1 of 2

পলাশির পরে – ১২

১২

রাজমহলের কাছে তেলিয়াগড়িতে একটা পাথুরে টিলার উপর দাঁড়িয়ে আছেন ফরাসি সেনাপতি জাঁ ল। চোখে দূরবিন। দৃষ্টি দূরে। দুই ফরাসি ঘোড়সওয়ারের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা করছেন ল সাহেব। বাংলার হালহকিকত নিয়ে তিনি চিন্তিত। তাই আগাম খবর সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছেন দুই অতি বিশ্বস্ত সহকর্মীকে। পরিস্থিতি বুঝে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, বাহিনী নিয়ে সামনে এগোবেন, না ফিরে যাবেন পাটনায়।

জাঁ ল’র মন চাইছে সামনে এগোতে। সেইমতো শুভ সংবাদের প্রত্যাশা করছেন তিনি। টিলার পাদদেশ থেকে শুরু করে সামনে বহুদূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে ধুধু রুক্ষ প্রান্তর। নাঃ! ঘোড়সওয়ারদের দেখা নেই। গলায় ঝোলানো দূরবিনটা নামিয়ে রেখে চুরুট ধরালেন জাঁ ল। দৃষ্টি গেল নীচের দিকে।

টিলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে তিরিশটি গো-গাড়ি। ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। কামান, গোলা-বন্দুক রসদে বোঝাই। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে চারটি হাতি স্তূপীকৃত সবুজ পাতা সাবাড় করে চলেছে। পাটনা থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে আসার সময় নিজের বাহিনীকে শক্তিশালী করতে পাটনার নায়েব রামনারায়ণের কাছ থেকে হাতি চারটি ধার করেছেন জাঁ ল। তিরিশটি গো-গাড়ি, চারটি হাতি, তাঁবু-বরদার, মুটে-মজুর ছাড়া মাত্র দু’শোজন সৈন্য রয়েছে ল’র সঙ্গে। সৈন্যরা হাতিয়ার হাতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। প্রস্তুত তাঁবু-বরদারেরাও। জেনারেলের হুকুম হলেই দ্রুত তাঁবু গুটিয়ে ফের পথ চলতে হবে।

উপর থেকে ফরাসি বাহিনীকে অতি ক্ষুদ্র দেখাচ্ছে। এ যেন বাংলায় বিলীন হওয়ার প্রহর গুনতে থাকা ফরাসি শক্তির প্রতীক। টিলার নীচে সরু রেখার মতো কয়েকসারি তাঁবুর মাথায় উড়ছে ফরাসি পতাকা। সেদিকে চেয়ে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেন জাঁ ল। বুকের মধ্যে কেমন একটা কষ্ট যেন পাক দিয়ে ওঠে। চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়।

চিরশত্রু ইংরেজদের কাছে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেতে হল সুবে বাংলায়। নবাবের চোখের সামনেই অন্যায় ভাবে ইংরেজরা ফরাসিদের চন্দননগরের উপনিবেশ গুঁড়িয়ে দিল। নবাব সিরাজদ্দৌলার প্রতি কোনও অনুযোগ নেই ল সাহেবের। নবাব তো অন্যায়ের প্রতিকার করতেই চেয়েছিলেন। রায়দুর্লভের নেতৃত্বে ফৌজও পাঠিয়েছিলেন। হুগলির ফৌজদার নন্দকুমারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইংরেজরা চন্দননগর আক্রমণ করলে তিনি যেন ফরাসিদের সাহায্য করেন। কিন্তু নবাবের হুকুম তামিল হল না। উৎকোচের লোভ দেখিয়ে নন্দকুমারকে নিষ্ক্রিয় করে রাখল ইংরেজরা। ক্লাইভের ভয়ে ভীত রায়দুর্লভ থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন হুগলি থেকে অনেক দূরে। গায়ের জোরে ইংরেজরা চন্দননগর গুঁড়িয়ে দিল।

কী করবেন সিরাজদ্দৌলা? তিনি যে ঘরে-বাইরে শত্রু পরিবৃত। কথা ছিল ফরাসিদের সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের প্রতিকার করতে ফরাসি জেনারেল বুসি নৌবহর নিয়ে বাংলায় আসবেন। আশায় বুক বেঁধেছিল ফরাসিরা। ফরাসি নৌবহর এলে ইংরেজদের কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফেলা যাবে ভেবে আশান্বিত হয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলাও। প্রতীক্ষাই সার হল, বুসি এলেন না।

তবুও হাল ছাড়েননি জাঁ ল। মনে ভরসা ছিল এই যে, কাশিমবাজারের কুঠিটাতো এখনও রয়েছে। রয়েছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। তিনি ফরাসিদের বন্ধু। সিরাজদ্দৌলার মদতে অচিরেই হয়তো ফরাসিদের সুদিন ফিরবে। জাঁ ল প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—ষড়যন্ত্রের আঁচ লাগতে দেবেন না সিরাজের গায়ে। জান কবুল করে তাঁকে আগলে রাখবেন তিনি। কিন্তু কী হল? বদকিসমতি দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে ফরাসিদের।

চুরুটের আগুন নিভে গিয়েছে। আধপোড়া চুরুটটা ছুড়ে ফেললেন ল সাহেব। সূর্যকে ঢেকে দিচ্ছে হঠাৎ ছুটে আসা আষাঢ়ের কালো মেঘ। খানিকবাদেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। ফের একবার দূরবীনে চোখ রাখলেন জাঁ ল।

নাঃ! ঘোড়সওয়ারদের দেখা নেই।

অস্থির ভাবে পায়চারি করতে করতে ল ভাবছিলেন সিরাজদ্দৌলার নির্বুদ্ধিতার কথা। দরবারের ওমরাহদের প্রায় সবাইকে দুশমন করে তুললেন নবাব। তাঁর দোস্ত বলতে ছিল কেবল মোহনলাল ও মিরমদন। আর ছিলেন জাঁ ল। দরবারে সিরাজের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র পেকে উঠছে তার স্বরূপ অনেক আগেই ধরা পড়েছিল ল’র চোখে। এই সাজিশির কথা তিনি নবাবের কাছে ফাঁস করে দিতে চেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য সিরাজের। দুর্ভাগ্য ফরাসিদের। ল’র হুশিয়ারি হেসে উড়িয়ে দিলেন সরলমতি নবাব।

ইংরেজরা টের পেয়েছিল ল সাহেবের অভিসন্ধি। তিনি সিরাজের আশেপাশে থাকলে ষড়যন্ত্রকে রূপ দেওয়া কঠিন। ফরাসিদের কাশিমবাজার থেকে বিতাড়িত করবার জন্য নবাবের উপর চাপ তৈরি করলেন ক্লাইভ, ওয়াটসন ও ওয়াটস। স্নায়ুর চাপে দিশেহারা হয়ে গেলেন অপরিণত যুবক সিরাজদ্দৌলা। তাঁর হুকুমে দলবল নিয়ে কাশিমবাজার থেকে পাটনায় যেতে বাধ্য হলেন জাঁ ল।

বিদায়বেলায় সিরাজদ্দৌলা বলেছিলেন, ‘কোনও গোলমাল বুঝলে পাটনা থেকে আপনাকে আমি ডেকে নেব। তুরন্ত চলে আসবেন।’

জবাবে ল বলেছিলেন, ‘সে সুযোগ বোধহয় আপনি আর পাবেন না হুজুর। মনে হচ্ছে এই আমাদের শেষ দেখা।’

আজ ল ভাবছেন অন্য কথা। হৃদয়ের অন্তঃস্থল পরমেশ্বরের প্রতি প্রার্থনা জানাচ্ছেন। যে ভবিষ্যৎবাণী তিনি করেছিলেন সিরাজদ্দৌলার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে, তা যেন সত্যি না হয়। সুবে বাংলায় ফরাসি উপনিবেশের পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য সিরাজদ্দৌলাকে ল সাহেবের আজ বড়ই প্রয়োজন।

২২ জুন ১৭৫৭। সিরাজদ্দৌলার চিঠি এসে পৌঁছয় ল সাহেবের হাতে। ‘…লড়াই বাঁধতে চলেছে ইংরেজদের সঙ্গে। জনাব ফৌজ নিয়ে জলদি মুর্শিদাবাদে চলে আসুন…’

এই পত্র পেয়ে দ্রুত পাটনা থেকে মুর্শিদাবাদ অভিমুখে চলেছেন জাঁ ল। তেলিয়াগড়িতে এসে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। আজ ১ জুলাই। তাঁর মনে শঙ্কা হল এই যে তিনি মুর্শিদাবাদে পৌঁছনোর আগেই সিরাজদ্দৌলা যদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, তবে তাঁর পক্ষে জিৎ হাসিল করা খুবই কঠিন। কারণ নবাব চারিদিক থেকে শত্রু পরিবৃত। তিনি যদি লড়াইয়ে হেরে যান তবে মুর্শিদাবাদে পা দিলেই জাতশত্রু ইংরেজদের হাতে ফরাসিদের আরেকপ্রস্থ নাকাল হতে হবে।

জাঁ ল এখন মনেপ্রাণে চাইছেন, নবাব যেন ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই না বাঁধিয়ে কোনও অছিলায় সময় নষ্ট করেন। তাঁর জন্য যেন অপেক্ষা করেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনে থেকে নবাবের ফৌজকে নেতৃত্ব দিতে চান ল সাহেব। দুরমুশ করে দিতে চান ইংরেজদের। সিরাজদ্দৌলার সাহায্য নিয়ে বাংলা থেকে ইংরেজদের উৎখাত করে চন্দননগরে ফরাসিদের বিপর্যয়ের বদলা নেওয়ার স্বপ্ন ভেসে বেড়ায় ল’র দুই চোখে।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে গলায় ঝোলানো ক্রসটায় হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন ল। ভগবান যিশুর উদ্দেশে বলেন, ‘প্রভু, আমার মন যা চাইছে, তাই যেন হয়। আমি মুর্শিদাবাদে না পৌঁছনো পর্যন্ত যেন নিরাপদে থাকেন সিরাজদ্দৌলা।’

হঠাৎ অনেক দূরে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী চোখে পড়ায় ব্যস্ত হয়ে দূরবীনটা ফের চোখে লাগালেন জাঁ ল। তিরবেগে ছুটে আসছে একজন ঘোড়সওয়ার। পরনে ফরাসি সৈনিকের পোশাক। মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। টিলার ঢাল বেয়ে দ্রুত নীচে নেমে আসেন ল।

ফরাসিদের তাঁবু দেখে ঘোড়ার গতি শ্লথ করে ঘোড়সওয়ার। টিলার পাদদেশে এসে থামে। এই ঘোড়সওয়ার হলেন গোলন্দাজ সিনফ্রে। বিধ্বস্ত তাঁর চেহারা।

সিনফ্রেকে হঠাৎ এভাবে হাজির হতে দেখে জাঁ ল-এর মন অমঙ্গল আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। ব্যস্ত গলায় তিনি প্রশ্ন করেন, ‘Quoi de nouf?—কী সংবাদ মঁসিয়ে?’

ম্লান মুখে সিনফ্রে জবাব দেন, ‘Le destin de Sirajdaula a été ruiné dans le désert de Plassy—পলাশির প্রান্তরে সিরাজদ্দৌলার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে।’

‘লড়াই খতম?’

‘Oui—হ্যাঁ। জঙ্গ ফতে করেছে ইংরেজরা। সিরাজদ্দৌলা পলাতক। আমি কোনওরকমে পালিয়ে এসেছি।’

সহসা চোখে যেন অন্ধকার দেখেন জাঁ ল। ইংরেজদের বাংলা থেকে বিতাড়ন করার আশা, ফরাসিদের অপমানের বদলা নেওয়ার স্বপ্ন নিমেষে চুরমার হয়ে যায়।

এমন সময় বাতাসে ভেসে আসে দ্রুতগামী ঘোড়ার খুরের শব্দ। দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ল দেখেন, যে দুই ফরাসি ঘোড়সওয়ারের ফিরে আসার প্রতীক্ষা তিনি করছিলেন, তারা ফিরে আসছে। প্রচণ্ড বেগে। ল পতাকা উড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাদের।

দুই ঘোড়সওয়ার এসে জানায়, ‘Extr-mement mauvaise nouvelle—ঘোর দুঃসংবাদ মঁসিয়ে। আজ সকালে এখান থেকে বিশ মাইল দূরে মিরকাশিমের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সিরাজদ্দৌলা। আমাদের খোঁজে বিরাট ফৌজ নিয়ে এদিকে ধেয়ে আসছেন রাজমহলের ফৌজদার মির দাউদ। এখনই তাঁবু গুটিয়ে দ্রুত আমাদের পিছু হটতে হবে।’

প্রবল হতাশায় মাথা ঝুঁকিয়ে দু’হাতে মুখ ঢাকেন জাঁ ল।

.

খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল দুপুরের দিকেই। সেই থেকে পথের দু’পাশে ভিড় জমিয়ে তুলছিল আমআদমি, এখন চারিদিক লোকে লোকারণ্য। ভিড় সামলাতে ব্যস্ত কোতোয়ালির সেপাই ও নিজামতের সেনারা। দৃশ্যটা দেখে গোটা চকবাজার স্তম্ভিত। পথের দু’পাশে ভিড় জমাট বাঁধলেও কারও মুখে কথা নেই। কোনও কলরব নেই, হুড়োহুড়ি নেই, গুঞ্জন নেই। চারিদিক অদ্ভুতরকম থমথমে। লোকজন বাক্যিহারা। হতচকিত।

পথের ধারের হাভেলিগুলোর অলিন্দে, ছাতেও অগণিত মানুষের ভিড়। এই জনতার কারও কারও বুকে বাজছে বিষাদের সুর, অন্তরে গুমরে উঠছে শুধু নীরব কান্না। চোখদুটো অশ্রুসজল। কারও কারও চোখে অবশ্য খুশির ঝিলিকও নজর করা যাচ্ছে।

যাই হোক, হর্ষে পুলকিত বা বিষাদে মুহ্যমান কারওরই যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না, চর্মচক্ষে এই মুহূর্তে তারা যা দেখছে সেটা স্বপ্ন না সত্যি! মাত্র ক’দিন আগেও যিনি ছিলেন নবাব, তামাম বাংলা-বিহার-ওড়িশার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, যাঁর খায়েশে জারি হত ফরমান, যাঁর আরজুতে কারও কপালে জুটত খেলাত-খেতাব-তোফা, যাঁর হুকুমে কারও জীবনে নেমে আসত জাহান্নমের দিগদারি, সেই সিরাজদ্দৌলাকে মিরকাশিমের সেনারা কোমরে দড়ি বেঁধে আর পাঁচজন সাধারণ কয়েদির মতো চকবাজারের পথ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!

সত্যিই কি বন্দি ওই যুবকের নাম সিরাজদ্দৌলা? ওই যুবকটি আলিবর্দির স্নেহপুত্তলি? চেহারাটা দেখে তাই তো মালুম হচ্ছে। হায় রে নসিবের খুশখেয়াল!

কুরসি বদল মুর্শিদাবাদ আগেও দেখেছে। মুর্শিদকুলির নাতি সরফরাজ খাঁকে হটিয়ে মসনদে বসেছিলেন আলিবর্দি। তামাম মুর্শিদাবাদ আগে যা দেখেনি, তা আজ প্রত্যক্ষ করছে। ভূতপূর্ব একজন নবাবের এই বেনজির বেইজ্জতি। সরফরাজের মুদ্দত নিয়ে শাহি হাতি চেহেল সেতুনে ফিরে এসেছিল চুপিসারে। গভীর রাতে অনাড়ম্বরে দাফন করা হয়েছিল সরফরাজকে। কেউ জানতে পারেনি। গিরিয়ার যুদ্ধে প্রাণ দিয়ে একদিক থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন মুর্শিদকুলির নাতি। সিরাজদ্দৌলার মতো গদ্দারদের হাতে এমনতর দিগদারি তাঁর হয়নি।

কালি পড়েছে সিরাজের দু’চোখের তলায়। উসকোখুসকো চুলে ধুলোর আস্তরণ। গোধূলির মরা আলোয় সুকুমার মুখখানাকে বড় মলিন দেখাচ্ছে। পরনে ময়লা পিরান ও হাঁটু পর্যন্ত গোটানো তহবন্দ। কোমরে এঁটে বসা শক্ত করে বাঁধা দড়ির দুই প্রান্ত শক্ত করে ধরে রেখেছে তাগড়াই চেহারার দু’জন পেয়াদা। সিরাজের পাশে পাশে হাঁটছে জহ্লাদের মতো চেহারার দুই লস্কর। তাদের হাতে উদ্যত কোড়া। তারপরেও প্রাক্তন নবাবকে উন্মুক্ত তরবারি হাতে ঘিরে রেখেছে একদল আহেদি। তারা অত্যন্ত সতর্ক। সিরাজদ্দৌলাকে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিতে হবে নবাব মিরজাফর খাঁর হেফাজতে।

সিরাজের হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। মাথা নিচু করে চকবাজারের পাথর বাঁধানো পথ ধরে খালি পায়ে হেঁটে চলেছেন যন্ত্রের মতো। দীর্ঘপথ হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। পাথরে, কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে পা দুটো। পায়ের গোড়ালিতে শুকিয়ে আছে রক্ত। কষ্ট হচ্ছে পা ফেলতে। তবুও রেহাই নেই। তাঁকে হাঁটতে হচ্ছে ফৌজিদের চলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

ভিড়ের মধ্যে থাকা মানুষজনদের অনেকেই অত্যন্ত চাপা গলায় ফিসফাস করছে। সিরাজের খুশখেয়ালে যাদের জীবনে নেমে এসেছিল দুর্বিপাক, জহমত, যারা তার বরবাদি চেয়ে হরবখত দোয়া মেঙেছে আল্লার কাছে, পলাশির প্রান্তরে সিরাজের পরাজয়ের খবর শুনে যাদের মনে খুশির তুফান উঠেছিল, চকবাজারের পথে সিরাজের এই আওকাত দেখে তাদের অন্তরেও মোচড় দিচ্ছে সূক্ষ্ম ব্যথা। তারাও বলছে, আর যাই হোক, আলিবর্দির দৌহিত্রের প্রতি আর একটু সম্মান দেখাতে পারতেন মিরজাফর। দু’দিন আগেও যিনি ছিলেন সুবে বাংলার নবাব, তাঁকে মামুলি এক তস্করের মতো, জনসমক্ষে হাঁটিয়ে এমন বেইজ্জত না করলেই ভালো হত।

শাহি রিয়াসতে অবশ্য এসব আবেগের কোনও দাম নেই। যে জঙ্গ ফতে করে তার জিন্দেগি গুলশন বনে যায়। গালিবের দুনিয়া তাগদের জলোয়ায় জেল্লাদার হয়ে ওঠে। আর যে হেরে যায়, তার নসিবে লেখা থাকে বেইজ্জতি, জিন্দানখানার আঁধারে দিন গুজারের অভিশাপ, অন্তহীন দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রণা। যা অন্ত হয় দাফনে। তাগদবাজেরা তাগদ হারিয়ে এ ভাবেই শেষ হয়ে যায়। জঙ্গবাজির ময়দানে যে কামেয়াব হয় সে তার প্রতিপক্ষকে চিরতরে বিনাশ করতে চায়। দুশমনের মওত না হলে গালিবের বেতাব দিলের আখেজ, আদাওতি, খুনজোশীর চ্যায়েন হয় না।

ফূর্তিতে মাতোয়ারা মিরকাশিমের বাহিনী। সকলকে মোটা ইনাম দেবেন বলে কড়ার করেছেন মিরকাশিম। বাজনদারেরা সেই খুশিতে কাড়ানাকাড়ার শব্দে কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে। বাজনা বাজিয়ে তামাম মুর্শিদাবাদকে মিরকাশিম জানাচ্ছেন তার কামালিয়তের কিসসা। বন্দি সিরাজদ্দৌলা এই কামালিয়তের সাবুত।

শোভাযাত্রার একেবারে সামনে অশ্লীল ভঙ্গিতে কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে চলেছে মিরনের দুই জঘন্য শাগরেদ—চুনিলাল ও মুন্নিলাল। তাদের পিছনে রয়েছে বাজনদারেরা। এদের পিছনে সেনা পরিবৃত হয়ে যন্ত্রের মতো হেঁটে চলেছেন সিরাজদ্দৌলা। তাঁর পিছনে মিরকাশিম। বসে আছেন হাতির পিঠে আম্ভারীতে। চোখেমুখে কামেয়াবির খুশির ঝিলিক। একেবারে পিছনে আসছে ফৌজের বাকি সেপাই-আহেদিরা।

শারীরিক ধকলে ও গভীর অবসাদে সিরাজের শরীরটা একেবারে যেন ভেঙে আসছে। এরপরে কী অপেক্ষা করে আছে তাঁর নসিবে, জানেন না। তাগদ-ক্ষমতা-জোশ এসব আর কিচ্ছু ফিরে পেতে চান না সিরাজ। খোদার দুনিয়া বহুত সুন্দর। শুধু বাঁচতে চান সিরাজ। কিন্তু গদ্দারেরা তাঁকে রেয়াত করবে কি?

মসনদের প্রতি সিরাজের মনে জন্মেছে তীব্র বিতৃষ্ণা। ভেবেছিলেন, মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়ে পাটনায় গিয়ে নায়েব রামনারায়ণ ও ল সাহেবের সঙ্গে মিলিত হয়ে ফের ফৌজ গড়ে তুলবেন। তারপর তুফান হয়ে আছড়ে পড়বেন মুর্শিদাবাদে। সবক শিখিয়ে ছাড়বেন ইংরেজদের। কোতল করবেন গদ্দারদের। এসব ভাবনা মন থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলেছেন সিরাজ। এই হিন্দুস্তানের কোনও এক অজানা দেহাতে একজন আমআদমির মতো অনাড়ম্বরে বাঁচতে চান তিনি। লুৎফা আর উম্মেসায়েরাকে নিয়ে ছোট্ট একটা সুখের নীড় গড়ে তুলতে চান। তার এই আরজু কি খোদাতালা মঞ্জুর করবেন?

লুৎফা ও উম্মেসায়েরার কথা মনে হতেই সিরাজের বুকটা হুহু করে ওঠে। কোথায় লুৎফা? কোথায় উম্মেসায়েরা? এখন কোথায় আছে তারা? কী লাঞ্ছনা জুটছে তাদের নসিবে সিরাজ কিছুই জানেন না। গ্রেফতারির পরেই মিরকাশিমের সেনারা তাঁর থেকে লুৎফা আর উম্মেসায়েরাকে আলাদা করে দিয়েছে। বিষাদে ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সিরাজদ্দৌলা। শ্লথ হয়ে গিয়েছে হাঁটার গতি। হঠাৎই পাশ থেকে তাঁর গায়ের উপর এসে পড়ে কোড়ার আঘাত। যন্ত্রণায় কাতর আর্তনাদ করে ওঠেন সিরাজদ্দৌলা। এই দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে আমজনতা।

গোধূলির আলো নিভছে। সন্ধে নামছে। খানিবাদেই আঁধারে ডুববে রাজধানী। সিরাজকে নিয়ে শোভাযাত্রা এগিয়ে চলে নিজামত কেল্লার নৌকোঘাটের দিকে। গন্তব্য হিরাঝিলের প্রাসাদ। চকবাজারের মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে তখন ভেসে আসছে আজানের সুর—

আশহাদু-আল্লা-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

আশহাদু-আল্লা-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

হাইয়া আলাস সালাহ।

হাইয়া আলাস সালাহ।

হাইয়া আলাল ফালাহ।

হাইয়া আলাল ফালাহ।

সিরাজ আকাশের দিকে মুখ তুলে মোনাজাত করেন, রহেম করো আল্লা। রহেম করো আমাকে।

.

অবেলায় নিদ্রা গিয়েছিলেন মিরজাফর।

সন্ধে নামল। আলোয় ঝলমল করে উঠল হিরাঝিল প্রাসাদ। মিরজাফর তখনও ঘুমোচ্ছিলেন। হিরাঝিলের হারেমে। অর্ধ্ননগ্ন অবস্থায়, নিরাবরণ এক গুলবদন যুবতীর নগ্নবাহুতে মাথা রেখে।

গুলকারি সুজনিতে ঢাকা পাখির পালক দিয়ে তৈরি নরম গদির উপরে সুখনিদ্রায় নিমজ্জিত নবাব মিরজফরকে ডেকে তুলল মিরন।

একজন খোজার মারফত হারেমের অভ্যন্তরে মিরনের পাঠানো চিরকুটে চোখ বুলিয়ে সিরাজের গ্রেফতারির খবরটা শুনে খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন মিরজাফর। বেশবাস সামলে দরহাল ছুটে বেরিয়ে এলেন অন্দরমহল থেকে। তাঁর নির্দেশে তখনই দূত ছুটল মোরাদবাগ প্যালেসের উদ্দেশে। কর্নেল ক্লাইভকে এই শুভ সংবাদটা জানাতে হবে।

মুখে মৃদু হাসির রেশ নিয়ে মিরজাফরের সামনে এসে তসলিম জানালেন মিরকাশিম। আবেগে দামাদকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন মিরজাফর।

জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ প্রমুখ প্রবীণ ওমরাহেরাও সিরাজের গ্রেফতারির খবর পেয়ে ছুটে এলেন হিরাঝিল প্রাসাদে। সিরাজের ভবিতব্য কী হবে তা নির্ধারণ করার জন্য তখনই দরবার বসল।

এই সেই হিরাঝিল। আলিবর্দি যখন সিরাজকে তার উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করলেন, সিরাজ বলেছিলেন, দশজন ফকির একটা জীর্ণ কম্বল গায়ে দিয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু একই প্রাসাদে দুইজন নবাবের থাকাটা ভালো দেখায় না।

দৌহিত্রের কথার ইঙ্গিতটা বুঝলেন আলিবর্দি। তারপরেই ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে দৌহিত্রের জন্য একটি রাজকীয় প্রাসাদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেন তিনি। সিরাজ নিজে দেখভাল করে গড়ে তুলেছিলেন বেহেস্তের মতো সুন্দর এই প্রাসাদ। কারিগরেরা এসেছিল দিল্লি আগ্রা থেকে। গৌড়ের পরিত্যক্ত হাভেলিগুলো ভেঙে নিয়ে আসা হয়েছিল পাথর।

এই প্রাসাদের দেখভাল নিমিত্ত কর আদায়ের জন্য পাশেই একটা গঞ্জ স্থাপন করেছিলেন আলিবর্দি। মনসুর-উল-মুলক উপাধি পেয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। সেই থেকে গঞ্জের নাম হয় মনসুরগঞ্জ। হিরাঝিল প্রাসাদকে অনেকে বলে থাকেন মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ।

মিরজাফরকে সুবে বাংলার মসনদে বসাতে এসে হিরাঝিল প্যালেসের বৈভব ও সাজসজ্জা দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল কর্নেল ক্লাইভের। প্রকাশ্যেই তিনি কবুল করেছিলেন, আলিশান এই প্রাসাদে আড়েবহরে এতটাই বড় যে একসঙ্গে তিনজন ইউরোপীয় রাজা এখানে অনায়াসে বসবাস করতে পারেন।

সন্ধের আলোয় ঝলমল করছে হিরাঝিল প্রসাদ। গোটা বাগান জুড়ে বাহারি শামদানে জ্বলছে অভ্রের পাত। নতুন নবাব মিরজাফরকে স্বাগত জানাতে ফুল, লতাপাতায় সেজেছে গোটা প্যালেস। সর্বত্র বিরাজ করছে বেহস্তের খুশি। নহবতখানা থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর। রংমহলে চলছে মুজরোর প্রস্তুতি। কানে ভেসে আসছে তবলা ও সারেঙ্গির আওয়াজ। সন্ধের শীতল বাতাস ঢেউ তুলছে হিরাঝিলের জলে। বাতাসে ভেসে আসছে সুগন্ধিফুলের সুবাস।

চেনা ছবি, চেনা গন্ধ। বহুকালের পরিচিত সবকিছু। তবুও কেমন যেন অচেনা। প্রাসাদে প্রবেশের মুখে প্রিয় হিরাঝিল প্যালেসকে অবাক চোখে দেখছিলেন সিরাজদ্দৌলা। নজরে পড়ছিল গোলাম-বাঁদি-বান্দাদের অতিপরিচিত মুখগুলো। সেই চোখগুলোর ভাষায় আজ মিশে রয়েছে তাঁর প্রতি সীমাহীন তাচ্ছিল্য। জমানা বদলে গেলেই সবাই বদলে যায়।

হিরাঝিল প্রাসাদে এনে সিরাজকে রাখা হয়েছে অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এক কারাকক্ষে। পাথরের মেঝের উপরে পাতা জীর্ণ একখানা চাটাইয়ের উপরে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসেছিলেন সিরাজ। চোখ বুজে আসছে ক্লান্তিতে। হঠাৎ শিউরে উঠলেন সিংহের গর্জন শুনে। অদূরেই হিরাঝিল প্রাসাদের পশুশালা। গর্জন করছে সিরাজের পোষা সিংহ আলাদিন। সে কি টের পেয়েছে যে তার মনিব আজ নিজের হাভেলিতেই গদ্দারদের হাতে বন্দি? আলাদিনের গলার আওয়াজ শুনে সিরাজের অশান্ত মনে কিছুটা হলেও যেন শান্তির প্রলেপ লাগল। পোষা জানোয়ার সবসময়ই তাঁর মনিবের অনুগত। সে কখনও বেইমানি করে না।

খানিকবাদে কয়েকজন পেয়াদা এসে কারাকক্ষের দরজা খুলল। ডাক পড়েছে। দরবার ঘরে যেতে হবে। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন সিরাজ। মাথা টলছে।

.

2 Comments
দীপ্তক বিশ্বাস October 7, 2026 at 1:39 pm

নমস্কার, আপনারা কি পুরো বইটা এখনও আপলোড দেন নি? অর্ধেকের বেশিই তো কিছু দেখাচ্ছে না।

বাংলা লাইব্রেরি (Administrator) October 7, 2026 at 6:26 pm

আজ পুরোটা দেয়া হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *