1 of 2

পলাশির পরে – ৪২

৪২

কাটোয়ায় শিবির ফেলেছেন ওড়িশার মারাঠা সর্দার শিবভট্ট। সঙ্গে শতখানেক অনুচর। তাতেই ত্রাসে কাঁপছে কাটোয়া ও তার আশেপাশের এলাকা। ফের বর্গির হাঙ্গামা শুরু হবে ভেবে গাঁ ছেড়ে পালাচ্ছে লোকজন।

শিবভট্ট ভাবছেন, নবাব যেমন দুর্বল হয়ে পড়েছেন তাতে সুবে বাংলা দখল করে নেওয়া এমন কিছু শক্ত নয়। কাঁটা কেবল কাশিমবাজার ও মুর্শিদাবাদে মজুত গোরা পল্টন ও তাদের কামান।

বর্গিদের শান্তিচুক্তির শর্ত হিসেবে ওড়িশা প্রদেশ মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। শুধু মেদিনীপুরকে ওড়িশা থেকে কেটে নিয়ে বাংলার সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছিলেন। সেই থেকে ওড়িশা প্রদেশ শাসন করছে মারাঠারা।

পৌষের এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে কাটোয়া থেকে ভাগীরথী পার হয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে ধেয়ে চললেন শিবভট্ট ও তার বিশ জন অনুচর।

আকাশে উড্ডীন গৈরিক পতাকা। সহসা জয় শিবো শম্ভু! জয় শিবো শম্ভু—ধ্বনিতে কেঁপে উঠল চারিদিক। পথের দুপাশের গায়ের মানুষজন ভয়ে আগল তুলল দরজায়। লুঠতরাজের ভয়ে কেউ কেউ সঞ্চিত ধনসম্পদ মাটিতে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে ফেলল দ্রুত। না! এবারে লুঠতরাজ নয়, হাঙ্গামা নয়, শিবভট্ট এসেছেন নবাবের সঙ্গে একটা জরুরি বিষয়ে আলোচনা করতে।

ঘোড়ার খুরে ধুলোর ঝড়। চকবাজার ছাড়িয়ে চেহেল সেতুনের দিকে ছুটে চললেন শিবভট্ট। নবাব রাজধানীতে নেই শুনে তিনি ও তাঁর অনুচরেরা দেওয়ান রায়দুর্লভের প্যালেসের দেউড়িতে এসে হাজির হলেন। ওড়িশার বর্গি সর্দার এসেছেন কোনও একটি বিষয়ে আলোচনা করতে।

নবাবের অবর্তমানে মারাঠাদের সঙ্গে কোনও আলোচনার মধ্যে যেতে চান না রায়দুর্লভ। তাছাড়া বর্গিদের সম্বন্ধে তাঁর প্রচণ্ড ভীতি রয়েছে। শিবভট্টের আগমন সংবাদ শুনেই আতঙ্কে হাভেলির সব দরওয়াজা বন্ধ করে দিতে বললেন রায়দুর্লভ। যদিও শিবভট্ট বার্তা পাঠিয়েছেন, ভয়ের কিছু নেই, একটা জরুরি বিষয়ে তিনি দেওয়ানের সঙ্গে আলোচনা করতে চান। কিন্তু বর্গিদের তামান্না কী তা কে জানে। মিরনের গুপ্ত ঘাতকদের হাতে কোতল হয়ে যাওয়ার ভয়ে এমনিতেই রায়দুর্লভ আধমরা হয়ে রয়েছেন। তার মনের মধ্যে দেখা দিল সন্দেহ। বর্গিদের সঙ্গে সাজিশি করে তাকে কোনও বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে চাইছেন না তো মিরন। নিজের মহলের চারিদিকে কড়া পাহারা বসিয়ে দেওয়ানজি শয্যাশায়ী হলেন।

রায়দুর্লভের এহেন আচরণ দেখে মারাঠা সর্দার স্তম্ভিত।

দেওয়ানের অন্দরমহলে ছুটে এলেন তাঁর নায়েব নন্দকুমার। শিবভট্টের লেখা চিরকুট রায়দুর্লভকে দেখিয়ে বললেন, ‘নবাব রাজধানীতে নেই। মারাঠা সর্দারকে অন্দরে ডেকে নিয়ে আপনার কথা বলা উচিত।’

রায়দুর্লভ ত্রস্ত। বললেন, ‘ওদের মতলব কী কে জানে? খবরদার দরজা খুলবেন না।’

‘শিবভট্ট মনে করবেন দেওয়ান বুজদিল।’

‘সেপাইদের বলুন ওদের হটিয়ে দিক।’

‘এতে যে অহেতুক হাঙ্গামা বাধবে হুজুর।’

রায়দুর্লভ ক্ষণেক চিন্তা করে বললেন, ‘বেশ। কথা বলতে হয় আপনিই বলুন। মারাঠা সর্দারের মুখোমুখি হতে আমি চাই না। ওরা কী বলতে চায় শুনে নিন। আমার কথা শুধোলে বলবেন, দেওয়ানজির কঠিন বিমার। বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই।’

দুয়ারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে এবারে বেশ বিরক্ত বোধ করছেন শিবভট্ট। তাঁর অনুচরেরা সমানে আওয়াজ তুলে চলেছে ‘হর হর মহাদেব! হর হর মহাদেব!’

সহসা সদর দেউড়ি খুলে বেরিয়ে এসে শিবভট্টকে স্বাগত জানালেন নন্দকুমার। খাতির করে প্যালেসের অন্দরে নিয়ে গেলেন।

পলাশির যুদ্ধের আগে হুগলির ফৌজদারের দেওয়ান ছিলেন নন্দকুমার। ফৌজদারের পদটি খালি থাকায় তিনি তখন সেই পদেরও দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী নন্দকুমার ভেবেছিলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা তাঁকে ফৌজদারের পদে নিযুক্ত করবেন। কিন্তু কিছুতেই সেটি হয়ে উঠছিল না। চন্দননগর আক্রমণের প্রাক্কালে উমিচাঁদের মারফত নন্দকুমারকে সমঝোতার প্রস্তাব দেন ক্লাইভ। তিনি বলে পাঠান দরবারে তদ্বির করে হুগলির ফৌজদারের পদটি তাঁকে পাইয়ে দেবেন। এই টোপ গিলেছিলেন নন্দকুমার। সিরাজের নুন খেয়েও তার সঙ্গে গদ্দারি করেছিলেন তিনি। ইংরেজদের চন্দনগর আক্রমণের সময় ফরাসিদের সাহায্যে পাঠানো নবাবের ফৌজকে তিনি হুগলিতে দাঁড় করিয়ে রেখে দেন। বিনা বাধায় চন্দননগর গুঁড়িয়ে দেন ক্লাইভ। কাজ হাসিলের পর নন্দকুমারের দায় ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে ইংরেজরা।

পলাশির যুদ্ধের পরেও নন্দকুমারের নসিব বদলায়নি। ওমর বেগকে হুগলির ফৌজদারের পদে বসিয়ে দিলেন মিরজাফর। নিজামতের শাসন কাঠামোর শীর্ষে ওঠার নাছোড় নেশায় দেওয়ান রায়দুর্লভকে বশীভূত করে তার নায়েবের পদে নিযুক্ত হন নন্দকুমার। তাঁর নজর এখন সুবে বাংলার দেওয়ানের পদের উপরে।

কপালে তিলক। কোমরবন্ধনী থেকে ঝুলছে তরবারি। শিবভট্ট বললেন, ‘জয় শিবো শম্ভু।’

নন্দকুমার খোশামুদে ঢঙে বলেন, ‘সুস্বাগতম সর্দারজি।’

‘শুনলাম নবাব রাজধানীতে নেই।’

নন্দকুমার বলেন, ‘হ্যাঁ। পূর্ণিয়া গিয়েছেন।’

‘দেওয়ানজির সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ বললেন শিবভট্ট।

‘দেওয়ানজি শয্যাশায়ী। কঠিন বিমার। আমি তাঁর নায়েব। সব কথা আমাকে বলতে পারেন।’

থমকে গেলেন শিবভট্ট। কপালে ভাঁজ পড়ল। নন্দকুমারকে ভালো করে একবার ইয়াদদস্ত করলেন। শিবভট্টের মনে উঁকি দিচ্ছে সন্দেহ। নন্দকুমার সত্যি কথা বলছেন, না বিমারের আছিলায় মারাঠাদের এড়িয়ে যেতে চাইছেন রায়দুর্লভ? মনের ভাব গোপন করে দরবার ঘরে এসে বসলেন শিবভট্ট। মুখোমুখি নন্দকুমার।

শিবভট্ট বললেন, ‘বেশ আমার যা বলার তা আপনাকেই বলে যাই। আমার কথা নবাব ও দেওয়ানের কানে পৌঁছে দেবেন।’

নন্দকুমার বললেন, ‘জরুর।’

‘আপনি বেশক জানেন যে ওড়িশা প্রদেশের মধ্যে ছিল মেদিনীপুর।’

নন্দকুমার বিনীত ভাবে বললেন, ‘জানি। আপনাদের সঙ্গে সন্ধির সুলেনামা দস্তখত করার আগে মেদিনীপুরকে বাংলার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ।’

‘সহি বাত। আগে ওড়িশা প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল মেদিনীপুর। সুবে বাংলা থেকে চৌথ হিসেবে ওড়িশার রাজস্ব আমরা পাচ্ছি ঠিকই লেকিন মেদিনীপুর থেকেও আমাদের চৌথ আদায় করার কথা। এই বাত আপনি নিশ্চয়ই মানবেন। মেদিনীপুরের মালগুজারি অনেক। আলিবর্দি ধোঁকা দিয়েছেন মারাঠাদের।’

চুপ করে রইলেন নন্দকুমার। তাঁর চোখে চোখ রেখে শিবভট্ট ফের বললেন, ‘মেদিনীপুরের মালগুজারির টাকা আমাদের চাই। নবাব যদি এই দাবি মেনে নেন তো ভালো নইলে…’

ক্ষণিকের জন্য থামলেন শিবভট্ট।

নন্দকুমারের বুক কেঁপে উঠল। মারাঠা সর্দারের কথার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট।

ধারাল দৃষ্টিতে নন্দকুমারের মুখপানে চেয়ে শিবভট্ট বললেন, ‘…নইলে বাংলায় ফের আগুন জ্বলবে। ধোঁকাবাজি মারাঠারা বরদাস্ত করবে না।’

নন্দকুমার বললেন, ‘বেশ আপনার কথা আমি দেওয়ানকে জানাব। নবাব ফিরে এলে তাঁর কানেও তুলব কথাটা। অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছেন। আপাতত একটু বিশ্রাম করুন। জলগ্রহণ করুন।’

‘না। আমার হাতে সময় খুব কম।’

‘আপনি অতিথি। দুয়ার থেকে ফিরে গেলে গৃহস্থের অকল্যাণ হবে যে।’

কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শিবভট্ট বললেন, ‘বাংলায় ফের আগুন জ্বালানোর ইচ্ছে নেই আমাদের। আশা করি আমার কথা নবাবকে বুঝিয়ে বলতে পারবেন আপনি।’

‘নিশ্চয়ই বলব।’

‘মেদিনীপুরের মালগুজারি আমাদের চাইই।’ এই বলে আর দাঁড়ালেন না শিবভট্ট। রায়দুর্লভের হাভেলি থেকে বেরিয়ে এসে লাফ দিয়ে চড়ে বসলেন ঘোড়ায়। তার অনুচরেরা অপেক্ষা করছিল বাইরে। যেমন ঝড়ের গতিতে এসেছিল, তেমনই ফিরে চলল মারাঠা ঘোড়সওয়ারেরা। ধুলোর ঝড় তুলে হারিয়ে গেল নন্দকুমারের দৃষ্টিপথ থেকে।

চিন্তিত হয়ে পড়লেন নন্দকুমার। ফের কি অশান্তি বাধবে? একদিকে বর্গি আরেকদিকে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার হানাদারির ভয়। হাঙ্গামা বাঁধলে ভরসা বলতে তো সেই ইংরেজরা। সেও তো অন্য এক বিপদ। দিনে দিনে নবাব যে ভাবে ইংরেজদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, আর ইংরেজদের দাপট যে ভাবে বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলার মসনদটাই না ইংরেজরা দখল করে নেয়। কী আছে ভবিষ্যতের গর্ভে, কীই বা লেখা আছে তাঁর নসিবে? নানা চিন্তায় বিব্রত নন্দকুমার ঘরমুখো হলেন।

.

অনেকে মনে করছে পূর্ণিয়া অভিযানে নবাবকে মদত দেওয়ার জন্যই কর্নেল ক্লাইভ বিরাট ফৌজ নিয়ে ছুটে এসেছেন। ইংরেজরা দোস্তির কিম্মত চোকাতে জানে। কিন্তু ক্লাইভের আসল উদ্দেশ্য অন্য। পলাশির ইকরারনামা মোতাবেক দ্বিতীয় কিস্তির তেইশ লক্ষ টাকা দেওয়ার সময়সীমা নভেম্বরে পার হয়ে গিয়েছে। নবাবের দিক থেকে কিস্তির টাকা মেটানোর কোনও উদ্যোগ নেই। সেই বকেয়া টাকা আদায়ের ইরাদা নিয়েই ক্লাইভ এসেছেন মুর্শিদাবাদে।

শীতের সকালে ঝলমলে রোদ এসে পড়েছে মোরাদবাগ প্যালেসের দোতলার অলিন্দে। রুপোলি ফিতের মতো ভাগীরথী বয়ে চলেছে অদূরে। আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসে আছেন ক্লাইভ। কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে চিন্তা অবশ্য বকেয়া টাকা আদায় নিয়ে নয়। কর্নেল জানেন কী করে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করতে হয়। আসলে এই মুহূর্তে অন্য এক চিন্তা ক্লাইভের মনকে তোলপাড় করে দিচ্ছে। চিন্তার কারণ চিরকালের দুশমন ফরাসিরা। গতকাল আয়ারকুটের চিঠি পেয়েছেন ক্লাইভ। দক্ষিণে কাউন্ট লালির হাতে চূড়ান্ত নাকাল হচ্ছে ইংরেজবাহিনী।

সত্যিই যদি দক্ষিণে ফরাসিদের হাতে ইংরেজদের চূড়ান্ত বিপর্যয় হয়, তার প্রভাব বাংলার রাজনীতিতে এসে পড়বে। ইংরেজ-শক্তি সম্বন্ধে নবাবের ভয় অনেকটা কেটে যাবে। এই মুহূর্তে নবাবের গলায় ফাঁস জড়িয়ে দড়িটা যেমন শক্ত মুঠোয় ধরে রেখেছেন ক্লাইভ, সেই মুঠো আলগা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। ফরাসিদের মদত চেয়ে হয়তো গলার ফাঁস আলগা করতে চাইবেন নবাব। সবচেয়ে বড় কথা হল, পলাশির যুদ্ধ থেকে পাওয়া সুবিধা যেন না হাতছাড়া হয়ে যায়।

মুনশি নবকৃষ্ণ এসে বললেন, ‘নবাবজাদা মিরন ফের আপনার সাক্ষাৎ চাইছে।’

ফরসির নলটা ঠোট থেকে সরিয়ে হাতে নিয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘এখানে এসেছে?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জি হুজুর। ছোকরা নাছোড়বান্দা। আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’

ফরসির নল ঠোঁটে গুজে ফের গম্ভীর মুখে তামাক টানতে লাগলেন ক্লাইভ।

‘আপনি যে চটে আছেন দিব্যি বুঝেছে। শুধোচ্ছিল, আপনার মেজাজ শরিফ আছে কি না।’

‘কী করা যায় বলো তো?’

‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। কথায় বলে লেবু বেশি কচলালে তিতে হয়ে যায়।’

কৌতূহলী চোখে মুনশির মুখপানে চাইলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ জোড়হস্ত হয়ে বললেন, ‘যাই হোক না কেন নবাবজাদা বলে কথা। আপনি বারবার হাঁকিয়ে দিচ্ছেন। ওদিকে নিজামতের অন্দরে তার মান নিয়ে টানাটানি পড়ছে। ছোকরা আপনার ভয়ে একেবারে আধমরা হয়ে আছে। এইবারে রশি একটু আলগা না করলে ভয়টা ভেঙে যেতে পারে। কাঁচা বয়স, তাজা রক্ত—বুঝতেই তো পারছেন হুজুর!’

ক্লাইভ মাথা নেড়ে বললেন, ‘ওয়েল সেইড মুনশি। ছোকরাকে গুড হিউমারে রাখা দরকার।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সেই ভালো। কী বলতে চায় শুনে নিন।’

‘এখানেই আসতে বলো।’

অর্ডারলি এসে একটা কুরসি ও চৌপাই রেখে যায়।

খানিকবাদে ক্লাইভের সম্মুখে এসে হাজির হয় মিরন।

‘প্লিজ সিট।’

কুরসিতে বসে মিরন বলল, ‘দেওয়ানের নামে আপনার কাছে শিকায়ত আছে।’

কৌতূহলী চোখে মিরনের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ।

‘মারাঠাদের সঙ্গে বাতচিত চালাচ্ছেন দেওয়ান। ফির ইনকিলাব ঘটানোর মতলব করছেন।’

মুচকি হেসে বেশ অবাক হওয়ার ঢঙে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘ইনকিলাব?’

তার কথা খুব হালকা ভাবে নিচ্ছেন দেখে মরিয়া হয়ে মিরন বলল, ‘আমি সচ বলছি সাহেব। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন। দেওয়ানের সঙ্গে মোলাকাত করতে এসেছিলেন শিবভট্ট। দু’দিন আগে।’

ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘জানি। এও জানি দেওয়ানের সঙ্গে তার মোলাকাত হয়নি।’

ক্লাইভের এই প্রতিক্রিয়ায় একেবারে মিইয়ে গেল মিরন। সে ভেবেছিল রায়দুর্লভের নামে শিকায়ত জানিয়ে তার বিরুদ্ধে কর্নেলকে উত্তেজিত করে তোলা যাবে।

মিরন তবু বলল, ‘এ তরিকা স্রেফ এক ধোঁকাবাজি।’

ক্লাইভ প্রশ্ন করলেন, ‘দেওয়ানের উপর আপনার এত গুসসা কেন?’

‘দেওয়ান গদ্দারি করছেন।’

‘তার সাবুত কোথায়?’

‘আমি সচ বলছি সাহেব। বাংলায় ফের হাঙ্গামা বাঁধিয়ে দেওয়ানজি মসনদ দখল করতে চাইছেন। এই ওয়াক্তে হাঙ্গামা বাঁধলে তো আপনাদেরই তকলিফ বাড়বে।’

‘তকলিফ বাড়াচ্ছেন তো আপনি।’

মিরনের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে হাসির রেশ রেখে কথাটা বললেন ক্লাইভ।

ক্লাইভের এই প্রতিক্রিয়ায় বেশ ঘাবড়ে গেল মিরন।

ক্লাইভ ফের বললেন, ‘বাড়াচ্ছেন না তকলিফ? কাশিমবাজার থেকে ফৌজ পাঠাতে হচ্ছে।’

শুকনো মুখ করে মিরন বলল, ‘ভেবেছিলাম মিরজা মেহেদিকে মসনদে বসাতে চান দেওয়ান।’

‘স্রেফ আন্দাজের বশে এমন একটা ভয়ানক কাণ্ড আপনি ঘটিয়ে ফেললেন?’

মিরন নিশ্চুপ।

এবারে গম্ভীর মুখে ক্লাইভ বললেন, ‘আপনাকে আমি আবার রিকোয়েস্ট করছি। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চলবেন। মিরজাফর খাঁ, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, রায়দুর্লভ ইনকিলাব চেয়েছিলেন। তাই তাদের মদত দিয়েছিলাম আমরা। এখন আপনারা নিজেদের মধ্যে কাজিয়া বাঁধিয়ে কোম্পানির বেইজ্জত করছেন। দেওয়ানের সঙ্গে কথা বলব আমি। তবে আমার আরমান হল এই যে দেওয়ানের উপরে কোনও আঁখেজ রাখবেন না আপনি। আমার উপর ভরসা রাখুন। ফের কোনও ইনকিলাব হবে না বাংলায়। মসনদে মিরজাফর খাঁ-ই থাকবেন।’

ক্লাইভের কথা শুনে খুব একটা খুশি হল না মিরন। কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ‘আপনার এই বাত আমি ইয়াদ রাখব সাহেব। দেওয়ানজির সঙ্গে রিস্তেদারি মজবুত রাখার কোশিশ করব।’

‘দ্যাটস গুড।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *