1 of 2

পলাশির পরে – ৩৩

৩৩

দুর্গাপুজোর পর ক্লাইভ চন্দননগরে ফিরতেই মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারাম এসে লুটিয়ে পড়লেন তাঁর পায়ে।

 ‘হুজুর আমি আপনার গোলাম। মুনশিজির কাছ থেকে সবই তো শুনেছেন। মুর্শিদাবাদে তলব করেছেন নবাব। ওখানে গেলেই আমার গর্দান যাবে। আমার জান বাঁচান হুজুর।’

ভয়ে বলির পাঠার মতো কাঁপতে থাকেন রাজারাম।

পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন নবকৃষ্ণ। তিনি বলেন, ‘এত ভয়ের কী আছে ফৌজদারমশায়?’

‘নবাবের তলবে আমার রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে হুজুর।’

ক্লাইভকে নিশ্চুপ দেখে রাজারাম বলেন, ‘ফরাসিদের একটা দলকে আমি মাদ্রাজে পালিয়ে যেতে মদত দিয়েছি। ইয়ে ইলজাম সচ হ্যায়। আমি কবুল করছি। আমার কসুর মাফ করুন হুজুর।’

রাজারামের ত্রস্ত মুখচোখ দেখে হাসি পেয়ে গেল ক্লাইভের। সজোরে হেসেও উঠলেন।

এই হাসিতে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে নবকৃষ্ণর পানে করুণ ভাবে চাইলেন রাজারাম।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনি দেখছি আজব লোক। হুজুরকে এখনও চিনে উঠতে পারলেন না? তার চরণে এসে ঠাই নিয়েছেন। আর ভাবনা কী?’

রাজারামের পিঠে হাত রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘ডরো মাত। মুর্শিদাবাদে যেতে হবে না।’

তবুও ভয় রাজারামের চোখেমুখে। বললেন, ‘সে না হয় গেলাম না। কিন্তু তাও কি স্বস্তি আছে হুজুর? আমার উপরে নজর রাখছে নবাবজাদার কাসিদরা। অচানক খুন হয়ে যেতে পারি।’

ক্লইভ একটু ভেবে বললেন, ‘আপাতত তাহলে আমার ক্যাম্পেই থাকুন।’

এবারে হাসি ফুটল রাজারামের মুখে। ‘হুজুরের অশেষ কৃপা।’

‘বাট ইউ হ্যাভ টু পে অনার টু নবাবস অর্ডার।’ বললেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন কথাটার অর্থ। ফের ত্রস্ত হয়ে পড়লেন রাজারাম।

‘সেন্ড ইওর টু রিপ্রেসেন্টেটিভস টু মুর্শিদাবাদ।’

‘এ একেবারে মোক্ষম দাওয়াই। সাপ মরল, ওদিকে লাঠিটি রইল অক্ষত।’ বললেন নবকৃষ্ণ।

ক্লাইভ বললেন, ‘নবাবকে একটা চিঠি লিখে দিন। তবিয়ত আচ্ছা নেই। সো আই অ্যাম আনেবল টু প্রেসেন্ট মাইসেলফ বিফোর ইউ। সেন্ডিং মাই রিপ্রেসেন্টেটিভস।’

মাথা নুইয়ে আবেগতাড়িত গলায় রাজারাম বলে উঠলেন, ‘হুজুর, জিন্দেগিভর এই বান্দা আপনার গোলাম হয়ে থাকবে। আপনার রহেমে আমার জান বাঁচল।’

রাজারামের এক অনুচর বড় বড় দুটো পেটিকা এনে ক্লাইভের পায়ের কাছে রাখল।

ক্লাইভ শুধোলেন, ‘হোয়াট ইজ ইট?’

‘হুজুরের নজরানা।’ এই বলে পেটিকাদুটির ডালা খুললেন রাজারাম।

দুটো পেটিকাই মোহরে ঠাসা। ক্লাইভের চোখ ঝলসে গেল। এইরকম দুটো পেটিকায় মোট কত মোহর থাকতে পারে ভেবে মনে মনে তিনি পুলকিত হয়ে উঠলেন। মনের উচ্ছ্বাস দমন করে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ইউ কেম ফ্রম ফার অ্যাওয়ে। নাউ টেক রেস্ট।’

.

