১৭
পাথরের দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বসেছিল লুৎফুন্নেসা। দৃষ্টি উপরের দিকে। অনেক উঁচুতে ছোট একটা জানলা দিয়ে ঢুকে আসা এক চিলতে আলো মলিন মুখখানার একপাশে এসে পড়েছে। চেহেল সেতুনের অন্দরের প্রায়ান্ধকার এই কারাকক্ষের সঙ্গে বাইরের দুনিয়ার একমাত্র সংযোগ চতুষ্কোণ ওই ক্ষুদ্র জানলাটাই। ও পথ দিয়েই এই অন্ধকূপে শ্বাস-প্রশ্বাসটুকু সচল রাখার জন্য বিশুদ্ধ বাতাসের অনুপ্রবেশ ঘটে। দিনের বেলা সামান্য আলো ঘরে এসে পড়ে। নজরে আসে একচিলতে খোলা আকাশ। রাত নামলে অন্তহীন অন্ধকার।
রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসার পর এই কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়েছে লুৎফুন্নেসাকে। কোথায় আছে উম্মেসায়েরা? কোথায় আছে সিরাজ? লুৎফা জানে না। গ্রেফতারির পরপরই তারা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন।
সিরাজের সঙ্গে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় লুৎফা সঙ্গে নিয়েছিল অনেক গয়না, হিরে, জহরত। শরীরের গোপন স্থানে পোশাকের অভ্যন্তরে পুটুলিবদ্ধ অবস্থায় যতটা নেওয়া যায়। সেসব হাত করেছে মিরকাশিমের অনুচরেরা। দেহতল্লাশির নামে সেপাই-পেয়াদারা তার শরীরটাকে অপবিত্র করতে পারে, একথা ভেবে লুৎফা নিজেই বের করে দিয়েছিল সব কিছু।
আর যাই হোক, মিরকাশিম লুৎফার সম্ভ্রম নষ্ট করেননি। পর্দা ঢাকা ডুলিতে চাপিয়ে লুৎফাকে নিয়ে আসা হয় মুর্শিদাবাদে। তারপর থেকে সে এই কারাগারে বন্দি। বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন।
অনেক উঁচুতে ক্ষুদ্র জানালাটার দিকে চেয়ে লুৎফুন্নেসা ভাবছিল তার ক্ষুদ্র জীবনটার কথা। কী বিচিত্র সেই জীবনের গতি। অতীত তার অন্ধকারে মোড়া। কে তার বাপ, কে তার মা লুৎফা জানে না। বাপ-মার স্নেহ-ভালোবাসার সঙ্গে লুৎফার কোনও জান-পহেচান নেই। জ্ঞান হতে সে দেখে আসছে নবাব আলিবর্দির খানদানে সে একজন আশ্রিতা। আলিবর্দির আদরের দৌহিত্র সিরাজের জারিয়া। কী ভাবে তাঁর ঠাঁই হয়েছিল নবাব-পরিবারে, লুৎফা জানে না। জানার কোশিশও করেনি। কী লাভ নিজের অন্ধকার অতীতটাকে খুড়ে বের করে!
কৈশোরে পৌঁছে লুৎফা পেল সিরাজের একনিষ্ঠ ভালোবাসা। শরিয়তি মতে সিরাজের সঙ্গে তার শাদি হল না ঠিকই, তবে সে অর্জন করল নবাব বেগমের মর্যাদা। বাঁদি থেকে বেগম।
দিব্যি চলছিল সব। হঠাৎই যেন ছুটে এল, সর্বনাশা এক আঁধি। ওলটপালট হয়ে গেল সব কিছু। লুৎফার জীবনের হর খুশি, হর রং এক লহমায় মুছে দিলেন দুনিয়াদার। পলাশির প্রান্তরে সিরাজের মুসিবতে লুৎফার সুখের দুনিয়াটা ভরে গেল জহমতে-দুঃখে।
দৌলত-তাগদ-জলুস—এসব হারিয়ে লুৎফার অবশ্য কোনও খেদ নেই। এসব তো সে কিছুই চায়নি জীবনে। শুধু নিবিড় ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিল সিরাজকে। সিরাজ সুখে থাক, খুশি থাক, তাগদে-জোশে-জশমে-আশরতে ভরপুর হয়ে উঠুক তাঁর জীবনটা—এই ছিল লুৎফার আরমান। কিন্তু এ কী হল? দুনিয়াদার তার প্রতি এত নির্দয় হলেন কেন? লুৎফার বুকটা মুচড়ে ওঠে ব্যথায়। কোথায় আছে সিরাজ? ভালো আছে তো? কবে দেখা হবে তাঁর সঙ্গে? আশা-নিরাশার দোলাচলে বেচ্যায়েন হয়ে ওঠে লুৎফার মন। সে ভাবে, আর যাই হোক, নিশ্চয়ই আলিবর্দির রিশতাদার নবাব মিরজাফর খাঁ জানে মারবেন না সিরাজকে। বেঁচে থাক সিরাজ। জিন্দেগিভর কয়েদ হয়ে থাকলেও বেঁচে থাক। খোদাতালার কাছে এর চেয়ে বেশি লুৎফার আর কিছু চাওয়ার নেই।
‘হুজুরাইন!’
আগন্তুকের সম্বোধন লুৎফার কানে যায় না। কখন যে সেপাইরা এই জিন্দানখানার দরওয়াজা খুলে দিয়েছে, দরওয়াজার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে মুন্নিলাল, কিছুই সে টের পায়নি। সিরাজের কল্যাণকামনায় নিবিষ্ট চিত্তে মোনাজাত করে চলেছে লুৎফা– ‘হে দুনিয়াদার। ভালাই করো আমার সিরাজের। তাঁকে সহি সালামত, খুশ তবিয়ত রাখো।’
টলমলে পায়ে কিছুটা এগিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মুন্নিলাল। গত রাতের মেহফিল-ফূর্তির রেশ রয়েছে এখনও। খোয়ারি পুরোপুরি কাটেনি। চোখদুটো করমচার মতো লাল। মুন্নিলাল সহসা যেন বাক্যিহারা হয়ে যায়। একদৃষ্টে চেয়ে থাকে লুৎফার মুখপানে। আলোছায়ায় অপার্থিব সুন্দর হয়ে উঠেছে মুখখানা। ঠিক যেন বেহেস্তের গুলবাগিচার তাজা একটা গোলাপ।
সিরাজদ্দৌলার পিয়ারিকে আগে দেখার সৌভাগ্য হয়নি মুন্নিলালের। হবেই বা কোত্থেকে! মুন্নিলাল ছিল নিজামতের সামান্য এক নোকর। লোকমুখে শুনেছিল লুৎফার রূপের কথা। এমন রূপসী জেনানা নাকি তামাম হিন্দুস্থানে বিরল। তা হওয়ারই তো কথা। না হলে সামান্য এক জারিয়া কি সুবে বাংলার নবাবের খাস বেগম হয়ে উঠতে পারে?
মুন্নিলালের মগজে ঘুমিয়ে থাকা শয়তানটা জেগে ওঠে নিমেষে। নখ-দাঁত বার করে লালসা। রঙিন খোয়াবে লুৎফার সঙ্গে রতি-সম্ভোগের কল্পনায় কামার্ত হয়ে পড়ে মুন্নিলাল। লোভী চোখদুটো লুৎফার গোটা শরীরের উপর দিয়ে ঘুরে বেড়ায় নির্বিচারে। চোখ দিয়ে মুন্নিলাল লেহন করতে থাকে লুৎফার দেহটাকে। এই লোভী নজর এসে স্থির হয় লুৎফার উন্মুক্ত নাভিদেশের উপর। শয়তানের চোখের পলক পড়ে না।
সহসা অদৃশ্য কেউ যেন সপাটে একটা চড় কষায় মুন্নিলালের গালে। তার অন্তরাত্মা ভয়ে কেঁপে ওঠে। খোয়াবের দুনিয়া ছেড়ে ধাতে আসে মুন্নিলাল। স্বয়ং নবাবজাদা মিরন যাকে কামনা করেন তার দিকে কুনজর দিয়েছে সে, একথা কোনওভাবে প্রকাশ পেলে তার গর্দান যাবে। নিজেকে সংযত করে মুন্নিলাল।
‘হুজুরাইন। সহি সালামত। আমি আপনার গোলাম মুন্নিলাল। নবাবজাদা মিরনের দিলপিয়ারা।’ মুন্নিলাল বিনয়ে গলে পড়ে।
সম্বিৎ ফেরে লুৎফার। চোখ নামিয়ে মুন্নিলালের দিকে তাকায়। মুন্নিলালের ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি। কী মতলব এই শয়তানের কে জানে। চকিতে কাঁচুলির অভ্যন্তর থেকে রাংতায় মোড়া জহরের পুরিয়া হাতে নেয় লুৎফা।
মৃদু হাসির রেশ ধরে রেখেই মুন্নিলাল বলে, ‘নবাবজাদা মিরন পাঠিয়েছেন আমাকে।’
‘কেন?’ তীক্ষ্ণ চোখে মুন্নিলালের দিকে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় লুৎফা।
‘সিরাজদ্দৌলার এন্তেকাল হয়েছে। গতকালই খোশবাগে তাকে দাফন করা হয়েছে। নবাবজাদা মিরনের হুকুমতে জাফরাগঞ্জের কারাগারে তাঁকে কোতল করা হয়েছিল। সিরাজের লাশ হাতির পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হয়েছিল গোটা শহরে। বহুত ফূর্তি হয়েছে। তামাম মুর্শিদাবাদ তা দেখেছে। নবাবজাদা এ আখবার আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফরমায়েশ করেছেন এই বান্দার উপরে।’
সিরাজ নেই! বলছে কী শয়তানটা! লুৎফার বুকের মধ্যে সহসা পাক দিয়ে ওঠে তীব্র এক কষ্ট। ধারালো এক ছুরির ফলা যেন বিদ্ধ করে তার কলিজা। অবশ হয়ে আসে হাত পা। চোখের সামনে গোটা দুনিয়া যেন টলে যায়। প্রবল তরঙ্গোচ্ছ্বাসের মতো বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় কান্না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয় সে। শক্ত করে মনকে। কখনোই সে তার অন্তরের বেদনাকে ব্যক্ত করবে না এই শয়তানের সমুখে। লুৎফা বোঝে, তার কান্না, আর্তনাদ, জহমত, জিগরপস্তানি তৃপ্তি দেবে সিরাজের ঘাতকদের। তাদের খুনজোশিকে আরও মস্ত করে তুলবে। তীব্র ঘৃণায় পরিপূর্ণ একটা দৃষ্টি মুন্নিলালের দিকে ছুড়ে দিয়ে লুৎফা চোখ নামিয়ে নেয়।
সিরাজের মওতের কহানি শুনেও লুৎফুন্নেসা নিশ্চুপ! এ প্রতিক্রিয়া সত্যিই প্রত্যাশা করেনি মুন্নিলাল। সে ভেবেছিল মাটিতে আছড়ে পড়বে লুৎফা, ভেঙে পড়বে কান্নায়। সে রগড় দেখবে। দেলাসা, হামদর্দির অছিলায় একবার ছুঁয়ে দেখবে বহু মরদের কামনার ধন গুলবদন এই যুবতীর শরীরটাকে।
কিন্তু লুৎফা যে পাথরের মতো অটল! ভাবলেশহীন। মুন্নিলাল বেওকুফ বনে যায়। নিজের হতবুদ্ধি ভাবটা গোপন করে সে বলে, ‘আপনাকে তকলিফ দেওয়া নবাবজাদার তামান্না নয়। সিরাজদ্দৌলার মওত হয়েছে। এবারে আপনার কমবখতির অন্ত হবে হুজুরাইন।’
আহত বাঘিনীর মতো চকিতে মুখ তুলে ধারালো চোখে তাকায় লুৎফা। ফের চোখ নামিয়ে শীতল, কঠিন গলায় সে বলে, ‘আমাকে একা থাকতে দিন।’
‘এ ওয়াক্ত তো জহমতে দিন-গুজরানের নয়, খুশির। হাবুজখানা-তনহাই-সদমা– এসব আপনার জন্য নয়। আমি ডুলি নিয়ে এসেছি। আপনাকে জাফরাগঞ্জ প্যালেসে নিয়ে যাওয়ার হুকুম হয়েছে আমার উপর। হুকুম তামিল না হলে এই গরিবের গর্দান যাবে হুজুরাইন। আপনি কি তা চান? আমি যে আপনার গোলাম।’ এই বলে মুচকি হাসে মুন্নিলাল।
তীব্র ঘৃণায়, অপমানে সর্বাঙ্গ জ্বলতে থাকে লুৎফার। নিজের মনোভাব দমন করে শান্ত গলায় সে বলে, ‘আমাকে জাফরাগঞ্জে যেতে হবে?’
মুন্নিলাল মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, ‘জি হুজুরাইন। হুজুরের ফরমায়েশ। আপনার জন্যে মস্ত এক হাভেলি সাজানোর আনজাম করেছেন নবাবজাদা। বেস্তারায় বসরাই গুলাবের পাপড়ি ছড়িয়ে রেখে আপনাকে ইয়াদ করছেন।’
‘তা এই খোশ আমদের কারণ?’ হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি সমেত প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় লুৎফা।
‘বিসমিল্লা। আপনি যে হুজুরের পিয়ারি।’
‘চুপ রহো কমিন! বেতমিজ কাঁহিকা। জেনে রেখো লুৎফা স্রেফ সিরাজেরই। কী দুনিয়ায়, কী জন্নতে।’ প্রখর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঝাঁঝাল গলায় কথাগুলো বলে লুৎফা।
‘বেওকুফের মতো এ কি বাত বলছেন হুজুরাইন? নবাবজাদা মিরন আপনার কথা ভেবে ভেবে বহেরা বনে গিয়েছেন। বহুত খুশনসিব আপনার। নবাব বেগম ছিলেন, ফের নবাব বেগম হবেন। মিরজাফর খাঁ বুড্ডহা হয়েছেন। সবাই জানে, তার দেহান্ত হলেই মসনদে বসবেন নবাবজাদা মিরন। হুজুরাইন আপনি হবেন তাঁর খাস বেগম। ইয়ে সচ বাত। আপনাকে শাদি করতে চান নবাবজাদা। শরিয়তের কানুন মেনে। সিরাজদ্দৌলা তো শাদি করেননি আপনাকে। আমলোগ জানে, আপনি ছিলেন সিরাজদ্দৌলার কসবি। আপনাকে ইমান দেননি সিরাজদ্দৌলা। নবাবজাদা মিরন দেবেন।’
‘খামোশ।’ চেঁচিয়ে ওঠে লুৎফা। পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয় শব্দটা।
বিনয়ে ফের মাথা নুইয়ে জোড়হাত হয়ে মুন্নিলাল বলে, ‘গোলামের গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুরাইন। যে বাত আমি বলছি, তা আমার জবান নয়। এসব কথাই নবাবজাদা লিখে পাঠিয়েছেন। আপনি ছিলেন ঝুটা বেগম। নবাবজাদা মিরনের সঙ্গে শাদি হলে শরিয়তের কানুন মেনে সাচ্চা বেগম হবেন। ইমানদারির সঙ্গে দিন গুজরান করবেন। এসব কথাই নবাবজাদা লিখেছেন চিঠিতে। এই যে আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি।’
এই বলে কোমর-বন্ধনী থেকে পাকানো একটা কাগজ বের করে লুৎফার দিকে এগিয়ে দেয় মুন্নিলাল। হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে কী লেখা আছে তাতে না দেখেই তীব্র ঘৃণায় সেটা কুটিকুটি করে ছিড়ে মাটিতে ফেলে দেয় লুৎফা।
মুন্নিলাল বলে, ‘এ কী করলেন হুজুরাইন? চিঠিটা ছিড়ে ফেললেন? একথা পাঁচ কান হলে যে হুজুরের ঘোর বেইজ্জতি হবে।’
‘বেহুদা, বেতরিবত আদমির ইজ্জত বলে কি কিছু থাকে যে বেইজ্জতি হবে?’
‘ইতনা কেরাহিয়াত! নবাবজাদার মহব্বতকে আপনি ইনকার করছেন?’ মুন্নিলালের গলার স্বর রুক্ষ হয়।
লুৎফুন্নেসা ফুঁসে উঠে বলে, ‘সহি আন্দাজ আপনার। আমার হয়ে নবাবজাদাকে বলবেন, যে চিরকাল হাতির পিঠে চেপেছে, সে কখনও গর্ধবের পিঠে সওয়ার হতে পারে না।’
এ কথার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্রিভাবে হেসে ওঠে মুন্নিলাল। পানের ছোপ ধরা নোংরা দাঁতগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘বেওকুফের মতো হাসছেন যে?’ লুৎফা শুধোয়।
‘হুজুরাইনের সমুখে গোলামের হাসতে নেই জানি। তবুও হাসছি আপনার বেওকুফি দেখে। নিজের খুশনিসিবিকে পায়ে ঠেলছেন আপনি।’
‘আপনি এখন আসুন। আমাকে একা থাকতে দিন।’
মুন্নিলাল মুচকি হেসে বলে, ‘খালি হাতে ফিরে যাওয়ার হুকুম নেই হুজুরাইন।’
‘মানে?’ ভুরুযুগল কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করে লুৎফা।
‘নারাজ হলে জবরদস্তি আপনাকে জাফরাগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার পরোয়ানা নিয়ে এসেছি।’
‘সে হিম্মত আপনাদের নেই।’ কঠিন গলায় বলে লুৎফা।
‘বলছেন কী হুজুরাইন! হাবুজখানায় কয়েদ হয়ে হিম্মতের বড়াই করছেন আপনি? সিরাজদ্দৌলার জমানা চলে গিয়েছে। তিনি এখন খোশবাগে ঘুমিয়ে আছেন। তামাম সুবে বাংলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হলেন নবাবজাদা মিরন। চলুন হুজুরাইন। আপনার সঙ্গে সোহাগরাত মানিয়ে আমার হুজুরের বেতাব দিলের চ্যায়েন হোক।’
‘মুন্নিলাল!’
সহসা পিছন থেকে নারী কণ্ঠের গর্জন শুনে চমকে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় মুন্নিলাল। কারাকক্ষের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন মণি বেগম। বেগমসাহেবার দু’পাশে দু’জন বাঁদি। পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল। সকলে হাতিয়ারবন্ধ।
‘বেগমসাহেবা আপনি?’ ত্রস্ত হয়ে ওঠে মুন্নিলাল।
মণি বেগমের দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। ধকধক করে জ্বলছে চোখদুটো। নবাববেগমকে দেখে মুন্নিলাল একেবারে হকচকিয়ে যায়। স্তিমিত হয়ে যায় তার খুনজোশি। এই ওয়াক্তে এই হাবুজখানায় মণি বেগমের হাজির হওয়াটা মুন্নিলালের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
বেগমসাহেবার গলার স্বর শুনেই মুন্নিলাল মালুম পেয়েছে যে তার উপরে তিনি রুষ্ট হয়েছেন। নবাব মিরজাফরের উপর মণি বেগমের প্রভাব যে কতটা, তা মুন্নিলাল বিলক্ষণ জানে। এটাও সে জানে যে, মণি বেগমের খায়েশ হলে এই জমানায় অনেকেরই জিন্দেগি বরবাদ হয়ে যেতে পারে।
বিপদ আন্দাজ করে অকুস্থল থেকে নিমেষে হাওয়া হয়ে যায় মুন্নিলাল।
রাগে ফুঁসছে লুৎফা। মণি বেগম এসে তার সামনে দাঁড়ালেন। শান্ত গলায় বললেন, ‘ভয় নেই বহেন। আমি আছি। তোমার উপর কেউ জুলমাত-জবরদস্তি করবে না।’
লুৎফার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে। আনত চোখে ভূমির দিকে চেয়ে থাকে সে।
মণি বেগম বলেন, ‘নবাবকে তুমি অভিশাপ দিও না বহেন। রহেম করো তাঁকে। আমি জানি এক মাসুম জেনানার আঁসু অনেকের জিন্দেগিকে কহরে, মুসিবতে ভরিয়ে তোলে। আমাদের রহেম করো বহেন।’
‘সিরাজ! মেরা সরতাজ!’
লুৎফার আর্তনাদে যেন কেঁপে উঠল গোটা চেহেল সেতুন। এতক্ষণ নিজের সঙ্গে লড়াই করে অন্তরের আবেগকে রুদ্ধ করে রেখেছিল লুৎফুন্নেসা। সহসা সেই বাঁধ ভাঙল। লুৎফার মনের মধ্যে পাক খেতে লাগল কয়েকটা কথা—সিরাজ নেই। আর কোনওদিনই সে দেখতে পাবে না তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষটাকে। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।
ছলছল করে উঠল মণি বেগমের চোখদুটো। মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে তিনি লুৎফার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘আমাদের উপর কোনও আখেজ রেখো না বহেন। মিরজাফর খাঁ চাননি সিরাজের মওত হোক। যা হয়েছে তা মিরনের খায়েশেই হয়েছে। আমি জানি সিরাজের প্রতি তোমার মহব্বত ছিল বেহেস্তের কওসরের মতো পবিত্র। এমন মহব্বতের নিশান এ দুনিয়ায় অনেক তজবিজ করেও মেলে না। ডরো মাত বহেন। আমি আছি। তোমার এই পেয়ারকে কেউ বেইজ্জত করবে না। তোমার দিল থেকে সিরাজকে উপড়ে ফেলার জন্য কেউ তোমার উপর জুলমাত করবে না, কোনও জবরদস্তি করবে না। তোমার শরীরকে কেউ অপবিত্র করার কোশিস করবে না। আমি নবাবকে দিয়ে কড়ার করিয়ে নিয়েছি।’
মুখ তুলে তাকিয়ে চোখের জল মোছে লুৎফা। বলে, ‘কোনও জুলমাত, জবরদস্তিকে আমি ভয় করি না বেগম সাহেবা। জহরের পুরিয়া সঙ্গেই আছে। বড্ড কড়া। জিভে ছোঁয়ালেই মওত। কেউ জোর খাটাতে গেলে আমাকে পাবে না। শুধু আমার লাশটাই পাবে।’
‘অ্যায়সা মাত শোচো বহেন। তুমি বাঁচবে। সিরাজের জন্যেই বাঁচতে হবে তোমাকে। আমি তোমাকে আজাদ করে দিতে এসেছি।’
‘আজাদি?’ এই বলে জল ছলছল চোখে মণি বেগমের দিকে তাকায় লুৎফা।
‘হ্যাঁ আজাদি। এখন থেকে খোশবাগের দেখভাল করবে তুমি। যেখানে তোমার সিরাজ শুয়ে আছে। তুমি ফুল ছড়িয়ে দেবে কবরে। হররোজ চিরাগ জ্বেলে দেবে। আগরবাতি জ্বালাবে। জেয়ারাত করবে সিরাজের সমাধি। তোমার সিরাজ নিশ্চিন্তে ঘুমোবে। কহানি হয়ে বেঁচে থাকবে তোমাদের মহব্বত।’
‘আপনি সচ বলছেন?’ আবেগে গলা কেঁপে যায় লুৎফার।
‘একিন হচ্ছে না তোমার? এই দেখো নবাবের পরোয়ানা।’ পাশে দাঁড়ানো বাঁদির হাত থেকে একটা গোটানো কাগজ নিয়ে লুৎফার সামনে মেলে ধরেন মণি বেগম। ‘এই যে নবাবের শিলমোহর।’
‘আর উম্মেসায়েরা? তার আখবর আপনি কিছু জানেন?’
‘ভেবো না। সায়েরা ভালো আছে। সে তোমার কাছেই থাকবে।’
‘আপনার বহুত মেহেরবানি বেগমসাহেবা।’ এই বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে লুৎফা।
মণি বেগম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সাচ্চা পেয়ার এ দুনিয়ায় বহুত কিমতি চিজ বহেন। সবাই তলাশ করে। কেউ পায়। কেউ পায় না। তুমি পেয়েছিলে। তুমি এক খুশনসিব আওরত। তোমাকে আমি ঈর্ষা করি।’
লুৎফা জল ছলছল চোখে মুখ তুলে তাকাল।
মণি বেগম বলে চললেন, ‘তোমার মতোই কোনও এক মামুলি খানদানে আমার পয়দায়িস ও পরবারিশ। আজ না হয় নবাব-বেগম। কাল কী হবে আমি জানি না। তবে মণি বেগম একজন আওরত হয়ে আরেকজন আওরতের ইমান, ইজ্জত রাখতে জানে। আমি আসি বহেন। খানিকবাদে ডুলি আসবে। তোমাকে খোশবাগে নিয়ে যাবে। ডরো মাত। জাফরাগঞ্জের হারেম নয়, তোমার ঠিকানা এখন থেকে খোশবাগ।’
এই বলে মণি বেগম আর দাঁড়ালেন না। দ্রুত পায়ে ফিরে চললেন। বেগমসাহেবা অনুভব করলেন তাঁর চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। দু’চোখে টলটল করছে জল। মনে মনে বললেন, ‘রহেম করো আল্লা। কোনও গুণাহ-পাপ যেন আমার দুই বেটা নজমদ্দৌলা ও সইফদ্দৌলাকে স্পর্শ না করে।’
কারাকক্ষের দরওয়াজা বন্ধ করে সেপাইরা। লুৎফা মুখ তুলে উপরের দিকে তাকায়। অনেক উঁচুতে জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের উন্মুক্ত নীল আকাশের একফালি। সেদিকে চেয়ে লুৎফা অঝোরে কাঁদতে থাকে।
খানিকবাদে ঘড়ঘড় শব্দে খুলে যায় কারাগারের দরওয়াজা। অন্দরে প্রবেশ করে জয়নাল। খোশবাগে আলিবর্দির সমাধির দেখভাল করে সে। আলিবর্দির গোলাম ছিল জয়নাল। লুৎফার একান্ত পরিচিত। জয়নালকে দেখে চোখের জল মুছে দ্রুত এগিয়ে এসে লুৎফা শুধোয়, ‘আপনি?’
জয়নালের বিষণ্ণ মুখে ক্ষীণ একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সে বলে, ‘চলুন হুজুরাইন। আপনাকে খোশবাগে নিয়ে যাওয়ার হুকুমত নিয়ে এসেছি। ডুলি অপেক্ষা করছে।’
.
