1 of 2

পলাশির পরে – ৩৮

৩৮

চুনিলাল ও মুন্নিলাল শাগরেদরা মোটা শালের খুঁটি দিয়ে ক্রমাগত ধাক্কা মেরে চলেছে দরওয়াজার উপরে। শব্দের তাণ্ডবে গোটা কক্ষটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। কাঁপছে পোক্ত পাল্লাদুটোও।

মির্জা মেহেদির ঘুম ভেঙে যায়। কী ঘটছে এত রাতে? কোনও দুঃস্বপ্ন না সত্যি ঘটনা? কারা হামলা করতে এসেছে, কারা? নানি বেগম, আম্মিজান ও খালার সঙ্গে সে তো ঘরবন্দি হয়ে আছে চেহেল সেতুনের অন্দরে এই হাভেলিতে। তবুও হামলা কেন? বিস্ফারিত চোখে চেয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে বালক মির্জা। অন্ধকারে হাতের স্পর্শে নানি বেগমকে খোঁজে।

শরফ উন্নেসা উঠে বসেছেন বিছানায়। ভীত, সন্ত্রস্ত। মির্জা ধড়ফড় করে উঠে বসে। ত্রস্ত চোখে দিদিমার মুখপানে চেয়ে শুধোয়, ‘কী হয়েছে নানি বেগম? ওরা কারা?’

বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে বেশ কিছু মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। আলিবর্দির খানদানের উদ্দেশে বর্ষিত হচ্ছে অশ্রাব্য গালিগালাজ। নাতিকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ভয়ার্ত গলায় শরফ উন্নেসা জবাব দেন, ‘জানি না বেটা।‘

‘ওরা কি কোতল করবে আমাদের?’

‘জানি না বেটা। জানি না।’

সহসা দরওয়াজার একটা পাল্লা ভয়ানক যান্ত্রিক শব্দে আছড়ে পড়ে মাটিতে।

ভয়ে আর্তনাদ করে ওঠে নাতি ও দিদিমা দু’জনেই।

কক্ষের অন্দরে প্রবেশ করে চুনিলাল ও মুন্নিলাল। পিছনে তাদের কয়েকজন শাগরেদ। চুনিলালের হাতে লকলক করছে একটা কাঁটাওয়ালা চাবুক।

বিছানা থেকে নেমে এলেন নানি বেগম। মির্জা ভয়ে জড়সড় হয়ে দিদিমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। অতীতের শাহি মেজাজের ঝাঁঝ ফিরে আসে শরফ উন্নেসার গলায়। ধমকের সুরে শুধোলেন, ‘কে তোমরা? কার হুকুমে এখানে জবরজুলুম করতে এসেছ?’

চুনিলাল হেসে উঠে বলে, ‘তার কৈফিয়ৎ কি তোমাকে দিতে হবে বুড়ি? হাবুজখানার হাওয়া খেয়েও দেখছি ঠাঁট-ঠমক, রওয়াব যায়নি।’

‘খামোশ। বেতমিজ বেয়াদপ কাঁহিকা। কথা বলার তরিবৎ জানো না? পুরোনো জমানা হলে–’

কথা হারিয়ে ফেললেন নানি বেগম। বুকের মধ্যে পাক দিয়ে উঠল বেদনা। ‘পুরোনো জমানা হলে’—কথাটা তার নিজের কানেই অর্থহীন প্রলাপের মতো শোনালো।

চুনিলাল ও মুন্নিলাল হেসে উঠল। মুন্নিলাল বলল, ‘জানি বুড়ি। পুরোনো জমানা হলে নানি বেগমের হুকুমতে গর্দান যেত আমাদের। তাই তো? লেকিন জমানা বদলে গেছে। তোমার নসিব মন্দ। তড়পাও মাত।’

চাবুক চালিয়ে শূন্যে বাতাস কেটে চুনিলাল বলল, ‘বুঝলে বুড়ি, এখন আমরা চাইলে তুর্কি ঘোড়ার সঙ্গে তোমাকে বেঁধে শাহি সড়ক দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিতে পারি। লেকিন নবাবজাদা মিরন আশরফ আদমি। ইতনা সঙ্গদিল নয়।’

‘মি-র-ন? মিরন পাঠিয়েছে তোমাদের?’ গলা কেঁপে গেল শরফ উন্নেসার। মিরন নিষ্ঠুর, নির্দয়। তারই আরজুতে মওত হয়েছে সিরাজ। ফের কী চায় সে?

শরফ উন্নেসার প্রশ্নের জবাবে মুন্নিলাল বলে, ‘জি নানি বেগম। আমরা নবাবজাদার বান্দা।’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শরফ উন্নেসা শুধোলেন, ‘নবাবজাদার আরমান কী?’

চুনিলাল বলে, ‘তাঁর হয়ে তোমাকে রুকসত জানাতে এসেছি বুড়ি।’

বুক কেঁপে উঠল শরফ উন্নেসার। শুধোলেন, ‘রুকসত মতলব?’

মুন্নিলাল বলল, ‘তোমার দুই বেটি–আমিনা ও ঘসেটির সঙ্গে তোমাকেও ঢাকায় যেতে হবে।’

‘নবাবজাদার হুকুম। বুড়িগঙ্গার তীরে জিঞ্জিরা প্রাসাদে কয়েদ হয়ে থাকবে বুড়ি। আখিরাতের ইন্তেজার করবে।’ এই বলে পানের ছোপ ধরা দাঁত বের করে বিশ্রি হেসে ওঠে চুনিলাল।

‘নবাবজাদার পরোয়ানা কোথায়?’ শুধোলেন শরফ উন্নেসা।

চুনিলাল ধমকে ওঠে, ‘খামোশ। বেতমিজি মাত করো। নবাবজাদার বাতই কাফি।’

শরফ উন্নেসা রুক্ষ গলায় বললেন, ‘তোমাদের জবানে একিন নেই আমার। পরোয়ানা দেখাও।’

‘বেয়াদপি মাত করো।’ এই বলে চাবুক চালাল চুনিলাল।

যন্ত্রণায় কাতরে উঠলেন নানি বেগম।

নানি বেগমকে জড়িয়ে ধরে মির্জা মেহেদি বলে, ‘মারছ কেন? নানি বেগমের গায়ে হাত ওঠাচ্ছ তোমরা? নবাবের কাছে আমি শিকায়ত জানাব।’

মুন্নিলালের দিকে চেয়ে চুনিলাল রসিকতার ছলে বলে উঠল, ‘ছোকরা তো নাজুক নয়। বিলকুল তাগদবাজ। শাহি তেজ। ইনসান-ই-কামিল।’

মুন্নিলাল হেসে উঠে মির্জা মেহেদির গাল টিপে দিয়ে বলে, ‘শিকায়ত জানালে আমরা যে মুসিবতের মধ্যে পড়ব ছোটে নবাব।’

মির্জা মেহেদি এক ঝটকায় মুন্নিলালের হাতটা সরিয়ে দেয়।

চুনিলাল কয়েক পা এগিয়ে এসে মির্জার মুখোমুখি দাঁড়ায়।

নাতির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেন শরফ উন্নেসা।

‘চলো ছোটে নবাব। বেহেস্ত ঘুরে আসি।’ মির্জার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে চুনিলাল।

‘না-আ-আ। কোথায় নিয়ে যাবে মির্জাকে?’ শরফ উন্নেসা আর্তনাদ করে ওঠেন।

চুনিলাল খল হাসি হেসে বলে, ‘বেহেস্ত ঘুরে এসে খোকাবাবু নবাব হবে।’

শরফ উন্নেসার বুকটা ছাৎ করে ওঠে। রায়দুর্লভের গোপন পরিকল্পনার কথা এরা কি জেনে ফেলেছে? এরা কি মির্জাকে…আর ভাবতে পারেন না শরফ উন্নেসা। গা-হাত-পা অবশ হয়ে আসতে থাকে তবুও সর্বশক্তি দিয়ে মির্জাকে তিনি জড়িয়ে ধরেন।

চুনিলালের চাবুক ফের এসে পড়ল শরফ উন্নেসার মুখের উপরে। কাঁটার আঘাতে রক্তক্ষরণ হল। তীব্র যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শরফ উন্নেসা।

শয়তান মুন্নিলাল চোখের নিমেষে পাঁজাকোলা করে মির্জা মেহেদিকে তুলে নেয়। মুন্নিলালের শক্ত দুই হাতের বাঁধনের মধ্যে বলির পাঁঠার মতো ছটফট করতে থাকে মির্জা মেহেদি।

উঠে এসে ফের চুনিলাল ও মুন্নিলালকে বাধা দিতে উদ্যত হন শরফ উন্নেসা। এই সময় কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করে একদল সেপাই। তারা নানি বেগমের পথ আটকায়।

‘মির্জা আমার মির্জা! রহেম করো। তোমরা আমার মির্জাকে রহেম করো। ওকে বাঁচতে দাও।’

কান্নায় ভেঙে পড়েন নানি বেগম। হুকুমের দাস সেপাইরা নিমেষের মধ্যে পিছমোড়া করে বেধে ফেলে তাঁর দুই হাত। তারপর তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় কেল্লাঘাটের দিকে।

ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে নৌবহর। শরফ উন্নেসাকে বলপূর্বক একটা বজরায় নিয়ে তোলে সেপাইরা। পিছনের দুটি বজরায় আগেই তোলা হয়েছে আলিবর্দির দুই মেয়ে আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে। দুজনেই ভাঙ-আফিমের নেশায় অচেতন।

ভাগীরথীর জল কেটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হল নৌবহর। মাঝনদীতে এসে শরফ উন্নেসার হাতের বাঁধন খুলে দিল পাহারায় নিযুক্ত দুই সেপাই। এরা আলিবর্দির আমল থেকে নিজামতের নোকরিতে আছে। আলিবর্দির নিমক খেয়েছে। একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ বেগমসাহেবার বেইজ্জতি দেখে দুঃখে বুক ফেটে যাচ্ছিল এদের। কিন্তু এদের তো কিছু করার নেই। এরা মাস মাইনের চাকর। হুকুমের দাস। শুধু মসনদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশই এদের একমাত্র কাজ। তবুও বিবেকের দায় থাকে কারও কারও। দৈহিক, মানসিক যন্ত্রণায় চুরচুর হয়ে যাওয়া সিরাজের নানি বেগম খেয়াল করতে পারলেন না, এই দুই সেপাইয়ের চোখের কোণায় চিকচিক করছিল জল।

একজন মাথা নুইয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘বেয়াদপি-গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুরাইন।’

শরফ উন্নেসা জানালা দিয়ে চেয়ে রয়েছেন বাইরের উন্মুক্ত আকাশের দিকে। জনৈক সেপাইয়ের এই গুজারেশ তাঁর কানে গেল না। দুই সেপাই ধীর পায়ে কক্ষের বাইরে গিয়ে বাইরে থেকে হুড়কো এঁটে দিল দরজায়।

দ্রুত দাঁড় বাইছে মাঝিরা। নবাবজাদার হুকুম ভোর হওয়ার আগেই মুর্শিদাবাদ থেকে অনেকটা দূরে চলে যেতে হবে। আকাশে ঝকঝক করছে হিরের কুচির মতো উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি। শরফ উন্নেসা চেয়ে রয়েছেন বাইরের দিকে। অনেক দূরে চোখে পড়ছে চেহেল সেতুনের বুরুজে, মিনারে জ্বলতে থাকা অজস্র চিরাগের বিন্দু বিন্দু আলো। আঁধারে সব মিলিয়ে যাবে একটু পরেই।

‘মির্জা! আমার মির্জা!’ চিৎকার করে উঠে ফের কান্নায় ভেঙে পড়লেন নানি বেগম।

.

ফুরিয়ে আসছে রাত। নবাবজাদার হুকুম—কাজটা সারতে হবে রাত শেষ হওয়ার আগে।

ভয়ে মির্জা মেহেদির গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখদুটো বিস্ফারিত। নরম গালদুটো ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। মুখে টুঁ-শব্দটি করার উপায় নেই। ঘাতকেরা তার মুখটা বেঁধে দিয়েছে শক্ত করে। বালক মির্জা বুঝতে পারছে তার জীবনের অন্তিমক্ষণ উপস্থিত।

চেহেল সেতুনের অভ্যন্তরে খোলা আকাশের নীচে পাথরের চাতালের উপরে একটা চওড়া তক্তার উপরে মির্জাকে শুইয়ে দিল মুন্নিলাল। তক্তার চার কোণায় চারটে কাঠের দণ্ডের সঙ্গে বেঁধে দিল মির্জার দুটো হাত ও দুটো পা। তীব্র যন্ত্রণায় বিকৃত হল মির্জার সুকুমার মুখটা। তার চোখের ভাষায় ধরা পড়ল বাঁচার আকুতি। কিন্তু জহ্লাদেরা নির্মম।

কাড়ানাকাড়ার শব্দে কান পাতা দায়। বাজনা বাজিয়ে হুল্লোড়ে মেতেছে ঘাতকবাহিনী। নিরীহ মানুষকে খুন করা এদের কাছে একরকমের রগড়। হঠাৎ থেমে গেল বাজনদারেরা। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। নবাবজাদা মিরন এসে হাজির হয়েছে অকুস্থলে।

মির্জার বুকের উপরে এক পা তুলে সামনে ঝুঁকে পড়ে বিশ্রি রকমের হেসে উঠল মিরন। নিস্তেজ হয়ে পড়েছে মির্জা। তার মুখের উপরে একদলা থুতু ফেলে মিরন বলে উঠল, ‘শালা খরিশের বাচ্চা! নবাব বনেগা?’

ভয়ার্ত চোখে মিরনের মুখপানে চেয়ে রইল মির্জা মেহেদি।

‘তক্তা লে আও।‘ মির্জার বুকের উপর থেকে পা সরিয়ে নিয়ে চুনিলালকে হুকুম করল মিরন।

চুনিলালের চোখের ইশারায় বেশ মজবুত একটা তক্তা মির্জার বুকের উপরে চাপিয়ে দিল তাগড়াই চেহারার কয়েকজন যুবক। এরা সব দুষ্কৃতী। চুনিলাল ও মুন্নিলালের কুকর্মের দোসর। বালক মির্জার গোটা শরীর ঢেকে যায় ওই তক্তায়। শুধু মুখমণ্ডল উন্মুক্ত। জেগে আছে শুধু ভয়ার্ত চোখদুটো। চোখ ও মুখের অভিব্যক্তিতে কলিজা বিদীর্ণ হওয়া মানুষের মরণযন্ত্রণা চাক্ষুষ না করলে এই জহ্লাদদের খুনজোশি স্তিমিত হবে না। যেন এক পরম কৌতূকের আস্বাদ নিতে মাটিতে শায়িত মির্জাকে ঘিরে দাঁড়াল সকলে।

‘সরফরাজ কাহা হ্যাঁয়।’ হাঁক ছাড়ে মিরন।

‘সফরাজ হাজির হুজুর। উহা খাড়া হ্যায়।’

মুন্নিলালের অঙ্গুলিনির্দেশ লক্ষ্য করে তাকিয়ে মিরন দেখল চাতালের এক কোণায় দাঁড়িয়ে শূঁড় দোলাচ্ছে সরফরাজ। পাহাড়ের মতো চেহারার মদ্দা হাতি। গায়ের রং অন্ধকারে প্রায় মিশে গিয়েছে। ঝকঝক করছে দুটো শাদা দাঁত। জ্বলজ্বল করছে দুই চোখ।

চুনিলাল বলে, ‘ভাতের সঙ্গে সিরাজি মিশিয়ে দিয়েছিলাম হুজুর। হাতি মস্ত হয়েছে।’

মিরন খুশি হয়ে বলে, ‘বহুত আচ্ছা। জবরদস্ত রগড় হবে।’

চুনিলালের নির্দেশে ফের বেজে উঠল কাড়ানাকাড়া। মাহুত হাতিটাকে নিয়ে এল চাতালের মাঝখানে। বাজনার তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে শরাবের নেশায় মত্ত হাতি। মির্জা মেহেদির চোখদুটো ভয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মাহুতের নির্দেশে মাতাল মদ্দা পাহাড়ের আকৃতির হাতিটা উঠে পড়ল মির্জার বুকে চাপানো তক্তার উপরে।

পৈশাচিক আনন্দে নাচতে শুরু করল চুনিলাল, মুন্নিলাল ও তাদের শাগরেদরা।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে গেল মির্জার চোখদুটো। চোখের কোণ দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল রক্ত। মুখের বাঁধন ভিজে উঠল রক্তে। কাঠের পাটাতনের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে কালো পাথরে মোড়া চাতালের উপর ছড়িয়ে পড়তে লাগল উষ্ণ রক্তস্রোত।

আলিবর্দির শেষ উত্তরাধিকারীর রক্তে ভিজল চেহেল সেতুনের বোবা পাথর।

‘খেল খতম।’ এই বলে হাততালি দিয়ে সজোরে হেসে উঠল মিরন।

নবাবজাদাকে খুশি করার জন্য বাজনদারেরা আরও তীব্র করল বাজনার আওয়াজ। কোমর দুলিয়ে অশ্লীল ভঙ্গিতে নাচছে চুনিলাল, মুন্নিলাল ও তাদের শাগরেদরা। তখন ভোর হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে আকাশের কালি।

.

রবার্ট ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে এলেও ইনকিলাব হবে না। মির্জা মেহেদিকে হত্যা করে রায়দুর্লভের চাল সে ভেস্তে দিয়েছে। লাওয়ারিশ আলিবর্দির খানদান। মিরন খুশি। কিন্তু অন্য এক ভাবনা এখন তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। নবাব মুর্শিদাবাদে নেই। ক্লাইভ রাজধানীতে এসে পৌঁছলেন বলে। মির্জা মেহেদির হত্যার খবর শুনে কী প্রতিক্রিয়া হবে সাধারণ মানুষের মনে, কী বলবেন কর্নেল ক্লাইভ?

তবে ক্লাইভের রক্তচক্ষু দর্শনের চেয়েও এই মুহূর্তে নবাবজাদার মনের মধ্যে বেশি করে চেপে বসেছে গণরোষের ভয়। সিরাজদ্দৌলার মওতের পরেও ক্ষিপ্ত হয়েছিল আমলোগ। তবে সে সময় হাজির ছিল গোরা পল্টন। আগুনে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল তারাই।

ক্লাইভ আসছেন ফৌজ নিয়ে। গোলমাল কিছু হলে এবারেও সামলে দেবে গোরা পল্টন। কড়া ভাবে ইংরেজ সাহেবরা হয়তো কিছু কথা শোনাবে তাকে। তাতে এমন ক্ষতি কী? ইনকিলাবের আনজাম তো বানচাল করে দেওয়া গেল। এই ভেবে দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে চাইল মিরন। দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে খোশমেজাজে ঘোড়া হাঁকিয়ে সে ছুটে চলল জাফরাগঞ্জ প্যালেসের দিকে। পুবাকাশ লাল। সূর্যের রং ডিমের কুসুমের মতো।

ভোরের আলো আর একটু জোরালো হতেই জেগে উঠল চকবাজার। রোজ যেরকম জেগে ওঠে। মির্জা মেহেদির হত্যা-কাহিনি চেহেল সেতুনের বান্দা-দাখিলা-গোলাম-বাঁদিদের মুখ থেকে দ্রুত চাউর হল বাইরে। এই নৃশংস হত্যার কাহিনি শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল তামাম চকবাজার।

বাতাসে খবর যখন ওড়ে, তখন নানা রঙের ছোপ লাগে তার গায়ে। এখানেও সে নিয়মের ব্যত্যয় হল না। খবরটা লোকের মুখে ছড়াতে ছড়াতে এইরকম আকার নিল, ‘…মিরনের হাতে খুন হয়েছে বালক মির্জা মেহেদি। বুকের উপর হাতি চড়িয়ে পিষে মারা হয়েছে তাকে। শুধু মির্জা মেহেদি নয়, আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগম ও আলিবর্দির বেগম শরফ উন্নেসাকেও খুন করেছে মিরন। খতম আলিবর্দির খানদানের সকলে। লাশগুলো গোপনে গোর দেওয়ার আনজাম চলছে চেহেল সেতুনেরই অন্দরে। এই কাজে মিরনের দোসর ছিল তার ইয়ারদোস্ত জঘন্য দুই শয়তান চুনিলাল ও মুন্নিলাল।…’

ক্ষিপ্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল সাধারণ প্রজারা। মুখগুলো গম্ভীর। থমথমে। জোড়াজোড়া অজস্র চোখে জ্বলছে আগুন। রাগে ফুঁসছে সকলে। দলে দলে তারা চলেছে চেহেল সেতুনের দিকে। তারা এই জঘন্য হত্যা কান্ডের বিচার চায়। তাদের মুখ থেকে ছিটকে আসা উত্তপ্ত বাক্য থেকে গণবিস্ফোরণের আঁচ পাচ্ছে চকবাজার। ফের অশান্ত হতে চলেছে রাজধানী। তড়িঘড়ি ঝাপ ফেলতে লাগল চকবাজারের দোকানপাট। সবে চবুতরার নীচে ফুল সাজিয়ে বসেছিল গুলাব-গুলদস্তার কারবারিরা। পসরা নিয়ে দ্রুত সরে পড়ল তারা। আমজনতার আগুনে মেজাজ দেখে সরে পড়ল চৌরাহায় মোতায়েন কোতোয়ালির সেপাইরাও।

মিরনের হুকুম অনুযায়ী চেহেল সেতুনের অন্দরেই মির্জা মেহেদির দেহকে সমাহিত করার আনজাম করছিল চুনিলাল-মুন্নিলাল ও তাদের শাগরেদরা। সহসা তাদের কানে ভেসে এল তুমুল গোলমালের আওয়াজ। কেল্লার এক বুরুজে উঠে দৃশ্যটা দেখে হাড় হিম হয়ে গেল চুনিলালের। চেহেল সেতুনকে ঘিরে ধরেছে কাতারে কাতারে মানুষ। তারা বিক্ষুব্ধ, উত্তেজিত।

সহসা একটা পাথরের টুকরো ভিড়ের মধ্যে থেকে চেহেল সেতুনের দরওয়াজার উপরে এসে পড়ল। তারপরে শুরু হল মুহুর্মুহু পাথর বৃষ্টি। কয়েকটা পাথর চেহেল সেতুনের দিবার টপকে অন্দরে এসে পড়ল। সেই সঙ্গে ভেসে আসতে লাগল মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। মির্জা মেহেদির হত্যার বিচার চাইছে এরা। শাস্তি চাইছে ঘাতকদের।

ভয়ে ধরল চুনিলাল ও মুন্নিলালের মনে। কী করে চেহেল সেতুনের বাইরে বেরোবে তারা!

নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে মির্জা মেহেদির শবদেহকে ফেলে রেখে দ্রুত কেল্লার পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল শয়তানের দল। গলার উড়নি দিয়ে ঘোমটার মতো করে মাথা ঢাকা সকলের। জাফরাগঞ্জ প্যালেসের উদ্দেশে তারা ছুটে চলল।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *