১
মুর্শিদাবাদ থেকে ‘ভগবানগোলা। দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তবু যেন অনন্ত পথ। কিছুতেই আর ফুরোতে চায় না। মনের মধ্যে সীমাহীন উৎকণ্ঠা নিয়ে সামনের দিকে চেয়ে আছেন সিরাজদ্দৌলা, পরাজিত, পলাতক নবাব। আলিশান দুই বলদের মসৃণ গায়ে ঘনঘন ছিপটির আঘাত করছে গাড়োয়ান। সে আঘাতে যেন ঝরে পড়ছে আর্তি—ছোট্ ছোট্। আরও জোরে ছোট্ বেটা। জোরসে চল্।
নিরীহ প্রাণীদুটিও যেন অনুভব করছে এই অভিযানের গুরুত্ব। এ তাদের মনিবের জিন্দেগি বনাম মওতের সওয়াল। নিরাপদে মানুষটাকে পৌঁছে দিতে হবে ভগবানগোলায়। বলদদুটির কোশিশে কোনও খামতি নেই। অবলা চারপেয়ে জীব নিমকহারামি করে না। তারা ক্রমশ গতি বাড়িয়ে চলেছে। ছাপিয়ে যেতে চাইছে নিজেদের জৈবিক সাধ্যকে। অন্ধকারের চাদর ফুঁড়ে আঁধির মতো ছুটে চলেছে সিরাজদ্দৌলার গো-গাড়ি। লোহার বেড় দেওয়া অতিকায় চারটি কাঠের চাকার একটানা গোঙানিতে রাতের স্তব্ধতা ভেঙে চৌচির।
আকাশ ঘন কালো। থেকে থেকে গুমরে উঠছে মেঘ। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভাঙাচোরা পথ। মাঝে মাঝে খানাখন্দে পড়ে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে গাড়ি। কেঁপে উঠছে থরথর করে। এই বুঝি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল গো-গাড়ি। পণ্ড হল যাত্রা। থেকে থেকে শিউরে উঠছে লুৎফুন্নেসা—সুখে-দুঃখে, হর্ষে-বিষাদে, আফতে-আশরতে সে-ই সিরাজের একমাত্র সহচরী। শরিয়তি মতে সিরাজের সঙ্গে লুৎফার শাদি না হলেও সে-ই সিরাজের পহেলা বেগম। কোলের মধ্যে তিন বছরের উম্মেসায়েরাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে লুৎফা, গাড়ির তীব্র ঝাঁকুনিতে নবাবজাদি কোল থেকে যেন ছিটকে না পড়ে। উম্মেসায়েরা ঘুমিয়ে কাদা।
ভয়ানক অস্থির হয়ে পড়লেন সিরাজদ্দৌলা। আর কতদূর ভগবানগোলা? কতটা পথ এলেন, কোথায় এলেন, তার কোনও আন্দাজ পাচ্ছেন না পলাতক নবাব। বাইরে সূচিভেদ্য অন্ধকার। তবুও থেকে থেকেই তিনি বাইরের দিকে তাকাচ্ছেন। ভগবানগোলা বন্দর এলাকা। কাছাকাছি এসে পড়লে আলোর দেখা মিলবে। কিন্তু কোথায় আলো?
মনের অবচেতনে সিরাজ যেন শুনতে পাচ্ছেন, ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। মনে হচ্ছে পিছনে ধেয়ে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার। প্রবল আতঙ্কে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন পানে চাইলেন। উৎকর্ণ হয়ে উঠলেন। না—এ তাঁর মনের ভুল। পিছনে কেউ নেই। শুধু পাহাড়ের মতো পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে একরাশ কালো অন্ধকার। সেই অন্ধকারের আড়ালে পড়ে রয়েছে হিরাঝিল, চেহেল সেতুন, মোতিঝিল, মোরাদবাগ প্যালেস, চকবাজার, রাজধানী মুর্শিদাবাদ। সিরাজদ্দৌলার অতীত জীবনের যাবতীয় জলুস, রোশনাই, খুশিয়ারি। সব মিলিয়ে রংদার এক দুনিয়া।
সেই দুনিয়া সহসা বেরং হয়ে গেল ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির প্রান্তরে কয়েক ঘণ্টার এক লড়াইয়ে। তারপরে অতলান্ত অন্ধকার।
পলাশির যুদ্ধে পরাজিত নবাব চুপিসারে পালিয়ে যাচ্ছেন মুর্শিদাবাদ থেকে।
বৃষ্টিভেজা নিঝুম রাতের বুক চিরে চলেছে গো-গাড়ি। চার চাকার একটানা কর্কশ যান্ত্রিক শব্দ যেন সিরাজের অন্তরের যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করে চলেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ভাগ্যহত নবাব। তাঁর হাতের উপরে হাত রাখে লুৎফা। প্রগাঢ় ভালোবাসার উষ্ণ স্পর্শ। বেগমের মুখের দিকে তাকালেন সিরাজ। দছমাল দিয়ে নবাবের কপালের শ্বেদবিন্দু মুছিয়ে দেয় লুৎফা। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা চিরাগের আলোয় লুৎফার মুখটা বড় করুণ দেখায়। সিরাজের চোখ যায় ঘুমন্ত উম্মেসায়েরার দিকে। পাকিজা নিষ্পাপ মুখ। বেচারি নবাবজাদি। সিরাজের বুকটা সহসা গভীর বেদনায় মুচড়ে ওঠে। চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে।
উম্মেসায়েরার নরম দেহে পরম স্নেহের সঙ্গে হাত বোলাতে থাকেন নবাব। একদৃষ্টে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। এই শিশুকন্যার দেহে বইছে তাঁর খুন। তাঁর একমাত্র শাদি করা বেগম উমাদাত উন্নেসার গর্ভজাত উম্মেসায়েরা। এই বদকিসমতির দিনে সিরাজের সঙ্গী হতে চায়নি উমাদাত উন্নেসা। মেয়েকে সে তুলে দিয়েছে লুৎফার কোলে। নবাবের যদি নসিব ফেরে তবে নবাবজাদিরও নসিব ফিরবে। এই আশায়।
ভয়ানক আফশোস এখন সিরাজের মনে। ভুল ভুল। সবটাই তাঁর ভুল। আজকের এই গরদিশের জন্য তো তিনিই দায়ী। তাঁর ভাগ্য আজ অন্যরকম হতে পারত। ভাগীরথীর জলে তিনি ডুবিয়ে মারতে পারতেন ইংরেজদের। সব বরবাদ হয়ে গেল তাঁর নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য। কেন শেষ বিকেলে অচানক থামিয়ে দিলেন লড়াই? কেন শুনলেন না মোহনলালের কথা? কেন মোহনলালের উপর ভরসা না করে ভরসা রাখলেন মিরজাফরের জবানে। এতেই তো শেষ হয়ে গেল সব। প্রায় জিতে যাওয়া লড়াইকে তিনি ফেলে এলেন পলাশির প্রান্তরে। আর কৌশলে বাজিমাত করল ইংরেজরা।
তবুও হতাশার গহীন আঁধারে আলোর তলাশ করেন সিরাজদ্দৌলা। স্বপ্ন ভেসে বেড়ায় দু’চোখে। ফের তিনি লড়াই করবেন। নসিবের চাকা ঘোরাবেন। নবাব-বাদশাদের জীবনে নসিব তো ঘনঘন ঘর বদলায়। হিন্দুস্থানের ইতিহাসে এর নমুনা বড় একটা কম নেই। তখতে-তাউস হারিয়েও ফের নিজের তাগদে প্রবল ভাবে ফিরে এসেছিলেন হুমায়ূন বাদশা। আরজুমান্দ বেগম ও মাসুম বাচ্চাদের নিয়ে দিনের পর দিন বাগি জীবন কাটিয়ে, শাহি ফৌজের সঙ্গে লড়ে নিজের তাগদে তখতে বসেছিলেন শাজাহান। তিনি কি পারবেন না ফের সুবে বাংলার মসনদ দখল করতে?
মরীচিকা আশা ঘুরে বেড়ায় বুকে। পাটনার নায়েব রামনারায়ণ তাঁর একান্ত অনুগত। পাটনা গিয়ে রামনারায়ণের মদতে তিনি ফের এক জবরদস্ত ফৌজ গড়ে তুলবেন। তাছাড়া আছেন জাঁ ল। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই বাঁধতে চলেছে একথা জানিয়ে ফৌজসহ তুরন্ত মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছনোর জন্য পলাশির যুদ্ধের ঠিক আগে তিনি চিঠি লিখেছিলেন ল-সাহেবকে। তিনি হয়তো অনেকটাই এগিয়ে এসেছেন। হয়তো পথেই মোলাকাত হয়ে যাবে ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে। তারপর তিনি নিরাপদ, নিশ্চিন্ত। ভাবতে থাকেন সিরাজ। তাঁর নাগাল পাবে না মিরজাফর। কয়েক মাসের মধ্যেই বড়সড় ফৌজ নিয়ে তুফান হয়ে মুর্শিদাবাদের উপর আছড়ে পড়বেন সিরাজদ্দৌলা। ঘামাসান লড়াই করে ফের দখল করবেন বাংলার মসনদ, হিরাঝিল, চেহেল সেতুন, মোতিঝিল, মোরাদবাগ প্যালেস। তারপর ইংরেজদের দরিয়ার পানিতে ডুবিয়ে মারবেন। রেয়াত করবেন না বেইমানদের। রংদার খোয়াবে চোখদুটো চকচক করে ওঠে।
তবে এই চিন্তার সূত্র ছিন্ন হয়ে যায় অচিরেই। দূরে বিন্দু বিন্দু আলো চোখের পর্দায় ভেসে উঠতেই সচকিত হয়ে ওঠেন সিরাজদ্দৌলা। এ আলো ভগবানগোলা বন্দরের প্রাকারের উপরে জ্বলতে থাকা মশালের। কোনও ভুল নেই।
একদিকে ভাগীরথী আরেকদিকে জলঙ্গি। এই দুই নদী ছাড়া ভগবানগোলা বন্দর পরিখা ও কাঠের মজবুত প্রাকার দিয়ে ঘেরা। বন্দর এলাকায় প্রবেশের মুখে রয়েছে মস্ত দরওয়াজা। এই বন্দর পাহারা দেয় নবাবের নৌসেনা। জাহাজঘাটায় নোঙর ফেলে থাকে নবাবের নওয়ারা। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে রেশম, নীল, শস্যের ব্যবসা জমজমাট। এর জলুসের কাছে কাশিমবাজার ম্লান হয়ে যায়। শুধু শস্য রপ্তানি থেকেই ভগবানগোলা বন্দরের আয় হয় বছরে তিন লাখ টাকা।
বন্দরে প্রবেশের মুখে জায়গায় জায়গায় মজুত সশস্ত্র ঘোড়সওয়ার বাহিনী। এ বাহিনী সিরাজদ্দৌলার একান্ত অনুগত। সিরাজের গো-গাড়ি পরিখার কাছে পৌঁছতেই সশব্দে নেমে এল কাঠের পাটাতন। সেতু পেরিয়ে বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সিরাজদ্দৌলা। ঘাটে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে নৌকো। হুঁশিয়ার হয়ে রয়েছে মাঝিমাল্লারা।
পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় হয়েছে। ভগবানগোলা বন্দর থেকে রাজমহলের দিকে পালিয়ে যাবেন বেইজ্জত নবাব– আগেই নওয়ারার দারোগা আবদুল করিমের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিয়েছে নিজামতের এক বিশ্বস্ত কাসিদ । এ খবর গোপন রেখেছে আবদুল। আজ রাতে খুব বিশ্বস্ত কিছু সেপাই ছাড়া বাকি সবাইকে তিনি কাজ থেকে ছুটি দিয়েছেন। ভগবানগোলা বন্দর থেকে নবাবের পলায়নের খবর বড় একটা যেন জানাজানি না হয়।
আলিবর্দির আমলের শেষ দিকে সিরাজদ্দৌলার সুপারিশে নিজামতের নোকরিতে আবদুলের যোগদান। সিরাজের প্রতি তার আনুগত্য অকৃত্রিম। গো-গাড়ি থেকে নামতেই নবাবের সামনে এসে কুর্নিশ জানায় আবদুল। গভীর কৃতজ্ঞতায় আবদুলের হাতদুটো চেপে ধরেন নবাব।
‘তোমাকে ইয়াদ রাখব আবদুল।’ চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
আবদুলের চোখদুটোও জ্বালা করে ওঠে। সে বলে, ‘এ তো আমার খুশনসিব।’
লুৎফা ও উম্মেসায়েরাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত নৌকোয় চেপে বসলেন নবাব। সঙ্গে লটবহর অত্যন্ত কম। সাড়ম্বরে যাওয়ার উপায় নেই। লোকের নজরে পড়বে। পথের কড়ি বলতে সঙ্গে রয়েছে লুৎফার একটা বাক্স। জহরতে ঠাসা। এছাড়াও হিরে, মণি, মুক্তোখচিত অনেক বহুমূল্য গয়না বোরখার অভ্যন্তরে দেহের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে লুৎফা। যতটা নেওয়া যায়। এছাড়া নৌকোয় রয়েছে সামান্য রসদ।
নৌকোর কাছি খুলে দিল মাঝিরা। ভাগ্যের খোঁজে পাটনার উদ্দেশে ভেসে পড়লেন পরাজিত নবাব। চারজন মাল্লা প্রাণপণে দাঁড় টানতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবাবের নৌকো নদীর বুকে জমাট বাঁধা অন্ধকারে হারিয়ে গেল। নৌকোর গলুইয়ের উপর দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তটভূমির দিকে চেয়ে রইলেন সিরাজদ্দৌলা। বন্দরের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সিরাজদ্দৌলার নৌকো চোখের পর্দা থেকে অদৃশ্য হতেই একটা তাগড়াই ঘোড়ার পিঠে চেপে অন্ধকারের মধ্যে অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশে রওনা হল আবদুলও। পরাজিত নবাবকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে সে। একথা হয়তো গোপন থাকবে না। গর্দান যাবে। বাদশাহি সড়ক হয়ে আবদুল ছুটে চলল বর্ধমানের দিকে। ঘুর পথে পাটনায় গিয়ে সে ফের মিলিত হতে চায় সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে।
বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। নৌকোর সমুখে জ্বলতে থাকা মশালটা বাতাস ও বারিশের সঙ্গে লড়াই করে কোনওরকমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। হুঁশ নেই সিরাজদ্দৌলার। গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছেন।
একজন মাল্লা এসে কুরনিশ করে বলে, ‘অন্দরে আসুন হজরত।’
শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘চলো।’
.
তাঁবুর চিলমন পর্দার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে বিছানায়। চোখ মেললেন রবার্ট ক্লাইভ। পরম নিশ্চিন্তে বেহুঁশের মতো ঘুমিয়েছেন গতকাল রাতে। তবুও সারা দেহে ক্লান্তি। সেই যে গেল ডিসেম্বরে পা রেখেছিলেন ফলতায় তারপর থেকে আর ফুরসত মেলেনি। শুধু লড়াই। একটার পর একটা কঠিন বাজি জিতে ওঠা। এবার হয়তো কিছুদিন বিশ্রাম মিলবে।
মাথার কাছে চৌপাইয়ের উপর গরম কফি রেখে গিয়েছে আরদালি। বিছানায় উঠে বসে কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে চুমুক দিলেন ক্লাইভ। বাইরে থেকে ভেসে আসছে সৈন্যদের প্রাত্যহিক সকালের কুচকাওয়াজের শব্দ। পলাশি থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে খানিক দূর এগিয়ে এসে গতকাল রাতে দাউদপুরে তাঁবু ফেলেছে ইংরেজবাহিনী।
বিছানা থেকে উঠে এসে তাঁবুর জানলার পর্দা সরিয়ে কর্নেল ক্লাইভ বাইরের দিকে তাকালেন। মেজর কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুটের নেতৃত্বে প্যারেড করছে সৈন্যরা। দৃশ্যটা দেখে ভালো লাগল কর্নেলের। ডিসিপ্লিন। লড়াইয়ের ময়দানে ফৌজের ডিসিপ্লিনই শেষ কথা। সামান্য লোক নিয়ে গড়া একটা ডিসিপ্লিনড বাহিনী, বিরাট আকারের এক ডিসঅরগানাইজড বাহিনীর থেকে অনেক বেশি কার্যকর, এদেশে লড়াই করতে গিয়ে বারে বারে এ কথা প্রমাণ করেছেন কর্নেল। তাই লড়াই জেতা মানে আবেগে ভেসে যাওয়া নয়। ফূর্তিতে গা ভাসানো নয়। সবসময় প্রস্তুত রাখো নিজেকে।
কিন্তু শুধুই কি ডিসিপ্লিন? অবশ্যই এর সঙ্গে রয়েছে কর্নেলের দুর্জয় সাহস আর ব্লেসিংস অফ দ্য গডেস অফ ফরচুন। ভাগ্যদেবী বরাবরই দুহাত ভরে আশীর্বাদ করেছেন দুঃসাহসী ক্লাইভকে। ভাগ্যদেবীর হাতের ছোঁয়াতেই তো তিনি আজ ব্যারন অফ প্ল্যাসি।
ক্লাইভের মনে পড়ে যায় গতকাল বিকেলের কথা। মোহনলালের বাহিনীর আক্রমণে ইংরেজরা তখন দিশেহারা। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন ক্লাইভ। কিন্তু পালাবেন কোথায়? দ্রুত নদী পেরিয়ে কাটোয়ায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। পিছু হটে আশ্রয় নেওয়ার জায়গাও নেই। যে ঝাঁঝের সঙ্গে আক্রমণ শানাচ্ছিলেন মোহনলাল আর মাত্র আধঘণ্টাখানেকের বেশি সেই হামলা ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা ছিল না ইংরেজদের। মিরজাফরের উপর রাগে ফুঁসছিলেন ক্লাইভ। এই কঠিন সময়ে কেন তিনি তার ফৌজ নিয়ে ইংরেজদের মদত দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছেন না? মূর্খ মিরজাফর কি বুঝতে পারছেন না যে, ইংরেজরা মরলে তিনিও মরবেন!
তবুও আশা ছাড়েননি ক্লাইভ। তাঁর বিশ্বাস ছিল ভাগ্যদেবী ঠিক মুখ তুলে চাইবেন। মিরাকেল ঘটবেই। সত্যিই ঘটল। ওই অবস্থায় হঠাৎ কেন যে যুদ্ধ থামিয়ে দিলেন মোহনলাল, সেটা বুঝে উঠতে পারেননি ক্লাইভ। তবে যাই হোক স্বস্তি মিলল। গলায় ঝুলতে থাকা ক্রসটা ঠোঁটে ছুঁইয়ে চুম্বন করেছিলেন ক্লাইভ। পরিকল্পনা করেছিলেন গভীর রাতে অতর্কিতে নবাবের ক্যাম্পের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। যে কায়দায় বাজিমাত করেছিলেন কলকাতায়, হালসিবাগানের লড়াইয়ে। কিন্তু শেষ বিকেলের মরা আলোয় সুকৌশলে পিছন থেকে মোহনলালের বাহিনীকে আক্রমণ করে লড়াইটা তখনই শেষ করে দিলেন কিলপ্যাট্রিক। প্রায় জিতে যাওয়া লড়াই ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়ে উটের পিঠে চেপে পালিয়ে গেলেন নবাব। কয়েক ঘণ্টাতেই শেষ হয়ে গেল পলাশির যুদ্ধ।
পলাশির প্রান্তরে সাফল্য এলেও কর্নেল ক্লাইভ কিন্তু সতর্ক। এখনও মিরজাফরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। ইয়ারলতিফ, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, মিরজাফরের মনের মধ্যে কী আছে কে জানে? তা ছাড়া ইংরেজদের হাতে নবাবের পরাজয়টা কী ভাবে দেখছে মুর্শিদাবাদের মানুষ, সেও এক ভাবনার বিষয়। তাই বাহিনী যেন সদা প্রস্তুত থাকে, ডিসিপ্লিনড থাকে এ নিয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন ক্লাইভ। মেজর কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুট যে সে কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন তা দেখে কর্নেল খুশি হলেন।
তাঁবু লাগোয়া টয়লেটে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নব মুনশিকে তলব করলেন ক্লাইভ।
খানিকবাদে নবকৃষ্ণ এসে সেলাম ঠুকে বললেন, ‘গুড মর্নিং স্যার।’
‘গুড মর্নিং মুনশি। যা বলেছিলাম করেছ?’
‘বিলক্ষণ হুজুর। আশেপাশের গাঁ থেকে এই তো ঘুরে এলাম।’
‘কী বুঝলে?’
‘লোকে কেমন যেন থম মেরে গেছে।’
‘আর দে অ্যাংরি উইথ আস?’
‘বিষয়টা তা নয় হুজুর।’
‘তবে?’
‘লড়াই তো এদেশের লোকে আগেও ঢের দেখেছে। যারা জেতে তারা লুঠতরাজ করে, বাড়িতে আগুন দেয়। মানুষ খুন করে। জেনানাদের বলাৎকার করে। ইংরেজ ফৌজ পলাশিতে লড়াই জিতে নিল, অথচ এসবের কিছুই ঘটল না। আশেপাশের গাঁয়ের লোকে বড় তাজ্জব বনে গেছে। তাই ইংরেজবাহিনী সম্বন্ধে আমলোগের বেশ ভালোই ধারণা হয়েছে।’
পাইপ মুখে দিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে ক্লাইভ বললেন, ‘ভেরি গুড।’
হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে ক্লাইভের তাঁবুতে প্রবেশ করলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
‘হোয়াট হ্যাপেনড ওয়ারেন?’ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।
‘মিরজাফর ইজ অ্যাপ্রোচিং আওয়ার ক্যাম্প উইথ অ্যা স্মল কন্টিনজেন্ট।’
দুদণ্ড কী যেন ভাবলেন কর্নেল। তারপর বললেন, ‘প্লিজ অ্যারেঞ্জ অ্যা বিফিটিং রিসেপশন।’
দ্রুতগতিতে বিদায় নিলেন হেস্টিংস।
তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন কর্নেল। দূরবীনে চোখ রেখে দেখলেন ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে আসছে একটা ছোটখাটো ফৌজ। হাতি, ঘোড়া, বন্দুকচি, ধানুকি সবই আছে সেই দলে। এদের কী মতিগতি কে জানে। গোলন্দাজদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন ক্লাইভ।
একই সঙ্গে ক্লাইভের নির্দেশে নতুন নবাবকে বিলিতি কায়দায় স্বাগত জানানোর জন্য একদল বেয়নেটধারী গোরাপল্টনকে সার বেঁধে দাঁড় করানোর কাজে লেগে গেলেন আয়ারকুট ও হেস্টিংস।
আগুয়ান ফৌজের ঠিক মাঝখানে হাতির পিঠে হাওদায় বসে রয়েছেন মিরজাফর। ক্লাইভের চোখ দূরবীনে। মিরজাফরের বাহিনী আর একটু সামনে এগোতেই স্যালুট জানানোর কায়দায় বন্দুক উঁচিয়ে ধরল গোরা পল্টনেরা। ঘাবড়ে গিয়ে মিরজাফরের হাতিকে দাঁড় করিয়ে দিল মাহুত। সামনে উদ্যত বেয়নেট দেখে মিরজাফরের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল রক্তস্রোত বইতে লাগল। স্যালুট জানানোর বিলিতি কায়দা জানা নেই মিরজাফরের। তিনি ভাবলেন গোরাপল্টনরা হয়তো তাঁর দিকে গোলাগুলি চালিয়ে বসবে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে মিরজাফরের সঙ্গের ফৌজিরাও। এখন কী করা উচিত তারা বুঝে উঠতে পারছে না।
গোলমালটা কোথায় অনুভব করলেন ক্লাইভ। নিজেই ছুটে এলেন সামনে।
নিরস্ত্র অবস্থায় হাসিমুখে কর্নেলকে ছুটে আসতে দেখে ভরসা পেলেন মিরজাফর। হাতির পিঠ থেকে নেমে এলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে উষ্ণ কণ্ঠে কর্নেল বললেন, ‘ওয়েলকাম! ওয়েলকাম নবাব। ওয়েলকাম টু আওয়ার ক্যাম্প।’
সার বেধে দাঁড়ানো গোরা পল্টনরা এক সঙ্গে দেহ ও মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাল। ক্লাইভের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল মিরজাফরের মন। শুধু এই বাহাদুর মানুষটার জন্য তিনি আজ সুবে বাংলার মসনদে বসতে চলেছেন। কর্নেল ক্লাইভ ছাড়া তার একান্ত আপনজন ও শুভানুধ্যায়ী আর কে আছে? মাথা নুইয়ে ক্লাইভকেও সম্মান জানালেন মিরজাফর।
ফৌজি ব্যান্ডের তালে তালে পা মিলিয়ে মিরজাফরের হাত ধরে তাঁকে নিজের তাঁবুতে নিয়ে গেলেন ক্লাইভ। খাতির করে মিরজাফরকে কুরসিতে বসালেন। নিজে বসলেন তাঁর মুখোমুখি।
মিরজাফর বললেন, ‘ইনকিলাবে কামেয়াবির জন্য আপনাকে বহুত বহুত সুক্রিয়া।’
এই সব শুকনো তোষামোদে ক্লাইভের মন ভরে না। তিনি কাজের লোক। সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন ক্লাইভ। শুধোলেন, ‘সিরাজদ্দৌলা এখন কোথায়?’
জবাবে মিরজাফর বললেন, ‘কাসিদরা খবর এনেছে, তিনি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে গিয়েছেন।’
ক্লাইভের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ‘পালিয়ে গিয়েছেন? কোথায়? কোনদিকে?’
‘রাজমহলের দিকে।’
‘রাজমহল? আমার আন্দাজ তিনি পাটনায় যেতে চান।’
খুশি ঝরানো গলায় মিরজাফর বললেন, ‘সহি আন্দাজ। সিরাজের সঙ্গে রয়েছেন লুৎফা বেগম ও লেড়কি উম্মেসায়েরা।’
চিত্রটা ক্লাইভের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল। পাটনার নায়েব রামনারায়ণ সিরাজের অনুগত। এছাড়া পাটনায় রয়েছে ফরাসি জেনারেল জাঁ ল। যদি সিরাজদ্দৌলা এঁদের কাছে আশ্রয় নেন তাহলে সমূহ বিপদ। পরাজিত নবাবকে গ্রেফতার করা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। শুধু তাই নয়, ফৌজ গড়ে তুলে প্রত্যাঘাত করতে পারেন সিরাজ।
ক্লাইভ ব্যস্ত হয়ে উঠে বললেন, ‘আপনি এখনই সিরাজদ্দৌলাকে পাকড়াও করার জন্য ফৌজ পাঠান। পাটনায় পৌঁছনোর আগেই তাকে গ্রেফতার করতে হবে।’
মিরজাফর হাসিমুখে বললেন, ‘আপনি বেকার পরেসান হচ্ছেন কর্নেল। সিরাজ এখন ঢোঁড়া সাপ। আর কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।’
ক্লাইভ এবারে মিরজাফরকে প্রায় এক ধমক লাগিয়ে বললেন, ‘আপনি এভাবে চুপ করে বসে থাকবেন না নবাব। যা বলছি তাই করুন। সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেফতার করা চাইই। জিন্দা।’
ক্লাইভের মেজাজ দেখে মিইয়ে গেলেন মিরজাফর। তখনই বড় একটা ফৌজসহ সিরাজকে ধাওয়া করার জন্য জামাই মিরকাশিমকে ডেকে হুকুম করলেন।
ক্লাইভ বললেন, ‘আউর এক বাত। নবাবের তোশাখানায় পাহারা বসান। কেউ যেন সেখান থেকে কিছু সরাতে না পারে।’
‘ও কাম আমি আগেই পাকা করেছি কর্নেল সাহেব। পাহারা বসিয়েছি। তোশাখানার হুড়কো খোলা হবে আপনি মুর্শিদাবাদে হাজির হওয়ার পর। আপনার সামনে।’
ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘সো কাইন্ড অফ ইউ। আপনি এবারে মুর্শিদাবাদে গিয়ে দ্রুত মসনদের দখল নিন।’
‘আমি এখনই মুর্শিদাবাদ রওনা হব।’ বললেন মিরজাফর।
‘ভেরি গুড।’
‘তবে আপনি মুর্শিদাবাদে হাজির না হলে আমি মসনদে বসব না। আমি কি আপনাকে বাদ দিয়ে খুশি মানাতে পারি?’
প্রবল আনুগত্য চুইয়ে পড়ল মিরজাফরের গলায়।
ক্লাইভ হেসে উঠে বললেন, ‘ইউ আর রিয়েলি ভেরি সুইট।’
.
