1 of 2

পলাশির পরে – ২৩

২৩

‘ও বিদ্যা দ্যাখ কাকে নিয়ে এসেছি?’

রতু সরকারের হাঁকডাক শুনে অন্দর থেকে বাইরে এসে বিদ্যা অবাক চোখে দেখে চৌকাঠে পা রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে বছর দশেকের একটি মেয়ে। তার পিছনে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে রতুবাবু।

ভারি সুন্দর মুখশ্রী মেয়েটির। মাজা মাজা গায়ের রং। সরল দুই টানাটানা চোখে জড়িয়ে আছে ভয়। কাজল ছিল চোখে। ধেবড়ে গিয়েছে। বিদ্যার দিকে একবার চোখ তুলে চেয়ে ফের চোখ নামিয়ে নেয় মেয়েটি।

অবাক হয়ে বিদ্যা শুধোয়, ‘এ কে গো?’

‘আহা অত খতেনে তোর দরকার কী? কত ধকল করে এলাম। আগে দু’দণ্ড জিরোতে দে বাপু।’ রতু সরকার জবাব দেয়।

মেয়েটির চিবুক ছুঁয়ে আদর করে বিদ্যা শুধোয়, ‘নাম কী রে তোর মেয়ে?’

‘বৃন্দা।’

‘বা বা! বেশ নাম। আয় আয়। ঘরে আয়।’

চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢোকে বৃন্দা। টালুসমালুস চোখে চারিদিক চেয়ে দেখতে থাকে। বাড়ির বৈভব দেখে ভয় ও বিস্ময়ে খানিকটা জড়সড়। দামি আসবাবপত্রে মোড়া, সাজানোগোছানো বিশাল দোতলা কোঠাবাড়ি। বৃন্দার গরিব বাপের ভিটের মতো ভাঙাচোরা কুটির নয়। জানলা থেকে ঝোলা বাঁশের চিকের আবরু গোটানো রয়েছে। বাতাসে থিরিথিরি কাপছে জানলার সামনে ঝুঁকে পড়া নিমের পাতা। দূরে দেখা যাচ্ছে গঙ্গা। বৃন্দার বাপের ভিটেও ছিল গঙ্গার পাড়ে। বাড়ির কথা মনে পড়তেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

ব্যস্ত হয়ে রতু সরকার বলে ওঠে, ‘ওই দ্যাখো। ফের কাঁদিস কেন? ভারি ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে তো তুই।’

বিদ্যা কাছে গিয়ে বৃন্দাকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, ‘ভয় নেই রে মেয়ে। আমার কাছে থাকবি। আমাকে মাসি বলে ডাকিস।’

‘আমাকে বাড়িতে দিয়ে এসো মাসি।’ কান্না জড়ানো গলায় বলে বৃন্দা।

বিদ্যা শুধোয়, ‘এই বাড়ি বুঝি তোর পছন্দ নয়?’

‘আমি বাবার কাছে যাব।’

রতু সরকার বলে, ‘সে হবে খন। আগে তোর বাপকে তো খুঁজে বের করি। বলিহারি আক্কেল তোর বাপের। ওই বাঘা ভিড়ের মধ্যে এক রত্তি মেয়েকে কেউ নিয়ে যায়? ভাগ্যিস আমার নজরে পড়লি তাই বেঁচে গেলি।’

কৌতূহলী চোখে রতু সরকারের মুখের দিকে তাকায় বিদ্যা।

রতু সরকার বলে, বুঝলি বিদ্যা, ‘আমি দেখি এ মেয়ে ভিড়ের মাঝে এক গাছতলায় বসে অঝোরে কাঁদছে। ভাগ্যিস চোখে পড়ল। না হলে কে যে এ মেয়েকে ফুঁসলে নিয়ে যেত তার ঠিক আছে। শান্তিপুরের রাসের মেলা বলে কথা। চারিদিকে একেবারে থিকথিকে ভিড়। ও ভালো কথা, তোর জন্য একটা লক্ষ্মীর পট এনেছি রে বিদ্যা।’

বিদ্যাকে জড়িয়ে ধরে ফের কেঁদে ওঠে বৃন্দা। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় বিদ্যা। তার দুই চোখও জলে ভরে ওঠে।

.

বাপের কাছে শান্তিপুরে রাসের মেলা দেখাতে নিয়ে যাওয়ার বায়না করেছিল বৃন্দা। কোনওদিনই মা মরা মেয়ের কোনও শখ আহ্লাদ মেটাতে পারেননি গরিব পুজারি বামুন বলরাম ভট্টাচার্য। এবারে অনেক কষ্টে পথের কড়ি জোগাড় করে রাসের মেলা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন মেয়েকে। প্রবল ভিড়ের চাপে বাপের হাত ছুটে হারিয়ে গেল মেয়ে।

জহুরির চোখ রতু সরকারের। বৃন্দাকে একঝলক দেখেই তার চোখ আটকে গিয়েছিল। শিকারির মতো তক্কে তক্কে ছিল সে। ভিড়ের ধাক্কায় বাপ মেয়ের ছাড়াছাড়ি হতেই রতু সরকার পরিত্রাতার ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করে।

‘ও মেয়ে কাদিস কেন তুই? হারিয়ে গিয়েছিস বুঝি? কেঁদে আর কী করবি? চল দেখি তোর বাপকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। ভয় নেই রে। তোর বাপকে আমি চিনি।’

রতু সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটাকে চেনা ঠেকে বৃন্দার। বাঁশবেড়িয়া থেকে নৌকোয় করে আসার সময় তার বাপের সঙ্গে কথা কইছিল। চোখের জল মুছে সরল মনে উঠে দাঁড়ায় বৃন্দা।

 ‘আয় আমার সঙ্গে। হাতটা শক্ত করে ধরে রাখিস। নয়তো ফের হারিয়ে যাবি।’

রতু সরকারের হাত ধরে হাঁটতে থাকে বৃন্দা।

.

বিদ্যা হাঁক দেয়, ‘বিশুর মা! ও বিশুর মা! এদিকে এসো তো একবার।’

‘এই যে যাই।’

আঁচলে হাত মুছতে মুছতে অন্দর থেকে বিশুর মা ছুটে আসে। বিদ্যার পরিচারিকা।

বিদ্যা বলে, ‘একে নিয়ে যাও ভিতরে। নতুন কাপড় বের করে দিও। যা মা ভিতরে যা। ভালো করে নেয়ে নিয়ে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম কর।’

‘এসো দিদি। আমার সঙ্গে এসো।’

যন্ত্রচালিতের মতো বিশুর মার সঙ্গে বিদ্যা ভিতরে চলে যায়।

বৃন্দা ভিতরে যেতেই শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে বিদ্যা বলে, ‘তুমি কেমন মানুষ গো?’

বিদ্যার কোমর জড়িয়ে ধরে রতন সরকার বলে, ‘কেন রে? মানুষটা কি আমি খারাপ?’

‘আহা রে! ফুলের মতো মেয়েটাকে তুমি এ পথে নিয়ে এলে?’

‘ওর বাপের বড় উপকার করলাম রে। মেয়েটার একটা গতি করে দিলাম।’

বিদ্যা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদে।

কোমর থেকে হাত সরিয়ে বিদ্যার চিবুক ছুঁয়ে রতু সরকার বলে, ‘আহা তুই আবার কান্নাকাটি করিস কেন?’

‘তোমার পায়ে পড়ি। মেয়েটাকে পাপের পথে টেনে এনো না। ওর বাপের কাছে দিয়ে এসো।’

‘তোর যত উটকো বুদ্ধি। মেয়েটার মুখখানার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখেছিস?’

‘তাই তো বলছি। সাক্ষাৎ যেন লক্ষ্মী পিতিমা।’

রতু সরকার পানের ছোপ ধরা দাঁত বের করে হেসে বলে, ‘অত রূপ নিয়ে গরিবের ঘরে জম্ম হল অভিশাপ। বাঁশবেড়িয়ার ঘাট থেকে একই নৌকোয় চড়ে ওদের সঙ্গেই শান্তিপুরে গিয়েছিলাম কিনা। ওর বাপের সব খতেন আমি জেনে নিয়েছি। বাপের নাম বলরাম ভটচাজ। পুজো-আচ্চা করে কোনওরকমে সংসারটা চালায়। কোন রাজপুত্তুর বে করবে ওর মেয়েকে? বাপ তো দু’দিন পরে কোনও হা-ঘরের গলায় মেয়েটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলত। তারপর? আড়কাঠিদের নজরে পড়ে ও মেয়ে উঠত গিয়ে হারেমে। ও জীবন যে নরক যন্ত্রণার সমান, তা বুঝিস? তার চেয়ে এই কলকেতার বাজারে নগদে গতর বেচা ঢের ভালো রে। খুশি মতো কারবার, কারও কাছে বাঁধা থাকা নয়, ফ্যালো কড়ি, মাখো তেল। একবার সাহেবদের নজরে পড়লে ও মেয়েকে ফিরে তাকাতে হবে না। পয়সা পায়ে এসে লুটোবে। সেই সঙ্গে আমারও এট্টু-আধটু—হে হে হে…’

বিদ্যার গালে আঙুল দিয়ে একটা ঠোনা মারে রতু সরকার। বলে, ‘সবই তো তুই বুঝিস।’

বুকের উপরে আঁচল টেনে বিদ্যা বলে, ‘তুমি একটা নরপিশাচ। একটুও কি দয়ামায়া নেই তোমার?’

রতন সরকার হেসে বলে, ‘বেশি দয়ামায়া থাকলে, দেউলে হয়ে আজ ভিক্ষে করে বেড়াতাম। পয়সা ওড়ে কলকাতার বুকে। তা ধরতে জানতে হয় রে বিদ্যা। লোকে বলে মাগির দালাল রতু সরকার। সে বলুক, কিন্তু লোকের কি ভালো করিনি আমি? এই যেমন তুই। তোকে দিয়ে এ কারবারে আমার হাতে খড়ি। আজ রাজরানির চেয়ে মন্দ কি আছিস তুই? কোনও বাবুর মরজির বাঁদি নোস। কেল্লার লালমুখো সাহেবগুলো তোর পায়ে এসে পোষা কুত্তার মতো লুটোয়। বিদ্যা মেমসাহেবের নাম শুনলে ব্যাটাদের নোলা একেবারে লকলক করে। এ কি চাট্টিখানি কথা?’

‘টাকা-কড়ি, সোনাদানা এসব তো আমি চাইনি রতুবাবু। শুধু একটা ঘর চেয়েছিলাম।’ এই বলে ঝরঝর করে কেঁদে ওঠে বিদ্যা।

রতু সরকার ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, ‘অ্যাঁ? ঘ-অ-র? সতীপনার উটকো পেতনি থেকে থেকে ভর করে তোর মাথায়। বাপ তো ঝুলিয়ে দিয়েছিল এক ঘাটের মড়ার গলায়। তারপর?’

সহসা বিদ্যার চোখে ভেসে ওঠে সেই ভয়ংকর ছবিটা। বিয়ের পর মাস ঘুরতে না ঘুরতেই মরল বুড়ো বর। আত্মীয়-কুটুম্বরা সতী হওয়ার নিদান দিল। কিশোরী বিদ্যাকে টানতে টানতে সবাই নিয়ে চলল ঘাটে। ঢাক-ঢোল, কাসর-ঘণ্টার সে কী বীভৎস আওয়াজ। বিদ্যা তখন অঝোরে কাঁদছে আর বলছে, ‘তোমাদের পায়ে পড়ি গো। ছেড়ে দাও আমাকে। আমি জ্যান্ত পুড়ে মরতে পারব না।’

কে শুনবে সেই আর্তি? গোবিন্দ চক্কোত্তির বিধবা বউটা সতী হবে, সেই খুশিতে গোটা গাঁ তখন উত্তাল। লোকজন সব উপচে পড়েছে নদীর ঘাটে। এয়োতী মেয়েরা এসেছে দলে দলে। সতীস্থলের মাটি সিঁথিতে ছুঁইয়ে অক্ষয় করবে স্বামীর আয়ু।

দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল চিতা। বিদ্যার আর্তনাদকে চাপা দিতে ভয়ানক জোরদার হল ঢাক-ঢোল, কাসর-ঘণ্টার আওয়াজ। বাঁচার প্রবল তাগিদে হঠাৎই যেন হাজার হাতির বলসঞ্চার হল বিদ্যার দেহে। যে লোকটি তার হাত ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সর্বশক্তি দিয়ে বিদ্যা কামড় বসাল তার হাতে। বিদ্যার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের হাত চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল লোকটা। বিদ্যারই দুঃসম্পর্কের এক দেওর। চকিতে চিতা থেকে একখানা জ্বলন্ত কাঠ হাতে নিয়ে রণংদেহী মেজাজে রুখে দাড়াল বিদ্যা।

পিছন থেকে কেউ এক জন চেঁচিয়ে উঠল, ‘হাঁ করে দেখছিস কী সব? লাঠি চালা। বজ্জাত মাগির মাথাটা দুফাঁক করে দে।’ লাঠি হাতে রে রে করে ছুটে এল কয়েকজন। জ্বলন্ত কাঠটা তাদের দিকে ছুড়ে দিয়ে বিদ্যা ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। গঙ্গায় তখন বান আসছে। গাঁয়ের লোকেদের হতচকিত ভাবটা কাটবার আগেই প্রবল জলের তোড়ে তাদের চোখের নজর থেকে হারিয়ে গেল বিদ্যা।

ত্রিবেণী থেকে নৌকোয় ফিরছিল রতু সরকার। বিদ্যাকে সে কুড়িয়ে পেয়েছিল হুগলির অদূরে। নদীর এক নির্জন চরে। অর্ধনগ্ন, সংজ্ঞাহীন অবস্থায়। স্তনযুগল অনাবৃত।

বরানগরে গঙ্গার পাশে নিরিবিলিতে একখানা বাড়ি ভাড়া করে বিদ্যাকে সেখানে নিয়ে তুলল রতু সরকার। মাসখানেক বেশ ভালোই কাটল বিদ্যার। রতু সরকার দু’বেলা এসে তার খবর নিয়ে যেত। মানুষটাকে যেন একটু একটু করে ভালো লাগতে শুরু করল সদ্য ঘর, কুল সব হারানো বিদ্যার। বাঁচতে হবে। পিছু টান ভুলে নতুন স্বপ্নের আনাগোনা শুরু হল বিদ্যার চোখে। এমন সময় হঠাৎই একদিন রাতে টোকা পড়ল তার ঘরে।

‘কে?’

‘আমি রতুদাদা। ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? দরজাটা একবার খোল দেখি।’

‘এত রাতে কী দরকার তোমার?’

‘আছে আছে। দরকার আছে।’

‘কাল এসো।’

‘ওরে খোল দেখি। অত ভয়টা কিসের? আমি কি বাঘ নাকি যে তোকে খেয়ে ফেলব?’

বাধ্য হয়েই উঠে এসে দরজার আগল খোলে বিদ্যা।

দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে রতন সরকার। সঙ্গে ফোর্ট উইলিয়ামের হোমরা চোমরা এক সাহেব।

ঘরের ভিতরে জ্বলতে থাকা কুপির আলোয় বিদ্যাকে এক ঝলক দেখেই সাহেব বলে ওঠে, বিউটিফুল। বেহায়ার মতো সাহেবের সামনে হাত পাতে রতু সরকার। জেবের ভিতর হাত চালিয়ে কয়েকটা রুপোর টাকা বের করে তার হাতের তালুর উপর ফেলে সাহেব।

অজস্র বিষধর সাপ একযোগে যেন বিদ্যার গোটা শরীরকে দংশন করে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে রতু সরকার বলে, ‘আজ রাতটা সাহেব থাকবে তোর ঘরে। ভালো করে একটু যত্নাত্তি করিস। সতীপনা দেখাতে গিয়ে পাগলামি করিস নে যেন। সাহেবকে খুশি করতে পারলে তোর কপাল খুলে যাবে। আমি এখন আসি। কাল আসব।’

কানে যেন শেল বেধে বিদ্যার। বাইরে থেকে দরজার আগল তুলে দেয় রতু সরকার।

আশা ভঙ্গের বেদনায় বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় কান্না।

মদের নেশায় বেসামাল, কামতাড়িত ইংরেজ সাহেব টলমল পায়ে বিদ্যার সমুখে এসে তার চিবুক ছুঁয়ে বলে, ‘ইউ আর টু প্রিটি মাই সুইট হার্ট।’

ভয়ে চোখ বুজে ফেলে বিদ্যা।

সহসা সবেগে তাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে সাহেব। বিদ্যার নরম শরীরটা দুই পেশিবহুল হাতের চাপে যেন গুঁড়িয়ে যেতে থাকে। চিৎকার করে ওঠার বিফল চেষ্টা করে সে। তার নরম ঠোঁটদুটো অবরুদ্ধ হয়ে যায়। বিদ্যাকে নিয়ে সাহেব আছড়ে পড়ে ফরাসের উপরে।

সেই শুরু। সব কিছুই ধীরে ধীরে মেনে নিল বিদ্যা। কিছুদিনের মধ্যেই ফোর্ট উইলিয়ামের সাহেব মহলে ছড়িয়ে পড়ল তার নাম। বিদ্যার কল্যাণে দালাল রতু সরকারেরও বেশ দু’পয়সা রোজগার হতে লাগল। তবে রতু সরকার কিন্তু বিদ্যাকে কখনও প্রতারিত করেনি। তার প্রাপ্য কড়ি বরাবরই কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে দিয়েছে।

মনের মতো শয্যাসঙ্গিনী পেলে সাহেবরা খুশিতে একেবারে প্রায় পাগল হয়ে যায়। হাত উপুড় করে পয়সা দেয়। এই বৃত্তিতে লাভের বহর দেখে মাথা ঘুরে গেল রতু সরকারের। আড়কাঠিদের মাধ্যমে গাঁ-গঞ্জ থেকে নতুন নতুন মেয়ে ফুঁসলে এনে ফোর্ট উইলিয়ামের সাহেবদের মনোরঞ্জনের ফলাও কারবার ফেঁদে বসল সে। কয়েকবছরের মধ্যেই অঢেল টাকার মালিক হয়ে গেল রতু সরকার। লোকে বলে, মাগির দালালি করে রতু সরকার আজ রইস আদমি। রতু সরকার হাসে। ভাবে, এই কলকাতা শহরের কেউকেটা যারা, তাদের মধ্যে কেই বা সোজা পথে টাকা করেছে। মাগির দালালি এমন কী খারাপ কাজ!

.

বেলা গড়িয়ে গিয়েছে অনেকটা। স্নানাহার সেরে ভিতরের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লান্ত বৃন্দা। বাইরের ঘরে ফরাসের উপরে বসে রতু সরকারের সঙ্গে কথা বলে চলেছে বিদ্যা। সে বলে, ‘এমনিতেই তো পাপে ডুবে রয়েছি। ও মেয়েকে এখানে তুলে দিয়ে আমার পাপ বাড়াচ্ছ কেন?’

পান চিবোতে চিবোতে রতু সরকার বলে, ‘অবুঝের মতো কথা বলিস না। তোর কাছে ছাড়া নিরাপদে কোথায় রাখব মেয়েটাকে?’

শাড়ির আঁচলে ফের চোখের জল মোছে বিদ্যা।

‘এই কাঁদুনেপনা ছাড় দেখি। মেয়েটাকে ঘষেমেজে ভালো করে তৈরি করে দে। সাহেবদের পছন্দ-অপছন্দ তো তুই ভালোই জানিস। তবে একটা কথা মিলিয়ে নিস বিদ্যা, ফের বলছি আমি, রতু সরকার ভুল করে না। দেহে যৌবনের লক্ষণগুলো সব ফুটে উঠলে, পয়সাও মেয়ের পায়ে এসে লুটোবে।’

রতু সরকারের অনুমান মিথ্যে হয়নি। কয়েকবছরের মধ্যেই কলকাতার সাহেবমহলে ঈশ্বরীর নাম ছড়িয়ে পড়ল। বৃন্দার ওই নাম রেখেছিল বিদ্যা। বলরাম ভট্টাচার্যের আদুরে মেয়ে বৃন্দা হারিয়ে গেল কলকাতা শহরে। বেঁচে রইল গণিকা ঈশ্বরী। তার টানে বরানগরে রতু সরকারের বাগানবাড়িতে সাহেবদের নিত্য আনাগোনা।

আলিবর্দির কাল গেল। মসনদে বসলেন সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই বাঁধল নবাবের। সদ্য গড়ে উঠতে থাকা শহরটাকে সিরাজ চুরমার করে দিয়ে গেলেন। ইংরেজরা পালিয়ে গেল ফলতায়। ইংরেজদের ব্যাবসা বন্ধ হল। শুকিয়ে গেল কলকাতার শাঁস, রং, রস। রতু সরকারের কারবারেও টান পড়ল।

তারপর একদিন গঙ্গা তোলপাড় করে নৌবহর নিয়ে বাংলায় এসে হাজির হলেন রবার্ট ক্লাইভ ও চার্লস ওয়াটসন। কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতায় ফিরে এল ইংরেজরা। মাদ্রাজ থেকে আসা ক্লাইভ ও ওয়াটসনের বাহিনীর অফিসারদের দেহসুখ চরিতার্থ করতে ফের জোয়ার এল রতু সরকারের কারবারে।

একদিন মেজর আয়ারকুটকে খাতির করে ডেকে আনল রতু সরকার। এক রাত ঈশ্বরীর সঙ্গে কাটিয়ে আয়ারকুট প্রেমরসে মজলেন। গোটা একটা মোহরের খেরিয়া রতু সরকারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাবু আই ওয়ান্ট দিস গার্ল।’

প্রমাদ গুনলেন রতু সরকার। ওদিকে ঈশ্বরীও কেমন যেন বদলে গেল। অন্য সাহেবদের সে ফিরিয়ে দিতে লাগল। শুধু মেজর আয়ারকুট ঘনঘন আসতে লাগলেন বরানগরের বাড়িতে। আয়ারকুট এলে খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠত ঈশ্বরী।

রতু সরকারের চক্ষু চড়কগাছ। ‘ও রে বিদ্যা—এ মেয়ে যে কারবার ভুলে দেখি ভালোবাসায় হাবুডুবু খাচ্ছে।’

বিদ্যা মুখ টিপে হেসে বলে, ‘খেলেই বা। তুমি তাতে নজর দাও কেন?’

‘আমার কারবারের যে সব্বনাশ হয়ে যাবে।’

ফের যুদ্ধের দামামা বাজল। বেঁচে গেল রতু সরকার। ঈশ্বরীকে ভুলে মেজর আয়ারকুট ছুটলেন, হুগলি-চন্দননগর-পলাশি-পাটনা।

বিপর্যয় হল সিরাজদ্দৌলার। মসনদে বসলেন মিরজাফর। কয়েকদিন পর রাজমহলে ধরা পড়লেন সিরাজ। তারপর জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের কয়েদখানায় খুন হলেন তিনি।

লোকে একটু একটু করে বুঝতে শুরু করল মিরজাফর নামেই নবাব, আসলে তিনি ইংরেজদের হাতের পুতুল। রতু সরকার বুঝলেন, সুবে বাংলায় দোর্দণ্ডপ্রতাপ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে ইংরেজরা। মুর্শিদাবাদের সব জলুস শুষে নিয়ে আগামী দিনে সব রং, রোশনি, জলুসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চলেছে কলকাতা। ফের টাকা উড়ছে কলকাতায়।

রতু সরকার বলল, ‘সুদিন আসছে রে বিদ্যা, চল তার আগে কাশী থেকে তীর্থ করে আসি।’

‘বেশ চলো। ঈশ্বরীকেও সঙ্গে নিয়ে যাই। সারাদিন মনমরা হয়ে থাকে মেয়েটা। তীর্থে গেলে হয়তো মন ভালো হয়ে যাবে।’

রতু সরকার হেসে বলে, ‘ওর এখন শ্রীরাধিকার দশা। বলিহারি বটে মেয়ের বুদ্ধির। গতর বেচার কারবারে নেমে কেউ মন বাঁধা দেয়? যৌবন গেলে বুঝবে লোকসানের বহরটা।’

কিছুদিন পরে ভাড়া করা কয়েকজন লেঠেল ও চাকরবাকরসহ বিদ্যা ও ঈশ্বরীকে নিয়ে রতু সরকার রওনা হল কাশীর পথে। সুতীর কাছে নোঙর ফেলেছিল বজরা। খুবসুরত দুই জেনানা রয়েছে বজরায়—আড়কাঠিদের মুখে এই খবর পেয়ে হামলা করল লুঠেরার দল। এরা মিরনের অনুগত। নবাবজাদার অস্বাভাবিক রতিসুখতৃষ্ণা মেটাতে তাদের তখন জেরবার অবস্থা। গাঁ-গঞ্জ ছেঁচে নিত্যদিন তারা খুবসুরতিদের জোর করে তুলে নিয়ে আসে। হররোজ নতুন শয্যাসঙ্গিনী না পেলে নবাবজাদার যৌন উন্মাদনা শান্ত হয় না। জাফরাগঞ্জের পাথরের দেওয়ালের গায়ে কান পাতলে শোনা যায় বহু গৃহস্থ ঘরের মেয়ে, বউদের অসহায় কান্না।

রাত গভীর। লেঠেলদের চোখেও ঘুম। কখন যে লুঠেরাদের নৌকোটা বজরার গায়ে এসে ভিড়েছে টের পায়নি তারা। একটা শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায় ঈশ্বরীর। তারপরেই সে শুনতে পায়, রতু সরকারের তীব্র আর্তনাদ, ডাকাত! ডাকাত!

ভয়ে কেঁপে ওঠে ঈশ্বরী। সহসা তার কক্ষের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে আসে এক ছায়ামূর্তি।

ঈশ্বরী চিৎকার করে উঠতেই লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়ে লোহার মতো শক্ত হাতের থাবায় চেপে ধরে তার মুখ। তারপর এক ঝটকায় তাকে কাঁধের উপর ফেলে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।

 ঈশ্বরীকে নিয়ে লোকটা কাঠের পাটাতন বেয়ে দ্রুত পাশের নৌকোয় উঠতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে তার মাথায় এসে পড়ে একটা লাঠির বাড়ি। লোকটা হুমড়ি খেয়ে জলের মধ্যে গিয়ে পড়ে। ঈশ্বরীও ছিটকে পড়ে জলে।

লাঠিটা চালিয়েছিল রতু সরকার। লুঠেরাদের দলের আরেকজন রতু সরকারের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকে গেঁথে দেয় খঞ্জর।

.

ভোরের আলো সবে ফুটেছে। ছইয়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে নৌকোর গলুইয়ের উপরে দাঁড়াল বচন সিং। পাটনার নায়েব রামনারায়ণের অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী। দেওয়ান রায়দুর্লভকে উদ্দেশ্য করে লেখা তার মনিবের একটা চিঠি সরাসরি দেওয়ান সাহেবের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সে এসেছিল মুর্শিদাবাদে। কাজ শেষ করে পাটনায় ফিরছিল বচন সিং।

গলুইয়ে দাঁড়িয়ে ভোরের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে সহসা বচন সিং-এর চোখে পড়ল, অদূরে একটা কাঠের গুড়িকে আঁকড়ে ধরে ভেসে চলেছে এক যুবতী। হাতের ইশারায় সে সাহায্য চাইছে। বচন সিং-এর হুকুমে সঙ্গে সঙ্গে দুজন ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। সেই যুবতীকে উদ্ধার করে নৌকোয় নিয়ে তুলল। বর্ষায় দুকুল ছাপিয়ে যাওয়া তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল নদীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ লড়াই করতে করতে সেই যুবতী তখন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। অসাড় হয়ে আসছে তার গোটা দেহ।

বচন সিং শুধোল, ‘কে তুমি? কী নাম তোমার?’

চেতনা হারানোর আগে অস্ফুট স্বরে যুবতী শুধু বলল, ‘ঈ-শ্ব-রী।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *