৩০
ভাগীরথীর বুকে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন্ট, টাইগার, সলিসবেরি, ব্রিজওয়াটার ও কামবারল্যান্ড। প্রত্যেকটা জাহাজের মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। শালতি চেপে দলে দলে গোরাপল্টনেরা জাহাজগুলোতে গিয়ে উঠছে। খানিকবাদে কোম্পানির নৌবহর মেজর আয়ারকুটের নেতৃত্বে রওনা হবে মাদ্রাজের উদ্দেশে। দক্ষিণে ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ বাধতে চলেছে। মেজর আয়ারকুটে সঙ্গে অ্যাডমিরাল পোককও মাদ্রাজে পাড়ি দেবেন।
মাদ্রাজ কাউন্সিলের গভর্নর মি পিগট ফিরে আসার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন ক্লাইভকে। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলা ছেড়ে নড়ার ইচ্ছে ক্লাইভের নেই। পিগট সাহেবের উদ্দেশে তিনি লিখলেন, ‘…রেসপেক্টেড স্যার, বাংলায় আমাদের জয়লাভ হয়েছে। নবাব সিরাজদ্দৌলাকে মসনদ থেকে হটিয়ে আমরা একজন পুতুল নবাবকে মসনদে বসিয়েছি ঠিকই তবে বাংলার পলিটিক্যাল সিচুয়েশন এখনও স্টেবল নয়। নিজেদের শর্তে বাংলায় আমরা ফের কারবার চালু করতে পেরেছি, তবে ব্যাবসার ক্ষেত্রে এদেশে একচেটিয়া অধিকার কায়েম করতে হলে মুর্শিদাবাদের দরবার রাজনীতির উপরে আমাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। আশঙ্কার কথা হল এই যে বাংলায় ফের হানা দিতে পারে বর্গিরা, মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করতে পারেন অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা। বর্তমান নবাব মিরজাফর খাঁ খুবই দুর্বল। নিজামতের অন্দরে দেখা দিয়েছে অন্তর্কলহ। দেওয়ান রায়দুর্লভ নবাবকে মসনদ থেকে হটিয়ে দিতে চান। এই ইচ্ছের কথা আমার কাছে তিনি কবুলও করেছেন। এই পরিস্থিতিতে বাইরের শত্রু আক্রমণ করলে নবাবের পক্ষে মসনদ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে উঠবে না।
সব মিলিয়ে সিচুয়েশন ইজ ভেরি কমপ্লেক্স। আপাতত নবাব মিরজাফর খাঁকে সহি সালামত রাখা দরকার। পলাশির ইকরারনামা মোতাবেক সবে মাত্র প্রথম কিস্তির টাকা আমরা পেয়েছি। এখনও বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া রয়েছে। এ অবস্থায় অচানক নবাব বদল হলে, পরবর্তী নবাব হয়তো সেই চুক্তির দায় নিতে চাইবেন না। তাছাড়া অন্য কোনও শক্তি বাংলা দখল করে নিলে ফের বেকায়দায় পড়তে হবে আমাদের। তাই বাংলায় বসে আপাতত পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখতে চাই আমি। কাজেই বুঝতেই পারছেন এখনই আমার পক্ষে বাংলা ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
আপনাকে এবারে একটা খারাপ খবর জানাই। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ইজ নো মোর। মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে আসার পরে অজানা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেহ রেখেছেন। তবে আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। অ্যাডমিরাল পোককের সঙ্গে যুদ্ধজাহাজগুলোকে আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি মাদ্রাজে। সেই সঙ্গে পাঠাচ্ছি মেজর আয়ারকুট ও পাঁচশো ফৌজিকে। মেজর আয়ারকুট অত্যন্ত দক্ষ অফিসার। আমার ধারণা দক্ষিণে সে ইংরেজবাহিনীকে যথার্থ নেতৃত্ব দিতে পারবে।’
উইথ রিগার্ডস। ইওরস সিনসিয়ারলি, রবার্ট ক্লাইভ।
টাইগার জাহাজের অদূরে জোয়ারের ঢেউয়ে দুলছে ছোট একটা দেশি নৌকো। ছইয়ের নীচে শুয়ে বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বাঘের মুখ আঁকা জাহাজটাকে খুঁজছিল ঈশ্বরী। গায়ে ধুম জ্বর। শরীর খুবই দুর্বল। সঙ্গে সে নিয়ে এসেছে বিশুর মাকে। বরানগরে বিদ্যার বাড়ির পরিচারিকা ছিল বিশুর মা। স্বামী-পুত্রহারা প্রৌঢ়া। কাশী যাওয়ার পথে বিদ্যা হারিয়ে গিয়েছে, একথা শুনে খুব কেঁদেছিল বিশুর মা।
চোখের জল চেপে ঈশ্বরী বলেছিল, ‘কাঁদছ কেন মাসি? আমি তো রয়েছি।’ বরানগরে নিজের বাড়িতে বিশুর মাকে আশ্রয় দিয়েছে ঈশ্বরী। এখন বিশুর মা’ই ঈশ্বরীর দেখভাল করে।
মুর্শিদাবাদ থেকে ঈশ্বরীর কলকাতায় ফেরার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন মেজর আয়ারকুট। ভাড়া করা একটা বজরায় চেপে ইংরেজ নৌবহরের পিছুপিছু কলকাতায় ফিরে আসে ঈশ্বরী। তার সঙ্গে আয়ারকুটের আশনাইয়ের কথা ক্লাইভের কানে পৌঁছেছে। মুচকি হেসে আয়ারকুটকে তিনি শুধিয়েছিলেন, ‘আই হ্যাভ হার্ড দ্যাট ইউ গট অ্যা কনসর্ট। অ্যা কান্ট্রি গার্ল। ইজ দ্যাট ট্রু?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘এনজয় ইওর টাইম ফর অ্যা ফিউ ডেজ অ্যান্ড স্টোর এনার্জি টু ফাইট এগেইন্সট দ্য ফ্রেঞ্চ।’
আয়ারকুট অবাক হন। ‘হোয়াট?’
‘ইউ হ্যাভ টু গো টু ম্যড্রাস। মি. পিগট নিডস হেল্প। ফ্রেঞ্চ জেনারেল কাউন্ট লালি ইজ অ্যাপ্রোচিং পুণ্ডিচেরি।’
এভাবেই মাদ্রাজে পাড়ি দেওয়ার কথাটা আয়ারকুটকে বলেছিলেন ক্লাইভ।
মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল আয়ারকুটের। ঈশ্বরীকে সঙ্গে করে মাদ্রাজে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ এক লড়াই লড়তে। থাকতে হবে সেনা ছাউনিতে। ওদিকে মন চাইছে না পিয়ারিকে কলকাতায় রেখে যেতে। সে এক বিষম সঙ্কট।
দিন কয়েক আগের কথা। আকাশে ভাসছিল আধখানা চাঁদ। নদীর বুকে ভাসমান বজরার ছাতে ফরাসের উপরে ডান হাঁটুতে থুতনি রেখে বসেছিল ঈশ্বরী। মনে বিষাদের মেঘ। নাগর চলে যাবে দূরে। ঈশ্বরীর চোখে টলটল করছিল জল।
‘রাগ কোরো না ডার্লিং। আমাকে যেতেই হবে। ফরাসিদের সঙ্গে লড়াই বেধেছে।’
ঈশ্বরী জবাব দেয় না। চুপ করে বসে থাকে।
আয়ারকুট বজরার ছাতের রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হেঁটে এসে ঈশ্বরীর মুখোমুখি হাঁটু মুড়ে বসলেন। ‘কাঁদছ ডার্লিং?’
ঈশ্বরী এবারে ভেঙে পড়ে সশব্দ কান্নায়।
আয়ারকুট বলেন, ‘আমি ওয়ারফিল্ডে যাচ্ছি ডার্লিং। ওখানে তোমাকে নিয়ে যাওয়া যায় না।’
কান্না থামিয়ে মুখ তুলে চোখের জল মুছে ঈশ্বরী বলে, ‘আমাকে বুঝ দিও না সাহেব।’
‘মাদ্রাজের লড়াই মিটে গেলেই আমি আবার ফিরে আসব কলকাতায়।’
‘আর বোধহয় তোমার সঙ্গে দেখা হবে না।’
আয়ারকুট মুখ তুলে আকাশের দিকে চাইলেন। তাঁর বুকের কাছে পাক খাচ্ছে একটা কষ্ট।
সবাই জানে বড় শক্ত মনের মানুষ মেজর আয়ারকুট। সূক্ষ্ম আবেগ, অনুভূতির কোনও দাম নেই তাঁর কাছে। লড়াইয়ের ময়দানে ভয়ংকর আগ্রাসী মনোভাবের জন্য তিনি বিখ্যাত। যুদ্ধক্ষেত্রে চরম বিপদের মধ্যেও এতটুকু বিচলিত হন না, এতটুকু টোল খায় না তাঁর আত্মবিশ্বাস। অনমনীয় মনোভাবের সঙ্গে লড়াই করে শত্রুকে মেরে, কেটে নিকেষ করে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। শত্রুপক্ষ বলে মেজর আয়ারকুট জহ্লাদ, নির্মম, নিষ্ঠুর। এমন একজন মানুষকে কী করে এমন মায়ার বন্ধনে জড়াল এই মেয়েটি? আয়ারকুট নিজেই অবাক হয়ে যান।
মেজর সাহেব বললেন, ‘পরশু আমি চলে যাব ডার্লিং।’
ঈশ্বরী নির্বাক।
‘জাহাজে ওঠার সময় তোমাকে দেখতে চাই একবার। অবশ্যই এসো।’
ঈশ্বরী অবাক হয়ে মুখ তুলে শুধোয়, ‘ওখানে কীভাবে যাব আমি?’
‘নৌকো করে এসো। জাহাজে ওঠার সময় দেখতে পাবে আমাকে।’
ঈশ্বরী শুধোয়, ‘কোন জাহাজ?’
‘টাইগার। দেখবে জাহাজের গায়ে বাঘের মস্ত বড় একটা মুখ আঁকা আছে। যখন জাহাজ থেকে ব্যান্ডে গানের সুর ভেসে আসবে, বুঝবে ঘাট থেকে শালতিতে চেপে জাহাজে চড়ার জন্য আমি রওনা হয়েছি।’
ঈশ্বরী শুধোয়, ‘কী গান?’
আয়ারকুট বলেন, ‘রুল ব্রিটানিয়া।’
মেজরসাহেব শিস দিয়ে গেয়ে শোনান রুল ব্রিটানিয়ার সুর।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে আয়ারকুটের মুখের দিকে চেয়ে থাকে ঈশ্বরী।
‘মনে থাকবে ডার্লিং?’
ঈশ্বরী ঘাড় নাড়ে।
আয়ারকুট অপলক চোখে চেয়ে থাকেন ঈশ্বরীর মুখপানে।
‘অমন করে কী দেখছ সাহেব?’
‘তোমাকে। ইউ আর টু প্রিটি। বহুত সুন্দর।’
হাসতে গিয়ে কান্নায় ফের ভেঙে পড়েছিল ঈশ্বরী।
গতকাল রাত থেকে ধুম জ্বর এসেছে ঈশ্বরীর। এখনও জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা। তবুও সাহেবকে একবার দেখার জন্য সে ভোর রাতে বরানগর থেকে নৌকো করে নদীতে ভেসে পড়ে।
জ্বালা করছে চোখদুটো। বাঘের মুখ আঁকা জাহাজটাকে দেখতে পায় ঈশ্বরী। অদূরে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঈশ্বরীর গলার কাছে আটকে রয়েছে কান্না।
কেল্লাঘাটে দাঁড়িয়ে অ্যাডমিরাল পোকক ও মেজর আয়ারকুটকে সি অফ করলেন কর্নেল ক্লাইভ। তিনিও যাত্রার জন্য প্রস্তুত। অপেক্ষা করছে তাঁর বজরা। ক্লাইভ যাবেন চন্দননগরে। কলকাতার জলহাওয়া সহ্য হচ্ছে না। আপাতত চন্দননগরের ফ্রেঞ্চ গার্ডেনে কিছুদিন থাকবেন। নৌবহরকে মাদ্রাজ অভিমুখে যাত্রা করিয়ে তারপর কর্নেল ক্লাইভ রওনা হবেন চন্দননগরের উদ্দেশে। তাঁর বাহিনীর বড় একটা অংশ সেখানে রয়েছে।
দুটো আলাদা আলাদা শালতিতে উঠলেন, আয়ারকুট ও পোকক। মিলিটারি ব্যান্ডে বেজে উঠল রুল ব্রিটানিয়া। আয়ারকুটের শালতি এগিয়ে চলল টাইগার জাহাজের দিকে।
কোমরে হাত দিয়ে গলুইয়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন আয়ারকুট। মোচার খোলার মতো অসংখ্য শালতি ভাসছে জলে। আয়ারকুটের ব্যগ্র দুই চোখ খুঁজছে তাঁর পিয়ারিকে।
পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রুজি-রোজগারের তাগিদে অনিশ্চয়তার জোয়ারে ভেসেছেন আয়ারকুট। একজন সেনানীর জীবন বড় রুক্ষ, কর্কশ। এ জীবনে দুদণ্ড শান্তি মেলে না। প্রতিমুহূর্তে জীবন বাজি রেখে চলা। ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষা। থেকে থেকে মনে হয়, এই বুঝি ফুরিয়ে এল জীবনের মেয়াদ। সামান্য অবসর বা ফুরসত যখন মেলে, সে সময়ে পার্থিব সুখরসের আকণ্ঠ আস্বাদ পেতে তাই অধীর হয়ে ওঠে মন। দেহ চায় রতিসুখ। এদেশে সুলভে রঙ্গিনী মেলে। কিন্তু মাধুর্যে, ভালোবাসা দিয়ে মনকে ভরিয়ে দিতে পারে ক’জনে?
দেহসুখ চরিতার্থ করতেই তো রতু সরকারের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দিয়ে ঈশ্বরীর রাতের নাগর হয়েছিলেন আয়ারকুট। ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ার কোনও কথা তো ছিল না। তাহলে? মেয়েটা কি জাদু জানে? শালতি প্রায় এসে পড়ল জাহাজের কাছে। কিন্তু কোথায় সে? কোথায় ডার্লিং ঈশ্বরী?
রুল ব্রিটানিয়ার সুর কানে ভেসে আসতেই গায়ের চাদর সরিয়ে দ্রুত উঠে বসে ঈশ্বরী। শরীরের দুর্বলতাকে উপেক্ষা করে ছইয়ের নীচ থেকে বের হয়ে গলুইয়ের উপরে এসে দাঁড়ায়। প্রবল উত্তেজনায় সে খুঁজতে থাকে তার সাহেবকে। শ্বাসপ্রশ্বাসের বেগ দ্রুততর হয়।
পরপর এগিয়ে চলেছে কয়েকটা শালতি। সহসা আয়ারকুটকে দেখতে পায় ঈশ্বরী। গলুইয়ের উপরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য রক্তবর্ণের মসলিনের দোপাট্টা শূন্যে দোলাতে থাকে ঈশ্বরী।
আয়ারকুটের নজরে এল উড্ডীন দোপাট্টা। হাত নাড়লেন দূর থেকে।
ঈশ্বরীর নরম দুই গাল বেয়ে জলের ধারা নামে।
খানিকবাদে তার নজরের আড়ালে চলে গেলেন মেজর আয়ারকুট।
ঈশ্বরী অস্ফুট স্বরে বলল, ‘ভালো থেকো সাহেব।’
জাহাজের ঘণ্টি বাজল। চলতে শুরু করল কোম্পানির নৌবহর।
সারা গায়ে ব্যথা। ব্যথার তাড়সে ঈশ্বরীর গোটা দেহ যেন অবশ হয়ে আসছে।
বিশুর মা বলে, ‘এবারে দাঁড় বাইতে বলি দিদিমণি? চলো ফেরা যাক। অনেক দেরি হয়ে গেল। জোলো বাতাসে শরীর আরও খারাপ করবে।’
জাহাজগুলো চলে যাচ্ছে দূরে। ঈশ্বরী বলে, ‘একটু দাঁড়াও মাসি।’
ধীরে ধীরে নৌকোর পাটাতনের উপরে বসে পড়ে ঈশ্বরী। সারা গায়ে তীব্র ব্যথা। যেন অজস্র বিষফোঁড়া ত্বক ভেদ করে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। পরনের ঘাগরা খানিকটা উপরে উঠে গিয়েছে। সেটা নামাতে গিয়ে চমকে ওঠে ঈশ্বরী। ডান পায়ে হাঁটুর নীচে ফুটে বেরিয়েছে একটি গুটিকা। ঠিক ফোসকার মতো। তলপেটে ব্যথা। ঈশ্বরী দেখে তার নাভির ঠিক নীচে বেরিয়েছে অবিকল ওইরকম দুটি গুটি। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে ঈশ্বরীর। এ এক ভয়ানক মারণ রোগের বহিঃপ্রকাশ। কপালে হাত দিয়ে সে অনুভব করে জ্বরটা আরও বেড়েছে।
.
অস্থির হয়ে পড়েছেন মহারাজ রাজবল্লভ। তাগদ, ক্ষমতা, জোশ খুব দ্রুত তিনি ফিরে পেতে চান। বয়স বাড়ছে। পাক ধরেছে মাথার চুলে। পেরিয়ে যাচ্ছে সময়। পরমায়ু কতদিনের জানা নেই। বৈদ্য কুলপতির অন্তরে এখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে ক্ষমতালিপ্সার আগুন। ক্ষমতা বয়ে আনে ভোগসুখের আনন্দ। ভোগ যে এখনও অনেক বাকি।
মিরজাফরকে হটিয়ে মির্জা মেহেদিকে মসনদে বসানোর পর সিপাহসালারের পদটা রাজবল্লভকে পাইয়ে দেবেন। কথা দিয়েছেন রায়দুর্লভ। কিন্তু রাজনীতিতে অভিজ্ঞ রাজবল্লভ বুঝতে পারছেন, এই ইনকিলাব জলদি হবে না। ইংরেজদের মদত ছাড়া নবাবের সঙ্গে পাঞ্জা কষার হিম্মত রায়দুর্লভের নেই। ক্লাইভের মতিগতি দেখে রাজবল্লভের ধারণা হয়েছে, এই মুহূর্তে মসনদ নিয়ে ফের একটা কাজিয়ায় জড়িয়ে পড়তে চান না তিনি। তাহলে উপায়?
নিজের নসিব ফেরাতে মিরনের সঙ্গেই হাত মেলানোর পরিকল্পনা করলেন রাজবল্লভ। তিনি জানেন দেওয়ান রায়দুর্লভের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আদমি বলে পরিচিতি থাকায় নবাবজাদা মিরন তাঁকে একেবারেই পছন্দ করেন না। মিরনের আস্থা অর্জন সহজ নয়। কৌশল হাতড়াতে লাগলেন বৈদ্যকুলপতি। কী ভাবে কাজটা হাসিল করা যায়। কূটবুদ্ধি তার মাথায় খেলে ভালো। চটজলদি একটা উপায়ও বের করে ফেললেন।
‘…বিহারমুলুকের জমিদারেরা সব আপনার অনুগত। আপনি ফৌজ নিয়ে এগিয়ে আসলেই কাম হাসিল হয়ে যাবে। নবাব মিরজাফর খাঁকে হটিয়ে মির্জা মেহেদিকে মসনদে বসাতে চাই। এতে আমার আপনার সকলেরই লাভ। কারণটা আশা করি বুঝিয়ে বলতে হবে না। আপনি অভিজ্ঞ লোক। পাটনার নায়েব সুবাদারের পদে বহুদিন বহাল আছেন। সুবে বাংলার রাজনীতির অন্ধিসন্ধি আপনার নখদর্পণে। নিশ্চয়ই বোঝেন যে, বাপ মসনদ থেকে হটে গেলে ওর অপগণ্ড ছেলেটাও সিধে হয়ে যাবে।…’
‘খামোশ।’
চিঠিটা পড়ে শোনাচ্ছিলেন রাজবল্লভ। মিরনের চিৎকার শুনে থতমত খেয়ে থেমে গেলেন।
রাগে কাঁপছে মিরন। নবাবজাদার কুরসির পাশেই রুপোর দাঁড়ে বসে থাকা নবাবের প্রিয় বাজপাখিটা ডানা ঝাপটাতে লাগল। মনিবের গরম মেজাজের আঁচ পেয়ে সে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মনিবের মন বোঝে পাখি।
রাজবল্লভ জোড়হস্ত হয়ে বললেন, ‘আমি আপনার ভালাই চাই হুজুর।’
‘ইয়ে খত দেওয়ানজি লিখেছেন? সাবুত কাঁহা? দস্তখত কোথায়?’
‘দেওয়ানজি চতুর আদমি। দস্তখত করেননি। লেকিন—’
‘লেকিন?’ শ্যেনদৃষ্টিতে রাজবল্লভের মুখপানে চেয়ে অস্থির গলায় প্রশ্ন করল মিরন।
‘দেওয়ানজির উপরে কড়া নজর রেখেছিলাম আমি। তাঁর এক কাসিদ এই খত নিয়ে গোপনে পাটনার দিকে যাচ্ছিল। আমার তাঁবের কয়েকজন সেপাই তাকে ঘায়েল করে কাগজটা কেড়ে নেয়। আপনি নিজেই বুঝে দেখুন হুজুর এ চিঠি দেওয়ানজি ছাড়া আর কার লেখা হতে পারে?’
পিরানের জেবের ভিতরে চিঠিটা চালান করে দিয়ে হঠাৎ সজোরে হেসে উঠল মিরন। তারপর রাজবল্লভের দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘দেওয়ানজি ঘুঁটি সাজানোর কোশিশ করছেন। ফির ইনকিলাব চান। এমনই আন্দাজ ছিল আমার। এবারে সাবুত মিলল। বহুত আচ্ছা কাম করেছেন আপনি। ইনাম মিলবে।’
খুশিতে গদগদ হয়ে রাজবল্লভ বললেন, ‘আপনার বহুত মেহেরবানি হুজুর।’
মিরন বলল, ‘আমি আপনার মতো একজন চৌখশ ইনসানের তালাশ করছিলাম।’
ব্যগ্র গলায় রাজবল্লভ শুধোলেন, ‘কাম কী আছে হুজুর?’
শ্বেতপাথরের চৌপাইয়ের উপরে রেকাবিতে রাখা রুপোর তবকে মোড়া একটা পান তুলে নিয়ে মুখে ফেলে মিরন বলে, ‘দেওয়ানগিরি। নবাবজাদা মিরনের দেওয়ান।’
খুশিতে রাজবল্লভের চোখদুটো চকচক করে উঠল। যাক শেষপর্যন্ত একখানা জাল চিঠি নবাবজাদার হাতে তুলে দিয়ে কার্যসিদ্ধি হল। বড্ড ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি। ধরা পড়লে নির্ঘাত গর্দান যেত। রায়দুর্লভের হাতের লেখা নকল করে এ চিঠি মুসাবিদা করেছেন তিনি নিজেই। রাজবল্লভ কোনও নীতির ধার ধারেন না। তিনি কেবল তাগদ ফিরে পেতে চান। সে যে উপায়েই হোক।
মদের নেশায় ইদানীং দিনরাত বেসামাল হয়ে থাকেন নবাব মিরজাফর খাঁ। নিজামত চলছে মিরনের খায়েশে। কাজেই নবাবজাদার দেওয়ানের পদে বহাল হওয়া মানে প্রচুর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অর্জন। এমনটাই তো চেয়েছিলেন রাজবল্লভ। এসব ভেবে খুশিতে ভাসছিলেন তিনি। তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে মিরন শুধোল, ‘এ কাম আপনার পসন্দ নয় বুঝি?’
‘বলছেন কী হুজুর? এ তো আমার খুশনসিব। বান্দা আপনার জন্য জান কবুল করবে।’
এই বলে মাথা ঝুঁকিয়ে নবাবজাদাকে বারবার সেলাম জানাতে লাগলেন রাজবল্লভ।
.
