৩৬
অধীর উৎকণ্ঠা নিয়ে একখানা ছিপনৌকোর গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ওয়ারেন হেস্টিংস। দ্রুতগামী ছিপনৌকো ভাগীরথী বেয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে কাশিমবাজারের উদ্দেশে ভেসে চলেছে। স্থলপথে গোটা গোরাপল্টন বাহিনীর কাশিমবাজারে ফিরতে অনেকটা সময় লাগবে। মেরির শারীরিক অবস্থা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন ওয়ারেন হেস্টিংস। জলপথে মুর্শিদাবাদ থেকে কাশিমবাজার অনেক কম সময়ে যাওয়া যায়। তাই বাহিনী ছেড়ে একাকী তাঁর এই নৌ-যাত্রা।
অধীর উত্তেজনায় সামনের দিকে চেয়ে আছেন হেস্টিংস। পথ যেন আর ফুরোতে চায় না। ঘন ঘন মাঝিমাল্লাদের কাছে তিনি শুধোচ্ছেন, ‘আর কতক্ষণ সময় লাগবে বলতো কাশিমবাজার পৌঁছতে?’
মাঝি বলে, ‘এই যে সাহেব এসে পড়লাম প্রায়।’
দিনের আলো কমে আসছে। ডানা ঝাপটে নদীর উপর দিয়ে উড়ে গেল একদল শঙ্খচিল। হেমন্তকালের এই সময়টায় সন্ধের মুখে নদীর বুকে কুয়াশার আস্তরণ নেমে আসে। সব রং কালচে ধূসর হয়ে যায়। দৃষ্টি বেশি দূরে যায় না। তবুও হেস্টিংসের ব্যগ্র দুই চোখ সমানে খুঁজতে থাকে—দূরে কোম্পানির কুঠির আবছা অবয়ব দেখা যাচ্ছে কী?
সকালে কুঠির ডাক্তার বলেছেন, যে কোনও সময় মেরির প্রসববেদনা উঠতে পারে। উৎকণ্ঠা আর সইতে পারছেন না হেস্টিংস। ঘনঘন টান দিয়ে চলেছেন চুরুটে।
মাঝি হঠাৎ বলে, ‘ওই যে সাহেব কুঠির ঘাট দেখা যাচ্ছে।’
কাশিমবাজারের কুঠিঘাটে ভিড়ল হেস্টিংসের ছিপনৌকো। নৌকো থেকে প্রায় লাফিয়ে পড়ে ঘাটের উপরে উঠে এলেন হেস্টিংস। ঘাট থেকে উপরে উঠে গিয়েছে দোতলা ইমারতের সমান উঁচু থাক থাক সিঁড়ি। খুব দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে তিনি উপরে উঠতে লাগলেন।
হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ল উপর থেকে অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে নেমে আসছেন কৃষ্ণকান্ত। পিছনে এক মশালচি। আঁধার নেমেছে। কী সংবাদ বয়ে আনছেন কান্ত?
হেস্টিংসের দম যেন বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। দ্রুত একথাক সিঁড়ি ভেঙে প্রশস্ত এক চাতালের উপরে উঠে এসে কৃষ্ণকান্তর মুখোমুখি হলেন হেস্টিংস।
‘কী পয়গাম কান্ত?’
কৃষ্ণকান্তর মুখে হাসি ঝলকায়। বলেন, ‘খুশখবর আছে সাহেব। আপনার মেয়ে হয়েছে। মেরি ম্যাডাম ও ড’টার দুজনেই ভালো আছে।’
নিমেষে দুশ্চিন্তার পাষাণভার নেমে গেল হেস্টিংসের বুক থেকে। খুশিতে ডানা মেলে উড়তে ইচ্ছে হল তাঁর। আকাশের দিকে মুখ তুলে প্রভু যিশুকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন।
কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘ইনাম চাই সাহেব। গুড নিউজ আমিই প্রথম আপনাকে দিলাম।’
‘জরুর।’ অনামিকা থেকে হিরে বসানো মূল্যবান একটা আংটি খুলে নিয়ে সেটা কৃষ্ণকান্তকে উপহার দিলেন হেস্টিংস। তারপর ছুটলেন বাংলো অভিমুখে।
আঁতুড় ঘরের দরজার মুখে এসে দাঁড়ালেন হেস্টিংস। গায়ে একখানা কাঁথা চাপা দিয়ে শুয়ে আছে মেরি। তার বুকের কাছে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে একরত্তি মেয়েটা। ফুলের মতো সুন্দর।
‘মেরি ডার্লিং!’ আনন্দে জল আসে হেস্টিংসের চোখে।
চোখ খুলে তাকালেন মেরি। হেস্টিংসকে দেখে মুচকি হাসলেন।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেরির মুখের দিকে চেয়ে রইলেন হেস্টিংস।
হাসলে মেরির দুগালে টোল পড়ে। খুব সুন্দর দেখায়।
.
