৯
প্রায় দশ-বারো বছর আগের কথা। বাংলার নবাব তখন আলিবর্দি খাঁ।
আগ্রা থেকে এসে কাটরা মসজিদের পাশে এক অশ্বত্থ গাছের নীচে আখড়া বানিয়েছে এক ফকির। নাম শাহ দানা। বয়স চল্লিশের আশেপাশে হবে। সেই ফকির বলে থাকেন, কোনও পিরের বংশে নাকি তাঁর জন্ম। তিনি একজন পিরজাদা।
লোকে বলে পিরজাদা ফকির শাহ দানা ত্রিকালদর্শী। করকোষ্ঠী বিচার করে তিনি নাকি মানুষের ভূত-ভবিষ্যতের খতেন প্রায় নিখুঁত বলে দেন। ইনসানের বদনসিবকে খুশনসিবে পরিণত করতে শাহ দানা পাথর, মাদুলি, তাবিজ, কবচও দেন। সকাল থেকেই ভিড় লেগে থাকে তাঁর আখড়ায়। দূরদূরান্ত থেকে লোকে আসে। হাত দেখিয়ে ভাগ্য গুনিয়ে নিয়ে যায়। ফকির সাহেবের মোবারকে ভিড়ের কমতি নেই। মিঠাইওয়ালা, চুড়িওয়ালা, শরবতওয়ালা, ফলওয়ালা, বাঁশিওয়ালারা এসে আখড়ার পাশে রোজ পসরা নিয়ে বসে। শাহ দানার দৌলতে এদেরও দু’পয়সা উপায় হয়।
সেদিনও সকাল থেকে ছিল জমাট ভিড়। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ভক্তেরা প্রতীক্ষা করছিল। ছন্দে চলছিল সব কিছুই। তাল কাটল হঠাৎই।
কাটরা মসজিদের সামনের পথ দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটা পর্দাঢাকা ডুলি। তার সামনে পিছনে হাতিয়ারবন্ধ পাইক-বরকন্দাজ। হঠাৎই শাহ দানার আখড়ার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ডুলিবাহকেরা। ডুলি নামিয়ে দিল মাটিতে। পাইক-বরকন্দাজরা অপ্রস্তুত। পথে ডুলি নামানোর হুকুম নেই। হিরাঝিল প্যালেসে পৌঁছতে হবে জলদি।
ডুলি থেমেছে এই ডুলির আরোহীর মর্জিতে। ডুলি থেকে নেমে এল সে। বোরখা পরিহিতা এক জেনানা। বড় একটা বট গাছের নীচে ফকির সাহেবের আখড়া। বাইজি এগিয়ে যায় সেদিকে। ইনি যে বিশেষ কেউ সেটা তার সঙ্গের হাতিয়ারবন্ধ সেপাইদের দেখেই আন্দাজ পাচ্ছে পথ চলতি আম-আদমি। কৌতূহলী চোখে তারা অবগুণ্ঠিতা রমণীকে দেখছে।
পাইক-বরকন্দাজরা স্তম্ভিত। কী করবে তারা ভেবে পাচ্ছে না। এই জেনানার খুশখেয়ালে বাধা দেওয়ার হিম্মত তাদের নেই। ওদিকে হিরাঝিলে পৌঁছতে দেরি হলেও বিপদ। পথে এই জেনানা ডুলি থেকে নেমে পড়ে আমআদমির ভিড়ের মধ্যে মিশে কোন এক ফকিরের ডেরায় গিয়ে উঠেছিলেন এ কথা মির্জা মহম্মদের কানে গেলে নোকরি যেতে পারে। নোকরি তো তাও মামুলি বস্তু। গর্দান থাকবে কি না তারও ঠিক নেই। পাইক-বরকন্দাজরা স্বাভাবিক কারণেই ত্রস্ত।
গোটা দলটা থমকে গিয়েছে টের পেয়ে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে সামনে থেকে ছুটে পিছনে এলেন পাইক-বরকন্দাজদের দলপতি মেহেদি নিসার খাঁ। আলিবর্দির নাতি মির্জার দিল-পিয়ারা। ঘটনাটা দেখে তার তো চক্ষুস্থির। পথের ধারে ধুলোয় ফকির সাহেবের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে মির্জার পিয়ারি। কী বেসহবত কাণ্ড!
মেহেদি নিসারের নির্দেশে হাতিয়ারবন্ধ পাইক-বরকন্দাজদের আখড়ার দিকে এগিয়ে যেতেই ছুটে পালায় আখড়ায় ভিড় জমানো আমলোগ। পসরা ফেলে পালায় মিঠাইওয়ালা, শরবতওয়ালা, চুড়িওয়ালা। এক নিমেষে গোটা চত্বর বেবাক খালি হয়ে যায়। হাতের ইশারায় পাইক-বরকন্দাজদের তফাতে যেতে বলে অবগুণ্ঠিতা।
ফকির শাহ দানা বিব্রত এবং খানিকটা ত্রস্তও।
‘গোস্তাকি মাফ করবেন ফকির সাহেব। আমার জন্য আপনার বোধহয় বহুত পরেসানি হল। আপনার নাম শুনেছি। নসিবে কী আছে জানতে চাই। হাতটা যদি একটু—’
বোরখার আড়াল থেকে জেনানার কণ্ঠের শিরিন আওয়াজ শুনে শাহ দানা চমকে ওঠেন। বাচনভঙ্গিতে মিশে রয়েছে সামান্য কৌতুক। ধন্দে পড়ে যান শাহ দানা। গলার আওয়াজটা খুবই চেনা ঠেকছে। একজনের সঙ্গে বড্ড বেশি মিল। পশ্চিমের রুক্ষ এক দেহাতে পাশাপাশি ঘর ছিল তাদের। তার মুখটা শাহ দানা ভোলেননি আজও। এই জীবনে কখনও ভুলতে পারবেন না।
গরিবের ঘরে জন্মেও সে মেয়ের ছিল বেহেস্তের হুরির মতো মাথাঘোরানো রূপ। যৌবনের শুরুয়াতে সেই রূপ দেখে বহেরা বনে গিয়েছিলেন শাহ দানা। মনে মনে একান্তভাবে তাকে চেয়েছিলেন কিন্তু মনের কথা খুলে বলার অবকাশ পাননি। হঠাৎই সে হারিয়ে যায় একদিন। তারপর থেকেই ঘরের বাঁধনে শাহ দানার অনাশক্তি, তিনি হয়ে গেলেন খোদার পথের রাহী।
শাহ দানা বলেন, ‘মালুম হচ্ছে আপনি কোনও বড় খানদানের আওরত। কে আপনি?’
‘খানদান না জেনে আপনি বুঝি কারও কররেখা বিচার করেন না?’
ফের চমকে ওঠেন শাহ দানা। অবিকল একই রকম খুশ ইলহান আওয়াজ। তার নাম ছিল গুলরুখ। শাহ দানার মনে প্রবল কৌতূহল, মুখটা যদি একবার দেখা যায়। কিন্তু জেনানা বোরখার আগল না সরালে দেখার উপায় নেই। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? সে কী করে আসবে এই বাংলা মুলুকে? কোথায় সেই মরুভূমির কোলঘেঁষা রুক্ষ দেহাত আর কোথায় এই সুবে বাংলা!
শাহ দানা ফের জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার পরিচয়?’
‘ধরে নিন আপনার বাঁদি।’
বোরখার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে দুটো হাত। দুই হাতের আটটা আঙুলে ঝলমল করছে দামি দামি পাথরের আংটি। চিকন ডান হাতের কবজিতে আঁকা উলকিটা দেখে শাহ দানার হৃৎপিন্ডের গতি দ্রুততর হয়।
গরিবের গুলবাগিচায় ফুল বেশিদিন থাকে না। তাগদবাজেরা ছিঁড়ে নেয়। একদিন এক ওমরাহ দলবল সমেত ঘোড়া হাঁকিয়ে এসে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল গুলরুখকে। তারপর থেকে তার আর কোনও খবর শাহ দানা আজও জানেন না।
‘কী ভাবছেন ফকির সাহেব?’ প্রশ্ন করে জেনানা।
ঘোর থেকে জেগে উঠে শাহ দানা বলেন, ‘কোথায় ঘর আপনার?’
হাসি ঝলকায় বোরখার আড়ালে। হাসি থামিয়ে জেনানা বলে, ‘তা জেনে আপনার কী হবে? আপনি আমার নসিবের কথা বলুন।’
শাহ দানা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। তাঁর সামনে প্রসারিত জেনানার দুই করতল।
‘ফকিরসাহেব বুঝি জেনানাদের নসিব গুনতে জানেন না?’ এই বলে ফের হেসে ওঠে রহস্যময়ী।
জেনানার এই কথায় ও হাসিতে অপ্রতিভ হয়ে পড়ে জেনানার কোমল দুই হাতের কররেখার উপর মনোনিবেশ করেন শাহ দানা। বোরখার আড়াল থেকে কৌতুক ভরা একজোড়া চোখের দৃষ্টি যে তার মুখের উপরে যে স্থির হয়ে রয়েছে, তা তিনি টের পেলেন না। নিজের বাঁ হাতের তালুর উপরে কোমল ডানহাতখানি রেখে সামনে ঝুঁকে পড়েন শাহ দানা।
পিছন থেকে দ্রুত এগিয়ে এসে প্রবল বিরক্তির সঙ্গে মেহেদি নিসার খাঁ বলে, ‘বিসমিল্লা। এ কিন্তু বেসহবত কারবার হয়ে যাচ্ছে বাইসাহেবা। আপনি আমআদমি মাফিক পথের ধারে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। ইজাজত দেন তো এই ফকিরকে উঠিয়ে নিয়ে যাই।’
‘নেহি। চুপ রহো।’ বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে কথাগুলো বলে ওঠে অবগুণ্ঠিতা।
অপ্রতিভ হয়ে পড়ে নিসার খাঁ বলে, ‘মির্জার মাশুকা আপনি, তাঁর দিল কি রানি। পথে আপনি ডুলি থেকে নেমেছেন জানলে আমার গর্দান যাবে।’
বোরখার আড়াল থেকে খিলখিল করে হেসে উঠে জেনানা বলে, ‘বেশ তো। গর্দান থাকবে না যাবে সেটা ফকির সাহেবের কাছে পুছতাছ করে নাও নিসার খাঁ।’
এবার নিসার খাঁর রাগ গিয়ে পড়ে শাহ দানার উপর। ‘আরে এ উজবুক! বেতমিজ কাঁহিকা। বাইসাহেবা কা হাত পাকাড়কর কিউ বইঠে হো? মনে পেয়ারের তুফান ছুটছে বুঝি? জো কহানা হ্যায় জলদি সে বোলো।’
নিসার খাঁর ধমক খেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে জেনানার হাত ছেড়ে দেন শাহ দানা।
বোরখার আড়াল থেকে হিসহিসে গলায় নিসার খাঁকে ধমকে ওঠে অবগুণ্ঠিতা, ‘চুপ রহো বেতমিজ। ইমানদার আদমির সঙ্গে বাত করার সবক জান না? তফাত যাও। ভুলে যেও না আমি ফৈজি ফয়জান। মির্জাকে বলে তোমার কলিজাখানা আজই ছিঁড়ে নিতে পারি।’
শাহ দানা চমকে ওঠেন। ফৈজি ফয়জান! কসবী! যাকে নিয়ে তামাম মুর্শিদাবাদ জুড়ে এত আলোচনা?
অপমানিত হয়ে খানিকটা তফাতে গিয়ে দাঁড়ায় মেহেদি নিসার খাঁ। কড়া চোখে চেয়ে থাকে শাহ দানার দিকে।
সামনে হাত প্রসারিত করে ফৈজি বলে, ‘বিসমিল্লা। কসুর মাফ করুন ফকির সাহেব। আমার নসিবের কথা বলুন।’
শাহ দানা বলে, ‘বড় আজব আপনার করকোষ্ঠী। মালুম হচ্ছে আপনার জিন্দেগি স্রেফ শাহি শান-শওকতে ভরাট। লেকিন অচানক এক আঁধিতে তছনছ হয়ে যেতে পারে সব। তবে এখনই কোনও নিদান হাঁকতে চাই না। তালেনামা ঘেঁটে দেখতে হবে। কাল একবার আসবেন।’
‘আপনার কোঠিতে? আকেলা?’ এই বলে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ফৈজি।
শাহ দানা হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘আমি চিনেছি তোমাকে। তুমি গুলরুখ।’
‘গলত বাত। আমি ফৈজি ফয়জান। মির্জার দিল কি রানি।’ এই বলে দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে ডুলিতে চড়ে বসে ফৈজি। ডুলিটা চলে যায়।
খানিকবাদেই কোতোয়ালির একদল সেপাই এসে শাহ দানাকে টেনে হিঁচড়ে ধরে নিয়ে গেল হিরাঝিল প্যালেসে। হাজির করল মির্জা মহম্মদ ও মেহেদি নিসার খাঁর সামনে।
ঘটনার নাটকীয়তায় শাহ দানা বাক্যহারা। কেন এই জুলুম মনে মনে তার উত্তর হাতড়ে চলেন। সামনে কুরসিতে বসে থাকা মির্জার চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে তাঁর বুক কেঁপে ওঠে।
মেহেদি নিসার খাঁ উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, ‘এই সেই ফকির হুজুর। বাইসাহেবার হাত ধরেছিল। ওর চোখে আমি মহব্বতের ঝিলিক দেখেছি। বেশরম ভণ্ড শয়তান। এর ফকিরি ঝুটা।’
মির্জার দু’চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। সুকুমার মুখটা যে অমন ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে তা শাহ দানা কল্পনাও করতে পারেননি। আল্লাকে স্মরণ করতে থাকেন তিনি।
মির্জা গর্জন করে ওঠে, ‘নিসার খাঁ!’
‘হুজুর!’
‘উসকি কান কাট দো।’
দু’কান চেপে ধরে আর্তনাদ করে ওঠেন শাহ দানা। ‘মাফ করুন হুজুর।’
মির্জা গর্জন করে ওঠে, ‘স্রেফ দো কান। শুধু খোদার পথের রাহী বলে জিন্দা ছেড়ে দিলাম।’
খঞ্জর হাতে নিসার খাঁ এগিয়ে আসে। শাহ দানা মরিয়া গলায় চিৎকার করে ওঠেন, ‘রহেম করুন হুজুর, রহেম করুন।’
দু’জন পেয়াদা এসে জাপটে ধরে শাহ দানাকে। মির্জা মহম্মদের সামনে শির ঝুঁকিয়ে বসতে বাধ্য হন শাহ দানা। বলির পাঠার মতো কাঁপতে থাকেন। পৈশাচিক উল্লাসে খঞ্জর চালায় নিসার খাঁ। নরম দুটো মাংসপিণ্ড খসে পড়ে বহুত কিমতি গালিচার উপর। সেই সঙ্গে টপ টপ করে ঝরতে থাকে রক্ত। গাঢ় লাল গালিচার রঙের সঙ্গে খুনের রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। শাহ দানা সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন সেই গালিচার উপরেই।
পরে হেকিমি দাওয়াইয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেও মির্জার হুকুমে মুর্শিদাবাদ থেকে বাস ওঠাতে হয় তাঁকে। রাজমহলের কাছে পরিত্যক্ত এক মসজিদে ডেরা বাঁধেন শাহ দানা। কিছুদিনের মধ্যে কয়েকজন মুরিদও জুটে যায়। ফকির সাহেবের যে দু’কান কাটা তা জানে না কেউই। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ঝাকড়া চুল সর্বদা ঢেকে রাখে শ্রবণযন্ত্রের উন্মুক্ত ছিদ্রদুটো।
মির্জার সেদিনের সেই ভয়ংকর মুখটা এই দশ বছরেও একদিনের জন্য ভোলেননি শাহ দানা। তাঁর মনে কোনও সন্দেহ নেই, তার কৈশোরের ভালোবাসা গুলরুখই ফৈজি ফয়জান। ভাবীকালের আন্দাজ নিতে এসেছিল ফৈজি। কয়েক মাসের মধ্যে আলিবর্দির নাতি মির্জার হাতে পড়ে তার কী হাল হয়েছিল, তা বিভিন্ন লোকের মুখে শুনেছেন শাহ দানা। সে কথা এখনও তামাম হিন্দুস্থানের ঘরে ঘরে চর্চা হয়। জ্যান্ত গোর দেওয়া হয়েছিল ফৈজিকে। খবরটা শুনে শাহ দানার বুকটা দুঃখে হুহু করে উঠেছিল।
সেদিনের সেই মির্জা মহম্মদই কয়েক সাল পরে হয়ে গেলেন তামাম সুবে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা। হায় আল্লা। ইনসাফ মিলবে কবে? তার সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের, গুলরুখের সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের বিচার করবেন না দুনিয়াদার? গত দশ-বারো সাল ধরে শাহ দানা মোনাজাত করেছেন দিনরাত। দুচোখ ভরে দেখতে চেয়েছেন সিরাজদ্দৌলার বরবাদি। এতদিনে আল্লা তার মোনাজাত মঞ্জুর করেছেন।
মাসুম বাচ্চা ও জেনানাসহ নাও নিয়ে নদীতে ভেসে পড়া, পানির অভাবে নদীতে আটকে যাওয়া, ক্ষুধার্ত হয়ে আহার ও আশ্রয়ের সন্ধানে মসজিদে এসে হাজির হওয়া মুসাফিরের বেশধারী লোকটি যে নবাব সিরাজদ্দৌলা শাহ দানা এক ঝলক দেখেই বুঝেছেন। না, কোনও ভুল নেই। সেই চোখ, সেই মুখমণ্ডল। দাড়ি-গোঁফের আড়ালেও চিনতে অসুবিধা হয়নি শাহ দানার। তা ছাড়া ওই মুসাফিরের নাগরায় বসানো রয়েছে বহুমূল্যবান হীরকখণ্ড। নবাব ছাড়া এমন জুতো পায়ে দেওয়ার সৌভাগ্য কার হয়? অবশ্যই উনি সিরাজদ্দৌলা।
পলাশির ময়দানে সিরাজদ্দৌলার পরাজয় হয়েছে। নবাব পালিয়ে গিয়েছেন মুর্শিদাবাদ থেকে। মিরজাফরের দামাদ মিরকাশিমের বাহিনী খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁকে। ফৌজ নিয়ে মিরকাশিম ছাউনি ফেলেছেন কয়েক ক্রোশ দূরে। তাদের আন্দাজ রাজমহল অভিমুখে গিয়েছেন সিরাজদ্দৌলা। দু’দিন আগে মুর্শিদাবাদ থেকে আসা এক দরবেশের মুখ থেকে এসব কথা শুনেছেন শাহ দানা। সবই মিলে যাচ্ছে। কোনও ভুল নেই। ওই মুসাফিরই সিরাজদ্দৌলা।
জোছনায় ভাসছে চরাচর। চিকচিক করছে নদীর জল। তটভূমি বরাবর তিরবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলেছেন শাহ দানা। আজ তাঁর গোটা শরীরে যেন নবযৌবনের জোশ। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ঘোড়া। ফেনা বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। এ তো আর ফৌজি ঘোড়া নয়। গৃহস্থের ঘরের মোট বওয়া নাজুক নড়বড়ে ঘোড়াটাকে শাহ দানার মুরিদ সেলিম একজনের থেকে ধার নিয়ে এসেছে। এ ঘোড়া এত ধকল সইতে পারবে কেন? কিন্তু শাহ দানা নাছোড়বান্দা। দ্রুত তাকে পৌঁছতে হবে মিরকাশিমের শিবিরে। পায়ের গোড়ালি দিয়ে ঘোড়ার পেটে ফের এক জবরদস্ত খোঁচা মারেন ফকির সাহেব। নিজের জান বাজি রেখে ছুটতে থাকে ঘোড়া।
‘উসকি কান কাট দো’—কথাটা যেন চারপাশ থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে শাহ দানার কানে। তিনি ভাবতে থাকেন, দুনিয়াদারের কী বিচিত্র খেল। তামাম সুবে বাংলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সিরাজদ্দৌলা, একদা যার হাতে শাহ দানার হেনস্থা, তাঁর কলিজা এখন তাঁর হাতের মুঠোয়।
সেলিম জানে না ওই মুসাফিরের আসল পরিচয়। শাহ দানাও ভেঙে কিছু বলেননি। সেলিমকে শুধু বলে এসেছেন তিনি একদিনের জন্য একটা বিশেষ কাজে যাচ্ছেন এক মুরিদের গৃহে। মসজিদের হুজরায় আশ্রয় নেওয়া মুসাফির ও তার পরিবারের যেন কোনও অযত্ন না হয়।
সিরাজদ্দৌলা যে তাঁকে চিনতে পারেননি, সে বিষয়ে শাহ দানা নিশ্চিত। এই দশ বছরে শাহ দানার চেহারাটা অনেক ভেঙেছে। ঘাড় অবধি লম্বা চুল ও লম্বা দাড়িগোঁফের জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছে পুরোনো মুখটা। আগের মেদবহুল চেহারাটা হয়েছে পাকানো দড়ির মতো।
শাহি রিয়াসতে একজন পরাজিত নবাব বিজয়ীপক্ষের হেফাজতে গেলে তাঁর কী পরিণতি হতে পারে শাহ দানা ভালোই জানেন। প্রতিহিংসার আগুন ঝলকাচ্ছে শাহ দানার দুই চোখে। সিরাজদ্দৌলাকে কিছুতেই রহেম করতে পারবেন না তিনি। পলাতক নবাবের খবর তিনি মিরকাশিমের কাছে পৌঁছে দেবেন। প্রতিহিংসা চরিতার্থ হওয়ার খুশিতে সহসা উন্মাদের মতো অট্টহাস্য করে ওঠেন শাহ দানা। সে হাসি তাঁর নিজের কানেই বড় বীভৎস শোনায়। সহসা ফকির সাহেবের চোখে পড়ে অসংখ্য বিন্দু বিন্দু মশালের আলো। নিঃসন্দেহে ওখানেই মিরকাশিমের ছাউনি। শাহ দানা ফের সজোরে হেসে ওঠেন। ঘোড়া হাঁকিয়ে এগিয়ে চলেন।
.
নানা দুশ্চিন্তায় তোলপাড় হয়ে আছে মিরকাশিমের মন। একটা একটা করে দিন চলে যাচ্ছে। এখনও সিরাজদ্দৌলার সন্ধান মিলল না। ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছেন মিরকাশিম।
দরবার রাজনীতিতে উত্থানের এই তো দারুণ সময়। কামিল ইনসান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে নিজেকে। যে কাজের ভার শ্বশুর মিরজাফর তাঁর কাঁধে চাপিয়েছেন সে কাজে সফল হতে হবে। গ্রেফতার করতে হবে সিরাজদ্দৌলাকে। জিন্দা।
রাজনীতির হকিকত বুদ্ধিমান মিরকাশিম ভালোই বোঝেন। পলাশির পরে সুবে বাংলায় ইংরেজদের উপেক্ষা করার আর কোনও উপায় নেই। ভবিষ্যতে মসনদে বসতে হলে ইংরেজদের সাহায্য চাই। কিন্তু মিরজাফরের অবর্তমানে মিরনকে ছেড়ে কেন তাঁর পিছনে বাজি ধরবে ইংরেজরা। তিনি তো এখনও ইংরেজদের কাছে অপরিচিত একজন মানুষ।
মিরকাশিম জানেন সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেফতার করার জন্য মিরজাফর খাঁর চেয়েও বেশি মরিয়া কর্নেল ক্লাইভ। পাটনায় পালিয়ে যেতে পারলে নিজের শক্তিকে ফের সংহত করে প্রত্যাঘাত করতে পারেন সিরাজদ্দৌলা। এ নিয়ে মিরজাফর যতটা না চিন্তিত তার চেয়ে বেশি চিন্তিত ক্লাইভ। তাই এখন কর্নেলের মূল লক্ষ্য সিরাজকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতার করা। আর এই কাজের গুরু দায়িত্ব মিরকাশিমের কাঁধে।
এ কাজে সফল হলে মিরকাশিম দু’দিক থেকে লাভবান হবেন। নিজামতের শাসনযন্ত্রে বড় একটা পদ তিনি আশা করতে পারেন আর সেই সঙ্গে কর্নেল ক্লাইভও খুশি হবেন তাঁর উপরে। কামিল ইনসান হিসেবে ইংরেজ মহলে তাঁর নামটা ছড়িয়ে পড়বে। এসবই অংকের সূত্রে বাঁধা। গণিতের মেধাবী ছাত্র মিরকাশিম সবই বোঝেন। কিন্তু কার্যসিদ্ধি হচ্ছে কোথায়? কোথায় সিরাজদ্দৌলা?
আজও তো কাসিদরা পলাতক সিরাজের কোনও সংবাদ আনতে পারল না।
সামনে খোলা রয়েছে তালেনামা। নদীর জল ছুয়ে ছুটে আসা শীতল বাতাসে এলোমেলো ভাবে উলটে যাচ্ছে পুঁথির পাতা। পাঠে মন নেই মিরকাশিমের। তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে চিন্তিত মুখে ফরসির নলে টান দিয়ে চলেছেন। তাঁবুর জানলা দিয়ে এক মুঠো জোৎস্না এসে পড়েছে ফরাসের উপরে। চরাচর ভয়ানক চুপচাপ। শুধু কানে ভেসে আসছে ঝিঁঝির কলতান।
খাস বান্দা এসে জানাল, ‘হুজুর একজন ফকির আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়।’
চিন্তামগ্ন মিরকাশিম কথাটা যেন ঠিক শুনতে পেলেন না। তাকিয়ে আছেন জানলা দিয়ে দৃশ্যমান কালো ঝাঁকড়া গাছগাছালির মাথায় আকাশে ভেসে থাকা গোল চাঁদটার দিকে।
বান্দা ফের বললে, ‘হুজুর!’
মুখ ঘোরালেন মিরকাশিম।
বান্দা গুজারেশ করে ‘একজন ফকির আপনার সাক্ষাৎ চায়।’
ফরসির নলে টান দিতে গিয়ে থমকে গেলেন মিরকাশিম। ‘ফকির? এই অনওয়াক্তে?’
‘বললে বহুত জরুরি বাত। কেবল আপনার মোবারকেই গুজারেশ করতে চায়।’
কপালে ভাঁজ পড়ে মিরকাশিমের। প্রশ্ন করেন, ‘পরিচয়?’
‘জানি না। ফকির বললে কাছেই থাকে। নাম শাহ দানা।’
ফকিরের নামটা শুনেই চমকে উঠলেন মিরকাশিম। মনের পর্দায় ভেসে উঠল বারো বছর আগের এক তসবির।
কাটরা মসজিদের পাশে আখড়া গেড়েছিল এক ফকির। এক রিস্তেদারের মুখে মিরকাশিম শুনেছিলেন, লোকটা নাকি জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শী। ভাবীকালের নিখুঁত আন্দাজ দেয়।
নিজের পরিচয় গোপন করে মিরকাশিম একদিন গিয়েছিলেন তাঁর আখড়ায়। বয়সে তরুণ ফকির সাহেবকে দেখে মিরকাশিমের মনে প্রথমে বড় একটা ভক্তি জাগেনি।
মিরকাশিমের কপালের দিকে তাকিয়ে সেই ফকির বলে উঠেছিলেন, ‘ইন্তেজার করুন। আপনার জিন্দেগিতে শান-শওকত, রওনকের পল খুব দূরে নয়।’
খুশি হয়ে ফকিরকে একটা মোহর উপহার দিয়েছিলেন মিরকাশিম। কয়েকদিন পরে শুনেছিলেন মির্জার হাতে বেইজ্জত হয়েছেন সেই ফকির। কারণটা কেউই সঠিক জানে না। তবে ফকিরের কান দুটো কেটে নিয়েছেন আলিবর্দির পেয়ারের নাতি। মুর্শিদাবাদ থেকে বাস উঠিয়ে সেই ফকির নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছেন।
মিরকাশিম ব্যস্ত গলায় বলেন, ‘ফকির সাহেবকে এখানে নিয়ে এসো। তুরন্ত।’
‘জি হুজুর।’ বান্দা চলে যায়।
.