রাজারামের প্রতিনিধি হয়ে তাঁর ভাই নারান সিং ও ছেলে মথুর সিং গেল মুর্শিদাবাদে। হিরাঝিল প্যালেসের দরবারে মিরজাফরের সম্মুখে হাজির হয়ে নারান সিং বলল, ‘বড়ে ভাইয়ার তবিয়ত আচ্ছা নেই। তাই দরবারে হাজির হতে পারলেন না। আমাদের পাঠিয়েছেন।’

মিরজাফর গর্জন করে উঠলেন, ‘বেতমিজ কাঁহিকা। নবাব বেওকুফ নয়।’

নারান সিং মরিয়া হয়ে বোঝানোর কোশিশ করে, ‘আপনার ফরমায়েশ মতো দেওয়ানখানার জাবেদা খাতা আমি নিয়ে এসেছি হুজুর।’

‘খামোশ!’

নারান সিং ও মথুর সিং-কে কারাগারে কয়েদ করলেন মিরজাফর।

কয়েকদিন পরেই ক্লাইভের চিঠি পেলেন নবাব।

‘…হুজুর আশা করি সহি সালামত, খুশ তবিয়ত আছেন। শুনলাম নারান সিং ও মথুর সিং-কে আপনি কয়েদ করেছেন। তারা যেন জিন্দা থাকে। ডিউরিং উইণ্টার আই উইল ভিসিট মুর্শিদাবাদ। অ্যাট দ্যাট টাইম আই উইল প্রেসেন্ট রাজারাম বিফোর ইউ। শুনলাম, ইউ স্যাকড রাজারাম। আমি মনে করি ইট ইজ অ্যা রঙ ডিসিশন। রাজারাম কাবিল-ই-ইনসান। আমি চাই উনিই মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে বহাল থাকুন। এতে আপনারই ভালো হবে বলে আমার ধারনা। অবশ্য আপনি সুবে বাংলার নবাব। যা ভালো বোঝেন, তাই করবেন।…’

থমকে গেলেন মিরজাফর। ভেবেছিলেন রাজারামকে সবক শেখাতে মথুর সিং ও নারান সিং-কে কোতল করবেন। ক্লাইভের ভয়ে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হল।

ওদিকে অন্য এক সমস্যা। পুত্র মিরনের খায়েশে তার এক দোস্ত খোজা হাদীকে তিনি ইতিমধ্যেই মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে বহাল করে হুকুমনামা জারি করেছেন। হাদীর উপরে কড়া নির্দেশ ফৌজদারের দায়িত্ব নিয়েই রাজারামের সঞ্চিত ধনদৌলত লুঠে নিয়ে মুর্শিদাবাদে পাঠাতে হবে। কয়েদ করতে হবে তাকে। যদি রাজারাম পালানোর বা বাধা দেওয়ার কোশিশ করেন তো তাকে খতম করতে হবে। এই পরোয়ানা নিয়ে ইতিমধ্যেই মুর্শিদাবাদের পথে রওনা হয়ে গিয়েছেন হাদী। এখন উপায়?

চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লেন মিরজাফর। কী করবেন এখন? অবশেষে ক্লাইভের ইরাদাই মেনে নিলেন তিনি। মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে হাদীর নিযুক্তি বাতিল করে ফের একটা পরোয়ানা জারি করলেন নবাব। তা নিয়ে কাসিদ ছুটল মেদিনীপুরের পথে।

এই সংবাদ পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল মিরন। এ যে তার ঘোর বেইজ্জতি। সে কথা দিয়েছিল দোস্ত হাদীকে – মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদ পাইয়ে দেবে। তড়িঘড়ি হাদীর নামে জারি হওয়া পরোয়ানা কেন বাতিল করলেন নবাব, তা বুঝে উঠতে পারছে না মিরন।

পুত্রের কাছে ক্লাইভের চিঠির কথা গোপন করে গিয়েছেন মিরজাফর খাঁ। এমনিতেই নিজামতের বিভিন্ন কাজে ইংরেজ রেসিডেন্টের খবরদারিতে মিরন ভয়ানক ক্ষুব্ধ। ক্লাইভের চিঠির কথা শুনলে হঠকারিতা করে সে হয়তো এমন কিছু করে বসবে যাতে কর্নেল সাহেবের বিরক্তি আরও বাড়বে। এই ভেবে হাদীর নামে পরোয়ানা বাতিলের আসল কারণটা পুত্রের কাছে চেপে গিয়েছেন নবাব। মিরন ভাবছে, এ নবাবের খুশখেয়াল।

রোজই একবার জাফরাগঞ্জ থেকে হিরাঝিল প্যালেসে গিয়ে নবাবকে সেলাম জানিয়ে আসে মিরন। রাগে, ক্ষোভে গত দুই দিন ধরে সে নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায়নি। পুত্রের মান ভাঙাতে জাফরাগঞ্জে ছুটলেন বিচলিত নবাব। মিরন যে তাঁর মস্ত বলভরসা।

পালকির অন্দরে গিরদায় ঠেস দিয়ে ঝিমোচ্ছিলেন নবাব। দুলুনিতে টলে টলে পড়ছিল মাথা। হঠাৎই মাথাটা গিয়ে ধাক্কা খেল কাঠের দেওয়ালে। উষ্ণীষ খসে গেল মাথা থেকে। ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসলেন। উষ্ণীষটা তুলে নিয়ে ফের মাথায় চাপালেন। মনের মধ্যে ফের চক্কর কাটতে লাগল একাধিক পরস্পর বিরোধী চিন্তা।

সত্যিই যদি বর্গিরা হানা দেয় তো কী হবে? আলিবর্দির জমানায় বর্গিদের যে রূপ তিনি দেখেছেন তা ভয়ংকর। হাদী নালায়েক। তার চেয়ে রাজারাম অনেক যোগ্য ব্যক্তি। মিরজাফর ভাবতে থাকেন, মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে তাকে পুনর্বহাল করে ভালোই হয়েছে। একদিক থেকে ক্লাইভ তাঁর উপকারই করেছেন। পরক্ষণেই আবার তাঁর মনের অন্দরে উঁকি দেয় আফশোশ। রাজারামের ধনদৌলত দখলের মনসুবা বানচাল হয়ে গেল। টাকা! অনেক টাকা চাই তার। না হলে নবাবি করে সুখ কোথায়? ভেবেছিলেন মসনদে বসে দুহাতে টাকা লুঠবেন। কিন্তু কোথায় টাকা? কোম্পানির দাবি মেটাতেই তোশাখানা শূন্য হয়ে যাচ্ছে। তেমন সুখ ভোগ হচ্ছে কোথায়? তিনি সুবে বাংলার নবাব। কেন তাঁকে তাকিয়ে থাকতে হবে ক্লাইভের মুখের দিকে? চলতে হবে তাঁর ইচ্ছার সঙ্গে তাল মিলিয়ে? মিরজাফর একবার ভাবলেন এখন থেকে তিনি উপেক্ষা করবেন ইংরেজ কোম্পানিকে। তাতে যা হয় হবে। এ ভাবে অন্যের খায়েশের গোলাম হয়ে মসনদে বসে থাকা অর্থহীন। তখনই মনে পড়ে গেল অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার কথা। কানাঘুষোয় যা শোনা যাচ্ছে, তা যদি সত্যি হয়, সুজাউদ্দৌলা যদি হানা দেন বাংলায় তখন কে বাঁচাবে তার মসনদ? সেক্ষেত্রে কোম্পানির ফৌজই যে ভরসা।

নবাবের তাঞ্জাম এসে থামল জাফরাগঞ্জ প্যালেসের দেউড়িতে।

আব্বাহুজুর এসেছেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সব মানঅভিমান ভুলে ছুটে এল মিরন। খোশ-আমদেদ করে নবাবকে সে নিয়ে গেল অন্দরে।

মিরন ও তার নতুন দেওয়ান রাজবল্লভের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন নবাব। শামাদানে পুড়ছে অভ্রের পাত। মাথার উপরে জ্বলছে ঝাড়বাতি। উজ্জ্বল হলদে আলোয় ঘর আলোকিত।

‘বাগি হয়েছেন পূর্ণিয়ার দেওয়ান অচল সিং। খাজনা দিতে ইনকার করেছেন। শুনেছেন নিশ্চয়ই।’ রাজবল্লভের উদ্দেশে কথাটা বললেন মিরজাফর খাঁ।

‘জি হুজুর।’

‘আপনি আকলমন্দ আদমি। এখন কী করা যায়, একটা মতলব বের করুন।’

‘ফওরান পূর্ণিয়ায় ফৌজ না পাঠালে নবাবের ইজ্জত বলে কিছু আর থাকবে না হুজুর।’

মিরন বলে উঠল, ‘সহি বাত। এই বেতমিজি বরদাস্ত করলে অন্যেরাও বাগি হবে।’

চিন্তিত গলায় মিরজাফর বললেন, ‘লেকিন ফৌজ যে পাঠাব তার কড়ি কোথায়? সেপাইদের মাহিনা বাকি পড়ে আছে। বকেয়া না মেটালে তারা ফির লড়াইয়ে যেতে নারাজ। কোথায় টাকা?’

মিরনের চোখদুটো টকটকে লাল। সে নেশাগ্রস্ত। কৈফিয়ৎ চাওয়ার ঢঙে বলল, ‘রাজারামকে গ্রেফতার করলেই তো পূর্ণিয়ায় ফৌজ পাঠানোর কড়ি হাতে চলে আসত। হাদীর নামে মেদিনীপুরের ফৌজদারির পরোয়ানা আপনি বাতিল করলেন কেন?’

উত্তরের প্রতীক্ষায় নবাবের মুখপানে চেয়ে রইলেন মিরন।

‘গুসসা মাত করো বেটা। এক বাত তোমাকে বলিনি। ক্লাইভ সাহেব চান রাজারামই মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে বহাল থাকুন। তাই—’

চিৎকার করে ওঠে মিরন, ‘সুবে বাংলার নবাব আপনি না ক্লাইভ সাহেব?’

পিতাপুত্রের এই কলহের মাঝে পড়ে রাজবল্লভ বিচলিত।

‘শান্ত হও বেটা। ক্লাইভ সাহেবের গুসসার কারণ হতে চাই না আমি।’

রাগে কুরসি ছেড়ে ঘরের মধ্যে অস্থির ভাবে পায়চারি করতে লাগল মিরন।

পরনের সদরিয়ার জেবে হাত ঢুকিয়ে একটা কাগজ বের করে হতাশ গলায় নবাব বললেন, ‘এটা পড়ে দ্যাখো। কর্নেলের চিঠঠি।’

চিঠিটা মিরজাফরের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে তাতে দ্রুত চোখ বোলায় মিরন।

‘আগেও একটা চিঠঠি লিখেছিলেন কর্নেল। ইয়ে দুসরা খত। গতকাল পেয়েছি।’

ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…রাজারামকে এবারে মুর্শিদাবাদে ডেকে পাঠিয়ে বিষয়টা আপোসে মিটিয়ে নিন। আপনাকে সুপরামর্শ দেওয়া আমার কর্তব্য বলে আমি মনে করি, তাই বলছি এ কথা। অবশ্য একটা বিষয় জেনে আমি খুশি হয়েছি যে ইতিমধ্যেই আপনি রাজারামকে মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে পুনর্বহাল করে হুকুমত জারি করেছেন। আপনি ও আমি, দুজনে গভীর রিস্তেদারির বাঁধনে বাধা পড়েছি। আমার একিন ছিল এই যে আমার ইরাদা আপনি মঞ্জুর করবেন। নারান সিং ও মথুর সিং যেন জিন্দা থাকে। কিছুদিন পরে আমি মুর্শিদাবাদে আসব। তখন এদের বিষয়ে ফয়সালা করা যাবে। সহি সালামত, খুশ তবিয়ত থাকবেন।…’

চিঠিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে মিরন বলে উঠল, ‘রাজারামের দৌলত দখল করতে চান ক্লাইভ। তাই এই নখরা। বেতমিজ, কর্নেল ক্লাইভ খন্নাস। ইবলিশের আওলাদ।’

শিউরে উঠে মিরজাফর বলেন, ‘জবানে লাগাম লাগাও বেটা। দিবারেরও কান আছে।’

‘তো? আমি বুজদিল আদমি নই। সব হারামি ইংরেজকে আমি সবক শিখিয়ে ছাড়ব। লাথ মেরে ভাগাব সুবে বাংলা থেকে। একদল কারবারি যা চাইবে, তাই মেনে নিতে হবে নবাবকে?’