সৈন্যসামন্ত নিয়ে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে পূর্ণিয়ার পথে রওনা হলেন খাদিম হোসেন। হাতি-ঘোড়া-উট-বন্দুকচি, পদাতিক, ধানুকি, মুটে মজুর-গোলাম-বাঁদি নিয়ে বিরাট এক বাহিনী। সেই সঙ্গে জেনানা পালকিতে চলেছে বেশ কয়েকজন কসবী, বাইজি। সব মিলিয়ে বিরাট এক লটবহর। এ অভিযানের কড়ি নিজের ট্যাঁক থেকেই খসাচ্ছেন খাদিম হোসেন। মনের মধ্যে কষে রেখেছেন সহজ এক অংক। ফৌজদারের পদে বসে জমিদারদের চাপ দিয়ে খরচের কয়েকগুণ তিনি উশুল করে নেবেন।
মিরনের ঘোর অপছন্দের লোক খাদিম হোসেন। নবাবজাদার অমতে ফৌজদারের পদপ্রাপ্তি তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। এই অভিযানে নিজামতের খরচ নেই। শুধু এই ভেবে খাদেম হোসেনের পদোন্নতি মেনে নিলেন মিরন। কিন্তু খাদেম হোসেনের পিছনে লেলিয়ে দিলেন কয়েকজন কাসিদ কে। খাদিম হোসেন দুর্জন ব্যক্তি। অসৎ, লম্পট ও দুশ্চরিত্র। সকলেই জানে। অনেকদিন ধরেই লুকিয়েচুরিয়ে নানা বেআইনি কারবার করে তিনি অঢেল বিত্তের অধিকারী। হালে নবাব মিরজাফরের মদতে খাদিম হোসেনের মাদকের কারবার খুল্লমখুল্লা চলছে। চকবাজারে কোতোয়ালির দারোগার নাকের ডগাতেই দেদার বিকোচ্ছে নিষিদ্ধ মাদক।
এমন দুর্জন লোককে উৎকোচে বশীভূত করা কঠিন কিছু নয়। নবাব ও নবাবজাদা দু’জনেরই ভয় রামনারায়ণকে। টাকা ছড়িয়ে গোটা ফৌজসহ খাদিম হোসেনকে নিজের তাঁবে না নিয়ে নেন রামনারায়ণ। পূর্ণিয়ার বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে খাদেম হোসেন নিজেই যদি গুমরাহী হন তো বিপক্ষ শিবিরের শক্তি আরও বাড়বে। খাদেম হোসেনের গতিবিধির উপর কড়া নজর রাখার জন্য কাসিদ বাহিনীকে হুঁশিয়ার করে দিল মিরন। খাদেম হোসেনও বুঝলেন তিনি নজরবন্দি। বাগিপনাহের ভূত দেখছেন নবাব ও নবাবজাদা। তবে এ নিয়ে তাঁর অবশ্য কোনও হেলদোল নেই। ফৌজদারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল টাকা উপায়ের খোয়াবে তিনি বিভোর হয়ে আছেন।
পূর্ণিয়ায় গিয়ে বেশ রগড় হবে। লুঠতরাজ করে বেশ দুপয়সা কামিয়ে নেওয়া যাবে। এই খুশিতে হইহল্লা করতে করতে চলেছে খাদেম হোসেনের উচ্ছৃঙ্খল বাহিনী। এরা কেউই সেই অর্থে সৈন্য নয়। বেশিরভাগই দুষ্কৃতী। খাদিম হোসেনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তরবারি বা বন্দুক ধরার অতীত অভিজ্ঞতা অনেকেরই নেই। মদে চূর হয়ে টলমল পায়ে এরা চলেছে। পথের ধারের গ্রামগুলোতে হামলা করে নিরীহ মানুষের ধনদৌলত কেড়ে নিচ্ছে। উচ্ছৃঙ্খল সেপাইদের দাপটে আতঙ্কের প্রহর গুনছে সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে খাদেম হোসেন নির্বিকার। যা ঘটছে তা তাঁর মদতেই ঘটছে। তিনি ভাঙের নেশায় চুর হয়ে ঝিম মেরে গাদেলার উপরে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে কাত হয়ে বসে পান চিবিয়ে চলেছেন। কেবল দিনের শেষে সেপাইদের কাছ থেকে বুঝে নিচ্ছেন নিজের বখরা। এর নাম যুদ্ধযাত্রা?
হাঁ হয়ে গিয়েছেন রাজধানীর প্রবীণেরা। এঁরা যৌবনকালে মুর্শিদকুলির রাজত্ব দেখেছেন, দেখেছেন সুজাউদ্দীনের শাসনকাল। প্রবল প্রতাপশালী বর্গিদের সঙ্গে সমানে টক্কর দিতে দেখেছেন আলিবর্দিকে। নিজামতের শাসনযন্ত্রের সার্বিক অবক্ষয়টা ভয়ানক বেআবরু হয়ে ধরা পড়ছে এঁদের চোখে। সকলে বুঝতে পারছেন মুর্শিদাবাদের গৌরব, ঐতিহ্য সব কিছু ক্রমশ ডুবছে অন্তহীন আঁধারে। এই সংকট থেকে উত্তরণ কার্যত অসম্ভব।
.
ক্লাইভ চেয়েছিলেন রামনারায়ণ, রাজারাম, অচল সিং এরা মিরজাফরকে চাপে রাখুক, তাতে নবাবকে তাঁবে রাখতে সুবিধা কোম্পানির। তবে বাগিপনাহ তিনি চাননি। বিচক্ষণ ক্লাইভ বোঝেন এ ছোঁয়াচে রোগ। এতে গোটা বাংলাজুড়ে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা, কোম্পানির কারবারের ক্ষতি। দূর থেকে ভীতি প্রদর্শন করে বুজদিল মানুষকে তাঁবে রাখা যায়। সুতোর টানে খুশিমতো নাচানো যায়। এ একটা খেলা। কিন্তু ভয়ের বাতাবরণ অসহ্য হয়ে উঠলে ডরপোক মানুষও প্রবল পরাক্রমে ঘুরে দাঁড়ানোর কোশিশ করে। ভীতির কারণকে নির্মূল করতে চায়। সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের সুতো ছিঁড়ে গোটা খেলাটাই বরবাদ হয়ে যেতে পারে।
স্ক্র্যাফটনের চিঠি পড়তে পড়তে চিন্তায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন ক্লাইভ। ফের মনঃসংযোগ করলেন পরের অংশে চোখ বুলিয়ে আঁতকে উঠলেন রীতিমতো।
স্ক্র্যাফটন লিখেছেন, ‘…নবাব ডেভেলপড অ্যা বিটার রিলেশনশিপ উইথ দেওয়ান। ইট ইজ এক্সপোজড টু দ্য নবাব দ্যাট দেওয়ান ইজ ইনভলভড ইন অ্যা কনস্পিরেসি। দেওয়ানকে খুন করার ফন্দি আঁটছে মিরন। রিসেন্টলি হি অ্যাটাকড দেওয়ানঅস রেসিডেন্স…’
চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রাখলেন ক্লাইভ। কুরসি ছেড়ে উঠে পাইপ ঠোঁটে গুঁজে পায়চারি করতে লাগলেন।
মিরন ছোকরা বেওকুফ। থেকে থেকে নানারকম উটকো সমস্যা ডেকে আনছে। তাকে আরও স্পয়েল করছেন রাজবল্লভ, দ্য ওল্ড ফক্স। স্ক্র্যাফটন লিখেছেন, রাজবল্লভের উস্কানিতেই নবাবজাদা ফৌজ নিয়ে রায়দুর্লভের হাভেলিতে হামলা করতে গিয়েছিল।
হাঁটা থামিয়ে নিজের কাজের জায়গায় এসে বসলেন ক্লাইভ। কাগজ টেনে নিয়ে নবাবের উদ্দেশে একটা একটা চিঠির মুসাবিদা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
‘…শুনলাম আপনার পুত্র মিরন ফৌজ নিয়ে হামলা করতে গিয়েছিল দেওয়ানের হাভেলিতে। এসব কী ঘটছে আপনার জমানায়? আমি নবাবজাদার দুঃসাহস দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছি। আপনি সামলান তাকে, নয়তো তার বেওকুফির কারণে তকলিফ বাড়বে আপনার। শক্ত হাতে নিজামতের রাশ ধরুন। কিছুদিনের মধ্যে আমি মুর্শিদাবাদে আসছি।…’
চিঠিটা শেষ করে মুনশিকে ডেকে ক্লাইভ বললেন, ‘চিঠিটা দ্রুত তর্জমা করে দাও।’
‘জি হুজুর। নবাবের একখানা চিঠি এসেছে।’ গুজারেশ করেন নবকৃষ্ণ।
‘কী লিখেছেন?’
‘তুরন্ত একবার মুর্শিদাবাদে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন আপনাকে। বিহার মুলুক নিয়ে তিনি পরেশানিতে পড়েছেন। ওদিকে আবার নিজামতের অন্দরেও কাজিয়া বেঁধেছে।’
ক্লাইভ বললেন, ‘জানি। স্ক্র্যাফটন লিখেছে। কী করা যায় বল তো মুনশি?’
‘ফওরান মুর্শিদাবাদে আপনার একবার যাওয়া দরকার।’
‘আমিও তাই ভাবছি মুনশি। মাই মাইন্ড ইজ রেস্টলেস। কিন্তু এদিককার অবস্থা তো দেখছ। মেনি সোলজারস আর সিক।’
‘যে কয়জন চাঙ্গা আছে তাদের নিয়েই বেরিয়ে পড়ুন হুজুর। বাকিরা না হয় পরে যাবে। আমার মনের মধ্যে কেমন যেন কু গাইছে। বড় কোনও অঘটন ঘটতে পারে।’
‘কী রকম?’
চকিতে মুখ তুলে নবকৃষ্ণর মুখপানে চাইলেন ক্লাইভ।
.
খাদেম হোসেনকে পূর্ণিয়ায় পাঠিয়ে স্বস্তিতে নেই মিরজাফর। মনের মধ্যে শঙ্কা, খাদেম কি পূর্ণিয়ার বিদ্রোহ সামাল দিতে পারবে? না কি অচল সিং-এর সঙ্গে দোস্তি গড়ে তুলে রামনারায়ণের সঙ্গে যোগ দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলবে? মিরজাফরের মন চাইছে এখনই সৈন্য নিয়ে বেরিয়ে পড়ে খাদিম হোসেনের পিছু ধাওয়া করেন। এই পরিকল্পনার আড়ালে রয়েছে অন্য আরেক ফন্দি। খাদেমের উপরে নজরদারি সেরে অতর্কিতে পাটনায় হানা দেওয়া। ক্লাইভের নিষেধে আপাতত পিছিয়ে এলেও নবাব ভুলতে পারছেন না রামনারায়ণকে। তাঁর ধনদৌলত কেড়ে না নিতে পারলে মিরজাফরের শান্তি নেই। কিন্তু ফৌজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ার মতো টাকা কোথায়?
নিজের ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে খানিকটা টাকা বেঁটে দিয়ে পূর্ণিয়া অভিযানের জন্য কিছু সংখ্যক সৈন্যকে রাজি করালেন মিরজাফর খাঁ। কিন্তু পাটনায় গিয়ে রামনারায়ণের মোকাবিলা করতে হলে আরও সৈন্যের প্রয়োজন।
ক্লাইভ সাহেব তার ফৌজ নিয়ে এখনই এসে পড়লে হয়তো সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। অচল সিংয়ের বাগিপনাহের কথা বলে কর্নেল ও তাঁর বাহিনীকে পূর্ণিয়ায় টেনে নিয়ে গিয়ে পরে কিছু একটা যুতসই অজুহাত খাড়া করে তাঁকে পাটনা আক্রমণে হয়তো রাজি করানো যেত। কিন্তু ক্লাইভ সাহেব কবে আসবেন, ঠিক নেই। নবাবের চিঠির জবাবে তিনি লিখেছেন জলদি একবার মুর্শিদাবাদে আসবেন। কিন্তু এখনও তাঁর কলকাতা থেকে রওনা হওয়ার কোনও পয়গাম নেই।
উপায় হাতড়াতে লাগলেন মিরজাফর। মনে পড়ল দামাদ মিরকাশিমের কথা।
পলাশির যুদ্ধের পর রংপুরের ফৌজদারের পদে বহাল হয়েছেন মিরকাশিম। নিজামতের শাসন কাঠামোয় ওই পদ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। মিরনের খায়েশে তাঁকে যেতে হয়েছে রাজধানী থেকে দূরে। জিজাজি রাজধানীর ধারেকাছে থাকুন– চাননি মিরন। তাঁর ভয়, জিজাজি মসনদের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন। সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেফতার করেও তাই নিজামতের চাকরিতে তেমন উন্নতি হল না মিরকাশিমের। তিনি রইলেন সুযোগের অপেক্ষায়। কী করে নবাবকে খুশি করা যায়। অচল সিং– এর বাগিপনাহ তাঁর সামনে এক সুযোগ এনে দিল।
‘পূর্ণিয়ার কহানি শুনেছ নিশ্চয়ই।’ জামাতার উদ্দেশে বললেন নবাব।
‘জি আব্বাহুজুর। দেওয়ানজির গদ্দারির কহানিও শুনেছি।’
নবাবের জরুরি তলব পেয়ে গতকালই রংপুর থেকে মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছেছেন মিরকাশিম।
‘খাদেম হোসেনকে পূর্ণিয়ায় পাঠিয়েছি ঠিকই, তবে তার উপরে সম্পূর্ণ ভরসা নেই আমার।’
কী বলতে চাইছেন নবাব, তার আন্দাজ পাওয়ার কোশিশ করতে থাকেন মিরকাশিম।
‘নিজামতের তোশাখানায় টাকা নেই। তোমার মদত চাই।’
অবাক হন মিরকাশিম। প্রশ্ন করেন, ‘মদত মতলব?’
‘ফৌজ নিয়ে আমি পূর্ণিয়া যেতে চাই। কিন্তু ফৌজিদের বেতন মেটানোর মুরোদ নেই আমার।’
মিরকাশিম শুধোলেন, ‘আপনি অর্থ সাহায্য চাইছেন আব্বাহুজুর?’
আনত চোখে মিরজাফর বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি বেদৌলত। পারবে টাকা জোগাড় করতে?’
‘পারব।’
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মিরজাফরের মুখ। ‘সচ বলছ বেটা?’
পৈতৃক সূত্রে অঢেল বিত্তের অধিকারী হয়েছিলেন মিরকাশিম। শ্বশুরের হাতে তুলে দিলেন নিজের সঞ্চিত অর্থের একটা অংশ। সেই টাকা বেঁটে দিয়ে সেপাইদের পূর্ণিয়া অভিযানে রাজি করালেন মিরজাফর। পূর্ণিয়ার পথে রওনা হওয়ার আগে ক্লাইভের উদ্দেশে পাঠালেন একটা চিঠি।
‘…জনাব আশা করি সহি সালামত, খুশ তবিয়ত আছেন। পূর্ণিয়ার হালত ভালো নয়। আমি ফৌজ নিয়ে রওনা হলাম। গিরিয়ায় ছাউনি গেড়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আপনি ফৌজ নিয়ে তুরন্ত চলে আসুন।…’ সেই সঙ্গে খাদিম হোসেনকেও একটা চিঠি পাঠালেন নবাব। ‘…রাজমহলে অপেক্ষা কর। আমি ফৌজ নিয়ে আসছি।…’
মিরজাফরের পরিকল্পনা রাজমহলে পৌঁছে খাদিম হোসেনের মতিগতি ভালো করে যাচাই করে নেবেন, সব ঠিক থাকলে খাদিম হোসেনকে হুকুম করবেন গঙ্গা পেরিয়ে পূর্ণিয়ায় হামলা করতে। আর ক্লাইভকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ছুটবেন পাটনায়। এক যোগে অচল সিং ও রামনারায়ণকে আক্রমণ করলে দুজনের কেউ কাউকে মদত দিতে পারবে না। বিরাট কাফেলা নিয়ে খোশ মেজাজে পূর্ণিয়ার পথে বেরিয়ে পড়লেন নবাব। ক্লাইভ তখন হুগলি পেরিয়ে দ্রুত গতিতে মুর্শিদাবাদের দিকে এগোচ্ছেন। সে খবর নবাবের কানে পৌঁছয়নি।
.
