৩
নিজের দোকান ‘জিনাত মঞ্জিলের’ সামনে এসে নিজামুদ্দিন চমকে ওঠে। বিস্ফারিত হয়ে ওঠে তার চোখ দুটো। মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে অস্ফুট আর্তনাদ। ‘হায় আল্লা!’
পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে তার দোকানঘর। ঘরের মাথায় লাগানো কাঠের ফলকের গায়ে খোদাই করা ‘জিনাত মঞ্জিল’ লেখাটা আধপোড়া হয়ে উঁকি দিচ্ছে ছাইয়ের স্তূপের মধ্যে থেকে। এখনও ছাই চাপা আগুন থেকে ধোঁয়া উঠছে অল্প অল্প। আশেপাশের দোকানগুলোতেও ভাঙচুর করে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। কোনও কোনওটার দশা তারই দোকানের মতো। কার রোষে, কার অভিশাপে এভাবে লোকসান হল বহু মানুষের?
গোটা চকবাজার থমথমে। নিত্যদিনের সেই জমজমাট ভাবটা উধাও। পথের দুপাশে দোকানিদের চবুতরাগুলো খাঁ-খাঁ করছে। শুধু এদিকে ওদিকে জটলা করে আছে কিছু অতি কৌতূহলী মানুষজন। তাদের চোখেমুখে গভীর উদ্বেগের ছাপ।
স্তম্ভিত নিজামুদ্দিন স্খলিত পদক্ষেপে নিজের আগুনে ঝলসে যাওয়া দোকানঘরের ভিতরে ঢোকে। ছাত ভেঙে পড়েছে। মাথার উপরে দেখা যাচ্ছে খোলা আকাশ। বুকটা মুচড়ে ওঠে নিজামুদ্দিনের। শুধু আর্থিক ক্ষতির জন্য নয়। নিজের মরহুম বিবির নামে দোকানের নাম রেখেছিল নিজামুদ্দিন। আজ সেটাও শেষ। ছাইয়ের গাদার মধ্যে হাঁটু মুড়ে বসে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে আধপোড়া কাঠের ফলকটা টেনে বের করতে গিয়ে নিজামুদ্দিনের চোখদুটো জ্বালা করে ওঠে। আঁসুতে ঝাপসা হয়ে যায় তার চোখের দৃষ্টি।
পিছন থেকে কেউ একজন এসে হাত রাখে নিজামুদ্দিনের কাঁধে। ঘুরে তাকিয়ে সে দেখে কাপড়ের কারবারি বুড়ো আফতাব আলি। নিজামুদ্দিনের দোকান থেকে কিছু দূরেই আফতাব আলির মস্ত দোকান। শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজামুদ্দিন প্রশ্ন করে, ‘কী করে এমন হল চাচা? কেন এই আখেজ?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফতাব আলি বলে, ‘শহরটা দোজখ হয়ে গেল রে বেটা। আমার দোকান থেকেও কয়েকহাজার টাকার মাল লুটে নিয়ে গেল আজ। শুধু তাই নয় রে বেটা, আমার নাতনি রাবেয়াকে জোর করে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেছে ইবলিশের দল।’
রাবেয়া চোদ্দো-পনেরো বছরের ফুলের মতো একটি মেয়ে। তাকে চেনে নিজামুদ্দিন। ঈদের দিনে আফতাব চাচার সঙ্গে একদিন তার দোকানে আতর কিনতে এসেছিল।
নিজের শোক-দুঃখ ভুলে উত্তেজিত হয়ে উঠে নিজামুদ্দিন বলে, ‘কী বলছ চাচা?’
গলার স্বরটা বোধ হয় একটু বেশিই চড়ে গিয়েছিল। শিউরে উঠে আফতাব আলি বলে, ‘গলা নামিয়ে কথা বল বেটা। শয়তানগুলোর নজরে পড়লে খুন হয়ে যাবি। ওরা সব ধারেকাছেই আছে।’
‘কারা শহরটাকে এমন দোজখ করে তুলল চাচা?’
‘শাহজাদা মিরনের শাগরেদ চুনিলাল-মুন্নিলাল ও তার দলবল। শাহজাদা মিরনই এসব শারারতির মদতদার।’
‘শাহজাদা মিরন?’
‘সে নাকি সিরাজদ্দৌলার দিলপিয়ারাদের ঢিট করতে চায়।’
‘আজব বাত! তোমার আমার মতো আমআদমি নবাবের দিলপিয়ারা হয় কী করে?’
‘এ একটা অছিলা। জমানা বদলের সুযোগ নিয়ে খন্নাসি। চুনিলাল ও মুন্নিলাল কাউকেই ছাড়ছে না। শকুনেরা টাকা আর আওরত, জেনানা, লেড়কি লুঠের পরোয়ানা পেয়েছে। তাই এই খন্নাসি।’
হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠে আফতাব আলি বলে, ‘আমার রাবেয়াকে কী করে ফেরত পাই বল দেখি? শুনেছি শয়তানের আওলাদেরা মেয়েটাকে জাফরাগঞ্জের হারেমে নিয়ে তুলেছে।’
রাগে ফুটতে থাকে নিজামুদ্দিনের গোটা শরীর। সে তো চেয়েছিল সিরাজদ্দৌলার বরবাদি। ভেবেছিল মসনদ থেকে সিরাজদ্দৌলা হটে গেলে নিজামতের সব জুলমাতের অবসান হবে। আমআদমি ভালো থাকবে। যেমন ছিল মুর্শিদকুলি, সুজাউদ্দিনের আমলে। কিন্তু এ কী হল? কাদের হাতে গেল নিজামতের ক্ষমতা। নতুন জমানাকে স্বাগত জানাতে চকবাজারের আজ খুশিতে ভাসার কথা। কুরসি বদল হতে না হতেই নগরটাকে দোজখ বানিয়ে ছাড়ল মিরন ও তার শাগরেদেরা?
আফতাব আলি বলে, ‘পালিয়ে যা বেটা। পালিয়ে যা। এ জমানায় জানে বাচবি না। এ জাহান্নাম ছেড়ে পালিয়ে যা।’
সহসা একটা গোলমালের শব্দ ভেসে আসে।
পথের উপরে ছুটে এসে আতঙ্ক জড়ানো গলায় আফতাব আলি বলে ওঠে, ‘ভাগ নিজামুদ্দিন। হার্মাদের দল!’
এক দৌড়ে চোখের নিমেষে একটা গলির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় আফতাব আলি। ছুটোছুটি পড়ে যায় জটলারত মানুষগুলোর মধ্যেও।
একদল লোক দৌড়ে আসছে। তাদের হাতে তরোয়াল, বল্লম, ছুরি, সড়কি।
ক্ষণিকের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিল নিজামুদ্দিন। নিজামত কেল্লার নাকের ডগায় যে এরকম অরাজকতা চলতে পারে, এ তার ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। হার্মাদের দল বেশ কাছে এসে পড়েছে। বাঁচতে হবে। এবারে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ছুটতে শুরু করে নিজামুদ্দিন। চকবাজারের অলিগলি ধরে এঁকেবেঁকে ছুটতে থাকে।
আঁধার নেমেছে। অন্যান্য দিন এসময়ে মশাল ও বাতিদানের রেড়ির তেলের আলোয় ঝলমল করে চকবাজার। ঝকমক করে জেল্লাদার দোকানপাট। মানুষের কলরবে মুখর হয়ে থাকে গোটা মান্ডি। মাঝে মাঝে এসে তেলের আধারে তেল ঢেলে দিয়ে যায় বাতিকরেরা। ঝিমিয়ে আসা আলোক-স্তম্ভ ফের সজাগ হয়ে ওঠে। কোথায় সেই চেনা চকমান্ডি? পরিচিত সেই সব গলি যেন প্রেতলোকের মতোই বীভৎস।
নিজামতের কয়েদখানার আধপেটা অখাদ্য আহারে দুর্বল হয়ে গিয়েছে নিজামুদ্দিনের শরীরটা। আর ছুটতে পারছে না সে। দম যেন ফুরিয়ে আসছে। কলিজা ফেটে যাওয়ার জোগাড়। পিছনে পাথর বাঁধানো পথের উপরে পায়ের শব্দ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। নিজামুদ্দিনের কানে ভেসে আসছে শরাবের নেশায় উন্মত্ত জহ্লাদবাহিনীর ছুড়ে দেওয়া অশ্রাব্য গালিগালাজ। ‘ভাগতা হ্যায় শালা কুত্তা। মার শালাকে। খতম করে দে।’ এরা চুনিলাল ও মুন্নিলালেরই দলবল। খুন, ধর্ষণ, রাহাজানিতে এদের পৈশাচিক আনন্দ।
গলির বাঁকের মুখে রয়েছে তছনছ হয়ে যাওয়া একটা গোলদারি দোকান। আগলবিহীন দরজা দিয়ে দ্রুত তার ভিতরে ঢুকে পড়ে নিজামুদ্দিন। অন্ধকার হাতড়ে সে টের পায় একদিকে মজুত করা রয়েছে বেশ কিছু চালের বস্তা। সুগন্ধি চালের সুবাসে ম-ম করছে চারিদিক। হার্মাদরা সবটুকু চেঁছেপুছে নিয়ে যেতে পারেনি। স্তূপীকৃত চালবোঝাই বস্তার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে নিজামুদ্দিন।
খানিকবাদেই বাইরে বেশ কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ শোনা যায়। দোকানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে শয়তানের দল। তাদের হাতে জ্বলন্ত মশাল। আড়াল থেকে তাদের চোখমুখগুলো দেখে নিজামুদ্দিন শিউরে ওঠে। লোকগুলোকে চিনতে পারে সে। চকবাজারে এরা লুকিয়েচুরিয়ে নিষিদ্ধ মাদকের কারবার করত। এমন কোনও জঘন্য কাজ নেই যা এরা করতে পারে না। হায় রে! এরাই এখন নবাবজাদা মিরনের জিগরি দোস্ত। সিরাজদ্দৌলার জমানা এর চেয়ে খারাপ কী ছিল?
বস্তার আড়ালে প্রায় শ্বাস বন্ধ করে বসে রয়েছে নিজামুদ্দিন। কিছুক্ষণ মশাল হাতে হাতে এদিকে ওদিকে ঘোরাঘুরি করে ফিরে যায় দুষ্কৃতীরা। বাইরে তাদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায়। আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে নিজামুদ্দিন। কান খাড়া করে রাখে। না বাইরে কারও সাড়াশব্দ নেই।
আরও কিছুটা সময় অতিবাহিত করে বস্তার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চমকে ওঠে নিজামুদ্দিন। তার চোখে পড়ে অদূরে একটি ছায়ামূর্তি।
চাপা গলায় নিজামুদ্দিন শুধোয়, ‘কে?’
‘আমাকে বাঁচান।’ খুশ ইলহান কিশোরী কণ্ঠ রিনরিন করে বাজে। দ্বিগুণ চমকিত হয় নিজামুদ্দিন।
‘কে তুমি?’
‘রাবেয়া।’
‘রাবেয়া? আফতাবচাচার নাতনি?’
‘জি। আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি। আপনি তো নিজামুদ্দিন চাচা। তাই না?’
খানিকটা বিস্মিত হয়ে নিজামুদ্দিন বলে, ‘জি। লেকিন তুমি এখানে?’
‘ওরা ঘর থেকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিল।’ মেয়েটি কেঁদে ফেলে।
‘ভয় নেই রাবেয়া। ঘাবরাও মাত। ওদের হাত থেকে তুমি ছাড়া পেলে কী করে?’
‘কোমরে ছুরি গোজা ছিল। এক কামিনেকে জখম করে ছুটে পালাই। ওরা তেড়ে আসছিল পিছনে। ছুটতে ছুটতে এই দোকানের মধ্যে ঢুকে লুকিয়ে পড়ি। আল্লার রহেমে বেঁচে গেছি। আমাকে ঘরে পৌঁছে দেবেন চাচা?’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে নিজামুদ্দিনের হাত চেপে ধরে হাঁপাতে থাকে রাবেয়া। হাতের স্পর্শে নিজামুদ্দিন বুঝতে পারে মেয়েটি ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
নিজামুদ্দিন বলে, ‘ডরো মাত রাবেয়া। এসো আমার সঙ্গে।’
রাবেয়ার হাত ধরে চুপিসারে পথে নেমে আসে নিজামুদ্দিন। অন্ধকার পথ। চারিদিকে জনমানুষের চিহ্ন নেই। দূর থেকে ভেসে আসছে একটা হইচইয়ের শব্দ। ওদিকের আকাশের গায়ে লালচে আভা। হয়তো শয়তানের দল আগুন লাগিয়েছে কারও বাড়িতে।
আচমকাই অন্ধকার ভেদ করে নিজামুদ্দিনের উপর ঝাপিয়ে পড়ে দুই ছায়ামূর্তি। পলকে নিজেকে সামলে নিয়ে দুই ছায়ামূর্তির সঙ্গে লড়তে থাকে নিজামুদ্দিন। আকস্মিক এই হামলায় হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে রাবেয়া। নিজামুদ্দিন চেঁচিয়ে ওঠে ‘ভাগো, রাবেয়া ভাগো।’
ছুটতে শুরু করে রাবেয়া। নিজামুদ্দিন সেয়ানে সেয়ানে লড়তে থাকে দুই হার্মাদের সঙ্গে। ছুটতে ছুটতে রাবেয়ার হুঁশ হয় সে তার বাড়ির কাছে এসে পড়েছে। ছুটে গিয়ে বাড়ির সদর দরজায় পাগলের মতো আঘাত করতে থাকে রাবেয়া। চিৎকার করতে থাকে, নানাজি! নানাজি! দরওয়াজা খোলো।
রাবেয়ার গলার আওয়াজ শুনে লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে আসেন আফতাব আলি।
‘রাবেয়া!’
‘নানাজি!’ এই বলে দাদুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাবেয়া। থরথর করে কাঁপছে সে। ধীরে ধীরে কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। ঠোঁট দুটো ফাঁক করে কিছু বলতে চায় সে।
‘রাবেয়া রাবেয়া!’ চেঁচিয়ে ওঠেন আফতাব আলি।
‘নিজামুদ্দিন চাচাকে বাঁচাও।’ এই বলে পথের দিকে অঙ্গুলিসংকেত করে নানাজির হাতের বাঁধনের মধ্যেই চেতনা হারায় রাবেয়া।
‘রাবেয়া বেটি!’ ছুটে আসেন আফতাব আলির বিবি। রাবেয়ার নানি। নাতনিকে পাঁজাকোলে করে তিনি ভিতরে নিয়ে যান।
চোয়াল শক্ত হয় আফতাব আলির। ইতিমধ্যে আফতাব আলির বাড়িতে কোনও বিপদ হয়েছে ভেবে ছুটে এসেছে আশেপাশের কয়েকজন লোক। তাদের হাতে লাঠি, বল্লম, সড়কি। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খাওয়া নয়। কোতোয়ালির সেপাইরা যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অপারগ তখন নিজের হাতেই আইন তুলে নেবে তারা। এই তাদের সংকল্প।
রাবেয়ার দেখানো অঙ্গুলিসংকেত লক্ষ্য করে ছুটতে থাকে তারা। সবার সামনে আফতাব আলি। তার এক হাতে মশাল, আরেক হাতে লাঠি।
খানিক দূর এগোনোর পরেই তারা দেখতে পারে একটা লোক টলমল পায়ে ছুটে আসার চেষ্টা করছে সামনে, অদূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই ছায়ামূর্তি। মারমুখী জনতাকে ছুটে আসতে দেখে দুই ছায়ামূর্তি উলটোদিকে দৌড় লাগায়। টলমলে পায়ে সামনের দিকে ছুটতে চাওয়া মানুষটা পথের উপরে মুখ থুবড়ে পড়ে।
লোকটার পাশে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন আফতাব আলি।
‘নিজামুদ্দিন! বেটা!’
শিউরে ওঠেন আফতাব আলি। নিজামুদ্দিনের পিঠটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পিঠের মাঝে আমূল গেঁথে রয়েছে একটা ছোরা। নিজামুদ্দিনের মাথাটা নিজের কোলের মধ্যে টেনে নেন আফতাব।
‘বেটা ইয়ে ক্যায়সে হুয়া?’
‘মেরা অন্তিম পল হাজির চাচা। লেকিন রা-বে-য়া–’
কথাটা শেষ করতে পারে না নিজামুদ্দিন। মাথাটা হেলে যায় একদিকে। ঠোটের কোণ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে।
.
দাউদপুর ছেড়ে এগিয়ে এসে কাশিমবাজারের কাছে ময়দাপুরে তাঁবু ফেলেছে ইংরেজ ফৌজ। সিরাজদ্দৌলার পরাজয় ও পলায়নের পর রাজধানীর সাধারণ মানুষের কী প্রতিক্রিয়া, মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করার আগে তা ভালো করে যাচাই করে নিতে চান কর্নেল ক্লাইভ। পা ফেলতে চান একেবারে হিসেব কষে। মোটামুটি সব ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু আজ সকালে হাতে এসে পড়া একটা চিঠি ক্লাইভকে ঘোর দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। চিঠিটা উইলিয়াম ওয়াটসকে লিখেছিলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ।
‘…কর্নেল ক্লাইভকে আমার সেলাম জানাবেন। মুর্শিদাবাদ শহরে আসার সময় উনি যেন হুঁশিয়ার থাকেন। কেননা মুর্শিদাবাদ শহরে ঢুকলেই ওঁর উপর হামলা হতে পারে। কর্নেলকে খতম করার একটা চক্রান্ত চলছে।…’
২৫ জুন ১৭৫৭। সেদিনই মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল ক্লাইভের। ফৌজ প্রস্তুত হয়েই ছিল। আপাতত যাত্রা বাতিল করলেন কর্নেল।
ওদিকে ক্লাইভ রাজধানীতে না এসে পৌঁছলে মসনদে বসতে পারছেন না মিরজাফর। তিনি অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। দ্রুত আসার জন্য ক্লাইভকে বারবার বার্তা পাঠাচ্ছেন এই মর্মে,
‘…তার জীবনের এই চরম খুশির দিনে সাবিৎ জঙ্গ ক্লাইভ যদি হাজির না থাকেন, তাহলে তার হর খুশি বরবাদ হয়ে যাবে।’
মিরজাফরের বার্তায় যে গভীর আন্তরিকতার ছোঁয়া রয়েছে সে নিয়ে ক্লাইভের কোনও সন্দেহ নেই। তবুও নিজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না করে মুর্শিদাবাদের পথে কর্নেল আপাতত আর এক পাও এগোতে রাজি নন। জগৎশেঠের পাঠানো সতর্কবার্তাকে তিনি উড়িয়ে দিতে পারছেন না।
ইংরেজদের হাতে নবাবের পরাজয় মুর্শিদাবাদের সাধারণ মানুষ কী ভাবে দেখছে তা নিয়ে কর্নেলের মনে ধন্দ রয়েছে। মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করলে যদি স্বতস্ফূর্ত জনরোষ ইংরেজদের উপর আছড়ে পড়ে তাহলে পালানোর কোনও পথ থাকবে না। সামান্য কয়েকজন সৈন্যকে নিয়ে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ কী করে সামাল দেবেন তিনি! এসব ভেবে আগে থেকেই শঙ্কিত ছিলেন ক্লাইভ। তার উপরে গোল বাধিয়েছে জগৎশেঠের চিঠিটা। কর্নেল ক্লাইভের উপর হামলা করার ষড়যন্ত্রটা যে কার তা নিয়ে অবশ্য কোনও ইঙ্গিত দেননি শেঠজি।
চিন্তিত হয়ে নিজের ক্যাম্প অফিস লাগোয়া বারান্দায় পায়চারি করছিলেন কর্নেল। ঠোঁটে গোঁজা রয়েছে পাইপ। মুখটা গম্ভীর। ঘন ঘন ধোঁয়া ছেড়ে চলেছেন।
নবকৃষ্ণ এসে সেলাম জানিয়ে বললেন, ‘কাসিদ মুর্শিদাবাদের খবর নিয়ে এসেছে হুজুর।’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ক্লাইভ শুধোন, ‘কী খবর মুনশি?’
নবকৃষ্ণ চিন্তিত গলায় বলেন, ‘রাজধানীতে ভয়ানক গোলমাল শুরু হয়েছে।’
‘হোয়াট? কীসের গোলমাল?’ ভুরু কুঁচকে যায় ক্লাইভের।
‘রাজধানী একেবারে দোজখ হয়ে উঠেছে হুজুর। দেদার লুঠতরাজ, খুনজখম হচ্ছে।’
বিস্মিত হয়ে ক্লাইভ শুধোন, ‘এসব কী বলছ? এর কারণ?’
‘গোল পাকিয়েছে মিরজাফরের বেওকুফ ছেলেটা। সিরাজের তাঁবের লোকজনদের খতম করতে হবে বলে হুকুম জারি করেছেন তার শাগরেদদের উপর। শাগরেদ মানে যতসব গুণ্ডা, বদমাশের দল। নবাবজাদার হুকুমতের বলে যার-তার উপর হামলা চালাচ্ছে তারা। মিশকিন থেকে রইস আদমি কেউই রেহাই পাচ্ছে না। আহাম্মকি আর কাকে বলে?’
প্রচণ্ড বিরক্তির সঙ্গে ক্লাইভ বলেন, ‘বলছ কী মুনশি, এ তো ডেঞ্জারাস অ্যাকশন।’
‘ডেঞ্জারাস মানে? ভেরি ভেরি ডেঞ্জারাস হুজুর।’
‘আর ইউ সিওর? ভেরিফাই করেছ? এসব খবর সত্যি?’ সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করেন ক্লাইভ।
‘এ তো আর কেবল কাসিদের জবান নয় হুজুর। চিরকুট পাঠিয়েছেন রায়দুর্লভ।’
‘রায়দুর্লভ!’
‘ইয়েস স্যার। আপনার হেল্প চেয়েছেন। এই যে চিঠি।’
‘কী লিখেছেন? ব্রিফলি বলো আমাকে।’
‘বাপ মসনদে বসবে। এই খুশিতে ব্যাটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। খুন ঝরাচ্ছে, বাড়ি জ্বালাচ্ছে, জেনানা লুঠছে। সাধারণ লোকে ভয়ানক পরেশানির মধ্যে পড়েছে। মিরজাফর খাঁকে শাপশাপান্ত করছে। কোম্পানিকেও দুষছে। বলছে, সিরাজদ্দৌলাকে দেশছাড়া করে আমআদমির কপাল পুড়িয়েছে ইংরেজ কোম্পানি। রায়দুর্লভের উপরেও মিরনের আক্রোশ রয়েছে। দেওয়ানজি ভয়ে ভয়ে রয়েছেন। গুপ্তঘাতকের হাতে তাঁর প্রাণটা না যায়।’
এই বলে চিরকুটটা ক্লাইভের হাতে তুলে দেন নবকৃষ্ণ।
কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জন করে ওঠেন ক্লাইভ। ‘রাবিশ! অল ননসেন্স। অ্যাবসোলিউট স্টুপিডিটি।’
এ সময়ে এই অযাচিত ঝুটঝামেলা কর্নেল ক্লাইভের একেবারেই পছন্দ নয়। নবাব সিরাজদ্দৌলার সময়ের অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে সুশাসন দেবেন মিরজাফর। তাই সিরাজের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীকে মদত দিয়েছে ইংরেজরা—একথাই এখন প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাধারণ মানুষের মনে। তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। বোঝাতে হবে সিরাজদ্দৌলাকে হটিয়ে ইংরেজরা সুবে বাংলার মঙ্গলই করেছে। এসময়টা মাথা গরম করার নয়, গোলমাল করার নয়, ডিপ্লোম্যাট রবার্ট ক্লাইভ এসব ভালোই বোঝেন। অথচ অকারণে পরিস্থিটা ঘোরালো করে তুলছে মিরজাফরের বেওকুফ ছেলেটা।
মিরনের উপরে হাড়েহাড়ে চটে গেলেন কর্নেল। রাগে তাঁর মুখটা লাল হয়ে উঠল। কর্নেলের মনে হল চিঠিতে যে কন্সপিরেসির কথা শেঠজি লিখেছেন, সেটা মিরনেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। চিঠি যদি কোনওভাবে ফাঁস হয়ে যায়, এই ভয়ে হয়তো জগৎশেঠজি মিরনের নামটা উল্লেখ করেননি।
মিরজাফরকে হাতের মুঠোয় রেখে অবাধে একচেটিয়া বাণিজ্য করে যাবে ইংরেজরা। নয়া নবাবকে দম ফেলার ফুরসত দেবে না। এতদিনে ইংরেজদের ব্যবসার যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা কড়ায়গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বেন ক্লাইভ। বহিরঙ্গে পরম অনুগত ভাবটা বজায় রেখে নিখুঁত ডিপ্লোম্যাসির প্যাঁচে তিনি নবাবের টুঁটি টিপে ধরতে চান। এসব ক্লাইভের মনের প্রচ্ছন্ন অভিসন্ধি। এখনও বাহিনীর মেজর ও ক্যাপটেনদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনও আলোচনা তিনি করেননি। তবে মিরন কি পড়ে ফেলেছে তাঁর মনের কথা? তাঁর হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে খোলা আকাশে আজাদ চিড়িয়ার মতো ডানা মেলে ওড়ার খোয়াব দেখছে? তাই তাঁকে খতম করার ভাবনা দেখা দিয়েছে মিরনের মাথায়? কিন্তু ওই ছোকরাকে দেখে তো মনে হয় না এতটা ইনটেলিজেন্ট। এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে হাতদুটোকে পিছন দিকে জড়ো করে ফের পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ।
নবকৃষ্ণ জোড়হাত হয়ে বলেন, ‘একটা কথা ছিল হুজুর।’
হাঁটতে হাঁটতেই ক্লাইভ বললেন, ‘বলো মুনশি।’
‘শুনলাম নানি বেগম, আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগম কয়েদ হয়েছেন। মিরজাফরের বেটা এই সময় দুম করে আলিবর্দির রিসতেদারদের কোতল করে না বসে। তাহলে কিন্তু চরম গোলমাল উপস্থিত হবে।’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ আর রাইট মুনশি। এক কাজ করো তো, চট করে একবার মেজর আয়ারকুটকে খবর দাও। বলো আমি ডাকছি।’
নবকৃষ্ণ শশব্যস্ত হয়ে চলে যান।
খানিকবাদে আয়ারকুট হন্তদন্ত হয়ে এসে স্যালুট করেন কর্নেলকে।
ক্লাইভ গম্ভীর মুখে বলেন, ‘গুড মর্নিং মেজর।’
‘গুড মর্নিং স্যার।’ মুখে একথা বললেও ক্লাইভের থমথমে মুখখানা দেখে আয়ারকুট বুঝলেন মর্নিং মোটেই গুড নয়।
আয়ারকুটকে দ্রুত পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে দিয়ে ক্লাইভ হুকুম করেন, ‘ইমিডিয়েটলি প্রসিড টু মুর্শিদাবাদ উইথ টু হান্ড্রেড কনটিনজেন্ট। আই ওয়ান্ট ইমিডিয়েট রেস্টোরেশন অফ পিস। আরেকটা কথা মিরনকে কড়া ভাবে বুঝিয়ে দিও, আমি এখানে হাজির থাকতে আলিবর্দির কোনও রিসতেদারের খুন যেন না ঝরে।’
‘ইয়েস স্যার।’
ক্লাইভের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কয়েকঘণ্টার মধ্যেই ফৌজসহ মুর্শিদাবাদের পথে রওনা হয়ে গেলেন আয়ারকুট। সঙ্গী ওয়ারেন হেস্টিংস।
.
