২০
চৌকো চৌকো হলদে পাথরের খণ্ড পরপর গেঁথে তৈরি নিরেট দেওয়াল। দুই প্রস্তরখণ্ডের মাঝের বিভাজন রেখা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। দেওয়ালের একটা অংশের উপর নিবদ্ধ মুনির খাঁর দৃষ্টি। তার ডান হাতে ধরা দণ্ডের মাথায় জ্বলছে মশাল। সেই আলো গুপ্তধনের সন্ধানে আসা মানুষগুলোর অতিকায় ছায়া ফেলেছে দেওয়ালে। কাঁপছে আগুনের লালচে শিখা। দেওয়ালের গায়ে কাঁপছে ছায়ার মানুষ। যেন দোজখের একদল প্রেতাত্মা পৈশাচিক লালসা নিয়ে হাজির হয়েছে সিরাজের দৌলতের সন্ধানে।
মুনির খাঁ সামান্য এগিয়ে গিয়ে দেওয়ালের উপর ঝুঁকে পড়ে। মনে হয়, কিছু একটা খুঁজছে সে। যদিও এ জায়গা তার কাছে খুবই পরিচিত, তবুও সে ধন্দে পড়ে। দেওয়ালের গায়ে গাঁথা হাজার হাজার পাথরের খণ্ডের মধ্যে থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তরখণ্ডটিকে কেবল চোখের নজরে চিনে নেওয়া সহজ নয়। চোখের পর্দায় ধরা পড়া ছবি ধোঁকা দেয় মনকে। ইনসানকে বেওকুফ বানানোর জন্য হরেক কিসিমের আনজাম রয়েছে এই ভুলভুলাইয়ার অন্দরে।
দেওয়ালের গায়ে আঙুল ছোঁয়ায় মুনির খাঁ। ক্লাইভের শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি দ্রুততর হয়। গুমোট ভ্যাবসা গরমে তিনি ঘেমে-নেয়ে একসা। লাল শাটিনের লং কোট ঘামে ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছে। কপাল থেকে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে। ঘাম ঝরছে ঘাড় অবধি বিস্তৃত লম্বা চুল থেকেও। তবে শরীরের সব অস্বস্তি ক্লাইভের কাছে এখন তুচ্ছ।
নিজামতের কোষাগার ছেঁচে হতাশ হয়েছিলেন কর্নেল। এত বড় যুদ্ধ জয় হল, কুরসি বদল হল, কিন্তু বাংলা লুঠের কড়ি জেবের ভিতরে ঢুকল কোথায়। লুঠ করবেনই বা কী? নবাব যে প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছেন। তবুও একটা খটকা ছিল ক্লাইভের মনে। গোপনে গচ্ছিত খাজানা কি কোথাও নেই? ভাগ্যদেবী এক্ষেত্রেও তাঁকে বঞ্চিত করেননি। আছে আছে! খাজানা আছে! মুনির খাঁ এর হদিশ জানে। তার জবানে যার মূল্য করিব চার কোটি টাকা।
রবার্ট ক্লাইভের মনে নতুন জোশ এনেছে এই গুপ্তধন প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা। প্রবল উত্তেজনায় তিনি কাঁপছেন। তাঁর দু’চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মুনির খাঁর উপরে। হাতের কোমল স্পর্শে সে জরিপ করছে দেওয়ালের গায়ে গাঁথা পাথরগুলোকে। কিন্তু কেন?
মিরজাফরের মেদবহুল শরীরটা আইঢাই করছে গরমে। চোখ জ্বলছে মশালের আগুনের ধোঁয়ায়। মুনির খাঁর কাণ্ডকারখানা দেখে তিনি রীতিমতো বিরক্ত। করছে কী মুনির খাঁ? গুপ্তধনের হদিশ দেওয়ার নামে দেওয়ালের গায়ে নাজুক ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে চলেছে? এসব সকলকে উল্লু বানানোর তরিকা না তো? মতলবটা কী তার?
ওমর বেগ অবাক চোখে দেখছেন মুনির খাঁর কীর্তিকলাপ। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না।
নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের দু’জোড়া চোখ বিস্ফারিত। মনে মনে তাঁরা স্মরণ করছেন ইষ্ট দেবতাকে। জয় গোবিন্দ! জয় রাধামাধব। জয় গোপীনাথ! মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করো ঠাকুর।
ধমকের সুরে মুনির খাঁর উদ্দেশে মিরজাফর বলে ওঠেন, ‘কেয়া কর রহা হ্যায়?’
ঘুরে তাকিয়ে নবাবকে তসলিম জানিয়ে মুনির খাঁ বলে, ‘পাত্থর তালাশ করছি হুজুর।’
‘পাত্থর? মতলব?’
মুনির খাঁ বলে, ‘একটা পাত্থর আশপাশ কে পাত্থরোঁ কি তুলনা মে থোড়া চিকনা হ্যায়। স্রেফ চোখের নজরে আন্দাজ পাওয়া মুশকিল। হাথ কি স্পর্শ সে সামঝা যাতা হ্যায়।’
‘বখওয়াস মাত করো। বেতমিজ কাঁহিকা।’ ধমকে ওঠেন মিরজাফর।
ক্লাইভ ফোঁস করে ওঠেন, ‘ডোন্ট ডিসটার্ব হিম।’ কর্নেলের গলায় বিরক্তির সুর। চুপসে যান মিরজাফর।
‘খাজানা কাঁহা হ্যায়? হোয়্যার ইজ দ্য ট্রেজার?’ মুনির খাঁর উদ্দেশে প্রশ্ন করেন ক্লাইভ।
‘দিবার কি পিছে। এক গুপ্ত কামরে মে।’ এই বলে ফের কাজে মগ্ন হয়ে পড়ে মুনির খাঁ। সকলকে সহসা চমকে দিয়ে হাতের চাপে বিশেষ কায়দায় একটা চৌকো প্রস্তরখণ্ড দেওয়াল থেকে সে খুলে নেয়। উত্তেজনায় ও বিস্ময়ে সকলেরই শ্বাস প্রায় রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম।
মশালের আলোয় দেখা যায় দেওয়ালের গায়ে চাবি ঢোকানোর একটা ছিদ্রপথ। উল্লসিত হয়ে ওঠেন নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। নেশার ঘোরে এমনই বলেছিল মুনির খাঁ। তাঁর ওই জবান কোনও ধোঁকাবাজি নয়। নবকৃষ্ণ আপনমনেই গুনগুন করে ওঠেন, ‘হে কৃষ্ণ, করুণাসিন্ধু, দীনবন্ধু…!’
এবারে দেওয়ালের গায়ে হাত দিয়ে জরিপ করতে করতে সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ফের থমকে দাঁড়ায় মুনির খাঁ।
‘মশালটা একটু ধরবেন বাবুজি?’
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মুনির খাঁর হাত থেকে মশালটা নিলেন নবকৃষ্ণ। কিছুক্ষণ কসরত করার পর দু’হাত দিয়ে ফের আরেকটা প্রস্তরখণ্ড দেওয়াল থেকে খুলে নিয়ে তার আড়াল থেকে মুনির খাঁ বের করে আনে প্রায় একবিঘত লম্বা লোহার চাবি। কর্নেল ক্লাইভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুনির খাঁ বলল, ‘আসুন এবারে আপনাকে গুপ্ত কামরায় নিয়ে যাই।’
দেওয়ালের গায়ে ছিদ্রপথে চাবিটা গলিয়ে জোরে একটা মোচড় দেয় মুনির খাঁ। ঘড়াং করে একটা শব্দ হয়। বন্ধ ঘরের হুড়কো খোলার পরিচিত আওয়াজ। এবারে মুনির খাঁ দেহের সর্বশক্তি দিয়ে ঠ্যালা দেয় দেওয়ালের গায়ে। পাথরের দরজাটা ঘড়-ঘড়, ঘড়-ঘড় শব্দে খুলে যায়। মনহুস আওয়াজ। বুক কেঁপে ওঠে মিরজাফরের। ভুলভুলাইয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে সেই আওয়াজ প্রতিফলিত হয়ে যেন একটা গোঙানির সৃষ্টি করে। কেউ যেন কেঁদে উঠল জহমতে, যন্ত্রণায়।
কক্ষটা বেশ বড়সড়। ভিতরে জমাট অন্ধকার। মশাল হাতে ভিতরে প্রবেশ করে রামচাঁদ। তার পিছনে নবকৃষ্ণ। এদের পিছনে ক্লাইভ, মিরজাফর ও ওমর বেগ।
মশালের আলোয় বিস্ফারিত চোখে ক্লাইভ দেখলেন ঘরের তিন দিকে দেওয়ালের গায়ে তাকের উপরে ও মেঝেতে সাজানো রয়েছে অনেকগুলো বড় বড় রুপোর কলসি। সবগুলো প্রায় একই আকারের। প্রত্যেকটার মুখে রয়েছে রুপোর ঢাকনা। ছুটে গিয়ে রামচাঁদের হাত থেকে জ্বলন্ত মশালের দণ্ডটা কেড়ে নিয়ে একটা কলসির মুখের ঢাকনা সরিয়ে ক্লাইভ দেখলেন, কলসি একেবারে মোহরে ঠাসা। খুশি ঝলকায় ক্লাইভের মুখে। তাঁর চোখের ইশারায় কাজে লেগে পড়েন রামচাঁদ, নবকৃষ্ণ ও ওমর বেগ।
দেখা গেল, সব কলসিই মোহরে ভরা। হিসেব নিকেষের ঝঞ্ঝাট নেই। একটা কলসিতে কত টাকার মোহর রয়েছে তার সহি আন্দাজ পেলেই সরল পাটিগণিতের নিয়মে বের করে নেওয়া যাবে কত টাকার সম্পদ রয়েছে ঘরে। ক্লাইভের হুকুমে একটা মোহরের কলসি পাথরের মেঝের উপরে উপুড় করে দেয় মুনির খাঁ। ঝনঝনাৎ ঝনঝনাৎ শব্দে স্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে যায়। মশালের আলোয় ঝলমল করে ওঠে সোনার হলদে রং।
সকলকে চমকে দিয়ে হঠাৎই সশব্দে হেসে ওঠেন ক্লাইভ। সে হাসিতে লোভ-লালসা চরিতার্থ হওয়ার সুর বড় কুৎসিত ভাবে বাজে। হাসি থামিয়ে মুনির খাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়ে ক্লাইভ বলে ওঠেন, ‘সবাশ। ওয়েলডান।’
চটপট এক কলসি মোহরের গোনাগুনতি সেরে ফেলেন নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। দেখা যায় এক এক মোহরের বাজার মূল্য করিব বিশ হাজার টাকা। মুনির খাঁ একটু বাড়িয়েই বলেছিল। এই ঘরে যে পরিমাণ মোহর রয়েছে তার টাকার অংকে তার মূল্য দেড় কোটির বেশি হবে না। তাই বা কম কী? কর্নেল বলেছেন, এই খাজানার একটা ভাগ তাঁদের দেবেন। টাকা, প্রতিপত্তি, অনাস্বাদিত সুখের কল্পনায় মাসে ষাট টাকা বেতন পাওয়া কোম্পানির দুই নেটিভ কর্মচারী, নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ আবেগে ও আনন্দে চোখে জল এসে যায়।
ক্লাইভ এগিয়ে এসে নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের পিঠে হাত রাখেন।
শশব্যস্ত হয়ে তাঁরা ক্লাইভের পায়ে লুটিয়ে পড়েন।
ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ নিয়ে ক্লাইভ বলেন, ‘ইয়েস। ইয়েস। ইউ উইল বি অ্যাডেকোয়েটলি রেমুনারেটেড।’
আবেগের চোখের জল মুছে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আপনিই আমাদের গোবিন্দ। আপনিই রাধামাধব। অন্তরের দেবতা। প্রাণের ঠাকুর। আমরা আপনার দাসানুদাস।’
ক্লাইভ বললেন, ‘চলো এবারে যাওয়া যাক। আমাদের শেয়ারটা নবাব সেক্রেটলি মোরাদবাগে পৌঁছে দেবেন।’
.
ভোর হয়ে এল। ফিকে হতে শুরু করেছে আকাশের কালি। ঘুমিয়ে আছে মুর্শিদাবাদ-হিরাঝিল-মোরাদবাগের প্যালেস। কেবল পথের ধারের ঝাঁকড়া গাছগুলোতে জেগে উঠেছে পাখিরা। মোরাদবাগ প্যালেসের পাশে কোম্পানির সেনা ছাউনি থেকে কোম্পানির ঘড়িয়াল ঘণ্টা পিটিয়ে জানাচ্ছে ভোর চারটে বাজল। গত রাতে কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল হিরাঝিল প্যালেসের ভুলভুলাইয়ার অন্দরে, মাত্র কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানতেও পারল না।
এই কাকভোরে মোরাদবাগ প্যালেস অভিমুখে চলেছে এক পর্দা ঢাকা ডুলি। সওয়ারিকে দ্রুত তাঁর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডুলিবাহকেরা ব্যস্ততার সঙ্গে ছুটছে। সওয়ারি কর্নেল ক্লাইভ। চুপিসারে হিরাঝিল প্যালেস থেকে মোরাদবাগ প্যালেসে তিনি ফিরে চলেছেন। ডুলির খানিকটা পিছনে দ্রুত গতিতে হাঁটছেন রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ।
হিরাঝিল প্যালেসে লুক্কায়িত গোপন সম্পদের সন্ধান ক্লাইভকে বলে দিয়ে নবাব মিরজাফর খাঁকে রুষ্ট করেছে মুনির খাঁ। নবাবের চোখে সে দেখেছে তার প্রতি তীব্র নফরতি। বাগে পেলেই মিরজাফর তাকে কোতল করবেন—একথা বিলক্ষণ বুঝতে পারছে মুনির খাঁ। কর্নেল ক্লাইভই এখন তার একমাত্র ভরসার স্থল। কর্নেল বলেছেন ইনাম দেবেন। কলকাতায় বসবাসের বন্দোবস্ত করে দেবেন। সেই আশায় নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের পিছনে খানিকটা তফাতে সেও হেঁটে চলেছে মোরাদবাগ প্যালেস অভিমুখে। দিন কয়েকের মধ্যেই নাকি শ’দুয়েক নৌকা মুর্শিদাবাদের দৌলত নিয়ে পাড়ি দেবে কলকাতায়। কর্নেলের কৃপায় একখানা নৌকোয় চড়ে বসতে পারলেই হল। মুনির খাঁর কাছে মুর্শিদাবাদ আর নিরাপদ নয়।
নবকৃষ্ণর দু’চোখে এখনও যেন ঘোর লেগে রয়েছে। একই অবস্থা রামচাঁদেরও। প্রায় অন্ধকারে অন্যমনস্ক হয়ে পথ হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মধ্যেই হোঁচট খাচ্ছেন দু’জনে। হিরাঝিল প্যালেস থেকে ডুলিতে ওঠার আগে ইনাম বাবদ যে টাকা দেওয়ার কথা ক্লাইভ বলেছেন সেটা চমকে ওঠার মতো। এতটা তাঁরা স্বপ্নেও আশা করেননি। মাথা পিছু দ-শ লা-খ টাকা! হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন রামচাঁদ। বিষম খাওয়ার জোগাড় হয়েছিল নবকৃষ্ণর। বলছেন কী কর্নেল! তারা ঠিক শুনছেন তো কানে?
সেই থেকে একের পর এক সুখের তসবির নেচে চলেছে নবকৃষ্ণর চোখের পর্দায়। কলকাতায় গিয়ে বিরাট একটা কোঠাবাড়ি হাঁকাবেন তিনি। গোবিন্দপুরের গোলপাতায় ছাওয়া জীর্ণ কুটির ছেড়ে পরিবারসহ চলে আসবেন নতুন কোঠাবাড়িতে। সুতানুটিতে যেখানে শোভারাম বসাক বাজার স্থাপন করেছেন, তার পাশেই চমৎকার বেশ কয়েক বিঘা জায়গা নবকৃষ্ণ মনে মনে পছন্দ করে রেখেছেন। আশপাশটা বেশ জমজমাট। কোঠাবাড়ি হবে, নাটমন্দির হবে, দেবালয় গড়বেন। প্রাণের ঠাকুর গোবিন্দদেবকে স্থাপন করবেন দেবালয়ে। এমন জাঁক করে দুর্গোৎসব করবেন যে তামাম কলকাতা হাঁ হয়ে যাবে। ক্রমশ জলুস হারাচ্ছে মুর্শিদাবাদ। আগামী দিনে রাজধানী শহর হয়ে উঠবে কলকাতা। একথা দিব্যি বুঝতে পারছেন নবকৃষ্ণ। কড়ির জোরে তিনি সেই কলকাতায় হিন্দুসমাজের মাথা হয়ে উঠতে চান। সমাজ চলবে তার অঙ্গুলিহেলনে। হিন্দুসমাজের কর্তা হিসেবে যে জায়গাটা এখন দখল করে আছেন নদিয়াধিপতি কৃষ্ণচন্দ্র, সেই জায়গাটা দখল করবেন তিনি। হয়ে উঠবেন কলকাতার অলিখিত রাজা। কেউ কেউ হয়তো বলবে ডাকাতি করে বিত্তবান হয়েছেন নব মুনশি। বলুক। তাতে নবকৃষ্ণর কিছু এসে যায় না। সোজা পথে চলে এ দুনিয়ায় কেই বা কবে বিত্তবান হয়েছে।
হঠাৎই বুনো ঝোপ ভেদ করে ছুটে এসে পথ অতিক্রম করল বিরাটাকৃতির একটা দাঁতাল শুয়োর। শিউরে উঠলেন নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। একেবারে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। ছুটে এসে ঢুঁ মারলে একেবারে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিত। এই চমক কাটিয়ে ওঠার আগেই ফের শিহরন। নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের কানে ভেসে এল একটা গুলির শব্দ। খুবই পরিচিত আওয়াজ। গোরা পল্টনদের হাতিয়ার ফ্লিন্টলক রাইফেল থেকে গুলি ছোড়ার শব্দ। সেই সঙ্গে পিছন থেকে ভেসে এল মানব কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ। মুনির খাঁর গলার আওয়াজ। নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ চমকে গিয়ে পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখেন পথের উপর লুটিয়ে পড়েছে মুনির খাঁ। ছুটে গিয়ে তার উপরে ঝুকে পড়লেন নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। মাটি ভেসে যাচ্ছে উষ্ণ রক্তে। মুনির খাঁর চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বুলেট বিদ্ধ হয়েছে তার পিঠে।
মুনির খাঁ কোনও রকমে বলে, ‘আমি গদ্দার বাবুজি। মনিবের দৌলত আমি তুলে দিলাম তার দুশমনদের হাতে। এই ইনামই আমার পাওয়ার কথা। আল্লা রহেম করুন আ–’ কথা শেষ করতে পারল না মুনির খাঁ। দেহটা নিথর হয়ে গেল। নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের কানে সহসা ভেসে এল ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। সে আওয়াজ নিমেষে মিলিয়ে গেল দূরে। নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ বুঝলেন কাজ সমাধা করে পালিয়ে গেল ঘাতক।
গুলির শব্দে শিহরিত চিড়িয়ার দল ডানা ঝাপটে পাক খাচ্ছে আকাশে। অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে কর্নেলের ডুলি। পথে পড়ে থাকল মুনির খাঁর নিষ্প্রাণ দেহ। মোরাদবাগ প্যালেসের সদর দেউড়ি খুব দূরে নয়। সেই অভিমুখে ছুটতে শুরু করেন নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। দুজনের মনের মধ্যে তখন পাক খাচ্ছে একই ভাবনা—‘যাক! আপদ বিদায় হল।’
.
গতাসু হয়েছেন ময়মনসিংহের জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী। পারলৌকিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন হয়েছে, তা প্রায় পক্ষকাল হয়ে গেল। বিশাল জমিদারির উত্তরাধিকার বর্তেছে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র কৃষ্ণকিশোরের উপর। পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক কৃষ্ণকিশোরের কাঁধে আচমকাই এসে পড়েছে বিশাল দায়িত্ব। একদিকে বিধবা মা, কনিষ্ঠ ভ্রাতা কৃষ্ণগোপাল ও অজস্র জ্ঞাতি, আত্মীয়স্বজন নিয়ে বিরাট একান্নবর্তী পরিবারের দায়ভার ও অন্য দিকে বিশাল এলাকা দেখভাল করা—এই দুই নিয়ে হঠাৎই ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষ্ণকিশোর। প্রাতরাশ সেরে সেরেস্তায় বসে খাজনা আদায় বিষয়ে দেওয়ানের কাছ থেকে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন তিনি। হিসেবের খাতায় চোখ বুলিয়ে দেখেন, ব্যায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে সেই তুলনায় আদায়পত্তর আশাপ্রদ নয়।
কৃষ্ণকিশোরের ভ্রু-যুগল কুঞ্চিত। কৈফিয়ৎ চেয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন দেওয়ানকে।
কৃষ্ণগোপালের সামনে জোড়হাত হয়ে দাঁড়িয়ে দেওয়ান শিবনারায়ণ বললেন, ‘হুজুর গত বছরখানেক ধরে দেশ অশান্ত, তার উপরে বড়কর্তামশায় ছিলেন সিরাজদ্দৌলা ও দেওয়ান মোহনলালের ঘনিষ্ঠ। হাওয়া ওই শিবিরের পক্ষে প্রতিকূল বুঝে কাজে ঢিল দিয়েছিল কর্মচারীরা। তাই খাজনা আদায়ে কিছুটা ফাঁকি পড়েছে। এখন সব ফয়সালা হয়ে গিয়েছে। মিরজাফর খাঁ মসনদে বসেছেন। আপনি নতুন নবাবের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে এসেছেন। এবারে দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এই উত্তরে খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন না কৃষ্ণকিশোর।
‘বাবামশায়ের পরিচিত?’ কৃষ্ণকিশোরের ভ্রুযুগল ফের কুঞ্চিত হয়।
‘তাই তো বললে।’
সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি কৃষ্ণগোপালের ভক্তি শ্রদ্ধা বরাবরই খুব বেশি। তার উপরে বিশেষ একটি সমস্যা ছায়া ফেলেছে গোটা পরিবারের উপরে। সময়টা ভালো যাচ্ছে না। কৃষ্ণকিশোরের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন চঞ্চল হয়ে উঠল। হঠাৎ এক সন্ন্যাসীর আগমনের হেতু কোনও দৈব অনুগ্রহ নয়তো? হিসেবের খাতা বন্ধ করে দেওয়ানকে বললেন, ‘আপনি এখন আসুন। খাজনা আদায় বিষয়ে পরে আলোচনা করব আপনার সঙ্গে।’
‘যে আজ্ঞে।’ শিবনারায়ণ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল।
ভৃত্যের উদ্দেশে কৃষ্ণকিশোর বললেন, ‘সন্ন্যাসীকে এখানেই নিয়ে এসো।’
খানিকবাদে কৃষ্ণকিশোরের সমুখে এসে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী। মাথায় জটা। মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। গৌরবর্ণ দেহ। সুন্দর দুই চোখে দিব্যভাব প্রকট। সন্ন্যাসীর এক হাতে ত্রিশূল, আরেক হাতে কমণ্ডলু। পরণে রক্তবর্ণের ধুতি। কাঁধের দুপাশ থেকে ঝুলছে লাল উত্তরীয়। লোমশ বুক। পেশিবহুল শক্তসমর্থ চেহারা। মানুষটি দীর্ঘদেহী। চেহারার মধ্যে রয়েছে প্রখর ব্যক্তিত্বের ছাপ।
আসন ছেড়ে উঠে এসে ভূমিষ্ঠ হয়ে সন্ন্যাসীকে প্রণাম করেন কৃষ্ণকিশোর।
তাঁকে আশীর্বাদ করে সন্ন্যাসী বলেন, ‘দীর্ঘজীবী হও বাবা। চিরসুখী হও।’
‘আপনি?’
‘তুমি চিনবে না আমাকে। তোমার পিতৃদেবের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। এখানে এসে শুনলাম তিনি গত হয়েছেন।’
‘হ্যাঁ। মাস দেড়েক হল সন্ন্যাস রোগে হঠাৎই তিনি—তা আপনি কোত্থেকে আসছেন?’
‘কাশী আমার সাধনপীঠ। লোকে আমাকে মহানন্দ স্বামী বলে জানে। একটি বিশেষ প্রয়োজনে আমি তোমার কাছে এসেছি।’
‘বেশ তো। পরে শুনব আপনার কথা। আগে স্নানাহার করুন। বিশ্রাম নিন।’
‘না বাবা। হাতে সময় আমার কম। কাজের কথাটা সেরেই আমি চলে যাব।’
ফরাসের উপরে উপবিষ্ট হলেন সন্ন্যাসী। তাঁর মুখোমুখি বসলেন কৃষ্ণকিশোর।
ভৃত্য এসে পাথরের গেলাসে করে বেলের শরবত দিয়ে গেল। সঙ্গে পিতলের রেকাবিতে ফল ও মণ্ডা। সত্যিই ক্ষুধার্ত ছিলেন মহানন্দ স্বামী। নিমেষে ফলভর্তি রেকাবি শূন্য করে দিলেন। এক চুমুকে শরবত শেষ করে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি বর্তমানে তোমারই জমিদারির অন্তর্ভুক্ত আমহাটি গ্রাম থেকে আসছি।’
‘আমহাটি? সে তো অনেক দূর। এতটা পথ পায়ে হেঁটে এলেন?’
মুচকি হেসে মহানন্দ বললেন, ‘পদব্রজেই তো সন্ন্যাসীকে ভ্রমণ করতে হয়।’
‘বলুন আপনার কী সেবা করতে পারি?’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘আমহাটি নিবাসী বিনোদ রায় আমার বিশেষ পরিচিত। পূজারি ব্রাহ্মণ। খুবই দরিদ্র মানুষ। অত্যন্ত সুলক্ষ্মণযুক্ত একটি শিশুপুত্রকে দেখলাম তার গৃহে। নাম শ্রীমন্ত। বিনোদের দ্বিতীয় পুত্র। রাজা হওয়ার যোগ আছে ছেলেটির হাতে।’
কৃষ্ণকিশোর গভীর মনোযোগের সঙ্গে চেয়ে আছেন মহানন্দ স্বামীর মুখপানে। কী বলতে চাইছেন সন্ন্যাসী, তার আন্দাজ পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সন্ন্যাসী বলে চললেন, ‘বিনোদের অভাবের সংসার। বড় কষ্ট। শিশুপুত্রটির যত্নাত্তি করতে পারে না ঠিক মতো। কোথা থেকে কীই বা করবে সে? দু’বেলা যে তাদের ভালো করে আহারই জোটে না। কী যে সুদর্শন শিশুপুত্রটি, তুমি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না। অবিকল যেন যশোদানন্দন। কোনও বিত্তবান মানুষ যদি শিশুপুত্রটিকে দত্তক নেয় তবে খুবই উপকৃত হবে বিনোদ। তোমার পিতৃদেবের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল জেনে আমার কাছে বিনোদ তার মনের বাসনা খুলে বলেছে। আমারও বড় মায়া পড়ে গিয়েছে শিশুটির উপরে। কোনও বড় বংশে লালিতপালিত হলে একদিন সে সেই বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তোমার পিতৃদেব বেঁচে থাকলে তার কাছেই আমি দরবার করতাম।’
সন্ন্যাসী এবারে কৃষ্ণকিশোরের হাত দুটি ধরে বলেন, ‘যদি তুমি শিশুটিকে দত্তক নাও তো খুবই খুশি হব।’
কৃষ্ণকিশোর সন্ন্যাসীর চরণ স্পর্শ করে আবেগতাড়িত গলায় বলে ওঠেন, ‘এ নির্ঘাৎ দৈব আশীর্বাদ। আপনি সাক্ষাৎ মহেশ্বরের দূত। না হলে যে বিষয়ে ভেবে ভেবে আমরা আকুল হয়ে পড়েছি, তার সমাধান সূত্র নিয়ে আপনি হঠাৎ এ ভাবে হাজির হবেন কেন?’
‘সত্যিই শিশুপুত্রটিকে দত্তক নিতে চাও তুমি?’ মহানন্দ স্বামীর কণ্ঠে উপচে পড়ে খুশি।
