গল্প
উপন্যাস
জীবনী

শেয়ালকাঁটার ফুল – মহাশ্বেতা দেবী

শেয়ালকাঁটার ফুল

বুলু স্বপ্নে এতবার বাড়িটা দেখেছে, ছেলেটিকে দেখেছে যে, জানালা দিয়ে চেয়েই বুঝেছিল, ও স্বপ্নে যা যা দেখেছে সব এবার দেখে ফেলবে৷

মেসোমশাইকে কিছু বলেনি, মাসিকেও নয়৷ বাবা বিশ্বাস করেনি, মা বিশ্বাস করেনি, দাদা বিশ্বাস করেনি, তাই আর কাউকে কিছু বলতে ওর ইচ্ছে হয়নি৷

গরমের ছুটির আগেই ও স্বপ্নটা দেখতে শুরু করে৷ রোজ একই স্বপ্ন দেখত, সেকথা আমরা তখনও জানি না৷ আমরা শুধু দেখছিলাম ক্লাসে ও ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল, রোগা হয়ে যাচ্ছিল খুব৷ চুপচাপও হয়ে গিয়েছিল৷ কী যেন ভাবত আর ভাবত৷ একদিন ও স্কুলে আসা ছেড়ে দিল৷ শুনলাম ওর স্লো-ফিভার হচ্ছে৷ সবসময়ে একজ্বরি হয়ে থাকছে৷ এখন ও আর আসবে না৷ একদিন বই ফেরত দিতে ওর কাছে গেলাম৷ তখন সন্ধ্যে৷ ঘরে আলো জ্বলেনি৷ বুলু হঠাৎ বলল, ‘স্বপ্নটার কথা কেউ বিশ্বাস করছে না৷ কিন্তু স্বপ্নের বাড়িটা আর ছেলেটাকে দেখতে পেলেই আমার জ্বর সেরে যাবে৷ স্বপ্ন দেখব বলে আমি নিশ্চয় জানি, আর স্বপ্নটা দেখার পরেই ঘুম ভেঙে যায়৷ আর ঘুমোতে পারি না৷’

সেই প্রথম স্বপ্নটার কথা শুনলাম৷ বললাম, ‘কী স্বপ্ন?’

‘একটা বাড়ি, একটা একলা ছেলে৷’

‘আর কী?’

‘খু-ব বড়ো বাড়ি৷ ছেলেটা সেখানে একেবারে একলা থাকে৷ আট বছরের ছেলে৷’

বুলু হয়তো আরও বলত, কিন্তু তখনই ওর বাবা ঘরে ঢোকেন৷ বলেন, ‘আবার তুমি আবোলতাবোল বকছ?’

আমাদের বলেন, ‘ওকে উত্তেজিত কোরো না, এখন বাড়ি যাও৷’

আমরা চলে এসেছিলাম৷ বুলুর বাবা, মা, দাদা সবাই কেমন যেন বেশি ভদ্র৷ কম কথা বলত৷ আমাদের দেখেও দেখতে পেত না, স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানে আসত না৷ এরকম একটা সরকারি স্কুলে বুলুকে পড়াতে ওদের মোটেও ইচ্ছে ছিল না৷ কিন্তু বুলু ছিল রুগ্ন৷ দূরের সায়েবি স্কুলে যাওয়া-আসার ধকল ওর সইবে না বলে বাড়ির কাছের স্কুলে দেওয়া৷ মনে হত ওরা খুব লজ্জা পেত ওবাড়ির ছেলে বাংলা স্কুলে পড়ছে বলে৷

সেই যে চলে আসি, যাইনি ওদের বাড়ি৷ শুনেছিলাম ওর মাসি ওকে বহরমপুর নিয়ে গেছে৷ জায়গা বদলালে নাকি অনেক সময়ে এরকম ঘিনঘিনে জ্বর সেরে যায়৷ মেসোমশাই বুলুকে অনেকদিন রাখবে৷ তারপরে ওর বাবা-মা গাড়ি করে বহরমপুর গিয়ে বুলুকে তুলে নিয়ে দার্জিলিং চলে যাবে৷

তারপর যা হয়েছিল সব ওর দাদার কাছে অনেক পরে শুনেছি৷ বুলু পৌঁছেছিল রাত আটটায়৷ মাসিদের বাড়ি সৈদাবাদ ছাড়িয়ে ফাঁকা জায়গায়৷ রাতে বুলু ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু আবার সেই স্বপ্নটা ও দেখে৷

একটা মস্ত বাড়ি৷ বাড়িতে কোনো মানুষজন নেই৷ বাড়িটা দোতলা, কিন্তু খুব নীচু৷ ছোটো ছোটো খুপরির মতো জানালা, দরজায় লোহার গজাল পোঁতা সারি সারি৷ মাঝে চকমেলানো উঠোন৷ উঠোনের ওপাশে ঘরগুলোর কোণ ঘেঁষে টানা দালান৷ দালানে কী যেন পুজোর ব্যবস্থা সাজানো আছে৷

একটা লাল কম্বলের আসনে একটা আট বছরের ছেলে লাল চেলির ধুতি পরে কুঁকড়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে৷ ছেলেটার কপালে সিঁদুরের ফোঁটা, গলায় জবা ফুলের মালা৷ গালে চোখের জল শুকিয়ে আছে৷ হাত-পা, সরু শেকলে বাঁধা৷ স্বপ্নে বুলুর মনে হত ছেলেটার সঙ্গে ওর অনেক দরকারি কথা আছে৷ এবারও মনে হয়েছিল৷ বুলু জেগে উঠেছিল৷

ওর খাটের এক পাশেই মাসি ঘুমোচ্ছে৷ বুলু জেগে উঠে কেন যেন মশারি তুলে নেমে জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল৷ দাঁড়াতেই বাড়িটা দেখতে পেয়েছিল৷

বুলু স্বপ্নে এতবার বাড়িটা দেখেছে, ছেলেটিকে দেখেছে যে, জানালা দিয়ে চেয়েই ও বুঝেছিল, ও স্বপ্নে যা যা দেখেছে সব এবার দেখে ফেলবে৷

ছেলেটা দালানে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল, কিন্তু বুলুকে দেখেই ও উঠে বসেছিল৷ বুলু দেখেছিল এখন ওর হাতে-পায়ে শেকল নেই, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা নেই৷ এক হাতে একটা মাটির ঘোড়া, বোধ হয় ও ঘোড়াটা নিয়ে খেলছিল৷

ছেলেটা ওর দিকে চেয়ে হেসেছিল৷ বুলু একটুও অবাক হয়নি, ছেলেটা যখন ওর জানালার নীচে এসে দাঁড়ায়৷ বুলু বুঝেছিল ছেলেটা সব পারে, বাড়ির ঘর পেরিয়ে ওর জানালার নীচে এসে ও দাঁড়াতে পারে৷ কেমন করে বুঝেছিল বুলু জানে না৷

বুলু বলেছিল, ‘তুমি কে?’

খুব ফিসফিস করে বলেছিল৷ মাসি জেগে উঠলেই ছেলেটা পালিয়ে যাবে, তা বুলু জানত!

‘আমার নাম গোপাল৷’

‘এটা তোমাদের বাড়ি?’

‘না৷ আমাকে নিয়ে এসেছে৷’

‘তোমাদের বাড়ি কোথায়?’

‘ওই গঙ্গার ওধারে৷’

‘এখানে আর কেউ নেই?’

‘না৷ ওরা নৌকোর বন্দোবস্ত করতে গেছে৷ পরে আসবে৷’

‘তোমার শেকল কোথায় গেল?’

‘পুজো হোক, তবে তো শেকল পরাবে৷’

‘একা একা তোমার ভয় করে না?’

‘আমি তো একাই থাকব৷’

‘কেন?’

‘চুপ৷’

ছেলেটা ঠোঁটে আঙুল রেখেছিল৷ বলেছিল, ‘ওরা আসছে৷ নৌকার শব্দ পাচ্ছ?’

তখন বুলু দেখছিল বাড়ির ওপারেই নদী৷ গঙ্গার জল জোছনায় মাখামাখি৷ জল দিয়ে একটা মস্ত নৌকো এদিকপানে আসছে৷

ছেলেটা তখনই পালিয়ে গিয়েছিল৷

বুলুর তখনই ঘুম পেয়েছিল৷ ঘুমে দু-চোখ জড়িয়ে গিয়েছিল৷ এতদিনের মধ্যে একদিনও ওর এমন করে ঘুম পায়নি৷

খুব ঘুমিয়েছিল বুলু৷ সকালে উঠে এই প্রথম ওর গায়ে জ্বর ছিল না৷ মাসি আর মেসোমশাই ভারি অবাক হয়ে গিয়েছিল৷ বুলুর মাকে চিঠি লিখে দিয়েছিল৷

জানালা দিয়ে চেয়ে বুলু দেখেছিল জানালার ওপারে অনেকখানি ফাঁকা পোড়ামাটির জমি, অনেক দূরে সার সার দোকানের চালাঘর, অনেক দূরে গঙ্গা৷ জমিটাতে একটা আম গাছ৷ তাতে কচি কচি আম, কিন্তু কেউ আম পাড়তে আসছিল না, একটা পাখিও আম গাছের ডালে এসে বসছিল না৷ বুলু অবাক হয়নি৷

ও জানত এর একটাও সত্যি নয়৷ কিংবা দিনের বেলা এটা সত্যি, রাতের বেলা বাড়িটা, বাড়ির গা ঘেঁষে কলকল করে বয়ে চলা নদী সত্যি৷

মাসির ঝি ঘর ঝাঁট দিতে দিতে বলেছিল, ‘জানি না বাবা! ওদিকের জানালা খুলে রাখে কে? না, বিশ্বেস যাই না৷ উ জমিতে গাছ হয় না, ঘাস হয় না, উ গাছে পাখি বসে না, একটা ফল ছেলেরা পাড়ে না, তবু বলে বিশ্বেস যাই না৷’

মাসি ঝিকে বকেছিল৷

খেতে বসে বুলু মেসোমশাইকে বলেছিল, ‘গঙ্গা একসময়ে অনেক এদিকে ছিল, তাই নয়?’

‘ছিলই তো৷ দু-শো বছরে সরে গেছে৷ তুই কী করে জানলি?’

‘পড়েছি৷’

মাসি বলেছিল, ‘একেবারে সেরে ওঠ৷ সব দেখিয়ে আনব৷’

বুলু সেদিন দুপুরেও ঘুমিয়েছিল, রাতেও৷ ওকে মাসি বা মেসো বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওই জমিটায় হাঁটতে বারণ করেনি! বুলু তখনও বাড়ি থেকে বেরোয় না৷ বারণ করার কথা ওদের মনেও হয়নি৷ মেসো বলেছিল, ‘মাসি তোকে সব পুরোনো জিনিস দেখাবে৷ আমি তোকে কত ভালো জিনিস দেখাতে পারি৷’

‘কী?’

‘কতরকম মাটি৷ সয়েল নিয়ে কতরকম কাজ হচ্ছে৷’

‘পাশের জমিটা অমন ন্যাড়া কেন?’

মেসো সয়েল কনজারভেটার৷ হেসে বলেছিল, ‘ও একটা মিস্ট্রি৷ টেস্ট করে দেখেছি কোনো দোষ নেই৷ তবু ওখানে না হয় ঘাস, না জন্মায় আগাছা৷’

মাসি বিরক্ত হয়ে বলেছিল, ‘থাক না ওসব কথা৷’

বুলু একবারও চোখ তোলেনি৷ কিছু জানতেও চায়নি৷ ও জানত, ও যা বলবে তাই বড়োরা অবিশ্বাস করবে৷

ও শুধু বলেছিল, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে৷’

ছেলেটা আজ মাটির ঘোড়াটা নিয়ে আপন মনে খেলছিল৷ বুলুকে দেখে ও একটু হেসে উঠে এল!

বুলু বলল, ‘কেন তুমি একা থাক, বলো না?

‘বা, এখানে আমার কে আছে?’

‘কেউ নেই?’

‘না৷ আমার বাড়ি তো দেউটিতে৷’

‘দেউটি কোথায়?’

‘কেন, এখন গঙ্গার তলে?’

‘এখানে তুমি এলে কেন?’

‘এদের পুরুত যে বাবাকে অনেক টাকা দিল৷’

‘তাই এলে?’

‘আমি তো জানতামই না৷ মাটির ঘোড়াটা নিয়ে খেলছিলাম, খেলতে খেলতে এরা আমায় ধরে আনল৷’

‘এরা কারা?’

‘পুরুতের লোকেরা?’

‘এ বাড়ির লোকরা কোথায়?’

ছেলেটা কথায় কথায় হাসে৷ জোছনার চেয়েও স্পষ্ট হেসে বলল, ‘দেশে বর্গি এসেছে বলে সবাই পালিয়ে গেছে না?’

‘সবাই?’

‘সবাই৷’

‘তোমাকে রেখে গেল কেন?’

‘আমি এদের টাকাকড়ি পাহারা দেব না?’

‘টাকাকড়ি!’

‘এদের যে ঘড়া ঘড়া টাকা৷’

‘এরা কারা?’

‘বাবাকে পুরুতঠাকুর বলেছিল জগৎশেঠদের খাজাঞ্চিখানা এটা! এরা তবে সেই শেঠরাই হবে৷’

‘তুমি কী করে টাকা পাহারা দেবে?’

‘কেন, জলের নীচে বসে?’

‘তা কি হতে পারে?’

‘শেঠরা কিচ্ছু জানে না৷ সব টাকার ঘড়া নদীতে ফেলে দিতে বলে তারা পালিয়েছে৷ সে টাকা পাহারা দিতেই তো আমাকে এনেছে৷’

‘তুমি তো এখানে আছ৷’

‘অমনি অমনি হয় বুঝি? পুজো হবে, হোম হবে, তারপর টাকাসুদ্ধ আমাকে সুদ্ধ নৌকো মাঝ গঙ্গায় ডুবিয়ে দিতে হবে, তবে তো? নইলে কি আমি পাহারা দিতে পারব?’

‘কখন হবে?’

‘দেখতে পাবে৷’

‘সে তো তবে অনেক আগে৷’

‘অনেক আগে হয়েছিল, স-ব হয়েছিল৷ আবার হবে, হতেই হবে৷ নইলে তুমি জানবে কি? তুমি জানবে বলেই তো তোমায় ডেকে এনেছি৷’

‘আমি জানলে কী হবে?’

‘তুমি যখন স-ব জানবে, তখন আমি ঘুমোতে পারব৷ তখন দেখো, বৃষ্টির পর এখানে ঘাস গজাবে, এখন একটা পাখিও আসে না, তখন এখানে পাখি এসে গাছে বসবে৷’

‘আমি সব জানলে এই স-ব হবে?’

‘বা, তুমি আমার বন্ধু যে৷’

‘বন্ধুই তো৷’

‘শুধু মাটির ঘোড়াটা নিয়ে খেলতাম, এখন তুমি এসেছ!’

‘এখন তো তোমার একা একা লাগে না?’

‘না৷’

বুলু আঙুল বাড়িয়ে ওকে ছুঁতে চেয়েছিল৷ গোপাল হেসে পিছিয়ে গিয়েছিল৷ বলেছিল, ‘আমাকে কি ছুঁতে আছে?’

পরদিন বুলুর জ্বর আসেনি৷ কিন্তু দু-দিন ওকে ওঘরে শুতে দেয়নি মাসি৷ ঘর চুনকাম হয়েছিল৷ সরকারি বাড়ি এরকম মাঝে মাঝে চুনকাম করতেই হয়৷

দু-দিন তো রাতে ভালো ঘুমোতে পারেনি৷ শুধু জেগে জেগে উঠেছিল৷ সেই জন্যেই বোধ হয় ওর আবার জ্বর আসে৷ মাসি ওকে দু-দিন বাদেই এই ঘরে নিয়ে আসে৷

মাসি ওর বাবাকেই চিঠি লিখে দিয়েছিল জ্বর আসার পর৷ মাসি আর মেসো খুব ভয় পেয়েছিল৷ আবার কেন জ্বর এল? মাসি মেসোকে বলেছিল, ‘পরের ছেলের দায়িত্ব বেশিদূর নেওয়া ঠিক নয়৷’

মেসো বলেছিল, ‘ওঁরাও তো আসছেন৷’

‘হ্যাঁ, নিয়েই যাক৷’

বাবা-মা আসবে, ওকে নিয়ে চলে যাবে জেনে বুলুর অসম্ভব কান্না পেয়ে গিয়েছিল৷ কতদিন, কতকাল ধরে গোপাল শুুধু একটা মাটির ঘোড়া নিয়ে খেলত৷ এখন বুলু আসার পর তবে না ওর একলা থাকা ঘুচেছিল? একলা থাকতে যে কী কষ্ট৷ বুলু জানে, স্কুলের আগে আর পরে নিজেদের বাড়িতেও বুলু ভীষণ একলা থাকে৷

গোপালেরও কষ্ট হয়েছিল নিশ্চয়৷ গোপালের চোখের জলের দাগ ছিল গালে৷ মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল৷ আবছা আলোতেও বুলু দেখেছিল গোপালের হাতে পায়ে শেকল, গলায় জবাফুলের মালা, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা৷

আবছা দেখেছিল৷ আজ রাতে খুব ঝোড়ো, বাদুলে বাতাস বইছিল৷ বার বার চাঁদ ঢেকে যাচ্ছিল ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে৷

বুলু বলেছিল, ‘আমি দু-দিন আসিনি৷’

‘তুমি তো চলে যাচ্ছ৷’

‘তুমি জান?’

‘জানি৷’

‘আজ তুমি ফোঁটা পরেছ, মালা পরেছ, কেন?’

‘পুজো হয়ে গেল যে৷’

গোপাল ফুঁপিয়ে কেঁদে বলেছিল৷ বলেছিল, ‘আমার বড্ড ভয় করছে৷’

‘হাতে পায়ে শেকল নিয়ে এলে কী করে?’

‘পালিয়ে এলাম৷’

‘একেবারে পালিয়ে আসতে পার?’

‘কেমন করে পারব বল? এখনই নৌকো আসবে, বাড়ির নীচ থেকে গঙ্গা অব্দি সুড়ঙ্গ আছে, জান? উঠোনের মাঝখানে একটা শেকল বাঁধা আংটা দেখছ?’

এতদিন দেখেনি, আজ বুলু দেখেছিল৷

‘ওটা চাপা দরজা৷ শেকল টেনে আংটা টেনে তুললে দেখবে সিঁড়ি নেমে গেছে৷ নৌকো ওই অব্দি চলে আসে৷ দেউটি থেকে ওরা যখন আমায় আনে, এই পথেই এনেছিল৷’

‘তখন যদি না আসতে, যদি তখনই পালিয়ে যেতে!’

‘বা, আমার বাবা যে আমায় বেচে দিল? তখন কি আর পালানো যায়? পারলে তো পালাতাম৷’

‘কিন্তু কেন বেচে দিল?’

‘নইলে যে ওদের যখ দেওয়া হয় না৷’

‘তোমাকে যখ দিয়েছিল!’

‘হ্যাঁ৷’

আবছা আলো এই আছে, এই নেই, গোপাল বলল, ‘এবার যাই৷’

বুলু দেখল গোপাল ছুটে চলে যাচ্ছে, চলে গেল বাড়ির ভেতর৷ কোথায় যেন ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজল, গোপাল এখন যেন আর শেকল টেনে হাঁটতে পারছে না, অথচ একটু আগেও ও ছুটে এসেছিল৷

পা ঘষটে গোপাল পালাতে চেষ্টা করছে, কারা যেন ঢুকে পড়ল৷ দু-জন লোক শেকল টেনে আংটা, জোড়া কপাট তুলে ধরল৷ বুলুর বুক ধড়াস ধড়াস করছিল৷ মাটির নীচ থেকে উঠোনে কারা উঠে এল৷ ঘরের দরজা খুলে কলসির পর পেতলের কলসি টেনে আনতে লাগল৷ একজন লোক গোপালকে পাঁজাকোলা করে তুলে ধরল৷

এই জোছনা আছে, এই নেই৷ কালো কালো ছেঁড়া মেঘ যেন আকাশগঙ্গায় খ্যাপা ঢেউ৷ খট-খট-খট খড়মের শব্দ৷ অসম্ভব লম্বা একজন বুড়ো লোক এগিয়ে এল৷ মাথা নেড়া৷ পরনে গরদ, গলায় রুদ্রাক্ষ৷ সে শেকল দিয়ে কলসির গলা জড়াচ্ছে, শেকলের মুখ গোপালের পায়ের শেকলের সঙ্গে কী দিয়ে ঠুকে জড়িয়ে দিচ্ছে৷ দিতে দিতে লোকটি চেঁচিয়ে বলল, ‘ছিপ আগে নাও! নৌকো ফাঁসিয়ে উঠতে হবে৷’

বাড়ির নীচ থেকে সাঁ সাঁ শব্দ৷ বুলু দেখল চারটে ছিপ গঙ্গায় বেরিয়ে গেল৷ গোপাল কাঁদছে৷ ‘না-না-না-না,’ বুড়ো লোকটা ওর মুখ চাপা দিল৷ ‘উঁ-উঁ-উঁ-উঁ’ বোবা কান্না, ওরা সবাই নেমে গেল উঠোনের মাঝের গহ্বর দিয়ে৷ ঝপাং করে চাপা দরজা পড়ল৷ এখন কোনো লোক নেই, কেউ নেই, দালানে একটা মাটির ঘোড়া, পিদিম নিবে গেছে৷

নৌকো বেরোল, নৌকো এখন মাঝগঙ্গায়৷ নৌকো থেকে সবাই ঝুপঝাপ করে জলে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে ছিপে উঠছে৷ বুলু ছুটে গিয়ে দরজা খুলল, বেরিয়ে গেল পাশের দিকে৷ চাপা দরজাটা কি ও খুলতে পারবে না? চোরা সিঁড়ির নীচে কি একটা ছিপও আর থাকবে না? কিন্তু কোথায় বাড়ি, কোথায় কী, পায়ের নীচে শুধু পোড়ামাটি, মাটির নীচ থেকে কে গুমরে কেঁদে উঠল, ‘না-না-না৷’ বুলু নাকি পোড়ামাটির পোড়ো জায়গায় একটা মাটির ঘোড়া আঁকড়ে ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল৷ ওর বাবা-মা-দাদা সবাই এসেছিল, কিন্তু বুলু তখন যে কার কথা বলছিল, ‘ও বুঝি একলা থাকবে?’ সব কথা ওরা বোঝেইনি৷

ডাক্তারও সব বুঝতে পারেনি৷ এখন বাতাসে সবসময়ে ভাইরাস থাকে৷ মাঝে মাঝে ব্রেনফিভার এমন হতে পারে যে ডাক্তাররাও কিছু করতে পারে না৷

বুলুর দাদা শুধু ওর কাছে বসে সব কথা শুনছিল৷ ওই আমাদের একদিন সব কথা বলেছিল৷ বলেছিল, ‘আমি কিছু বিশ্বাস করছি না, তবে বুলু এইসব কথা বলে গেছে৷’

ওর মাসি আর মেসো আর সে বাড়িতে থাকেননি৷ ওঁরা নাকি থাকতে পারছিলেন না৷ তবে সেবার হঠাৎ ক-দিন ধরে খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল৷ তারপর নাকি এতদিনের পোড়ো ন্যাড়া জমিটা ঘাসে ঢেকে গিয়েছিল৷ ঘাসের মাঝে মাঝে শেয়ালকাঁটার চারা, হলদে একফোঁটা ফুল৷ আর কয়েকটা টিয়া পাখি আম গাছটার ডালে বসে ভারি গোলমাল করছিল৷

চলে যাবার আগে বুলুর মাসি সেই মাটির ঘোড়াটা খুঁজতে গিয়ে ঘোড়াটা খুঁজে পাননি, শুধু শেয়ালকাঁটার ফুল দেখে, টিয়া পাখির চেঁচামেচি শুনে চলে এসেছিলেন৷ শেয়ালকাঁটার ফুল যে এত সুন্দর হয় তা তিনি আগে জানতেন না৷ মনে হয়েছিল ঘাসের ওপর যেন ছোটো ছেলেদের দৌড়ে চলে যাবার শব্দ৷ কিন্তু এখানে তো চারদিকে দোকান-বাজার, অমন কত দূরের শব্দ কাছে বলে মনে হয়৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *