1 of 2

পলাশির পরে – ১০

১০

এই অনওয়াক্তে হাজির হয়ে কী গুজারেশ করতে চান শাহ দানা? কোনও খুশখবর কি? যে খবরের জন্য তিনি পড়ে রয়েছেন এই আইরান প্রান্তরে। উত্তেজিত মিরকাশিম ফরসির নলে ঘনঘন টান দিতে থাকেন।

খানিকবাদে তনসুখ কাপড়ের পর্দা সরিয়ে তাঁবুর অন্দরে প্রবেশ করেন শাহ দানা। মিরকাশিমকে তসলিম জানিয়ে বলেন, ‘আল্লার রহেমে সহি সালামত থাকুন মালিক। আমি পিরজাদা শাহ দানা। আপনার বান্দা।’

একদৃষ্টে শাহ দানার দিকে চেয়ে থাকেন মিরকাশিম। ফকিরের পরনে মলিন কুর্তা ও জোব্বা। চোখদুটো কোটরে ঢোকা। শীর্ণ ঋজু চেহারা। মাথায় কান ঢাকা ঝাঁকড়া চুল। মুখে ঘন দাড়ি বুক পর্যন্ত লম্বা। পাক ধরেছে চুল ও দাড়িতে। এই মুখের সঙ্গে বারো সাল আগে দেখা মুখের মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

মিরকাশিম বলেন, ‘বসুন ফকির সাহেব।’

‘বহুত সুক্রিয়া।’ এই বলে ফরাসের এক কোণায় সংকোচের সঙ্গে উপবেশন করেন শাহ দানা।

মিরকাশিম শুধোন, ‘কাটরা মসজিদের পাশে আপনার আখড়া ছিল কি একসময়?’

উৎসাহিত গলায় শাহ দানা বলেন, ‘জি মালিক। বহুত পুরানি বাত। ইয়াদ আছে আপনার?’

‘সিরাজদ্দৌলার হাতে আপনার বেইজ্জতির কথা আমি জানি।’

কানের পাশের চুল সরিয়ে শাহ দানা বলেন, ‘এই যে মালিক সেই নিশান এখনও বয়ে বেড়াচ্ছি।’

শিউরে ওঠেন মিরকাশিম। চোয়ালের সামান্য উপরে জেগে আছে শুধু একটা ছিদ্র। আলিবর্দির আদুরে নাতির খুশখেয়ালের দাগ।

‘ইয়ে মেরা বদ কিসমতি হুজুর।’

চোখ নামিয়ে নেন মিরকাশিম। বলেন, ‘কী চাই? ফরমায়েশ করুন ফকির সাহেব।’

ফরাসের উপরে পড়ে থাকা জন্মছক আঁকা কাগজ ও জ্যোতিষশাস্ত্রের পুঁথিগুলোর দিকে চেয়ে শাহ দানা বলেন, ‘মালুম হচ্ছে আপনি তকদির-তলাশ করছিলেন।’

মিরকাশিম মৃদু হেসে বলেন, ‘এ বিদ্যা আমি কিছুটা জানি। এ বিষয়ে আপনার কুদরতির কথাও জানি।’

শাহ দানা অবাক হয়ে মিরকাশিমের দিকে তাকালেন।

মিরকাশিম বলেন, ‘কাটরা মসজিদের পাশে আপনার ডেরায় একবার গিয়েছিলাম। আমার কপাল দেখে আপনি বলেছিলেন একদিন শান-শওকত-রওশনে ভরে যাবে আমার জিন্দেগি।’

‘তাই বুঝি?’

সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন মিরকাশিম।

শাহ দানা বলেন, ‘মালুম হচ্ছে আপনি আপনার পরিচয় ছুপিয়ে এসেছিলেন হুজুর। না হলে আপনার কথা আমার ইয়াদ থাকত।’

‘শুনেছিলাম আপনার নিদান অব্যর্থ। তাই যাচ-ইমতেহানি করতে গিয়েছিলাম জালসাজিসে।’

‘কী বুঝছেন এখন?’ শাহ দানার মুখে মৃদু হাসির রেশ।

‘কোথায় শান-শওকত-রওশন ফকির সাহেব? লক্ষণ তো কিছু নজরে পড়ছে না।’

‘শাহ দানার নিদান ঝুটা হতে পারে না হুজুর।’

‘ভরসা যে পাচ্ছি না ফকির সাহেব। এখানে তাঁবুর উর্দু গেড়ে কী খুঁজে বেড়াচ্ছি জানেন?’

‘জানি। খুশনসিবি।’

‘জানেন, কী সেই খুশনসিবি?’

‘সিরাজদ্দৌলার গ্রেফতারি।’

শাহ দানার এই উত্তরে খুব একটা অবাক হলেন না মিরকাশিম। সিরাজের খোঁজে তার কাসিদরা ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। গ্রামে গ্রামে ঢোলশোহরত হয়েছে। ঢোল পিটিয়ে, শিঙা ফুকে তারা জানিয়েছে পলাশির লড়াই ফতে করেছে ইংরেজরা। মসনদে বসেছেন মিরজাফর। সিরাজদ্দৌলা পলাতক। যে তাঁর হদিশ দিতে পারবে, মোটা ইনাম পাবে।

মিরকাশিম বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই ঢোলশোহরত শুনেছেন?’

‘না হুজুর। শুনিনি।’

‘তাহলে কেমন করে জানলেন আমি পলাতক সিরাজদ্দৌলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি?’

‘এ কথা তো তামাম বাংলার লোক জানে। এক দরবেশের মুখে শুনেছি।’

আনত চোখে ভূমির দিকে চেয়ে মিরকাশিম বললেন, ‘লোকে বলবে মিরকাশিম নালায়েক।’

‘কেন বলছেন একথা?’

‘সিরাজদ্দৌলার হদিশ তো এখনও মিলল না। সিরাজকে জিন্দা গ্রেফতার করতে না পারলে আমার ঘোর বেইজ্জতি হবে। সত্যিই সাবুত হবে মিরকাশিম নালায়েক। আমার নসিবের চাকা ঘুরবে কী করে?’

শাহ দানা হাসেন। শীর্ণ মুখটা ঝলমল করে ওঠে।

‘হাসছেন যে?’ প্রশ্ন করেন মিরকাশিম।

‘আপনার খুশনসিবির খবর আমি বয়ে নিয়ে এসেছি।’

ফরসির নলে টান দিতে গিয়ে থমকে যান মিরকাশিম। অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘মতলব?’

মুখে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে রেখে শাহ দানা বলেন, ‘সিরাজদ্দৌলার খবর আমি জানি। সেই খবরটা আপনাকে দিতেই আমার এখানে আসা।’

শিহরিত হয়ে ওঠেন মিরকাশিম। চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে বসে ভয়ানক ব্যস্ত গলায় প্রশ্ন করেন, ‘কোথায় সিরাজদ্দৌলা?’

‘মুসাফিরের ছদ্মবেশে বিহার মুলুকের দিকে যাচ্ছিলেন। আমার ডেরায় আশ্রয় নিয়েছেন।’

‘সচ বলছেন আপনি?’ উত্তেজিত হয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মিরকাশিম।

উঠে দাঁড়ালেন শাহ দানাও। জবাবে বললেন, ‘বিলকুল। আপনি নয়া নবাবের দামাদ। ঝুটমুট বললে আপনি আমার গর্দান নিতে পারেন।’

‘কোথায়? কোথায় আপনার ডেরা?’ মিরকাশিম ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে পড়েন।

‘এখান থেকে করিব ছয় ক্রোশ দূরে। নাজিরপুরের মোহনার কাছে। মুসাফিরের জালসাজিশে নাও নিয়ে ভেসে যাচ্ছিলেন পরাজিত নবাব। যাদা পানি নেই মোহনায়। নাও আটকে যায় চরায়। এই মুসিবতে পড়ে সিরাজদ্দৌলা আশ্রয় নিয়েছেন মসজিদ লাগোয়া হুজরায়। সঙ্গে আছে এক মাসুম লেড়কি ও এক জেনানা।’

মিরকাশিম উল্লাসে চেচিয়ে ওঠেন। ‘ইনসাল্লা। আপনি বিলকুল সচ বলছেন।’

‘খুশনসিবি আপনার মুঠঠিতে। জলদি চলুন মালিক।’

খানিক বাদেই নদীতে ভেসে পড়ে পাঁচ-ছখানা ছিপ নৌকা। গভীর রাতে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা নদী সহসা চঞ্চল হয়ে ওঠে।

.

ভোরের আলো সবে ফুটেছে। সিরাজদ্দৌলা ঘুম ভাঙ্গার পর অভ্যাসের বসে দাখিলাদের ডাকার জন্য ঘন্টির ডোরিটা খোঁজেন। পরক্ষণেই ভুল ভাঙে। এতো হিরাঝিল প্যালেস নয়। তিনি শুয়ে আছেন অজানা এক গাঁয়ের মসজিদ লাগোয়া মাটির ঘরের মেঝেতে বিছানো জীর্ণ একখানা মলিদার উপরে।

মনটা বিষাদে ভরে যায়। সিরাজের মনে হয়, মাথার উপরে কেউ চাপিয়ে দিয়েছে পাষাণভার। অদূরে এক খণ্ড পাথরে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমোচ্ছে ক্লান্ত লুৎফা। গালের উপরে শুকিয়ে গিয়েছে চোখের জলের দাগ। লুৎফার কোলের কাছে শুয়ে রয়েছে উম্মেসায়েরা। তার গায়ের উপরে বিছানো রয়েছে লুৎফারই পাতলা একখানা উড়নি।

কাল রাতে উম্মেসায়েরার জ্বর এসেছিল। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ছেঁড়া মলিদার উপরে শুয়ে হু-হু করে কাঁপছিল একরত্তি নবাবনন্দিনী। গায়ের উড়নিখানা দিয়ে তাকে জড়িয়ে রেখেছিল লুৎফা তবুও কাঁপছিল সায়েরা। লুৎফা রুমাল ভিজিয়ে জলপট্টি দিচ্ছিল সায়েরার মাথায়। মেয়ের পাশে বসে ছিলেন অসহায় সিরাজ। তারপর ক্লান্ত শরীরটা কখন যে ঢলে পড়েছিল গভীর ঘুমে, তা আর খেয়াল নেই সিরাজের।

মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে সিরাজ দেখলেন জ্বরটা একটু কমেছে, তবে পুরোপুরি যায়নি। কোথায় হেকিম, কোথায় দাওয়াই, কী দিয়ে ইলাজ করবেন মেয়ের? বুকের মধ্যে জমাট বাঁধে কষ্ট, বোবা কান্নায় গলা বুজে আসে সিরাজের। ফকির সাহেবের কাছে হয়তো কোনও জ্বর উপশমের জড়িবুটি মিলতে পারে। কিন্তু গতকাল বিকেলে জরুরি কাজে কোথাও গিয়েছেন। বলে গিয়েছেন ফিরবেন ক’দিন বাদে। এ সময় ফকিরকে পাশে পেলে খুব সুবিধে হত।

ঘরের বাইরে এসে মাটির দাওয়ায় বসেন সিরাজ। খানিক্ষণ হল, ভোরের আলো ফুটেছে। ঝকঝকে সকাল। আশপাশের গাছগাছালি থেকে ভেসে আসছে পাখির কলকাকলি। দূরে নদীর পাড়ে পড়ে রয়েছে নৌকাখানা। দেখতে পাচ্ছেন সিরাজ। কাত হয়ে থাকা নৌকাটা তাঁর বদকিসমতির নিশান। নাহানে পানির আকাল। না হলে এতক্ষণে রাজমহলে পৌঁছে যাওয়া যেত।

দাওয়া থেকে নামলেই কুয়ো। তারপরে রসুইঘর ও দস্তরখানা। কুয়োতলায় পড়ে রয়েছে গলায় পাটের দড়ি বাঁধা মাটির একটা কলসি। কুয়োতলায় এসে কলসিটা কুয়োর ভিতরে নামিয়ে দেন সিরাজ। বগবগ শব্দে জল ভরতে থাকে কলসিতে। ধীরে ধীরে ভরন্ত কলসিটা ডুবে যায়। টান পড়ে দড়িতে। মামুলি এক দৃশ্য। তবু ঝুঁকে পড়ে দড়ি হাতে কলসির ডুবে যাওয়াটা মন দিয়ে দেখছিলেন সিরাজ। দড়িতে টান পড়তে জলভরা কলসিটা টেনে উপরে তুলে আনলেন। কলসির জল ঢেলে দিলেন কুয়োতলায় পড়ে থাকা একটা শূন্য চিলুমচিতে।

চিরকাল এসব কায়িক শ্রমের কাজ করে এসেছে গোলাম-দাখিলারা। নবাব ঘুম থেকে উঠতেই তারা রুপোর পাত্রে হাতমুখ ধোয়ার গুলাবজল এগিয়ে দিয়েছে। আজ গোলামদের মতো এই গোদা কাজ করতে সিরাজের মন্দ লাগল না। গাড়ুতে করে চিলুমচি থেকে জল তুলে সিরাজদ্দৌলা হাতমুখ ধুলেন। চোখেমুখে শীতল জলের ঝাপটা দিয়ে বেশ আরাম লাগল।

তারপরে মসজিদ চত্বরে পদচারণা করতে লাগলেন সিরাজ। বেশ জায়গাটা। সিরাজের হঠাৎ মনে হল, এমন কোনও এক অচেনা দেহাতে লুৎফাকে নিয়ে যদি ঘর বাঁধতে পারতেন তাহলে কেমন হত? একখানা ঘর, দাওয়া, এক চিলতে উঠোন, কুয়োতলা, তারপরে রসুইঘর—সব মিলিয়ে মিয়া-বিবির ছোট্ট সাজানো সংসার। নাই বা থাকল, হিরাঝিল প্যালেসের আরাম-আয়েশ! গোলাম-দাখিলা-বাঁদি-বান্দা দিয়ে পরিবৃত জীবনের চেয়ে দেহাতের সামান্য এক আদমির মতো দিন গুজরান বোধ হয় অনেক সুখের হত।

কাল রাতে খানা পাকিয়েছিল লুৎফা নিজেই। মোটা চালের খিচুড়ি আর লাবড়া। পরম তৃপ্তিতে খেয়েছেন সিরাজ। রসুইঘরে লুৎফা যখন আহারের আনজামে ব্যস্ত ছিল তখন দরজার চৌকাঠে সামনে পা ছড়িয়ে বসেছিলেন সিরাজ। বাবার কোলের মধ্যে চুপ করে বসেছিল উম্মেসায়েরা। পরম মমতায় মেয়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন সিরাজ আর মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে লুৎফাকে দেখছিলেন। গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত লুৎফা ঠিক যেন দেহাতের এক বিবি। আগুনের আঁচে গলদঘর্ম।

তামাম সুবে বাংলার দেহাতে দেহাতে আমআদমি তো এভাবেই দিন গুজরান করে। মরদেরা গতর খাটিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সামান্য উপায় করে। ক্লান্ত হয়ে দিনের শেষে ঘরে ফেরে। বিবি খানা পাকায়। বাল-বাচ্চার দেখভাল করে। রাতে বাড়ির দাওয়ায় বসে মরদ তার বিবি সুখ-দুঃখের গল্প করে, জীবনের খুব ছোটছোট আশা পূরণের খোয়াব দেখে। জীবনের অনেক আশাই হয়তো তাদের পূরণ হয় না, তবু সিরাজের মনে হল, তাদের জীবনে অনেক সুখ। নবাবের তকদিরে মসনদ, তাজ, দৌলত, তাগদ, রোশনি যেমন আছে তেমনই আছে গহীন আঁধার, কাঁটা, খন্নাসি, সাজিসি, গদ্দারি। আর সব সময় আছে অতল কালো গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার ভয়। সব কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়। জীবনকে উপভোগ করার ফুরসত যেন ঠিক মেলে না। শুধু তাগদ-ক্ষমতা ধরে রাখার ভাবনায় জেরবার হতে হয়।

কাল রাতে অপূর্ব রান্না করেছিল লুৎফা। সে রান্নার স্বাদ সিরাজের মুখে এখনও যেন লেগে আছে। পাশাপাশি খেতে বসেছিলেন সিরাজ ও সেলিম। খাদিমদারি করছিল লুৎফা নিজেই। শাহ দানার মুরিদ এই সেলিম ছেলেটির বয়স বেশি না। খুব জোর সতেরো-আঠেরো হবে। প্রথমদিন সেলিম নিজেই রান্নাবান্না করে খাইয়েছিল তাদের। পরের দিন থেকে রান্নার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে লুৎফা।

খিচুড়ি মুখে দিয়ে সেলিম বলে, ‘ভাবীজি আপনার রসুইয়ের তরিকতই আলগ। কেয়া খুশনসিব দাদাজির।’

ঘুংঘুটের আড়ালে নিঃশব্দ মলিন হাসি খেলে যায় লুৎফার ঠোঁটে।

সেলিম হঠাৎ শুধোয়, ‘পলাশির হকিকত জানেন?’

সিরাজ চমকে ওঠেন। নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে গ্রাস তুলতে গিয়ে থমকে গিয়ে নিখুঁত অভিনয়ের ভঙ্গিতে শুধোন, ‘কী হকিকত?’

‘জানেন না? নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই বেঁধেছিল।’

শঙ্কায় কেঁপে ওঠে লুৎফা। শ্বাস বন্ধ করে স্থির হয়ে বসে থাকে। নেকাবের আড়াল থেকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সেলিমের মুখের দিকে।

সিরাজ বলেন, ‘তাই বুঝি?’

সেলিম বলে, ‘মুর্শিদাবাদ থেকে এক দরবেশ যাচ্ছিল মুঙ্গেরে। রাতে মুসাফিরখানায় আশ্রয় নিয়েছিল। তার মুখে শুনেছি ইনকিলাবের কথা।’

‘কী শুনেছ?’ প্রশ্ন করেন সিরাজ।

‘ইংরেজরা লড়াই ফতে করেছে। নবাব সিরাজদ্দৌলা পলাতক। মসনদে বসবেন মিরজাফর খাঁ। আপনি তো ওদিক থেকেই আসছেন। জানেন না?’

‘মুর্শিদাবাদ নয় ভাই, আসছি জাহাঙ্গিরনগর থেকে।’

‘পথে শোনেননি কিছু?’

মুচকি হেসে সিরাজ বলেন, ‘না ভাই। আমরা আমআদমি। নবাব-বাদশার কিসসা-কহানির খতেন জেনে আমাদের ফয়দা কী?’

সেলিম বলে, ‘এ বোধ হয় ভালোই হল।’

‘কী ভালো হল?’ প্রশ্ন করেন সিরাজ।

‘সিরাজদ্দৌলার বরবাদিতে তামাম সুবে বাংলার নসিব ফিরবে।’

একথা শুনে সিরাজের বুকে যেন শেল বিঁধল। সামান্য প্রজাদের মনেও কি তার প্রতি এতটুকু সহানুভূতি অবশিষ্ট নেই? সবার চোখেই কি তিনি আজ খলনায়ক? আলিবর্দির দৌহিত্র তিনি। বর্গির আক্রমণ থেকে যে আলিবর্দি বারো বছর ধরে লড়াই করে সুবে বাংলার মানুষদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, তার জন্য কি কোনও কৃতজ্ঞতা বোধ নেই সাধারণ মানুষের? আজ তাঁর দৌহিত্রের বরবাদিতে এরা সবাই খুশি?

মসনদে তো বেশিদিন বসেননি সিরাজ। নবাব হওয়ার পর এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পলাশিতে তাঁর পরাজয়। শাসক হিসেবে তিনি ভালো কি মন্দ তার আন্দাজ কেমন করে পাবে সাধারণ মানুষ? তবু তাঁর প্রতি সকলে নারাজ কেন? মিরজাফর-আলিবর্দি-জগৎশেঠ এরা সবাই মিলে নিশ্চয় সাধারণ মানুষের মনে তাঁর প্রতি গভীর নফরতি জাগিয়ে তুলেছে সুকৌশলে।

সিরাজ শুধোলেন, ‘একথা বলছ কেন?’

সেলিম বলে, ‘অনেকে বলে নবাব সিরাজদ্দৌলা নাকি সঙ্গদিল আদমি ছিলেন। হোসেনকুলি খাঁকে অন্যায় ভাবে কোতল করেছিলেন। ফৈজি নামে এক জেনানাকে জ্যান্ত গোর দিয়েছিলেন। ফকির সাহেবের মুখে শুনেছি এসব কথা।’

মাথা নিচু করে গ্রাস তুলতে তুলতে সিরাজ বলেন, ‘তেমন আমিও শুনেছি। তবে সেলিম আমরা তো শুধু একদিকের কথা জানি। নবাবের অন্তরের কথা তো জানি না। হয়তো তাঁর সঙ্গদিল হওয়ার পিছনে কোনও কারণ ছিল। এখন এসব আলোচনা থাক। তুমি খাও।’

সেলিম হেসে বলে, ‘মালুম হয় নবাব-বাদশার জিন্দেগি বড় পরেসানির। তার চেয়ে ফকিরিই ভালো। কী বলেন দাদাজি?’

লুৎফা শুধোয়, ‘নাও বাওয়ার পানি কবে মিলবে বলতে পার সেলিমভাই?’

‘এখানে বুঝি ভাবীজির ভালো লাগছে না?’ লুৎফার দিকে চেয়ে শুধোয় সেলিম।

লুৎফা বলে, ‘আজমের শরিফ যাব বলে বেরিয়েছি আমরা। পথে শুধু শুধু আটকে থাকতে কি ভালো লাগে?’

সেলিম হেসে বলে, ‘ইয়ে সহি বাত।’

মাথা নিচু করে চুপচাপ খেতে থাকেন সিরাজদ্দৌলা।

সেলিম ফের বলে, ‘শুনলাম এখান থেকে করিব ছ’-সাত ক্রোশ তফাতে ফৌজি তাম্বু পড়েছে।’

মুখে গ্রাস তুলতে গিয়ে থমকে যান সিরাজ। মুখ তুলে সেলিমের দিকে তাকিয়ে শুধোলেন, ‘ফৌজি তাম্বু?’

‘হুঁ। মিরজাফর খাঁর দামাদ মিরকাশিম ফৌজ নিয়ে এসেছেন।’

‘কেন? লড়াই বাঁধবে বুঝি?’

‘না না ফের লড়াই কীসের? লড়াই তো পলাশিতে খতম হয়ে গেছে। ফৌজ এসেছে নবাব সিরাজদ্দৌলার খোঁজে। সেরকমই তো শুনলাম।’

ছ’-সাত ক্রোশের মধ্যে মিরকাশিমের তাঁবু! মিরজাফরের ফৌজ খুঁজে বেড়াচ্ছে সিরাজকে। লুৎফা ও সিরাজ দুজনেই ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন।

.

মসজিদের চৌহদ্দিতে পদচারণা করতে করতে গতকাল রাতে সেলিমের কথাগুলো ভাবছিলেন সিরাজদ্দৌলা। মনের মধ্যে নানা চিন্তার ঝড় বইছে। মাত্র ছয়-সাত ক্রোশ দূরত্বের মধ্যে ফৌজ নিয়ে ছাউনি ফেলেছেন মিরকাশিম। এতক্ষণে রাজমহল পার হয়ে চলে যাওয়া যেত। নদীর পাড়ে কাত হয়ে থাকা নৌকোটার দিকে চোখ যায় সিরাজের। গলুইয়ের উপরে নিশ্চিন্তে খেলে বেড়াচ্ছে কয়েকটা হলদে রঙের পাখি। মাঝিরা বোধহয় এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। এই বন-জঙ্গলে ভরা এলাকা চারিদিকে জল দিয়ে ঘেরা। নদীতে নাও বাওয়ার মতো জল না পেলে এ জায়গা ছেড়ে এগোনোর উপায় নেই।

‘মেহের?’

হঠাৎই মানুষের গলার আওয়াজ শুনে চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন সিরাজ। লুৎফা এসে সিরাজের পাশে দাঁড়াল।

সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে লুৎফা। সিরাজ মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভোরের মিঠে আলোয় লুৎফাকে বড় অপূর্ব দেখাচ্ছে।

লুৎফা বলে, ‘সায়েরার জ্বরটা কমেছে। আল্লার বহুত মেহেরবানি।’

‘সায়েরা ঘুমোচ্ছে বুঝি?’

‘হুঁ। আপনি কখন উঠেছেন?’

‘অনেকক্ষণ।’

‘আমাকে ডাকেননি কেন?’ প্রশ্ন করে লুৎফা।

‘অঘোরে ঘুমোচ্ছিলে তুমি। ডাকতে মায়া হল। তোমারও তো বিশ্রাম দরকার।’

ব্যস্ত হয়ে লুৎফা বলে, ‘আমি পানি এনে দিই। হাতমুখ ধুয়ে নিন।’

‘সে সব সারা হয়ে গেছে।’

‘পানি কোথায় পেলেন?’

‘কুয়ো থেকে তুলে নিয়েছিলাম।’

‘এ কিন্তু আপনার ভারি অন্যায়।’

‘এমন বলছ কেন?’

‘আমাকে ডাকা উচিত ছিল।’

‘কেন আমি কি নিজের কাজ নিজে করে নিতে পারি না?’

লুৎফা বলে, ‘বাঁদির কাজ আপনি করবেন কেন? আপনি তামাম সুবে বাংলার নবাব।’

‘নবাব এখন মিরজাফর। সিরাজদ্দৌলা বরবাদ হয়ে গেছে।’

‘ইয়ে গলত বাত। আমি মানি না।’

‘এ তো তোমার খুশখেয়ালের কথা। নিজের মুসিবতকে কী করে অস্বীকার করব?’

‘নসিবের চাকা ঘুরবেই মেহের। কিছুদিন পরে ফের মসনদের মালিক হবেন আপনি। হরপল আমি দোয়া মাঙছি আল্লার কাছে। আমি জানি, খোদাতালা আমার খায়েশ পূরণ করবেন।’

‘আমি যে আর নবাব হতে চাই না।’

লুৎফা অবাক চোখে সিরাজের মুখের দিকে তাকায়।

সিরাজ বলেন, ‘তোমাকে নিয়ে অচেনা এক দেহাতের এক প্রান্তে ঘর বাঁধতে চাই লুৎফা। সিরাজদ্দৌলা চিরকালের মতো হারিয়ে যাক। কেবল তুজুক হয়ে থাক। তাতে আমার কোনও খেদ নেই। আমি মির্জা মহম্মদ—এক আম-আতরফ আদমির মতো বাঁচতে চাই। মাটির ঘর, মাটির দাওয়া, ছোট্ট এক চিলতে উঠোন, সায়েরা ছুটোছুটি করে খেলে বেড়াবে সেখানে। মেহনত করে আয়-উপায় করব আমি। তুমি ঘরের দেখভাল করবে। কেউ জানবে না আমাদের আসল পরিচয়।’

লুৎফার জল ছলছলে দুই চোখের তারায় খুশির খোয়াব বড় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সিরাজ বলে চলেন, ‘হিরাঝিল, মসনদ, দৌলত, হুকুমত—এসব এক অভিশাপ। নাহানে পানি এলেই ভেসে পড়ব আমরা। ভেবেছিলাম পাটনা গিয়ে ল সাহেব আর রামনারায়ণের মদতে ফের ফৌজ গড়ে তুলব। এর কোনও জরুরত নেই লুৎফা। কর্মনাশা নদী পার হয়ে বাংলা মুলুক ছেড়ে আমরা চলে যাব। অনেক দূরে। কোনও এক দেহাতে। কেউ আমাদের নাগাল পাবে না।’

প্রবল আবেগে লুৎফার হাতদুটো ধরে সিরাজ বলে ওঠেন, ‘তুমি আমার পাশে থাকবে তো লুৎফা? কোনও তকলিফ হবে না তো তোমার?’

সিরাজের বুকে মাথা রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে লুৎফা।

লুৎফার মাথায় হাত রেখে সিরাজ শুধোন, ‘কাঁদছ যে?’

চোখের জল মুছে মুখ তুলে লুৎফা বলে, ‘আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আপনাকে ছেড়ে কি আমি থাকতে পারব? আপনি পাশে থাকলে আমার আবার তকলিফ কী?’

‘কোনওরকমে কর্মনাশা নদীটা পেরিয়ে গেলেই হল লুৎফা। মিরজাফর খাঁর কাসিদরা, ইংরেজরা আমাদের নাগাল পাবে না। দোয়া মাঙো লুৎফা। খোদাতালা এই খায়েশ যেন মঞ্জুর করেন।’

ঠিক সেই সময় পিছন থেকে সমবেত পৈশাচিক হাসির শব্দ ভেসে আসল। চুরমার হয়ে গেল মসজিদ চত্বরের অপার্থিব শান্তির পরিবেশ। সিরাজ চমকে উঠে ঘুরে তাকালেন। ঘুরে তাকিয়ে চিত্রার্পিত হয়ে গেল লুৎফা।

অদূরে কুয়োতলায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন ফকির শাহ দানা ও মিরকাশিম। দু’জনের মুখে এখনও লেগে আছে খল হাসির রেশ। তাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে জনা পঁচিশ সেপাই।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *