লছমনের মা
জুন মাসের দুই-তিন তারিখ থেকেই গঙ্গা বুঝতে পেরেছিল গতিক সুবিধের নয়৷
গঙ্গার বর যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন ঘোড়ার ঘাস জোগান দিত কেল্লায় আর রানিমহালে৷ ঘাস কাটতে গিয়ে ওকে সাপে কামড়ায়৷ ও মরে যাবার পর গঙ্গা আর ঘাস কাটে না, তবে ও উপোস করে মরেনি৷
ওর ছেলে রামের হাত ধরে ও চলে গিয়েছিল রানিমহালে৷ রানির দরবারে যাবার সময় তিনটের পর৷ সকালে স্নান আর পুজো হয়ে গেলে রানি তাঁর মহালের বড়ো ঘরে এসে বসেন৷ একটু ভজন গান শোনেন৷ তারপর শহরের মানী গুণী লোকেরা দেখা করতে আসেন, মন্ত্রীরাও আসেন৷
রানি বসেন চৌকিতে, পাশে বসে দামোদর, ওঁর ছেলে৷ যে দেখা করতে আসে সে সামনে এটা-ওটা উপহার রাখে৷ রানি তা থেকে একটু করে শুকনো নারকেল বা সুপুরি তুলে নেন৷
গঙ্গা রানিমহালে গিয়ে রানির বুড়ি দাসী যমুনাবাইকে ধরেছিল৷ বলেছিল, ‘আমায় দেখা করিয়ে দাও দেখি রানিসায়েবার সঙ্গে!’
‘হাতে কিছু নিয়ে যেতে হয়৷ কী এনেছিস?’
গঙ্গা কয়েকটা ভুট্টা এনেছিল৷ কে না জানে রানি ভুট্টা খেতে ভালোবাসেন? এমন কথা কে শুনেছে বল? নাহয় কোম্পানি ঝাঁসিরাজ্য নিয়ে নিয়েছে৷ তবু তুমি রানি তো বটে! তুমি ভুট্টা পুড়িয়ে আদার রস আর নুন মেখে কচ কচ করে খাবে?
গঙ্গা বেঁটেখাটো মানুষ, তবে খুব শক্তি রাখে শরীরে৷ একটা জামার ওপর কনুই অব্দি চোলি পরা, মাথায় ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানা৷ ঘোমটা আর ঘাঘরা সবই কালো রঙের৷ গরিব মানুষ, কালোই ভালো৷ ময়লা কম হয়৷
যমুনাবাইও পেছনে পেছনে এসেছিল৷ যমুনাবাই পঞ্চাশ বছর ধরে এই রাজবাড়ির দাসী হয়ে আছে৷ এখন চারটি সলতে পাকায়, একটু গল্প করে, এই তার কাজ৷
‘এর নাম গঙ্গা৷ এ বিধবা হয়েছে৷ এর বর ঘাস কাটত৷’
‘জানি৷’ দামোদর হঠাৎ বলল-ও রামকে চিনতে পেরেছে৷
‘জান? কেমন করে জানলে?’ রানি জিজ্ঞেস করলেন৷
‘সারঙ্গীকে ঘাস তো ও দিতে আসতে ওর বাবার সঙ্গে? তখন দেখেছি৷’
সারঙ্গী রানির ঘোড়ার নাম৷ রানি বললেন, ‘কী বলবে তুমি বলো?’
গঙ্গা অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিল সাজিয়েগুছিয়ে কথা বলবে, কিন্তু এখন ওর কেন যেন মনে হল সোজাসুজি কথা বললেও চলবে৷
রানি হয়েছে তো কী হয়েছে বাপু! গঙ্গার চেয়ে তুমি বছর দশেকের ছোটো হবে৷ গঙ্গা বলল ‘আমি কি না খেয়ে মরব, তোমার আশ্রয় থাকতে?’
রানির হাসি পেল, দুঃখও হল৷ ‘রাজ্য কি আমার আছে? আমি যা পাই তাতে আমার চলে না৷ কী ব্যবস্থা তোমার করি বলো তো?’
রানির যথাসর্বস্ব গয়নাগাঁটি টাকাকড়ি সব যে ইংরেজরা কেড়ে নিয়ে রেখে দিয়েছে এ কথা আর ঝাঁসিতে কে না জানে!
রানি আবার বললেন ‘রামের বাবা কিছুই রেখে যায়নি?’
‘তা রাখবে না কেন? ঢোল বাজিয়ে গান গাইত, ঢোলটা রেখে গিয়েছে৷ ঘাসের আঁটি বাঁধত, সেই দড়িটা আছে৷ আর আছে দুটো গোরু৷ সে কিন্তু আমার নিজের৷ বাছুর পুষে বড়ো করে দিয়েছিলাম, তাই দুটো গাই পেয়েছি৷’
‘দুধ দেয়?’
‘দেয় বই কী৷’
রানি বললেন ‘তবে তুমি সবটা দুধ এখানে দিয়ে যেয়ো, রান্নাঘরে! এই টাকাটা রাখো, দুধের আগাম দাম পেলে৷’
গঙ্গা ঢিপ করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল৷ ছেলেকেও প্রণাম করতে বলল৷ রাম হাঁ করে রানির সাদা শাড়ি, এত বড়ো খোঁপা, আর হাতের হিরের বালা দেখছিল৷ গঙ্গার কি আর এই সকালে রানি দেখবার সময় আছে?
সেই থেকে গঙ্গা রানিমহালে দুধ দেয়৷ আজ ক-দিন হল৷ দুধের ব্যবস্থা করেই গঙ্গা প্রায় ছুটে ছুটে বাড়ি ফেরে৷ শহরের দক্ষিণ দিকে হল গিয়ে লছমিতাল৷ তারও ওপারে গঙ্গার ঘর৷ জলের ধারেই ঘাসটা ভালো হয়৷ তবে, জায়গাটা বড়ো একটেরে৷
গঙ্গা রামকে চারটি ভুট্টার খই আর গুড় খেতে দেয়৷ তারপর রাম যায় গাই চরাতে, গঙ্গা মাথায় দুধের ঘটি নিয়ে চলে যায় কেল্লায়৷
মিলিটারি সায়েবরা এই কেল্লায় থাকে না৷ তারা থাকে কেল্লার বাইরে দু-মাইল দূরে ক্যান্টনমেন্টে৷ সেখানে ওদের থাকবার বাড়ি-ঘর-জেলখানা-সেপাইদের ছাউনি৷
কেল্লায় থাকে আপিসে যারা কাজ করে সেইসব ইংরেজ৷ গঙ্গার বর সেখানে ঘাস জোগাত৷ ঘোড়া ছাড়া তো কারোই চলে না৷ ঘোড়া চড়ে সবাই ঘোরেফেরে, যুদ্ধ করে, আবার বেতো টাট্টু ঘোড়ার পিঠে চড়ে চাষিরা চাষ করে৷
গঙ্গা ঘাসের দাম চাইতে গেল৷ আর গেল ওর ছেলেকে দেখতে৷ সত্যি ছেলে নয়, আবার মিথ্যে বলাও ভুল৷
কেল্লাতে থাকে রেভিনিউ বিভাগের লোক টার্নবুল৷ ওর দাদা গেছেন পাঞ্জাব আর বউদি মারা গেছেন৷ দাদার সাত বছরের ছেলেটা, উইলিয়াম, এখানেই আছে৷
ওকে পিসিদের কাছে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলেই হয়৷ কিন্তু কী যে শুরু হয়েছে ১৮৭৫-এর মার্চ থেকে! এখানে সিপাহিরা খেপে উঠছে, ওখানে সিপাহিরা খেপে উঠছে৷ এ সময়ে কলকাতা অব্দি যাওয়া কি সোজা?
ছেলেটার ডাকনাম বিল৷ মাথাটা বড়ো, গা-টা রোগাটে৷ গম্ভীর গম্ভীর চেহারা৷ আয়াদের কাছে থাকে বলে বেশ হিন্দি শিখেছে৷ গঙ্গার সঙ্গে ওর খুব ভাব হয়েছে৷ গঙ্গার ছেলে রাম বেজায় কালো৷ গঙ্গার ইচ্ছে করে বিলকে বেশ কাজল পরিয়ে সাজিয়ে দেখে৷ ফর্সা তো! ফর্সা রঙের উপর গঙ্গার খুব টান৷
ছেলেটা পেটুক আছে৷ গঙ্গাকে দেখেই ও এসে বলল ‘আমার মকাই?’
‘এই নাও৷’
গঙ্গা ওকে একটা কচি ভুট্টা দিল৷ তারপর বলল, ‘তোমার কাকা কোথায়?’
‘ঘরে৷ চিঠি লিখছে৷’
গঙ্গা ঘরের দরজায় গিয়ে সেলাম করল৷
‘ঘাসের দাম চাই তো? কত দেব বলো তো? দাঁড়াও, কোথায় যেন লেখা আছে৷’
‘দাম চাই, কিন্তু অন্য কথাও বলব৷’
গঙ্গার বুকটা টিপ টিপ করে কাঁপল৷ বাপ রে! সায়েবদের সঙ্গে কথা বলা কি সোজা সাহসের কাজ? গঙ্গা বুন্দেলখণ্ডী মেয়ে৷ কারুকে ভট-টয় পায় না৷ তবে সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে একটু বুক কাঁপে বই কী৷
‘কী বলবে, বলো?’
গঙ্গা মাটির দিকে চেয়ে বলল ‘তোমাদের কেল্লাটায় কোনো বন্দোবস্ত নেই, এখানে থেকে কি প্রাণ বাঁচবে? তোমরা কেন সাগর বা জব্বলপুর চলে যাচ্ছ না?’
‘চলে যাব কেন? এসব কথা তোমায় কে বলেছে?’
‘আমায় কে বলবে? অনেক খবর পাই৷’
‘আমায় বলছ কেন?’
গঙ্গা চোখটা তুলে বলল, ‘সব সায়েবরাই বুঝি গোঁয়ার হয়? রামদিন বলেছিল বটে!’
‘রামদিন? রামদিন কে?’
‘তোমার বেয়ারা৷’
টার্নবুল অবাক হয়ে গেল৷ বেয়ারা-চাপরাশি-বাবুর্চি-জমাদার-খানসামা -পিয়োন-বরকন্দাজ এদের নাম কে জানে বল!
‘কী বকবক করছ বল তো? যাও, কাজ করতে দাও৷’
এই সময়ে বিল ঘরে ঢুকল৷ কাকার টেবিলে হাঁসের পালকের কলম, কাগজ, পেনসিল, কত কী থাকে৷ বিল টেবিলের কাছে এলে কাকা কিছু বলে না৷
‘তুমি কি গঙ্গাকে বকলে?’ বিল ইংরেজিতে বলল৷
‘না, বকব কেন?’
‘বোকো না৷ ও আমার বন্ধু৷’
বিলের কাকা একটু হাসল৷ এসব কথার কী উত্তর হতে পারে বল!
গঙ্গা চলে গেল বেয়ারা দাসীদের জটলায়৷ বলল, ‘তোমাদের কথাই তো দেখছি ঠিক! কিছুতে ওরা বুঝতে চায় না যে, সিপাইরা বলওয়া (বিদ্রোহ) করছে চারদিকে! মরবে সব; দেখো কী হয় শেষ অবধি!’
বকবক করতে করতে গঙ্গা চলে গেল৷ যেন চুপ করে থাকবে ব্যারাকের সেপাইরা! যেন তারা একটা সায়েবকেও ছেড়ে দেবে! গঙ্গা তো সেদিন সুবেদার সায়েবের ওখানে ঘাসের দামের জন্যে তাগাদা করতে গিয়েছিল৷ সহিসটা ফট করে বলে বসল ‘আমাদের দিন এসে যাচ্ছে, জানিস, ঘাস-টাসের দাম আর দেব না!’
‘চোপরহ!’ সুবেদারের চৌধুরি বেজায় বকেছিলেন সহিসটাকে৷ গঙ্গা সময় বুঝে চেঁচিয়ে কাঁদতে শুরু করেছিল ‘আহা আমি গরিব বিধবা গো! আমাকে দেখবার কেউ নেই গো!’
ঘাসের দাম বাকি ছিল আট আনা৷ গঙ্গা কেঁদেকেটে আরও একটা টাকা বকশিশ পেয়ে গেল৷ চকচকে রুপোর রামচাঁদি টাকাটা দেখে সহিসটার মাথা ঘুরে গিয়েছিল৷
গঙ্গা বাড়ি চলে গেল৷ তারপর কী হল তা তোমরা সবাই জান নিশ্চয়৷ রানি বার বার সায়েবদের বলেছিলেন সিপাহিরা খেপতে পারে, তোমরা ঝাঁসি ছেড়ে পালাও৷
ওরা শোনেনি৷
ঝাঁসিতে যে সিপাহিরা ছিল তারা ৪ঠা জুন জেলখানা খুলে দিল৷ ক্যান্টনমেন্টের অস্তশস্ত্র সব নিয়ে নিল৷
সাহেবরা ঝাঁসি শহর ঝেঁটিয়ে যে যেখানে ছিল গিয়ে কেল্লায় জুটল ৪ঠা জুন৷
সেখানে না আছে খাবারদাবার কোনো ব্যবস্থা৷ সাহেবদের ভারতীয় চাকর বেয়ারারা প্রাণপণে সাহায্য করতে চাইল৷ সায়েবরা তাদের বিশ্বাস করল না৷
রানি বললেন ‘মেয়েদের আর ছোটোদের আমার কাছে পাঠিয়ে দাও৷’ সায়েবরা শুনল না৷
আট তারিখে সিপাহিরা কেল্লার যত সায়েব ছিল, ছেলে-মেয়ে সবাইকে কেটে ফেলল কেল্লার বাইরে এনে৷ তারপর ওরা দিল্লি চলে গেল৷
কেল্লাটা চিরদিন রাজাদের ছিল৷ তারপর সেখানে সায়েবরা এসে ঢুকেছিল৷ কেল্লার ভিতরে কী আছে না আছে দেখবার জন্যে মানুষের কৌতূহলের শেষ ছিল না যেন৷ বাইরে যখন হইচই চলেছে, রানি তখন সেপাহিদের কথা শুনে বেজায় চটে গেছেন, ঝাঁসি শহরে দোকানপাট বন্ধ, তখন গঙ্গা এর-তার সঙ্গে কেল্লায় গেল৷
গিয়ে যে ওর কী খারাপই লাগল! ছোটো ছেলে-মেয়ের জুতো-টুপি-জামা-খেলনা ছড়িয়ে পড়ে আছে৷ মজাদার-বিছানা-আসবাব-বাসন সব লণ্ডভণ্ড এদিকে-সেদিকে৷ গঙ্গার যত মনে হতে লাগল যারা মরেছে তাদের মধ্যে বিলও ছিল, তত ওর কষ্ট হতে লাগল৷
বলওয়া হলে নাকি ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করা যায় না৷ পথেঘাটে সবাই বলছে৷ সেপাইরা শহরে কোনো জিনিসপত্র নেয়নি৷ তবু ভয়ে সবাই দোকানপাট বন্ধ করে বসে আছে৷
গঙ্গা একথা-সেকথা ভাবছে, এমন সময়ে শুনতে পেল ‘গঙ্গা!’
‘বিল, তুমি এখানে?’
‘আয়া আমাদের এই ঘরে বন্ধ করে রেখে চলে গেছে; এখানে থাকলে কেউ বুঝতে পারবে না, তাই আছি আমি৷ আয়ার খুব বুদ্ধি! তাই না?’
গঙ্গা ঘরের শেকলটা খুলল৷ এখন কী করবে গঙ্গা? কেমন করে ওকে বাঁচাবে? ওকে ফেলে রেখে পালিয়ে যাবার কথা গঙ্গার একবারও মনে হল না৷
‘বিল, আমার সঙ্গে চলো৷’
‘কোথায়?’
‘কথা বোলো না; একটা কথাও বোলো না৷ চলো দেখি!’
গঙ্গা ওকে পিঠের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধল৷ তারপর তার মাথা ঢেকে, শরীর ঢেকে, নিজের মাথা ঢেকে চাদর মুড়ি-সুড়ি দিয়ে নিয়ে কেল্লা ছেড়ে বেরোল৷
ভাগ্যি দোকানপাট বন্ধ, শহরের রাস্তা নির্জন! সায়েবরা যে চলে যাবে, সেপাইরা এক-এক জায়গায় এক-এক জনকে রাজা করবে একথা তো গঙ্গা সেই কবে থেকে শুনছে তো শুনছেই৷ বিল তো সায়েবদেরই ছেলে৷ সে ছেলেকে-বা গঙ্গা বাঁচাতে যাচ্ছে কেন?
গঙ্গার বাড়ি যেতে হলে লছমিতাল ঘুরে যেতে হয়৷ মাটি সেখানে ঢেউ-খেলানো৷ বাড়িটা পাথর আর মাটির চাপড়ায় রোদে পুড়ে ঝামার মতো শক্ত হয়ে গেছে৷ একটা লম্বা টানা ঘর৷ একপাশে ক-খানা খাটিয়া, মা, ছেলে শোয়৷ ঘরের অন্যদিকে ঘাসের টাল থাকত একসময়ে, সেদিকের ছাতটা বেশ উঁচু৷
এখন সেদিকে গাই দুটো থাকে, আর বাছুর৷ মাঝে কাঠের বেড়া দেওয়া৷ ঘরের এক কোনে রাঁধার উনোন৷ নাওশা তাতে বসানোই থাকে৷
এখন গরমকাল৷ রাতে গঙ্গারা বাইরে শোয়৷ ঘরের চালে দড়ি দিয়ে ওদের শীতের কম্বল ক-খানা, দড়ি, বস্তা, দুটো পেতলের হাঁড়ি, সর্বস্ব ঝোলানো৷
রাম ঘরে নেই৷ নিশ্চয়ই শহরে কী হচ্ছে দেখতে ছুটেছে, নয় তো গাই আনতে গেছে৷
গঙ্গা পিঠের দড়ি খুলে বিলকে বিছানায় ফেলল ধপ করে৷ মাগো! ছেলেটা নেতিয়ে পড়েছে দেখো!
গঙ্গা সবসময় হিন্দি বলে না৷ নিজেদের মধ্যে ওরা বুন্দেলখণ্ডী কথাই বলে৷
‘খিদে পেয়েছে?’ গঙ্গা জিজ্ঞেস করল৷
ছেলেটা কথা বলে না৷ একবার ওর দিকে তাকায়, আরেকবার বাইরের দিকে৷ তারপর বলে ‘কাকা কোথায়?’
‘কাজে গেছে, আসবে৷’
‘না৷ কাকা মরে গেছে৷’
‘কে বলল?’
‘আয়া৷’
রাম রাম! গঙ্গার আয়ার উপর রাগ হল৷ নাহয় সত্যি কথা৷ তা বলে তুই সে কথা ওকে বললি কেন?
‘রাম কোথায়?’
‘বাইরে গেছে৷ শোনো, এখন কথা বোলো না৷ একটু দুধ খাও তো!’
গঙ্গা ওকে দুধ আর গুড় দিল৷ শক্ত গুড়ের ডেলা৷ ‘একটু কামড়াও, একটু দুধ খাও, বেশ লাগে৷’ খেতে খেতেই ছেলেটার চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল৷ ওকে খাটিয়ায় শুইয়ে দিয়ে গঙ্গা ধমক দিয়ে বলল, ‘চুপ করে শুয়ে থাকো৷ কাঁদলে মারব!’
আয়াদের হাতে মারধর খেয়েই বড়ো হয়েছে বিল৷ ও ভয় পায় আর কথা শোনে৷ চুপ করে ও শুয়ে পড়ল৷
গঙ্গা এসে বাইরে বসল পাথরের ওপর৷ বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল৷
রাম এল কিছুক্ষণ বাদে৷ বলল ‘মা! আজ কত কাণ্ড হয়েছে জানিস?’
‘কী হয়েছে?’
‘সেপাইরা সব সায়েবদের ধরে কেটে ফেলেছে! জোকাসবাগে সবাই দেখেছে, আমিও দেখে এলাম৷ সব পড়ে আছে৷ সেপাইরা বাটসায়েবের কাছে টাকা চেয়েছিল, বাটসায়েব ওদের সব গয়না দিয়ে দিয়েছে জানিস?’
‘না, জানি না৷ রাম, শোন! কাজের কথা আছে৷’
‘কী কথা?’
‘ভেতরে আয়৷’
গঙ্গা বিলকে দেখাল আর ফিসফিস করে ছেলেকে কী বলল৷ রাম বলল, ‘ওরা যে বলছে এক-একটা সায়েবকে ধরিয়ে দিলে টাকা পাবে সবাই?’
গঙ্গার রুক্ষ চুল আর পাথুরে মুখ সূর্যাস্তের আলোয় জ্বলতে লাগল৷
গঙ্গা বলল, ‘ও যে এখানে আছে সেকথা কারুকে বললে তোকে কুচি কুচি করে কেটে ওই জলে ফেলে দেব!’
রাম একটু কাঁদল৷ বলল, ‘আমি কি বলেছি বলে দেব?’
‘যদি বলে দিস, তবে ওরা যেমন করে সায়েবদের কেটেছে ঠিক তেমনি করে আমাদের কাটবে জেনে রাখিস!’
‘ওকে যদি কেউ দেখে?’
‘ব্যবস্থা একটা করতে হবে৷’
‘ওকে তুই কী করবি মা?’
‘এখন প্রাণটা তো বাঁচাই, এনে যখন ফেলেছি! তোর বাবার ঘোড়াটা আনতে পারিস পিসির কাছ থেকে?’
রামের বাবার টাট্টু ঘোড়া ছিল একটা৷ তার পিঠে ঘাস চাপিয়ে ও শহরে যেত৷ ও মরে যাবার পর ঘোড়াটা কে দেখে, কে চরায়, এক ঝামেলা হয়েছিল৷ রামের পিসি কাছাকাছি থাকে, ওর গাঁয়ের নাম ভুলি৷ পিসি ঘোড়াটা চেয়ে নিয়ে গেল৷ ওর চাষবাস আছে, পিসে ঘোড়া চড়ে খেতে ঘুরে ঘুরে দেখবে৷
রাম বলল, ‘কী হবে?’
‘আবার ঘাস বেচব৷ তুই নিয়ে আয়৷ তোর ঘোড়াটাকে পিসি যেন কী বলে? তোর জ্যাঠার নাম?’
‘ভর্তুয়া৷’
‘তোর বাবা বেজায় গোঁয়ার আর রাগী ছিল তো! দাদার সঙ্গে ঝগড়া ছিল খুব৷ তাই দাদাকে জব্দ করবে বলে রামজির তিসরা ভাইয়ের নামে নাম রেখেছিল ঘোড়াটার৷’
রাম গিয়ে ঘোড়াটা নিয়ে এল৷ বলল, ‘পিসি খুব রাগ করল মা৷ বলল, তোদের ঝাঁসিতে বলওয়া লেগে গেল৷ আমাদের ভুলিতে যদি লেগে যায়? ঘোড়াটা থাকলে আমাদের সুবিধে হত খানিকটা৷’
‘আহা হা! আমার ঘোড়া ওঁকে সুবিধের জন্যে ছেড়ে দেব! ওরে আমার তুমি রে! রং এনেছিস, রং?’
‘হ্যাঁ মা৷’
ঝাঁসির লোকরা নাচ-গান রামলীলা-থিয়েটার খুব ভালোবাসে৷ রাম মুখে মাখবার রং নিয়ে এসেছে কিনে৷ দোকানি ওকে মারতে নাকি বাকি রেখেছে৷ বলেছে, ‘সায়েবরা চাঁদ সূর্যের কর্তা৷ তারা মরল, অপঘাতে, দেশে এখন কী হয় তার ঠিক নেই৷ তুই এখন বাঁদর সাজবি?’
গঙ্গা রংটা নিল, রামকে ডেকে ভেতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করল৷ বিলকে বলল, ‘তোমার এখন সব বুঝতে হবে৷ তোমার কাকা আর সব সায়েবদের গলাটি-‘
আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল গঙ্গা কী হয়েছে৷ বলল, ‘তুমি সায়েব জানতে পারলে তোমাকে ওরা মারবে৷’
‘জানি৷ জমাদার বলেছিল কাকাকে৷’
‘বোকাটা! কারও কথা শোনেনি৷’
‘এই! আমার কাকা বোকা?’
‘না, খুব বুদ্ধি তার! শোনো-তোমাকে মুখে রং মাখিয়ে দেব আমি৷ বলব তোমার নাম লছমন!’
‘লছমন? এ একটা খেলা?’
‘হ্যাঁ বাবা৷ এ একটা খেলা৷ কিন্তু যদি একটিবার ইংরেজিতে কথা বল আর লছমন ডাকলে সাড়া না দাও, তাহলে পিঠে ওই ঘোড়ার চাবুক ভাঙব!’
রাম বলল, ‘মা! ও কেন বোবা সাজুক না?’
‘সেই ভালো৷ বোবা সেজে ঘরে থাকবে তুমি৷’
‘সারাদিন?’
রামের মনে দয়া হল৷ বলল, ‘চাঁদনি রাতে আমি তোমায় বাইরে নিয়ে বেড়াব, কেমন?’
‘রাম, তুই ওকে দিনে-রাতে পাহারা দিবি৷ আমি যখন বেরোব তখন দোর বন্ধ করে যাব কেমন?’
‘তুই একা যাবি?’
‘হ্যাঁ৷’
গঙ্গার কথামতোই চলতে লাগল সব৷
সেপাইরা চলে গেল দিল্লির দিকে৷ রানি ঝাঁসির রানি হয়ে বসলেন৷ দশ মাস ধরে আজ এ রাজ্যের সঙ্গে কাল ও রাজ্যের সঙ্গে রানির যুদ্ধ লেগেই রইল সে তো তোমরা জান৷ তবু দশ মাস ধরে ঝাঁসিতে যেন সুখশান্তির সীমা রইল না৷
তারপর খবর চলে গেল দিকে দিকে৷ পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে ইংরেজরা আসতে লাগল ভারতে৷ তারপর তারা একদিন হাজার হাজার সেপাই-কামান-বন্দুক-তাঁবু-গোলাগুলি নিয়ে ঝাঁসিতে চলে এসেছিল৷
তখন কী হয়েছিল? সে তো গল্পের শেষ কথা৷ গঙ্গার গল্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই৷ শেষ কথাটা কি কেউ আগে বলে দেয়? আগে কী হল তাই বরং বলি৷
শোনা গেল গঙ্গার ছেলেটার কী যেন অসুখ হয়েছে৷ দিনরাত ঘরে থাকে আর একটু-আধটু গাই দোয়৷
গঙ্গা পায়ে নাগরা আর কোমরে ঘাঘরা পরে ঘোড়ার পিঠে ঘাস আর দুধের কলসি চাপিয়ে শহরে নিয়ে যায়৷ কারও সঙ্গে কথা কয় না গঙ্গা৷ দুধ বেচে আটা ডাল, তেল কিনে নিয়ে চলে আসে৷
ঘর থেকে জানালা দিয়ে লছমন দেখে, ওই ওপারে মহালক্ষ্মী মন্দিরের ঘাটে কতজন স্নান করছে৷ মাঝে মাঝে রানি আসেন পালকি নিয়ে৷
খুব ভালো লাগে ওর৷ এদের ঘরদোর বেজায় নোংরা, আর রুটিতে বড়ো লবণ দেয় গঙ্গা৷ তবু ভালো লাগে৷ এমন করে ও কারও মন আর মমতা পায়নি জীবনে৷ মাকে মনে পড়ে না, বাবাকে অস্পষ্ট মনে পড়ে৷ কাকা ভালো ছিল, কিন্তু তাকে আর ও কতটুকু দেখেছে? ও তো থাকত আয়াদের কাছে৷ তারা খেতে দিত, আবার ধমকও দিত৷
অন্ধকারে ওর বড়ো ভয় ছিল৷ আয়ারা ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিত৷ গঙ্গা কেমন তেলের ডিবরি জ্বেলে রেখে দেয়!
সবচেয়ে মজা লাগে, সারা দিনমান ঘরে পড়ে ঘুমোও, আর রাত হলে লছমিতালের জলে গিয়ে স্নান কর, কাপড় ধোও, ছুটোছুটি কর৷
একেবারে চুপটি করে, ঠোঁটটি বুঁজে৷ রামের সঙ্গে ঘরে বসে খেলা কর মাটির মারবেল নিয়ে, মেঝেতে দাগ কেটে৷ একেবারে হেসো না৷ জানতে দিয়ো না কাউকে যে এখানে তুমি আছ৷
সবচেয়ে ভালো লাগত লছমনের গঙ্গার কাছে রানির গল্প শুনতে৷ সত্যিকারের রানি! ভোরবেলা ঘোড়ার শব্দ শুনে জানালা দিয়ে চেয়ে দেখো, সারঙ্গী ঘোড়ার পিঠে নীল পোশাক পরে ছুটে চলে যাচ্ছেন৷
‘রানি ভালো? খুব ভালো?’ ও জিজ্ঞেস করেছে৷
গঙ্গা রুটি সেঁকতে সেঁকতে বলেছে, ‘খুব ভালো৷’
‘আমার কাকা?’
‘চুপ করো বেটা, খানা বানাই৷’
গঙ্গা ভুরু কুঁচকে বসে বসে রুটি ভাজছে৷ রোজ গঙ্গা মনে মনে বলে, হে বাবা শিব! হে মা মহালক্ষ্মী! যদি পাপ করে তার ক্ষমা করে৷’
কত কথা মনে হয় ওর৷ যদি ওর কাছে থেকে যায় তাই তো ভালো! রামের ভাই লছমন হয়ে যদি থেকে যায়? দুটো ছেলে ঘরে থাকলে গঙ্গা আরও গাই আর মোষ কেনে৷ একটু খেতের জমি চেয়ে নেয় বাটসাহেবের কাছ থেকে৷ গঙ্গা গল্প শুনেছে, বাঘের কাছে, নেকড়ের কাছে অব্দি ছেলে মানুষ হয়েছে কত৷
তা যদি হতে পারে তবে কি আর একটা সায়েবের ছেলে গঙ্গার কাছে থেকে যেতে পারে না?
ছেলেটাও তেমনি হয়েছে৷ যখনই দেখে গঙ্গা বসে ভাবছে, আর ভাবছে, তখনই কাছে আসে৷
অন্যদিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বলে, ‘আমি ইংরেজিতে কথা বলিনি, আমি বাইরে যাইনি; তবে আমার সঙ্গে কথা বলছ না কেন?’
‘চুপ কর!’
গঙ্গা কখনো ধমক দেয়, কখনো একটা ভুট্টা সেঁকে ফেলে দেয় সামনে৷
এমনি করেই দিন কেটে যাচ্ছিল৷ ক্রমে ফাল্গুন মাস এল৷ দিনে গরম পড়ে, কিন্তু রাত্রে গায়ে কম্বল দিতে হয়৷ কেল্লার পলাশ গাছ ফুলে ফুলে ভরে গেল৷
হঠাৎ কী যেন কথা ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে৷ দলে দলে লোক শহরের ভেতরে আসতে লাগল৷ গ্রাম থেকে মানুষ সরে যেতে লাগল৷
কী হয়েছে? ইংরেজরা আসছে৷ তারা বাটসাহেবকে ফাঁসি দেবে৷ তারা ঝাঁসির প্রতিটি মানুষকে মেরে ফেলবে৷ সেই যে ইংরেজদের মেরে রেখে সেপাইরা চলে গিয়েছিল, এ হবে তার প্রতিশোধ৷
শুনে বুড়ো বুড়ো বুন্দেলা রাজপুত, আফগান, পাঠান আর মকরানি সিপাহিদের যে কী আনন্দ তা যদি দেখতে! যাদের দাঁত পড়ে গেছে তারা হা-হা করে হেসে বলল, ‘এতদিনে যুদ্ধ করার একটা সুযোগ পাওয়া গেল!’
রানিকে ভয় দেখানো অমনি চাট্টিখানি কথা কিনা? কেল্লার ওপর টকটকে লাল একটা নিশান উড়িয়ে দিয়ে রানি যুদ্ধের জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷
তার পর কী হল?
বলব না৷
তোমরা ইতিহাসে পড়ে নিয়ো৷ কেমন করে যে যুদ্ধ চলল পনেরো-ষোলো দিন ধরে আর কেমন করে যে রানি তাঁর ছেলেকে নিয়ে ঝাঁসি ছেড়ে গোয়ালিয়র চলে গেলেন পড়লে পরে অবাক হয়ে যাবে৷
রানি পালিয়ে গেলেন শুনে ইংরেজরা তখন ঝাঁসি শহরের হাজার হাজার মানুষকে কাটতে শুরু করল৷ যুদ্ধ চলছে, কেননা সৈন্যরা তখনও ইংরেজের সঙ্গে লড়তে লড়তে মরছে৷ শহর জ্বলছে-সে এক সর্বনাশের দিন৷
যে পারল সে পালাল৷ গঙ্গা দেখতে লাগল, রাতেবিরেতে মানুষ পালাচ্ছে শহর ছেড়ে৷
রামকে বলল, ‘রাম, তুই পিসির বাড়ি যা৷’
‘তোমায় ছেড়ে যাব না৷’
‘কেমন করে পালাব বল, একটা ঘোড়ায় তিন জন যেতে পারব কি?’
‘মা আমি যদি আরেকটা ঘোড়া নিয়ে আসি?’
‘কেমন করে আনবি?’
‘কেন, চুরি করে?’
‘তুই পারবি?’
‘আমার বয়স বুঝি হয়নি? আমি বুঝি বুন্দেলা রাজপুত নই? আমি কি ভিতু হয়ে ঘরে বসে থাকব?’
রাম চলে গেল ঘোড়া আনতে৷ তেরো বছরের ছেলে, মাথার চুলগুলো কোঁকড়া, একটু কটা৷ ময়লা গায়ে লালরঙের জামা, আর কালো পাজামা পরনে৷ পায়ে মোটা নাগরা৷
গঙ্গা বেরিয়ে গিয়ে একটু দূরে শহরের পথের ধারে দাঁড়িয়ে রইল৷
ভাণ্ডীর দরজা দিয়ে রানি পালিয়েছেন, তাই ওরা পাথর দিয়ে ভাণ্ডীর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে৷ শহরের এতগুলো দরজা, সবগুলোই বুঝি বন্ধ৷ কিন্তু কেল্লা আর শহর-ঘেরা পাঁচিল ভেঙে গেছে কামানে৷ ফাটল দিয়ে মানুষ বেরোচ্ছে তো বেরোচ্ছেই৷ ঝাঁসি শহরে কি এত মানুষও ছিল?
এখন গঙ্গার বুকের ভেতরটা দুপদাপ করতে লাগল৷ মাগো, ও তো কাছেও যায়নি, ওর মধ্যে রাম গেল কেন? ও যেতে দিল কেন? ওই দেখো, কত চেনা চেনা মুখ৷
‘হ্যাঁরে, তোদের কি এত গাই মোষ ছিল?’
‘কী যে বল গঙ্গামাসি, এখন কোনটা কার, কে হিসেব করে?’
‘খুব লুঠ চলেছে বুঝি?’
‘গিয়ে দেখে এসো একবার!’
‘যাব?’
‘গরিবের আবার বিপদ কী বাবা? লুট হচ্ছে হালোয়াইপুরা আর কোস্টিপুরায় বড়োলোকদের পাড়ায়৷ রানিমহালটা আর নেই গো! তুমি দাঁড়িয়ে কেন? তুমি পালাবে না?’
‘পালাব কেন বাছা, আমি কি দোষ করেছি কোনো?’
‘তুমি যে গোঁয়ার সেই গোঁয়ারই রয়ে গেলে দেখছি৷ বলওয়ার সময় কে দোষ করেছে কে দোষ করেনি তার হিসেব রাখে কেউ?’
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গঙ্গা বাড়ি চলে এল৷ দিন কাটল, বিকেল হল৷ সন্ধ্যে হল, অন্ধকার৷ আজ আর গঙ্গা ঘরে পিদিম জ্বালল না৷ রাম জানে আলো না থাকলেও মা ঘরে বসে থাকবে৷ হয়তো গোলমালের জন্যে রাম আসতে পারছে না, পরে আসবে৷
গঙ্গা বসে থেকে থেকে কখন ঘুমিয়ে পড়ল কে জানে৷
ওর ঘুম ভাঙল ভোরে৷ শহরের আকাশে শকুন উড়েছে৷ গঙ্গা যেন কী বুঝতে পারল৷ ঘরে এসে ও লছমনকে ডেকে তুলল৷
লছমল তো অবাক! আজ গঙ্গার মুখে কথা নেই, ধমক নেই, চোখ দিয়ে শুধু অল্প অল্প জল পড়ছে, আর ঠোঁট কামড়াচ্ছে গঙ্গা৷ গঙ্গা ওকে নাওয়াল, গায়ের রং তুলল৷ তারপর ওকে ওর আগেকার প্যান্ট, শার্ট পরাল৷ শুধু জুতোটা ওর পায়ে হল না৷
‘গলার রুপোর সেই কাঠিটা কোথায় গেল বিল?’
‘তুমি আমায় বিল বলছ?’
‘তুমি যে নিজের লোকদের কাছে যাচ্ছ!-সেই কাঠিটা?’
‘আমি তো জানি না, রাম আর আমি নিয়ে খেলছিলাম কাল, রাম বুঝি জেবে লুকিয়ে রেখেছে৷’ (জেব=পকেট)৷
‘রামের পকেটে?’
গঙ্গার বুকের মধ্যে কে যেন কামান দেগে দিল৷
‘তখন যে ওর লুকোবার দান ছিল৷’
‘রামের পকেটে!’
‘সত্যি বলছি৷’
‘ঠিক আছে৷ ঘোড়ার পিঠে বসো৷’
বেতো টাট্টুটার উপর বিল বসল৷ গঙ্গা ঘোড়ার লাগাম ধরে লছমিতাল ঘুরে ঘুরে সেই দক্ষিণ দিক, যেখানে হিউরোজের তাঁবু সেখানে গেল৷
কাছে যেতে কি পারে? শুধু গোরা সেপাইয়ে ভরা৷ তবে, গঙ্গা এমন মাথা উঁচু করে হেঁটে হেঁটে এল যে কেউই মনে করতে পারল না ও একজন অপরাধী৷ ওর মুখে-চোখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই৷
‘সবচেয়ে বড়ো সাহেব কই? কুমেদান (কমান্ডান্ট) সায়েব কই?’
গঙ্গাকে ওরা সবচেয়ে বড়ো সায়েবের কাছেই নিয়ে গেল৷
‘তুমি হিন্দি বোঝ?’ গঙ্গা জিজ্ঞেস করল৷ দোভাষী বলল ‘আমি বুঝিয়ে দেব৷’ গঙ্গা বলল ‘এ হল গে, যে রেভিনিউ সায়েব ছিল তার ভাইপো৷ বিল৷’
‘বলো বাবা, সব বলো৷’
আস্তে আস্তে বলতে লাগল গঙ্গা৷ দু-চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল ওর৷
সবাই অবাক হয়ে গেল৷ মুখে আর কথাটি নেই৷ এমন করে কেউ পরের প্রাণ বাঁচায় নাকি? শত বিপদ মাথায় নিয়ে?
‘এখন তোমরা ওকে নিয়ে যাও৷ লছমন! যাও বাবা!’
‘তুমি কোথায় যাবে?’
‘আমি ঘরে যাব৷’
সায়েবরা বলতে লাগল ‘বকশিশ পাবে গঙ্গা, অনেক, অনেক টাকা৷’
গঙ্গা বলল ‘টাকা চাই না৷ শুধু, আমার ছেলে রাম যদি তোমাদের কয়েদিদের মধ্যে থাকে তাকে ছেড়ে দাও৷’
‘রাম? সে কি বড়ো ছেলে?’
‘ছোটো ছেলে৷ ওই লছমনের রুপোর একটা হার ওর কাছে ছিল, তাই শুনে থেকে…’
সায়েবরা এ-ওর দিকে চাইতে লাগল৷ কী বলবে ওরা? পকেটে একটা নাম-লেখা ক্রস ছিল৷ তা দেখে বুঝি ওরা মনে করবে না যে, এটা লুঠের মাল? মনে করবে না যে, ছেলেটা মিছে বলছে?
‘ও বলেনি কিছু? তোমরা ওকে দেখেছ?’
‘বলেছিল ওটা লছমনের৷’
‘বলেছিল?’
‘হ্যাঁ৷ আমরা বিশ্বাস করিনি৷’
গঙ্গা মাথা নাড়তে লাগল৷ হা রে রাম! লছমনের নাম যে উইলিয়াম তা কি তোর মনে পড়েনি রে? না তুই বড্ড ভয় পেয়েছিলি বাবা? বলতে পারিসনি কিছু?’
‘কোথায় ও, সাহেব?’
সাহেবরা চুপ করে রইল৷ ওই তো পড়ে আছে ওই গাদার মধ্যে৷ কে এখন ঘাঁটতে যায় বল?
গঙ্গা মাথা নাড়তে লাগল৷ বুঝতে পারছে না ও, কিছু বুঝতে পারছে না৷ বিল-এর দিকে চেয়ে ও হাতটা তুলল৷ কথা মুখে এল না একটাও৷
তারপর আস্তে আস্তে ও বেতো ঘোড়াটার গলার দড়ি ধরে চলে যেতে লাগল৷ কোথায় যেতে লাগল গঙ্গা? শহরের দিকে তো ওর ঘর নয়? শহর তো জ্বলছে৷
গঙ্গা সেদিকেই যেতে লাগল৷
‘থামো! থামতে বলো! আরে বুঝতে পারছ না, ও নিশ্চয় ওদের দলের লোক! থামো! গুলি করব!’
ওরা চেঁচাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে৷ গঙ্গা কিছুই শুনতে পেল না৷