মিরজাফর সোজা হয়ে বসে ব্যস্ত গলায় বলেন, ‘শান্ত হও বেটা। ধেয়ান সে শোচো। আমার টাকা নেই। সেপাইদের বেতন বাকি পড়ে আছে। এই আওকাতে আগর বর্গিরা হানা দেয়, আগর সুজাউদ্দৌলার নজর পড়ে মুর্শিদাবাদের উপর তাহলে মসনদ বাঁচাবে কে?

মিরন কিছু বলতে গিয়ে থমকে যায়। ফের এসে বসে কুরসিতে। সুজাউদ্দৌলা ও বর্গির কথা উঠতেই চুপসে গিয়েছে সে। তার মনেও ভয় ধরেছে।

নবাব বলে চলেন, ‘আমাকে যে ভরসা রাখতেই হবে কোম্পানির ফৌজের উপরে। ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে আমি কাজিয়া বাঁধাই কী করে? মসনদকে সালামত রাখার মতো বাহাদুর আদমি আর কে আছে?’

রাজবল্লভ বলে উঠলেন, ‘পূর্ণিয়ায় ফৌজ পাঠানোর কী হবে হুজুর? অচল সিং-কে যে ফওরান সবক শেখানো জরুরি। নয়তো নবাবের ইজ্জত মাটিতে মিশে যাবে।’

‘সেপাইদের চাবকে লড়াই করতে পাঠাব আমি।’ ফের ফোঁস করে উঠল মিরন।

রাজবল্লভ বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। জবরানে সেপাইদের জঙ্গবাজির ময়দানে টেনে নিয়ে যেতে পারেন আপনি, কিন্তু তাদের নিয়ে কাম হাসিল করতে পারবেন কি? টাকার টোপ দিয়ে দলে টেনে নিতে পারে অচল সিং।’

মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘সহি বাত।’

নবাবের সঙ্গে রায়দুর্লভের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। দেওয়ানকে হত্যা করার ছুতো খুঁজে বেড়াচ্ছেন মিরন। একদা রায়দুর্লভের ঘনিষ্ঠ ছিলেন রাজবল্লভ। নিজের উন্নতির কথা ভেবে রায়দুর্লভকে ছেড়ে সম্প্রতি তিনি আঁকড়ে ধরেছেন নবাবজাদাকে। তাই নবাবজাদার প্রতি নিজের আনুগত্য বোঝাতে, নিজেকে বেশি করে রায়দুর্লভবিরোধী বলে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে রাজবল্লভ বলে উঠলেন, ‘সেপাইদের মাহিনা দেওয়ার দায় দেওয়ানজির। তিনি সেই দায় পালন করছেন না কেন? সেপাইদের মাহিনার টাকা দেওয়ানখানায় নেই বলে আমি বিশ্বাস করি না।’

মিরন উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘সহি বাত বলছেন আপনি।’

‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। দেওয়ানকে ঢিট করতে কেন কদম ওঠাচ্ছেন না?’ মিরজাফর খাঁর উদ্দেশে গুজারেশ করলেন ধূর্ত রাজবল্লভ। দেওয়ানের সঙ্গে নবাবের সম্পর্কটাকে আরও বিষিয়ে দিতে চান তিনি।

ভাঙের মৌতাতে ঝিমোচ্ছেন নবাব। রাজবল্লভের প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না।

মিরনের চোখে নিমেষে যেন ভয়ংকর হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। ‘বুডঢা দেওয়ান! সব শারারতি, সাজিশির মুরুব্বি। মদত দিচ্ছে রামনারায়ণকে। উও খরিশের বাচ্চা নির্ঘাত উসকেছে অচল সিং-কে। ওই বুডঢাকে কোতল করব আমি। দোজখে পাঠাব হারামির আওলাদকে। রায়দুর্লভজির কোঠি লুঠ করে ফৌজ পাঠাব পূর্ণিয়ায়।’

মিরনের জবান শুনে ভাঙের মৌতাত ছুটে গেল নবাবের। শিউরে উঠলেন তিনি।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *