হোয়াট ইজ আর্ট – ১৭

১৭

[খাঁটি শিল্পের অস্তিত্বহীনতার পরিণতি। শিল্পবিকৃতির ফল : অপ্রয়োজনীয় এবং অনিষ্টকর বিষয়বস্তুর জন্য শ্রম এবং জীবনের ব্যয়। বিত্তবানদের স্বাভাবিক জীবন। শিশুদের এবং সরলপ্রকৃতির লোকদের বিভ্রান্তি। সৎ এবং অসৎ সম্পর্কে বিভ্রম। নীটশে এবং রেববেয়ার্ড। কুসংস্কার, স্বদেশপ্রেম এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণতা।]

মানবপ্রগতি-বিধায়ক দুটি অঙ্গের মধ্যে শিল্প একটি। ভাষার দ্বারা মানুষ চিন্তার আদান- প্রদান করে, শিল্পরূপের সাহায্যে আদান-প্রদান করে অনুভূতি। অনুভূতির এই আদান- প্রদান শুধু স্ব-যুগের সর্বমানবের সঙ্গে নয়, অতীত এবং ভবিষ্যৎ যুগের মানুষের সঙ্গেও। মানুষের পক্ষে পারস্পরিক আদান-প্রদানের কার্যসাধক এই অঙ্গদ্বয়ের প্রয়োগ স্বাভাবিক। সুতরাং এই উভয়ের মধ্যে কোন একটির বিকৃতি ঘটলে সমাজকে অনিবার্যভাবে অশুভ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। এই পরিণতির প্রকৃতি হবে দুই রকম : প্রথম, যে অঙ্গের সাহায্যে যে কর্ম সম্পাদিত হওয়া উচিত, সে সমাজে তার অভাব, এবং দ্বিতীয়ত বিকৃত অঙ্গের ক্ষতিকর ক্রিয়াকলাপ। ঠিক এই ধরনের পরিণতিই আমাদের সমাজে আত্মপ্রকাশ করেছে। শিল্পরূপ অঙ্গের বিকৃতি ঘটেছে। সুতরাং আমাদের অভিজাত সমাজ শিল্পসমূত সুফল থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হয়েছে। একদিকে বৃহৎ পরিমাণে বিকীর্ণ কৃত্রিম শিল্প কেবলমাত্র মানুষের চিত্ত বিনোদন এবং চরিত্র কলুষিত করবার কাজে নিয়োজিত হয়েছে, অপরদিকে অকিঞ্চিৎকর স্বাতন্ত্র্যধর্মী শিল্পকে শ্রেষ্ঠ শিল্প বলে মনে করার ভ্রান্তি অধিকাংশ মানুষের খাঁটি শিল্পের দ্বারা সংক্রমিত হবার শক্তিকে বিকৃত করেছে। ফলে তারা সর্বোচ্চ অনুভূতির অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে-যা মানুষের পরস্পরের মধ্যে কেবলমাত্র শিল্পের দ্বারাই সঞ্চারিত হওয়া সম্ভব।

শিল্প-সংক্রমিত হবার ক্ষমতাবঞ্চিত মানুষের নিকট মনুষ্যসৃষ্ট সর্বশেষ্ঠ শিল্প-পরিচয় অজ্ঞাত থেকে যায়। মিথ্যাচারী সেই সর্বোৎকৃষ্ট শিল্পের স্থানে স্থাপন করে তারা কৃত্রিম শিল্পকে, অথবা প্রকৃত শিল্প-ভমে অকিঞ্চিৎকর শিল্পবস্তুকে। আমাদের সমকালীন সমাজের মানুষ কবিতায় বোদলেয়ার, ভেরলেন, মোরোয়া, ইবসেন, মেটারলিঙ্ক প্রভৃতিদের নিয়ে, চিত্রশিল্পে মোনে (Monets), মানে (Manets), পুভি দ্য শাভান (Puvis de Chavannes), বার্ণ জোন্‌স (Burne-Joneses), স্টুক্স (Stucks), এবং ব্যকলিনদের (Bocklins) নিয়ে, সংগীতে ভাগনার, লিস্ট (Liszt), রিচার্ড স্ট্রাউস (Richard Strausses) – দের নিয়ে উল্লসিত হয়। তারা আর সর্বোচ্চ অথবা সহজতম শিল্পের উপলব্ধিতে সক্ষম নয়।

অভিজাত শ্রেণীর মানুষ শিল্প-সংক্রমিত হবার ক্ষমতা বিচ্যুত হয়ে যে শিল্পের প্রভাবে তাদের জীবনকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করতে পারত, তার থেকে বঞ্চিত হয়েই তারা বেড়ে ওঠে, শিক্ষা প্রাপ্ত হয় ও জীবনযাপন করে। সুতরাং তারা যে সম্পূর্ণতার দিকে প্রগতি লাভ করে না, কিংবা অধিকতর সহৃদয় হয়ে ওঠে না শুধু তাই নয়,-পরন্তু সভ্যতার উচ্চ-বিকশিত বহিরঙ্গীয় উপায়গুলি আয়ত্তে আসায় তারা উত্তরোত্তর অধিকতর বর্বর, স্থুল এবং নিষ্ঠুর হযয়ার দিকে যায়।

আমাদের সমাজের এই অতি-প্রয়োজনীয় অঙ্গ-শিল্পের প্রভাব কার্যকরী না হওয়ায় এরূপ পরিণতি ঘটেছে। কিন্তু সে অঙ্গের বিকৃত ক্রিয়ার পরিণতি আরও বেশি ক্ষতিকর এবং সে পরিণতি অসংখ্য।

এর প্রথম পরিণতি যা সকলের চোখেই ধরা পড়বে তা হল, এমন বস্তুর জন্য শ্রমিক শ্রেণীর বিপুল পরিমাণ শ্রম ব্যয়, যা শুধুমাত্র অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। ততধিক উল্লেখ্য বিষয় হল, এই অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর কাজের জন্য অমূল্য মানবজীবনের অপব্যয়। ভাবলে ভয়াবহ মনে হয় যে, নিজের এবং পরিবারের অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয় কর্মানুষ্ঠানের জন্য যাদের সময় এবং সুযোগের অভাব-এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ কী ভয়ানক কষ্টের মধ্যে এক নাগাড়ে দশ, বারো, চৌদ্দ ঘন্টা পর্যন্ত কী দারুণ পরিশ্রম করে যাচ্ছে, এমনকি রাত্রিবেলায় মানবজাতির মধ্যে পাপ বিস্তারে ব্যাপৃত কৃত্রিম শিল্পগুণান্বিত গ্রন্থের জন্য টাইপ সাজিয়ে যাচ্ছে, অথবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাপকর্মে সহায়তায় নিযুক্ত থিয়েটার, কনসার্ট, প্রদর্শনী এবং চিত্রশালার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই চিন্তা আরও বেশি ভয়াবহ, সৎ কর্মে সক্ষম সজীব, সহৃদয় ছেলেগুলি জীবনের আদিপর্ব থেকে এমন সমস্ত কাজে আত্মনিয়োগ করে-যে কাজ চলে দশ বা পনেরো বৎসর ব্যাপী দৈনিক ছয়, আট বা দশ ঘন্টা পর্যন্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বরগ্রাম বাজানো ও তার বিবিধ পাঠ অভ্যাস করবে, কারো কারো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাঁকাবে এবং পদাঙ্গুলির ওপর ভর করে হাঁটবে, পা-গুলিকে মাথার ওপর তুলবে; তৃতীয় একদল সা-রে-গা গাইবে; চতুর্থ দল সকল প্রকার অঙ্গভঙ্গি করে কবিতা আবৃত্তি করবে; পঞ্চম দল আবক্ষ মূর্তি থেকে, নগ্ন মডেল থেকে অতবা চিত্রিত ছবি থেকে আঁকতে থাকবে; ষষ্ঠ দল কোন বিশিষ্ট যুগের রীতি অনুসরণ করে রচনাকর্মে নিযুক্ত হবে। মানুষের অযোগ্য এ সমস্ত কর্মের অনুষ্ঠানে অনেক সময় পূর্ণ বয়স প্রাপ্তির পরও চলতে থাকায় তারা তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে,-এমনকি জীবনের অর্থ উলব্ধির সমস্ত বোধ পর্যন্ত তাদের নষ্ট হয়ে যায়। ছোট ছোট বাজীকর যে ঘাড়ের ওপর পা তুলে কসরত করে তা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং করুণ বলে অনেক সময় বলা হয়ে থাকে। কিন্তু দশ বছরের ছেলের ঐকতানে অংশগ্রহণ করার দৃশ্যও কম করুণ নয়। দশ বৎসরের স্কুলের ছাত্রদের সাহিত্যকর্মের প্রস্তুতি হিসেবে ল্যাটিন ব্যাকরণের ব্যতিক্রমগুলি মুখস্থ করার দৃশ্যও কম করুণ নয়। দশ বৎসরের স্কুলের ছাত্রদের সাহিত্যকর্মেল প্রস্তুতি হিসেবে ল্যাটিন ব্যাকরণের ব্যতিক্রমগুলি মুখস্থ করার দৃশ্য আরও নিকৃষ্ট অনুভূতি জাগ্রত করে। শুধুমাত্র শারীরিক ও মানসিক দিক থেকেই নয়, নৈতিকতার দিক থেকেও বিকৃত মূর্তি নিয়ে এ ধরনের মানুষ বেড়ে ওঠে, এবং মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কোন কিছু সাধনে তারা অসমর্থ হয়ে পড়ে। সমাজের ধনী ব্যক্তিদের কৌতুক যোগাবার ভূমিকা গ্রহণ করে তারা তাদের মানবমর্যাদাবোধ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। জনসাধারণের প্রশংসা অর্জনের জন্য তাদের অন্তরে এমন একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় যে, তারা সর্বদাই স্ফীত এবং অতৃপ্ত অহমিকার শিকারে পরিণত হয়-যা তাদের মধ্যে অসুস্থ মাত্রায় বেড়ে ওঠে এবং এই প্রক্ষোভের পরিতৃপ্তি সাধন প্রয়াসে তারা তাদের মানসিক শক্তি অপচিত করে। সব চাইতে বেদানাদায়ক হল, এ ধরনের শিল্প অনুশীলনে যে সমস্ত ব্যক্তির জীবন পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়, তারা শিল্পের সহায়ক কোন কাজ পর্যন্ত যে করে না শুধু তাই নয়, পরন্তু শিল্পের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে। কি ভাবে মেকি শিল্প সৃষ্টি করা যায় সেজন্য তারা বিদ্বজ্জনসভায়, বিদ্যালয়ে, শিল্প শিক্ষায়তনে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয় এবং এ ধরনের শিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে তাদের এতদূর স্বভাববিকৃতি ঘটে যে, প্ৰকৃত শিল্পকর্ম সৃষ্টির সামর্থ্য পর্যন্ত একেবারে হারিয়ে ফেলে। এবং তারা আমাদের সমাজপ্লাবনকারী কৃত্রিম অকিঞ্চিৎকর কলুষিত শিল্পের যোগানদারে পরিণত হয়। শিল্প-অঙ্গ বিকৃতির এই হল প্রথম সুস্পষ্ট পরিণতি।

এর দ্বিতীয় পরিণতি হল, বিপুল সংখ্যক শ্রেণীর শিল্পীদের দ্বারা যে বহুল পরিমাণ চিত্তবিনোদনকারী শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে তা আমাদের দেশের ধনীদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রারই সহায়ক। সে জীবন শুধুমাত্র অস্বাভাবিক নয়, বরং যে সহৃদয় মানব-নীতি তারা নিজেরাই উচ্চারণ করে থাকে-তার বিরোধী। অলস ধনীর দল-বিশেষ করে স্ত্রীলোকেরা প্রকৃতি এবং প্রাণিজগৎ থেকে বহু দূরে কৃত্রিম পরিবেশে বসবাসে অভ্যস্ত। এবং কৃত্রিম শরীরচর্চার প্রভাবে তাদের পেশী হয়ত ক্ষয়িত অতবা বিসদৃশ পরিণামপ্রাপ্ত। প্রাণশক্তি ক্ষীয়মান হওয়ায় শিল্পনামধেয় বস্তুর সহায়তা ছাড়া তাদের বেঁচে থাকাই অসম্ভব হত। যেহেতু এই শিল্প-ব্যাপৃতি এবং চিত্তবিনোদন তাদের সৃষ্টি থেকে জীবনের অর্থহীনতাকে আড়াল করে রাখে এবং যে নীরসতায় তারা ম্রিয়মান তা থেকে তাদের উদ্ধার করে। থিয়েটার, কনসার্ট, প্রদর্শনী, পিয়ানো বাদন, গান এবং উপন্যাস প্রভৃতি যাদের জীবনের সর্বক্ষণ ভরে রাখে, এ সমস্ত নিয়ে ব্যাপৃত থাকাকে যারা খুবই সুসংস্কৃত, নান্দনিক এবং সৎকর্ম বিবেচনায় পূর্ণ প্রথতয়য়ে সর্বদা নিয়োজিত থাকে-তাদের যদি সেগুলি থেকে বঞ্চিত করা হয়, শিল্পে যে সমস্ত পৃষ্ঠপোষক ছবি কেনে, গায়কদের সাহায্য করে, লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হয়, তাদের যদি শিল্পকর্ম-রক্ষকের এই মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে না দেওয়া হয়,-তবে তারা এ ধরনের জীবন যাপনে সক্ষম হবে না, কর্মভারজনিত অবসাদ ও বিমর্ষতার ভারে তাদের প্রাণশক্তি ক্ষয়িত হবে। এ ছাড়া তারা তাদের বর্তমান জীবনপ্রণালীর অর্থহীনতা এবং দোষদুষ্টতা সম্পর্কেও সচেতন হবে। যা তারা শিল্প বলে মনে করে তারই মধ্যে এই ঐকান্তিক ব্যাপৃতি ওই সমস্ত ব্যক্তিকে তাদের জীবনের শূন্যতা এবং নিষ্ঠুরতা বুঝতে দেয় না এবং প্রকৃতির সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করেও তারা যে বেঁচে থাকে-তার কারণও ওই। ধনী ব্যক্তিদের দ্বারা অনুসৃত জীবনচর্যার এই ভ্রান্ত রূপের পরিপোষণ শিল্পবিকৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পরিণতি। শিল্পবিকৃতির তৃতীয় পরিণতি শিশু এবং সরল প্রকৃতির জনসাধারণের মনে বিভ্ৰান্তি সৃষ্টি। আমাদের সমাজের ভ্রান্ত তত্ত্ব দ্বারা বিকৃত হয়নি এমন মানুষের-যেমন শিশুদের ও শ্রমিকদের সম্মানযোগ্যতা এবং প্রশংসাযোগ্যতা বিষয়ে সুস্পষ্ট একটা ধারণা আছে। কৃষক এবং শিশুদের মনে প্রশংসা এবং গুণানুবাদের ভিত্তি হয় শারীরিক শক্তি (হারকিউলিস, বীরবৃন্দ অথবা বিজয়ীবৃন্দ), অথবা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি (মানুষের মুক্তির জন্য শাক্যমুনির সুন্দরী স্ত্রী এবং রাজ্যত্যাগ, স্বপ্রচারিত সত্যরক্ষার নিমিত্ত খ্রীষ্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং সকল আত্মোৎসর্গকারী এবং সাধুবৃন্দ)। প্রশংসাযোগ্য এই উভয় উৎকর্ষই কৃষক এবং শিশুদের নিকট সুস্পষ্ট বোধগম্য। দৈহিক শক্তি সম্মান আদায় করে নিতে জানে বলে অবশ্যই সম্মানযোগ্য-একথা তারা বোঝে। অ-বিকৃত তার সামগ্রিক আত্মিক সত্তা তাকে সহজে সেই দিকে আকর্ষণ করে। কিন্তু এই শিশু এবং কৃষকেরা হঠাৎ অনুভব করে যে, দৈহিক এবং নৈতিক শক্তির জন্য প্রশংসিত, সম্মানিত এবং পুরস্কৃত ব্যক্তি ছাড়াও ভালো গায়ক, কবি এবং নৃত্যশিল্পী তাদের সংগীত, কাব্য এবং নৃত্য প্রতিভার জন্য শক্তিমান এবং সদগুণান্বিত নায়কের চাইতে অনেক বেশি প্রশংসিত, সম্মানিত এবং পুরস্কৃত হন। গায়কেরা, কবিরা, চিত্রশিল্পীরা, যৌথ নৃত্যশিল্পীরা লক্ষ লক্ষ রুবল অর্জন করে এবং সাধুসন্তদের চাইতেও অনেক বেশি সম্মান পায় দেখে কৃষকেরা এবং শিশুরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

পুশকিনের মৃত্যুর পঞ্চাশ বৎসর অতিক্রান্ত হবার পর তাঁর রচনার সুলভ সংস্করণ যুগপৎ জনসাধারণের মধ্যে প্রচারিত এবং মস্কোতে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হবার পর পুশকিনকে কেন এরূপ মর্যাদার আসনে উন্নীত করা হয়েছে-এ বিষয়ে আমি বিভিন্ন কৃষক থেকে এক ডজনেরও বেশি চিঠি পাই। এই মাত্র সেদিন সারাটোভ থেকে একজন সাক্ষর লোক স্পষ্টত এই প্রশ্নে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আমার সাক্ষাৎপ্রার্থী হন। যে ধর্মযাজক মিঃ পুশকিনের উদ্দেশ্যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছিলেন, লোকের সামনে তার মুখোস খুলে দিতে সেই ব্যক্তি মস্কোর দিকে যাত্রা করেছিলেন। বস্তুতপক্ষে জনসাধারণের একজন যখন এরূপ গুজব এবং সংবাদপত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে জানতে পারে যে-ধর্মযাজক, সরকারি কর্মচারি এবং রাশিয়ার সমস্ত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বিজয়গর্মে তখন পর্যন্ত তার একান্ত অশ্রুত একজন মহান ব্যক্তি, হিতকারী এবং রাশিয়ার গৌরব পুশকিনের শিলামূর্তির আবরণ উন্মোচন করছেন, তার মনের অবস্থা তখন কি হতে পারে তা অনুমানযোগ্য। চারিদিকেই এ বিষয়ে সে অনেক কিছু পড়ে এবং শোনে এবং স্বভাবতই তার ধারণা হয় যে,-কারও প্রতি যখন এরূপ সম্মান প্রদর্শিত হয়, তখন নিঃসন্দেহে তিনি অনন্যাসাধারণ কিছু করে থাকবেন-হয় দৈহিক শক্তির কোন অসামান্য অভিব্যক্তি প্রদর্শন অথবা কোন মঙ্গলজনক কাজ। পুশকিন কে ছিলেন সে সম্পর্কে জানার জন্য সে সচেষ্ট হয়। এটা যখন সে আবিস্কার করে যে পুশকিন কোন বীরও ছিলেন না, কোন সেনাধ্যক্ষও ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন বেসরকারি ব্যক্তি এবং লেখক, তখন সে এ সিদ্ধান্তে আসে যে, পুশকিন নিশ্চয়ই একজন সাধু ব্যক্তি এবং শুভজনক কাজের শিক্ষক। তখন সে অবিলম্বে তাঁর জীবন ও রচনাকর্ম বিষয়ে পড়াশোনায় উদ্যোগী হয়। কিন্তু যখন সেই ব্যক্তি জানতে পারে যে, ব্যক্তিগত জীবনে পুশকিনের নৈতিক মান ছিল খুবই নিচু স্তরের এবং একটি দ্বন্দ্বযুদ্ধে অপরকে হত্যার প্রয়াসে নিজেই নিহত হয়েছিলেন এবং তাঁর সমস্ত অবদানই ছিল প্রেমের কবিতা-যা প্রায়শই অশ্লীল বলে বিবেচিত-তখন সেই ব্যক্তি কী নিদারুণ বিভ্রান্তির সম্মুখীন হয়-তা কল্পনার বিষয়।

একজন বীর অথবা আলেকজান্ডার দি গ্রেট অথবা নেপোলিয়ানের মধ্যে যে কোন একজন তাকে এবং তার মতো হাজার জনকে পিষে ফেলতে সমর্থ জ্ঞানেই সে তাকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। বুদ্ধ, সক্রেটিস, খ্রীষ্টও তার দৃষ্টিতে মহান, যেহেতু এ কতা সে জানে এবং উপলব্ধি করে যে, তার এবং সকলেরই ঠিক তাঁদের মতই হওয়া উচিত।

কিন্তু যে ব্যক্তি নারীপ্রেম নিয়ে কবিতা রচান করেছেন-তিনি মহৎ বিবেচিত হবেন কেন, সে তার কোন কারণ খুঁজে পায় না।

অনুরূপ বিভ্রান্তি একজন ব্রেতঁ বা নরমান চাষির মস্তিস্ককে পীড়িত করবে-যদি সে শোনে যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা একটি ভাস্কর্যমূর্তি (যেমন মেরীমাতার উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়) বোদলেয়ারের জন্যও নির্মিত হচ্ছে এবং সে Fleurs du Mal কাব্যের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে অবগত হয়, সে আরও বিস্মিত হবে যদি সেই স্মারকটি ভেরলেনের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয় এবং সেই লেখকের জঘন্য দূষিত জীবনের কাহিনি সে শোনে এবং তার কবিতা পাঠ করে। এবং যখন তারা শুনবে যে Patti অথবা Taglioni-র মতো সংগীতকারকে এক ঋতুর জন্য দশ হাজার পাউন্ড পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে, কিংবা একজন চিত্রকর একটি চিত্রের জন্য অনুরূপ অর্থ পাচ্ছে অথবা প্রণয়দৃশ্য বর্ণনাত্মক উপন্যাস রচনার জন্য লেখকেরা তার থেকেও বেশি অর্থ লাভ করেছেন, -তখন চাষিদের মস্তিষ্কে কী বিভ্রান্তিই না সৃষ্টি হবে।

শিশুদের সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য। আমি নিজে কিভাবে এই বিস্ময় এবং হতবুদ্ধির স্তর অতিক্রম করেছিলাম এবং কিভাবে আমার মূল্যায়ন নৈতিক উৎকর্ষের গুরুত্বকে নিম্ন পর্যায়ে স্থান দিয়ে এবং শিল্পকর্মের ওপর ভ্রান্ত অস্বাভাবিক তাৎপর্য আরোপ করে শিল্পীকে বীর ও সন্তদের সমশ্রেণীভূক্ত করে নিয়েছিলাম। সে কথা এখনও স্মরণ করতে পারি। শিল্পীদের ওপর প্রচুর পরিমাণে অশ্রুতপূর্ব সম্মান পুরস্কার বর্ষিত হচ্ছে দেখতে পেয়ে প্রত্যেক শিশু এবং গণ-মানুষের চিত্তেও নিশ্চয়ই একই বিভ্রান্তি উপস্থি হয়। শিল্পের সঙ্গে আমাদের সমাজের ভ্রান্ত সম্পর্কের দ্বিতীয় পরিণতি এই। চতুর্থ পরিণতি হল, অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা উত্তরোত্তর সৌন্দর্য এবং মঙ্গলের মধ্যস্থিত স্ব-বিরোধিতার প্রায়শই সম্মুখীন হয়ে সৌন্দর্যের আদর্শকে অগ্রে স্থান দেন এবং এভাবে নৈতিকতার দাবি থেকে নিজেদের মুক্ত করে নেন। এ সমস্ত ব্যক্তি দৃষ্টিভঙ্গির বিপর্যয় হেতু সত্যকে স্বীকার করেন না। যে শিল্পকে তারা ভজনা করেন-তা যে অতি প্রাচীন এবং বর্তমানের পক্ষে অনুপযোগী তা স্বীকার না করে নৈতিকতাকেই তারা অতি প্রাচীন আখ্যা দেন এবং বলেন, তাদের মতো উচ্চ স্তরে উপনীত ব্যক্তিদের নিকট নৈতিকতার কোন মূল্যই নেই।

শিল্পের সঙ্গে ভ্রান্ত সম্পর্কের এই পরিণতি আমাদের সমাজে বহু পূর্বেই আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এ মতের প্রবক্তা নীশে এবং তাঁর অনুবর্তীদের, ক্ষয়িষ্ণুদের (Decadents) এবং তাঁর সঙ্গে সমমতবাদী কতিপয় ইংরেজ নন্দনতত্ত্ববাদীদের মধ্যে এই ভ্রান্ত ধারণা অধিকতর নির্লজ্জতার সঙ্গে অভিব্যক্তি লাভ করেছে। অস্কার ওয়াইড্ এক সময়ে এই পর্যায়ের

সময়ে এই পর্যায়ের ক্ষয়িষ্ণুদের এবং নন্দনতত্ত্ববাদীদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁরা সৃষ্টিকর্মের জন্য এমন বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন যা নৈতিকতাবিরোধী এবং পাপের উচ্চপ্রশংসামুখর।

এ পর্যায়ের শিল্প অংশত অনুরূপ দার্শনিক তত্ত্বের উৎপাদক এবং সে তত্ত্বের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত। সম্প্রতি আমি শিকাগোর রেগনার রেডবেয়ার্ড (Ragner Redberad) লিখিত এবং ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত The Survival of the Fittest: Philosophy of Power শীর্ষক একখানি গ্রন্থ আমেরিকা থেকে পেয়েছি। সম্পাদকের ভূমিকায় এ গ্রন্থের যে সারবস্তু প্রকাশিত হয়েছে তা এই : হিব্রু প্রফেটদের ভ্রান্ত দর্শন এবং ‘ক্রন্দনশীল মানব ত্রাতাদের’ সাহায্যে সত্যনির্ণয়প্রয়াস উন্মত্ততার সামিল। সত্য তত্ত্বসম্ভূত নয়, শক্তিজাত। যে ব্যবহার তোমার প্রতি প্রযুক্ত হওয়া তোমার কাছে অনভিপ্রেত, অন্যের প্রতি অনুরূপ ব্যবহার না করার নীতি অনুসারী সমস্ত আইন, নির্দেশ ও তত্ত্বেও বিন্দুমাত্র কোন স্বাভাবিক প্রামাণিকতা নেই -তার উৎস লগুড়, ফাঁসিকাষ্ঠ ও তরবারি।

প্রকৃত মুক্ত মানুষের পক্ষে মানবিক বা দেবী কোন প্রকার অনুশাসনের অনুবর্তী হবার প্রয়োজন নেই। আনুগত্য অধঃপতিতদেরই চরিত্র-লক্ষণ। অবাধ্যতা বীরের নিশানা। শত্রু-আবিষ্কৃত নৈতিক নিয়মাবলীর অধীন হওয়া মানুষের উচিত নয়। সমস্ত জগৎ‍ পিচ্ছিল সংগ্রাম-ক্ষেত্র। বিজিতদের শোষণ ও নির্বিজ্জীকরণ এবং তাদের প্রতি ঘৃণাই আদর্শ ন্যায়পরতার দাবি। মুক্ত এবং সাহসী ব্যক্তিরাই জগৎ করায়ত্ত করতে পারে। সুতরাং জীবনের জন্য, ভূমির জন্য, ভালোবাসার জন্য, স্ত্রীলোকের জন্য, ক্ষমতা ও স্বর্ণের জন্য যুদ্ধকে চিরকালের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে হবে। (কয়েক বৎসর পূর্বে ডি. ভোগে (dee Vogue) নামাক খ্যাতিমান রুচিবান বিদ্বৎসমাজের একজন সভ্য অনেকটা এ রকম উক্তিই করেছিলেন)। পৃথিবী এবং তার সমস্ত ঐশ্বর্য সাহসী ব্যক্তির লুণ্ঠনীয় সামগ্রী।

মতবাদরূপে অভিব্যক্ত এ ধরনের মনোভাব আমাদের চমকিত করে। বস্তুতপক্ষে সৌন্দর্যের সেবায় নিয়োজিত শিল্পাদর্শের মধ্যেই সে সমস্ত মতবাদ অন্তনির্হিত। আমাদের অভিজাত শ্রেণীর মানুষের শিল্প জনসাধারণকে অতিমানবের এই আদর্শে দীক্ষিত করেছে-যা প্রকৃতপক্ষে নিরো, স্টেঙ্কা রাজিন (Stenka Razin) চেঙ্গিস খান, রবার্ট মেকেয়ার (Robert Macaire) অথবা নেপোলিয়ান, তাঁর সমস্ত সাঙ্গোপাঙ্গ, সহকারী এবং চাটুকারদের পুরাতন আদর্শ। এ পর্যায়ের শিল্প এই পুরাতন আদর্শের বলিষ্ঠ সমর্থক।

সৌন্দর্যের অর্থাৎ আনন্দপ্রদ বস্তুর সাহায্যে সত্যের আদর্শকে স্থানচ্যুত করা আমাদের সমাজস্থিত ভয়ঙ্কর শিল্প-বিকৃতির চতুর্থ পরিণতি। এ ধরনের শিল্প জনসাধারণের মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করলে মানবজাতি কি পরিণতির সম্মুখীন হবে, সে চিন্তা ভীতিজনক। বস্তুতপক্ষে এ ধরনের শিল্পের প্রসার শুরু হয়ে গেছে।

সর্বশেষে, পঞ্চম এবং প্রধান পরিণতি হল এই : ইউরোপীয় অভিজাত সমাজে যে শিল্প প্রসার লাভ করেছে তার একটি প্রত্যক্ষ দূষিত প্রভাব এই যে, তা মনুষ্য সমাজের পক্ষে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও ক্ষতিকর অনুভূতি ও প্রবৃত্তি, যেমন, কুসংস্কার, স্বদেশপ্রেম এবং সর্বোপরি ইন্দ্রিয়-পরাযণতা-এইগুলির দ্বারা মানবচিত্তকে সংক্রমিত করে।

জনসাধারণের অজ্ঞতার কারণ নির্ণয়ে সযত্ন দৃষ্টির সাহায্যে দেখা যাবে, আমাদের অভ্যস্ত ধারণা অনুযায়ী বিদ্যালয় এবং গ্রন্থাগারের অভাবই তার মুখ্য কারণ নয়, বরং যাজকীয় এবং স্বদেশপ্রেমজাত যে কুসংস্কারের দ্বারা জনসাধারণের মন পরিপূর্ণ-তার মধ্যেই সে কারণ নিহিত। এ কুসংস্কারগুলি সর্বপ্রকার শিল্পক্রিয়া থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে জন্ম নিচ্ছে। যাজকীয় কুসংস্কার সমর্থিত হয় এবং জন্মলাভ করে প্রার্থনামূলক কবিতা, স্তোত্র, চিত্রশিল্প, প্রতিমূর্তি এবং মূর্তি-ভাস্কর্যের দ্বারা, গান করা, অর্গান বাদন এবং সংগীত ও স্থাপত্য শিল্পের দ্বারা, এমনকি ধর্মীয় উৎসবাদিতে নাট্যশিল্পের মাধ্যমে। স্বাদেশিক কুসংস্কারের জন্ম-উৎসে থাকে কবিতা এবং গল্প, সে কুসংস্কার সমর্থনপুষ্টও হয় এগুলির দ্বারা (বিদ্যালয়গুলিতে পর্যন্ত যা সরবরাহ করা হয়)। এ ছাড়া যন্ত্রসংগীত ও গান, বিজয়ী শোভাযাত্রা, রাজসম্মিলন, সামরিক চিত্রাদি এবং স্মৃতিস্তম্ভগুলিও এ পর্যায়ের কুসংস্কারে ইন্ধন জোগায়।

শিল্পের সকল বিভাগে মানুষের ধর্মীয় এবং স্বাদেশিক মাদক আসক্তিকে চিরকালীন করে এবং জনসাধারণের জীবনকে তিক্ত করার মতো নিরবচ্ছিন্ন কার্যকলাপ যদি না চলতে থাকত, তবে বহুকাল পূর্বেই জনসাধারণ সত্যিকারের আলোকপ্রাপ্ত হত।

কিন্তু শুধুমাত্র যাজকীয় এবং স্বাদেশিক বিষয়কেন্দ্রিক শিল্প যে মানুষকে কলুষিত করে তা নয়; সামাজিক জীবনে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ যৌন সম্পর্কের প্রশ্নে এ যুগে জনসাধারণের চিত্তবিকৃতি সাধনের প্রধান ভূমিকাই শিল্পের। অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের প্রায় সকলের নিকট এটা সুপরিজ্ঞাত এবং বয়স্ক সন্তানদের সম্পর্কে পিতামাতাদেরও এটা জানা কথা যে, শুধুমাত্র যৌন আকাঙ্ক্ষার নৈতিক শিথিলতার পরিণতিতে মানুষ কী ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়, তাদের কত অর্থহীন শক্তিক্ষয় ঘটে।

পৃথিবীর প্রথম যুগে ট্রয় যুদ্ধ সে একই যৌন শিথিলতা-উদ্ভুত। সে যুদ্ধ থেকে তার বহু পরবর্তীকালে প্রায় প্রত্যেক দিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রণয়ীদের আত্মহত্যা এবং হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা-সম্বলিত মানবজাতির যে যন্ত্রণার কথা শোনা যায়, তার একটি বৃহৎ পরিমাণও এই উৎসজাত

বস্তুত শিল্পের কার্যকরী ভূমিকা কী? খুব স্বল্প ব্যতিক্রম ছাড়া সমস্ত অকৃত্রিম ও কৃত্রিম শিল্প সর্ববিধ রূপের যৌন প্রেমের বর্ণনা, চিত্রণ, কিংবা উত্তেজনা সম্পাদনে নিয়োজিত। যদি কেউ সূক্ষ্মতম থেকে স্থূলতম লালসা-উত্তেজক প্রণয় বর্ণনা-সম্বলিত আমাদের সাহিত্যের সে সব তটপ্লাবী উপন্যাস সমূহকে স্মরণ করেন, যদি কেউ স্ত্রীলোকের নগ্ন দেহের এবং সকল প্রকার ঘৃণ্য বস্তুর প্রতিরূপ সমস্ত চিত্র এবং ভাস্কর্য মূর্তির এবং চিত্রে ও বিজ্ঞাপনে সেগুলির পুনর্মুদ্রণের কথা ভাবেন, যদি কেউ কেবলমাত্র নোংরা অপেরা এবং লঘু অপরিচ্ছন্ন গীতাভিনয়ের কথা মনে রাখেন, আরও স্মরণ করেন আমাদের জগৎপ্লাবিত গীতি এবং গ্রাম্য গাথা-তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনে হয়, প্রচলিত শিল্পের যে একটি মাত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে তা হল,-যত ব্যাপকভাবে সম্ভব পাপকে ছাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের সমাজের শিল্পের যে বিকৃতি ঘটেছে তার সমস্ত পরিণতি এরূপ না হলেও সর্বাপেক্ষা প্রত্যক্ষ পরিণতি ঐগুলিই। সুতরাং আমাদের সমাজে যা শিল্প নামে অভিহিত, তা যে শুধুমাত্র মানবজাতির অগ্রগতির পক্ষে অনুপযোগী তা নয়, বরং আমাদের জীবনে শুভলাভেল পথে সর্বাধিক বাধার সৃষ্টি করে।

সুতরাং যারা শৈল্পিক কাজে যুক্ত নয়, এবং স্বার্থের তাগিদে প্রচলিত শিল্পের বশীভূতও নয়, এরূপ প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে যে প্রশ্নটি স্বতই আত্মপ্রকাশ করে এবং যে প্রশ্নটি আমি নিজেই গ্রন্থারম্ভে উত্থাপন করেছি, তা হল : যাকে আমরা শিল্প নামে অভিহিত করি, যা সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশের সম্পত্তি মাত্র, তার জন্য এভাবে মানুষের শ্রম, জীবন ও মঙ্গল বিসর্জন দেওয়া -যা এখনও ঘটে চলেছে,-সেরূপ ঘটা কী সঙ্গত? এ প্রশ্নের স্বাভাবিক উত্তর এই : না, এটা অন্যায়,-এরূপ ব্যাপার ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। বিচক্ষণ এবং অবিকৃত নৈতিক অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের উত্তরও এই রকম। এ সব শুধু যে না ঘটাই উচিত তাই নয়, আমাদের মধ্যে শিল্প নামে যা অভিহিত তার জন্য কোনরূপ ত্যাগ সত্যাশ্রয়ী, তাঁদের প্রয়াস হওয়া উচিত-এই শিল্পের ধ্বংস। কারণ এই শিল্প আমাদের প্রতীচ্য মানব-বিশ্বের সন্তাপদায়ক নিষ্ঠুরতম অশুভ শক্তিগুলির অন্যতম। এ অবস্থায় যদি এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয় : বর্তমানে যে সমস্ত বস্তু শিল্প বলে বিবেচিত, আমাদের খ্রীষ্টীয় জগতের পক্ষে সেগুলি থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং ভ্রান্ত বস্তুর সঙ্গে শিল্প-জগতের সমস্ত সৎ-বস্তুকে হারানো আমাদের গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে কী? আমার মনে হয়, প্লেটো তাঁর রিপালিক (Republic)- এ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অনরূপভাবে প্রত্যেক যুক্তিবাদী এবং নীতিবাদী মানুষেরও প্রশ্নটির পুনর্বিচার করা প্রয়োজন। আদি খ্রীষ্টীয় ও মুসলিম ধর্মীয় মানবজাতির শিক্ষাগুরুরা যেভাবে প্রশ্নটির মীমাংসা করেছিলেন, অর্থাৎ যেভাবে বলতেন, অধুনা-প্রচলিত কলুষিত শিল্পের অথবা শিল্পের স্থায়িত্ব দান অপেক্ষা শিল্পের আদৌ অস্তিত্ব না থাকাই বাঞ্ছণীয়। সৌভাগ্যক্রমে কোন ব্যক্তিকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না এবং এই দুটির কোন সমাধানও গ্রহণ করতে হয় না। মানুষের যা সাধ্য এবং আমরা-যারা তথাকথিত শিক্ষিত এবং জীবন- ব্যাপারের অর্থ উপলব্ধিতে সক্ষম-যা করতে পারি এবং আমাদের করা উচিত তা হল- যে ভ্রান্তিজালে আমরা জড়িয়ে পড়েছি তার স্বরূপ উপলব্ধি, তার দ্বারা হৃদয়কে আচ্ছন্ন হতে না দেওয়া, পরন্তু এর থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *