অনেক দূরে৷ ভাপতার বিল, বা চোপকামিনীর বিলের কাছে৷ বনজঙ্গল আছে, শিকার করো, জঙ্গলের কাঠ বেচো, বিলের মাছ ধরো, আর ভাপতা জঙ্গল থেকে কবিরাজি ওষুধের গাছপালা শেকড়বাকল, লতাপাতা জোগাড় করে বৈদ্যপাড়ায় বেচে এসো৷

ধানচালের বদলেই এসব বেচা হয়৷ বুনোরা টাকাকড়ি তেমন বোঝে না৷ সারাদিন খাটেখোটে, সন্ধ্যা হলে মাদল বাজায়, গান গায়৷

সেনমশাই তো সে কথাই বলেছিলেন গঙ্গারামকে৷ ‘বুনোরা গেল, এখন আমায় গাছগাছড়া কে এনে দেয় বল? ঘনশ্যাম জানত কখন কী লাগে, সব পাঠিয়ে দিত৷ সেও নেই৷ আমি কি খোঁড়া পা নিয়ে লাঠি ঠকঠকিয়ে বনেবাদাড়ে ঘুরব?’

গঙ্গারাম ভদ্দরলোকদের পাড়ায় এলে অন্যরকম করে কথা বলে৷ সে বলল, ‘তা কেন মাশায়? ঘোনাকাকা তো পবনদাদার ব্যাটা মানিককে সব চিনাত৷ সে জানবে৷’

‘এই দেখ! সে জানবে কোন গাছটা কী?’

‘সি ছেলা গাছের সঙ্গে কথা কয়৷’

‘তবে সে পারবে৷ নিয়ে আয় একদিন৷’

‘তার মা যদি ছাড়ে৷’

‘পুণ্যাটা কেটে যাক, তা বাদে আনিস৷’

‘এ বছরও পুণ্যা হবে?’

‘হবে না কি আর? বুড়ো নবাবের সময়ে যেমন জাঁকজমকে হত, তেমন না হলেও সিরাজ নতুন নবাব৷ পুণ্যা তো করতেই হবে৷’

চৈত্র সংক্রান্তি থেকে সাতই বৈশাখ পুণ্যাহ উৎসবের সময়৷ আলিবর্দির সময়ে তো বড়ো জাঁকজমক হত৷ নবাব বসতেন খোলা দরবারে৷ খাজনা সংগ্রহকারী আমলাদার, জমিদার, বণিক, সবাই এসে নবাবের সামনে নামিয়ে রাখতেন খাজনার টাকা এবং নজরানা৷ নবাবও একে তাকে বকশিশ করতেন৷ খাওয়া-দাওয়া চলত৷

পুণ্যাহ অন্যান্য মহলদার, মৌজামালিক এঁদের ঘরেও হত৷ সে সময়ে মৌজা থেকে চাল, দুধ, রান্নার কাঠ, এসব তোলা হত৷ কবিরাজমশাইয়ের কাছে ওষুধ নিতে মুর্শিদাবাদের লোকজনও আসে৷ ওঁর কাছেই খবর পেল গঙ্গারাম, আর দৌড়ে দৌড়ে গ্রামে ফিরল৷

একো বলল, ‘কী দেখল্যে! বাঘ দেখেছ্য?’

‘বাঘ নয় রে, টাগ৷’

‘সি টো আবার কী?’

‘নবাব তো এখুন সিরাজ-সে পুণ্যা করবে৷ তা পাতুল থেকে ঘোনাপাড়া সব মৌজার মহলদার জগৎ দত্ত৷ ঢোলসোহর শুনিসনি? আসব্যে, আসব্যে৷ যাতির রান্না হবে দত্ত বাড়ি৷ কাঠ দাও৷ খাটবার মানুষ দাও৷ শাক-কুমড়ো, বেগুন, ঝিঙা, পটল দাও৷ কাঁচা আম দাও৷ সব দিল্যে আমরা বেচব কী খাব কী?’

‘না দিল্যে?’

‘বিষনজরে পড়ব্যে৷ লেঠেল-বর্শেলের গাঁ৷ আমরা কি চাষিবাসি?’

এবার মা বলল, ‘চাষিবাসি হতে হবে গো ঠাকুরপো৷ কতকাল আর এমন চলব্যে?’

‘যখন হতে হব্যে, হব্য৷’

‘চাষেবাসে শান্তি কত!’

‘খুব শান্তি! বর্গিরা কি শান্তি দিয়ে গেল্য৷’

‘লয় ষষ্টীতলায় ডাক সকলকে৷ গাঁয়ের মাথা বলতে তুমি৷ দত্তকে বল্য, কাঠ দিতে পারব, শাক আনাজ যেমন করি, তেমন খাই৷ করি-বা কই? বন আছে, না মা আছে৷ বনধুঁধুল, তিতপটল, কচু-ঘেঁচু-কান্দা-মূল, যা পাই খাই৷ মেটে আলু থাকতে, শাক থাকতে…’

‘দেব না বললে মানব্যে সে?’

‘বছরে একবার পুজোর কালে পাঁচসিকা দিই৷ একটা পাঁঠা, আর দিতে পারি?’

‘দত্ত যে আমাদের্যে শেখওমরা ধর্যেছে বউঠান৷ হাঁকুড়ি কী! না তোদের ছেলারা কালীনাচ, রুদ্দুনাচ নেচে অ্যানেক আনছে৷’

‘হ্যাঁ! চাল-গামছা-নারকেল-বড়জোর একটা ধুতি!’

‘সবে নবাব হল্য৷ সিরাজ যদি পুণ্যা না করত দত্তের চিড়বিড়ানি বাড়ত? ঃও! নবাব করবে তো মোরাও করব্য৷ নিয়ম!’

‘জানি, নিয়ম তাদের! কিন্তুক শান্তিকালে নিয়ম খাটে, এখানে খাটে? এখনও গ্রামে কামার বসল না এক ঘর, তাঁতিপাড়া বসল না৷ এ কি সুখবাড়ি? সেথা স-ব ছিল৷’

ঠাগমা হঠাৎ বলল, ‘ঘোনাদাদার কথা কি মিছে হব্যে? সি বল্যে গেল মাহাদুর্দিন আসতেছে, মাহাদুর্দিন! বর্গিরা আসবে!’

‘যাক! পাঁচজনারে ডাকা করাও৷’

‘তাই ডাকি৷ তুমি যাব্যে?’

‘নিশ্চয়৷ বাড়ির মাথা বলতে মা! তিনি কি সব পারে? আমি যাব্য, রামের পিসি যাব্যে৷’

‘পানচাঁদ মুনসি তো খাতা বগলে ঘুরতেছে৷ এ গাঁ এই দেব্যে, উ গাঁ ওই দেব্যে৷’

একো, দুকো আর তেনা এ-ওর দিকে চাইল৷ পেঁচো আকাশপানে চেয়ে বলল, ‘বাড়ি রামহাট, একটা মরকুটে ঘোড়া চেপে তাগদায় বেরায়৷ পাশে দৌড়ায় বেঙা, সাদা খাতা উয়ার মাথে ধর্যে৷’

একো বলল, ‘যি হাটে যাবে৷ একটা রুপোর সিকি লিব্যেই লিব্যে৷’

ওদের মা বলল, ‘কড়ি থাকতে রুপোর টাকা-দুয়ানি, বাপ রে বাপ! আমরা জানি কড়ির সওদা!’

‘দিন কি দাঁড়িয়্যে থাক্যে বৌঠান? জগৎ শেঠের টাঁকশাল! টাকা-সিকা-দু-আনি!’

‘লাও, পুণ্যার হুড়া সামলাও!’

পুণ্যার ঢোলসোহরই বাজছিল৷ দূরে, অনেক দূরে৷ মানিক উপুড় হয়ে ঘাসে মুখ ডুবিয়ে শুনছিল৷ আজ কতদিন বন্ধু আসে না৷ কতদিন কথা হয় না৷ বন্ধু যে কোথায় কোথায় চলে যায় থেকে থেকে! যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়, আবার হঠাৎ চলে আসে৷ স্থির হয়ে শুয়ে আছে মানিক, খুব বুঝতে পারছে ওর গায়ের কাছে বসে একটা কাঠবেড়ালি কুটুর কুটুর মুড়ি খাচ্ছে৷ কাঠবেড়ালির গায়ে নাকি রামচন্দ্রের পাঁচ আঙুলের দাগ৷ সাগরে সেতু বাঁধার সময়ে…

‘ব্যাপারটা কী? ঝনঝন করে গেট খুলল৷ আমি চলে এলাম৷ তুমি শুনতেই পেলে না?’

মানিক উঠে পড়ল৷ তারপর বন্ধুর হাত ধরল৷

‘কতদি-ন পরে বল্য ত?’

বন্ধুও ঘাসের ওপরেই শুয়ে পড়ল৷

‘হ্যাঁ, অনে-ক দিন পরে৷’

‘কোথায় চল্যে যাও?’

‘আমি কি সাধ করে যাই? আমাকে যে শুধু ছুট করায়…এদেশে… ওদেশে…বড্ড ক্লান্ত লাগে আজকাল…’

‘কারা ছুট করায়?’

‘নাম বলে কী হবে?’

‘আমার দাদারা সবাই তির ছুড়তে ওস্তাদ৷ তারা গিয়ে ওদের জব্দ কর্যে দেবে?’

‘তাই নাকি?’

‘নিশ্চয়৷ তির দিয়্যে হাত-পা মাটির সঙ্গে গিঁথে রেখ্যে দিব্যে৷’

‘একটু ধীরে ধীরে বন্ধু, কী বললে?’

‘মাটির সঙ্গে এই এমুনি করে গিঁথে রেখ্যে দিব্যে৷ বাস! আর লড়তে পারব্যে না৷’

বন্ধুর চোখ হেসে উঠল৷ মাথার টুপিটা খুলে ঘাড় অব্দি লম্বা সুন্দর চুলে হাত বুলোল বন্ধু৷

‘তিরের এত ক্ষমতা? বন্দুকের চেয়ে বেশি?’

‘বন্দুক আমি দেখি নাই৷’

‘বল কী?’

‘ঘোনাদাদু বল্যে গিছে, তিরের ক্ষ্যামতা অ্যানেক৷ কেন বল্য দেখি?’

বন্ধু আকাশের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি তো জানি না৷ তুমি বলো, আমি শুনি৷’

মানিক হাত নেড়ে বোঝাল৷ ‘তিরের ফলা এমন যে গেঁথে গেলে টেনে তুললে কী সর্বনাশ! পেটে বা বুকে বিঁধল তো টেনে তুললে ভেতরের সব ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসবে৷’

‘বাঃ! তবে বের করবে কী করে?’

‘আস্তে, ঠেলে ঠেলে৷’

‘আর আমি জানতাম, বন্দুক আর তলোয়ার হচ্ছে মরদের হাতিয়ার! ইস! বড্ড ভুল হয়ে গেছে তো!’

মানিক বলল, ‘আমার বাবা আঁধারে শব্দ শুন্যে তির চালাত আর মানুষ মর্যে যেত৷’

‘আমার কী হবে বন্ধু? আমি তো তির চালাতে শিখিনি৷ শুধু বন্দুক আর তরোয়াল…’

‘তুমি চালাতে পার্য?’

বন্ধু হাত দুটো মানিকের দু-গালে বোলাল৷ বলল, ‘নরম, না শক্ত?’

‘খুব কড়া বট্যে৷ সি কি বন্দুক…’

‘হ্যাঁ বন্ধু৷ তোমার বাবাকে যদি পেতাম…’

‘বাবা তো নাই৷ সে-ই সুখবাড়ি…সে-ই দুল্লভ রায়…বাবা তো বর্গি লড়াইয়ে…আমি তখুন খুব ছোট বট্যে…’

বন্ধু ওর চুলে আঙুল ছোঁয়াল৷ ‘আমারও বাবা আমার ছোটোবেলায়… তোমারও…দেখো, কত মিল!’

‘হ্যাঁ, মা আছে আমার! ঠাগমা আছে!’

‘আমার মা…’

‘আছে তো!’

‘আছে, আছে৷’

‘তিনি তোমারে বন্দুক চালাত্যে দেয়?’

বন্ধু একটু হাসল৷ ঠোঁট হাসল, চোখ হাসল না৷ বলল, ‘আমাকে সব শিখিয়েছে এক সর্বনেশে বুড়ো৷’

‘তিনি কে গো?’

‘ছিল একজন৷ সেই তো আমাকে বলত, মন খারাপ হলে তুই…থাকগে সেসব কথা! বন্দুক, লড়াই, বর্গি, কিছু ভালো লাগছে না আমার৷ তাই তো এখানে…’

‘আস্যই না আখুন!’

‘সর্বদা আমাকে ঘিরে রাখে যে? সময় পেলে পালিয়ে আসি৷’

‘কারা ঘির্যে রাখ্যে?’

‘সেসব জেনে তোমার দরকার নেই বন্ধু৷ এখন তোমাদের খবর বলো৷’

‘খাটাশ আমাদের হাঁস খেয়্যে ল্যিল! সাদা হাঁসটা গো! কাল বিকালে…’

‘তোমার দাদারা মারতে পারল না?’

‘তারা ঘর্যে নাই৷ কালীনাচ নাচ্যে, চাল-নারকেল আন্যে৷ কিন্তুক…’

‘কী হল? তোমার মনেও দুঃখ?’

মানিক ভাসা ভাসা চোখ কুঁচকে বলল, ‘জগৎ দত্তকে চিন?’

‘আমি কাউকে চিনি না৷’

‘সি মাহালদার বট্যে!’

‘জগৎ দত্ত…মহলদার…কী করেছে?’

‘ঢোলসোহর দিছে! আমরা ডর্যে গেলম৷’

‘কেন?’

‘কুথায় নবাব…কী জানি নাম…সিরাজ…পুণ্যা করব্যে…পুণ্যা বুঝ?’

‘পুণ্যা…পুণ্যা…তারপর?’

‘আমরাদের সকল গাঁ-কে কাঠ-কুমড়া-চাল কত কী দিত্যে হবে! আমরা কুথা পাব বল্য? আমরা কি…চাষিবাসি, না বড়ো মানুষ, না ধানের হামার আছে…’

মানিকের গলাটা ক্ষীণ হয়ে গেল৷

বন্ধু চোখ বুজে রইল৷

‘হামার কী…বন্ধু?’

‘ধান রাখ্যে৷ কেউ বল্যে গোলা, আমরা বল্যি হামার!’ বন্ধু পকেটে হাত ঢোকাল, বের করল৷

‘নাও, খাও৷’

‘ই কী বট্যে?’

‘আখরোট, খোবানি, মেওয়া…’

‘কী সোন্দর বাস!’

‘খেতে আরও ভালো৷’

‘তুমিও খাও?’

‘আর না৷ সারাদিন তো ওই খাচ্ছি আর…’

‘বাড়ি যেয়্যে ভাত খাও নাই?

‘বাড়ি…বাড়ি…’

‘মা বস্যে থাকব্যে না?’

বন্ধু হাসল না৷ বলল, ‘তোমাকে বন্ধু না পেলে কত দরকারি কথা যে জানা হত না৷ না জেনেই…কিচ্ছু জানতাম না জান? এই বাগানটা তো ছিলই…’

‘অ্যানেক দিন আগে?’

‘নইলে এত বড়ো বড়ো গাছ হয়?’

‘তা বট্যে৷’

‘এখানে এসেছি, গেছি৷ সে তো আমোদ করতে আসতাম…’

‘কব্যে গো?’

‘অনে-ক আগে! তখন তুমি হওইনি! তখন…এসেছি…কিন্তু মাঝে মাঝে…পালিয়ে এলে যে কত শান্তি লাগে…তা জানতাম না…এখন বুঝি…খুব বুঝি…আমাকে একজন ফকির বলেছিল কী জান? …সে অনেকদিন আগে…আমি, তাঁবুতে বসে আছি…সে আছে গাছতলায়…কাটোয়া গেছ তুমি?’

‘নামই শুনি নাই৷’

‘মেদিনীপুর? পাটনা? বর্ধমান?’

মানিক মাথা নাড়ল, বন্ধু চোখে হাত চাপা দিল৷

‘কী হল্য?’

‘কিচ্ছু না৷ সে একটা…হাসির কথা…বর্ষাকাল…অন্ধকার…ফকির আমাকে পৌঁছে দিল তাঁবুতে…’

‘তাঁবু কেমন হয়্য গো?’

‘এই…সে আমি বলব একদিন…শোনো না…ফকিরকে বললাম, এই তাঁবুর মধ্যে এসো না! গাছতলায় বসে আছ? আমার যে কী বিচ্ছিরি লাগছিল…আমি তো…খুব খারাপ লোক…গরিব গরিব চেহারার লোক চেটাং চেটাং কথা বললে রেগে যেতাম তো! খুব খুব খারাপ লোক আমি!’

‘অমুন কথা বল্যে না৷’

‘বলে না? বেশ, তার কথাটাই শোনো তবে৷ লোকটা খুব হেসে বলল, আমি তো ভালোই আছি গো! খোদাতাল্লা এমন ঘর দিয়েছে…ওপরে আকাশ…এমন গাছের আড়াল…আমি খুব ভালো আছি৷ বলেছিল, শান্তিতে আছি…খুব শান্তি৷ খুব…’

‘তোমার দুঃখ হচ্ছে?’

‘না…দুঃখ তো আমি জানিই না…কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই বাগানে এলে কেমন শান্তি পাই…এই যে তোমায় বন্ধু পেয়ে গেলাম…আমি…আমাকে তুমি খারাপ লোক মনে কর?’

‘কক্ষনো না৷ তুমি ভালো, খুব ভালো৷’

‘এটা খোদাতাল্লার ঘরই বটে! কোনো ভয় নেই, একটুও না…’

‘ভয় থাকবে কেন? আমি তো বনে-জঙ্গলে ঘুরি…বিলের ধারে আসি…আমার কক্ষনো ভয় করে না৷’

‘আর বাড়ি গিয়ে মা-র কাছে বসে খাও!’

‘খাই!’

‘তারপর?’

‘বোনের সঙ্গে খেলা করি, কথা বল্যি, ঘুমাই…’

‘তোমার কতজন আছে! ঠাকুমা, মা, দাদারা, বোন! তুমি খুব ভালো আছ বন্ধু, এমনই ভালো থাকো৷’

‘ইস! পা খুঁতা, বেড়াতে পারি না দূরে…খানিক এস্যে টুকা বস্যি, টুকা জিরাই…তবে হ্যাঁ! মা মাটির ঘোড়া মানত কর্যেছে, আমার পা ভালো হয়্যে যাবে৷’

‘ওই যে অনেক বেরোও না, অনেক দেখ না, খুব, খুব ভালো আছ তুমি৷ আচ্ছা! এবার চলে যাও তুমি…আমিও যাব৷’

বন্ধু উঠে দাঁড়াল, মানিকও৷

কীরকম পোশাক! কী সুন্দর বড়ো বড়ো চোখ! যেন সত্যিকারের মানুষ নয়৷

‘ঘরে যাও বন্ধু৷’

‘আবার কব্যে আসব্যে?’

‘দেখি! তোমার আর আমার…ঠিক দেখা হয়ে যাবে৷ আমার কথা কাউকে বলনি তো?’

‘তাই বলি?’

মানিক যখন বেরিয়ে এল তখনও বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে৷ মানিক চেঁচিয়ে বলল, ‘তুমি কুথা থাক্য গো?’

বন্ধু আঙুল তুলে ওপর পানে দেখাল৷ বলল, ‘আকাশ থেকে উড়ে আসি৷’

‘পাখির মতো?’

‘তুমি যাও!’

‘আবার আসব্যে…’

ঘরে ফিরতে ফিরতে আজ মানিক সাঁজা ফুল পেয়ে গেল৷ অনেক, অনেক ফুল তুলে নিল৷ মা সাঁজা ফুল চচ্চড়ি করে কচু আর চিংড়ি দিয়ে৷ মা খুব খুশি হবে৷

আসলে যেদিন থেকে বন্ধু পেয়েছে, সেদিন থেকেই নীলকন্ঠ পাখিটা মানিকের সঙ্গে উড়ে উড়ে চলে৷ নীলকন্ঠ হল স্বর্গের পাখি৷ নীলকন্ঠের সঙ্গে চললে ভয়ভীত থাকে না৷ স-ব বন্ধুর জন্যে হচ্ছে না তো?

মানিক মনে মনে বলল, হেই নীলকন্ঠ! আমার বন্ধুরে সুভালাভালি রেখ্য গো! তার মুখ হাসে তো চক্ষু হাসে না৷ মা ভাত লয়্যে বস্যে থাকে না, বড়ো দুঃখ তার!

সাঁজা ফুল দেখে মা হেসে ফেলল৷

‘কুথা পেল্যি?’

‘মা ষষ্ঠী দিল্য৷’

‘মানিক! কেমুন কথা বল্যিস?’

‘তুই তো বল্যিস, ঠাকুর না দিল্যে কেও কিছু পায় না!’

ঠাগমা বলল, ‘কেমুন কর্যে জানলি, মা সাঁজা ফুল, সাঁজা ফুল কত্তেছে?’

‘আমি স-ব জানতে পারি৷’

মানিকের মা গালে আঙুল রেখে চেয়ে রইল৷ কী হয়েছে মানিকের? বুনো ও, বনবাদাড়ে ঘোরে তো চিরকাল৷ এখন যেন, ওর ভেতরে আলো জ্বেলে দিয়েছে কে৷ মা মনে মনে বলল, মানিক বল্যে বড়ো টান গো ঠাকুর! ওরে ভালো রেখ্য৷ পা-খুঁতা ছেলা আমার!

কত কী যে আশ্চর্য জিনিস ঘটল বাংলা ১১৬৪ সনের বৈশাখে, তা ভাবতে পারবে না৷

এক সকাল বেলা দৌড়ে দৌড়ে এল গঙ্গারামকাকা৷ বলল, ‘ব্বাপো রে ব্বাপো! এমুন কাণ্ড জন্মে দেখি নাই, শুনি নাই৷’

‘কী হল্য? ও ঠাকুরপো!’

‘তোমার ব্যাটারা বলুক!’

‘বাব্বা! ঢোলডগর বাজে কেনি?’

ঢোলডগর বাজাতে বাজাতে একোদের সঙ্গে বিশ জন ছেলে ঢুকে পড়ল৷

ঢোলে চাঁটি মেরে ঘুরে ঘুরে দুলে দুলে গদন কাওরা গেয়ে উঠল,

‘আশ্চাজ্জ কথন হে-এ-এ-এ আশ্চাজ্জ কথন!

নবাবি হুকুমতে হে-এ-এ

পুণ্যার লতুন কথন…’

মা লাঠি তুলে তেড়ে গেল৷

‘গলায় সুর বুলে না ছোঁড়ার, গান করে! বল, কী বলতেছিস?’

গদনকে থামায় কে! সে কাঁঠাল গাছ তরতরিয়ে বেয়ে উঠে গেল৷ ডালে দাঁড়িয়ে এক হাতে আরেকটা ডাল জড়িয়ে অন্য হাতে লাল গামছা নেড়ে বলল, ‘নবাবের হুকুমত! জগৎ দত্তের নাকে খত! হাঁ গো বজ্যঠি! বড়ো মুনশি জগৎ দত্তরে খুব হজিমত দিয়া করাছে৷ পুণ্যার লেগে তুমি পাতুল হতে ঘোনাপাড়া, ও দিগরে কুন-অ গাঁ হতে কিছু ল্যিবে না৷ ল্যিয়েছ কি মহলদারিটি কেড়্যে লিবে, হাঁ!’

‘বলল?’

‘আর বলল, টাকা লাও, গাঁ দিগররে পুণ্যাতে পাঁচ তরকারি ভোজন দাও৷ অ্যানেক ল্যিয়েছ হে, বর্গির হাংগামাকালে আমার ই গিছে, সি গিছে, বুড়া নবাবরে টাকা দিছি বল্যে৷’

‘জগতের বুক ফাট্যে যাব্যে৷’

‘এখুনি ফাটত্যেছে৷ বলে, তারা অ্যানেক খায়৷ মুনশি বল্যেছে, অ্যানেকই খাব্যে৷’

‘ই হল্য কেমুন কর্যে?’

‘সবে বলত্যেছে নবাব সঁপন পেয়্যেছে৷’

‘গঙ্গারাম বলল, সাহেবদের সাথ লঢ়াই করে আল্য, উয়ার মনে ফুত্তি আখুন৷ বুঝলে বউঠান?’

‘বুঝলাম৷ আখুন গাঁ ডাক ঠাকুরপো, ষষ্ঠীথানে পূজা দিক সকল্যে৷’ একোরা ধামা ধামা চাল আর তিনটে গামছা নামিয়ে রাখল, এক গেঁজে কড়ি৷

‘ওজগার, মা, ওজগার!’

মানিক মুখে আলো মেখে চেয়ে থাকল৷ নীলকন্ঠ পাখির আশীর্বাদে সব হচ্ছে৷

বন্ধু, বন্ধু জানলে কত খুশি হবে?

খুব, খুব আশ্চর্য ছিল ১১৬৪ সন৷ আম বাগানের পর বাগানে গাছে গাছে ধরেছিল রানিপসন্দ, বেগমপসন্দ, আনারসা, চৌরসা, সাদৌলা, শত শত নামের আর জাতের আম৷ মানিকরা তো ওসব আম কখনো খায় না৷ গরমকালটা গরিবরা আমকাঁঠাল খেয়েই কাটিয়ে দেয়৷ মানিকদের জন্যে এখানে-সেখানে গাছে গাছে মধুকুলি, জাংদার, আতাবোনা আম ফলে থাকে৷ এ বছর গাছে পাতা যত, আম তত৷ কবিরাজমশাই মাথা নেড়ে বললেন, ‘ভালো নয়, এ ভালো নয়৷ একটা কিছু হবে৷’

গঙ্গারাম আর মানিক এক বোঝা আকরকরা, গজপিপুল, হিড়িঙ্গী, আঁতমোড়া গাছগাছড়া নিয়ে গিয়েছিল৷

কবিরাজমশাই গাছগাছড়া দেখে কেন বললেন, ‘ভালো নয়, ভালো নয়৷’

গঙ্গারাম ডান কানে কম শোনে, তাই চেঁচিয়ে কথা বলে৷ সে বলল, ‘কী বল্য কত্তা? ই গাছগাছালি ভালো নয়?’

‘না রে৷ আমি লক্ষণ দেখি, দুর্লক্ষণ৷’

‘কীসে?’

‘আরে মূর্খ! মুর্শিদাবাদে আমের নিয়ম৷ এ বছর সুফলা তো পরের বছর অফলা, কম ফলবে৷’

‘তাই তো!’

‘তেষট্টি সনে কত আম খেয়েছিলি?’

‘উ বাবা! হাটে গেল্যে বেপারি বল্যে, যা পার দিয়ো৷ যত পার্য লাও৷ ই মানিকের বুনটা…বুঁচি…উয়ার শ্বশুরঘরে বউঠান আম পাঠাল্য তো শাউড়ির কান্না কী! ঘরে আম, উঠানে আম, ব্যান আমই পাঠাল্য? সি হাসির কথা বেট্যে!’

‘তাহলে?’

‘কী হল কত্তা?’

‘তেষট্টিতেও আম, চৌষট্টিতেও? খুব খাব বলে নাচলে তো হবে না৷ লক্ষণটি তো দেখতে হবে৷ এমনটা হলে একটা কিছু হয়৷’

‘ধুর কত্তা! কী হব্যে? আমি তো দেখি সুদিন আল্য৷ লইলে পুণ্যার আদায় মুকুব হয়? জগৎ দত্তের উঠানে সাত জাতের ডাক পড়ে?’

‘গঙ্গারাম রে! এমনটি যখনই হয়েছে, তখনই ঘোর সর্বনাশ হয়েছে৷’

‘কেমুন?’

‘এমনটিই হয়েছিল এগারোশো সাতচল্লিশ সনে৷ নবাবদের বল৷ জগৎ শেঠদের বল৷ বড়ো বড়ো আমবাগান থেকে আম বিলাতে হয়েছিল৷ সেসব তো মধুকুলি আম নয়! সাদৌলা কি কোহিতুর, সময়টি হলেও খেতে হবে৷ সে বছর গাড়ি গাড়ি আমে পচ ধরে যায়, ফেলেঢেলে দিতে হয়৷ সেই আঁটি হতেই যে গাছ উঠল…এই যে আমের জঙ্গল সর্বত্তর, তা থেকেই৷’

‘সি মন্যে নাই৷’

‘আবার আটচল্লিশ সনে ফিরে আম হল? আর সে বছরই বর্গিরা এল৷’

গঙ্গারাম নিশ্বাস ফেলল৷ বলল, ‘কত্তা! আবার বর্গি আসবে?’

‘কী করে জানব? একটা কিছু হবে৷’

মানিকের মনে পড়েছে৷ ওর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল৷ ও বলল, ‘অ কাকা! মনে নাই?’

‘কী বলিস বাপো?’

‘ঘোনাদাদু মরণকালে বলে নাই?’

‘কী বল্যেছিল? আরে, আমি তো ছিলাম সারগাছি-মানকরা৷ ঘর এলাম তো শুনি বুড়া মরে গিছে৷’

‘দাদু বল্যে গিছে, লতুন বর্গি আসব্যে৷’

কবিরাজমশাই বালকের কথাকে আমল দিলেন না৷ মাথা নেড়ে বললেন, ‘আর কখনো আসে? সেসব চুকেবুকে গেছে৷’ গঙ্গারাম বলল, ‘আল্যে আসব্যে, না আল্যে না আসব্যে৷ উ আমরা ভাবি না৷ আস্যে তো ছেলেরা দেখব্যে৷ তাখুন আমরা দেখ্যেছি, লড়্যেছি৷ উ তো লবাবে রাজায় যুদ্ধ মাশায়৷ মানিক্যের বাপ! আহা, শূরবীর মানুষ গো! সি মরল্য, তেমন কত মরল্য, উলুখ্যাড়ের জন্ম তো মরত্যে না কি বল্য? আখুন বল্য, গাছগাছালির দাম কী দিব্যে?’

‘দাঁড়া, দেখি আগে৷ আহা হা, এ যে খাসা আকরকরা গো! সোমরাজি গোত্তর! কিন্তু গাছ আনলে বাপ, মূলটা যে চাই?’

‘দিব্য৷ কত আনব্য?’

‘অনেক আছে?’

‘অ্যানে-ক!’

‘আঁতমোড়া! আহা হা, কবে থেকে খুঁজছি৷ এসব গাছ তুই চিনলি কী করে?

গঙ্গারাম বলল, ‘উ চিনব্যে নাই, উ ছেলার পা খুঁড়া…কিন্তু ছেলা সামান্য লয় কত্তা! বনের সকল গাছ উয়ার সাথ কথা কয়! আর চিনার কথা? ঘোনাকত্তা সব শিখায়্যে গেছে উয়াক৷ সি মাহাজ্ঞানী ছিল্য মাশায়! গাছপালা, আকাশ, বাতাস, জল, স-ব জানত্য! সি থাকত্যে আমারদের মাথা ছিল্য৷’

‘কোথায় এসব গাছ পাস?’

মানিক মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘সি বলব্য নাই৷ যা বলব্যে দিয়্যে যাব্য৷’

‘ভালো! ভালো! আমি গাছগাছলা পেলেই হয়৷ আমার সঙ্গেই শেষ! তারপরে তো ছেলে পারবে না৷’

নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘একটা কাজের কথা আছে৷ জগৎশেঠের নাম তো জানিস গঙ্গারাম!’

‘শুন্যেছি৷ তিনি সোনার থালে খায়, রুপার ঘটিতে জল খায়৷’

‘না না, শ্বেতপাথরের থালে খায়৷ যাক গে, তার বুড়ো কাকার চোখে ছানি পড়েছে৷ আমি সেথা থেকে ওষুধ দিয়ে ছানি কাটব৷’

‘কবে?’

‘আষাঢ় মাসের শুক্লা চতুর্থী না হলে…সাদা আংড়া, বুঝিস?’

মানিক বলল, ‘মোটা পাতা! হলুদ হলুদ ফুল হয়! পাতা দেখত্যে চক্ষুর মতো!’

‘বাঃ! বাঃ বাঃ! তুই যদি দুলের ছেলে না হতিস…’

গঙ্গারাম শুকনো গলায় বলল, ‘পবন দুলের ছেলা মানিক! সি জনা শূরবীর ছিল মাশায়!’

‘হ্যাঁ…যাক গে৷ শোন বাপ! আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষ পড়ল তো সাদা আংড়ার শিকড়ে রস জমল৷ তখন আমি মুর্শিদাবাদ যাব৷ তুই তাজা পাতা নিয়ে আমাকে পৌঁছে দিবি৷ এ জন্যে…’

চোখ বুজে কী ভেবে বললেন, ‘তোকে রুপোর টাকা দেব দুটো!’

বেরিয়ে এসে গঙ্গারাম বলল, ‘এখন শুধু এক সিকা! সেও ভালো৷’

‘মা বুঁচির নখ গড়াব্যে৷’

‘তখন তোরে দু-টাকা!’

‘মা বুঁচির হার গড়াব্যে৷’

‘কত্তা নিজে তো এক গেঁজা মহর লিব্যে৷ সোনার মহর!’

‘নিক গা৷ ঘোনাদাদু বলত্য, যখুন বড়ো হব্যি, তাখুন ই গাছগাছালির গুণ শিখাব্য৷ সি মর্যে গেল্য৷’

‘তাতে কী? হোই কাঙ্গাল পালের গাড়ি যায়৷ হাটে হাঁড়ি-কলস লয়্যে গিছল্য৷ চল! উয়ার গাড়িতে উঠি৷ এত সামগ্যি!’

শুধু সিকে নয়, পাঁচ কাঠা চাল, তিন কাঠা ডাল, একটা গামছা দিয়েছেন কবিরাজমশাই৷ এক ক্রোশ পথ হেঁটে এনেছে! পা টেনে চলে ছেলেটা!

‘নানা সামগ্যি রে মানিক!’

মানিক গাড়িতে বসে হেলান দিল৷ কাকা অবাক হচ্ছে কেন? মানিক তো জানেই এমনটা হবে৷ আজ ভোরে উঠোনে নেমেই ও নীলকন্ঠ পাখি দেখেছে যে!মানিক চোখ বুজল৷ গোরুর গাড়ির চাকা কেমন কাঁদে, ক্যাঁ, কোঁ! ক্যাঁ কোঁ!

গঙ্গারাম বলল, ‘চাকায় তেল দিস না কাঙ্গাল?’

সবচেয়ে জমেছিল জগৎ দত্তের বাড়ি পুণ্যার ভোজটা৷ ঠাগমা যায়নি৷ কিন্তু মা সকলকে অবাক করে বলল, ‘কাপড়টা ক্ষারে কেচে দিব্যি তেনো! অমুন ভারী গড়া কাপড় বুঁচি পিটাতে পারব্যে নাই৷’

‘তুই যাব্যি, মা?’

‘কেনে যাব্য নাই? কাঠ লয়, কুমড়া লয়, কিছু দিত্যে হব্যে লাই৷ লবাবি হুকুমে মান দিয়্যে ডেক্যেছে৷ যাব্য নাই? মাশায়রা ডাক্যে কখুনো?’

একো বলল, ‘কেনে? বর্গির হাংগামার কালে?’

মা সবসময়ে চুলগুলো চুড়ো করে শূন্যে মাথার ওপর একটা বড়োসড়ো তালের মতো জড়িয়ে বেঁধে রাখে৷ এককালে নাকি মায়ের চুল ছিল মেঘের মত কালো৷ মানিক যবে থেকে দেখছে, চুলে রুপোলি সুতোর মত অনেক রেখা৷

এখন মা চুল খুলে আঙুল দিয়ে জট ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, ‘তখুন বর্গির কাল! মাশায়রাও ধুমেধামে পূজা দেয়, বর্গিরাও দেয়৷ আর মাশায়রা যত দুলে, বাগদি, কাওরা, ডোম, চায়িঁধানুকি, তিওরদের ডাকে৷ তারা বিনা বর্গি পড়ল্যে লাঠি-তির-বর্শা-টাঙ্গি চালাত্য কে? বর্গি তো গেল্য৷ ইয়ারা বছরে চারবার কালী উঠায়, আশ্বিনে দুর্গা, দশহরায় গঙ্গাপূজা, কই, আখুন তো ডাক্যে না? যাব্য, যদি দেখ্যি, হেলাচ্ছদ্দা, পাত উলটায়্যে দিয়্যে গ্রাম ডাক্যে উঠায়্যে লিয়্যে চল্যে আসব৷ হাঁ! আমি বটি মাতং দুলের বিটি, পবন দুলের বউ!’

ঠাগমা বলল, ‘মাতুঙ্গী? যাব্যি ত ভাল্য মনে যা!’

‘মায়ের নাম মাতুঙ্গী?’

‘হ্যাঁ বাপো!’

মা অমনি সামনে থেকে সরে গেল৷

একোরা এ-ওর দিকে চাইল সবাই৷ এই দেখো! এও এক আশ্চর্য! মা তো ‘একোর মা’, ঠাগমার ‘বউ’! মায়ের নাম তো জানা যায়নি আগে? মানিক গিয়ে মায়ের আঁচল ধরল৷

‘মা, তোর নাম মাতুঙ্গী?’

‘ছাড় বাপো! লামের সাঁজান কে রাখ্যে বল? ছেলাকালে বাপ-মা ডাকত্য৷ তা বাদে…আমিও ভুল্যে গিছি৷’

মা তবে ছোটো ছিল? রামের ভাইয়ের বিটি চন্নুনির মতো?

বুঁচির মতো? পুতুল খেলাত, রান্নাবাড়ি খেলাত, ডুরে শাড়ি পরত, নাকে নোলক দুলত?

এসব গল্পকথা, গল্পকথা! মা মানে বল ভরসা৷ মা মানে মাথায় চুড়ো করে চুল বাঁধা৷ হাঁটু অব্দি তুলে মোটা গড়ে কাপড় পরা৷ দশজনের খাটনি একলা খাটা, বাজখেঁয়ে গলায় হাঁকুর পাড়া৷

অবাক হয়ে মানিক মাথা নাড়ল বার বার৷

তা বলে পুণ্যার দিনে ঘোনাপাড়া থেকে পাতুল অব্দি সব গাঁয়ের মানুষরা খালি হাতে গিয়েছিল এ যদি ভাব, তাহলে খুব ভুল করেছ৷ সবাই যাকে বলে, শূরবীরের জাত৷ বর্গিদের সঙ্গে লড়তে কে যায়নি? চায়িঁধানুকিদের তির আকাশ ছেয়ে ফেলত৷ ডোম-বাগদি-বাউরি-কেওট-কাওরা-তিওর-দুলে এমন কত, কত জাতের মানুষ চিরকাল লড়াই করছে৷ তাদের যাকে বলে আত্মসম্মান নেই? রাবণ তিওর তো তির ফুরিয়ে যাওয়া অব্দি গিরিয়ার মাঠে লড়েছিল আর ধরা পড়লে বলেছিল, ‘লাঃ! মাথা লামাব নাই! কেট্যে লিব্যি তো কেট্যে লে! মাথা লামাব নাই, মানও দিব্য না তোরাদের!’

সেকথা আজও বুড়োরা বলে৷ রাবণ তিওরের, পবন দুলের, উদ্ধব বাউরির, সূর্য ডোমের বীরত্ব আর সাহসের কথা৷ সূর্য বলত, ‘কাপড় গেলে কাপড় কিনতে পার্য, চাল নাই তো ধান লুট্যে আনতে পার্য৷ কিন্তুক মান গেল্যে আর পাব্যে নাই, বাপ সকল! মান হল্য গঙ্গার উজান সোত! যি জলটো উজানে যায়, সি জল কি আর ফিরে? ফির্যে না৷’ এরাও তো আত্মসম্মানী৷ তাই জেলেরা ডিঙি নৌকো ধুয়ে মেজে শুকিয়ে মাথায় বয়ে নিয়ে গেল৷ তাতে ডাল ঢালা হবে, আমের টক৷ মেয়েরা নিয়ে গেল বড়ো বড়ো খেজুর পাতার ঠাসবুনোট চাটি, তাতে ভাত ঢেলে পাহাড় করা হবে৷

কুমোররা নিয়ে গেল এই বড়ো বড়ো জালা, তাতে বেন্নন রাখা হবে৷ ছুতোররা দিল কাঠের হাতা, কামাররা গড়ে দিল লোহার ডাবর হাতা, ছেলেরা নিয়ে গেল বোঝা বোঝা কলাপাতা৷ যে-যার জলখাবার পাত্র নিয়ে গিয়েছিল বটে৷ কুমোররা হাজারটা মাটির ঘটি কেমন করে ঝপ করে গড়াবে? রান্নাও হয়েছিল অমৃত সমান৷ হবারই কথা৷ শ্রীধর চটখণ্ডীর মা বসে থেকে নির্দেশ দিয়ে রান্না করিয়েছিলেন৷ এই বামুন মা-র রান্নায় এত নাম যে, বড়ো যজ্ঞি হলে ওঁকে পান, কাপড়, হলুদ, নারকেল প্রণামী দিয়ে পালকি করে আনতে হয়৷ উনি বলে যান, বামুন ছেলেরা রাঁধে৷ শ্রীধররা চার ভাই৷ এক ভাইপো দক্ষ রাঁধুনি৷

চটখণ্ডীর মা বললেন, ‘ঝাল মরিচ ঢেল্যে রাঁধবি রে! উয়ারা ঝাল ভিন্ন খায় না৷’

পাঁচখানা ব্যঞ্জন, শুক্তো, বেগুন-কুমড়ো-কচু-পুঁইশাকে মাছের মাথা দিয়ে চচ্চড়ি, নটে শাক আর চিংড়ি ভাজা, চিতল মাছের ঝাল, রুই মাছের ঝোল৷ না, পায়েস-টায়েস মিষ্টি জিনিস ওরা তেমন পছন্দ করে না৷ ওদের পছন্দমতো সর্ষেপোস্ত বাটা দিয়ে সবচেয়ে টক আমের ঝাল ঝাল টক হয়েছিল৷

খেয়ে সব ধন্য ধন্য৷ ডিঙিগুলো জেলেরা ধুয়ে নিয়ে গেল৷ খেজুরপাতার চাটি, মাটির জালা, কাঠের হাতা, লোহার হাতা, এঁটো পাতা সব পগাড়ে ফেলে দিল৷

জগৎ দত্ত ঘুরে ঘুরে ‘ভালো করে দাও গো! ঘোনাপাড়ার কেউ যেন বাদ না পড়ে’ বলছিল৷

আর সব শেষে বলল, ‘ঘরের মানুষদের জন্যে নিয়ে যাও বাপসকল! মা জননীরা! সবাই তো আসতে পারে নাই! দেখো! নিমন্তন্নকালেই বলেছি, খাবে, ঘরে নিয়ে যাবে, বাসন এনো৷’

মা পেতলের পরাত এনেছিল৷ ঠাগমার জন্যে বেন্নন আর টক নিল৷ খেয়ে-দেয়ে, ‘খুব খেলাম গো মাশায়! ধন্য ধন্য খেলাম!’ বলে পান-সুপুরি-চুন-দোক্তাপাতা নিয়ে সবাই চলে এল৷

বুঁচির শাশুড়ি মানিকের মা-র পাশে বসে খেল৷ পুকুরে হাত ধুয়ে বলল, ‘অ ব্যান! বউ কিন্তু মাঘ মাসে আনব্য আমি!’

‘ঘর কত্তে?’

‘না গো! সাত দিন রাখব্য কাছে! আমার ননদ আসব্যে কাঁদী হত্যে, বউ দেখব্যে৷’

মা নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘উ আখুন তোমরাদের বউ! ই বছর পারব লাই, উ বছরে একোর আর দুকোর বউদেরে আনব্য, বুঁচিরে পাঠাব্য৷ হাতে হাতে কাজ কর্যে, তব্যে হেঁসেলে দিয়ো না ব্যান! পারব্যে নাই৷’

‘ই দেখ্য! কচি বউ কেও হেঁসেলে দেয়? আমরা তিনো জা আছি ক্যানে? ঘড় বড়ো খালি ব্যান! বউ ঘুরব্যে, দেখব্য, বড়ো সাধ কর্যে গো!’

‘তব্যে আর কী? পাঠাব্য তারে৷’

বুঁচি কিন্তু ওর বরকে ভেংচি কাটছিল৷ মানিককে বলছিল, ‘দেখ কেনে ছোটদাদা, খেয়্যে প্যাট ফুল্যেছে কেমুন?’

বুঁচির বুদ্ধি হয়নি৷

মানিক ভাবতে ভাবতে চলল, ‘এত যে আশ্চর্য সব কাণ্ড হল, স-ব বলতে হবে বন্ধুকে৷’

গঙ্গারামকাকা বলল, ‘বউঠান! আমরা তো ই সন ভাল্যই যাব্যে দেখি৷ কবিরাজ মাশায় ওঠা অলক্ষণ দেখ্যে!’

‘মানিকরে না কি তিনি মুশ্যিদাবাদ নিব্যে?’

‘হাঁ গো! দু-টা টাকা দিব্যে!’

‘আশ্চাজ্জ কথা বট্যে ঠাকুরপো!’

সত্যিই অবাক কথা৷ টাকার সঙ্গে মানিকদের কারবার খুব কম৷ কড়ি চলে বাজারে, নয় তামা আর লোহা মেশানো ঢ্যাবা পয়সা৷ রুপোর সিকি বা টাকার দরকার কমই পড়ে৷ যদি দরকারও হয়, একটা গোটা টাকা রোজগার করা কঠিন৷ বর্গিরা তো ‘তঙ্কা দেহ, তঙ্কা দেহ’ বলত তরোয়াল তুলে৷

সব সময়ে তো পেত না৷ মেদিনীপুরেই এক ছোটোখাটো রাজা টাকার বদলে কড়ি দিয়েছিলেন৷

হ্যাঁ, পবন যখন বেঁচে ছিল তখন টাকা হাতে পেয়েছে মানিকের মা৷ সে তো একটা শূরবীর মানুষ৷ সে টাকা পেতে পারে৷ কিন্তু মায়ের কোলপোঁছা ছেলে খুঁতো-পা মানিক পাবে দুটো রুপোর টাকা?

মা আবার বলল, ‘উ গাছবাকলের এত্য দাম?’

‘হ্যাঁ বউঠান! কবিরাজমাশায় অষুধপালা কর্যে বড়ো বড়ো ঘরে৷ এত্য এত্য সোনারুপা পায়! তা অষুদ আসে কি বাতাস হতে? উ-ই গাছবাকল ভসসা!’

‘আশ্চাজ্জ কথা! বনে বনে ফির্যে ঘোনাকত্তা উয়াক গাছ পাতা চিনায়, আমি ভাব্যি ই ছেল্যেখেলা! কিন্তুক…ই একটো…কাম বট্যে? আশ্চাজ্জ!’

‘উ ছেলাও আশ্চাজ্জ! সিকা ধর্যে বল্য, মা বুঁচির নথ গড়াব্যে৷ দুটা টাকা পাবে শুন্যে বল্য, মা বুঁচির হার গড়াব্যে! আমারদের ঘরের ছেলা এমুন বুড়ার মত্য চিন্তা কর্যে?’

‘না, কর্যে না৷ ই সনে সবই আশ্চাজ্জ!’

কবিরাজমশায় মানিককে পেয়ে কি কম খুশি? গিন্নিকে বললেন, ‘এ ছেলে যদি পড়তে জানত সদার মা! তাহলে কাণ্ড করে ফেলতাম৷’

‘দুলে-কেওরা-তিওর-বাগদি যদি পড়বে, তবে আমাদের ছেলেরা যায় কোথায়?’

‘সকলকে দিয়ে কি সব কাজ হয়? সদা আর গদা পাঠশালে যায় বটে, কিন্তু অষুদবাকল চিনে না আজও৷ উপেনটা শিখছিল, সে চলে গেল৷’

‘ওই যে ভূতের দল পুষেছ, কাঠা কাঠা মুড়ি আর হাঁড়ি হাঁড়ি ভাত খায়, ওরা?’

‘ওরা খানিক শিখবে তা বাদে গাঁয়ে যেয়ে কবিরাজ হয়ে বসবে৷ ও কাজগুলোও তো করা দরকার৷’

সত্যিই কবিরাজ বাড়ি-এটা ছেঁচো, ওটা বাটো…এটাকে রোদে শুকাও, সেটাকে গুঁড়ো করো, এসব না হলে তো ওষুধ হয় না৷ শেঠরা যদি সাহায্য করে, তবে মুর্শিদাবাদে গিয়ে বসবেন৷ ওষুধ তৈরি করতে প্রবাল-মুক্তা-সোনা-রুপো-গজদন্ত, কত কী লাগে! শহরে অনেক রত্নব্যবসায়ী৷ তারা দিতে পারে সব৷ রাজবৈদ্য, নয় শেঠদের খাসবৈদ্য হতে চান কবিরাজমশাই৷ কিন্তু দুষ্প্রাপ্য লতাপাতার বড়ো অকুলান৷ মানিক যদি থাকে৷ কবিরাজমশাই নির্ঘাত ভেষজ উদ্যান করবেন একটা৷

মানিক গাছ লাগাবে, পালবে, দেখবে৷

কবিরাজমশাই ছাত্র জোটাবেন কিছু৷ শহর ছাড়া তেমন ছাত্র মিলবে না৷ তাদের শেখাবেন৷ মানিক কেন দুলের ছেলে? বামুন-কায়েত-বদ্যির ছেলে কেন নয়? ওকে কোনোদিন বলতে পারবেন না এটা কর, ওটা কর৷

তাহলেই সর্বনাশ!

দুলের ছেলে ঘরে তুলেছ? তোমাকে কেউ ডাকবে না৷ কিন্তু কী বোঝে, কী সুন্দর বোঝে ছেলেটা!

‘চাকুল্যার শিকড় যে চাই রে!’

‘আখুন? ভাদ্দরে আমাবস্যা হবে তবে শিকড়ে রস হবে৷ ওই রসেই তো গুণাগুণ গো কত্তা!’

‘বাপ রে! সুশ্রুত জানিস না, মহৌষধি রত্নসার পড়িসনি, এত জানিস?’

‘ঘোনাদাদু সব জানত৷ সে গাছ লাগত, আবার বনের গাছগাছলা খুঁজেও বের করত৷ আমাকে সাথকে লয়্যে ঘুরত্য, সব চিনাত৷ উনিশ জাতের নাগবলা, তেরো জাতের বামনহাটি, স-ব, স-ব!’

‘সে অষুদ করত?’

‘কিছু কিছু৷’

‘একা?’

‘আমি ধুয়ে-কুটে-বেছে দিতাম৷ সে ছেঁচত, জ্বাল দিত, বাটত৷’

‘আজ কী আনলি?’

‘দুধআমলার পাতা আর লতাডুমুর৷’

কবিরাজমশাই মন ঠিক করে ফেললেন৷ বললেন, ‘নে, আজও সিকি দেব৷’

‘এক সিকি!’

‘মুর্শিদাবাদ নিয়ে যাব তোকে৷ সেখানে মস্ত শেঠ, জগৎ শেঠ, জমি চেয়ে নিব, অষুদপালার বাগান করব৷’

‘অ্যানেক দূর নয়?’

‘কত আর দূর? আসবি-যাবি, যাবি-আসবি, বাগানটা করলে মানিক! পাঁচ টাকা মাইনা! বেড়ে দশ হবে! তোর মা ইট পুড়িয়ে দালান দেবে দেখে নিস৷’

‘লা কত্তা! মাট্যা ঘরে শান্তি কত! আর! মা অমুন ঘর লিব্যে না৷ আমাক ছেড়্যে অ থাকব্যে না কুনঅ দিন৷’

‘নয় আমাকে অষুদপালা জোগালি? মুরশিদাবাদ দেখলে…কত যে আশ্চজ্জ জায়গা…একবারটি চল না!’

কবিরাজের মন বলল, ভুলে যাবে, ভুলে যাবে৷ একবার দেখলে গাঁ ভুলে যাবে৷

‘দাও কী দিব্যে৷ আমি ঘর যাব৷’

রুপোর সিকি নেড়েচেড়ে মানিক বলল, ‘তুমি বড়ো ভালো গো কত্তা! ই দিয়্যে মা বুনকে গহনা গড়্যে দিবে৷’

বাড়ি ফিরতে মা বলল, ‘এমন আশ্চাজ্জ কথা! দাদারা যা পার্যে নাই, ভাই পারল্য৷’

ঠাগমা বলল, ‘মানিকের বাপ থাকত সোনা-উপো হাতে ধরতাম, আখুন মানিক ধরাল্য৷ বুনো বুনো বল্যেছি তা ঘোনাদাদা বলত্য, উ হিরামানিক চিন্যে, কিন্তুক তার কতার মম্য বুঝি নাই তখুন৷’

মানিক হেসে গড়িয়ে গেল৷ কীসের হিরে, কীসের মানিক? দুপুরে কলমিশাক আর শোলমাছ পোড়া আদা, লঙ্কাবাটা আর তেল দিয়ে মেখে তাই দিয়ে ভাত খেতে খেতে মানিক বলল, ‘আমার পা ভাল্য হব্যে মা?’

‘লিচ্চয় হব্যে৷ জন্মকালে উ পা মুড়্যে পেট হতে পড়ল্যি, তাথেই অমন! মাটির ঘোড়া মেন্যে এলম না?’

বুঁচি বলল, ‘খুঁতা পা, তাতেই ঘর্যে থাকিস না!’

মা বলল, ‘না থাকুক৷ যুজ্যে যাব বল্যে তো দাদাদের মত ঘুর্যে বুলছে না?’

‘কুথা যুজ্য, মা?’

‘আমি জানি? লতুন লবাব খালি যুজ্য কত্তেছে, কুন-বা ফেরেংগি, না কি সাদা বর্গিদের সঙ্গে! উরা যুজ্যে যাবে!’

‘সত্যি যাবে?’

‘কে নিবে উদের? দেওর বল্যে গেল, আখুন যুজ্য কত্তে বন্দুক চাই, এই বড়ো বড়ো নাঙ্গা তলোয়ার! সড়কি-বল্লম-ধনুকের দিন নাই! খানিক ঘর্যে থাক, বেরাস না মানিক!’

‘হ্যাঁ…ঘর্যে আছ্য তো! মা কবিরাজ কত্তা কী বলে জানিস?’

সব শুনেমেলে মা বলল, ‘দেখা যাব্যে৷ এতজনা গাঁয়ে থাকতে তুই বা কেন তার সেথো হল্যি, গাছগাছলা চিনল্যি, কে জানে? কিন্তুক আখুন নয়, কী-বা যুজ্য, কী বা বেধ্যেছে, সব ঠান্ডা হোক!’

ঠাগমা পান-তামাকের টোপলা গালে দিয়ে বলল, ‘সকল কি শেতল হয় বউ? ঘোনাদাদা ছিল ঠাউরদেবতা মানুষ! গাঁ-খানা যেমুন মাথায় নে চলত৷ মরণকালে বল্যে গেল, আবার বর্গি আসব্যে, সব লতুন বর্গি, সে জনা মনে মনে বুঝ্যেছিল৷’

‘মা! যুজ্য কেন কর্যে গো?’

‘যা, দাদাদেরে শুধা৷’

মা খেজুরপাতা নিয়ে চিরতে বসল৷ আর মানিক খেজুরপাতা গুছিয়ে রাখতে রাখতে ভাবল, ওই কথাটাই ভাব্যি নাই?

বন্ধু কত কী দিছে আমাক, আমি একটো চাটি নিজে বানাব্য সি বস্যে কথা বলব্যে৷

চাটিটা মানিক বানিয়েছিল৷ আর দেখে মা গালে হাত দিল৷ এমন চিকন করে পাতা চিরে এমন চাটি বানাতে তো সে পারে না? মানিক! সব আশ্চর্য তোর? বনে বনে ফিরিস, অষুধপালা তোর মতো কেউ চিনল না? চাটিটা বুনলি, এমন চাটি কেউ বুনল না? তবে তোর ঠাকুমা ঠিকই বলে? তোর কোন ঘরে জন্মাবার কথা ছিল, কোন ঘরে জন্মালি? কোন দেবতা ঠিক করে, দেয় এসব? মা ষষ্ঠী?

বেঁচে জীয়ে থাক মানিক, আর কিছু চাই না৷

কিন্তু মানিক চাটি নিয়ে যায় আর ফিরে আসে৷ আসার সময় অষুধমালা জোগাড় করে৷

দিতে যায় কবিরাজমশাইকে৷

সব কথা যাকে বললে সে মানুষ শুনে খুশি হত, সে মানুষ গেল কোথা?

আসে না, সে আসে না৷

এর মধ্যে আষাঢ় না আসতে আকাশ থেকে ইঁদ রাজার ঐরাবত সাতসমুদ্দুরের জল ঢালতে থাকল নীচে৷ দিনেমানে আকাশ কালো, পাখপাখালি গাছের ডালে বসে ভেজে, গর্তের সাপ শুকনো জায়গা খোঁজে, মানিক ওর স্বর্গের বাগানে যায় কী করে?

নদীনালা খালবিল ভাসাভাসি, উঠোনে কইমাছ কানে হেঁটে যায়, ঠাগমা বলল, ‘শনিতে লাগল্য, মঙ্গলে ছাড়ব্যে, তার আগে আকাশ ফার্সা হব্যে নাই৷ আর বউ! রীতকরণও ভুল্যে বসলি?’

‘কী রীতকরণ ঠাগমা?’

‘ইঁদুরাজা বসব্যে…’

মা মাথায় টোকা দিয়ে উঠোনে পিঁড়ি রেখে এল৷ ওই পিঁড়িতে বসবে ইঁদুরাজা৷ একগাছা সুতো ঢিলে জড়িয়ে রেখে এল, মেঘের ছ্যাঁদাগুলো সেলাই করবে৷ তারপর শাশুড়িকে বলল, ‘আর কী?’

‘আর আবার কী? আখুন ইঁদআজা চিয়ে দেখল্যে হয়৷’

আশ্চর্য, আশ্চর্য, পরম আশ্চর্য! রাত থেকেই বিষ্টি কম, সকালে আরও কম৷ মেঘগুলো ধীরে ভেসে চলে যাচ্ছে অন্য দেশে, বেলার দিকে সূর্য অপ্রতিভ হেসে নরম রোদ নিয়ে দেখা দিলেন৷

আর পরদিন ভোরে মানিক ভাতপান্তা খেয়েই দৌড়োল৷ হাতে হেঁতালের লাঠি, দেখলে সাপ সরে যায়, মা বলেছে৷

কিন্তু কোথায় কী?

মানিক থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বোবা যেন! কোনো গাছে আম নেই, কে পাড়ল?

ঝরাপাতায় পথ ঢেকে গেছে, ঘাসগুলো এত বড়ো বড়ো, বন্ধুর বড়ো সাধের বকুল গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে, একটা শালিকছানা ঘাটলায় পড়ে আছে; মরে কাঠ! কেউ এসেছিল? আম পাড়ল কে? বন্ধু বলেছিল আষাঢ়ের জল পেলে এ আম মিষ্টি হয়৷ কিন্তু ঝাঁটপাট দেয়নি কেউ, ঘাস কাটেনি, এ কেমন কথা? বাগানটার চেহারা এমন একলা একলা কেন?

মানিক ঠিক বুঝল, বাগানটা একলা হয়ে গেছে৷ মানিক নিজেও তো মনে মনে একলা ছেলে! বনজঙ্গল, খালবিল, পাখপাখালি, আকাশ, মেঘ, রোদ, এদের সঙ্গেই ওর ভাব৷ শুধু একজন মানুষ বন্ধু হয়ে এসেছিল৷

মানিক কিছু বোঝে না জগৎ সংসারের৷ ওর পৃথিবীটা ওর নিজের মনের মধ্যে৷ কিন্তু শালিক ছানাটাকে ভিজে পাতা দিয়ে জড়িয়ে ঘাসের ওপর রাখতে রাখতে ও বুঝল, স্বর্গের বাগান নয়! মানুষ আসত, পয়পরিষ্কার রাখত, এখন তারা আসে না৷

বন্ধু যেমন আসে না৷

বেরিয়ে এল মানিক৷ হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে বাগানের পাঁচিল পেরিয়ে এল, তারপর থমকে দাঁড়ায়৷ বাগানের সীমানা শেষ? এটা তো উত্তর দিক৷ এখানে এমন কাঁকর বিছানো পথ? সে পথ এসে থেমেছে পাঁচিলের গায়ে এতবড়ো একটা ফটকের গায়ে? ফটকের গায়ে কত বড়ো তালা! তালার গায়ে কত নকশা!

মন বলল, এ পথেই তোর বন্ধু আসত৷ তুই বুঝিসনি৷ কিন্তু এই লাল কাঁকরের রাস্তাটা যাচ্ছে কোথায়? মানিককে কেন বলছে, এসো, এসো?

এই পথেই তবে বন্ধুকে নিয়ে গেছে৷ পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মানিক পৌঁছোল বড়ো একটা রাস্তায়৷ ঘোনাদাদু বলত, ‘আস্তা নয় রে, উটি হল্য সড়ক৷’ আর মানিকের ঘোনাপাড়ায় আর সবাই বলে সোড়াং৷

সোড়াংটা যাচ্ছে কোথায়? পাতুল যায় মানিক যে পথে, এ তো সে পথ নয়? আর দেখো! পথ দিয়ে কত লোক না যাচ্ছে৷ কত না গোরুর গাড়ি, পালকি, ডুলি! কোথায় যাচ্ছে?

কত লোকের দেখো, কোথাও-না-কোথাও যাবার আছে৷ মানিকের তো ছিল একটা বাগান, আর একটা বন্ধু৷ দুটোই হারিয়ে গেছে বলে মানিকের ছোট্ট বুকটা চৌচির হয়ে ভেঙে যাচ্ছে৷ কে যেন চালাচ্ছে ওকে, ও নিজের বশে নেই৷ ও গিয়ে পথের পাশে দাঁড়াল৷

বড়ো সড়কে যারা চলে তাদের নিয়ম বুঝি অন্যরকম৷ ঘোনাপাড়ার সব পথ পায়েহাঁটা পথ৷ সে পথে যারা চলে, সবাই সবাইকে চেনে, দুটো কথা বলে, এ পথে কি কেউ কাউকে চেনে না?

মানিক বাড়ি যাবে কী করে? গোরুর গাড়ি যাচ্ছে, তাতে মানুষ নেই, জন নেই, গাদা গাদা বল্লম-বর্শা, লম্বা লম্বা নল বাগানো কী যেন!

‘কী লিয়্যে যেছ কাকা?’

‘কে রে তুই?’

‘ঘোনাপাড়ার মানিক বট্যে!’

‘তা হেথাক কেন? যা, সরে যা!’

মানিকের বুক ধুকুপুকু৷ না, ও দক্ষিণ দিকেই যাবে৷ গেলে কোনো-না-কোনো সময়ে কি বাড়ি পৌঁছোবে না! কিন্তু মন যে বলছে, চলো, চলো, আমার সঙ্গে চলো?

‘তুমি কে ভাই?’

মানিক চমকে তাকাল৷ দাড়ি, গোঁফ, আলখাল্লা, মাথায় টুপি, ভুরুর পাশে আঁচিল৷

‘আপনি…তুমি…মুশকিল আসান লয়?’

‘আমায় চেনো?’

‘তুমি পাতুলে যাও, আমি তোমায় দেখ্যেছি৷ আর, আর, সবুটিতে বিশালাক্ষী থানের পথেও যেতে দেখেছি…’

‘ঠিক বলেছ৷ বলবেই তো৷ ছোটোরা তো ঠিক কথাই বলে! তা তুমি এখানে?’

‘পথ ভুল্যে গিছি৷ মাথা দুখাইছে, পা বেথা…’

‘বাড়ি কোথায়? দেখি? কপালটা দেখি?’

‘ঘোনাপাড়া৷’

‘সে তো দক্ষিণে যেয়ে পুবে ঘুরে…জ্বর গায়ে চলে এসেছ?’

‘হাঁ গো৷ জ্বর নয়, হেঁটে হেঁটে…’

‘এখন তো যেতে পারব্যে না৷ আজ ওদিকে কোনো গাড়ি যাবে না৷’

‘তুমি তো মুশকিল আসান কর, আমাক ঘরে ল্যিয়ে যাবে?’

‘আর পারলাম কই! যে মুশকিল হয়ে গেল, তার আসান হয় না৷’

‘আমার ডর লাগ্যে গ!’

‘চলো, আমার সঙ্গে চলো৷’

‘কুথাক?’

‘আজ যাব মুর্শিদাবাদ৷ আর কাল, নিশ্চয় তোমায় পৌঁছে দেব৷’

‘পাতুল যেল্যেই ঘর যেত্যে পারব৷’

‘ভয়ডর নাই তোমার?’

‘আছে৷ কিন্তুক বিশালাক্ষীর থানের ধুল্য মাদুলিতে আছে না? আমার কুন-অ বিপদ হবে নাই৷’

‘বুঝলাম, চলো, গাড়িতে চাপো৷’

গাড়িতে খড়ের গাদা, মানিক শুয়ে পড়ল৷ গাড়ি চলেছে ক্যাঁচ-কোঁচ, ক্যাঁচ-কোঁচ! মাঝে মাঝে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যাচ্ছে কারা৷

‘উ কারা যায় গো?’

‘সব নবাবের ফৌজ৷’

‘লবাব মুশ্যিদাবাদে থাকে, লয়?’

‘থাকত৷ এখন তুই ঘুম যা৷’

ব্যস৷ আর তো কথা নেই৷ হেঁটে হেঁটে পায়ে ব্যথা, মনে বড়ো দুঃখ গো৷ না, ঘোনাপাড়া ছেড়ে কোথাও যাবে না মানিক৷ কিন্তু বাড়ির কথা মনকে টানছে কই? মন কেন বলছে, চলো, চলো, চলো?

কত কথা বলার ছিল বন্ধুকে, বলা হল না৷ খেজুরপাতার অমন চাটিটা দেয়া হল না৷ মা জানল না মানিক কোথায়, না জানি কত আতিপিতি ঘর-উঠান করছে, না জানি মাটির দেলকোয় পিদিম বসিয়ে দেখতে যাচ্ছে পথে৷ ডর নাই রে মা আমি আস্যে যাব্য বিহান না হত্যে৷ আখুন আমি নিজের বশে নাই মা! মন আমার টানছ্যে৷

আর জোনাক পোকা দেখো ঝাঁক বেঁধে সঙ্গে সঙ্গে যায়৷ মানিকের মায়া হল৷ অ জোনাক! তোর কত আলো আছে যে এমন আঁধারে পথ দেখাবি? এতটুকু নরম আলোয় কি আঁধার কাটে? মানিক ঘুমিয়ে গেল৷

গাড়োয়ান বলল, ‘ই কী হলছে গো? সব গাড়ি ঘুর্যে দিতেছ্যে? কাল ফিরতে পারব্য?’

মুশকিল আসান বলল, ‘নিশ্চয়৷ আমিও তো যাচ্ছিলাম বেনপুর৷ তা নবাব হেরে গেছে বলছে সবাই৷’

‘অত সড়কি বন্ধুক?’

‘এক নবাব যায়, আর নবাব আসে, যুদ্ধ নাকি হলই না! জিতবে যে, সে তো নবাবের ফৌজের হাতিয়ার কেড়ে নেবেই৷’

‘আজায় আজায় যুজ্য! তা আমাদেরে এমুন ছিটাভিটা করে কেন?’

‘আর কেন! এখন রাত পোহালে বাঁচি৷’

‘ছেলাকালই ভালো গো! উ ছেলাটো ঘুমালছে কেমুন! কুন-অ চিন্তা নাই!’

‘আছে, আছে৷ ওর চোখ বলছে ও বড়ো দুঃখ পেয়েছে৷’

গোরুর গাড়ি ক্যাঁচর-কোঁচর যেতে থাকল৷ গাড়োয়ান ঘুমঘুম গলায় বলল, ‘সকাল হতেই মুশ্যিদাবাদ!’

‘কালই ফিরবে তো?’

‘লিচ্চয়৷’

‘ছেলেটাকে পাতুলে নামিয়ে দিয়ে যাব!’

ভোর ভোর ওরা পৌঁছে গেল৷

মানিকের চোখে রোদ পড়তে তবে ঘুম ভাঙল৷ এ কী? এ কোন জায়গা? চোখ কচলে তড়াক করে নামল ও৷ কোথায় এসেছে ও? এত বড়ো বড়ো ঘরবাড়ি, এমন পথ, এত লোকজন! এটা মুশ্যিদাবাদ?

মুশকিল আসান কোথায়? শুধু তো ওদের গোরুর গাড়ি নয়, কতগুলো গাড়ি দেখো! বাপরে, একসঙ্গে এত গাড়ি তো মানিক দেখেনি?

আর কত লোক, কত লোক দেখো! সব দু-পাশে বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ কী দেখবে বলে? কীসের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে ঢং ঢং ঢং? মানুষ কেন একবার পথের দিকে চাইছে, একবার মাথা নামাচ্ছে?

‘হাতি! হাতি আসছে!’ -কে বলল!

সিরাজের হাতি! পিঠে বসে কত বেড়াত সিরাজ!

‘দু-বছরও টিকল না গো! যবে থেকে নবাব, তবে থেকে সিরাজ যুজ্য করে করে…’

‘পলাশীতে তো যুজ্য হলই না! হলে কি সিরাজ হারত?’

‘হা রে সিরাজের নবাবি! হা রে আল্লার বিচার! কী-বা বয়স!’

কার কথা বলছে ওরা? মানিক কাকে শুধোবে?

হাতির গলায় ঘণ্টা ঢং ঢং ঢং!

‘আস্যে গেল!’

কোথায় হাতি? মানিক হাঁচড়েপাঁচড়ে ছইয়ের ওপর উঠল৷ হ্যাঁ, হাতি আসছে৷ দু-পাশে দু-জন লোক হাঁটছে৷ হাতির ওপর বসে আছে মাহুত৷

আর হাতির পিঠে ওটা কী? মানিক মুখ বাড়াল৷ ও তো একা নয়, অনেকেই ছইয়ে উঠে পড়ছে, গোরুর গাড়িতে উঠছে৷ কী দেখবে বলে?

হাতিটা চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল৷ শুঁড় দোলাল, পা ঠুকল একটা৷

মানিকের বুকের ভেতর হঠাৎ যেন পিদিম নিভে গেল৷ পথ যেন ফুরিয়ে গেল৷ সব অন্ধকার, অন্ধকার অন্ধকার৷ অন্ধকার, অন্ধকার৷

মাথা আর দু-হাত ঝুলছে বুক চিতিয়ে৷ সেই ভীষণ চেনা বড়ো বড়ো চোখ নিষ্পলক, উদাসীন! হাতের আঙুল ছড়ানো৷ আর রক্ত, রক্ত, রক্ত! এত রক্ত, এত রক্ত!

‘না-আ-আ-আ!’

মানিকের রিনরিনে গলায় তীব্র কান্নায় সবাই চমকিত৷

‘কে, কে, কে চ্যাঁচাল?’

মানিক ঢলে পড়ল, পড়ে গেল মাটিতে৷

গোরুর গাড়ি চলছিল৷ মুশকিল আসান মানিককে ধরে বসে ছিল ছইয়ে হেলান দিয়ে৷ কেউ কোনো কথা বলছে না৷ মানিক তাকিয়ে আছে পথের দিকে, নিষ্পলক৷ গাড়োয়ানই যা কথা বলছে৷

‘ই দিশ্য কি দেখতে আছ্যে?’

মানিক চুপ৷

‘অক্ত দেখ্যে আমারই দেহ যেমন…’

মানিক চুপ৷

মুশকিল আসান বলল, ‘শো খানিক৷’

মানিক মাথা নাড়ল৷ এখনও ওর মন বলছে, না! না! না! কিন্তু এটা তো হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ!

এখন ও বুঝতে পারছে একটু একটু, কেমন করে? আজ সকালের পর মানিক বড়ো হয়ে গেছে বলে? মানিক যেমন পালিয়ে যেত বাগানে, বন্ধুও বুঝি সব ভুলে থাকতে দু-দণ্ড যেত গাছ, ঘাস, জলের কাছে৷

পালিয়ে যেত, পালিয়ে যেত, পালিয়ে যেত! কারা বন্ধুকে পালিয়ে যেতে দিল না?

ক্রমে চেনা চেনা জায়গা এল৷ মানিক শুকনো গলায় বলল, ‘রাখ্য খানিক! আমি লেম্যে যাই৷’

‘পাতুল তো আরও সামনে৷’

‘না গো! আমি বনের পথ্যে চল্যে যাব!’

গাড়োয়ান গাড়ি থামাল, মানিক নেমে পড়ল৷

‘সাবধানে যাবি! আবার দেখা হবে কোথাও৷’

ঘাড় হেলাল মানিক!

‘তোর হেঁতালের লাঠি?’

মানিক লাঠিটা নিল৷

বাগানের পাঁচিলকে বাঁয়ে রেখে এগোতে এগোতে কানায়ের বিল! সব দেখো, যেমনকে তেমন আছে৷ বিলের জলে ঢেউ খেলছে পুবে বাতাসে৷ নীলকন্ঠ পাখির কী ওড়াউড়ি! তেলশেঁওটা ঝোপে সাদা ফুল ফুটে আলো করেছে৷ স-ব যেমনকে তেমন আছে৷

শুধু মানিক দুলে মনে মনে খুব বড়ো হয়ে গেছে৷ অনেক বুঝতে পারছে এখন৷

হঠাৎ মেঘ থমকে দাঁড়িয়ে গেল, মাথার পরে নেমে এল৷

বাতাসে বৃষ্টির খবর৷ মানিক একটা বুনো মানের পাতা ছিঁড়ে নিল, মাথায় ধরে চলতে থাকল৷

আর চড়বড়িয়ে জল নামল৷

মা দাওয়ায় হেলান দিয়ে বসেছিল৷

‘মা!’

‘মানিক? তুই আসছিস বাপ? কুথাক হারায়্যে গিছিল্যে বাপ? আমি কেন্দ্যে কেন্দ্যে…’

তারপর মা চুপ করে গেল৷ অবাক চোখে চাইল৷ এ কি তার মানিক? নতুন নতুন লাগে কেন?

মানিক আস্তে বলল, ‘কানলি কেন্যে? কানবি না মা…আমি, আমি বড়ো হয়্যে গিছি আখুন৷ আমি তো কান্দি নাই! কান্দি নাই তো!’

বলতে বলতে মানিকের চোখের জলে ধারা নামল৷ মানিক বলল, ‘আমি কান্দি নাই মা৷’

মা ওকে কাছে টেনে নিল৷

তারপর সব চুপ৷

শুধু আকাশ কেঁদে চলল৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *